ফন্ট সাইজ:
থিম:
সে আমার সর্বনাশ-২

৩৭তম পর্ব

লেখক: লামইয়া তাসনিম

#সে_আমার_সর্বনাশ_২

(৩৭)

ভোরের স্নিগ্ধ নরম আলো ধীরে ধীরে চোখের পাতায় এসে ছুঁতেই ঘুমটি ভাঙল তার। শারীরিক দুর্বলতায় চোখ দুটো খুলতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। দীর্ঘ অনাহার, প্রসব যন্ত্রণা আর অবসাদ তার শরীরটাকে যেন একেবারে নিঃশেষ করে দিয়েছে। তবুও সে চেষ্টা করল। অনেক কষ্টে ভারী চোখের পাতা সরিয়ে চারপাশে তাকাল। চারপাশ জুড়ে ফিকে আলো ছড়িয়ে আছে। রাত শেষ হয়ে ভোর নেমেছে পৃথিবীর বুকে। অথচ সে টের পাইনি। হঠাৎই তার বুকের ভেতর অকারণ এক অস্থিরতা জন্ম নিল। মাতৃত্বের অদৃশ্য এক কোমল অনুভূতি তাকে চমকে দিল। তার সন্তান কোথায়? উদ্বিগ্ন চোখ নিচের দিকে নামাতেই দেখল ছোট্ট শিশুটি তার বুকের ওপর নিথর হয়ে পড়ে আছে। অস্বাভাবিক শান্ত। কোনো কান্না নেই, কোনো নড়াচড়া নেই। দৃশ্যটা দেখে তার হৃদপিণ্ড যেন ধপ করে নিচে নেমে গেল। কাঁপতে কাঁপতে সে হাত বাড়িয়ে সন্তানের গায়ে স্পর্শ করল। স্পর্শের সঙ্গে সঙ্গেই তার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। শিশুটির শরীর বরফের মতো ঠান্ডা। সেই ঠান্ডা স্পর্শ মুহূর্তেই তার সমস্ত অস্তিত্ব কাঁপিয়ে দিল। আতঙ্কে তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো। চোখের মণি বিস্ফারিত হয়ে উঠল। তার অচেতন মন বলে ওঠল, না, এটা হতে পারে না। কিছুতেই হতে পারে না। সে তড়িঘড়ি করে উঠে বসল। বুকের ধনটাকে কোলে তুলে নিল। ব্যাকুলতার সঙ্গে উন্মাদের মতো ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে কাঁপা গলায় ডেকে উঠল, “আব্বু, এই আব্বু, চোখ খোলো আব্বু। মা ডাকছে তো। একটু কাঁদো। আম্মু তোমার কান্না শুনবে। তুমি ক্ষুধার্ত না? খাবে না বাবা?”

তার কণ্ঠস্বর বারবার ভেঙে যাচ্ছিল। সন্তানের নিস্তেজ মুখের ওপর চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। সে একের পর এক ডাকতে লাগল, আকুতি করতে লাগল। যেন মায়ের ডাক শুনে শিশুটি আবার নড়ে উঠবে। আবার ছোট্ট করে কান্না করবে। খাওয়ার জন্য মায়ের বুকের দুধ খুঁজবে। কিন্তু ভোরের আলোয় মোড়া সেই নিস্তব্ধতায় পাখির কান্না ছাড়া আর কোনো শব্দ ফিরে এলো না।

ছেলেটি নড়ল না। একটুও না। নিথর, নিশ্চুপ হয়ে মায়ের বুকে পড়ে রইল। পাখির বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। আতঙ্ক যেন মুহূর্তেই কয়েকগুণ বেড়ে গেল। গত রাতেও তো সে বেঁচে ছিল! ছোট্ট বুকটা উঠানামা করছিল। তবে এখন এমন কেন? কাঁপতে কাঁপতে সে সন্তানের নাকের কাছে হাত নিয়ে গেল। পরমুহূর্তেই তার সমগ্র অস্তিত্ব যেন বজ্রাঘাতে বিদীর্ণ হয়ে গেল। চোখ দুটো স্থির হয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। পৃথিবীটা যেন হঠাৎ থেমে গেছে। বাতাস থেমে গেছে। সময় থেমে গেছে। থেমে গেছে তার শ্বাস ফেলার শক্তিটুকুও যেন। হুঁশ ফিরতেই বুকফাটা আর্তনাদ বেরিয়ে এলো তার কণ্ঠস্বর থেকে।

মায়ের উন্মাদ মন আবারও কেঁদে কেঁদে ডাকতে লাগল,

“আব্বু, ও আব্বু! তুই মারে ফেলে রেখে যাস নারে বাবা। জানিস না তোর আম্মু একা। এই দুনিয়ায় তার কেউ নাই। সে এতিম। তার বুকটারে খালি কইরা যাস না। তুই তো মায়ের সব ছিলি। এসেই যদি চলে যাবি, তাইলে এলি কেন বাবা? কেন এলি আমার বুকটা খালি করে দিতে?”

কথাগুলো বলে সন্তানটিকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরে কাঁদতে লাগল। যেন ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে। এবার সে কান্না থামিয়ে উন্মাদের মতো ছেলেটার মুখে মুখ রেখে শ্বাস দিতে লাগল। বারবার। আবারও। তার বিশ্বাস, একটু অক্সিজেন পেলেই তার সন্তান চোখ মেলে তাকাবে। আবার কান্না করবে। আবার মায়ের বুক শান্ত করবে। মুখে হাসি ফুটাবে। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো বুঝি, যে চলে যায়, সে আর ফিরে আসে না। এই সত্যটুকু কে বোঝাবে তাকে? অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও যখন শিশুটির বুক আর ওঠানামা করল না, নড়ল না। শ্বাস ফেলল না। তখন ধীরে ধীরে পাখির হাত দুটো নিস্তেজ হয়ে এলো। কান্নাও যেন থেমে গেল। অতিরিক্ত শীত, শ্বাসকষ্ট আর অবহেলার কাছে হার মেনে ছোট্ট প্রাণটা রাতের অন্ধকারেই বিদায় নিয়েছে। যদি একটু উষ্ণতা মিলত, যদি কেউ তাকে বুকের কাছে জড়িয়ে রাখত, যদি একফোঁটা অক্সিজেন জুটত। তবে হয়তো আজ ভোরের সূর্যটা সে দেখত। কচি আঙুলগুলো নাড়িয়ে পৃথিবীকে স্বাগত জানাত। কিন্তু ভাগ্য তার জন্য সেই সুযোগটুকুও রাখেনি। ভাগ্য লিখে রেখেছে মৃত্যু।

নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইল পাখি। বুকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মৃত পুত্র সন্তানের মুখের দিকে একদৃষ্টিতে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। ছোট্ট মুখটা অবিকল তার বাবার মতো হয়েছে। চোখ, নাক, ঠোঁট সবকিছুতেই যেন সেই মানুষটার ছাপ। হঠাৎই তার মনে পড়ল অন্য সন্তানটির কথা। তার মেয়ে? গত রাতে তো তাকে বন্য প্রাণী টেনে নিয়ে গিয়েছিল। ভাবনাটা মাথায় আসতেই বুকের ভেতর কাঁপন ধরে গেল। সে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। ছেলেটিকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরে জঙ্গলের দিকে ছুটল। খুব বেশি দূর যেতে হলো না। নদীর ধারের নির্জন জায়গাটিতে পৌঁছে সে থমকে দাঁড়াল। তার ছোট্ট মেয়েটি আর নেই। চারপাশে পড়ে থাকা ছিন্নভিন্ন হাড্ডি, রক্ত, নাড়িভুড়িগুলোই বলে দিচ্ছিল রাতের নির্মমতার গল্প। ঠিক কতটা যন্ত্রণা পেয়ে ছটফট করতে করতে তার মৃত্যু হয়েছিল। মেয়েটার মাথাটা পাওয়া গেল মেহগনি গাছের নিচে। যেখানে নিশ্চিন্তে তাকিয়ে ছিল মেয়েটা। চোখ দুটো এখনো খোলা। ধূসর রঙের দুটো চোখের মণি। গোলগাল মুখ। কি সুন্দর হয়েছিল! দুটো সন্তান হয়েছিল। ভাই বোন দুটোই বাবার মতো। কিন্তু ভাগ্য তার প্রতি সহায় হয়নি। সবচেয়ে নৃশংস খেলাটি খেলল। পাখি কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আশ্চর্যের বিষয়, তার চোখে এখন আর জল এলো না। কান্নারও একটা সীমা থাকে। সেই সীমা পেরিয়ে গেলে মানুষ বুঝি পাথর হয়ে যায়। ধীরে ধীরে মেয়ের অবশিষ্ট হাড্ডিগুলো জড়ো করল সে। বুকটা ফাটছে। কলিজা পুড়ছে। ভেতরটা যেন জ্বলছে। ঠিক আগুনে জ্বলার মতো করে। কেউ যেন শরীরে মরণ ঘা বসিয়ে দিয়েছে। এমন লাগছে কেন তার? সে নিজের শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে মেয়ের দেহের হাড্ডিগুলো খুব যত্ন করে বেঁধে নিল। তারপর এক হাতে সেই পোটলা, আর বুকে জড়িয়ে মৃত পুত্রসন্তানকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল। নদীর পাড় পেরিয়ে যখন প্রধান সড়কে উঠল, তখন সকালের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ থমকে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকাচ্ছিল।

রক্তে ভেজা শাড়ি, এলোমেলো চুল, পায়ের গোড়ালি বেয়ে ঝরে পড়ছে মাতৃত্বের তাজা রক্ত। বুকে নিথর শিশু আর হাতে আরেক সন্তানের শেষ স্মৃতি। এই দৃশ্য কোনো গল্প নয়, কোনো সিনেমা নয়; বরং জীবনের নির্মমতম এক বাস্তব সত্য। যে সত্য কাঁপিয়ে দিয়েছে একটা মায়ের জীবন। অনেক পথচারী এগিয়ে এলো। জানতে চাইল কী হয়েছে, কোথা থেকে এসেছে সে। কিন্তু পাখি কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু যান্ত্রিক যন্ত্রের মতো করে হাঁটছিল। কোথায় যেন আবার বেজে চলছে তার জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে চলা একটি গান....

এমন জীবন কেন দিলা

সুখের চেয়ে দুক্ষু দিলা।

ভাঙে অন্তর ভাঙেরে ছাড়খার।

হাঁটছিল তার প্রাণহীন অবিশ্রান্ত দেহটা। হৃদয়ের মৃত্যু তো অনেক আগেই হয়ে গেছে। বেঁচে আছে শুধু ক্লান্তময় ভঙ্গুর দেহটা। হাঁটতে হাঁটতে একসময় একটি কবরস্থানের সামনে এসে থামল সে। কবরস্থানের দারোয়ান তখন মোবাইল টিপতে ব্যস্ত ছিল। পাখিকে খেয়াল করেনি। পাখি মৃদু, ভাঙা কণ্ঠে ডাকল, “আঙ্কেল।”

নারী কণ্ঠ শুনে লোকটি ভাঁজ পড়া মুখটা তুলে চাইল। আর মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেল সে। তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে দেখে বুকের ভেতর অজানা এক গম্ভীর শীতলতা নেমে এলো। মেয়েটার পরনে রক্তমাখা শাড়ি। ক্লান্ত মুখ। কপালের মাঝে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘামের চিহ্ন। খোলা চুলে ঝুরা মাটি আর শুকনো পাতা লেগে আছে। বুকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি মৃত শিশু। আর হাতে কাপড়ে বাঁধা একটি পোটলা। সে বিস্মিত হলো। সেই সঙ্গে চমকালও যেন। বুকে লেপ্টে শোক বহে আনা এক জীবন্ত নারী তার সম্মুখে দাঁড়ানো। ঘটনাটি যেন অবিশ্বাস্য। বিস্মিত চোখে মুখে কিছুক্ষণ লোকটি তাকিয়ে রইল । পরপরই কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে চিনচিনে শুকনো গলায় শুধাল, “মা জননী কিছু বলবেন?”

পাখি মাথাটা নৈঃশব্দ্যে ঝাঁকাল, “আমার সন্তানদের কবরস্থানে একটু জায়গা দিবেন আঙ্কেল? ওদের দাফন করতে হবে।”

“তোমার কোলে থাকা বাচ্চাটি মৃত?” কথাটি চমকপ্রদভাবে বললেন তিনি।

পাখি ছলছল চোখ দুটো নিয়ে মাথাটা আবারও ঝাঁকাল।

“হ্যাঁ।”

“মারা গেল কিভাবে?”

“অক্সিজেনের অভাবে।”

“তোমাকে দেখে ঠিক লাগছে না। রক্তমাখা শরীর। নাড়ি পেঁচানো সন্তান। হাতে একটা পোটলা। কোথা থেকে এসেছো তুমি? আর তোমার স্বামী কই? তোমার পরিবার কই?”

পাখি দেখল, তার শরীর বেশ কয়েকবার দুর্বলতায় নেতিয়ে যাচ্ছিল। সে কোন মতো বলল, “আমার কোন পরিবার নেই। স্বামী কাজের সূত্রে দূরে আছে। বাড়িতে আমি একা থাকি। বাড়ি বসে একা একাই ডেলিভারি পেইন উঠছে। হসপিটালে যাওয়ার পথে জঙ্গলে বসে ডেলিভারি হয়ে যায়। দুই দুটো বাচ্চা হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। ভোরে উঠে দেখি একটা বাচ্চা মারা গেছে। আরেকটি শিয়াল টেনে নিয়ে খেয়ে ফেলেছে। এই দেখুন হাড্ডিগুলো খুঁজে আমি নিয়ে এসেছি।” বলেই পাখি ঠোঁট কামড়ে ধরল। তার গলাটা অবরুদ্ধ লাগছিল। বুকটা যেন নিঃশব্দে ফাঁড়ছে, চিঁড়ছে। অথচ ভেতরের যন্ত্রণাটা সে কাউকে দেখাতে পারছিল না। চোখ দুটো জলে ভিজে ওঠল। ওর কথা শুনে দারোয়ানটি নব্য করে আর কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস পেল না। কিঞ্চিৎকর হলেও সে মেয়েটার বর্তমান অবস্থা বুঝতে পারছিল।

পাখি অনুরোধ করে আবারও একই কথা বলল,

“এখন একটা অনুরোধ করছি। আমার সন্তানদের একটু জায়গা দেন আঙ্কেল। তাদের একটু কষ্ট করে দাফনের ব্যবস্থা করে দিবেন? আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব।”

দারোয়ান ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় কথার পরিপার্শ্ব বলল,

“দেখো মা, এখানে জায়গা কিনে মাটি দিতে হয়। এছাড়া মাটি দেওয়া যায় না। তুমি বরং ওদের নিয়ে বাড়িতে চলে যাও। বাড়িতে গিয়ে মাটি দেও।”

“না, বাড়ি যাব না। আমি এখানে আমার সন্তানদের শেষ কাজ সাড়ব।”

“মাটি যে দিবে, তোমার কাছে পয়সা কড়ি কিছু আছে?

পাখি নিজের হাতের আংটিটা খুলে এবার দারোয়ানের দিকে এগিয়ে দিল।

“এটা বিক্রি করলে অনেক টাকা আসবে আঙ্কেল। দাফন আর মাটি কিনতে যা লাগবে, তা কাজে লাগান। বাকিটা আপনি রেখে দিন। তবুও আমার সন্তানদের একটু জায়গা দেন। ওরা কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে জান্নাতে যাওয়ার জন্য। দেখেন কি সুন্দর করে ঘুমুচ্ছে? মনে হচ্ছে নিজ চোখে জান্নাত দেখছে।”

দারোয়ানটির বড্ড মায়া হলো। চোখ দুটো বারবার ভিজে উঠছিল। এমন অসহায় এক মাকে সে জীবনে খুব কমই দেখেছে। বুঝে গেল, মেয়েটা সন্তানদের মাটি না দিয়ে কোথাও যাবে না। তাই আর ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল না।

সে লোক ডেকে কাফনের কাপড় আনাল। তারপর নিজেই কোদাল হাতে তুলে নিল। জীবনে কোনোদিন কবর খোঁড়েনি। অথচ আজ নিজের হাতে জান্নাতের পাখিদের জন্য দুটো ছোট্ট কবর খুঁড়ছে। মাটি কাটতে গিয়ে তার বুকটাও ভারী হয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, আল্লাহ হয়তো এই ভালো কাজটার উছিলায় তার কিছু গুনাহ মাফ করে দিবেন। পাখির দেওয়া আংটিটাও সে বিক্রি করেনি। সমস্ত খরচ নিজের পকেট থেকেই দিল। কিছুটা দূরে পাখি পাথরের মূর্তির মতো বসে ছিল। কোলে তার মৃত পুত্রসন্তান। নিঃশব্দে তাকিয়ে দেখছিল সন্তানদের শেষ ঠিকানা তৈরি হচ্ছে। কবর খোঁড়া শেষ হলে দারোয়ান ধীরে ধীরে তার কাছে এলো। তার কণ্ঠেও তখন মায়া জমেছে।

“দেও মা জননী, জান্নাতের ফুলটারে দেও। আমি শেষ গোসলটা করায়ে দেই।”

কথাটা শুনে পাখির বুকটা ধক করে ওঠল। সন্তানটাকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল। যেন শেষবারের মতো তার অস্তিত্বটা বুক ভরে অনুভব করে নিতে চায়। সন্তানটিকে দিতে তার হাত দুটো কাঁপছিল। সে কাঁপা কাঁপা হাতে দারোয়ানের দিকে নিজের সন্তানটিকে এগিয়ে দিল। পুত্র সন্তানটি নিয়ে যাওয়ার আগে দারোয়ান বলল, “মেয়েটার অবস্থা কি করবে? ওমনই মাটি দিয়ে রেখে দিবে? তাকে তো গোসল করানো যাবে না। যেখানে শরীরটাই নেই।”

পাখি এই প্রথম প্রচন্ড রেগে দারোয়ানকে ধমক দিয়ে ওঠল, “আপনাকে কে বলেছে ওর শরীর নেই? আমি তো অনুভব করতে পারছি ওর শরীর আছে। আমি ওকে গোসল করাব। আপনি যান।”

দারোয়ান ফোঁস করে বুক চিঁড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এক বালতি পানি আর সাবান, কাফনের কাপড় এনে পাখির সামনে রেখে নিঃশব্দে সরে গেল। পাখি ধীরে ধীরে পুটলিটা খুলল। এক এক করে সব হাড্ডিগুলো বের করল। যেন সেগুলো কোনো হাড্ডি নয়, তার বুকের টুকরো। অপার যত্নে, কাঁপা কাঁপা হাতে সেগুলো ধুতে লাগল। মেয়েটার মাথাটার ওপর পানি ঢালতে গিয়েই তার বুকটা যেন চিরে দু'টুকরো হয়ে গেল। কলিজাটা হাহাকার করে উঠল। কী ভয়ংকর ব্যর্থতা তার! সে একজন মা হয়েও নিজের সন্তানদের একজনকেও বাঁচাতে পারল না। এই অপরাধবোধ, এই গ্লানি, এই অসহ্য ব্যর্থতা তাকে সারাজীবন তিলে তিলে দগ্ধ করবে। চোখের জল ফেলতে ফেলতে মেয়েটাকে শেষ গোসল দিল সে। তারপর সাদা কাপড়ে জড়িয়ে নিল পরম মমতায়। শুধু ছোট্ট মুখখানা খোলা রাখল। মেয়েটাকে কোলে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল। নির্বাক। নিস্তব্ধ। পাথরের মতো। কী হতভাগা ছিল সন্তান দুটো! পৃথিবীর আলো দেখেও কপালে একফোঁটা পানি জুটল না। এক মুঠো খাবারও জুটল না। ক্ষুধা নিয়েই জীবন শুরু হয়েছিল, আর ক্ষুধা নিয়েই শেষ হয়ে গেল। আর মা হয়ে সে সেই নির্মম দৃশ্য নিজের চোখের সামনে দেখেছে। সহ্য করেছে। এর চেয়ে হৃদয়বিদারক, এর চেয়ে নিষ্ঠুর দৃশ্য আর কী হতে পারে? অবশেষে বাচ্চা দুটোকে পাশাপাশি শুইয়ে দেওয়া হলো। মনে হচ্ছিল, জন্মের পর যেমন একসঙ্গে এসেছিল, বিদায়ের পথটাও তারা একসঙ্গেই বেছে নিয়েছে। দারোয়ান ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে মমতাভরা কণ্ঠে বলল, “শেষবারের মতো বাচ্চাগুলারে দেখে আসো মা জননী। এই জনমে আর এদের দেখা পাইবা না। পরজনমে যদি সৃষ্টিকর্তা চান, আবার তোমাদের সাক্ষাৎ হইব।”

পাখি হঠাৎ ধুম করে রেগে গেল। অশ্রুসিক্ত নয়ন দুটো নিয়ে চ্যাঁচিয়ে ওঠল, “সাক্ষাৎ হবে না মানে কি? পরজনমে সাক্ষাৎ হতেই হবে। সৃষ্টিকর্তা আমার থেকে এজনমে ওদের কেড়ে নিয়েছে। পরজনমে ওদের দিতেই হবে। তিনি তো অন্ধ নন। তিনি দেখেন না, আমি আমার সন্তানদের বিদায়ে কাঁদছি না? কারণ পরজনমে ওদের মন ভরে দেখব বলে। ওদের মন ভরে আদর করব বলে। ওদের মন ভরে দুধ পান করাব বলে। তোমার সৃষ্টিকর্তাকে বলে দিও দারোয়ান আঙ্কেল, পরজনমে যেন তিনি আমাকে আমার সন্তানদের থেকে আলাদা না করেন। কারণ এ জনমে সকল কষ্ট সইবো, ওইজনমে ওদের সাক্ষাৎকার পাব বলে।”

দারোয়ানের চোখ দুটো ভিজে এলো। সে ভেজা গলায় বলল,

“সময় চলে যাচ্ছে, আসুন মা জননী।”

পাখি ধীরে ধীরে হাঁটছিল। তখনও তার পা বেয়ে বেয়ে ব্লাড ঝরছিল। দারোয়ানের সেদিকে নজর পড়তেই সে চোখ ঘুরিয়ে নিল। পাখি গিয়ে বাচ্চা দুটোর পাশে বসল। তার দুই দুটো নক্ষত্র কি সুন্দর করে ঘুমিয়ে আছে? যেন ওরা কতকাল ঘুমাইনি। তার চোখ বেয়ে ওদের কাফনের কাপড়ের ওপর জল গড়াল। দারোয়ান বলল, “ওদের কাপড়ের ওপর জল ফেলো না মা জননী। ওদের কষ্ট হবে।”

“ওদের আবার কষ্ট কি? কষ্ট তো হবে আমার। আমি আমার এই দুই নক্ষত্রকে কিভাবে ভুলব দারোয়ান আঙ্কেল? আমার বুকটা যে জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে।” বলেই সে থামল।

দারোয়ান দেখল এখানে আর থাকা যাচ্ছে না। তার চোখ দুটো বড্ড জ্বলছে। সে আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। রুমাল দিয়ে নিজের চোখ দুটো মুছল। জীবনে কত লাশ কবর দিতে দেখেছে? কত লাশ দাফন করতে দেখেছে? কিন্তু কোন দিন তার এমন চোখ দুটো কাঁদেনি। জলে ভাসেনি। যেমন ভাসছে আজ ওই নিষ্পাপ ফুলগুলোর জন্য।

পাখি ধীরে ধীরে তার ছেলে ও মেয়ের কপালে দুটো করে চারটি চুমু খেল। সেই চুমুতে ছিল মায়ের সমস্ত মমতা, সমস্ত ভালোবাসা আর বুকভরা হাহাকার। এরপরে দুজনের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ভয় পেয়ো না বাচ্চারা। আম্মু আছে তো। চিন্তা করো না। জান্নাতে আমাদের আবার দেখা হবে। তখন মন ভরে তোমাদের দেখব। তৃপ্তি মিটিয়ে তোমাদের তৃষ্ণা মেটাব। আম্মু প্রমিজ করছে, আমাদের আবার দেখা হবে। হতেই হবে। বিদায় আমার নক্ষত্র দুটো, বিদায়।”

কথাগুলো শেষ করেই পাখি উঠে দাঁড়াল। তার গলা ধরে আসছিল। চোখের জল আর কোনোভাবেই আটকে রাখা যাচ্ছিল না। বুকের ভেতরটা যেন বারবার ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল। পাখি সরে যেতেই দারোয়ান আরও দুজন লোক নিয়ে এলো। জানাজা শেষ করে ছোট্ট দুটো লাশ কবরে নামানো হলো। পাখি কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। প্রতিবার মাটি পড়ার শব্দে তার কলিজাটা ছ্যাৎ করে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, মাটির নিচে সন্তান নয়, তার নিজের হৃদয়টাই চাপা পড়ে যাচ্ছে। গতকালও তো তারা বেঁচে ছিল। তার গর্ভের ভেতর ছোট্ট ছোট্ট নড়াচড়া করছিল। সে অনুভব করত তাদের অস্তিত্ব। তাদের লাথি, তাদের চঞ্চলতা, তাদের বেড়ে ওঠা। আর আজ? আজ তারা নেই। সে তো মা। আটটা মাস বুকের ভেতর আগলে রেখেছেিল তাদের। প্রতিদিন সকালে একবার, রাতে একবার তাদের সঙ্গে কথা বলত। নিজের দুঃখ বলত, নিজের স্বপ্ন বলত। সন্তানরাও বুঝি নীরবে শুনত। সেই অভ্যাস, সেই মায়া, সেই নাড়ির টান কি কোনোদিন ভোলা যায়? মা হয়তো অনেক কিছু ভুলে যেতে পারে, কিন্তু নিজের সন্তানের অস্তিত্ব কখনো ভুলতে পারে না। পাখিও পারবে না। তার বুকের ভেতর এই শূন্যতা, এই হাহাকার, এই অপূর্ণতা বেঁচে থাকবে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।

শিশু দুটোকে মাটিচাপা দেওয়ার পর দারোয়ান ফিরে এসে দেখল, পাখি হাতের ওপর কপাল ঠেকিয়ে বসে আছে। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল, হয়তো বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছে।

সে মৃদু স্বরে ডাকল,“মা জননী, শুনছেন? উঠুন।”

পাখি কোনো সাড়া দিল না। দারোয়ান আবার ডাকল। তবুও কোনো উত্তর এলো না। এবার সে একটু কাছে গিয়ে কাঁধে আলতো করে হাত রাখল। কাঁধটা হালকা ঝাঁকাতেই পাখির শরীর ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। দারোয়ান আতঙ্কে দু'পা পিছিয়ে গেল। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। দ্রুত নিজেকে সামলে তার দিকে এগিয়ে গেল। মেয়েটার পুরো শরীর তখনও শুকনো রক্তে মাখামাখি। মুখটা বিবর্ণ। ঠোঁট শুকিয়ে ফেটে গেছে। এমন অবস্থায় তাকে ফেলে রেখে যাওয়াও সম্ভব নয়। কিছুক্ষণ চিন্তা করে সে নিজের স্ত্রী সুমনাকে ফোন দিল। সব ঘটনা খুলে বলল। তারপর দ্রুত কবরস্থানে আসতে বলল। সুমনা আসার পর দুজনে মিলে পাখিকে ধরে হাসপাতালে নিয়ে গেল। হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর ডাক্তার বেশ রেগে গেলেন।

“রোগীকে এত দেরি করে আনলেন কেন? আর একটু দেরি হলে বড় বিপদ হয়ে যেত!”

দারোয়ান মাথা নিচু করে সব শুনল। আসল ঘটনা আর খুলে বলল না।

পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডাক্তার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

“রোগীর শরীরে প্রায় রক্ত নেই বললেই চলে। জরুরি ভিত্তিতে চার ব্যাগ রক্ত লাগবে। প্রেশারও অনেক বেড়ে গেছে। শরীর ফুলে পানি নেমেছে। অবস্থা ভালো না।”

দরিদ্র দারোয়ানের পক্ষে একসঙ্গে চার ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল না। অনেক কষ্টে আপাতত দুই ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করল। বাকিটা পরে করবে বলে জানাল। সেই কঠিন সময়ে পাখির পাশে ছিল শুধু দুজন মানুষ। একজন দরিদ্র দারোয়ান আর অপরজন তার স্ত্রী সুমনা। সারাদিন পাখির জ্ঞান ফিরল না। ডাক্তার তাকে ঘুমের ওষুধ দিয়েছিলেন। স্যালাইনের ফোঁটা ফোঁটা পানি ধীরে ধীরে তার শরীরে প্রবেশ করছিল। ভোর পাঁচটার দিকে তার জ্ঞান ফিরল। চোখ মেলতেই প্রথমে নজরে এলো দারোয়ান আর সুমনাকে। দুজনেই তার শয্যার পাশে বসে আছে। পাখিকে জেগে উঠতে দেখে দারোয়ান মুচকি হেসে বলল, “এখন কেমন লাগছে মা জননী? ক্ষিধে পাইছে? কিছু খাবেন? আমি খাবার এনে দেই?”

পাখির চোখ দুটো মুহূর্তেই ছলছল করে উঠল। এরা কেউ তার আপন নয়। কোনোদিন দেখেওনি। অথচ তার দুর্দিনে দুঃসময়ে তারাই পাশে দাঁড়িয়েছে। তখন তার মনে হলো, মানুষের অনেক টাকা নয়, বড়ো করে একটা হৃদয় থাকতে হয়। যে হৃদয় অপরজনের জন্য সাহায্যের হাত হয়ে দাঁড়াবে।

জ্ঞান ফেরার পর থেকেই সে চলে যেতে চাইছিল। কিন্তু দারোয়ান ও তার স্ত্রী সুমনা কিছুতেই যেতে দিল না। দুপুরের দিকে সুমনা এক সেট থ্রি-পিস আর গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত নিয়ে এলো। নিজের হাতে পাখির কাপড় বদলে দিল। মমতা মিশিয়ে ভাত মেখে তাকে খাওয়াতে লাগল। পাখি চুপচাপ খাচ্ছিল। আর বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা অনুভব করছিল। আজ জীবনে প্রথমবার সে কারও কাছে মায়ের আদর পেল। জন্মের পর থেকেই সে ’মা ’ডাকটার উষ্ণতা থেকে বঞ্চিত। কারণ পৃথিবীতে আসার কিছুদিন পরই তার মা চলে গিয়েছিলেন না-ফেরার দেশে। তাই আর মায়ের মমতা, মায়ের আদর, মায়ের ভালোবাসা পাওয়া হয়নি।

সুমনার হাতের স্পর্শে আজ মায়ের মমত্ববোধের ছোঁয়া খুঁজে পেল সে। বিকেলের দিকে পাখি ধীরে ধীরে বলল, “এবার আমাকে যেতে দিন আঙ্কেল। আমি এখন অনেকটাই সুস্থ। আপনারা রক্তের সম্পর্কের কেউ না হয়েও আমার জন্য যা করেছেন, তা হয়তো আপন মানুষও করত না। আমি আপনাদের এই ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না।”

সুমনা আপত্তি জানিয়ে বলল, “না না, তুমি আজ যেতে পারবে না। আগামীকাল যেও। তোমার শরীর ভালো না। দুর্বল। তোমার শরীরে রক্তও নেই। হাত পা কেমন সাদা দেখাচ্ছে, দেখছো? ডাক্তার চার ব্যাগ রক্ত দিতে বলেছে। আমরা দু ব্যাগ দিয়েছি। বাকি দু ব্যাগ তোমার হাসবেন্ডকে নিয়ে দিয়ে নিও। এখন তোমার হাসবেন্ডের নাম্বার বলোতো। তাকে ফোন করে কয়েকটা বকা দেই। অসুস্থ স্ত্রীর এমন অবস্থা রেখে সে কোথায়?”

পাখি মিছেমিছি বলল, “ওনি জানেন না এসব। ওনার ফোনটাও চুরি হয়ে গেছে। তাই খবর নিতে পারছেন না। চিন্তা করবেন না, তিনি আমাকে অনেক ভালোবাসেন।”

“তাইলে আরকি? এখন আগামীকাল যাবা কিভাবে? তোমার যা অবস্থা, একা তো যেতে পারবা না। এখন বলো তোমার গ্রামের বাড়ি কই?”

“বরিশাল।”

“ওরে মাবুদ! ওতো দূরে?”

পাখি হেসে মাথা ঝাঁকাল, “হ্যাঁ।”

পরদিন বিদায়ের প্রাক্কালে পাখি শেষবারের মতো তার সন্তানদের কবর দেখতে গেল। পাশাপাশি শায়িত আছে তার বুকের দুই দুটো নক্ষত্র। নুরাজ ও নুজাইন। কবর দুটির সামনে দাঁড়াতেই তার হৃদয়ের গভীরতম প্রদেশে এক অদ্ভুত কম্পন অনুভূত হলো। চারপাশে যেন মৃদু এক সুরভি ভেসে বেড়াচ্ছে। অপার্থিব, পবিত্র, প্রশান্তিময় এক ঘ্রাণ। নিষ্পাপ আত্মাদের কবর থেকে এমন সুবাসই তো ছড়ায়। তারা তো পৃথিবীর কলুষতা স্পর্শ করার আগেই জান্নাতের অতিথি হয়ে গেছে। কাঁপা হাতে দুটি সাইনবোর্ড গেঁথে দিল সে।

নাম : নুরাজ

পিতা : নাওয়াফ তালুকদার

মাতা : অনন্যা রহমান পাখি

মৃত্যু তারিখ : ২০শে মার্চ

অপরটিতে—

নাম : নুজাইন

পিতা : নাওয়াফ তালুকদার

মাতা : অনন্যা রহমান পাখি

মৃত্যু তারিখ : ২০শে মার্চ

নাম দুটো লিখা দেখে বুকের ভেতরটা আবার মোচড় দিয়ে উঠল। কত স্বপ্ন ছিল! কত আকাঙ্ক্ষা ছিল! অথচ আজ তাদের পরিচয় কেবল একটি কবর আর একটি নামফলকের মাঝে সীমাবদ্ধ। দীর্ঘক্ষণ নির্বাকে দাঁড়িয়ে রইল পাখি। শেষবারের মতো কবর দুটোর দিকে তাকিয়ে বিদায় নিল। মনে হচ্ছিল, প্রতিটি পদক্ষেপে তার অস্তিত্বের একটা অংশ পিছনে পড়ে থাকছে। দারোয়ান ও তার স্ত্রী সুমনার কাছ থেকেও বিদায় নিল সে। যাওয়ার সময় তারা কিছু টাকা গুঁজে দিল তার হাতে। এমনকি আংটিটাও ফিরিয়ে দিতে চাইল। কিন্তু পাখি নিল না। কিছু ঋণ অর্থ দিয়ে পরিশোধ করা যায় না। কিছু মানবিকতা সারাজীবন হৃদয়ের গহীনে স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সিএনজি, ফেরি আর অটোর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে সে পৌঁছাল তালুকদার বাড়ির সামনে।

আজ সে এসেছে নাওয়াফের সন্ধানে। সে জানাতে চায় তাদের সন্তানদের কথা। জানাতে চায় সেই ভয়াবহ দুর্দিনের প্রতিটি মুহূর্তের কথা। তার বিশ্বাস, সন্তানদের কথা ও সন্তানদের মৃত্যুর সংবাদ শুনে নাওয়াফ আর তাকে অবিশ্বাস করতে পারবে না। সমস্ত অভিমান, সমস্ত বিভ্রান্তি নিশ্চয়ই ভেঙে যাবে। এই ক্ষীণ আশার প্রদীপ বুকে জ্বালিয়েই সে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। কিন্তু ভেতরে ঢুকেই তার অন্তরাত্মা কেমন যেন হিম হয়ে গেল। কেননা সমগ্র বাড়ি জুড়ে এক ভয়াবহ নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। উঠোন জুড়ে ঝরে পড়া শুকনো পাতার স্তূপ। কোথাও মানুষের পদচারণার চিহ্ন নেই। বাড়িটাকে দেখে মনে হচ্ছিল, বহুদিন ধরে এখানে প্রাণের কোনো অস্তিত্ব নেই। পাখি বুঝতে পারল, নাওয়াফ এখানে নেই। হয়তো ট্রি-হোমে আছে। আর সেখানে না পেলে সে রমিজ কিংবা নিখিলের কাছে যাবে। সব খুলে বলবে। নিজের নির্দোষিতার সাক্ষ্য দিবে। এই প্রত্যাশা নিয়েই সে ট্রি-হোমের দিকে রওনা হলো। বিকেলের রক্তিম আলো তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কড়া নাড়ল সে। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আলোড়ন। নাওয়াফ তাকে দেখে কী করবে? তিরস্কার করবে? অপমান করবে? হয়তো। রাগে কণ্ঠ উঁচু করবে। তবুও সে প্রস্তুত। প্রয়োজনে তার পা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাইবে। কাঁদবে। অনুনয় করবে। কারণ সে বিশ্বাস করে, তাদের সন্তানদের স্মৃতি একদিন সব দূরত্ব মুছে দেবে। কিন্তু দরজা খুলতে বিলম্ব হচ্ছে কেন? সে আবার কড়া নাড়ল। পরমুহূর্তেই দরজাটা হঠাৎ খুলে গেল। আর দরজা খুলতেই পাখির সমস্ত সত্তা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।

দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে এক অপরূপা তরুণী। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশের বেশি হবে না। আধখোপা করা চুল, লাবণ্যময় মুখাবয়ব। প্রথমে শুধু বিস্মিত হয়েছিল পাখি। কিন্তু পরক্ষণেই তার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো নারীটির পরিধেয় বস্ত্র আর অলংকারে। তার গায়ে পাখির শাড়ি।

তার শরীরে পাখির গহনা। মুহূর্তেই পাখির রক্ত যেন হিম হয়ে গেল। সমস্ত শরীর ঘামে ভিজে উঠল। মস্তিষ্কের ভেতর অসংখ্য আশঙ্কা, সংশয় আর বিভীষিকাময় কল্পনা ঘূর্ণিঝড়ের মতো আছড়ে পড়তে লাগল। সে যা ভাবছে, তা যেন সত্য না হয়। সৃষ্টিকর্তা যেন তাকে এত বড় নির্মম আঘাত না দেন। ঠিক তখনই তরুণীটি তাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,

“কে তুমি?”

পাখি জবাব দিলো না। ভঙ্গুর হৃদয় ও বিস্মিত নয়ন দুটো নিয়ে উল্টো প্রশ্ন করল সে, “আপনি কে?”

২৫ বছর বয়সী সুন্দরী নারীটির কণ্ঠস্বর থেকে জবাবে বেরিয়ে এলো, “নাওয়াফ তালুকদারের স্ত্রী।”

কথাটি কর্ণে প্রবেশ করা মাত্রই ধুম করে মাটিতে নেতিয়ে পড়ল পাখির ক্লান্তময় দেহটা।

#(চলমান~)

#লামইয়া_তাসনিম

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন