ফন্ট সাইজ:
থিম:
সে আমার সর্বনাশ-২

৩৯তম পর্ব

লেখক: লামইয়া তাসনিম

দরজার শব্দে পাখির বুকটা ধক করে উঠল। মনে হলো ওনি দরজাটি আটকাল না, তার বুকে ছুরি মেরে দিল। আত্মমর্যাদার ওপর আঘাত করল। সে ধীরে ধীরে দরজার সামনে অসহায়ের মতো হামাগুড়ি দিয়ে বসে পড়ল। অঝরে কাঁদতে লাগল। এ কাকে ভালোবাসল মন? কাকে বিশ্বাস করল? যে এত আয়োজন করে কাঁদাচ্ছে তাকে? প্রতিটি কথার আঘাতে তার দেহটাকে ক্ষতবিক্ষত করছে। কলিজাতে যেন লোহা পুড়ে সেঁকা দিচ্ছে। নির্দোষ হয়েও বার বার একই অপরাধে শাস্তি পেয়ে যাচ্ছে। তার একটা গান মনে পড়ল...

না জানি কোন অপরাধে দিলা এমন জীবন

আমারে কাঁদাতেই তোমার এতো আয়োজন...

গানটা পূর্ণতা পেল বুঝি তার জীবনে। আজ কত আয়োজন তার জন্য! কত উৎসব তাকে কাঁদানোর জন্য! তাকে ব্যথা দেওয়ার জন্য তার সংসারে ঢুকানো হলো আরেক নারীকে। নিজের বলতে তার আর কিছুই রইল না। না ঘর, না ঘরের মানুষটা। সে কাউকে বলতেও পারবে না আমার একজন ভালোবাসার মানুষ ছিল। যাকে বড্ড ভালোবাসতাম। মন পুড়িয়ে বাসতাম। হৃদয় দিয়ে বিশ্বাস করতাম। বিনিময়ে তার থেকে পেয়ে গেলাম মেলা দুক্ষু। তাকে দিলাম ভালোবেসে নিজের দেহ ও মন। সে দিলো আমার ভঙ্গুর হৃদয়ে একের পর এক ছুরিঘাত।

সে চোখ দুটো মুছে নিল। দরজার বাহির থেকে মৃদু স্বরে ডাকল, “শুনছেন, একটা কথা ছিল।”

ভেতর থেকে তখন কোনো উত্তর এলো না। তবুও সে অনুভব করছিল, লোকটা এখনও দরজার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। তার প্রতিটি শব্দ শুনছে। তাই ঠোঁটে একরাশ বিষণ্ন হাসি ফুটে ওঠল। বলল সে, “আপনি ঠিকই বলেছিলেন, আমি ভিখারি। তবে টাকার নয় গো, আমি ভালোবাসার ভিখারি। সেই ভিখারিনী আজ আপনার দরজায় এসেছিল নিজের দুঃখ- দুর্দশার গল্প শোনাতে। আপনার বুকে মাথা রেখে একটুখানি শান্তির ঘুম ঘুমাতে। কিন্তু আপনি তাকে ফিরিয়ে দিলেন। তাকে তাড়িয়ে দিলেন। ঘর থেকে টেনে বের করে দিলেন। আপনার বুক থেকে তাকে ছুঁড়ে মারলেন। আজকের পর থেকে ভালোবাসার প্রতি এই ভঙ্গুর নারীর আর কোনো বিশ্বাস রইল না। আর কোনো পুরুষকে ভালোবাসাও হবে না। আর কোনোদিন আপনার কাছে ছুটে এসে বলবও না, নাওয়াফ ভাই, আমাকে একটু বিশ্বাস করবেন? বলব না, চলুন না, আজ জোছনা দেখি।”

কথাগুলো বলতে বলতে তার কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো।

বুকের গভীরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসগুলো যেন শব্দ হয়ে বেরিয়ে আসছিল। সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। অবরুদ্ধ গলাটা একটু হালকা হতে আবার বলল, “জানেন, মা-বাবার পর স্বামীই নাকি মেয়েদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হয়। একথা গ্রামের মুরব্বিরা বলতো। আমিও সেটা এতদিন ধরে বিশ্বাস করে এসেছি। সেই আশ্রয়টা আপনার মাঝে খুঁজেছিলাম। কিন্তু আর না, আপনি সেই স্থানটা ধরে রাখতে পারেননি। সেচ্ছায় হারিয়েছেন আমায়। আমার প্রতি আফসোস নয়, আপনার প্রতি আমার বড্ড আফসোস হয়। কেন জানেন? সত্য চিনতে অলস আপনি। কোন জগতে বাস করছেন আপনি জানি না। সত্য মিথ্যার পার্থক্যটুকু বুঝতে পারছেন না। যেদিন সত্যিটা সামনে আসবে, আপনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের সঙ্গে চোখ মিলাতে পারবেন তো? একজন নারীকে বিনা দোষে যে দিনের পর দিন, মানসিক টর্চার করেছেন তার কি হবে ভেবে দেখেছেন? তাকে ঘর ছাড়া করেছেন, তার সংসার ছাড়া করেছেন। নিজের জীবনে দ্বিতীয় নারীর স্থান দিয়েছেন, কেবল তাকে যন্ত্রণা দিবেন বলে। তার দিকে অবিশ্বাসের তীর ছুঁড়ে মেরেছেন। তার চরিত্র নিয়ে কথা বলেছেন। তাকে পতিতার চেয়েও নিচু চোখে দেখেছেন। ঘৃণা করেছেন তাকে। তার স্পর্শওকে ঘৃণা করেছেন। এসব সেদিন কোথায় যাবে? সেদিন আপনি আমাকে খুঁজেও পাবেন না শুধু সরিটুকু বলার জন্য। আমার ছায়াটুকু পর্যন্ত দেখার সুযোগ হবে না আপনার। একটা কথা মনে রাখবেন, সত্যরা কখনো মরে না। যুগ যুগ ধরে তারা বেঁচে থাকে। আর কেয়ামত পর্যন্ত তারা থাকবেই। আমার রব জানেন আমি কতটুকু সত্য। আজ যে সত্যটা আপনাকে বলতে চেয়েছিলাম, একদিন সেই সত্য শোনার জন্য আপনি উন্মাদ হয়ে যাবেন। আজ যেমন আমি আপনার জন্য কাঁদছি। একদিন আপনি আমার জন্য এরচেয়েও বেশি কাঁদবেন। অনেক অনেক। রাস্তায় গড়িয়ে গড়িয়ে। বুক থাপ্পড়ে থাপ্পড়ে আর্তনাদ করবেন। সেদিন কেউ শুনবে না আপনার কান্না, আপনার বুক চিঁড়া আর্তনাদ। কেউ ফিরেও দেখবে না। আমার সঙ্গে একটু কথা বলার জন্য, আমার একটুখানি স্পর্শ পাওয়ার জন্য, একটু আলিঙ্গনের জন্য আপনার হৃদয় ছটফট করে ওঠবে। রাতের পর রাত নির্ঘুমে কাটবে আপনার রজনী। শুধু অনুতপ্তে। কিন্তু সেদিন আমি থাকব না। আমার অস্তিত্বটাকেও আপনি খুঁজে পাবেন না। আমার আমিটাকে আমি এমন এক নিভৃত অন্ধকারে গুটিয়ে নেব, যেখানে আপনার কোনো অস্তিত্ব পৌঁছাতে পারবে না। সেখানে শুধু আমি থাকব, থাকবে আমার নিঃসঙ্গতা , আর থাকবে আমার না বলা কষ্টগুলো।”

কথাগুলো শেষ করে পাখি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। চোখের পানি মুছে নিজের প্রতি তাচ্ছিল করে হাসল।

“ওহে আমার প্রিয় পুরুষ, জীবিত থাকতে মৃতের স্বাদ পাইয়ে দিলেন। নরম আমিটাতে পুড়তে পুড়তে যে অস্ত্রে পরিণত করলেন, একদিন সেই অস্ত্রে আপনিই দগ্ধ হবেন।”

টেনে টেনে নিচ্ছিল তার দুর্বল পা দুটো। প্রতি কদমের সঙ্গে নিজের ভেতরে জেগে উঠছিল অদ্ভুত এক শক্তি। সে ভেঙে যাইনি। সে নিজেকে নতুন করে গড়বে। জীবনে আঘাত না পেলে মানুষ কখনো শক্ত হয় না। একটা ইট তখন পরিপূর্ণ শক্ত হয়, যখন সে পুড়ে পুড়ে যায়। সে যখন কাদা মাটি আকারে থাকে, তখন সে নরম থাকে। এরপরে তাকে পোড়ানো হয়। পুড়তে পুড়তে হয় সে শক্ত। সেও তেমন শক্ত হবে। তার নিজের পরিচয় সে নিজে তৈরি করবে। সেখানে কারোর কোন উপস্থিতি থাকবে না। থাকবে একমাত্র সে আর তার নিঃসঙ্গ জীবন।

পাখি চোখের আড়াল হতেই নাওয়াফ দরজাটা খুলে দিল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। দরজার সামনের জায়গাটা শূন্য। সেখানে নেই পাখি, নেই তার কান্না, নেই তার অভিমানভরা কণ্ঠস্বর। অথচ কিছুক্ষণ আগেও মেয়েটা তার দরজার সামনে এতিমের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। হাউমাউ করে কেঁদেছিল। কতশত কথা বলে গেল। আবার নীরবে যেভাবে এসেছিল, ঠিক সেভাবেই চলে গেল। নাওয়াফ বুকের ভেতরটা হঠাৎ শূন্যতা অনুভব করল। সত্যিই কি সে অবিশ্বাস্যের মধ্যে ডুবে আছে? না না, নিজের চোখের দেখা ভুল হয় কি করে? ঠিক তখনই বউ বলে পরিচয় দেওয়া মেয়েটা এসে তার পাশে দাঁড়াল। মাথা নিচু করে অপরাধবোধে ভেজা কণ্ঠে বলল, “সরি ভাইয়া, ভাবি অনেক কষ্ট পেয়েছে। আপনি তাকে ফিরিয়ে আনুন।”

নাওয়াফ দুচোখ বন্ধ করে নিল। চোখের সামনে ভেসে ওঠল পাখির জলে ভেজা মুখটা। রোগা শরীর। ফ্যাকাশে মুখ। ফোঁস করে শ্বাস ফেলল সে। বুকের ভেতর অদ্ভুতভাবে জ্বলছে। শান্তি পাচ্ছে না কিছুতেই। ওকে বুকেও টানতে পারছে না। দূরে সরিয়েও রাখতে পারছে না। শুধু জ্বলছে।

সে বলল, “ওকে ফিরিয়ে আনা গেলে আমি এতমাস অপেক্ষা করতাম না। আমি চেয়েছি ও নিজ থেকে অনুতপ্ত হোক, ওর ভুল আমার কাছে স্বীকার করুক। ও সেটা না করে বার বার নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাইছে। এইদিকে আমি পারছি না ওকে ক্ষমাও করতে, আবার বুকেও টানতে। কতটা যন্ত্রণায় ছটফট করছি বুঝতে পারছিস?”

“কিন্তু ওনি তো ভুল বুঝল আপনাকে। সত্যি এটাই যে আমি আপনার বউ না। আপনার কাজিন। আপনি যেমন যেমন বলেছিলেন শুধু তাই করেছি।”

“বুঝুক ভুল। তুই এখন বাসায় চলে যা। আমি রমিজকে বলব, তোকে পৌঁছে দিতে।”

বলেই সে নিখিলকে একটি মেসেজ করে দিল।

“তোদের বাসায় পাখি গেলে থাকতে দিস। আমি আগামীকাল ওর জন্য বাসা ভাড়া করে দিব। কিন্তু ওকে আমার নাম বলবি না। বলবি তুই ভাড়া করে দিয়েছিস। সেখানে ও থাকবে। ওর যা যা লাগবে, সব পাঠিয়ে দিব।”

পাঠিয়ে সে ফোঁস করে শ্বাস ফেলল।

“তোর থাকা খাওয়ার জন্য যা যা লাগে সব করব। কিন্তু তোকে নিজের কাছে আসতে দিব না। না নিব বুকে টেনে। আর এটাই হবে তোর উপযুক্ত শাস্তি। যেদিন নিজের দোষ স্বীকার করবি। মাফ চাইবি। তওবা করবি। সেদিনই তুই আমার বুকে আবার স্থান পাবি। এর আগে আর না।”

রাত তখন প্রায় আটটা। আকাশ জুড়ে গাঢ় অন্ধকার নেমে এসেছে। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক, আর মাঝেমধ্যে শীতল বাতাসের দীর্ঘশ্বাসময় শব্দ রাতটাকে আরও বিষণ্ন করে তুলছিল। ক্লান্ত, অবসন্ন শরীর আর ভগ্ন হৃদয় নিয়ে পাখি গিয়েছিল মোল্লা বাড়িতে। শেষ আশ্রয় হিসেবে ভেবেছিল অন্তত নিজের মানুষগুলো তাকে ফিরিয়ে দেবে না। কিন্তু ভাগ্য বোধহয় সেদিনও তার প্রতি প্রসন্ন ছিল না। তাহিরা ইতোমধ্যেই নাওয়াফের কাছ থেকে সব শুনেছে। নিখিলসহ বাড়ির প্রায় সবাই বিষয়টা জানে। তাই পাখিকে দেখেও তাহিরার মন গলেনি। বরং কঠোর কণ্ঠে জানিয়ে দিয়েছিল, “যেদিন নাওয়াফ তোকে ক্ষমা করবে, সেদিনই এই বাড়িতে তোর জায়গা হবে। তার আগে নয়।”

কথাগুলো শুনে পাখির বুকের ভেতরটা যেন চুপচাপ ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল। মানুষ যখন খুব বেশি কষ্ট পায়, তখন সে কাঁদতেও পারে না। পাখির অবস্থাও ঠিক তেমন হয়েছিল। চোখে জল ছিল, কিন্তু সেই জল গড়িয়ে পড়ার শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছিল। নিরাশা, অপমান আর বঞ্চনার ভার বুকে নিয়ে সে আবার রওনা দিল নিখিলদের বাড়ির দিকে। তার আর কোনো চাওয়া ছিল না। শুধু আজকের রাতটুকুর জন্য একটা আশ্রয়। একটা ছাদ। ভোরের আলো ফুটলেই সে বেরিয়ে পড়বে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে। কোথায় যাবে, কী করবে, তার কোনো উত্তর জানা নেই। তবুও যেতে হবে। কারণ কিছু মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য নিজের ভাঙা হৃদয় নিয়েই পথ চলতে হয়। বাড়ির সামনে এসে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল পাখি। কাঁপা হাতে দরজায় নক দিল। কয়েক মুহূর্ত পর দরজাটা খুলে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে মুক্তি। মুক্তিকে দেখে পাখি অনেক কষ্টে ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটানোর চেষ্টা করল। সেই হাসিতে প্রাণ ছিল না, ছিল কেবল ক্লান্তি আর অসহায়ত্ব। মনে হচ্ছিল, বহু ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে আসা কোনো পথহারা মানুষ শেষবারের মতো বাঁচার আশায় কারও দিকে হাত বাড়িয়েছে। কিন্তু মুক্তির মুখে কোনো হাসি ফুটল না। বরং তার চোখেমুখে বিরক্তি আর কঠোরতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে ভ্রু কুঁচকে ঠান্ডা গলায় জিগ্যেস করল, “তুই এখানে? এখানে কেন এসেছিস?”

পাখির খুব কান্না পাচ্ছিস। রক্তের বোনও এমন প্রশ্ন করতে পারে? সে বলল, “আগে ভিতরে ঢুকতে দেও।”

মুক্তি মুখের ওপর বলে দিল, “না পারবি না। কারণ কোন চরিত্রহীন নারীর জায়গা নেই এই ঘরে।”

পাখি এবার তেজ দেখিয়ে বলল, “ভুলে যেও না আপা, এটা আমারও মণি বাড়ি। তাই এই ঘরে ঢোকার তোমার যেমন অধিকার আছে, তেমন আমারও আছে।”

“এটা তোর খালা বাড়ি হতে পারে পাখি, বাট আমার বর্তমানে শশুর বাড়ি। তাই তোর চেয়ে আমার অধিকার বেশি। এখন এই বাড়িতে কে ঢুকবে না ঢুকবে সেটা আমি ডিসাইড করব।”

পাখি বিস্মিত চোখে চাইল,

“আমায় ছাড়া তুমি বিয়ে করে নিলে?”

”ইচ্ছে তো ছিল তোদের নিয়েই করার। কিন্তু নাওয়াফ ভাইর মুখে যা শুনলাম। যাক যাইহোক তুই এখানে কেন?”

“আমাকে আজকের রাতটা থাকবে দিবা? আগামীকাল থেকে একটা বাসা ভাড়া করে নিব। আর তোমাদের বিরক্ত করব না।”

“কেন নাওয়াফ ভাই তোকে ঘরে উঠতে দেইনি?”

পাখি মাথা নত করে নিল। ঠোঁট কামড়ে বহু কষ্টে চোখের জল আটকাতে চেষ্টা করল। নীরবে মাথাটা দুদিকে ঝাঁকিয়ে না বোঝাল।

“দিবা থাকতে?”

“না পারবি না। কারণ নাওয়াফ ভাই নিষেধ করে দিয়েছে।” কথাটা মিথ্যে বলল মুক্তি।

“তোকে আরেকটি কথা বলি, অন্যায় যা করার করে ফেলেছিস। এখন নিজের ভুল স্বীকার গিয়ে ওনার কাছে মাফ চা। ওনি ক্ষমা করে দিবেন।”

“তুমি বিশ্বাস করো আমি ওমন?”

“আমি তো দেখিনি পাখি। আর নাওয়াফ ভাইয়ের কথাও কি অবিশ্বাস করব?”

“থাকতে দিবা না?”

“তোর শশুর বাড়ি যা। দরকার পড়লে আমিও তোর সঙ্গে যাব। নাওয়াফ ভাইকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বলব। তবুও তুই একটু নরম হ। স্বামীর ঘরে ফিরে যা। স্বামীর পা ধরে মাপ চা। অন্যায় দোষ যাই করিস, দিন শেষে স্বামী স্বামীই হয়। নাওয়াফ ভাই উপরে শক্ত হলেও ভেতরে নরম। তোকে ক্ষমা করে দিবে।”

পাখি নিরাশ হলো। আর কিছু বলল না। সে বুঝে গেল ওখানে তার জায়গা নেই। তাই আর ওখানে রইল না। নীরবে বেরিয়ে গেল। পেছন থেকে মুক্তি বেশ কয়েকবার ডাকল।

“যাস না পাখি, যাস না। ফিরে আয়। থাকতে দিব তোকে।”

সে শুনেনি, দাঁড়ায়ওনি। করুনা সে কারোর থেকে চায় না। হয়ত সে আজ অসহায়। আগামীকাল এই অসহায়টুকু নাও থাকতে পারে।

নিখিল গিয়েছিল ওয়াশরুমে। ওখান থেকে বেরিয়ে মুক্তিকে ম্লান মুখে বসে থাকতে দেখে জিগ্যেস করল, “কার সঙ্গে কথা বলছিলি?”

মুক্তি মলিন মুখে জবাব দিল, “পাখি এসেছিল।”

“পাখি এসেছিল! কই?”

“তাড়িয়ে দিছি।”

এতটুকু বলেই মুক্তি কেঁদে ফেলল।

নিখিল অবাক হয়ে বলল, “তাড়িয়ে দিয়েছিস মানে?”

“যাতে ও নিজের ভুল বুঝতে পারে। নিজের সংসার, নিজের স্বামীর কাছে ফিরে যায়। অনুতপ্ত হয়। মাথা নত করে।”

“কিন্তু নাওয়াফ তো ওকে রেখে দিতে বলেছিল। সকালে পাখিকে ও বাসা ভাড়া করে দিবে এও বলেছিল। কি যে করিস না? বোন হয়েও বোনের প্রতি অবহেলা করিস। বাপ নাই, মা নাই। ছোট মানুষ কি না কি করেছে, তা নিয়ে পড়ে আছে। ওতটুকু মানুষ নাকি করছে আবার পরকিয়া? দুনিয়া উল্টে গেলেও এসব বিশ্বাস করতাম না। ঘরে থাকিস। দেখি অভিমানিটা কোথায় গেল?”

“বুঝিয়ে ঘরে নিয়ে আইসেন।”

“তোকে তা বলতে হবে না। তোগো মতো বদজাতরা যেন কারোর বোন না হয়।”

রাগারাগি করেই একপ্রকার সে বৃষ্টির ভেতর মাথায় ছাতা নিয়ে পাখিকে খুঁজতে বেরিয়ে গেল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাখিকে পাওয়া গেল রাস্তার পাশে। যেখানে একজন পাগল শুয়ে আছে। তার থেকে কিছুটা দূরে ওড়না দিয়ে গা ঢেকে শুয়ে আছে পাখি। ওই দৃশ্য দেখে নিখিলের চোখ ভিজে উঠল। বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। সে গিয়ে পাখির মাথার কাছে বসল। আলতো স্বরে ডাকল ওকে,

“পাখি।”

পাখি পিটপিট করে তাকাল। নিখিলকে দেখে ধীরে ধীরে উঠে বসল। গায়ে দেওয়া ওড়নাটা আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিল। নিখিল ভালো করে ওর দিকে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে সে আঁতকে উঠল। এ কী অবস্থা হয়েছে মেয়েটার! শরীর শুকিয়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেছে। গালের হাড় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দাঁত বেরিয়ে গেছে। গায়ের রং এতটাই সাদা ও বিবর্ণ হয়ে গেছে যে, ত্বকের নিচের নীলচে রগগুলো পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, শরীরের সমস্ত রক্ত যেন কোনো অদৃশ্য নিষ্ঠুর শক্তি এসে শুষে নিয়েছে। গলার রগগুলোও স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। চেহারা জুড়ে ক্লান্তি, অবসাদ আর দীর্ঘদিনের দুঃসহ যন্ত্রণার ছাপ। দৃশ্যটা দেখে নিখিলের চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত অভিমান মুহূর্তেই গলে গেল। সে ধীরে ধীরে পাখির হাতটা টেনে ধরল।

“চল আমার সঙ্গে।”

পাখি শক্ত পাথরের মতো বসে রইল। নিজের জেদ বজায় রেখে বলল, “যাব না।”

নিখিল মিষ্টি করে হাসল।

“বোন অভিমান করে বের করে দিয়েছে বলে রাগ করেছিস? ওটা তো ও রাগ করে বলেছে, মনের কথা না। আচ্ছা ওর কথা ছাড়। আমি তো তোর বড়ো ভাই। আমার কথা শোন। চল বাড়ি যাই। তোকে নিতে এসেছি। না আমার কথাও শুনবি না?”

“বাড়ি?” বলেই পাখি উন্মাদের মতো হাসতে লাগল। নিখিল বিম্মিত হয়ে তার সামনে থাকা ভঙ্গুর নারীটার দিয়ে চেয়ে রইল৷ যেন অতি শোকে পাগল হয়ে গেছে মেয়েটা। কেমন অদ্ভুত করে হাসছে।

হাসতে হাসতে তার চোখে জল জমল। নিখিল অবাক হয়ে দেখে গেল সব। পাখি হাসি থামিয়ে বলে, “নারীদের কোন বাড়ি হয় না। তাদের একমাত্র বাড়ি কবর। কবর যেদিন আমার আপন হবে, সেদিন তোমাদের কারোর ডাকতে হবে না। সেচ্ছায় হাঁটতে হাঁটতে চলে যাব। সেদিন তোমরা হাজার টেনেও আমাকে আমার বাড়ি থেকে নিতে পারবে না।”

কথাগুলো নিখিলের শরীরের সমস্ত পশম পর্যন্ত নাড়িয়ে দিল। সে আর কথা বলতে পারল না। থম মেরে রইল। কিছুটা সময় চুপ করে রইল।

“যাবি না তুই?”

“নাহ।”

পাখির অদম্য জেদের কাছে শেষপর্যন্ত হার মানতেই হলো নিখিলকে। কিছু মানুষ থাকে, যাদের কষ্টের কাছে যুক্তি পরাজিত হয়। জেদের কাছে হার মেনে যায় পৃথিবীর সমস্ত অনুরোধ। তেমনই পাখি। সেচ্ছায় না গেলে সে কিভাবে জোর করবে? নিখিল নাওয়াফকে একটি মেসেজ করে বিষয়টি জানিয়ে দিল। এরপরে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে চলে গেল।

পাখি আবারও সেই জায়গাটাতেই শুয়ে পড়ল। ওড়নার আঁচল দিয়ে মুখখানা ঢেকে রাখল। যেন পৃথিবীর কারও মুখও সে দেখতে চায় না । সমস্ত অভিমান, সমস্ত অপমান আর সমস্ত ক্লান্তি থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখতে চায়। রাত ক্রমশ গভীর হলো। চারপাশ নিস্তব্ধ। দূরে কোথাও কুকুর ঘেউঘেউ করছে। আকাশের বুকে চাঁদ নেই, তারা নেই। শুধু একরাশ বিষণ্ন অন্ধকার। এমন সময় সেখানে এসে দাঁড়াল একটি দীর্ঘকায় মূর্তি। লোকটা কোনো কথা বলল না। কোনো শব্দ করল না। শুধু দূর থেকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। যেন কাউকে পাহারা দিচ্ছে। যেন কাউকে হারানোর ভয় তাকে নীরব করে দিয়েছে। ঠিক ভোর পর্যন্ত সে সেখানেই ছিল। ফজরের আযানের সুর বাতাসে ভেসে উঠতে ছায়ামূর্তিটা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল।

পরদিন সকালে নিখিল আবার সেখানে এলো। কিন্তু পাখিকে আর খুঁজে পেল না। মুহূর্তেই তার বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কার ঢেউ আছড়ে পড়ল। পরে জানতে পারল, রাস্তার পাশের একটি একতলা বাড়িতে উঠেছে সে। বাড়িটা দেখতে অনেকটা পুরোনো স্কুলঘরের মতো। সারি সারি ছোট ছোট সিঙ্গেল রুম। প্রতিটি রুমের ভাড়া তিন হাজার টাকা। সেই রুমগুলোর একটিতে আশ্রয় নিয়েছে পাখি।

সে নাচ জানে। একসময় ছিল সে নৃত্য করত। গত বছর দুই যাবৎ করা হয় না। তাতে কি? ভুলে তো যায়নি। এক দুইদিন রিহার্সাল করলে ঠিক হয়ে যাবে। তাই ভাবল নৃত্য নিয়ে কাজ করা যাক। সে বাচ্চাদের নৃত্য শিখাবে। এতে যা টাকা আসবে মোটামুটি তার হয়ে যাবে। তাই বাড়ির সামনে একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিয়েছে ‘এখানে নৃত্য শিখানো হয়।’

ঠিকানা নিয়ে নিখিল সেখানে পৌঁছে গেল। গিয়ে দেখল, পাখি তার ছোট্ট ঘরখানা গুছিয়ে নিচ্ছে। টুকিটাকি কিছু জিনিসপত্র কিনেছে। একটি চৌকি, কয়েকটি প্রয়োজনীয় বাসনপত্র আর হাতে একটি ছোট বাটন ফোন। জীবন তাকে রাজপ্রাসাদ দেয়নি, কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় স্বপ্নটুকু এখনও কেড়ে নিতে পারেনি। নিখিলকে দেখেই পাখি হাসল। সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না, ছিল একরাশ অবসাদ আর বেঁচে থাকার দৃঢ় প্রত্যয়। নতুন বাসা নেওয়ার কথা শুনে নিখিল দু-একটা বকা দিল। পাখি কিছু বলল না। তার এখন অভিমান করার সময় নেই। জীবন নামক কঠিন সমীকরণ তাকে প্রতিদিন নতুন করে হিসাব শেখাচ্ছে। এরই মধ্যে নিখিলের ফোন এলো। নিখিল খাবার এনেছিল, সেই খাবার পাখিকে খেয়ে নিতে বলে চলে গেল। কিন্তু পাখি সেই খাবারটা নিজে খেল না। রাস্তার এক পাগলকে ডেকে দিয়ে দিল। সে নিজের জন্য নিজেই রান্না করল। হয়তো সে বুঝে গেছে, জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধগুলো মানুষকে একাই লড়তে হয়।

পরদিন দুটি মেয়ে এলো। তারা নাচ শিখতে চায়। অনেকদিন পর পাখির বুকের ভেতর যেন ক্ষীণ এক আলোকরেখা জ্বলে উঠল। সে তো আগে থেকেই নৃত্যে পারদর্শী ছিল। দীর্ঘদিন রিহার্সাল হয়নি বটে, কিন্তু শিল্প কি কখনো মানুষকে ছেড়ে যায়? মেয়ে দুটোকে আগামীকাল থেকে আসতে বলল। সেই রাতে বহুদিন পর আবার তাল, লয় আর ছন্দের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে দিল। পরদিন থেকে শুরু হলো নৃত্য শিক্ষা। ধীরে ধীরে সাত-আটজন শিক্ষার্থী নিয়মিত আসতে লাগল। ছোট্ট ঘরটিতে আবার প্রাণের সঞ্চার হলো। এসব কিছু নাওয়াফ জানত। কিন্তু তাদের আর দেখা হয়নি। পাখিও আর কখনো তার সামনে যায়নি। বুকের গভীরে জমাট বেঁধে থাকা ক্ষোভ, আত্মসম্মান আর অভিমানকে সঙ্গী করে সে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে নেমে পড়ল। তাকে পড়াশোনা করতে হবে। নিজের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বাসা ভাড়া দিতে হবে। নিজের জীবনটাকে আবার নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। মোটামুটি সবই ভালো চলছিল। অন্তত বাইরে থেকে তাই মনে হতো। কিন্তু মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর যুদ্ধটা তো বাইরের নয়, ভেতরের। দিনের ব্যস্ততা তাকে ভুলিয়ে রাখত। কিন্তু রাত নামলেই পুরোনো স্মৃতিগুলো শকুনের মতো এসে বসত তার বুকে। সারাদিন শক্ত থাকা মেয়েটা রাতের অন্ধকারে ভীষণ অসহায় হয়ে পড়ত। ঘুম যেন তার জীবনের সবচেয়ে দূরবর্তী অতিথি হয়ে গেছে। ডাক্তার দেখিয়ে ঘুমের ওষুধ এনেছিল। প্রায় প্রতিরাতেই সেই ওষুধ খেয়ে ঘুমাতে হতো। আগের মতো আর কাঁদতেও পারত না। মনে হতো, অশ্রুর ভাণ্ডার বহু আগেই নিঃশেষ হয়ে গেছে। এখন আর কান্না আসে না, আসে শুধু বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস। ডাক্তার তাকে মানসিক চাপ নিতে নিষেধ করেছিলেন। যা করলে মন ভালো থাকে, সেসব করতে বলেছিলেন। ঔষুধও দিয়েছিলেন। কিন্তু কিছু ক্ষত থাকে, যেগুলোর চিকিৎসা কোনো প্রেসক্রিপশনে লেখা থাকে না। তবুও পাখি হার মানেনি। সে ভেবেছিল, অতীতকে সমাধিস্থ করে সামনে এগিয়ে যাবে। কিন্তু নিয়তি যেন অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। মানুষ অনেক কিছু থেকে পালাতে পারে, নিজের অতীত থেকে নয়। যে অতীতকে পেছনে ফেলে আসতে চেয়েছিল, সেই অতীতই আবার ফিরে এলো। আর কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তার গড়ে তোলা বর্তমানটাকে ছিন্নভিন্ন করে দিল।

সেদিন ছিল রবিবার। বরাবরের মতো বাচ্চারা নাচ শিখতে এসেছিল। ঘর জুড়ে নূপুরের শব্দ, তালের মূর্ছনা আর শিশুদের উচ্ছ্বাস। ঠিক তখনই কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক এসে উপস্থিত হলো। পাখি ভেবেছিল, হয়তো সন্তানদের খোঁজখবর নিতে এসেছে। জানতে এসেছে, সে কেমন নাচ শেখায়। কিন্তু তার সেই ভাবনা ভেঙে যেতে সময় লাগল মাত্র কয়েক সেকেন্ড। একজন একজন করে অভিভাবকেরা নিজেদের সন্তানদের ডেকে নিতে শুরু করল। পাখির কপালে বিস্ময়ের ভাঁজ পড়ল। বুকের ভেতর অকারণ শঙ্কা জন্ম নিল। সে এগিয়ে গিয়ে বিনীত স্বরে বলল, “আন্টি, কোনো সমস্যা? ওদের নিয়ে যাচ্ছেন কেন? এখনও তো আধ ঘণ্টা বাকি।”

অনেকগুলো অভিভাবকদের মধ্যে একজন রগচটা গলায় বলল, “নিব না তো কি করব? তোমার তামসা দেখব? টিচারের চরিত্রই যদি হয় কুৎসীত, তাহলে তার থেকে ছাত্রছাত্রীরা কি শিখবে? না না এমন টিচারের কাছে আমার মেয়েদের নাচ শিখতে দিব না।”

পাখি বুঝতে পারল না ওনি কি বলছে? সবটা মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। এতটুকু অন্তত বুঝল গণ্ডগোল কিছু একটা হয়েছে? কিন্তু কি হয়েছে তাকে তা জানতে হবে? সে এবার বেশ শান্ত গলায় বলল, “দেখুন আন্টি বাচ্চাদের নাচ শিখতে দিবেন না ভালো কথা। তাই বলে মিথ্যে বদনাম কেন রটাচ্ছেন?”

ওই মহিলার পাশে একজন মহিলা ছিল। যে এবার পাখির ওপর খুব চটল। বাজখাঁই গলায় বলল, “কি বদনাম রটাচ্ছি হ্যাঁ? এই যে তুমি তোমার স্বামীর থেকে কেন আলাদা থাকো জানি না? কারণ তোমার তো চরিত্র ভালো না। তুমি তো পরকিয়া করতে গিয়ে ধরা খেয়েছো। তোমার স্বামী নিজের হাতে তোমায় ধরেছে। তাই ঘর থেকে তোমাকে বের করে দিয়েছে। এখন এখানে এসে ভাড়া থাকছো। এসবও বলবে মিথ্যে?”

পাখির মাথায় যেন গোটা আকাশটি ভেঙে পড়ল। সে ওনাদের কথার জবাব আর দিতে পারল না। তার ঠোঁটজোড়া কাঁপছে৷ বুকটা হু হু করে ওঠল। দাঁড়ানো অবস্থাতে হঠাৎ ধপ করে নিচে বসে পড়ল৷ ওনারা চলে গেলেন ঠিকই, কিন্তু ভঙ্গুর হৃদয়টা আরও ভঙ্গুর করে দিয়ে। পাখির চোখ দুটো বেয়ে অবিরাম জল গড়াচ্ছিল। একটু শক্ত হতে যখনই যাচ্ছিল, তখনই এসে তাকে ভেঙে দিতে হলো? কিন্তু কে করেছে এসব? সে খুব ভালো করে বুঝতে পারছে।

সে কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন বসাল কাউকে। রিসিভ করল না। কল কেটে ব্যাক করল। সে কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে চ্যাঁচিয়ে ওঠল, “আপনার ভাই কি আমাকে একটু শান্তিতে বাঁচতে দিবে না? আমার নামে কেন মিথ্যে বদনাম এলাকায় এলাকায় রটাচ্ছে? আমি তো তাকে মুক্ত করে দিয়েই চলে এসেছি। এক পয়সার জন্য তার কাছে হাতও পাতিনি। তবুও কেন সে আমার জীবনটা তছনছ করে দিতে আসে? আমার সাজানো গোছানো স্বপ্নগুলো ভেঙে দেয়।”

রমিজ অবাক হয়ে বলল, “এসব কি বলছেন ভাবিজান?”

“কেন, জানেন না কিছু? আপনার ভাই কই? ফোনটা তার কাছে দেন।”

“সে তো বাজারে।”

“আমার স্টুডেন্টের অভিভাবকদের কাছে কেন তিনি আমার নামে দুর্নাম ছড়াচ্ছে?”

“একটা সত্যি কথা বলব ভাবি, শোনেন হতে পারে ভাইয়ের সঙ্গে আপনার ঝামেলা চলছে। তাই মানে এই নয় যে ভাই আপনার নামে বদনাম রটাবে। তিনি গত কয়েকদিন যাবৎ বিছানায় পড়া। ওইযে মাথায় আপনার সাথে থাকতে আঘাত পেয়েছিল। তার ব্যথা এখনো কমেনি। রোজ ঔষধ খেতে হয়। ১২ ঘণ্টা তাকে ঘুমাতে হয়। সে কিভাবে এসব বলতে যাবে?”

পাখির হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে কলটা কেটে দিল সে।

রমিজ ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

এদের যে কী হয়েছে, সে বুঝে ওঠে না। দুজন দুজনকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, অথচ আলাদা থাকে। গতকাল রাতভর জ্বরের ঘোরে নাওয়াফ ভাই কতবার যে পাখি নাম উচ্চারণ করেছে, তার সাক্ষী সে নিজে। তবুও লোকটার মন গলে না। অভিমান যেন তার হৃদয়ের চারপাশে পাথরের প্রাচীর তুলে রেখেছে।

এদিকে পাখি কল কেটে দ্রুত ফোনটা চেক করল। সেখানে একটি অচেনা নম্বর থেকে আসা বার্তা ভেসে উঠল।

“আমার না হওয়া পর্যন্ত তোমাকে আমি শান্তিতে থাকতে দিব না। তোমাকে আমার কাছে ফিরতেই হবে। আমার কাছে আত্মসমর্পণ করতেই হবে।”

মেসেজটা পড়তেই পাখির বুকের ভেতর জমে থাকা অস্বস্তি আরও ঘনীভূত হলো। সে ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। নিশ্চয়ই এটা সিরাজের কাজ। চারদিক থেকে যেন অদৃশ্য এক জাল তাকে ঘিরে ফেলেছে। যতই মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে, ততই নতুন নতুন ঝামেলায় আটকে যাচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, দশ-পনেরোটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে সবকিছুর অবসান ঘটিয়ে দিলে কেমন হয়? সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত অপমান, সমস্ত যন্ত্রণা থেকে চিরদিনের মুক্তি পাবে। কিন্তু পরক্ষণেই তার ভেতরের আরেকটা সত্তা মাথা তুলে দাঁড়াল। কেন সে হার মেনে নেবে? কেন সে পালিয়ে যাবে? সে তো কোনো পাপ করেনি। সে পাপিও নয়৷ অন্যায়ের বোঝা তো তার কাঁধে নয়। তবে কেন বারবার তাকে শাস্তি পেতে হবে? তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে এলো। চোখের গভীরে জমতে লাগল দীর্ঘদিনের দমিয়ে রাখা ক্ষোভ, বঞ্চনা আর প্রতিশোধের আগুন।

সে মনে মনে ভাবল, “শান্তিতে থাকতে দিবি না? আমিও কাউকে শান্তিতে থাকতে দিব না৷ মরব নয়, এবার মারব। সময় এসে গেছে বদলা নেওয়ার। যার সূচনা হয়েছিল আমার হাত ধরে, তার সমাপ্তিও হবে আমার হাত ধরে।”

মুহূর্তের মধ্যেই তার ভেতরটা দপদপ করে জ্বলে ওঠল। মুখে ফুটল অদ্ভুত এক হাসি। কল বসাল একটি নম্বরে। ফোনটা বেশিক্ষণ বাজল না। ওপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই চাপা এক হাসির শব্দ ভেসে এলো। পরিচিত কণ্ঠস্বরটি বলল,

“অবশেষে মনে পড়ল আমায়?”

পাখি পাল্টা হাসি দিয়ে বলল, “মনে না পড়ে উপায় আছে? সবদিক দিয়ে তো পথ বন্ধ করে রেখেছেন।”

“কেন ফোন করেছ বলোতো? এমনিতে ফোন করার মেয়ে তো তুমি নও।”

“কোথায় আছেন?”

“তোমাদের কাজিরহাট।”

পাখি এবার শতভাগ শিউর এই লোকটাই তার নামে তার স্টুডেন্টের অভিভাবকদের কাছে দুর্নাম ছড়িয়েছে।

সে চাপা হাসি দিয়ে বলল, “চলে আসুন। একা আছি।”

“আমি কি স্বপ্ন দেখছি, না কানে ভুল শুনছি?

“সঠিকই শুনছেন। আপনার জন্য স্বামী সংসার সব হারিয়েছি। আপনি চেয়েছিলেন না আমাকে পেতে? আজ পুরো রাত পরে আছে আপনার জন্য। এই রাত সম্পূর্ণ আপনার আর আমার। তাই দেরি না করে চলে আসুন। আমি আপনার জন্য ওয়েট করছি...!”

শেষ কথাগুলো পাখি এমন এক গভীর ইঙ্গিতপূর্ণ ভঙ্গিতে বলল, যার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে সিরাজের আর বাকি রইল না। তার বহুদিনের লালিত স্বপ্ন বুঝি অবশেষে বাস্তবতার দুয়ারে এসে কড়া নাড়ছে। লোভ আর উল্লাসে তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল। বুকের ভেতর জমে থাকা আকাঙ্ক্ষা উন্মত্ত হয়ে উঠল। অবশেষে মেয়েটা তার হাতে ধরা দিতে যাচ্ছে। আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না। তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে পড়ল পাখির বাসার উদ্দেশে।

ওইদিকে ফোন কেটেই পাখি অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসল। সে হাসিতে ছিল না কোনো আনন্দ, না কোনো প্রশান্তি। বরং ছিল এক রহস্য সংকল্পের আভাস। তার মস্তিষ্কে যে এক গোপন নীলনকশা রচিত হচ্ছে, সেটা পৃথিবীর আর কেউ জানে না। একমাত্র সে-ই জানে তার অন্তরে কী ভয়ংকর পরিকল্পনার বীজ অঙ্কুরিত হচ্ছে।

এদিকে পাখির ফোনের সঙ্গে নাওয়াফের ফোনের কানেকশন দেওয়া ছিল। পাখি যার সঙ্গেই কথা বলুক না কেন, নাওয়াফ তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে সমস্ত কথোপকথন শুনতে পারবে। ফলে পাখি আর সিরাজের পুরো আলাপচারিতাই নাওয়াফের কানে পৌঁছে গেল। সেই সময় নিখিলও নাওয়াফের সামনে উপস্থিত ছিল। নাওয়াফ শব্দের ভলিউম বাড়িয়ে নিখিলকেও সব শুনিয়ে দিল।

সবটা শুনে নিখিল স্তম্ভিত হয়ে গেল। সে যেন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না। পাখি এমন হতে পারে? যাকে সে এতদিন ধরে চিনেছে, বুঝেছে, বিশ্বাস করেছে সে কি সত্যিই এমন?

অন্যদিকে নাওয়াফের অন্তর্জগতে তখন প্রলয়ংকরী ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ক্রোধে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। চোখ দুটো রক্তিম আভায় জ্বলতে লাগল। হাতের শিরাগুলো পর্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠল। সে তো ভেবেছিল পাখিকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দেবে। সমস্ত অভিমান ভুলে আবার বুকে টেনে নেবে। সেই উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ চমকের আয়োজনও করছিল। অথচ আজ তার মনে হলো, দ্বিতীয়বারের মতো তার বিশ্বাস ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। তার বুকের ভেতর ক্ষোভ, অপমান, অভিমান আর বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণা একাকার হয়ে গেল। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, ছলনাময়ী এই নারীকে আর কখনো নিজের অন্তরে স্থান দেবে না। আর নয়। এতদিন যে হৃদয় ভালোবাসার জন্য ব্যাকুল ছিল, সেই হৃদয় আজ প্রতিশোধ, ঘৃণা আর বেদনার আগুনে দাউদাউ করে জ্বলছে।

তার মনে হলো, চরিত্রহীন জীবনসঙ্গিনীর সঙ্গে প্রতিনিয়ত দহন নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে নিঃসঙ্গ জীবন অনেক শ্রেয়। অন্তত সেখানে বিশ্বাসভঙ্গের বিষাক্ত দংশন থাকবে না, থাকবে না প্রতারণার শ্বাসরোধী যন্ত্রণা।

সে ঢুকে গেল ক্লাবের সবচেয়ে গোপন কক্ষে। সেখান থেকে পাটের বস্তা খুলে বের করল চকচকে এক রামদা। হাত দিয়ে রামদাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখল। বেশ ধারালো। সে কখনো ভাবেনিও নিজের শখের নারীকে এভাবে হত্যা করতে তার হাতে রামদা নিতে হবে। কিন্তু আজ সকল বিশ্বাসের মৃত্যু হয়েছে। নারীটিও আর শখের নেই। তাকে ভালোবেসে সে যেই ভুল করেছিল। সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্তবোধ করবে তাকে হত্যা করে। সঙ্গে তার পরকিয়া প্রেমিককেও। আজ দুই দুটো লাশ পড়বে তার হাতে। হ্যাঁ, দুই দুটো লাশ। রক্তের বন্যা বইবে।

#(চলমান~)

#লামইয়া_তাসনিম

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন