ফন্ট সাইজ:
থিম:
সে আমার সর্বনাশ-২

৩৪তম পর্ব

লেখক: লামইয়া তাসনিম

#সে_আমার_সর্বনাশ_২

(৩৪, ৩৫)

“তোর মৃত্যু আমার হাতে হবেরে পাখি। আমার হাতে হবে। জানে মেরে দিব তোকে।”

কথাটি যেন অনবরত বেজে চলছে তার কর্ণধারে। সে যেন এখনো বাকরুদ্ধ। নিজের কানকে পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারছে না, সেকি সঠিক শুনল, নাকি ভুল। না না ভুলই হবে। সঠিক হবে না। কারণ তার নাওয়াফ ভাই এমনটা বলতেই পারে না। তাকে মারতেও পারে না। ওনি না তাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে? তাকে কি মারা এত সহজ? মোটেও না। সে ভুলই শুনেছে। সে মলিন মুখে হাসতে হাসতে বলল, “দেখুন না নাওয়াফ ভাই, আজকাল কানে কি যেন হয়ে়ছে? উল্টা পাল্টা সব শুনছি। আপনি নাকি আমাকে মেরে ফেলবেন? এ কথা তো আমি মরে গেলেও বিশ্বাস করব না। আমি জানি আপনি আমাকে কতটা ভালোবাসেন। আপনি আমাকে মারতেই পারেন না। দুনিয়া উল্টে গেলেও একথা আমি বিশ্বাস করব না।”

লোকটা কঠিন মুখে বলে,

“আমি তোকে ভালোবাসি না।”

পাখির কলিজাটা যেন তৎক্ষণাৎ কেঁপে ওঠল। শরীর থরথর করে কাঁপছিল। চোখ দুটো নোনা বারিতে ছলছল করে ওঠল। সে মিছেমিছি হেসে জানতে চাইল, “মজা করছেন না?”

“তুই কি আমার বেয়াইন লাগিস যে মজা করব? এত কিছুর পরও তুই আমার কাছে আশা রাখিস কি করে তোকে আমি ভালোবাসব?”

“ভালোবাসতেন না?”

“বাসতাম। এখনো বাসি। কিন্তু তোকে না। আমার সেই কিশোরি বউটাকে ভালবাসি। যে হারিয়ে গেছে। মরে গেছে।”

পাখি চক্ষু ভর্তি জল নিয়ে চ্যাঁচিয়ে ওঠে,

“আমি মরি নাই। আমি জীবিত।”

“হ্যাঁ তুই জীবিত। কিন্তু আমার বউ না।”

লোকটার কথা শুনে তার বক্ষ মাঝটা অজানাভাবে কেঁপে ওঠে। অন্তরের গভীরে গিয়ে কাঁটার মতো বইল। কোন কিছু বলার সাহস খুঁজে পাচ্ছে না সে। কিন্তু আজকে তাকে চুপ থাকলে চলবে না। সে আজকে চুপ থাকলে তার নাওয়াফ ভাই তাকে ভুল বুঝবে। তার শরীরে কলঙ্ক লাগবে। সেই কলঙ্ক শেষে সে কোন পানি দিয়ে মুছবে? সে শেষবারের মতো লোকটাকে বোঝাতে চেষ্টা করল। জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট জোড়া ভিজিয়ে নিয়ে বলে, “নাওয়াফ ভাই, শুনুন আমার কথাটা। একটাবার কথা বলার সুযোগ দেন আমাকে। আমি যে নির্দোষ সেটা প্রমাণ করতে দেন।”

“তুই নির্দোষ?” কথাটা বলে লোকটা কেমন করে যেন হাসল।

তার কথাটা বিশ্বাস করল না। তার ঠিক বুকের বাম পাশটা জ্বলে ওঠল। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে আজ সে কি করবে সে জানে না। কি করলে লোকটা বিশ্বাস করবে সে দোষি না। তার ভাবনার মাঝে আবার শুনতে পেল লোকটা বলছে, “প্রমাণ কর তুই নির্দোষ।”

পাখির চোখ দুটো জলে টইটম্বুর করছে। গলাটা অবরুদ্ধ হয়ে এলো। সে মুখ খুলে কথাটুকু বলতে পারছিল না। তার শরীর প্রচন্ড ঘামছিল। গলাটা শুকিয়ে যাচ্ছিল। তবুও নিজেকে ভেতরে ভেতরে শক্ত রেখে বলল, “দেখুন আপনি যা ভাবছেন, সেসব কিছু না। আমি কারোর ষড়যন্ত্রের স্বীকার। সেই চাইছে না আপনার সঙ্গে আমার সংসার হোক।”

“কত টাকার মালিক তুই, যে তোর শান্তি বিনষ্ট করতে চাইছে?”

পাখি অবাক হয়ে রইল। তার মুখ যেন আজ চলছে না৷

“আপনি আমায় বিশ্বাস করছেন না?”

“নিজের চোখের দেখাটাকে অবিশ্বাস করব?”

“আমার শরীর চেক করলে তো বিশ্বাস করবেন।” কথাটি বলেই পাখি দুচোখ বুজে নিল। ঠোঁট কামড়ে চোখের অবাধ্য জলগুলো আটকাতে চাইল। কিন্তু ওরা কি থামে? গাল গড়িয়ে ঝরে। সে এবার লাজ লজ্জা ভুলে গিয়ে নিজের বুকের ওপর থেকে শাড়ি আঁচল নামিয়ে নিল। বলল, “চেক দেন আপনি। দেখেন কোন পুরুষ ছুঁয়েছে কিনা।”

নাওয়াফ ধীরে ধীরে নিঃশব্দে পাখির দিকে এগিয়ে যায়। হঠাৎ ওর গলাটা সজোরে চেপে ধরে চোখ মুখ শক্ত করে বলল, “শু*য়ো*রে*র বাচ্চা, গলায় লাভ বাইট, কোমরে লাভ বাইট নিয়ে তুই আমাকে বিশ্বাস করতে বলছিস? প্রমাণ দিচ্ছিস? না বলতে এসেছিস হ্যাঁ আমি ওই পুরুষের সঙ্গে ছিলাম। আর কতটা নিচে নামবি তুই? টাকার দরকার ছিল? আমারে বলতি। ব্যাংকে লাখ লাখ টাকা পড়ে আছে। কার্ডের অভাবে তুলতে পারছি না। আর দুটো দিন ধৈর্য ধরতি। তোকে টাকা দিয়ে গোসল করাতাম। তুই কেন নিজের দেহ বিলাতে গেলি আরেক পুরুষের কাছে? উত্তর দে বেয়াদবের বাচ্চা।”

পাখি লোকটার দিকে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে চেয়ে রইল। আকাশচুম্বী বিস্ময় নিয়ে সে বলল, “কি বলছেন আপনি? কোথায় লাভ বাইট?”

গলা ছেড়ে দিয়ে নাওয়াফ বলল, “তোর শরীর দেখ।”

পাখি তড়িঘড়ি নিজের দিকে তাকাল। সে দেখল তার গলায় কামড়ের একটা দাগ। কোমর কামড়ের দাগ। সে বিস্ময় হলো। এসব কখন হলো? কি করে হলো? এ নিশ্চয়ই সিরাজের কাজ। সিরাজই করেছে। বলেছিল না তার সংসার নষ্ট করবে। এভাবেই করছে। কিন্তু সে কিভাবে লোকটাকে বিশ্বাস করাবে? সে তবুও চাইছে লোকটা তাকে বিশ্বাস করুক। সে লোকটার পা দুটো বুকের সঙ্গে চেপে ধরল। দুচোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলল, “ও প্রণয় পুরুষ, শুনুন আমি চরিত্রহীন নই। আমার মন সত্য। আমার কথা সত্য। মসজিদ যেমন পবিত্র, আমার দেহও তেমন পবিত্র। আপনি একবার শুধু আমায় বিশ্বাস করুন আমার প্রিয় পুরুষটি। আপনার পাখি ওমন নয়।”

পাখির আকুতিগুলো শুনে মনটা এক মুহূর্তের জন্য নরম হলেও পরক্ষণে চোখের সামনে আবারও ভেসে উঠল সেই দৃশ্য। একে অপরকে চুম্বন করার সেই ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত! পরমুহূর্তেই লোকটা আবারও আহত সিংহের ন্যায় গর্জে উঠল। ঝাড়া মেরে নিজের পা দুটো ছুটিয়ে ফেলল। পাখির থুতনি শক্ত করে চেপে ধরে তাকে ওপরে তুলল। রক্তাভ চোখে তাকিয়ে বলল, “আমায় বিশ্বাস করতে বলছিস তোকে? কিন্তু কীভাবে? এত এত প্রমাণ তোর বিরুদ্ধে। তবুও তোকে কী করে বিশ্বাস করব? তুই যে আমার বুকে বিষাক্ত ক্ষত ঢুকিয়ে দিলি, এর অভাব কে পূরণ করবে? বল!” বলেই পাখির গালে একের পর এক চড় বসাতে লাগল।

প্রতিটি চড়ের সঙ্গে সঙ্গে তার নরম গালে পাঁচ আঙুলের লালচে দাগ স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠতে লাগল। পাখি ফুঁপিয়ে উঠল। দুই হাত জোড় করে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে তবুও সে বলতে লাগল, সে নির্দোষ। কিন্তু লোকটা তার কোনো কথা শুনল না। ওর গাল লক্ষ্য করে আরও একটি চড় বসিয়ে দিল। এবার চড়টি গালে গিয়ে পড়ল না, সোজা গিয়ে আঘাত করল তার নাকের ওপর। সঙ্গে সঙ্গে নাক ফেটে টগবগে রক্ত বেরিয়ে এলো। রাগে উন্মাদ হয়ে ওঠা নাওয়াফের সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। বিশ্বাসঘাতকতার তীব্র আঘাতে তার মনটা যেন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। তার ভেতর যেন কোনো হিংস্র পশু ভর করেছে। পাখি ঠিকমতো কথা পর্যন্ত বলতে পারছিল না। নাক বেয়ে অবিরাম রক্ত ঝরছিল। অথচ নাওয়াফ সেই অবস্থাতেও তার গালে অনবরত চড় বসিয়ে যাচ্ছিল। পাখি কোনো বাধা দিতে পারল না। ওমন বলবান, শক্তিশালী শরীরের সঙ্গে সে কী করে পারবে?

আজ নাওয়াফকে তার অসম্ভব রকমের ভয় করছে। এই মানুষটাকে সে যেন চেনেই না। যে মানুষটা একদিন তার সামান্য চোখের জলও সহ্য করতে পারত না, সেই মানুষটার চোখেই আজ রক্তপিপাসু ঝড়ের ছায়া, ভয়ংকর উন্মাদনার আগুন। সে ভয়ে ভয়ে পিছু হটতে চাইল। কিন্তু পারল না। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা যেন খাঁচাবন্দি পাখির মতো ছটফট করে উঠছে। কিন্তু তার আগেই নাওয়াফ তার চুলের মুঠিটা শক্ত করে খামচে ধরল। পাখি যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠল। চোখের কোণ বেয়ে নোনা অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় আতঙ্কের শীতল স্রোত ছড়িয়ে পড়ল। মনে হলো, আজ পৃথিবীর সমস্ত নিরাপত্তা তাকে ছেড়ে বহুদূরে চলে গেছে। নাওয়াফ চুলের মুঠি ধরে এবার হেঁচড়ে হেঁচড়ে তাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল। আর পাখি টলতে টলতে যাচ্ছিল। একসময় যে হাতটা তাকে আগলে রাখত, স্নেহে জড়িয়ে রাখত, আজ সেই হাতই তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে অজানা এক অন্ধকার গহ্বরের দিকে। ভাগ্যের এমন নির্মম পরিহাস বোধহয় মানুষের জীবনে বারবার আসে না।

প্রতিটি মুহূর্তে তার মনে হচ্ছিল, এ কোনো ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন। একটু পরেই হয়তো ঘুম ভেঙে যাবে। কিন্তু না, এ স্বপ্ন নয়। এ এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা। ভয়ংকর, হৃদয়বিদারক এক বাস্তব।

হঠাৎ তার দৃষ্টি পড়ল তার থেকে দুহাত দূরে। আর পরমুহূর্তেই বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠল। মাটির বুকে খোঁড়া আছে আস্ত একটি কবর। কিন্তু এই কবর কার জন্য? তার নিজের জন্য? কথাটা ভাবতেই গা বেয়ে শীতল স্রোত নেমে গেল। সমস্ত শরীর অবশ হয়ে এলো। মনে হলো, পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে। আজ তার মৃত্যু সুনিশ্চিত। আজ হয়তো এই পৃথিবীতে তার শেষ রাত।

কিন্তু মৃত্যুর চিন্তাও তাকে যতটা না কষ্ট দিল, তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি কষ্ট দিল অন্য একটি সত্য। সে মরবে বিনা দোষে, বিনা কারণে। তাও নিজের সবচেয়ে আপন মানুষটির হাতে। নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির হাতে। যে মানুষটার জন্য সে নিজের সুখ, নিজের স্বপ্ন, নিজের ভবিষ্যৎ পর্যন্ত বিসর্জন দিতে দ্বিধা করেনি। যে মানুষটাকে বাঁচাতে গিয়ে আজ নষ্ট নারী, বিশ্বাসঘাতকতার তকমা পেয়েছে। আজ সেই মানুষটাই তাকে অপরাধী ভেবে মৃত্যুদণ্ড দিতে দাঁড়িয়ে আছে।

পাখির বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল। পৃথিবীটা বড় নিষ্ঠুর, বড় স্বার্থপর। সে মনে মনে তিক্ত হেসে উঠল। নিজের জীবনটার প্রতিই যেন আজ বড্ড উপহাস জন্মাল।

কী অদ্ভুত নিয়তি! যাকে রক্ষা করতে সে পরের কাছে হাত পাতল, দেনা শোধ করতে কাজে নামল। আজ সেই মানুষটার কাছেই সে চরিত্রহীন, বিশ্বাসঘাতক, কলঙ্কিনী। তার সত্যগুলো আজ মিথ্যার কাছে পরাজিত। তার ত্যাগগুলো আজ অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অশ্রুতে ঝাপসা চোখে সে একবার নাওয়াফের দিকে তাকাল। কী ভীষণ ভালোবাসত সে মানুষটাকে! এখনো ভালোবাসে। মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়েও ভালোবাসবে। অথচ সেই মানুষটার চোখে আজ একফোঁটা বিশ্বাসও নেই তার জন্য। বুকের গভীর থেকে একটা দীর্ঘ, নিঃশব্দ আর্তনাদ বেরিয়ে এলো। কিন্তু সেই আর্তনাদ ঠোঁট পেরিয়ে বাইরে এলো না। শুধু চোখের জল হয়ে ঝরে পড়ল। নীরবে, নিঃশব্দে। ঠিক যেমন নিঃশব্দে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে তার সমগ্র পৃথিবী, তার সমস্ত স্বপ্ন, তার সমগ্র জীবন।

“আমাকে জীবিত কবর দিবেন, নাওয়াফ ভাই?”

প্রশ্নটি করেই পাখি নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল। গাল বেয়ে টপটপ করে অশ্রুর স্রোত নেমে আসছিল চক্ষু জোড়া থেকে। কতটা কষ্ট নিয়ে প্রশ্নটি করেছিল একমাত্র সে জানে। কণ্ঠটা কেঁপে উঠছিল ভয়ে, অথচ সেই ভয়কে ছাপিয়ে সেখানে ছিল একরাশ অভিমান আর ভাঙা বিশ্বাসের যন্ত্রণা। হৃদয়টা ছিঁড়ে খন্ডবিখন্ড হচ্ছিল। কাউকে নিজের ভেতরকার কষ্টটা বোঝাতে পারছিল না। কেবল শ্বাস কষ্টে ভোগা রোগির মতো ফোঁস ফোঁস করে ছটফট করছিল।

নাওয়াফ ধীর দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল। বড্ড মায়াভরা মুখটা! অশ্রুসিক্ত চোখ দুটো ভীষণ আকর্ষণীয়, গভীর আর নিষ্পাপ। এই চোখের মায়াতেই তো একদিন সে ডুবে গিয়েছিল। এই মুখের জন্যই নিজের সবকিছু ভুলে যেতে পেরেছিল। অথচ আজ সেই মায়াই তাকে ধ্বংসের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে। তার সকল বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছে। সেই সঙ্গে তাকেও। তার বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠলেও সে নিজেকে শক্ত করল। না, আর এই মায়ার ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না। আর না।

সে চোয়াল শক্ত করে পাখির কোমর থেকে শাড়ির আঁচল খুলে নিতে লাগল। সেই কাপড় দিয়েই ওর হাত-পা বেঁধে ফেলতে শুরু করল। পাখি নাক টেনে কাঁপা কণ্ঠে বলল, “মারতে হলে মারবেন। এত আয়োজন করে হাত-পা বেঁধে মারার দরকার কী আছে? আপনি একবার বললেই আমি মরে যেতাম।”

শেষের কথাগুলো বলতে গিয়ে তার গলা ধরে এসেছিল। কণ্ঠস্বর আটকে এসেছিল। চোখের অবাধ্য জলগুলো আরও দ্রুত গড়িয়ে পড়তে লাগল। মনে হচ্ছিল, মৃত্যুকে সে এতটা ভয় পায় না। যতটা ভয় পায় প্রিয় মানুষটার চোখে নিজের জন্য একফোঁটা বিশ্বাস দেখতে না পারাটা।

“মরার আগে খুব বর ভক্ত সেটাই বোঝাতে চাচ্ছিস?”

পাখি তাচ্ছিল্য একটু হাসল।

“আফসোস হয় আপনার প্রতি। সত্য মিথ্যার পার্থক্য বুঝলেন না।”

“আমার জীবনে পতিতাদের কোন স্থান নেই।”

পাখির মাথায় যেন বজ্রপাত পড়ল। সে দুচোখ বুজে পানি ছেড়ে দিল।

“আপনি আমাকে পতিতা বলতে পারলেন?”

“তুই পতিতাদের চেয়েও খারাপ। ওনারা তো টাকার জন্য ব্যবসা করে। আর তুই টাকা ছাড়াই পুরুষের বিছানায় চলে যাস।”

পতিতা? তাও নিজের স্বামীর মুখ থেকে শুনতে হলো। তার বুঝি আর বুঝতে বাকি রইল না জীবনটা তছনছ হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বাসের জায়গায় আর সে রইল না। তাকে নর্দমার কিটের চেয়েও নিকৃষ্ট করা হলো। বড্ড বুক ফাটিয়ে চিৎকার করে বলতে মন চাইল।

“আমি পতিতা নই। পতিতা নই আমি। ওমন চরিত্রহীন না বিশ্বাস করুন। করুন বিশ্বাস আমায়। আমি পবিত্র। আমার দেহ পবিত্র। আমার মনও পবিত্র। সেখানে অপবিত্রতার কোন স্থান নেই।”

কিন্তু কে করবে আজ তাকে বিশ্বাস? কে নিবে তার পক্ষ? কে দিবে তার সাক্ষী? বিশ্বাস করার মতো যে আজ তার কেউ নেই। সে একা। খুব একা। তাই মুখ বুঝে তিক্ত অপমানটা শরীরে গেঁথে নিল। হয়ত একদিন এই অপমান থেকে মুক্তি মিলবে এই আশায়।

তার বড্ড মন চাইল চ্যাঁচিয়ে বলতে, “শোন পৃথিবী শোন, সে বলেছে আমি পতিতা, চরিত্রহীন, বিশ্বাসঘাতক, ছলনাময়ী। যার জন্য এত ত্যাগ স্বীকার করলাম, যার জন্য মানুষের বাসার কামলা হইলাম। আজ সেই কইল আমারে পতিতা, নষ্টা নারী। এ বুঝি ছিল আমার পাওনা, আমার পারিশ্রমিক? তোমার কাছে একটা প্রশ্ন রেখে গেলাম, যাকে বাঁচাতে নিজের আত্মসম্মান ভুলে গিয়ে মানুষের বাসায় কামলা দিতে গিয়া হইলাম নষ্ট নারী। সেই কইল মোরে, তুই নষ্টা। আমার থেকে শিক্ষা নেও তোমরা। কাউকে এতটা ভালোবেসো না যে, তার জন্য নিজের সম্মান বিসর্জন দিয়া নষ্ট নারীর ট্যাগ লাগতে হয় শরীরে।”

“মরার জন্য প্রস্তুত?”

পাখির গলা আটকে আসছিল। তবুও বলল,

“মেরেই তো ফেলবেন। মরার আগে একটা সত্য কথা বলবেন? আপনি আমায় বিশ্বাস করেন না?”

নাওয়াফ কঠিন মুখে বলল, “না।”

“আপনি মনে করেন আমি পতিতা?”

“তারচেয়েও তুই খারাপ। বলতে আমার নিজেরই লজ্জা লাগছে, স্বামীর অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে আরেক পুরুষের সঙ্গে ছিহ...। আর বলতে পারছি না। রুচিতে বাঁধছে। ইসলামে পরকিয়ার শাস্তি কি জানিস? কোমর পর্যন্ত পুতে পাথর নিক্ষেপ করা। কিন্তু আমি পাথর পাব কোথায়? তাই তোকে জ্যান্ত পুতে দিয়ে তার পাপমোচন করব। একজন স্বামী হিসেবে আমার এটাই করা উচিত।”

“আপনি নিজের চোখে পরকিয়া করতে দেখেছিলেন আমাকে?”

“হ্যাঁ, দেখেছি।”

“তাহলে হাতে নাতে ধরেননি কেন?”

“লজ্জা তোর না থাকতে পারে। আমার আছে।”

“বিশ্বাস করেছিলেন?”

“অবিশ্বাসের কি আছে?”

“যদি কখনো শোনেন আমি নির্দোষ, তখন কি করবেন?

“এই রকমটা কখনো হওয়ার সুযোগ নেই।”

“আমি যদি সত্যিটা বলি আমায় বিশ্বাস করবেন?”

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন