#কে_বাঁশি_বাজায়_রে
#Methuburi_মিথুবুড়ি
#পর্ব_০২
ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর জেনেও একদল পুরুষ একে অমৃতের মতো পান করে। রণয়ও তাদের থেকে ব্যতিক্রম নয়। সিগারেটের সাথে তার সম্পর্কটা মৌলিক চাহিদার মতোই নিয়মিত। দিনে এক-দুই প্যাকেট সিগারেট উড়িয়ে দেওয়াটা তার নিত্যদিনের অভ্যাস। তবে তার এই বদভ্যাসের কথা খুব কম মানুষই জানে। প্রকাশ্যে রণয় কখনো ঠোঁটের ডগায় সিগারেট ছোঁয়ায় না।
আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। অভ্যাসবশত সেই অমৃত সুধা পানের জন্য রণয় ক্যাম্পাসের পেছনের নির্জন দিকটায় চলে আসে। এই সময়টায় ওই পাশটা ফাঁকাই থাকে। আর সেই সুযোগের সৎ ব্যবহার করতেই সেখানে আসা।
ক্যাম্পাসের পেছনের নির্জনতায় দাঁড়িয়ে নিকোটিনের ধোঁয়া ওড়াচ্ছিল রণয়। ধূমপান ক্ষতিকর হলেও, ধূমপানরত একজন পুরুষের মধ্যে অন্যরকম আকর্ষণীয় রহস্য ফুটে ওঠে। যখন কেউ দুই আঙুলের ফাঁকে সিগারেট চেপে ধরে, তারপর ঠোঁট দিয়ে ধোঁয়া টেনে শূন্যে উড়িয়ে দেওয়ার ভঙ্গি করে; তখন দূর থেকে দেখলে মনে হয় কোনো চলচ্চিত্রের নায়ক দাঁড়িয়ে। আর যদি রণয়ের মতো দীর্ঘকায়, সুগঠিত দেহের অধিকারীর ক্ষেত্রে এই আকর্ষণ তো দ্বিগুণের চেয়েও বেশি।
সিগারেটের শেষ অংশটুকু ফেলে দিয়ে রণয় ঘুরে কলাভবনের দিকে পা বাড়াচ্ছিল। ওই মুহুর্তে হঠাৎ কারও ফোঁপানোর শব্দে থমকে দাঁড়ায় সে। কেউ কাঁদছে। অত্যন্ত আড়ালে, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে।
কৌতূহলী চোখ চারপাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলাতেই নজরে এলো দৃশ্যটি। বিশালাকৃতির একটি বটগাছের নিচে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে কাঁদছে এক তরুণী। ভেজা শরীরে জড়িয়ে থাকা পোশাক ঢাকা পড়েছে তার হাঁটু ছাড়ানো লম্বা চুলে। পিঠ গড়িয়ে ঘন কালো চুল মাটি স্পর্শ করেছে, ভোরের ঝরে পড়া শিউলি ফুলের মতো বিছিয়ে পড়েছে মাটিতে। হেঁচকি তুলে কান্নার প্রতিটি ধাক্কায় ঝাঁকুনি খাচ্ছে তার নাজুক শরীরটি। এক ফাঁকে কাঁধ থেকে চুল একপাশে সরে যেতেই অনাবৃত হয়ে উঠল তার ফর্সা পিঠ। রণয় তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।
নিজের দৃষ্টি সংযত করে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল রণয়। মুখের ভাবান্তরহীন রেখায় গা থেকে খুলে ফেলল ডেনিম জ্যাকেটটি। কী ঘটেছে সে জানে না, কিন্তু ভেজা ও অসহায় মেয়েটিকে দেখে তার ভেতর থেকে জেগে ওঠা বিবেক তাকে তা করতে বাধ্য করে। জ্যাকেট খুলে ঘুরে দাঁড়িয়ে অপরিচিত মেয়েটির সে যে-ই দিকে জ্যাকেটটি ছুঁড়ে দেবে, ওমনি ঘটে গেল এক আকস্মিক ঘটনা!
ছোট্ট একটি ইটের টুকরো এসে আঘাত হানল রণয়ের কপালে। আঘাত সামান্য হলেও চামড়া ফেটে রক্ত ভেসে উঠল ভ্রুর ওপরের অংশে। তৎক্ষনাৎ সংক্রিয়ভাবে রণয়ের হাতের মুঠো বজ্রের মতো শক্ত হয়ে গেল।
রণয়ের সামনে এই মুহূর্তে অগ্নিকন্যারূপে দাঁড়িয়ে আছে স্নেহা। ক্রন্দনরত সেই মেয়েটি অন্য কেউ নয়, স্নেহাই ছিল। এতক্ষণের ভঙ্গুর কান্না নিমেষেই উবে গিয়ে স্নেহার চোখে এখন জমাট বেঁধেছে তীব্র ক্ষোভ। ফোলা ফোলা লাল চোখ দুটো অসম্ভব শক্ত দৃষ্টিতে বিঁধে আছে রণয়ের পানে।
কান্নারুদ্ধ গলায় চিৎকার করে উঠল স্নেহা,"সবটা আপনার জন্য হয়েছে!"
রণয়ের চোয়াল এতটাই শক্ত হয়ে উঠল যে দাঁতে দাঁত পিষে ওঠার কর্কশ ধ্বনিত হলো। মুঠো এমন শক্ত করে চেপে ধরেছে যে গৌরবর্ণ ত্বকের নিচে নীলচে রগগুলো টনটন করে ফুলে উঠেছে। তাদের দ্বিতীয় সাক্ষাতে আবারও ফিরে এলো সেই একই তীব্র, কট্টর আর দমবন্ধ করা উত্তপ্ত আবহ।
স্নেহা তেড়েফুঁড়ে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, তখন ঝড়ের বেগে কোত্থেকে আরেকটা মেয়ে ছুটে এসে উত্তেজিত স্নেহার মুখ চেপে ধরল। তারপর অনুনয়ের সুরে রণয়ের উদ্দেশ্যে বলল,
"সরি ভাইয়া, কিছু মনে করবেন না... ও একদম নতুন তো, তাই আপনাকে চিনতে পারেনি।"
রণয়ের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা না করে পূর্বের সেই ঝড়ো বেগেই স্নেহাকে টেনে-হিঁচড়ে সরিয়ে নিয়ে গেল মেয়েটি।
রণয় সটান সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। ধূসর চোখের চোখের তারায় বিস্ফোরিত রাগ। শক্ত দুই হাতের মুঠো দিয়ে যেন ধুলোবালি পিষে ছারখার করে দেবে। কপালের শিরা-উপশিরাগুলোও ততক্ষণে ভয়ংকর রূপধারণ করে ফুলে উঠেছে। এবার শুধু ভেতরের সবটুকু ক্ষোভ ফেটে পড়ার অপেক্ষায়! অনড় চিবুক উঁচিয়ে সে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল স্নেহার দূর হয়ে যাওয়া পথের পানে।
_______
ভার্সিটির পেছনে টেনে আনতেই স্নেহা নিজের সর্বশক্তি দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। দু’হাতে হাঁটুতে ভর দিয়ে হাঁপাতে থাকে সে। আর একটু হলেই দম বাবাজি নির্ঘাত টাটা মেরে বিদায় নিত!
"নিঃশ্বাস আটকে মেরে ফেলতে চাস নাকি? ফালতু মেয়ে!"
তিবাকে একপ্রকার ঝাড়ি মেরেই পাশের বড় গাছটার তলায় বসে পড়ল স্নেহা। ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে স্নেহার পাশে গা ঘেঁষে বসল তিবা। তারপর ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে সযত্ন মুছে দিতে লাগল স্নেহার ভেজা মুখ। তিবা সবসময় ব্যাগে একটা এক্সট্রা ওড়না রাখে। সেটি বের করে স্নেহার গায়ে জড়িয়ে দিতে দিতে শান্ত গলায় তিবা বলল,
"সবসময় এমন শর্ট-টেম্পারড হয়ে চললে হবে বল? ভার্সিটিতে আসার দ্বিতীয় দিনেই সিনিয়রদের সাথে ক্যাচাল শুরু করে দিলি!"
