কথাটা বোধহয় তার জীবনের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি মিলে গেল।
সারাদিন আর নাওয়াফের দেখা মিলল না। সে কোথায় গেছে, কী করছে কোনো খবর নেই। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে এলো। রাতের খানিক পরে নাওয়াফ ফিরল। দুই হাতে বাজারের ব্যাগ আর নানা রকম খাবার। দরজার সামনে বসে জুতা খুলতে খুলতেই সে স্বভাবসুলভ আদুরে গলায় ডাক দিল, “বউ! ও বউ! আমার আদুরে বউটা কই?”
ডাক শুনে পাখি ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
জুতার ফিতা খুলতে খুলতে হঠাৎ নাওয়াফের চোখ সামনের দিকে গিয়ে থমকে গেল। এক মুহূর্তের জন্য যেন সে সবকিছু ভুলে গেল। পাখির পরনে হালকা রঙের একটি তাতের শাড়ি। বড় বড় চোখ দুটো আজ কাজলে ঘেরা। ঠোঁটে হালকা লালচে লিপস্টিক। কোমর ছুঁয়ে নামা চুলগুলো লাল ফিতা দিয়ে বাঁধা। সাজটা খুব সাধারণ, অথচ অদ্ভুত মায়াময়। নাওয়াফের মনে হলো, এই নির্জন বনজঙ্গলের মাঝেও কেউ যেন হঠাৎ এক টুকরো বসন্ত এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
তবে পরক্ষণেই তার চোখ নিচের দিকে নামল। পাখির পা দুটো আজ ফাঁকা। সেখানে নেই সেই পরিচিত লাল আলতার ছোঁয়া। কেমন যেন অসম্পূর্ণ লাগল দৃশ্যটা। অকারণেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। মেয়েটা রাগ করুক, অভিমান করুক, তবু তাকে সুন্দর লাগা বন্ধ না হোক। সে প্রশংসা করে বলে, “সুবহানাল্লাহ, আজ যেন আমার ঘরে স্বয়ং আসমানের চাঁদটা নেমে এসেছে।”
অন্য সময় হলে পাখি লজ্জায় গাল দুটো লাল করে নিতো। কিন্তু আজ তার মন ভাল নেই। সেখানে আঘাত দিয়ে ফেলেছে লোকটা। তাই জবাবে সে কোনো কথা বলতে পারল না। নীরবে নাওয়াফের হাত থেকে বাজারের ব্যাগগুলো নিয়ে ঘরের ভেতরে চলে গেল। এক নজর তাকিয়েই নাওয়াফ বুঝে গেল, দুপুরের ঘটনার জন্য তার বউ ভীষণ অভিমান করে আছে। সে ধীর পায়ে ঘরে ঢুকল। পাখি তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে চেয়ে আছে। সন্ধ্যার মৃদু বাতাসে তার শাড়ির আঁচল উড়ছে। মুখে একরাশ নীরবতা। বুকে জমাট বাঁধা কষ্ট। নাওয়াফ প্লেটে বিরিয়ানি বাড়তে বাড়তে কয়েকবার আড়চোখে তাকাল ওর দিকে। অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। চুপচাপ গিয়ে পাখির পাশে দাঁড়াল সে। কিন্তু পাখি তার দিকে ফিরেও তাকাল না। বরং আরও একটু সরে গিয়ে খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল। নাওয়াফ এবারও রাগ করল না। হাত ধুয়ে এসে পাখির কাছাকাছি দাঁড়াল। দুষ্টুমিভরা স্বরে গুনগুনিয়ে একটা গান ধরল—
তোমার গায়ে তাঁতের শাড়ি,
চুল বাঁধা লাল ফিতায়।
রাগ কইরো না, রঙিন আলতা
দিয়া দিমু পায়।
তুমি আমার মরা গাঙ্গে
হঠাৎ আসা বান,
সোনা বউরে...,
তোমার লাগি বাঁধলাম এই গান
সোনা বউরে....
তোমার লাগি গাইলাম এ গান।
লোকটার কণ্ঠটা সত্যিই অপূর্ব। কিন্তু আজ সেই সুরেও পাখির মন গলল না। দুপুরের আচরণটা তাকে ভেতর থেকে আহত করেছে। কিছু ক্ষত থাকে, যা ক্ষমা করা যায়; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ভুলে যাওয়া যায় না।
নাওয়াফ ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াল। পাখি মুখ ফিরিয়ে নিল। তখন নাওয়াফ আলতো করে তার থুতনি ছুঁয়ে মুখটা নিজের দিকে ফেরাল। নিচু হয়ে আসা চোখদুটো দেখে তার বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। চোখের পাপড়িগুলো ভেজা। মেয়েটা কাঁদছে। নাওয়াফ হালকা করে নিজের কান ধরে ফিসফিসিয়ে বলল, “সরি, বউ।”
শব্দটা শুনতেই পাখির বুকের ভেতর জমে থাকা কান্না আর আটকে রইল না। এতক্ষণ যে অভিমান, যে কষ্ট, যে অপমান সে চেপে রেখেছিল। সব যেন হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে এলো। সে দুহাতে নাওয়াফের বুক চাপড়াতে লাগল। খুব জোরে নয়, বরং আহত শিশুর মতো অসহায়ভাবে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “কী পেয়েছেন আমাকে? কখনো আদর করেন, আবার কখনো কষ্ট দেন। কখনো বুকের মধ্যে আগলে রাখেন, আবার কখনো তালাকের ভয় দেখান। আমি কি মানুষ না? আমার কি কষ্ট হয় না?”
