#কে_বাঁশি_বাজায়_রে
#Methuburi_মিথুবুড়ি
#পর্ব_০৩
"সুন্দরী মেয়েদের আমাদের ক্যাম্পাসে আসা একেবারেই নিষেধ।"
আচমকা পেছন থেকে তেড়ে আসা মন্তব্যটিতে কপাল কুঁচকে ওঠে স্নেহার। এমন কথা কে বলতে পারে, তা আর বুঝতে বাকি থাকে না তার। স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই ঘুরে তাকাল স্নেহা। সামনে দাঁড়িয়ে আছে আদিল, চেহারায় বড় ভাই সুলভ গম্ভীর ভাব। তার পাশে নিহাল। দৃশ্যটা দেখে স্নেহার মনে হলো এক ছাগলের সাথে আরেক ছাগল!
"মানে?"স্নেহা ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন করে।
"মানে বুঝো না, খুকি?" আদিলের মুখে নাটকীয় বিস্ময়ের ভঙ্গি।
"স্নেহা। আমার নাম স্নেহা," স্পষ্ট ও দৃঢ় গলায় আদিলকে শুধরে দেয় সে।
"ওহো! তাই নাকি? না বললে তো জানতেই পারতাম না!"ঠোঁট ফাঁক করে ভান ধরা অবাক হওয়ার অভিনয় করে আদিল।
স্নেহার মেজাজ ক্রমশ চড়তে থাকে, তবে নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রাখল সে। হাতঘড়ির দিকে একবার চোখ বুলে নিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, "কী বলতে চাইছেন ভাইয়া, স্পষ্ট করে বলুন। আমার ক্লাসের সময় হয়ে যাচ্ছে।"
"বললাম তো, আমাদের ভার্সিটিতে সুন্দর মেয়েদের কোনো এলাওয়ান্স নেই। আন্ডারস্ট্যান্ড?"
"হোয়াট? কেন?" এবার সত্যিই হতবাক দেখায় স্নেহাকে।
"হয় বাংলায় বলো, নয় ইংরেজিতে! দু’ভাষার এই খিচুড়ি মার্কা মিক্সচার আমি একদম সহ্য করি না।"
হঠাৎ আদিলের গলার তীব্র গাম্ভীর্যে ক্ষণেকের জন্য থতমত খেয়ে যায় স্নেহা। লোকটা কি অপমান করছে, নাকি সিনিয়র হিসেবে কোনো জ্ঞান দিচ্ছে, ঠিক বুঝে উঠতে পারে না সে। একটু যেন থমকে গিয়ে মাথা নিচু করে ফেলল সে।
স্নেহাকে দমে যেতে দেখে আদিল তার গলার স্বর আরও গম্ভীর করে বলল, "সিনিয়র হিসেবে ক্যাম্পাসে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা আমাদের দায়িত্ব। আর তোমার জন্যই আমরা সেই দায়িত্বটা পালন করতে পারছি না!"
বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে যায় স্নেহা। আদিলের পেছনে দাঁড়িয়ে নিহাল তখন মুখ চেপে হাসছে। স্নেহা খুব ভালো করেই বুঝতে পারে, সেদিনের বদলা নিতেই আজকের এই নাটক সাজানো হয়েছে।
"আমি আবার কী করলাম, ভাইয়া?" স্নেহার নিরপরাধ প্রশ্ন।
ধমকে ওঠে আদিল, "কী করোনি মানে? তোমার জন্য ছেলেতে-ছেলেতে মারামারি লাগছে, চারদিকে ব্রেকআপের হিড়িক পড়ে গেছে! প্রতিদিন হাজারটা মন ভাঙছে! তোমার এই রূপটা কি বাসায় রেখে আসতে পারো না? রূপ বেচে প্যারিস চলে যাও না কেন, হে মেয়ে?"
স্নেহা এবার আর রাগল না। বরং দু’হাতে মুখ ঢেকে লাজুক ভঙ্গিতে হেসে উঠে বলল, "আমি দেখতে সুন্দর, এটা সোজা করে বললেই তো হয় ভাইয়া! এত পেঁচিয়ে উদাহরণ দেওয়ার কী দরকার ছিল?"