স্নেহা সাথে সাথে তেতে উঠল, "আমি ঝামেলা শুরু করেছি? আর ওই লোকটার জন্য যে মেয়েটা আমার গায়ে পানি ঢেলে দিল, আমাকে এতগুলো মানুষের সামনে হ্যারাস হতে হলো সেটার কী, হাহ্?"
তিবা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, "আহা! তুই বুঝতে পারছিস না... পাবলিক ভার্সিটিতে এমন একটু-আধটু হয়ই। এত হাইপার হলে চলে? এখানে ‘জোর যার, মুলুক তার’! জানিস, কার সাথে লাগতে গিয়েছিলি তুই? তোকে গুম করে দিলে কেউ টেরও পাবে না!"
স্নেহা ঠোঁট বাঁকায়, "হুহ! সে কোন খানের মন্ত্রী শুনি?"
তিবা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে স্নেহার দিকে তাকাল। চোখেমুখে গম্ভীর ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,
"এখানকারই। অর্থমন্ত্রী রেদোয়ান তাজওয়ারের একমাত্র ছেলে ‘প্রান্তিক তাজওয়ার রণয়’। ভার্সিটির দলনেতা! লিডার, গ্রুপের হেড, টপার আর প্রচণ্ড ডেয়ারিং লোক। এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিস, সবসময় লোকটার পিছু পিছু অত চ্যালাপ্যালা ঘোরে কেন? গাঁধি কোথাকার!"
কথা শেষ করে স্নেহার মাথায় গাট্টা মারল তিবা। এতক্ষণে যেন স্নেহার চোখে সামান্য ভয়ের ছাপ নামতে শুরু করে। মনে পড়ে যায় ভাইয়ার বলা সতর্কবার্তা—‘উল্টাপাল্টা ঝামেলায় যাবি না একদম।’
তেজি স্নেহা এবার আমতা আমতা করে,"ত-তো আমি এক দিনেই বা এত কিছু জানব কী করে? শুধু দেখেছি... খুব লম্বা, তাকাতে গেলে ঘাড় তুলে কথা বলতে হয়! ব্যস, এইটুকুই!"
"ওনার কিন্তু আরও একটা পরিচয় আছে।" হঠাৎ করে লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে তিবা।
স্নেহা কপাল কুঁচকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাতেই তিবা ফিসফিস করে বলল, "চকলেট বয়!"
বলার সাথে সাথে লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিতে দু’হাতে মুখ ঢেকে ফেলে তিবা। স্নেহার মনে লোকটার ব্যাপারে হঠাৎ কৌতূহল উঁকি দিলেও, তিবার এমন ন্যাকামি দেখে চিবুক শক্ত হয়ে আসে। কিছুটা ঝাঁঝ দেখিয়েই বলে উঠল,
"তো খেয়ে ফেল না একবারে! এখানে বসে আছিস কেন? যা! গিয়ে একটু চেটেপুটে আয়! যত্তসব!"
তিবার মুখে সেই একই দুষ্টুমি ভরা হাসি, "আরে না! তোর ভাই থাকতে অন্য কেউ...." বলতে বলতেই নিজের জিভে নিজে কামড় বসাল তিবা।
স্নেহার ছোট ছোট চোখরেখা সন্দেহবাতিক হয়ে ঠিকরে পড়ে তিবার ওপর। তা দেখে তিবা বলদের মতো হিহি করে হেসে উঠল। হঠাৎ তাড়া দেখিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
"কী যে বলিস! এত তাড়াতাড়ি বুকিং হয়ে গেলে চলবে? আমার এই সুন্দরী পরীকে পাহারা দিতে হবে না? এক দিনেই তো তুই সবার সেন্টার অব অ্যাটেনশন হয়ে গেছিস! হুম হুম, দেখি তো কেমন করে তাকায় সবাই! কী জানি, প্রথম দিন আসিনি বলে কত কী মিস করে গেলাম! আর কাকে কাকে কী কী ঝলক দেখালি কে জানে!"
ন্যাঁকামি ভরা গলায় কথাগুলো বলতে বলতে সে স্নেহার হাত ধরে টানতে টানতে ক্যাম্পাসের দিকে হাঁটতে শুরু করে। বিপরীতে মুখ বাঁকায় স্নেহা।
____
হন্তদন্ত হয়ে ক্লাবঘরে প্রবেশ করে অনির্বাণ। তাদের এই ক্লাবে সাধারণ ছাত্রদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। তবে পাশে আরেকটি ক্লাব আছে, যেখানে যে কেউই আসতে পারে। এই ক্লাবটা রণয়ের সম্পূর্ণ নিজস্ব, যা সে নিজের ইচ্ছেমতো সাজিয়েছে। প্রায়সই সে এখানে সময় কাটায়, বন্ধুদের নিয়ে গান-বাজনা করে, গিটার বাজায়। রণয়ের গানের গলাও বেশ চমৎকার! আবার মাঝে মাঝে কিছু বদমাশকে এখানে এনে হালকা ডোজে হালুয়া বানিয়ে মজাও নেয়।
রাজনৈতিক জীবনের প্রথম হাতেখড়ি বাবার কাছে হলেও আসল সূচনা এই ক্লাবঘর থেকেই। এখানেই সে প্রথম নিজের রাজনৈতিক বৈঠকখানা গড়ে তুলেছিল, নিজ হাতে সাজিয়েছিল বিশাল কক্ষটি। নিজের পছন্দের জিনিসে কারও হস্তক্ষেপ পছন্দ নয় রণয়ের।
অনির্বাণ রাগান্বিত গলায় বলল, "কোন মেয়ে নাকি তোর কপালে আঘাত করেছে? তুই কিছু বললি না, এত সহজে ছেড়ে দিলি? আদিল, তোরা কী বা ল ফেলছিলি?"
আদিল ম্যাট্রেসে শুয়ে গেম খেলছিল। অনির্বাণের হঠাৎ চেঁচামেচিতে হকচকিয়ে ওঠে সে। কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে বিড়বিড় করল, "দে নাড়া, চিনি ছাড়া! আমি আবার কী করলাম? ভাই-ই তো কিছু করতে দিল না।"
অনির্বাণ আরও রেগে গিয়ে আদিলের ওপর চিল্লে উঠল,"কী বিড়বিড় করছিস?"
"আহ্! এত অল্পতেই যদি মাথা গরম করিস, তাহলে জটিল পরিস্থিতি সামলাবি কীভাবে?" বিরক্ত ভঙ্গিতে ল্যাপটপে চোখ রেখে টাইপ করতে করতে বলল রণয়।
অনির্বাণ ঘুরে দাঁড়িয়ে রণয়ের দিকে তাকিয়ে গলায় একটু রাগ মিশিয়ে বলল, "ধর্মে আমাদের পার্থক্য থাকলেও আত্মা তো এক। তুই আমার বেস্টফ্রেন্ড রণয়, তোর অপমান আমি সহ্য করতে পারি না। সেটা তুই খুব ভালো করেই জানিস।"
রণয় কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলেছিল, ঠিক তখনই ক্লাবে ঢোকে নিহাদ। রণয়ের মুখের কথা মাঝপথেই থেমে যায়। চোখ তুলে গম্ভীর গলায় নিহাদের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় সে,"যা বলেছিলাম, হয়েছে?"
নিহাদ মাথা নাড়ে, "হ্যাঁ ভাই, এ টু জেড।"
রণয় মাথা ঝাঁকাল, "শুরু কর।"
নিহাদ একবার চারপাশে চোখ বোলাল। সবাই উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। গলার খাঁকারি দিয়ে কণ্ঠনালী পরিষ্কার করে নিল নিহাদ। তারপর কণ্ঠে কৃত্রিম রোবটিক গাম্ভীর্য এনে বলতে শুরু করল,
"উহুম, হুম... বিসমিল্লাহ্!
মেয়েটির পুরো নাম স্নেহা তাফসি। ভার্সিটির ফ্রেশার। নরসিংদীর মেয়ে। স্কুল— আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়। হাইস্কুল—হাজী মোফাজ্জল হক স্কুল অ্যান্ড কলেজ। কলেজ—নরসিংদী কাদির মোল্লা সিটি কলেজ। রেজাল্ট সবসময় এ প্লাস। অত্যন্ত ট্যালেন্টেড, বৃত্তিও পেয়েছে।
বাবা একজন হাইস্কুল টিচার। দুই মাস হলো ট্রান্সফার হয়ে উত্তরা রাজউকে এসেছেন। একজন বড় ভাই আছে। স্নেহ তাফসির, পেশায় উকিল। বোনের জন্যই বেশিরভাগ কেসে লড়ে সে। যতটুকু জানতে পেরেছি, স্থানীয় চেয়ারম্যানের বখাটে ছেলে বহুদিন যাবৎ রাস্তায় মেয়েটিকে ডিস্টার্ব করত, এমনকি তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করেছিল। সেই মামলা এখনো চলছে।"
একটানে তথ্যগুলো বলে লম্বা একটা শ্বাস ছাড়ল নিহাদ। ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে রণয় খুব মনোযোগ দিয়ে শুনল নিহাদের প্রতিটা কথা। চোয়াল শক্ত, মুখে কোনো ভাবান্তর নেই তার, তবে চোখের কোণে ক্ষীণ আগ্রহের রেখা।
অনির্বাণ চেয়ার টেনে রণয়ের পাশে বসে । কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, "তুই আসলে কী করতে চাইছিস, রণয়?"
রণয় যেন তার অস্তিত্বই টের করল না। অনির্বাণকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে একচিলতে রহস্যময় হাসি ফুটাল মুখে। তারপর আদিলের দিকে তাকিয়ে রসিকতার ছলে বলল,
"আদিল, যা তোদের ভাবিকে নিয়ে আয়।"
ইঙ্গিতটা খুব সহজেই বুঝে ফেলে আদিল। সময় নষ্ট না করে ঠোঁটে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে গমগমে পায়ে ক্লাবঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল সে। আদিল বেরিয়ে যেতেই রণয় হুইলিং চেয়ারে মাথা হেলিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। তার ঠোঁটের কোণে ঝিলিক।
_____
"ভাই… ভাবি!"
আদিলের উল্লাসিত ডাকে সবাই একসঙ্গে পেছনে ফিরে তাকাল। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আছে আদিল, তার পাশে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে। মেয়েটার মুখভর্তি আতঙ্কের ছায়া। ভয়ে শরীর জমে গেছে। ওয়েস্টার্ন পোশাকে সজ্জিত মেয়েটিকে দেখলেই বোঝা যায় সে কোনো ধনী পরিবারের আদুরে ও কিছুটা বিগড়ে যাওয়া সন্তান।
মেয়েটাকে দেখে রণয়ের ঠোঁটের কোণায় ফুটে উঠল একচিলতে বাঁকা হাসি। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল এবং প্রসারিত হাসিতে দু’হাত ছড়িয়ে গলা উঁচিয়ে বলে ডাকল,
"কাম বেবি, কাম! আই ওয়াজ ওয়েটিং ফর ইউ সো লং।"
রণয়ের ভয়ানক হাস্কি কণ্ঠে ভয়ে শিউরে উঠে মেয়েটি আদিলের পিছনে লুকিয়ে পড়ল। তা দেখে আদিল বিটলামির সুরে হেসে বলে উঠল, “উফফ ভাবি, ভয় পাচ্ছেন কেন? ভাই আমার তো আজ পুরো মুডে আছে!”
সে সরে গেল মেয়েটার সামনে থেকে। তারপর ভেতরে গিয়ে বসতেই পেছন থেকে নিহাদ গাট্টা বসিয়ে দিল আদিলের মাথায়। আদিল কপাল চেপে ধরে চোখ গরম করে নিহাদের দিকা তাকাই। নিহাদ আদিলের মাথার জন্য দেখতে পাচ্ছিল না। ক্লাবঘরে উপস্থিত সকলে হয়ে গেল নীরব দর্শক। চারপাশ অস্বস্তি আর কৌতূহলে মিশে একাকার!
রণয় হেঁটে এগিয়ে গেল মেয়েটির দিকে। তার হাত ধরে বলল,"কাম উইথ মি, হানি… ওই কর্নারে চলো, ওখানে বেশি কম্ফোর্ট পাবে।"
সে মেয়েটিকে টেনে নিয়ে গেল বড়ো একটি টেবিলের কাছে। টেবিলের ওপর সাজানো জিনিসপত্র ধীরে ধীরে সরিয়ে ফেলতে লাগল, যেন মেয়েটিকে ভয় পাওয়ার যথেষ্ট সময় দিচ্ছে আর সেই ভয় বেশ উপভোগ করছে সে। মেয়েটির হাত-পায়ের কাঁপুনি আর ঢোক গেলার শব্দ....সবই টের পাচ্ছিল রণয়। হঠাৎ রণয় ঘাড় বাঁকিয়ে বলে উঠল,
"অল ডান। উঠে পড়ো এখানে, হানি। ওহ, তোমার নামটা যেন কী ছিল? আইস, লুক হাউ ইরেস্পন্সিবল আই অ্যাম! গার্লফ্রেন্ডের নামই জানি না! ডোন্ট মাইন্ড, বেবি… লেট মি হেল্প ইউ।"
রণয় হাত বাড়িয়ে মেয়েটিকে ধরতে গেলে সে আতঙ্কে ছিটকে দূরে সরে গেল। কাঁপতে কাঁপতে ঢোক গিলে বলে উঠল,
"উ-উ-উর্ফি… উর্ফি, আ-আমার নাম।"
রণয় ঠোঁট কামড়ে বিশ্রী ভঙ্গিতে হাসল,"আই লাইক ইট। সো লেটস স্টার্ট, উর্ফি। আই’ম অন মুড…!"
রণয়ের ঠোঁটে পূর্বের সেই বাঁকা হাসি। হিংস্র শিকারির মতো সে এগিয়ে গেল উর্ফিকে জাপটে ধরতে। ভয়ে বিদীর্ণ হয়ে কান্নায় ফেটে পড়ল উর্ফি। রণয় থেমে গেল। তার ঠোঁটে পুরোনো স্মার্ক, মুখেও অবুঝের অভিনয়,
"হোয়াই? হোয়াটস রং, উর্ফি? কী, ওদের নিয়ে সমস্যা হচ্ছে? আরে বাবা, লজ্জা পেও না। এরা ভীষণ বিশ্বস্ত। আমার সব বিপদে-আপদে এরা সাথে থাকে। তো সুখের সময় ভাগ না করলে কেমন দেখায় বলো? আমার গার্লফ্রেন্ড মানে তো ওদেরও… তুমি শুধু মোমেন্টসটা এনজয় করো। কাম বেবি!"
রণয় আবারও এগিয়ে গেলে চিৎকার করে দু’হাতে নিজেকে আগলে নিল উর্ফি। ভয়ে পিছিয়ে ফ্লোরে বসে পড়ে সে গুমরে কাঁদতে লাগল। রণয় নিম্ন অধর কামড়ে ক্রূর হাসল। হেসে ধীরে ধীরে উর্ফির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। মুহূর্তেই বদলে গেল তার মুখের অভিব্যক্তি। কণ্ঠস্বর হয়ে উঠল কঠিন ও ধারালো। উর্ফিকে কাঁপিয়ে দিয়ে সে প্রতিটি শব্দ এক এক করে উচ্চারণ করে,
"ভয় পাচ্ছো? লজ্জা লাগছে? খুব লাগছে? নিজের ইজ্জত তো অনেক দামি, তাই না? আর অন্যেরটা? সেটা কি রাস্তায় পড়ে থাকা কোনো খেলনা?"
ঘরজুড়ে রণয়ের চিৎকার গমগম করে উঠল। অনির্বাণ এগিয়ে আসতে চাইলে এক হাত তুলে ইশারায় তাকে থামিয়ে দিল রণয়।
"তোমরা মেয়ে জাত… নিজেরাই নিজেদের সবচেয়ে বড় শত্রু। গিঁটে গিঁটে হিংসা, ঈর্ষা! একজন মেয়ের গায়ে ভরা ক্যাম্পাসে পানি ঢেলে দিতে একটুও হাত কাঁপল না? স্পিক আপ,বিচ! আমার ক্যাম্পাসে রেগিং দেওয়ার সাহস কোথা থেকে পেলি? চালাকি? তাও আবার আমার সাথে? আমাকে এখনো চেনা হয়নি… বাট ইটস ওকে, চিনিয়ে দেব আমি। তবে সে চেনা হবে ভয়ংকর— ডার্ক নাইটমেয়ারের মতো ভয়ংকর।"
শেষ কথাগুলো রণয় দাঁতে দাঁত চেপে উচ্চারণ করল। রণয় উঠে দাঁড়াল। ক্রোধে চোয়াল এখনও মটমট করছে। ভেতরের হিংস্র সত্তাটা বার-বার মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে চাইলে। অন্তরালের পিশাচটাকে দমাতে না পেরে কাউচের ওপর থেকে দামি ওয়াইনের বোতল তুলে সজোরে আছাড় মারল ফ্লোরে। কাচ ভাঙার বিকট শব্দে কেঁপে উঠল পুরো ক্লাব রুম। সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। নত মস্তকে দাঁড়িয়ে রইল। রণয়ের এই রূপের সঙ্গে এঁরা সবাই বেশ পরিচিত।
উর্ফি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলল। তার কান্না রণয়ের রাগকে আরও উসকে দিল। ক্ষুধার্ত বাঘের মতো গর্জন করে উঠল সে,
"কী বালচাল নিয়ে এসেছিস? কান্না দেখলে মায়া হয় না। এটাকে সরা আমার চোখের সামনে থেকে, এক্ষুনি!"
রণয়ের তেজ আঁচ করতে পেরে বিজ্ঞ সাজন দ্রুত উর্ফিকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। রণয় পকেট থেকে সিগারেট বের করে কাউচে গা এলিয়ে শুয়ে পড়ল। লাইটার খুঁজে না পেয়ে বিরক্তিতে সিগারেটটি ছুঁড়ে ফেলে দিতে যাবে ঠিক তখনই অনির্বাণ তার ঠোঁটের সামনে লাইটার জ্বেলে ধরল। বাঁকা হাসল রণয়। সিগারেটে আগুন জ্বলে উঠল। বিষাক্ত ধোঁয়া মিলিয়ে গেল শূন্যে।
চোখ বন্ধ করে একটু স্বস্তি পেতে চাইল সে। কিন্তু চোখের পাতায় বারবার ভেসে রইল সেই মুখটা। বাচ্চা বাচ্চা একটা চেহারা, জবা ফুলের মতো লাল ও নরম গাল, টলমল চোখে জমে থাকা জলরাশি। ফোলা চোখের নিচে ফুটে থাকা একটিমাত্র কুচকুচে কালো তিল। আর দেহের মৃদু স্পন্দনে বারবার কেঁপে ওঠা গোলাপি ঠোঁট টা!
________
স্নেহা আর তিবার সাবজেক্ট আলাদা হওয়ায় ওদের ক্লাসের সময়সূচিও ছিল ভিন্ন। তিবার ক্লাস আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। স্নেহাকে স্নেহা নিতে আসবে। তাই তিবা আর স্নেহার জন্য অপেক্ষা না করে চলে যায়।
ক্লাস শেষে স্নেহা চারুকলা পুকুরপাড়ের রাস্তা ধরে হাঁটছিল। হঠাৎ মিষ্টি এক বাঁশির সুর কানে আসতেই সে থমকে দাঁড়াল। এই যান্ত্রিক যুগে এখন বাঁশির সুর সত্যিই বিরল! কৌতুহল সংবরণ করতে না পেরে সুরের উৎস খুঁজে সে পা বাড়াল।
পুকুরপাড়ের একটি বেঞ্চিতে বসে আছে এক তরুণ, পাশে রাখা একটি গিটার। সুরে মুগ্ধ হয়ে কাছে যেতেই স্নেহা চমকে উঠল। রণয়! খেয়াল করে দেখল, রণয় কোনো বাঁশি বাজাচ্ছে না। শিষ বাজিয়েই অলৌকিক জাদুতে বাঁশির অবিকল সুর তুলে ধরেছে।
কারও উপস্থিতির আভাস পেয়ে রণয় চোখ মেলল। আবারও দু'জনের দৃষ্টি এসে থমকে গেল একবিন্দুতে। স্নেহার চোখ আটকে গেল রণয়ের কপালে। আঘাতের স্থানটায় কোনো ব্যান্ডেজ করা হয়নি। কপাল ছিঁড়ে ভেতরের মাংস স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। স্নেহার বুকে তীব্র অনুশোচনার ঢেউ খেলে গেল। কাল সে যদি চিঠিটা রণয়কে দিয়ে দিত, তাহলে মেয়েটা তার গায়ে পানি ঢেলে দিত না। নিজের বাড়াবাড়ির কথা ভেবে মনটা অপরাধবোধে ভারী হয়ে উঠল।
স্নেহার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল রণয়কে একটা 'স্যরি' বলতে। কিন্তু রণয়ের সেই একগুঁয়ে আর নিষ্প্রভ চাউনি দেখে তার কণ্ঠনালী যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। অস্বস্তিতে আচ্ছন্ন স্নেহা আর এক পা-ও এগোতে পারল না। ব্যাগ থেকে তড়িঘড়ি করে একটা অন-টাইম ব্যান্ডেজ বের করে দুই পা এগিয়ে বেঞ্চিতে রাখল, তারপর ক্ষিপ্র পায়ে সেখান থেকে সরে পড়তে চাইল।
রণয় স্থির দৃষ্টিতে সব দেখছিল। তবে স্নেহার এই কাণ্ডে তার চিবুকের রগগুলো শক্ত হয়ে উঠল। কিসের অনুশোচনা এটি? যেখানে সামান্যতম সৌজন্যবোধের বালাই নেই!
তীব্র ক্ষোভে ফুঁসে উঠে রণয় স্নেহার দিকে তেড়ে গেল। ভারী জুতো আর ধেয়ে আসার শব্দে স্নেহা চমকে পেছন ঘুরে তাকাল। রণয়ের হিংস্র রূপ দেখে ভয়ে গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল তার। সে ভীত পায়ে পেছাতে শুরু করল। চারপাশে একবার নজর বুলাল। না, আশেপাশে কেউ নেই! আতঙ্কে বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল।
পেছাতে পেছাতে স্নেহা একদম পুকুরের পাড়ের শেষ প্রান্তে চলে এসেছে। আর এক কদম পিছালেই সোজা পানিতে পড়বে। স্নেহা বেমালুম পা বাড়াতেই পুকুরের বুকে উল্টে পড়লে নিলে রণয় চট করে স্নেহার কব্জি চেপে ধরল।
হঠাৎ স্পর্শে আঁতকে উঠে স্নেহা চেঁচিয়ে উঠল,"ছুঁবেন না আমাকে।"
"ওকে।"
হাত ছেড়ে দিল রণয়। চোখের পলকে স্নেহা ছিটকে গিয়ে পড়ল পুকুরের পানিতে। কাকভেজা স্নেহার দিকে তাকিয়ে রণয় বাঁকা হাসল। তারপর স্নেহার স্টাইলেই, কোনোরূপ সৌজন্যতা না দেখিয়ে, স্রেফ অনুশোচনা প্রকাশের ভান করল। গা থেকে জ্যাকেটটা খুলে পুকুরপাড়ে রেখে চলে গেল।
~চলবে.......