তার গলা আরও ভারী হয়ে এলো।
“আমাকে এতিম পেয়েছেন, অসহায় পেয়েছেন বলে যা খুশি তাই করবেন? আমি প্রতিবাদও করতে পারি না। তাই বলে কি আমার অনুভূতির কোনো দাম নেই?”
কথাগুলো বলতে বলতেই সে আবার কেঁদে উঠল।
নাওয়াফ আর কোনো জবাব দিল না।সে শুধু পাখির কাঁপতে থাকা হাত দুটো নিজের হাতে শক্ত করে ধরে রাখল।
মনে হলো, এই মুহূর্তে হাজারটা ব্যাখ্যার চেয়েও তার নীরব অনুশোচনাটাই বেশি দরকার। সে ওর হাত দুটো ধরে বলল,
“বউ, আমার লক্ষ্মী বউ থাম। এমন পাগলামি করে না লক্ষ্মীটি। আমি না তোর বর হই? বরকে কেউ মারে পঁচা মেয়ে?”
পাখি হেঁচকি টানতে টানতে নাক ঘষে বলে, “আর আপনি যখন মারেন তখন?”
“আমি তো তোর বর হই। শাসনের সময় শাসন করব। আদরের সময় আদর করর। আবার মারার সময় মারব। সেই অধিকার আমার আছে।”
“সেজন্য তালাকের ভয় দেখাবেন?”
“ওটা তো কথার কথা ছিল। আচ্ছা সরি। এখন আসেন আমার বধূয়া। বিরিয়ানি এনেছি। খাইয়ে দেন বরকে। রাতে বেশি বেশি আদর দিয়ে পুষিয়ে দিব।”
“পারব না।” বলেই গাল ফুলিয়ে রাখল সে।
নাওয়াফ ঠোঁট টিপে হেসে বলে,
“বুঝেছি তুই এখনি বাচ্চার মা হতে চাস। আমি ভেবেছিলাম আর কয়টা দিন সবুর করব। আচ্ছা আয় বাচ্চাদের দুনিয়ায় আনার বন্দোবস্ত করে নেই।”
পাখি চিৎকার করে ওঠল, “নায়া..হ।”
“নাহ কি?”
“আমি খাইয়ে দিচ্ছি।”
নাওয়াফ মুচকি হাসল।
-----
খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠল নাওয়াফ। ঘুম ভাঙতেই সে বাজারের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটি বড়সড় মাছ কিনল। মাছটা কেটেকুটেই নিয়ে এসেছে। কাটতে গিয়ে যদি পাখির হাত কেটে যায়, সেই ভয়টাই তার বেশি। মাছ দেখে পাখির মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কতদিন হলো তারা মাছ খায়নি! সে নিজের হাতে যত্ন করে মাছের ঝোল রান্না করল। রান্নাঘর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল সুস্বাদু ঘ্রাণ। নাওয়াফ পেট ভরে খেল। খেতে খেতে বারবার রান্নার প্রশংসা করল। পাখি অবশ্য মুখে কিছু বলল না, তবে তার মনটা অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে ভরে উঠল।
পরদিন নাওয়াফ কাজে বেরিয়ে গেল। এখন সে মোটামুটি সুস্থবোধ করছে। তাছাড়া এভাবে বসে থাকলেও তো চলবে না। কাজ না করলে সংসার চলবে কীভাবে? কাজে যেতে যেতে তার মনে হলো, সুযোগ পেলে একবার রমিজ কিংবা নিখিলকে ফোন করবে। ওদিকটার পরিস্থিতি এখন কেমন, কিছুই তো জানা নেই। অনিশ্চয়তার এই জীবন আর ভালো লাগছে না তার। যদি সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে থাকে, তবে পাখিকে নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে চলে যাবে। এই জায়গাটাকে আর ভালো লাগছে না। চারপাশে যেন এক অদ্ভুত অশান্তি ঘুরপাক খাচ্ছে। মন কোনোভাবেই এখানে স্থির হতে চায় না। নাওয়াফ চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই পাখি দরজাটা বাহির থেকে আটকে বেরিয়ে পড়ল। আজ সে সিরাজের কাছে এসেছে। গতকালই সিরাজ তাকে খবর পাঠিয়েছিল। পাখি ভেবেছিল, চুক্তিপত্রে সই করেই আজ সব ঝামেলা চুকিয়ে ফেলবে। তারপর নিজের মতো করে নতুন করে জীবন শুরু করবে। কিন্তু ভাগ্য কি কখনো মানুষের পরিকল্পনা মেনে চলে? পাখি যখন সিরাজের ঘরে ঢুকল, তখন সিরাজ টেবিলে বসে কিছু একটা লিখছিল। তার উপস্থিতি টের পেয়ে কলমটা নামিয়ে রাখল সে। মুখ তুলে একবার পাখির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “এসেছো? তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম।”
ড্রয়ার খুলে একটি কাগজ বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
“নাও, এই হলো চুক্তিপত্র। সই করে দাও, তারপর তুমি চলে যেতে পারবে।”
পাখির চোখে মুহূর্তেই স্বস্তির ঝিলিক ফুটে উঠল। কিন্তু সে তখনও জানত না, এই কাগজের পাতার আড়ালে তার জন্য অপেক্ষা করছে এক নতুন বিস্ময়।
পাখি নিঃশব্দে মাথা ঝাঁকাল। চুক্তিপত্রে সই করার আগে একবার মনোযোগ দিয়ে পুরোটা পড়ে নিতে চাইল সে।
কিন্তু শেষ লাইন পর্যন্ত পড়ার পর তার মনে হলো, যেন মাথার ওপর গোটা আকাশটা ভেঙে পড়েছে। অবিশ্বাসে বিস্ফারিত চোখে সে সিরাজের দিকে তাকাল।
“এসব কী, সিরাজ ভাই? আপনি এতটা জঘন্য হতে পারেন? বাইরে ভালো মানুষের মুখোশ পরে ভেতরে এমন ভয়ংকর রূপ লুকিয়ে রেখেছেন?”
সিরাজ মৃদু হেসে চেয়ারে হেলান দিল।
“পুরুষ কখনো পুরোপুরি ভালো হয় না, পাখি। কেউ মুখোশ পরে থাকে, কেউ সুযোগের অপেক্ষা করে। আমি দুটোই করেছি। যৌবনে প্রথম যাকে দেখে ভালো লেগেছিল, সে তুমি। সেদিন ভেজা কাপড়ে তোমাকে দেখার পর থেকেই তোমাকে চাইতাম। ইচ্ছে ছিল তোমাকে বিয়ে করে নিজের করে নেওয়ার। কিন্তু পরে জানতে পারলাম তুমি বিবাহিত।”
সে একটু থামল।
“প্রথমে কষ্ট পেয়েছিলাম। তারপর ভাবলাম, কষ্ট পাওয়ার কী আছে? তোমার সংসারটাই যদি ভেঙে দেওয়া যায়, তাহলে তো সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।”
পাখির চোখে বিস্ময় আর ক্ষোভ একসঙ্গে ফুটে উঠল।
“আপনি আমার সংসার ভাঙতে চান?”
“হ্যাঁ, চাই। বিবাহিত নারীর প্রেমে পড়ার মতো ভয়ংকর অনুভূতি বুঝি পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। সেদিন সারারাত তুমি আমার বাড়িতে ছিলে। তোমার স্বামীর মনে সন্দেহের বীজ বপন হয়ে গেছে। আমি সেই সন্দেহটাকে আরও বড় করব। গাঢ় করব। একসময় সে তোমাকে অবিশ্বাস করবে, দূরে ঠেলে দেবে। তখন তুমি পুরোপুরি আমার হয়ে যাবে।”
পাখি ঘৃণা ভরা দৃষ্টিতে তাকাল।
“মিথ্যা স্বপ্ন দেখছেন আপনি। আপনার এই দুঃস্বপ্ন কোনোদিন পূরণ হবে না। আমার স্বামী যদি এসব জানতে পারে, তাহলে আপনার পরিণতি ভালো হবে না। চিনেন তাকে?” শেষেরটুকু ঝাঁঝাল ছিল।
সিরাজ ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল।
“চিনব না কেন? নাওয়াফ তালুকদার বেশ পরিচিত মানুষ। বর্তমানে ছদ্মবেশে, ছদ্মনামে জীবন কাটাচ্ছে। তবে ওসব বাদ দাও। তার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা নেই। আমি শুধু তোমাকে চাই।”
একটু থামল সে। পরক্ষণেই চোখদুটো অস্বাভাবিকভাবে চকচক করে উঠল।
“অনেক দিন ধরে তোমাকে মন চাইছে। সে বড্ড অস্থির হয়ে আছে। কিন্তু তুমি কখনো আমার হবে না, এটা মেনে নিতে পারছি না।”
পাখির ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। ঠাস করে একটা সজোরে চড় এসে পড়ল সিরাজের গালে।
“ছিহ্, নীচ মানুষ! আপনার মতো লোকের জন্য ঘৃণাও কম হয়ে যাবে। নরকেও আপনার ঠাঁই হবে না।”
কথাটা বলেই সে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলো।
কিন্তু ঠিক তখনই পেছন থেকে তার শাড়ির আঁচল চেপে ধরল সিরাজ।
পাখি থমকে দাঁড়াল। এক মুহূর্তের জন্য যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না, মানুষটা এত নিচে নামতে পারে। সে ক্ষুব্ধ চোখে তাকিয়ে বলল, “ছাড়ুন বলছি!”
সিরাজের মুখে বিকৃত হাসি ফুটে উঠল। পাখি আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকতে চাইল না। সে তার হাত ঝটকা মেরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। এমনকি আত্মরক্ষার জন্য সিরাজের হাতে কামড়ও বসিয়ে দিল। সিরাজ ব্যথায় হাত সরিয়ে নিল, কিন্তু পরক্ষণেই পাখির মুখের কাছে কিছু স্প্রে করে দিল। তীব্র গন্ধ নাকে যেতেই পাখির মাথা ঘুরে উঠল।
চারপাশ ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। অচেতন হয়ে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো পাখির মনে হলো সে ভয়ংকর এক ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছে। যার শেষ পরিণতি কি সে জানে না। শুধু এতটুকু চায় তার নাওয়াফ ভাই তাকে যেন ভুল না বুঝুক। সে নির্দোষ। সিরাজ নিচু হয়ে তার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক অশুভ হাসি ফুটে উঠল। মনে মনে সে এমন এক পরিকল্পনা আঁটছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল পাখির জীবনকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা। যেন একসময় পাখি নিজেকে সম্পূর্ণ একা ও অসহায় মনে করে। এবং তার কাছেই আত্মসমর্পণ করে।
সন্ধ্যার একটু আগে বাড়ি ফিরল নাওয়াফ। ঘরে ঢুকতেই তার কপাল কুঁচকে গেল। পুরো ঘর অন্ধকার। আজ কোনো প্রদীপ জ্বলেনি। ঘরে কোনো আলো দেওয়া হয়নি। আর পাখি? সে কোথায়? নাওয়াফের বুকটা অজানা আতঙ্কে মোচড় দিয়ে উঠল। প্রথম দিন হলে হয়তো সে এটাকে কাকতালীয় ঘটনা বলে মেনে নিতে পারত। দ্বিতীয় দিনেও নিজেকে বুঝিয়ে রাখা যেত। কিন্তু আজ নিয়ে টানা তিন দিন! প্রতিদিন তার অনুপস্থিতির সময়ে পাখি কোথায় যায়? কেন যায়? প্রশ্নগুলো গত কয়েকদিন ধরে তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
আজ আর সে চুপ করে বসে থাকবে না। আজ তাকে সত্যিটা জানতে হবে। এমনিতেই সারাদিনের পরিশ্রমে শরীর ক্লান্ত। একজন যাত্রীর সঙ্গে ঝামেলার কারণে মেজাজও খারাপ হয়ে আছে। তার ওপর ঘরে ফিরে আবার পাখিকে না পেয়ে ভেতরের সমস্ত ধৈর্য যেন ভেঙে পড়ল। সে দ্রুত বেরিয়ে পড়ল। যেতে যেতে পথের ধারে একটি বাড়ি পড়ল। এই পথ দিয়ে যাতায়াত করলে বাড়িটার সামনে দিয়েই যেতে হয়।
নাওয়াফ সে বাড়িতে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়ল। কিছুক্ষণ পর একজন মধ্যবয়সী মহিলা দরজা খুললেন। নাওয়াফ বিনীত কণ্ঠে বলল, “দুঃখিত আন্টি, আপনাকে বিরক্ত করলাম। আসলে আমার স্ত্রীকে খুঁজে পাচ্ছি না। আপনি কি কোনো মেয়েকে এই পথ দিয়ে যেতে দেখেছেন? উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ গায়ের রং। খুব বেশি লম্বা নয়। পাঁচ ফুট এক ইঞ্চির মতো উচ্চতা। আজ গোলাপি রঙের শাড়ি পরা ছিল।”
মহিলাটি কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
“হ্যাঁ, দেখেছি তো। দুপুরের দিকে এমন একজন মেয়েকে মাতবরের বাড়ির দিকে যেতে দেখেছি। শুধু আজ নয়, গত কয়েকদিন ধরেই যেতে দেখছি।” কথাটা শুনে নাওয়াফের বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠল।
সে দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
“ওই বাড়িতে কে কে থাকে?”
“মাতবর একাই থাকে।”
“আর কেউ না?”
“না। লোকটা তো এখনো বিয়ে করেনি।”
নাওয়াফের মুখের পেশিগুলো টানটান হয়ে উঠল।
“বাড়িটা কোন দিকে?”
মহিলা পথ দেখিয়ে দিলেন।
“আরেকটু সামনে গিয়ে বাম দিকে একটা সরু পথ আছে। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে গেছে। ওই পথ ধরে গেলেই একলা একটা বাড়ি দেখতে পাবে। ওটাই মাতবরের বাড়ি।”
“আচ্ছা, ধন্যবাদ।”
কথা শেষ করে নাওয়াফ দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল।
দরজা বন্ধ করে দিলেন মহিলা।
নাওয়াফ হাঁটছে। কিন্তু মনে হচ্ছে শরীর যেন চলতে না। আর সাড়া দিতে চাইছে না। সারাদিন কাজ করেছে। দুপুরে খাওয়ারও সময় পায়নি। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়েছে। আজই তো রমিজদের সঙ্গে কথা হয়েছিল। সব ঠিকঠাক থাকলে দুদিন পর পাখিকে নিয়ে নিজের জেলায় ফিরে যাবে বলে ভেবেছিল সে। কিন্তু এখন? মাথার ভেতর অদ্ভুত সব চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। পরক্ষণেই নিজেকে নিজে ধমক দিয়ে ওঠল।
“এত ভেব না মন। আমার পাখি এমন নয়। ও জেদি হতে পারে, অবাধ্য হতে পারে, নিজের মতো চলতে ভালোবাসতে পারে। কিন্তু ও বিশ্বাসঘাতক নয়।”
নিজের মনকে বোঝাতে বোঝাতেই সে মাতবরের বাড়ির কাছে পৌঁছে গেল। বাড়িটার চারপাশে তখন অস্বাভাবিক নীরবতা। জঙ্গলের বুক চিঁড়ে একা দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা। ঘরের পাশ দিয়ে সদর দরজার দিকে এগোচ্ছিল নাওয়াফ। ঠিক তখনই খোলা জানলা দিয়ে তার চোখে একটি অপ্রত্যাশিত দৃশ্য ধরা পড়ল। ঘরের ভেতর ম্লান আলো জ্বলছে। সেই ক্ষুদ্র আলোয় একজন পুরুষ এবং একজন নারীর ঘনিষ্ঠ ছায়ামূর্তি দেখা যাচ্ছে। পুরুষটির বুকে নারীটির মাথা। তারা আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়াল। এবার একে অপরকে চুম্বনে লিপ্ত হলো। মেয়েটা পুরুষটির চুল দুহাতে খামচে ধরে অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে গোঙিয়ে ওঠল। পুরুষটি এবার মেয়েটার গলায় নেমে এলো। যে দৃশ্য না চাইলে সে দেখছে। নারীটির গড়ন, চুল, পোশাক সবকিছুই অবিকল পাখির মতো। ওটা যে পাখি সেটাও স্পষ্ট। আবছা আলোতে শুধু মুখটা দেখা যাচ্ছে না। পিছনের অংশ সবই দেখাচ্ছে। মাতবর পাখিকে এবার কোলে তুলে নিল। বেডে নিয়ে শুয়ে দিল ওকে। ঘরের ড্রিম লাইটটা এবার বন্ধ করে দিল। খোলা জানলা দিয়ে চাঁদের আলো ঘরে ঢুকছে। সে আলোতে নাওয়াফ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে লোকটা পাখির ব্লাউজের হুক খুলছে। ঘাড়ে ছোট ছোট চুমু খাচ্ছে। পাখি বিছানার চাদর খামচে ধরল। মুখটা দেখা যাচ্ছে না। শুধু ব্যাকপিঠটা দেখা যাচ্ছে তাদের। শাড়ির প্রতিটি কুচি খুলে তারা আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠল। শাড়িটা ছুঁড়ে মারল জানলার দিকে। নাওয়াফ ভালো করে শাড়িটা দেখল। এটা তারই কিনে দেওয়া শাড়িটা। যেটা পাখি সকালে পরেছিল। নাওয়াফের আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না। সবটা জলের মতো পরিষ্কার। তার পা দুটো তৎক্ষণাৎ বরফে পরিণত হলো। মুখে নেই কোন ভাষা। তার গোটা পৃথিবী জুড়ে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। সেখানে আলোর কোন দেখা নেই। তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। সে তলিয়ে যাচ্ছে কোন অন্ধকার জগতে। তার পাখি তার সঙ্গে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করল এটা ভাবতেও তার শ্বাসরুদ্ধ হলো। কত ভালোবাসত! কত রাত তারা একে অপরে ঘনিষ্ঠ হয়ে কাটিয়েছে। এটা ভাবতেও তার অবিশ্বাস্য ঠেকছে যে, পাখি তাকে ঠকাল। নিজ চোখকেও অবিশ্বাস করতে পারছে না সে। তার সামনে ওদের ঘনিষ্ঠ দৃশ্য সে তা ভুলে যাবে কি করে?
হঠাৎ রাগে শরীরের সমস্ত রক্ত মাথায় উঠে গেল। সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর যেন কেউ ধারালো ছুরি চালিয়ে দিয়েছে। তার সমস্ত বিশ্বাস, সমস্ত ভালোবাসা, সমস্ত স্বপ্ন মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হলো। ক্রোধে তার হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠল। চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে প্রায় তেড়ে যাচ্ছিল ঘরের দিকে। আজ দুই দুটো লাশ ফেলবে সে। কোন প্রতারকের তার জীবনে ঠাঁই নেই। ঠিক তখনই তার ভেতরের আরেকটি সত্তা তাকে থামিয়ে দিল। মনে হলো কেউ যেন সামনে দাঁড়িয়ে আঙুল তুলে বলছে তাকে,
“কোথায় যাচ্ছো, নাওয়াফ?”
সে থমকে দাঁড়াল। কণ্ঠটা আবার বলল,
“যে তোমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তার জন্য লড়তে? নাকি এমন একজনের জন্য যে তোমার নিজের জীবন ধ্বংস করতে চাইছে, যে তোমার ভালোবাসার মর্যাদা রাখেনি তার জন্য?”
নাওয়াফ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। চোখ দুটো রক্তিম। বুকের ভেতর ভয়ংকর এক যুদ্ধক্ষেত্র শুরু হয়ে গেছে। একদিকে ভালোবাসা। অন্যদিকে বিশ্বাসঘাতকতা। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে তার ভেঙে পড়া বিশ্বাস। হ্যাঁ তার বিশ্বাসের মৃত্যু হয়েছে। যে বিশ্বাস তার এতদিন ছিল, তাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। আর যে হত্যা করেছে, সে আর কেউ না। তার নিজের মানুষ। যার স্থান ছিল হৃদয়ের সর্বোত্তম উপরে।
জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত আসে, যখন মানুষ কাঁদতেও পারে না, চিৎকারও করতে পারে না। শুধু মনে হয় বুকের ভেতর কেউ ধীরে ধীরে একটা জীবন্ত হৃদয়কে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলছে। নাওয়াফের ঠিক সেই অবস্থাই হলো। তার চোখ দুটো ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে এলো। চোখের কোণে জমে থাকা জলগুলো আর আটকে রাখতে পারল না সে। টুপটাপ করে মাটিতে পড়তে লাগল। যে মেয়েটার জন্য সে পৃথিবীর সঙ্গে লড়েছে, যে মেয়েটাকে নিজের বুকের ভেতর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাটা দিয়েছে। আজ সেই মেয়েটাকেই অন্য একজন পুরুষের সঙ্গে দেখে এসেছে। দৃশ্যটা সত্যি ছিল, নাকি মিথ্যা তা যাচাই করার মতো শক্তিটুকুও আর অবশিষ্ট নেই তার। মানুষ যখন খুব বেশি ভেঙে যায়, তখন সে আর সত্য খোঁজে না। তখন সে শুধু কষ্ট অনুভব করে। নাওয়াফও তাই করল। ধীরে ধীরে ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। কিন্তু হাঁটতে পারছে না। মনে হচ্ছে পা দুটো শরীরের নয়, পাথরের তৈরি। প্রতিটা পদক্ষেপে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে। বুকটা ফাটছে। কলিজা পুড়ে যাচ্ছে। জ্যান্ত মানুষের শরীরে আগুন ঢেলে দিলে যেমন লাগে, তার দিক তেমনই অসহনশীল যন্ত্রণা হচ্ছে। যা পৃথিবীর বুকে থাকা কোন মানুষকে বোঝানো সম্ভব নয়। তার মনে হলো,
আজ যদি সে মরে যেত, তাহলে হয়তো এত কষ্ট হতো না। নাওয়াফ চলে যেতেই সিরাজের ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। যে হাসি মানুষ হাসে না। হাসে শিকারি। তার বিছানায় শুয়ে থাকা নারীটির দিকে তাকিয়ে সে আরেকটু হাসল। কে সেই নারী? যার দিকে তাকিয়ে সে হাসল। সে কি আসলেই পাখি ছিল? নাকি আড়ালে পাখি রূপি অন্য কেউ? সবটা যেন ধোঁয়াসা, আর অপ্রকাশিত রহস্যে ঘেরা।
--------
রাত তখন প্রায় একটা। অন্ধকার ঘরের ভেতর ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরল পাখির। চোখ খুলতেই কিছুই বুঝতে পারল না। মাথাটা প্রচণ্ড ব্যথা করছে। চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার।দরজার ফাঁক দিয়ে আসা সামান্য আলো ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কয়েক সেকেন্ড পর সব মনে পড়তেই বুকটা ধক করে উঠল। সে দ্রুত বিছানা থেকে নেমে পড়ল। তারপর প্রাণপণে দৌড়াতে শুরু করল। সবটা টের পাচ্ছে সিরাজ। কিন্তু আজ আর পাখিকে আটকাচ্ছে না। কারণ যা আগুন ঢালার, তা ঢালা শেষ। সে চায় পাখি সর্বদিক দিয়ে সর্বশান্ত হয়ে যাক। কোনঠাসা হয়ে পড়ুক। সব হারিয়ে তার কাছে ফেরত আসুক। আত্মসমর্পণ করুক। তার হয়ে থাকুক।
জঙ্গলের সরু পথ ধরে ছুটছে সে। কোথাও কাঁটা পায়ে বিঁধছে। কোথাও লতায় জড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে। কোথাও মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে যাচ্ছে। তবুও থামছে না। আজ তার ব্যথা লাগছে না। আজ তার ভয় করছে না। শুধু একটাই ভয়। নাওয়াফ যদি তাকে ভুল বুঝে! শাড়িটা এলোমেলো। চুলগুলো বিশৃঙ্খল। শরীর কাদা আর ধুলোয় মাখামাখি। তবুও সে ছুটছে। ছুটতে ছুটতে কাঁদছে।
আর মনে মনে বলছে, "নাওয়াফ ভাই, একবার শুধু আমার কথা শুনবেন। একবার। তারপর যদি শাস্তি দেন, আমি মাথা পেতে নেব।"
ঘামে ভেজা, ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন বাড়ির উঠোনে পৌঁছাল, তখন রাত গভীর। ঘরের ভেতর থেকে সিগারেটের তীব্র গন্ধ ভেসে আসছে। এত তীব্র যে মনে হচ্ছে ধোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোনো মানুষের ভেতরের সমস্ত শান্তিও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
পাখির বুকটা কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল সে। ঘরের ভেতর তাকাতেই তার নিঃশ্বাস আটকে গেল। নাওয়াফ বসে আছে। এক হাতে সিগারেট। অন্য হাতটা ঢিলে হয়ে পাশে ঝুলে আছে। চারপাশে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য সিগারেটের অবশিষ্টাংশ। মনে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে সে এক জায়গায় বসে আছে। নড়েনি। চড়েনি। শুধু পুড়েছে।
যেমন পুড়ছে তার বুক। পায়ের ওপর পা তুলে নাচাচ্ছে। দু আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট। সেটা ফুঁকতে ফুঁকতে গুনগুন করে গান গাইছে লোকটা...
ঝড় হয়ে দিলে সব ধ্বংস করে
ক্ষত দেখাবো কাকে।
পারবেনা থামাতে কেউ আমাকে
সব শেষ করবো নিজের হাতেই...
গানটা শোনা মাত্রই পাখির বুকের ভেতরটা কেমন করে দুমড়ে মুচড়ে ওঠল। তার হাত পা শীতল হয়ে এলো। লোকটা একেবারে চুপ হয়ে গেল। ওনার নিস্তব্ধতা তাকে আরও ভয়াবহভাবে ভয় পাইলে দিল। তখনই ধুম করে তাকাল ওর দিকে। সঙ্গে সঙ্গে পাখির বুকের ভেতরে ধক করে ওঠল। লোকটার চোখ দুটো আজ রক্তজবার মতো লাল। চোখে মুখে ফুটে ওঠেছে গভীর কাঠিন্যতা। শক্ত আদল। ওর দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থায় হঠাৎ অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেসে দিল। পাখি অবাক হয়ে গেল। এমন অদ্ভুত আচরণ করছে কেন লোকটা? তার ভয় এবার বৃদ্ধি পেল। সে ভিতরে ঢোকার আর সাহস পেল না। লোকটাই ধীরে ধীরে জ্বলন্ত সিগারেট হাতে ওর দিকে এগিয়ে গেলো। ওর গালে প্রথমে নরম করে হাত রাখল। সে হাতটা ধীরে ধীরে পৌঁছে গেল চুলে। এবার খামচে ধরল ওর চুল। পাখি ব্যথায় চোখ মুখ খিঁচে নিল। নাওয়াফ তখন আরেকটি কাজ করল। ওর থুতনি চেপে ধরে বলল, “জিভ বের কর।”
পাখি ভয়ার্ত চোখে মুখে কাঁপতে কাঁপতে জানতে চাইল, “কে...কেন?”
নাওয়াফ চিৎকার করে শাসিয়ে ওঠল ওকে।
“শুয়ারে*র বাচ্চা তোরে বলছি না বের করতে। আমার মুখে মুখে আবার তর্ক করোস?”
লোকটার মুখের ভাষা শুনে পাখি স্তব্ধ। সেই সঙ্গে ছলছল নয়নে ওনার শক্ত মুখটার দিকে চেয়ে রইল। যেখানে আজ তার নাওয়াফ ভাইকে সে খুঁজে পাচ্ছে না। এ যেন অন্য কেউ। যাকে পাখি চিনে না। নাওয়াফ নিজেই পাখির মুখের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে জিভটা টেনে বের করল। সেখানে জিভের মাথায় চেপে ধরল জ্বলন্ত সিগারেটটি।
পাখি চিৎকার করার আগেই ওর মুখ চেপে ধরল। যন্ত্রণায় ছটফট করে ওঠল পাখির ছোট দেহটা। হাত পা লাফিয়ে নাওয়াফের থেকে ছুটতে চাইল। কিন্তু ওমন বলবান পুরুষের থেকে ছোটা কি এতই সহজ? পাখির দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে লোকটার হাতের ওপর পড়ল। তবুও লোকটা তাকে ছাড়ল না। একটু মায়া দেখাল না। কিছুক্ষণ পর তাকে ছেড়ে দিল। কিন্তু এবার তাকে খাটের ওপর ছুঁড়ে মারল। তার দিকে আবার ভয়ংকর রূপে এগিয়ে যাচ্ছিল। পাখি ভয়ে ভয়ে পিছু হটল। সেই সঙ্গে ভয়ার্ত চোখ দুটো নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আপনি এমন করছেন কেন নাওয়াফ ভাই? কি হয়েছে আপনার? আপনি তো কখনো এমন করে আঘাত করেননি।”
নাওয়াফ শরীর থেকে শার্টটি রাগে ক্ষোভে টেনে হিঁচড়ে ছিঁড়ে ফেলল। সিগারেট ধরাল আরেকটি। সেটা ধরিয়ে টানতে টানতে একটা চেয়ার টেনে পাখির সামনে মুখোমুখি করে পায়ের ওপর পা তুলে বসল। উদম শরীর। শুধু প্যান্ট পরনে। বলিষ্ঠ দেহের প্রতিটা ভাঁজ স্পষ্ট। দেখতে কত সুন্দর! এই পুরুষটিকে দেখলে যে কোন নারী প্রেমে পড়তে বাধ্য। কিন্তু তার ভয়ংকর রূপ দেখলে মৃত্যু গ্রহণ করে নিবে, তবুও চাইবে না এমন পুরুষ তার হোক। লোকটার মাথার ব্যান্ডেজটি নেই। সেখান দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তার। সে দুআঙুল মাঝে জ্বলন্ত সিগারেটটি রেখে চেয়ারে চওড়া শরীরটা হেলিয়ে দিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল ওর দিকে, “আমি কি দেখতে অসুন্দর?”
পাখি প্রথমে এহেন প্রশ্নে চমকালো। পরক্ষণে বলল,
“নাহ।”
লোকটা আবার প্রশ্ন করল,
“তোকে কি আমি কম ভালোবাসতাম?”
পাখি মাথা ঝাঁকিয়ে এবারও জবাব দিল, “নাহ।”
“সজ্ঞানে কোনদিন তোকে কোন অভাবে রেখেছি?”
“নাহ।”
“বিয়ের পর একদিনও তোর গায়ে হাত তুলেছি?”.
“নাহ।”
“আমার ভালোবাসায় কি কোন কমতি ছিল?”
“নাহ।”
“আমার দ্বারা কি কখনো শারীরিক ও মানসিক অসুখী ছিলি?”
“নাহ।”
“বাস্টার্ডের বাচ্চা তাহলে তুই আরেক পুরুষের সঙ্গে শুলি কেন? তুই আরেক পুরুষের বিছানায় গেলি কেন? আমার সম্পত্তি আরেক পুরুষকে বিলিয়ে দিলি কেন? উত্তর দিস কিন্তু পাখি। নতুবা তোর জিভ টেনে নিব আমি।”
পাখির মাথায় যেন গোটা আকাশটা ভেঙে পড়ল। অবিশ্বাস্য নয়ন তার। এসব কি বলছে তার নাওয়াফ ভাই? এ যে মিথ্যে!দরদর করে সমস্ত শরীর কাঁপছে তার। সে বিস্মিত চোখে মুখে জিজ্ঞেস করল, “কি বলছেন নাওয়াফ ভাই? দেখুন আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন। আমি ওমন মেয়ে নই। আপনি চিনেন না আপনার পাখিকে? ও নাওয়াফ ভাই, বিশ্বাস করুন আপনার যা, আমি তা কাউকে বিলিয়ে দেইনি।”
কথাগুলো বলতে গিয়ে তার গলাটা অবরুদ্ধ ও ভারী হয়ে এল। গাল গড়িয়ে চোখ থেকে জল পড়ছিল। সে জলে আজ কলিজা ভিজল না নাওয়াফের। উল্টো তার ধৈর্যের মাত্রা ভেঙে গেল। নিজের চোখের দেখাটাকে মিথ্যে প্রমাণ করতে চাইছে মেয়েটা। কিন্তু সে তো বোকা নয়? সে ঠাস করে পাখির গাল নিয়ে দুটো চড় বসিয়ে দিল। চড়ের তেজ এতটাই ছিল যে, পাখির ঠোঁট কেটে গেল। কোমল ঠোঁট কেটে রক্তের ফিনকি বেরিয়ে এলো। মুখের সামনে চুলগুলো এসে ঝুলে পড়ল।
নাওয়াফ ধীরে ধীরে পাখির দিকে এগিয়ে যায়৷ তার হাত দুটো চলে যায় পাখির চুলে। ব্যথা দিয়ে খামচে ধরে চুলগুলো। পাখি আহ্ শব্দ করে ওঠে। নাওয়াফ তর্জনী আঙুল তুলে ওকে শাসিয়ে ওঠল, “চুপ, একদম চুপ। একটাও শব্দ মুখ দিয়ে বের করবি না। আজ আমি বলমু, তুই শুধু শুনবি।”
পাখি ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকাতে চায়। তবুও সে পারে না। তার অবাধ্য চোখ দুটো কাঁদছে। গাল ভিজে জল গড়াচ্ছে। লোকটা তার চুল টেনে মাথাটা উঁচু করে তুলে।
“জগতে আমার নিজের আপন বলতে কেউ ছিল না। একমাত্র তুই ছিলি। সেই তোরে বিশ্বাস করে মনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত জায়গাটা দিয়েছিলাম। বুকের মাঝখানের জমিনটাতে তোর নামে দলিল করে দিয়েছিলাম। তুই সেই বিশ্বাসের ঘরে আগুন দিলি? অবিশ্বাসের বিষ ধরাইয়া দিলি মনে? এই বেইমান, তোরে কি আমি কম ভালোবেসে ছিলাম? কম যত্নে রেখেছিলাম?”
পাখি ফুঁপিয়ে ওঠে। কান্নার কারণে সে কোন কথার সঠিক জবাবই দিতে পারে না। তার মনে হয় মুখ খুললেই সে আবার চড় খাবে।
নাওয়াফ আবার ক্ষোভ নিয়ে কাঠিন্য গলায় বলে, “আমি নাওয়াফ তালুকদার খাওয়া জিনিস খাই না। আমার জীবনে নষ্ট কোন জিনিস আমি রাখি না। তা শখের নারী হলেও। অতঃপর তোকেও দ্বিতীয়বার গ্রহণ করার কোন সুযোগ নেই।”
পাখি আশ্চর্য হয়ে গেলো। কি বলছে লোকটা? সবকিছু কি এত সহজেই হয়ে যায়? আর কতবার সে বোঝাবে সে নষ্ট নয়। তার দেহ ও মন পবিত্র। সে আবারও ফুঁপাতে ফুঁপাতে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে বলে, “ও নাওয়াফ ভাই, আপনি আমায় ভুল বুঝছেন। আমি নষ্ট নই বিশ্বাস করুন। আমার দেহ ও মন পবিত্র।”
নাওয়াফ বজ্র কণ্ঠে ধমকে ওঠল ওকে,
“চুউব কু** বাচ্চা...! দুই দুইটা রাত, তিনটা দিন আরেক পুরুষের ঘরে আরেক পুরুষের সঙ্গে দেহ বিলিয়ে আইছোস কইতে আমি ওমন নই। আমারটা খেয়ে আমারটা পরে আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলি? ইচ্ছে তো করতেছে তোরে জ্যান্ত পুতে দেই।”
একটু থেমে অধরজোড়া জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নিয়ে আবার বলল, “আমার আদালতে বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি কি জানোস? মৃত্যু। তোর মৃত্যু দিয়ে আমি নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্তবোধ করব। আজ তোর মৃত্যু আমার হাতে হবেরে পাখি, আমার হাতে হবে। জানে মেরে দিব তোকে। আজ আর কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না। তোরে আমি জ্যান্ত কবর দিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর কাহিনিটি রচনা করব। সেই কাহিনির নায়কও আমি, খলনায়কও আমি।”
#(চলমান~)
#লামইয়া_তাসনিম