ফন্ট সাইজ:
থিম:
বর্ষা হিমেলের প্রেমের ছোঁয়া

পর্ব 3

লেখক: শিমলা সিমু

বর্ষা হিমেলের প্রেমের ছোঁয়া

পর্ব: ৩

আরও একটি বর্ষার সকালের সূচনা হলো। গত রাতের তুমুল ঝড়ে চারপাশটা এলোমেলো হয়ে আছে। উঠানে ছড়িয়ে আছে ভাঙা ডালপালা আর ভেজা পাতা।

ঘুমের মধ্যেই মানুষের কথাবার্তার গুঞ্জন শুনে ছোঁয়ার ঘুম ভেঙে গেল। ঘুমজড়ানো চোখে জানালাটা খুলে পর্দার আড়াল থেকে তাকাতেই একটু অবাক হলো। ওদের বাড়ির উঠানজুড়ে অনেক মানুষের ভিড়।

কিছু কথাবার্তা কানে আসতেই বুঝতে পারল, কালকের ঝড়ে গ্রামের অনেক মানুষের ক্ষতি হয়েছে। সেইসব খবর জানাতেই ছোঁয়ার বাবা হাফিজুল ইসলামের কাছে এসেছে তারা।

সবার কথা শোনার পর মাতব্বর হাফিজুল ইসলাম বললেন,

— তোমাগো সবার কথাই আমি মন দিয়া শুনলাম। মেলা ক্ষতি হইছে সবার, হেইডা আমি বুজতাছি। কিন্তু এইসব কাম তো আর আমার একার পক্ষে করা সম্ভব না। আমি ট্যাহা দিয়া যতটুকু পারি সাহায্য করমু। আর বাকি কামগুলা তোমাগো সবাইরে একজোট হইয়া করতে হইবো। তাইলে আইজ থেইক্যাই কামে লাইগা পড়ো। ট্যাহার চিন্তা তোমাগো করতে হইবো না, আমি পাঠাইয়া দিমু। অহন তোমরা সবাই যাও, যার যার কামে লাইগা পড়ো।

সবাই চলে যেতেই ছোঁয়া দেখল, তাদের বাড়ির উঠানের আমগাছটার নিচে হিমেল দাঁড়িয়ে সবার কথা মন দিয়ে শুনছিল।

ছোঁয়া দরজার এপাশ থেকেই একটু জোরে ডাক দিল,

— ও হিমেল ভাই, একটু শুইনা যাও।

হঠাৎ ছোঁয়ার কণ্ঠ কানে আসতেই হিমেলের হৃদস্পন্দন আগের চেয়ে একটু বেড়ে গেল। হিমেল এগিয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়াল।

— কেমন আছো, হিমেল ভাই? বাড়ির অবস্থা কেমন? চাচি, দাদি ভালো আছে তো?

— হ, আম্মা আর দাদি ভালোই আছে। তবে আমি বেশি ভালো নাই। আমাদের তেমন কোনো ক্ষতি না হইলেও, মেলা মানুষের ঘরদোর ভাঙছে।

একটু চুপ থেকে হিমেল বলল,

— তুমি ভালো আছো, ছোঁয়া? কাল রাইতে তোমার লিগা মেলা চিন্তা হইতাছিলো আমার।

কথাটা বলেই হিমেল একটু আড়চোখে ছোঁয়াকে দেখার চেষ্টা করল। কিন্তু দেখার চেষ্টা বৃথা—তাই চোখ ফিরিয়ে নিল।

তবে হঠাৎ মাটির দিকে চোখ পড়তেই সকালের নরম আলোয় ভেসে উঠল একটি মেয়েলি ছায়া। ছায়াটুকু দেখেই হিমেল বুঝে গেল—এটা ছোঁয়ার ছায়া। মুগ্ধ দৃষ্টিতে সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল সেদিকে।

ছোঁয়ার কয়েকগাছি চুল বারবার বাতাসে উড়ে এসে মুখের ওপর পড়ছিল। আর সেই অবাধ্য চুলগুলো যত্ন করে কানের পেছনে গুঁজে দিচ্ছিল সে। দৃশ্যটা দেখে হিমেলের চোখ যেন সেখানেই আটকে গেল।

ছোঁয়া কিছু বলতেই যাবে, তার আগেই হিমেল বলল,

— আমি এহন যাই, সবার লগে কাম করতে হইবো।

ছোঁয়া তার ফিনফিনে গোলাপি অধরে মৃদু হাসি রেখে বলল,

— আইচ্ছা, যাও। বিকালে তোমাগো বাড়ি যামু। তুমি থাকবা তো, হিমেল ভাই?

