#সে_আমার_সর্বনাশ_২
(৩৬)
“আপনি...!”
“চুপ।”
“কি..কি হয়েছে?”
বৃদ্ধা হালিমা বেগম ফিসফিস করে বললেন, “ঘরে আসো। বাহিরে থাকাটা তুমি নিরাপদ নয়।”
পাখি অবাক হয়ে জানতে চাইল, “কেন?”
“মানুষ খেকো শকুনেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে।”
বড়োই অদ্ভুত শোনাল তার কথাগুলো। সেখানে যুক্তিসঙ্গত কোন কারণ খুঁজে পেল না পাখি। এমনিতে ভঙ্গুর নারী সে। তার ভিতরে এত রহস্য রেখে কথা শুনতে তার ভালো লাগছিল না। বড্ড বিরক্ত লাগছিল। সে ভ্রুকুটি করে নেয়। কিছুটা বিস্ময় নিয়ে শুধালো, “এত রাত্রে আপনি এখানে কেন দাদু?”
“সে অনেক কাহিনি। মেয়ের বাড়ি থেকে দুপুরে রওয়ানা দিয়েছি। পথে দু দুবার মরার গাড়ি খারাপ হইলো। এরপরে গাড়ি এসে নামিয়ে দিয়ে গেল বাস স্টেশনে। সেখানে এসে বাস পেলাম না। লও ঠেলা। বাকিটা রাস্তা হেঁটে আসতে হলো। রাস্তায় কোন অটোও পাইনি। এখন বলোতো তোমার অবস্থা এমন কেন? ঠোঁট কাটা, নাক ফাটা। চুলে মাটি। গায়ে মাটি। চোখ মুখ লাল। হাত পা বাঁধা। সামনে একটা কবর খোলা। এসব কি? এই মাইয়্যা ঠিকাছো তো তুমি? তোমার স্বামী কই?”
পাখি অতি শোকে হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলল। ফোঁস করে একটা বুক চিঁড়ে শ্বাস ফেলল। তৎপর বলল,
“স্বামীই হাত পা বেঁধে রেখে গেছে।”
“তোমার স্বামীই এ কাজ করেছে?”
পাখি ঠোঁট কামড়ে চক্ষু ভর্তি চোখ দুটো নিচু করে মাথাটা ঝাঁকাল, “হ্যাঁ, পরাণ দিয়ে ভালোবেসেছিলাম তো। তাই তার প্রতিদান হিসেবে শোধ নিয়ে নিল। এক্ষেত্রে বলব সে একটুও কৃপণতা করেনি।”
হালিমা বেগম চমকানো চোখ মুখ নিয়ে বললেন,
“তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। একটু খুলে বলোতো।”
“আগে আমাকে একটু পানি খাওয়াবেন? বড্ড তৃষ্ণা পেয়েছে।”
“দাঁড়াও আনতেছি। আমার ঘরে তো পানি নাই। তোমাদের ঘর থেকেই এনে দেই।”
পাখি নীরবে সম্মতি জানাল।
বৃদ্ধা যেতেই সবকিছু আবার আগের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। বড়ো বড়ো গাছগুলোর ছায়া কোন অংশে প্রেত্মার চেয়ে কম নয়। তা দেখে পাখির ভয় করতে লাগল। ঠান্ডা একটা শীত শীত বাতাস ছেড়েছে। শীতে পাখি কুঁকড়ে ওঠল। জড়সড় হয়ে বসল। লোকটার কথা আচমকা মনে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে বুকটা চিনচিন করে ওঠল। বুকের একাংশ জুড়ে ফাঁকা ফাঁকা আর শূণ্যতা লাগছে। মনে হলো গুরুতর কি যেন একটা হারিয়েছে গেছে? গেছে তো। তার প্রিয় পুরুষটি তাকে ছেড়ে চলে গেছে। তার চোখ দুটো আবারও জলে ডুবল। বিড় বিড় করে ওঠল সে, “আপনি জানতেন আমি অন্ধকার ভয় পাই। আপনাকে ছাড়া রাতে একা ঘুমাতে পারি না। আপনার বুকে মাথা রেখে ঘুমাতে না পারলে আমার ঘুম হয় না। তবুও আমায় একা এভাবে ফেলে রেখে চলে গেলেন? এত পাষাণ কি করে হতে পারেন আপনি? একটাবার আমাকে বলার সুযোগটুকু দিলেন না। এই ঠুনকো বিশ্বাস নিয়ে এসেছিলেন আমায় ভালোবাসতে? কেন এসেছিলেন? এসেই যদি চলে যাবেন, তাহলে আগেই যেতেন। ক্ষণিকের জন্য এসে মায়া বাড়িয়ে দিলেন কেন?”
কিছুক্ষণের মাথায় আবার বৃদ্ধা ফেরত এলো। এসে দেখল
পাখি কাঁদছে। সে আশ্চর্য হয়ে শুধাল, “কাঁদছো তুমি?”
পাখি এবার বৃদ্ধা হালিমা বেগমের গলা ধরে হাউমাউ করে কেঁদে দিল।
“পুরুষ মানুষ ওমন শক্ত হয় কি করে দাদু? তাদের মন কি পাথরের দ্বারা তৈরি? তাদের মনে কি দয়া মায়া নেই? মানুষ তো একটা কুকুর পোষলেও পরদিন থেকে কুকুরের জন্য মায়া অনুভব হয়। তাদের বুঝি হয় না? আমাদের জন্য কি তাদের মন পোড়ে না? আমাদেরটা তো তাদের জন্য পোড়ে। তাদের জন্য চিত্ত জ্বলে। অস্থির হয়ে ওঠে।”
পাখির ক্রন্দনরত প্রতিটা বাক্য শুনে বৃদ্ধার চোখও জলে ভিজল। সে চোখ দুটো আঁচলে মুছে বলে ওঠে, “সব পুরুষ এক না দাদু। কিছু পুরুষ আছে একটা সেকেন্ডও সে তার স্ত্রীকে ছাড়া থাকতে পারে না। কেউ আবার বছরের পরও বছর স্ত্রীকে ভুলে থাকে। আবার কিছু পুরুষ দূর থেকে স্ত্রীকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে। কেউ বা কাছ থেকেও বেশ যত্ন করে অবহেলা করে। চিন্তা কইরো না তোমার জামাই ওমন না। সে হতে পারে একটু রাগি। মনটা ভালো। এখন বলো তোমাগো ঘরের অবস্থা ওমন কেন? বিছানা রক্তে মাখা। হাড়ি পাতিল ছড়ানো ছিটানো। আবার তোমার পেছনে একটা কবরও। এসব কি হচ্ছে?”
“আমার হাতটা একটু খুলে দিবেন? তারপরে বলছি।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ দিচ্ছি।”
বৃদ্ধা পাখির হাত খুলতে খুলতে জিগ্যেস করল, “এমন পিশাচের মতো কে করল তোমার অবস্থা?”
“আমার হাসবেন্ড।”
“হঠাৎ এমন করল। কিছু কি হয়েছিল?”
“হ্যাঁ, তার ধারণা আমি পরকিয়া করছি। তাও আপনাদের মাতবরের সাথে। যার কারণে সে আমাকে মারধর করে। রাগে ক্ষোভে জীবিত মাটি চাপা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু দয়া দেখিয়ে ছেড়ে গেছে।”
“সে এখন কই?”
“আমি জানি না দাদু। কিচ্ছুটি জানি না। সে আমায় ভুল বুঝল শুধু শুধুই। আমি ওমন নই। মাতবর আমার স্বামীকে ভুল বুঝিয়েছে।” বলেই সে ফুঁপিয়ে ওঠল।
পাখির মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বৃদ্ধা হালিমা বেগম বললেন, “থাক কেঁদো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। সত্যের একদিন ঠিকই জয় হবে। কারণ তুমি জানো তুমি নিজে সত্যের পথে আছো। আর যার বুকে সত্য থাকে। তার কোন ভয় থাকে না। সে স্বাধীন। এখন ঘরে চলো। তোমার শরীর তো ঠান্ডা হয়ে গেছে।”
পাখি আপত্তি করল না। বৃদ্ধা তাকে টেনে নিজের ঘরে নিয়ে খাটের ওপর বসিয়ে দিল। পাখির গা মুছিয়ে নতুন একটা কাপড় আর শীতের পোশাক দিল। প্লেট ভর্তি খৈ আর মিঠাই এনে সামনে খেতে দিল। বলল, “খাও। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে সারাদিন কিছু খাওনি।”
“আমার গলা দিয়ে খাবার নামছে না দাদু। আমি কীভাবে খাব? সে কোথায় আছে? কি করছে? কি খাচ্ছে না খাচ্ছে? আমার চিন্তা হচ্ছে। যাই হয়ে যাক, ওনাকে ছাড়া আমি একটা রজনীও পার করতে পারব না। সে আমার ভয়ংকর অভ্যাস। সেই তাকে ছাড়া থাকি কি করে? খাই কি করে?”
“বেডা মানুষ চলে যায় নারে দাদু ভাই। তারা হয়ত সাময়িক কষ্ট ভুলতে দূরে সরে যায়। কষ্ট ভুলে গেলে আবার মনের টানে ঠিকই ফিরে আসবে।”
“ওনি আর আসবে না। আমাকে স্ত্রী হিসেবে মানে না বলল।”
“আরে ধুর। ওসব ব্যাডাদের মুখের কথা। মনের কথা না। তুমি খাইতে খাইতে এবার প্রথম থেকে বলোতো কি কি হয়েছে?”
পাখি সংক্ষিপ্তকারে বৃদ্ধাকে সব খুলে বলল। সব শুনে বৃদ্ধা বলল, “শুধু শুধু তোমার ব্যাডায় তোমায় ভুল বুঝল। মারও খাইলা ফাও।”
“ওনি ছাড়া আর আমার কেউ নাই দাদি। সেই ওনাকে আমি কি করে ভুলব?”
“ভুলবা কেন? স্বামী কি ভোলার জিনিস? তাকে ভোলা কি ওত সহজ? ভুলতে হবে না তাকে। সে তোমার ইহকাল ও পরকালের একমাত্র সঙ্গী। না না তাকে ভুলবা না। তুমি কিছুদিন আমার কাছে থাকো। সে তো জানে তুমি এখানে। ১০-১৫ দিন অপেক্ষা করো। রাগ ভাঙলে ঠিকই বাড়ি ফিরবে।”
পাখি আনমনে বলল, “হয়ত।”
______
পরদিন থেকে পাখির এক টানা সাতদিন জ্বর। সেই জ্বর ঔষধ খাওয়ার পরও ভালো হলো না। সেই সঙ্গে সমস্ত শরীর ব্যথায় টুকরো টুকরো হয়ে আছে। সে নড়তে পারছে না। এই সাতটা দিনে যতটা না সে শারীরিক যন্ত্রণায় কাতরিয়েছে, তারচেয়ে বেশি মানসিক যন্ত্রণায় ভেঙে পড়েছে। কারণ সাতদিনের মধ্যে একবারও নাওয়াফের দেখা মেলেনি। সেকি বেঁচে আছে, না মরে গেছে। সেই খবরটি পর্যন্ত নিল না। পরদিন দুপুরে বেশ কয়েকবার বমি করেছে সে। মাথা ঘুরছে। পেট মোড়াচ্ছে। হালিমা বেগম পাখির মাথায় পানি ঢালল। তেল পানি দিল। তাতেও কাজ হলো না। আবারও বমি করে শরীর মাখল। কাপড় পরিষ্কার করে হালিমা বেগম পাখির পাশে এসে বসল। পাখির মাথায় ছোট ছোট বিলি কেটে জানতে চাইল, “তোমার শেষ মাসিক হইছে কবে?”
পাখির ঠিক মনে পড়ল না। গলাটা ভীষণ ব্যথা করছে। ওই যে লোকটা চেপে ধরেছিল। সে ব্যথা এখনো যায়নি। সে একটু কষ্ট করে বলল, “ভুলে গেছি।”
“ভুলে গেছো?”
“হ্যাঁ।”
“ক’মাস হবে?”
“তিন চারমাসের মতো হবে।”
“তোমার স্বামীকে বলেছিলা?”
“আসলে এখানে আসার পর একের পর এক যা ঝামেলা ঘটেছে, তাতে আর বলার সময় পাইনি। আমারও আর খেয়াল ছিল না।”
বৃদ্ধা উঠে দাঁড়াল। কোথায় যেন একটা গেল। কিছুক্ষণ পর আবার ফেরত এলো। পাখির দিকে একটি কালো বোরকা এগিয়ে দিয়ে বলল, “এটা পরে নেও। তোমায় নিয়া সরকারি হসপিটালে যাব।”
পাখি জানতে চাইল,
“হসপিটালে কেন?”
“গেলেই দেখতে পারবা।”
পাখি কিছুটা হলেও বুঝে গেল। সে আর বাড়াবাড়ি করল না। অসুস্থ শরীর নিয়ে হসপিটালে গেল। সেখানে গিয়ে ধরা পড়ল সে চার মাসের অন্তঃসত্তা। তার ভিতরে ঢুইন বেবি। খবরটি একদিকে যেমন খুশির, অন্যদিকে একইভাবে কষ্টেরও। কারণ যে বাবা হচ্ছে, সে জানলা না তার দুই দুটো বাচ্চা পৃথিবীতে আসতে চলেছে। ডাক্তার বলল, তার শরীরে রক্তের অভাব আছে। ভিটামিনেরও অভাব আছে। এছাড়া এত অল্প বয়সে বাচ্চা নেওয়ার জন্য দুটো ধমকও খেল। বার বার তার স্বামীর কথা জিজ্ঞেস করছিল। সে কোন যোগ্য জবাব দিতে পারছিল না। নিকাবের আড়ালে শুধু তার নিষ্পাপ চোখ দুটো জলে ভিজে ওঠে ছিল। অথচ কেউ দেখল না সেই অসহায়ত্বটুকু। নীরব চোখের ব্যথিত ভাষাটুকু। কত পুরুষ এসেছিল তার স্ত্রীর সঙ্গে! সে শুধু তাদের খুনসুটি দূর থেকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছিল। এছাড়া আর ওই মুহূর্তে তার কিছুই করার ছিল না।
হালিমা বেগম পাখিকে বাড়িতে এনে বললেন, “এবার আর তোমার কোন টেনশন নেই। বেডা কোন বাল? সন্তান থাকলে বেডা আইবোই।”
পাখিও মনে মনে ভাবে তা যেন হয়। এতকিছুর পরেও সে লোকটাকে সুযোগ দিবে। আপন করে নিবে। সব ভুলে গিয়ে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলবে, “আপনি যা করেছেন আমি সব ভুলে গেছি প্রিয় পুরুষটি। এবার আপনিও ভুলে গিয়ে চলুন সংসারটা আমরা জোড়া হাতে গোছাই।”
এরপরের সময়গুলো শুধু পাখির অপেক্ষাতেই কাটতে লাগল। দিন যায়, মাস যায়। লোকটার দেখা নেই। কোথায় গেল? কি করছে কে জানে? সে শুধু অপেক্ষায় প্রহর গোণে। ওই বুঝে এলো লোকটা। তাকে ডাকল পাখি বলে। কিন্তু না, লোকটা এলো না। তার খবরও আর নিল না। পাষাণের মতো অচিন কোন দূরে পড়ে রইল। দেখল না ফিরে সে কেমন আছে? কি করছে?
এর মধ্যে একবার সিরাজ এসেছিল তার খোঁজে। সে তখন লুকিয়ে ছিল। তাকে পাইনি। হালিমা বেগমের সঙ্গে কথা বলে চলে গেল। সময়ের কাটাগুলো কিভাবে চলে যায়? দেখতে দেখতে কেটে গেল চারটা মাস। পাখির আটমাস চলছে। এতদিন বৃদ্ধা তার দেখাশোনা করেছে। একজন মেয়ের মতো আগলে রেখেছে। অথচ সে ছিল ওনার নাতনি। কিন্তু আজ সকালে ভোরের দিকে তিনি ইন্তেকাল করেছে। খুব স্বাভাবিক মৃত্যু। যেন ঘুমিয়ে আছে। পাখির মনে হলো তার মাথার ওপর ছায়াটি আর রইল না। শেষ সাহায্যটুকু বিদায় নিল। সে হয়ে পড়ল পুরোপুরি একা। বৃদ্ধাকে মাটি দেওয়া হয়েছে বাড়ির পাশে। বৃদ্ধার মেয়ে আসেনি।
মাটি দেওয়ার পর সবাই চলে গেল। পাখি কেবল খোলা জানলাটি দিয়ে ফ্যালফ্যাল করে বৃদ্ধার কবরটি দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ সে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠল।
“সবাই চলে গেলেও আপনি ছিলেন আমার একমাত্র ছায়া। সেই ছায়াটুকুও বিধাতা কেড়ে নিল। এবার এই ছায়াহীন আমার কি হবে? রাতে ঘুম না আসলে কে গল্প শোনাবে? হাত পা ব্যথা করলে কে আঙুল টেনে দিবে? কে বলবে অপেক্ষা করো, সে একদিন ফিরে আসবে বলুন আপনি দাদি মা। মায়ের মতো স্নেহ আদর একমাত্র আপনার কাছ থেকে পেয়েছি। সেই আপনিও আমায় ত্যাগ করলেন। মায়া বাড়িয়ে চলে গেলেন। আপনারা কেন ক্ষণিকের জন্য আসেন মায়া বাড়াতে?”
সারারাতে সে ঘুমাতে পারেনি। শেষ রাতের দিকে বৃষ্টি নেমেছে। শীতে লেপ গায়ে টেনে দিল পাখি। চোখ দুটো বাহিরে। পুরো ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকার। যে মেয়েটা একদিন অন্ধকার ভয় পেত। সে আজ অন্ধকারে থাকার অভ্যাস করে নিয়েছে।
সেদিন ছিল শনিবার। কে জানত, সেই শনিবারই তার জীবনে শনি হয়ে নেমে আসবে? সন্ধ্যার পর চিড়া-মুড়ি খেয়ে ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল পাখি। চারপাশে তখন ছিল নিস্তব্ধতা। শুধু দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছিল। গভীর রাতের দিকে হঠাৎই ঘুম ভেঙে গেল এক অস্বাভাবিক ঘটঘটে শব্দে। শব্দটা যেন বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছিল। মনে হলো, কেউ যেন জানালা ভাঙতে চাইছে।
পাখি প্রথমে বিশ্বাস করতে পারল না। নিজের ভুল ভাবল। দ্বিতীয়বারও যখন একই শব্দ হলো, তখন তার সন্দেহ আরও গাঢ়তে পরিণত হলো। সে অস্থিরতায় বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ বাড়তে লাগল। খাট থেকে নেমে মাটিতে পা দুটো রাখল। কাঁপতে কাঁপতে সে দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে বাইরে উঁকি দিল। আর উঁকি দিতেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তার শরীরের সমস্ত রক্ত যেন হিম হয়ে গেল। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে দুই দুই জোড়া পুরুষের পা। অন্ধকারের মাঝেও তাদের উপস্থিতি স্পষ্ট। মুহূর্তেই শরীরের লোম খাড়া হয়ে উঠল তার। দ্রিম দ্রিম করে লাফাল হৃদপিণ্ডটা। ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। এরা কারা? মাঝরাতে তার বাড়িতে কেন এসেছে? জানালা ভাঙছে কেন? তার কাছেই বা কী চায়? আতঙ্কে আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না সে। তড়িঘড়ি করে আবার নিজের ঘরে ঢুকে গেল। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা এমন জোরে ধুকপুক করছিল, যেন শব্দ শুনেই লোকগুলো তাকে খুঁজে পাবে। কয়েক মুহূর্ত পরই ভেসে এলো আরও ভয়ঙ্কর বিকট এক শব্দ। জানালার কপাট ছিটকে পড়েছে। অতঃপর ভারী পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে তার ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে। প্রতিটি পদধ্বনি মৃত্যুর বার্তা হয়ে কানে বাজছিল। হঠাৎই বাইরে থেকে দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কা পড়ল।
পাখি চমকে উঠল। ভয়ে তার নিঃশ্বাস পর্যন্ত আটকে এলো। সে মুখ চেপে ধরে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। কোনো শব্দ করার সাহস হলো না। মনে হচ্ছিল, সামান্যতম আওয়াজও হয়তো তার সর্বনাশ ডেকে আনবে।
বাহির থেকে দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে লোকগুলো হুমকি দিচ্ছিল, “দরজা খোল। নতুবা দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকব।”
পাখি কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “আপনারা কারা? কি চান?”
“মাতবর পাঠিয়েছে আপনাকে তুলে নিতে। চলে আসুন। নতুবা দরজা ভাঙতে বাধ্য হব।”
পাখির বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সিরাজ পাঠিয়েছে? এই চিন্তাটুকুই তার বুকের ভেতর আতঙ্কের ঝড় তুলে দিল। এত কিছুর পরেও পিশাচটা তার পিছু ছাড়ছে না। তাকে সর্বশান্ত করে ছাড়বে এ লোকটা। ভয় যেন মুহূর্তেই কয়েকগুণ বেড়ে গেল। সিরাজের হাতে পড়লে তার গর্ভের সন্তানগুলোকেও ধ্বংস করে দিতে সে একটুও দ্বিধা করবে না। না, কিছুতেই সে সিরাজের কাছে যাবে না। এতে যা হওয়ার হোক। সংসার গেছে যাক, তার সন্তানদের একটি নিরাপদ আশ্রয় দিতে হবে। সেজন্য তাকে পালাতে হলেও পালাবে। নিজের ভারী, সন্তানসম্ভবা শরীরটা নিয়ে সে পেছনের দরজাটি নিঃশব্দে খুলল। তারপর রাতের অন্ধকার চিরে বেরিয়ে গেল অজানার পথে। অশান্ত, কাঁপতে থাকা পা দুটো নিয়ে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে উন্মাদের মতো দিকদিশা ভুলে ছুটতে লাগল। কোথায় যাচ্ছে সে জানে না। কোন দিকে যাচ্ছে তাও জানে না। সে শুধু জানে, তাকে বাঁচতে হবে। তার সন্তানদের বাঁচাতে হবে। তাদের একটা সুন্দর, নিরাপদ জীবন দিতে হবে। তাদের বাবার বুকে পৌঁছে দিতে হবে। ছুটতে ছুটতে হঠাৎই মুখ থুবড়ে পড়ে গেল সে। তলপেটে প্রচণ্ড আঘাত লাগল। মনে হলো শরীরের ভেতরের সবকিছু ছিঁড়ে যাচ্ছে। যন্ত্রণায় তার গলা ফুঁড়ে আর্তনাদ বেরিয়ে আসতে চাইল। কিন্তু সে তড়িঘড়ি মুখ চেপে ধরল। সামান্য শব্দও যে তার মৃত্যুর কারণ হতে পারে। অসহনীয় যন্ত্রণায় শরীর শক্ত হয়ে এলো। তবুও সে হার মানল না। আবার উঠে দাঁড়াল। আবার ছুটতে লাগল। দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ অনুভব করল, তার পা বেয়ে যেন পানির স্রোতের মতো কিছু গড়িয়ে পড়ছে। নিচে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। ভয়ঙ্কর এক আশঙ্কা তাকে গ্রাস করল। তার সন্তানদের কিছু হয়ে গেল না তো? ওইদিকে পেছন থেকে লোকগুলোর পায়ের শব্দ এখনও ভেসে আসছে। তারা তার পিছু নিয়েছে। পাখি দ্রুত একটি ঘন ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। নিঃশ্বাসটা পর্যন্ত আটকে রাখল। লোকগুলোকে এইদিকেই এগিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে। সে নাক-মুখ চেপে ধরল। তার শ্বাসের সামান্য শব্দও যেন ওদের কানে না পৌঁছায়। হঠাৎ আবছা চাঁদের আলোয় তার চোখ পড়ল ঠিক এক হাত দূরে। মোটামুটি বড়সড় একটি গর্ত। আর সেই গর্তের ভেতরে ফণা তুলে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে আছে এক বিষধর সাপ। তার চারপাশে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ডিম। দৃশ্যটা দেখেই পাখির শরীর বেয়ে ঠান্ডা ঘাম নেমে এলো। গা শিউরে উঠল ভয় আর ঘৃণায়। সে জানে, ওই সাপের একটি ছোবলই তার জীবনের শেষ অধ্যায় লিখে দেবে। একদিকে রক্তপিপাসু মানুষ, অন্যদিকে মৃত্যুর দূত হয়ে বসে থাকা বিষধর সাপ। সে কোন দিকে যাবে? আপাতত চুপ রইল। কোনো শব্দ করল না। নিঃশব্দে বসে রইল। নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দও যেন আজ তার কাছে ভয়ঙ্কর লাগছিল। লোকগুলো চলে যেতেই সে ধীরে ধীরে জায়গা পরিবর্তন করল। হাঁটতে হাঁটতে নদীর পাড়ের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু সেখানে পৌঁছে আর হাঁটতে পারল না। পা দুটো যেন শরীরের ভার বইতে অস্বীকার করল। সে ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল। তলপেটের ব্যথা তাকে টুকরো টুকরো করে ফেলছে। কলিজা ছিঁড়ে নিচ্ছে। নিচে তাকিয়ে দেখল, তার পা দুটো রক্তে ভিজে গেছে। মুহূর্তেই তার কলিজা শুকিয়ে এলো। এখনও তো সময় পূর্ণ হয়নি। তবে কি তার আগেই প্রসব বেদনা শুরু হয়ে গেল? এখন সে কী করবে? চারদিকে শুধু অন্ধকার। পাশে কেউ নেই। সাহায্য করার মতো একটা মানুষও নেই। ভয়, যন্ত্রণা আর অনিশ্চয়তায় তার শরীর দরদর করে কাঁপতে লাগল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যথা আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। ক্রমশ বাড়তেই লাগল। কোমর খিঁচে আসতেছে। ঠান্ডায় শ্বাস আটকে যাচ্ছে। সে বুঝে গেল, আজ নিজের সন্তানদের পৃথিবীর আলো দেখানোর যুদ্ধটা তাকে একাই লড়তে হবে। একদম একাই। তার পাশে কেউ যে নেই। এ জীবন তার। লড়াইটা একান্ত তার। বাঁচা মরা আল্লাহর হাতে। লড়াইটা সে করবে। এতে বাঁচুক আর মরুক। একটি বড়ো গাছের আড়ালে গিয়ে বসল সে। ব্যথার ঢেউ বারবার তার শরীর ভেঙে দিচ্ছে। ওইদিতে তৃষ্ণায় জিভ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। মুখের ভেতর শাড়ির আঁচল গুঁজে নিল, যাতে তার আর্তনাদ বাইরে না বেরিয়ে আসে। চোখ দুটো অবিরাম কাঁদছে। শরীরটা যন্ত্রণায় ছটফট করছে। যন্ত্রণা আর সহ্য করতে পারছিল না। সে ভাঙা কণ্ঠে এবার বেশ শব্দ করেই কেঁদে ওঠল, “মাগো..! মরে গেলাম।”
দুচোখের পানি সে ছেড়ে দিল। এতো যন্ত্রণা মধ্যেও নাওয়াফের মুখটা ভেসে ওঠল। সে দুচোখের পানি মনের কষ্টের সঙ্গে ছেড়ে দিল৷
“পরাণের পুরুষ, কোথায় আপনি? একবার এসে দেখে যান আমার কত কষ্ট হচ্ছে! একটু আসুন না আপনি। আজ আপনাকে আমার বড্ড প্রয়োজন। আমি আপনার উপস্থিতি চাই। আপনার বুকে মাথা রাখতে চাই। আর সহ্য করতে পারছি না। মৃত্যুর মুখে পড়ে কাতরাচ্ছি। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কোথায় আপনি? এই বেইমান পুরুষটি বলেছিলেন না, কখনো আমার হাত ছাড়বেন না। আমার চোখে জল আসতে দিবেন না। এই আপনার প্রতিশ্রুতি? আজ যে আমি মরছি, কার জন্য? আপনার রক্তকে পৃথিবীর আলো দেখাতে গিয়েই তো। তবুও আসেন না কেন? দেখেন না কেন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছি? একটু দয়া করুন আমার প্রতি। একটু দয়া করুন। আমি আর পারছি না। ফিরে আসুন আপনি। আল্লাহ গো, আমায় নিয়ে যাও। মৃত্যু দেও। আমার কেউ নাই। আমি আর সইতে পারছি না মাওলা। আহহহ...!”
বিকট এক আর্তনাদ তার গলা ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো। শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে চিৎকার করে উঠল সে। তার ছোট্ট শরীর থেকে রক্ত আর পানিতে ভিজে পৃথিবীতে এলো একটি নতুন প্রাণ। তার শরীর দরদর করে কাঁপছিল। ছেলে সন্তান হয়েছে তার। কিন্তু শিশুটি কাঁদছে না কেন? পাখির বুক ধক করে উঠল। দেহে একফোঁটা শক্তি নেই। শরীর বেয়ে রক্ত ঝরছে অবিরাম। কাঁপতে কাঁপতে শিশুটিকে হাতে তুলে নিল সে। নাড়ে পেঁচানো ছোট্ট প্রাণটা পিটপিট করে তাকিয়ে আছে। তার শ্বাস পড়ছে থেমে থেমে। পাখি মুখে মুখ লাগিয়ে শ্বাস দিতে লাগল। কিছুক্ষণ পর হঠাৎই শিশুটি কান্না করে উঠল। সেই কান্না যেন তার জীবনের সবচেয়ে মধুর সুর।
মুখে ফুটে উঠল এক অপার্থিব মাতৃত্বের হাসি। বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরল সন্তানটিকে। কিন্তু সুখটা স্থায়ী হলো না।
আবারও শুরু হলো ভয়ঙ্কর প্রসব বেদনা। এবার আরও তীব্র। আরও নির্মম। শরীরটা মৃগীরোগীর মতো অবিরাম কাঁপতে লাগল। দাঁত কটমট শব্দ করছে। ব্যথা সহ্য করতে না পেরে নিজের হাতে নিজেই কামড় দিয়ে বসল। পেটের নিচে যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে। মৃত্যু সমতুল্য যন্ত্রণা। যার সঙ্গে সে কোনদিন পরিচিত ছিল না। যা সহ্য করার ক্ষমতা তার ছিল না। আজ সেসব সহ্য করতে হচ্ছে তাকে। কোমর খিঁচে ব্যথার মাত্রা আরও বাড়ল। সে মাটি খামচে ধরল। অবশেষে পৃথিবীর আলোয় এলো আরেকটি সন্তান। একটি কন্যাশিশু। রক্তাক্ত, নিঃস্ব, মৃত্যুপথযাত্রী অবস্থাতেও পাখির মনে হলো, এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটি বুঝি সে-ই। যার দুই দুটো সন্তান হয়েছে। দুটো সন্তানই নাড়ে পেঁচানো অবস্থায় পড়ে আছে। কিন্তু কী দিয়ে নাড়ি কাটবে? চারপাশে কিছুই নেই। শরীরটাও আর তার কথা শুনছে না। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃগী রোগির মতো কাঁপছিল। চোখ দুটো ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছে। সে সন্তান দুটোকে বুকের সঙ্গে টেনে আনল। বারবার চুমু খেতে লাগল। ঠিক তখনই নিস্তব্ধ রাতের আধার চিরে ভেসে এলো শেয়ালের হাঁক। রক্তের গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে একটি শেয়াল ধীরে ধীরে এইদিকে এগিয়ে আসছিল। পাখি দেখতে পাচ্ছে সবকিছু। তার বুকটা আতঙ্কে ধক করে ওঠল। সন্তান দুটোকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরল সে। চোখ দুটো যখন একেবারে বন্ধ হয়ে আসছিল, ঠিক তখনই আবছা আলোয় সে দেখল শেয়ালটি তার বুকের ওপর থেকে কামড়ে ধরে মুখে তুলে কন্যা সন্তানটিকে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ সে পারছে না শেয়ালটির মুখ থেকে সন্তানটিকে কেড়ে আনতে৷ চিৎকার করে কাঁদছিল বাচ্চাটি। সে উঠতে গিয়েও পারল না। শরীর দিল না। নিথরের মতো পড়ে রইল। চোখের কোল ঘেঁষে অশ্রু ঝরতে লাগল। শরীরের ভেতর বজ্রপাতের মতো একটা ঝাঁকুনি বয়ে গেল। সে প্রাণপণে চিৎকার করতে চাইল, “নিও না তাকে। নিও না৷ সে আমার সন্তান৷ আমার নাড়ি ছেঁড়া ধন। তাকে নিও না। দয়া করো। আমার মেয়েটাকে ফিরিয়ে দাও।
আফসোস কথাগুলো আর বলা হলো না। বলতে পারল না। সেই শক্তিটুকু দেহে ছিল না। তার আগেই পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে গেল সে। শরীরের কাপড় রক্তে ভিজে গেল। তার শরীরও জমিনে মিশে রইল। চোখ দুটো ঘুমিয়ে গেল। যেন কতকাল তারা ঘুমায়নি! আজ সন্তানদের মৃত্যুর মুখে রেখে ঘুমুচ্ছে। আহারে জীবন! এমন জীবন কি তার প্রত্যাশা ছিল?
#(চলমান~)
#লামইয়া_তাসনিম