হাঁ হয়ে যায় আদিল আর নিহাল। যে মেয়েকে খেপাতে এসেছিল, সেই মেয়েই এখন তাদের এক ধাপ এগিয়ে খোঁচা দিচ্ছে! যারা মজা নিতে এসেছিল, তারা নিজেরাই এখন হাসির পাত্র। তাও হার মানার পাত্র নয় আদিল। কণ্ঠে মেকি রাগ ফুটিয়ে বলল,"দু’দিন হলো না কলেজে এসেছ, এখনই বড় ভাইয়ের সাথে বেয়াদবি?"
"দশ দিন।"
"অ্যাঁ?"
স্নেহা সম্পূর্ণ নির্বিকার। ব্যাগ থেকে লিপবাম বের করে ঠোঁটে লাগাতে ব্যস্ত সে। কাজ শেষে লিপবামটা ব্যাগে রাখল। তারপর গা ঝাড়া দিয়ে টানটান ভঙ্গিতে দাঁড়াল, যেন দুটো ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করে নিচ্ছে! এরপর সরাসরি আদিলের চোখের দিকে তাকিয়ে ধারালো গলায় বলল,
"ভার্সিটিতে এসেছি আজ দশ দিন হলো। আপনাকে প্রথম দেখে ছাগল ভেবেছিলাম, এখন দেখছি আপনি শুধু ছাগল নন, আস্ত একটা গাধা!”
আদিল ক্রোধে স্তব্ধ হয়ে যায়। একটা জুনিয়র মেয়ের এত বড় সাহস! নিহালের তো চোখ কপালে ওঠার জোগাড়!
আদিল তেড়ে যেতে নেয় স্নেহার দিকে, নিহাল পেছন থেকে তাকে কষে ঝাপটে ধরে। রাগে আদিলের বুক ওঠানামা করছে, ছটফট করছে সামনে যাওয়ার জন্য। অন্যদিকে স্নেহা একদম শান্ত, চোখেমুখে একবিন্দু ভয়ের ছাপ নেই।
আদিল গর্জে উঠে বলল, “এই মেয়ে! তুমি কি আমাকে ইনডাইরেক্টলি অপমান করলে?”
স্নেহা অতি শান্ত গলায় জবাব দিল, “উহু… ডাইরেক্টলি।”
আদিল আবার ছিটকে আসতে চায়, কিন্তু নিহালের শক্ত বাঁধন থেকে বেরোতে পারে না। চারপাশের দাঁড়িয়ে থাকা অন্য শিক্ষার্থীরা ততক্ষণে হাঁসি চেপে রাখতে পারছে না। কেউ মুখ চেপে হাসছে, তো কেউ গালে হাত দিয়ে হো হো করে হেসে উঠছে।
স্নেহা আবারও হাতঘড়িটা দেখে নিল। তারপর বন্দি পাখির মতো ছটফট করতে থাকা আদিলের দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেল। একদম আদিলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, চোখ তুলে বিরক্ত গলায় বলল,
“এখনও মাথায় ঢোকেনি? ভেবেছিলাম আপনি একটা ছাগল। কিন্তু না, গাধারাম!”
কথাটা শেষ করে আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে হনহনিয়ে হাঁটা দেয় স্নেহা। পেছন থেকে ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মতো চিৎকার করতে থাকে আদিল, “এই মেয়ে! থামো! থামো বলছি! আমি আদিল… এর শোধ আমি নিয়েই ছাড়ব!”
কিন্তু কে শোনে কার কথা৷ উদাস হাওয়ায় চুল উড়িয়ে নিজের গন্তব্যে এগিয়ে যায় স্নেহা।
_____
ধর্মীয় পূজোর ছুটির কারণে দু’দিন ক্যাম্পাসে আসতে পারেনি অনির্বাণ। ক্লাবে পা দিতেই তার ভ্রু কুঁচকে উঠল
নিহাল আর আদিল কানে ধরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে! ওদের পাত্তা না দিয়ে অনির্বাণ সোজাসুজি কাউচে গিয়ে গা হেলিয়ে বসল। তারপর খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতে উল্টাতে সাজনকে প্রশ্ন করল, “আবার কী করেছে এই দুটো?”
“সকাল সকাল মেয়েদের পেছনে লাগতে গিয়েছিল… শেষমেশ অপমানিত হয়ে ফিরেছে,” সাজন জবাব দিল।
“কে এত সাহসী?” অনির্বাণের ভ্রু আরও কিছুটা কুঁচকে উঠল।
“সেদিনের সেই মেয়েটা, ভাই!”
অনির্বাণ বরাবরই শান্ত আর গম্ভীর স্বভাবের। তার স্মৃতিশক্তিও ভীষণ প্রখর। ‘সেই মেয়ে’ শব্দটা কানে পৌঁছাতেই তার স্মৃতির পর্দায় ভেসে উঠল কাচুমাচু একটি মুখ, একঝলক চঞ্চল হাসি, আর তারপরই দ্রুত ছুটে পালানোর দৃশ্য!
ঠিক তখুনি ধুপধাপ পা ফেলে কক্ষে প্রবেশ করল রণয়। শরীর থেকে ঘামে ভেজা টি-শার্টটা এক টানে খুলে ছুঁড়ে ফেলল সে। সঙ্গে সঙ্গে উন্মুক্ত হয়ে পড়ল তার জিম করা টানটান শরীর, আকর্ষণীয় অ্যাবস আর ফোলা মাসল। এসি-র ঠান্ডা বাতাস ভারী করে সে ধপাস করে কাউচে বসে পড়ল।
“সকাল সকাল ওদের ওপর এত খেপলি কেন?” অনির্বাণ একটু হেসে জানতে চাইল।
“বীরপুরুষ বানানোর সামান্য একটা চেষ্টা করছি! হাঁটুর বয়সী এক মেয়ের কাছে অপমানিত হয়ে এসেছে এই ছাগলগুলো,” ঘাম মুছতে মুছতে গম্ভীর গলায় প্রত্যুত্তর করে রণয়।
আদিল নিচু গলায় কাচুমাচু মুখে বলে, “ভাই, আমি তো পরিপূর্ণ পুরুষই! মেয়েটাই একটু বেশিই পাকনা।”
রণয় টেবিলের ওপর রাখা ভারী পেপারওয়েটটা তুলে সোজা ছুঁড়ে মারল আদিলের দিকে। আদিল চট করে সরে যাওয়ায় একটুর জন্য বেঁচে গেল।
রণয় গর্জে উঠল, “পুরুষ মানুষের চালচলন হতে হয় বেপরোয়া আর তেজী। তোদের মতো ছাগল না!”
“ভাই, আপনিও!”
“চুপ!” রণয়ের বজ্রকণ্ঠের ধমকে মিইয়ে গেল আদিল। বাচ্চার মতো মুখ কালো করে চুপসে রইল সে।
হঠাৎ রণয়ের নজর আটকে গেল অনির্বাণের হাতের দিকে। সে উঠে বসে অনির্বাণের হাতটা চেপে ধরে উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল, “তোর হাতে কী হয়েছে, অনি?”
ক্লাবের সবাই একযোগে ঘুরে তাকাল অনির্বাণের দিকে। অনির্বাণের কনুইয়ের ওপরের ত্বক লালচে হয়ে আছে। চামড়াও ছিলে গেছে। অনির্বাণ ক্ষতটার কথা ভুলেই গিয়েছিল।
সে হালকা হেসে বলল, “আরে, ওই বাচ্চা মেয়েটা...”এটুকু বলে থামল অনির্বাণ। রণয়ের কপাল কুঁচকালো, চোখ দুটো প্রশ্নবোধক হয়ে উঠল। অনির্বাণ নিজ থেকেই আবার বলা শুরু করল,
“আরে দোস্ত, সাইডে গিয়ে একটু সিগারেট খাচ্ছিলাম। নিচে তাকিয়ে দেখি কয়েক জোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা প্রেমালাপে ব্যস্ত। তাই ছাদে গেলাম। গিয়ে দেখি সেদিনের সেই মেয়েটা অন্যমনস্ক হয়ে রেলিঙের ওপর বসে আছে। তারপর…
“সুইসাইড করার শখ থাকলে বাইরে গিয়ে করো, ক্যাম্পাসের ভেতরে না।”
হঠাৎ একটি গভীর পুরুষালি কণ্ঠ কানে পৌঁছাতেই চমকে উঠেছিল স্নেহা। সামলাতে না পেরে হাত-পা পিছলে রেলিং থেকে পড়ে যায় সে। নিচের দিকে তাকাতেই বুক ধক করে উঠে। দম বন্ধ হয়ে আসে স্নেহার। চোখ দুটো শক্ত করে বুজে ফেলে সে মনে মনে কালমা পড়তে শুরু করেছিল… হয়তো জীবনের শেষ এখানেই !
তখুনি একজোড়া খসখসে, শক্ত হাত এসে আকড়ে ধরে তার কবজি। ছয় তলার উঁচুতে স্নেহা তখন শূন্যে ঝুলছে। নিচে মৃত্যুর হাতছানি, আর ওপরে তাকাতেই চোখে পড়ে আংশিক চেনা মুখটা। স্নেহা লোকটাকে চেনে। কিছুদিন আগে টিএসসিতে আদিলদের সঙ্গে দেখেছিল।
গায়ের জোর দিয়ে স্নেহাকে ওপরে টেনে তোলে অনির্বাণ। সমতলে ওঠার পর দুজনই জোরে জোরে হাঁপাতে থাকে। তবে স্নেহার অবস্থা ছিল সবচেয়ে কাহিল। অবশ্য স্নেহার রোগা-পাতলা শরীরটাকে ওপরে তুলতে অনির্বাণের খুব একটা কষ্ট হয়নি।
ভয়ে স্নেহার শরীরের কাঁপুনি তখনও থামছিল না। শিউরে উঠছিল সে। যদি সত্যিই পড়ে যেত, শরীরটা কোথায় গিয়ে গুঁড়িয়ে যেত কে জানে!
স্নেহা মাথা তুলে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকায় অনির্বাণের দিকে। মুখে “থ্যাঙ্ক ইউ” ফোটাতে যাবে, তখন হঠাৎ অনির্বাণের চোখে পড়ে স্নেহার ভেজা চোখের দিকে। মেয়েটির ওই অসহায় রূপ দেখে ধমক দেওয়ার জন্য মুখে চলে আসা শব্দগুলো অনির্বাণ গিলে নেয়। অতঃপর নিঃশব্দে সে সেখান থেকে চলে আসে।
“কী বলেন! ওই ঝগড়ুটে মেয়ে কান্নাও করতে পারে? সকালেও তো কীভাবে গায়ে পড়ে ঝগড়া করল!” মাঝখান থেকে ফোড়ন কাটল আদিল।
সাজন বিরক্ত হয়ে মুখে ‘চ’ শব্দ করে তাকে থামিয়ে দিল,“আহ্! চুপ করবি তুই? হয়তো সত্যিই কিছু হয়েছিল বলেই মেয়েটা কাঁদছিল।"
এতক্ষণ চুপচাপ, স্থির হয়ে পুরো ঘটনাটা শুনছিল রণয়। কিন্তু হঠাৎ করেই তার বুকের ভেতরটা অজানা কোনো কারণে খচখচ করে উঠল। অনভিপ্রেত ঘোরের ভাবটা কাটাতে সে পকেট থেকে ফোন বের করে ঘাঁটতে শুরু করল। তাও মনটা যেন কিছুতেই শান্ত হচ্ছিল না, ভীষণ এলোমেলো লাগছিল।
কয়েক মিনিট পার হওয়ার পর হঠাৎ-ই বসা থেকে সোজা উঠে দাঁড়াল রণয়। ক্লাবের সবাই একসাথে তার দিকে তাকাল, সবার চোখেই একধরনের কৌতূহল আর বিস্ময়।
কারও নজর বা প্রশ্নকে তোয়াক্কা না করে রণয় হনহন করে ক্লাবঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
____
"হাত ছাড়ুন বলছি।"
রাগী নারী কণ্ঠস্বরটা অনুসরণ করে ক্ষিপ্রতায় সামনে এগিয়ে গেল রণয়। সাউন্ডটা ফিমেল ওয়াশরুমের দিক থেকেই ভেসে আসছে। একটি ছেলে ও মেয়ের কথোপকথন শোনা যাচ্ছে। কথার ভাজে লুকানো ছিল অস্বস্তি আর উত্তেজনা। খারাপ কিছু একটা আঁচ করতে পারা মাত্রই রণয়ের হাতের মুঠি শক্ত হয়ে উঠল, চিবুক শক্ত করে সে দ্রুত পায়ে ছুটে গেল সেদিকে।
“আমাকে বোঝো, স্নেহা। আই লাভ ইউ!”
“দয়া করে আমাকে বুঝুন আপনি। আমি আপনাকে বড় ভাইয়ের চোখে দেখি, নাথিং এলস!”
“কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি স্নেহা, একদম প্রথম দিন থেকে!”
“মহা অসভ্য তো আপনি। ভার্সিটির টপার বলেই না একটু কথা বলতাম নোটসের জন্য। তাই বলে এভাবে অ্যাডভান্টেজ নেবেন? ভদ্রভাবে বলছি বের হন এখান থেকে, আসিম ভাইয়া।”
“একটা সুযোগ দাও, প্লিজ।”আসিম নামের ছেলেটি আবারও হাত বাড়ায় স্নেহাকে স্পর্শ করার জন্য।
ভয়ে শিউরে উঠে পিছিয়ে যায় স্নেহা। চোখ বুজে ফেলল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, কোনো স্পর্শ নেমে এলো না তার গায়ে। কোনো শব্দও হলো না। বুকের ভেতরটা এবার আরও জোরে ধক করে উঠল । কাঁপা কাঁপা ভঙ্গিতে পিটপিট করে চোখ খুলেই স্তব্ধ হয়ে যায় স্নেহা।
আসিম থরথর করে কাঁপছে ভয়ে আর লজ্জায়। আর তার সামনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে রণয়!
রণয়ের চোখ-মুখ কঠিন, কপালের নীল রগগুলো ফুলে উঠেছে। তার ধূসর চোখ দুটোয় যেন দাউদাউ করে জ্বলছে আগুনের শিখা। এক হাতে সে শক্ত লোহার মতো চেপে ধরেছে আসিমের হাতটা। আসিম পুরোপুরি জমে গেছে, তার মধ্যে নড়াচড়াও নেই। চোখে-মুখে তীব্র আতঙ্ক। কিছুক্ষণ স্তব্ধতার রাজত্ব চলল। রণয়ের চোখের সাদা অংশ ততক্ষণে রক্তে লাল হয়ে এসেছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“এটা ফিমেল ওয়াশরুম। ডোন্ট ইউ নো দ্যাট?”
আসিমের গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। মনে হলো গলায় ভারী, যন্ত্রণাদায়ক কিছু একটা আটকে গেছে। বহু কষ্টে, কাঁপা কাঁপা স্বরে সে অস্পষ্টভাবে বলল, “জি ভা… ভাই… জি।”
রণয়ের গলার স্বর বরফের মতো ঠান্ডা, “নেক্সট টাইম যেন এদিকে আর না দেখি। গো। ডোন্ট লুক বিহাইন্ড!”
ঝটকা দিয়ে আসিমের হাতটা ছেড়ে দিল সে। আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না আসিম। পশুপাখির মতো ছুটে পালিয়ে বাঁচল সেখান থেকে।
রণয়ের মুখের দিকে তাকাতেউ শিউরে উঠল স্নেহা। অজান্তেই শুকনো ঢোক গিলল সে। ওই রাগি চোখ যেন দৃষ্টি দিয়েই জ্বালিয়ে ছাই করে দেবে তাকে। রণয়ের ফর্সা মুখটা রাগে লাল লাভার মতো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
এই লোকটাকে স্নেহা ভীষণ ভয় পায়, যেদিন থেকে তার আসল পরিচয় জেনেছে সেদিন থেকেই। আর পুকুরে ফেলে দেওয়ার ঘটনার পর থেকে তো ভয়টা বহুগুণ বেড়ে গেছে। ভার্সিটিতে এলেও আজকাল সবসময় নিজেকে লুকিয়ে রাখত, যেন কোনোভাবে রণয়ের সামনে পড়তে না হয়। এতদিন বেঁচে গেলেও আজ আর শেষ রক্ষা হলো না। সোজা এসে পড়ল বাঘের খাঁচায়!
এমনকি পালানোরও কোনো উপায় নেই। দরজার সামনে পাহাড়ের মতো আটল দাঁড়িয়ে আছে রণয়।
রণয় সেই ভয়ংকর অভিব্যক্তি নিয়েই পেছন ফিরল। তারপর সে যা করল, তাতে স্নেহার চোখ কপালে উঠে গেল।
রণয় অকস্মাৎ ক্ষিপ্র গতিতে স্নেহাকে প্রায় টেনে নিয়ে গেল বেসিনের সামনে। ফ্যাসেটের কলটা ছেড়ে দিয়ে স্নেহার হাত দুটো পানির নিচে ধরে অস্থিরভাবে ধুতে লাগল সে, যেন স্নেহার হাতে কোনো বিষ লেগে গেছে, বা কোনো নোংরা জিনিস!
শুধু পানিতেই শান্ত হলো না রণয়, হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে ঘষতে শুরু করল স্নেহার হাত দুটো। স্নেহা তো পুরো অবাক, বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে ভেজা চোখে তাকিয়ে রইল রণয়ের দিকে। রণয়ের এই অনিয়ন্ত্রিত রাগের উৎসটা সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না।
সে সবটুকু জোর দিয়ে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করেও পারল না। হ্যান্ডওয়াশ দেওয়া শেষ হতেই বোতলটা রাগে দূরে ছুঁড়ে মারল রণয়। তারপর হফোঁস ফোঁস করতে করতে হনহন করে বেরিয়ে গেল।
পেছনে পড়ে রইল আহত স্নেহা। অতিরিক্ত ঘষাঘষিতে তার হাতের তালুর চামড়া ছিলে গিয়ে রক্তাভ হয়ে উঠেছে। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে।
______
“মন্ত্রী হয়ে এটাও কিন্তু আপনার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, আব্বু! ট্রাফিকটা অন্তত নিয়ন্ত্রণে আনা উচিত।”
ছেলের এমন বিরক্তিভরা মুখ আর কথা শুনে হেসে ওঠেন মি. রেদোয়ান। বাবার হাসিতে আরও বেশি চটে যায় রণয়।
“হেঁসো না। আমি আগেই বলেছিলাম, যাব না। শুধু শুধু জোর করে নিয়ে আসলে।”
একটু জোরেই হেসে উঠলেন মি. রেদোয়ান। হেসে স্নেহের সাথে হাত রাখলেন ছেলের প্রশস্ত পিঠে, কণ্ঠে উপচে পড়ল অগাধ মায়া, “তুমি আমার একমাত্র উত্তরাধিকারী। আমার পরে আমার এই দীর্ঘদিনের গড়া রাজনৈতিক কেরিয়ারটা তোমারই হাতে তুলে দিতে চাই, মাই সান। কারণ, এর জন্য তুমিই সবচেয়ে যোগ্য। তোমার মধ্যে আমি আমার যৌবনের সেই তেজ, সেই আগুন দেখতে পাই। তাই তো এখন থেকেই তোমাকে সব গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রামে সঙ্গে নিয়ে যাই।”
বাবার কথায় বেশ অস্বস্তি আর ঝাঁঝ নিয়ে রণয় বলল “উফ্ আব্বু! আমার কেরিয়ার আমি নিজের যোগ্যতায় গড়তে চাই, কোনো ফ্যামিলি ফ্রেমে নয়। নিজের পরিশ্রমে ওপরে উঠতে চাই, তোমার রাজনৈতিক সাপোর্টে নয়।”
মি. রেদোয়ান মৃদু হেসে বলেন, “তোমাকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য তো নিয়ে যাচ্ছি না, বাবা, বরং তুমিই বাবার সবচেয়ে বড় শক্তি।”
ছেলের কপালে একটা চুমু খান মি. রেদোয়ান। বাবার এই নিভে যাওয়া ছোঁয়া আর ভালোবাসায় রণয়ের কঠোর মুখটা নিমেষেই নরম হয়ে আসে, সমস্ত রাগ আবেশে গলে জল হয়ে যায়।
কিছুটা সময় কেটে যায়। কিন্তু জ্যামের লেশমাত্র কমে না। তারা মূলত যাচ্ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবনে। ছোট পরিসরে আজ তাঁর ছোট মেয়ের বাগদান। দলীয় সম্পর্কের বাইরেও মি. রেদোয়ানের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগতভাবে বন্ধুত্ব রয়েছে, তাই সপরিবারে তারা স্পেশালি ইনভাইটেড। প্রটোকল ছাড়া সাধারণ গাড়িতে আসায় আজকে জ্যামের ভোগান্তিটা একটু বেশিই হচ্ছে। এসি চলতে থাকলেও গরমে গাড়ির ভেতরে হাঁসফাঁস করতে থাকে রণয়।
তখনই বাইরের এক দৃশ্যে আটকে যায় রণয়ের সমস্ত মনোযোগ। সবকিছু যেন হঠাৎ মুহূর্তের জন্য থেমে যায়।
রণয়ের চোখে ফুটে ওঠে অপার মুগ্ধতা। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ফুটপাতের এক কোণে। দৃশ্যটা দেখতে দেখতে তার মনটা জুড়িয়ে যাচ্ছিল। একজন দায়িত্বশীল বড় ভাই অভিভাবকের মতো ধৈর্য আর আদর-ভালোবাসায় সামলাচ্ছে তার ছোট বোনকে। চোখেমুখে বিরক্তির লেশমাত্র নেই। বরং সে আনন্দে উজ্জ্বল মুখে দাঁড়িয়ে আছে বোনের পাশে।
ছোট বোনটি খিলখিল করে হেসে ফুচকা খাচ্ছে, আর সে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটু পর পর টিস্যু পেপার দিয়ে যত্নে মুছে দিচ্ছে বোনের ঠোঁটে লাগা ফুচকার টক।
রণয় মাথা নিচু করে ফেলল। কিন্তু তার বেহায়া চোখ যেন চুম্বকের টানে বারবার ছুটে যেতে চায় সেদিকেই। অপরিচিত একটা দৃশ্য, অথচ কেন যেন বড্ড আপন মনে হচ্ছে! গাড়ির ভেতরে জ্যামে আটকে থাকার সমস্ত ক্লান্তি আর বিরক্তি নিমিষেই কর্পূরের মতো উবে গেল।
রণয় আবার চোখ তুলে তাকাল সেদিকে। ঝালের চোটে স্নেহার ঠোঁট দুটো লাল হয়ে আছে। গোলাপি ঠোঁটে সেই লাল আভাটা বড্ড মানিয়েছে। মনে হচ্ছে যেন গাছ পাকা, রসালো লাল টমেটো, যা একেবারে খাওয়ার উপযোগী! নিজের এমন উদ্ভট আর বখাটে ভাবনায় নিজেই লজ্জিত হয়ে চোখ নামিয়ে নেয় রণয়।
এই মেয়েটা আসলেই অদ্ভুত চরিত্রের! সকালে গায়ে পড়ে ঝগড়া করে, বিকেলে রেলিঙের ওপর বসে কাঁদতে কাঁদতে মরতে যায়, এরপর ওয়াশরুমে একটি ছেলেকে আজেবাজে কথা বলে বিভ্রান্তি তৈরি করে, আর এখন? এখন মুক্তোদানা ঝরিয়ে অমন প্রাণখোলা হাসিতে মেতেছে!
রণয় নিজের দৃষ্টি সংযত করতে চাইল। কিন্তু চোখ দুটো যেন তার কথা শুনছেই না৷ ঘুরেফিরে আবার সেই হাসির মুখটাকেই খুঁজে ফিরছে। গভীর চোখে রণয় স্নেহাকে যেন পা থেকে মাথা পর্যন্ত একলুহায় জড়িয়ে নিল। সাদা লেগিংস, হাঁটু অবধি ছড়ানো আকাশি রঙের টপ, আর বুকের দু’পাশে ছড়ানো সাদা ওড়না। চুলগুলো বরাবরের মতো কানের লতি বরাবর টাইট পনিটেলে বাঁধা। দূর থেকে মনে হচ্ছে নীল আকাশ থেকে নেমে আসা মেঘপরী!
হঠাৎ রণয়ের নজর যায় স্নেহার বাঁ হাতের দিকে। হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে অতিরিক্ত রগরগে ঘষার কারণে হাতের তালু লালচে হয়ে ফুলে আছে। একটা খচখচে অস্বস্তি আর অপরাধবোধ তাকে ঘিরে ধরে। সঙ্গে সঙ্গে এক চিন্তায় শক্ত হয়ে যায় তার চোয়াল। খানিকবাদেই সিগন্যালের লাল বাতি নিভে সবুজ জ্বলে উঠল। সাঁ সাঁ করে নিজস্ব গন্তব্যের দিকে ছুটে চলল সারি সারি গাড়িগুলো।
চলবে.......