— চেষ্টা করমু। তুমি আইসো।

বলেই হিমেল তার ড্রাম পেটানো হৃদস্পন্দন নিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করল।

----------

বিকেলবেলা ছোঁয়া ওর মা তাসলিমা বেগমকে বলল,

— ও আম্মা, আমি একটু বাইরে যামু।

— কোই যাবি এহন?

— হিমেল ভাইগো বাড়িতে যামু, আম্মা।

— তাড়াতাড়ি ফিরিস। আকাশের অবস্থা কিন্তু বেশি ভালা না।

— আইচ্ছা।

বলেই ছোঁয়া বাড়ি থেকে বের হয়ে হিমেলদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো।

ছোঁয়া হিমেলদের বাড়িতে এসে দেখল, হিমেল বাড়িতে নেই।

হিমেলের দাদি বারান্দার চৌকিতে শুয়ে আছে আর ওর মা সেলাই মেশিনে কাজ করছে। ছোঁয়া হিমেলের মায়ের দিকে এগিয়ে গেল।

— কেমন আছেন, চাচি?

— ভালা আছি মা, তুমি কেমন আছো?

— জি, আমিও ভালো আছি।

চারপাশটা একবার দেখে ছোঁয়া একটু ইতস্তত করে বলল,

— আপনাকে একটা কথা জিগাই, চাচি।

রাবেয়া বেগম মুখে হাসি রেখে বললেন,

— আইচ্ছা, জিগাইবা পরে। তার আগে এহানে আইসা বহো দেহি।

ছোঁয়া এগিয়ে গিয়ে একটি টুলের ওপর বসল।

হিমেলের মা মেশিন থেকে উঠে ঘরে গিয়ে তালপাতার একটা হাতপাখা আর কয়েকটা নারকেল নাড়ু একটা বাটিতে করে নিয়ে এসে ছোঁয়ার সামনে বসে বললেন,

— নেও মা, কয়ডা নাড়ু। খাইয়া দেহ তো, কেমন হইছে!

ছোঁয়া একটা নাড়ু হাতে নিয়ে হিজাবের নিচ দিয়ে খেতে বসলে হিমেলের মা বললেন,

— আরে, মুখখান খোলো দেহি। কেউ নাই আমাগো বাড়িতে। হিমেল করিমগো বাড়ি গেছে হাঁসের ডিম আননের লিগা।

ছোঁয়া আর কিছু বলল না। একটু বিব্রত হলেও হিমেলের মাকে সে পছন্দ করে, যার কারণে মুখ থেকে নিকাবটা খুলল।

মুখ খুলতেই রাবেয়া বেগম মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলেন ছোঁয়াকে।

কী মায়াবী মুখ! ফর্সা মুখের সঙ্গে খাড়া নাক আর টানাটানা নীল চোখগুলো তো সবার থেকে আলাদা সুন্দর। গোলাপি ফিনফিনে অধরের নিচে ঠিক মাঝ বরাবর একটা কালো কুচকুচে তিল, তার ওপর হাসলে দুই পাশেই কেমন গর্ত হয়ে যায়।

রাবেয়া বেগম ছোঁয়ার দিকে চোখ রেখেই একটু জোরে করে বলে উঠলেন,

— মাশাআল্লাহ, কারও নজর না লাগুক গো!

রাবেয়া বেগমের কথাটা শুনে ছোঁয়া একটু লজ্জা পেল। আর সেই লজ্জায় যেন তার সৌন্দর্য দ্বিগুণ বেড়ে গেল।

ছোঁয়া নাড়ুটা মুখে দিয়ে বলল,

— চাচি, নারকেলের নাড়ুটা বেশ ভালো হইছে। এই বছরে প্রথম খাইলাম। প্রতিবার নানি পাঠায়া দেয় আমার লিগা, তবে এইবার আর বানায় নাই।

হিমেলের মা টুলটা আরও একটু সরিয়ে নিয়ে বললেন,

— এবার কও তো মা, কী জানবার চাও তুমি?

ছোঁয়া একটা শুকনো ঢোক গিলে ইতস্তত করে বলল,

— আইচ্ছা, চাচি, হিমেল ভাই কি পড়াশোনা শেষ কইরা শহরে যাইব গা?

রাবেয়া বেগম একটু অবাক হয়ে বললেন,

— হঠাৎ এই কথা ক্যান জিগাস মা?

ছোঁয়া তাড়াতাড়ি বলল,

— না মানে এমনি... জিগাইলাম।

রাবেয়া বেগম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মৃদু হেসে বললেন,

— হিমেলের পড়ালেহা শেষ হইলে তো ওরে ভালো একটা কামকাজ করতে হইব। আমার তো মেলা দিনের স্বপ্ন, আমার হিমেল একদিন মস্ত বড় ডাক্তার হইব। ছোটবেলা থিকাই পোলাডারে এই স্বপ্ন দেখাইছি। আল্লাহ যদি কপালে রাহে, তাইলে শহরে গিয়া আরও পড়ালেহা কইরা ডাক্তার হইবো।

একটু থেমে আবার বললেন,

— এহন তো আগে মেট্রিকটা পাশ করুক। তারপর আল্লাহ যেদিকে নিয়া যায়, সেদিকেই যাইব। আমার শুধু একটাই চাওয়া, আমার পোলাডা যেন মানুষের মতো মানুষ হয়।

ছোঁয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। রাবেয়া বেগমের কথাগুলো যেন তার মনে কেমন একটা ভাবনা জাগিয়ে দিল। একটু পর ধীরে ধীরে বলল,

— আইচ্ছা, চাচি, হিমেল ভাই যদি শহরে গিয়া লেখাপড়া করে, তাইলে তো অনেক দিন ওখানেই থাকতে হইব, তাই না?

রাবেয়া বেগম হেসে বললেন,

— হ মা, ডাক্তার হইতে গেলে তো কম পড়ালেহা করলেই হয় না। অনেক বছর পড়তে হইব।

ছোঁয়া আর কিছু বলল না। কিছুক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে থেকে আস্তে করে বলল,

— তাইলে তো হিমেল ভাই একদিন আমাগো থিকা অনেক দূরে চইলা যাইব...

কথাটা বলেই ছোঁয়া চুপ করে গেল। নিজের অজান্তেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভার হয়ে এলো।

ছোঁয়ার শেষের কথাটা ঠিক রাবেয়া বেগম শুনতে পেলেন না। বিধায় জিজ্ঞেস করতে যাবেন, তার মধ্যেই বাড়ির বাইরে থেকে হিমেলের কণ্ঠ কানে এলো,

— আম্মা, ও আম্মা, কই তুমি? দেহো তো কালুতি কই চইলা গেছিলো। সেই নদীর পারের দিকে। আমি না দেখলেই তো শিয়ালে টাইনা নিতো।

বাড়ির ভিতরে ঢুকেই ডানে-বামে না তাকিয়েই হাতে থাকা কালো ছাগলের বাচ্চাটার গলার ফিতার সঙ্গে দড়ি বাঁধতে লাগল। এই মেয়ে ছাগলটার নাম অবশ্য রাবেয়া বেগম নিজেই রেখেছেন—কালুতি।

বাঁধা শেষ হতেই পিছন ফিরে সামনের দিকে তাকাতেই দেখল, তার মায়ের পাশে কালো বোরকা পরা একটা মেয়ে মুখে নিকাব আটকাচ্ছে তাড়াহুড়ো করে। কয়েক পলক তাকিয়েই বুঝল, মেয়েটা ছোঁয়া।

মনে মনে ভাবল, হ্যাঁ, ছোঁয়া তো সকালে কইছিলো, বিকালে আমাগো বাড়িতে আইবো। সত্যিই আইছে।

আইচ্ছা, এতক্ষণ কি ছোঁয়া মুখ খোলা রাখছিল? কেমন দেহা যাইতাছিল ওরে!

নিজের মনেই এসব ভাবছে হিমেল। মায়ের কণ্ঠ কানে যেতেই সব ভাবনার ছেদ ঘটল।

— কী কও এহন! আমি না এইমাত্র দেখলাম, এইহানে আমের পাতা খাইতেছিল। এত শিগগিরই নদীর পারে চইলা গেল কেমনে?

একটু থেমে আবারও বলল,

— আইচ্ছা, থাক। হেই কথা বাদ দে বাপ। এইহানে আয়—দেহ, কে আইছে আমাগো বাড়িতে!

হিমেল বারান্দায় উঠে দাদির চৌকির পাশে গিয়ে বসল। কমেলা ভানু তখন চৌকিতে শুয়ে ছিলেন।

আজ কেন যেন হিমেলের চোখে ছোঁয়াকে অন্য দিনের তুলনায় একটু বেশিই সুন্দর লাগছে। একপলক দেখেই মন ভরে গেল, অথচ পরনে তো সেই প্রতিদিনের বোরকাই। নতুন কিছু পরেনি, সাজেও তেমন কোনো পরিবর্তন নেই। তবুও আজ তার চোখে ছোঁয়াকে এতটা আলাদা লাগছে কেন?

হিমেল নিজেই নিজের মনে প্রশ্ন করল,

“কী এমন বদলেছে আজ? ছোঁয়া তো প্রতিদিনের মতোই আছে। তাহলে আমার চোখে আজ ওকে এত সুন্দর লাগছে কেন?”

প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই হিমেলের দৃষ্টি গিয়ে থামল ছোঁয়ার চোখে।

আজ প্রতিদিনের তুলনায় একটু গাঢ় করে কাজল টেনেছে সে। হিমেল কিছুক্ষণ সেদিকেই তাকিয়ে রইল। তাহলে কি এই গাঢ় কাজলের জন্যই আজ ছোঁয়াকে এতটা সুন্দর লাগছে? নাকি গাঢ় কাজলের আড়ালে নীল চোখজোড়াই আজ একটু বেশিই সুন্দর হয়ে উঠেছে?

ছোঁয়ার এইটুকু সৌন্দর্য দেখেই হিমেলের দৃষ্টি যেন চিরদিনের মতো থেমে গেল।

ছোঁয়া হিমেলের দিকে তাকাতেই হিমেলের ধ্যান ভেঙে গেল।

ছোঁয়া হাতের বাটিটা হিমেলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,

— নাড়ু খাও।

হিমেল মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

— তুমি খাও। আমি তো খাইছি।

এভাবেই দুজনের মধ্যে আরও দু-একটা কথা চলছিল। এরই মাঝে রাবেয়া বেগম এগিয়ে এসে বললেন,

— ছোঁয়া মা, আহো, কয়ডা ভাত খাইয়া যাও। দুপুরে লাউ দিয়া শোল মাছ রাইন্ধছি।

ছোঁয়া একটু ইতস্তত করে বলল,

— না চাচি, ভাত খামু না। দেরি হইয়া যাইবো গা। আম্মায় তাড়াতাড়ি বাড়ি যাইবার কইছে।

রাবেয়া বেগম আবারও খাওয়ার জন্য বললেন। কিন্তু ছোঁয়া এবারও বিনয়ের সঙ্গে বলল,

— না চাচি, সত্যিই দেরি হইয়া গেছে। অহন খামু না। কিছু মনে কইরেন না। অন্যদিন আইসা খামু।

ছোঁয়া হাতের বাটিটা পাশের টুলের ওপর রেখে পানির গ্লাসটা হাতে নিল। দু-এক ঢোক পানি খেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

— তাইলে অহন যাই, চাচি।

রাবেয়া বেগম তখন একটা টিফিনের বাটি ছোঁয়ার হাতে দিয়ে বললেন,

— ভাত তো খাইলা না, এইডা নিয়া যাও। হেইখানে কয়ডা নাড়ু আর মুড়ির মোয়া আছে। তোমার আব্বা-আম্মার লগে বইসা খাইও।

ছোঁয়া মুচকি হেসে বাটিটা হাতে নিল।

রাবেয়া বেগম এবার হিমেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,

— ও হিমেল, মাইয়াডারে বাড়ি পান্ত আগাইয়া দিয়া আয় বাপ।

ছোঁয়া হিমেলের মা আর দাদির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। হিমেলও মায়ের কথামতো তার পেছন পেছন বেরিয়ে গেল।

---------

পড়ন্ত বিকেলের নরম রোদটা ধীরে ধীরে মাটির ওপর থেকে সরে যাচ্ছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা কুসুমের মতো লাল হয়ে আছে, কিন্তু কোনো তেজ নেই—মনে হচ্ছে যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। হালকা বাতাসে গাছের পাতাগুলো দুলছে। পাখিরা দল বেঁধে আপন নীড়ে ফিরছে। চারপাশের শান্ত পরিবেশে বিকেলটাও ধীরে ধীরে সন্ধ্যার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

তারই মাঝে কাঁচা রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছে হিমেল আর ছোঁয়া। রাস্তার দুপাশে বিস্তীর্ণ ধানখেত। ধানের শীষের ওপর আলতো করে হাত বুলিয়ে হাঁটছে ছোঁয়া।

সামনে বেশ কিছু গাছগাছালি চোখে পড়তেই হঠাৎ হিমেল বলল,

— কাঁচা আম খাইবা, ছোঁয়া?

ছোঁয়া অবাক হয়ে বলল,

— কাঁচা আম এহন কই থেইকা পাবা, হিমেল ভাই?

হিমেল হাতের ইশারায় সামনের একটা আমগাছ দেখিয়ে বলল,

— ওই দেহো, লতিফ চাচাগো গাছ। বারোমাসি আম। খাইবা তুমি?

ছোঁয়া একটু ইতস্তত করে বলল,

— না জিগায়া পাড়লে চাচা কিছু কইবো না?

হিমেল হেসে বলল,

— না। চাচা আমাগো মেলা দিন আগেই পাড়ি খাইতে কইছে। আমি কইছি পরে খামু। তুমি যদি এহন খাইবার চাও, তাইলে পাড়মু।

ছোঁয়ার মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল।

— ওহ আইচ্ছা, তাইলে পাড়াই দেও। খামু।

ছোঁয়ার কথা শেষ হতে না হতেই হিমেল গাছের দিকে এগিয়ে গেল।

হিমেলের পরনে কালো রঙের শার্ট আর সাদা লুঙ্গি। গাছে ওঠার সুবিধার জন্য লুঙ্গিটা নিচ থেকে একটু তুলে মাঝ বরাবর গিঁট দিয়ে নিল। তারপর মুহূর্তের মধ্যেই গাছে উঠে পড়ল।

দেখে মনে হলো, ছোঁয়ার আম খাওয়ার কথা বলতে যতটুকু সময় লাগল, হিমেলের গাছে উঠতে তার চেয়েও কম সময় লাগল।

গাছটা বেশ বড়। আমগুলোও ডালের অনেকটা ভেতরের দিকে থাকায় হাত বাড়িয়ে পাড়তে একটু সময় লাগল। কিছুক্ষণ পর একে একে আম পেড়ে নিচে নামল হিমেল।

ছোঁয়া আমগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,

— কয়ডা পারছো হিমেল ভাই ?

হিমেল গুনতে শুরু করল,

— এক, দুই, তিন, চার... এই তো মোট বারো খান!

ছোঁয়া হিমেলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

— তুমি কয়ডা নিবা, হিমেল ভাই?

হিমেল মাথা নেড়ে বলল,

— একটাও না। সব তোমার লিগাই পারছি।

ছোঁয়ার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

ছোঁয়া আমগুলো হাতে নিতে গেলে হিমেল তাড়াতাড়ি বলল,

— তুমি ধইরো না । হাতে কস লাগব। আমের কস হাতে লাগলে চুলকাইবো কিন্তু।

— খাড়াও আমি নিতাছি।

আমগুলোর ডাঁটি একটু বড় করে পাড়া হয়েছিল। তাই ধরতে সুবিধাই হলো।

হিমেল আমগুলো হাতে নিয়ে আবার ছোঁয়ার পাশে হাঁটতে শুরু করল।

কিছুদূর যাওয়ার পর ছোঁয়া বলল,

— তাইলে কাল বিকালবেলায় আমার ঘরের পিছনের জানালার কাছে আইসো। তোমার লিগা আমের ভর্তা রাখমু। নিয়্যা যাইও।

হিমেল মৃদু হেসে বলল,

— তাই? আইচ্ছা, নিয়া আমুনি।

তারপর একটু সামনে এগিয়ে বলল,

— এহন বাড়ি চলো। আরেকটু পর দিনের আলো চইলা যাইবো গা।

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে চলল।

একসময় ছোঁয়াদের বাড়ির সামনে এসে হিমেল দাঁড়াল। ছোঁয়ার হাতে আমগুলো তুলে দিতে গিয়ে আচমকাই দুজনের হাত এক মুহূর্তের জন্য স্পর্শ হয়ে গেল।

দুজনেই যেন হঠাৎ থমকে গেল।

হিমেলের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। সে অপ্রস্তুত হয়ে, জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে শুকনো ঢোক গিলে বলল,

— আমি তাইলে যাই। কালক্য দেহা হইবো।

ছোঁয়াও মাথা নিচু করে আস্তে বলল,

— আইচ্ছা, যাও।

হিমেল ঘুরে হাঁটতে শুরু করল।

ছোঁয়া সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। হিমেল যতই দূরে এগিয়ে যেতে লাগল, ছোঁয়ার চোখও ততই তার পিছু নিল। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠেছে, ছোঁয়া নিজেও বুঝতে পারল না।

হঠাৎ নিজের এমন আচরণ টের পেয়ে লজ্জায় মুখটা নিচু করে ফেলল।

চলবে...........।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 3 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন