ফন্ট সাইজ:
থিম:
কে বাঁশি বাজায় রে

পর্ব 4

লেখক: মিথুবুড়ি

#কে_বাঁশি_বাজায়_রে
#Methuburi_মিথুবুড়ি
#পর্ব_০৪

তিনদিন আগের ঘটনা......

"এই মেয়ে, দাঁড়াও!"

ভার্সিটির সামনে রিকশা থেকে নামতেই হঠাৎ কারো চরা গলার ধমকে কেঁপে উঠল স্নেহার ছোট গড়নটা। পেছন ফিরে তাকাতেই দেখতে পেল বটগাছের নিচে পুরো দল নিয়ে আড্ডা দিচ্ছে সেইদিনের ছেলেগুলো। গতকালের ঘটনা মনে পড়তেই শুকনো ঢোঁক গিলল স্নেহা। তার চোখ গিয়ে পড়ল রণয়ের ওপর। রণয় তখন অনির্বাণের সাথে প্রেস ক্লাবের মিটিং নিয়ে আলোচনা করছিল। আদিলের আকস্মিক ধমকে চোখ তুলে তাকাতেই তার দৃষ্টি আটকে গেল স্নেহার ওপর। কেমন একটা অদ্ভুত অস্বস্তি খেলে গেল রণয়ের মনে।সে চোখ নামিয়ে নিল।

অথচ স্নেহা তাকিয়েই রইল। তিবার বলা কথাগুলোর সাথে লোকটাকে মেলানোর চেষ্টা করল সে। না, তিবার কথা মিথ্যে ছিল না। লোকটা নিঃসন্দেহে সুদর্শন। লম্বা, ছিপছিপে গড়ন।গায়ে সাদা ফিটিং শার্ট, যার সামনের দুটো বোতাম খোলা, ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে সুঠাম প্রশস্ত বুক। পরনে ডেনিম প্যান্ট। গায়ের রঙও উজ্জ্বল। পুরুষ মানুষের এতো উজ্জ্বলতা ভালো লাগে না, তবে লোকটাকে বেশ মানাচ্ছে। কালো, সিল্কি চুলে কেমন একটা মায়া মাখানো। ডান হাতে একটা স্টিলের ব্রেসলেট। আর বাঁ মুঠোয় ধরা গুচির মানিব্যাগ। চেহারায় একচ্ছত্র নেতার ভাব, দেখতে যেন তামিল কোনো সিনেমার হিরো।

"এই মেয়ে! ড্যাবড্যাব করে কই তাকিয়ে আছো?"

আদিলের দ্বিতীয় ধমকে স্নেহার ঘোর কাটল। একটু চমকে গেলেও পরমুহূর্তেই বুক সোজা করে দাঁড়াল । দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের নামটা সংশোধন করে দিল,

"স্নেহা। আমার নাম স্নেহা।"

মেয়েটার এমন অনমনীয় আত্মবিশ্বাসে কিছুটা হকচকিয়ে গেল আদিল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, "তো আমি কী করব? কোলে চড়িয়ে ঘুম পাড়ানি গান শুনিয়ে ঘুম পারাব? সিনিয়রদের দেখলে সালাম দিতে হয়, জানো না?"

"আমায় ভাইয়া নিষেধ করেছে।"

সবার উৎসুক দৃষ্টি একযোগে ঘুরে গেল স্নেহার দিকে। এতগুলো ছেলের সামনে একটা মেয়ের এমন নির্ভয় কণ্ঠ আর অকপট স্বীকারোক্তিতে রণয়ও চোখ তুলে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকাল। তার ধূসর নেত্রদ্বয়ে জমল গভীর কৌতূহল।

আদিল যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না, "মানে কী? বড়দের সালাম দিতে নিষেধ করেছে তোমার ভাই?"

"বলেছে, উল্টাপাল্টা ঝামেলায় না জড়াতে," মাথা নিচু করে জবাব দিল স্নেহা।

"কীহ্! আমরা ঝামেলা নাকি?" চেঁচিয়ে উঠল আদিল।

"আমরা হতে যাব কেন? তুই শালা দ্বারে দ্বারে সালাম খুঁজিস!" পাশ থেকে খাস মেজাজে বলে উঠল আলামিন৷ সে অনির্বাণের বিশ্বস্ত লোক। আদিলকে চুপ করানোর জন্য তীক্ষ্ণ চোখে চোখ রাঙাল রণয়।

স্নেহা নিজের মতো করে আবার বলে উঠল,"কারণ আমি বেশি কথা বলি না। দু-একটা কথা বললেই যে সর্বনাশ হয়ে যায়!"

একটু থেমে মাথা তুলল সে। তারপর আদিলের প্যান্টের দিকে ইশারা করে ঠোঁট ওল্টাল,

"এই যেমন, এখন আপনার ফ্লাই ওপেন।"

বলেই এক দৌড়ে সেখান থেকে চম্পট দিল স্নেহা। হতবাক হয়ে স্থবির হয়ে গেল আদিল। নিচে দৃষ্টি নামাতেই তার চোখ কপালে উঠে যায়। সত্যিই তার প্যান্টের চেইন খোলা! তাৎক্ষণিক লজ্জায় দু’হাতে জায়গাটা চেপে ধরল সে। মুহূর্তেই চারপাশ ফেটে পড়ল হাসির রোলে। লজ্জায় একদম নুইয়ে এককোণায় দাঁড়িয়ে রইল আদিল৷ চপল মুখে এখন কাচুমাচু ভাব।

রণয় পরিস্থিতি লক্ষ্য করে ধমক দিয়ে সবাইকে চুপ করাল। অনির্বাণ উৎসাহী গলায় জানতে চাইল,

"এটাই কি সেই মেয়েটা? কী অদ্ভুত! একবার হাসতে দেখি, তো আরেকবার কাঁদতে দেখি, আবার কখনো এমন তেজ দেখি!"

মাথা নিচু করে বিড়বিড় করল আদিল, "হ ভাই। মাল্টি-কালার নাগিন একটা।"

"কিন্তু খুব ক..." অনির্বাণ কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। নিজেকে সামলে নিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল, "সকাল সকাল এর পিছু লাগতে গেছিস কেন?"

"শাওন ভাই ইনফরমেশন চেয়েছিল।"

"কীহ্! জাবির দলনেতা ঢাবির খবর দিয়ে কী করবে?"এতোক্ষণ নীরব থাকা রণয় হঠাৎ ভ্রু কুঁচকাল। তার কণ্ঠস্বরও ভীষণ গম্ভীর শোনালো।

"ইস্কে লাড়া দিছে হয়তো," নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে টিটকিরি কেটে আদিল নিজেই হেসে গড়িয়ে পড়ল।

"মাদা'চোদ, লাগাতে চাইছে আবার!" দাঁতে দাঁত পিষে বিড়বিড় করে অনির্বাণ।

গম্ভীর রণয় রহস্যময় হাসে, "তবে লাগানোর জন্য প্রস্তুত থাক। চল সবাই।"

_____

"ভাইয়া, স্যরি।"

হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে এলো মেয়েলি মিহি কণ্ঠ। পকেটে ফোনটা রেখে রণয় ঘুরে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল একটা পিচ্ছি মেয়ে কাচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কাঁধে ব্যাগ, পরনে হলুদ কুর্তি৷ মেয়েটার ফর্সা গায়ের রঙের সাথে রঙটা চমৎকার মানিয়েছে। গরমে ঘেমে-নেয়ে একাকার অবস্থা। কপালের খুদে চুলগুলো ঘামে লেপ্টে গিয়ে মুখটাকে আরও বেশি শিশুসুলভ লাগছে। মুখে মাস্ক নেই, সেটা ঝুলছে কবজিতে।

রণয়ের ঠোঁটে তখন জ্বলন্ত সিগারেট। সে বিনা প্রত্যুত্তরে আচমকা মুখভর্তি ধোঁয়া ছেড়ে দিল মেয়েটির মুখের ওপর। খকখক করে কাশতে কাশতে চোখে পানি এসে গেল স্নেহার। রণয় শূন্য ভাবলেশহীন চোখে তা দেখল। তারপর সিগারেটটা মাটিতে ফেলে জুতো দিয়ে পিষে দিল। অতঃপর দু’হাত পকেটে পুরে একদম টানটান সোজা হয়ে দাঁড়াল।

কাশি থামতেই তেতে উঠল স্নেহা, "আপনি তো মারাত্মক অসভ্য লোক। আমি তো সুন্দর করে স্যরি বলতে এসেছিলাম, আপনি তো আমাকে মে রে ফেলার চেষ্টা করছেন!"

"ইউ মিন, এটেম্পট টু মা র্ডার?" ঝুঁকে জানতে চাইল রণয়।

"হ্যাঁ, একদম! আর একটু হলেই তো আমার দম বন্ধ হয়ে যেত। আমি মানছি, আপনাকে একটু ভুল বুঝেছিলাম, একটু রুড বিহেভও করেছি। কিন্তু তাই বলে এমন করবেন? আপনিও তো আমাকে পুকুরে ফেলে দিয়েছিলেন! তারপরও তো আমি মাফ চাইতে এসেছি। তাছাড়া ওই মেয়েটা সেদিন আমার গায়ে পানি ঢেলে আজ হুট করে আমার কাছে ক্ষমা চাইতে এল কেন? আপনি নিশ্চয়ই তাকে কিছু বলেছেন, রাইট?"

একশ্বাসে কথাগুলো বলে দু’হাতে কোমর বেঁধে ঠোঁট গোল করে ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ল স্নেহা। রাগে তার নাকের পাটা ওঠানামা করছে। তা দেখে রণয় মুখ ফিরিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসল, হাসিটা অবশ্য স্নেহার চোখে পড়ল না। রণয় এবার আরও একটু ঝুঁকে এলো স্নেহার দিকে। ভয় পেয়ে স্নেহার চোখ দুটো গোল গোল হয়ে যায়। পেছাতে পেছাতে সে তোতলাতে লাগল,

"আচ্ছা... আবারও স... স্যরি, ভাইয়া!"

রণয় ধীরে ধীরে এগোতে থাকল। তার ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি,"তাহলে হয়ে যাক কিছু ভুল আমারও?"

"কী বলছেন আপনি? এগোচ্ছেন কেন?"

"তুমিই তো ডাকলে!"

রণয়ের আকস্মিক পুরুষালী হাস্কি কণ্ঠে স্নেহার গায়ের লোমকূপ শিহরে উঠল। পেছাতে পেছাতে স্নেহার পিঠ ঠেকে একটা গাছের কাণ্ডে। রণয় আরও কাছে এগিয়ে এসে স্নেহার মাথার দু'পাশে কানের কোল ঘেঁষে হাত রেখে ওকে চারদিক থেকে আটকে ফেলল। আতঙ্কে স্নেহার ঠোঁট জোড়া কাঁপছে। তার পালানোর সব পথ বন্ধ। পেছনে শক্ত গাছ, সামনে দেয়ালের মতো রণয়, আর দুইপাশটা আটকে আছে রণয়ের দীর্ঘ বাহু দিয়ে।

কিছুক্ষণ এভাবেই থমথমে আতঙ্কে কেটে গেল। স্নেহার চোখের পাতা থরথর করে কাঁপলেও রণয়ের দৃষ্টি ছিল একদম স্থির। নিবদ্ধ ছিল স্নেহার ভয়ার্ত মুখখানাতে।

ভয় আর আতঙ্কে স্নেহার চোখের কোণে শ্রাবণের মেঘ জমে উঠল। অথচ তাতেও রণয়ের মনে মায়া হলো না। সে একচুল সরলো না। দু’হাতে ঠেলে রণয়কে সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো স্নেহা। ক্লান্ত হয়ে একসময় তার হাত দুটো রণয়ের চওড়া বুক থেকে খসে পড়ল।

স্নেহা কান্নাভেজা গলায় চিঁচিঁ করে উঠল,"আল্লাহর গজব পড়ুক আপনার ওপর!"

স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা রণয়ের ঠোঁটের কোণ একপাশে সামান্য বেঁকে গেল। তার শীতল কণ্ঠ শিশিরের মতো প্রলেপ ছোঁয়াল স্নেহার ত্বকে,

"তোমার চেয়ে বড় গজব আবার হয় নাকি?"

"আমি আবার আপনাকে কী করলাম?" স্নেহা ভেজা চোখে তাকাল।

রণয় চোখের ইশারায় নিচের দিকে ইঙ্গিত করল,"তাকিয়ে দেখো তোমার হাত কোথায়!"

ইঙ্গিত বুঝে স্নেহা নিচে তাকাল। তাকাতেই হিম হয়ে গেল সে।তার খসে পড়া একহাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে আছে রণয়ের প্যান্টের বেল্ট! চকিতে হাত সরিয়ে নিল সে। লজ্জায় কান্নাভেজা মুখটা একলহমায় লাল বর্ণ ধারণ করল।

মেয়েটির ওই রাঙা মুখটা দেখে রণয় বাঁকা হেসে কিছু একটা বলতে যাবে, তখন বেজে উঠল তার ফোন। যান্ত্রিক রিংটোনে রণয়ের মনযোগে ছেদ পড়ল। সে পকেট থেকে ফোন বের করার উদ্দেশ্যে হাত সরাতেই, এই সুবর্ণ সুযোগে হাওয়া হয়ে গেল স্নেহা!

চমকে উঠল রণয়। সামনে তাকিয়ে দেখে মেয়েটা ইতিমধ্যে অনেক দূরে দৌড়ে চলে গেছে। খানিকটা গিয়ে হঠাৎ স্নেহা ঘুরে দাঁড়াল। তারপর মাথার ওপর বুড়ো আঙুল তুলে ভেংচি কেটে দূর থেকে চেঁচিয়ে বলল

"আমার স্যরি ব্যাক, অসভ্য লোক!"

ভেংচি কেটেই এক দৌড়ে চম্পট দিল। আজ আর থামার কোনো লক্ষণ নেই। স্নেহার এই চঞ্চল রূপ আর পাগলাটে দৌড় দেখে পেছন থেকে ফিক করে হেসে ফেলল রণয়।

______

“এই তিব্বত সাবান, দাঁড়াও!”

অতর্কিতে থমকে যায় তিবা। তাড়াহুড়োয় সকালে নাস্তা না করেই বেরিয়েছে। এখন ক্ষুধার জ্বালায় পেটের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠছে। তাই সে ক্যান্টিনে খেতে এসেছিল। কিন্তু এমন উদ্ভট ডাকে থতমত খেয়ে যায় সে। লজ্জায় যেন গলা শুকিয়ে আসে।

ধীরে ধীরে পিছন ফিরে তাকাতেই চোখ পড়ে আদিলের ওপর। মাথা নিচু আর চাপা কণ্ঠে তিবা বলল,

“আমার নাম তিবা বুশরা, ভাইয়া।”

আদিল বুক ফুলিয়ে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায়। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি নিয়ে কয়েক পা এগিয়ে আসে তিবার দিকে। তারপর হঠাৎ করেই তার কণ্ঠে ঝরে পড়ে কটাক্ষ,

“বাহ্! বান্ধবীর কাছ থেকে তো ডায়লগ বেশ ভালোই রপ্ত করেছ দেখছি! তা কোথায় সে? ঝগড়ার উড়নচণ্ডীটা আজ এত নিখোঁজ কেন?”

কথাগুলো শুনে রাগে ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে তিবার। তবুও নিজেকে সামলে নেয়। সে স্বভাবগতভাবেই লাজুক, স্নেহার ঠিক উল্টো। চোখ নামিয়ে চুপচাপ আঙুল কচলাতে কচলাতে নিচু স্বরে বলল,

“ওকে এভাবে বলবেন না, ভাইয়া। স্নেহা অনেক ভালো মনের মেয়ে।”

তিবার কথা শুনে শব্দ করে হেসে ওঠে আদিল। তিরস্কারের হাসি। তার সুবিস্তৃত, সুঠাম বুক কেঁপে ওঠে ওই হাসির তোড়ে। নিহাল তড়িঘড়ি করে আদিলের হাত চেপে ধরে ওকে থামানোর চেষ্টা করে, কারণ পাশেই বসে আছে ওদের যম।

কিন্তু আদিল থামে না, বরং তার হাসির তীব্রতা আরও বাড়ে। ঝগড়াটে মেয়েটার ওপর জমে থাকা সব ক্ষোভ যেন বের হয়ে আসছে তার গলা কাঁপানো ওই হাসির ভেতর দিয়ে। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল আদিল,

“সে যে কত ভালো মনের, এই ক’দিনেই হাড়ে হাড়ে বুঝে গেছি! আস্ত একটা বুম্বাই মরিচ! তা কোথায় সে...”

শেষ কথাটা একটু চেঁচিয়েই বলে সে। রণয় আর অনির্বাণ বিরক্ত হয়ে তাকায়, তবে কিছু বলে না। নিহাল আর আদিল যদিও ওদের দু’বছরের জুনিয়র, তবুও সর্বক্ষণ আঠার মতো লেগে থাকে। তাছাড়া রাজনৈতিক কাজেও ছেলে দুটো যথেষ্ট সাহায্য করে। একটা সংগঠনে অনেক মানুষের দরকার হলেও, সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিশ্বস্ত অনুসারীর।ওরা ঠিক সেই দলে পড়ে। প্রকাশ্যে না বললেও রণয় ওদের বেশ স্নেহ করে। তবে এত শাসনের পরও দুটোর একটাকেও সোজা করা যায়নি, বিশেষ করে এই আদিলকে। বড্ড বেশি বাচাল সে। মুখ চলে রকেটের গতিতে। সারাক্ষণ অহেতুক প্যাঁচাল পাড়তেই থাকে। রণয়ের মতো গম্ভীর স্বভাবের মানুষের জন্য আদিল যেন গলার কাঁটা! বিরক্তিতে চরম সীমায় পৌঁছে টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে যায় রণয়।

ঠিক তখনই তিবা ধীরে বলে ওঠে,,

“ও আসবে না। অসুস্থ।”

থমকে দাঁড়ায় রণয়। দাঁড়িয়ে পড়ে অনির্বাণও। রণয়ের গম্ভীর মুখটা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। চোখে অজানা উদ্বেগের ছায়াও লক্ষ করা গেল। ভ্রু কুঁচকে সে তিবার দিকে তাকায়।

আদিল তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলে,“অসুস্থ! আবার কার সাথে লাগতে গিয়েছিল? নির্ঘাত মার খেয়ে এসেছে! খাবেই তো, সবাই কি আর আমার মতো ভদ্র?”শার্টের কলার দুটো টেনে হিরো ভাব নিতে ভুললো না আদিল।

“সবাই ভদ্র না হলেও, আপনার মতো আস্ত একটা গাধা না!”

তড়িৎ গতিতে পেছনে ফিরে তাকায় আদিল। একই সঙ্গে ক্যাফেটেরিয়ার সবার দৃষ্টি ঘোরে দরজার দিকে। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে স্নেহা। তিবা সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে স্নেহার পাশে দাঁড়ায়। তার চেহারায় এতক্ষণে সাহসের আভা ফুটে উঠেছে, কারণ তার আইটেম বোম যে এসে গেছে!

আদিল হাঁ করে তাকিয়ে থাকে ক্ষণকাল। পরক্ষণেই গলায় দাপট এনে ধমকে ওঠে,“এই মেয়ে! তুমি না অসুস্থ? এসেই আবার শুরু করে দিলে?”

স্নেহা এক পা এগিয়ে এসে তীক্ষ্ণ স্বরে জবাব দেয়,“না আসলে তো জানতাম না যে গাধা হওয়ার পাশাপাশি আপনি একজন ইভটিজারও। আমার বান্ধবীকে একা পেয়ে টিজ করা হচ্ছে? অসভ্য কোথাকার!”

আদিলকে কোনো জবাব দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই হনহন করে তিবার হাত ধরে টেনে বের হয়ে যায় স্নেহা। আদিল অপমানে ফেটে পড়ার মতো অবস্থায় থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

স্নেহা রণয়কে খেয়াল করেনি। কিন্তু রণয়ের তীক্ষ্ণ চোখ গিয়ে পড়ে স্নেহার হাতের সাদা ব্যান্ডেজটার ওপর। সেখানে গিয়েই তার নিরীক্ষণময় দৃষ্টি আটকে যায়। কালও তো হাতটা ঠিকই ছিল। এক রাতে এমন কী ঘটল? ইনফেকশন ছড়ালো নাকি?

অজানা অপরাধবোধ ভেতর থেকে গিলে খেতে থাকে রণয়কে। শব্দহীন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্লাবের দিকে হাঁটতে শুরু করে সে। সামনে ইলেকশন, অনেক কাজ জমে আছে।

_______

“রাতে বললি কেন আসবি না?”

ক্লাসের দিকে হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করে তিবা। সমান্তরাল তালে পা মিলিয়ে স্নেহা জবাব দেয়,

“ভাইয়াব্বু নিষেধ করেছিল। আর রাতে পেটে খুব ব্যথা হচ্ছিল... কয়েকবার বমিও হলো।”

“কেন?”

“ভাইয়াব্বু ভোরে একটা কেসের তদন্তে বেরিয়েছে। সকালে ব্যথা একটু কমলেও একা আসতে মানা করেছিল। তা ছাড়া আমি তো এখানে কাউকে চিনিও না।”

“তাহলে কে দিয়ে গেল?”

“আব্বু।”

তিবা একটু চমকে স্নেহার দিকে তাকাল। স্নেহার ওষ্ঠপুটে তখন বিদ্রূপাত্মক হাসি। সে ফিচেল হেসে বলল,

“রেজাল্ট ভালো লাগবে, প্রতিটা পরীক্ষায় নব্বই প্লাস, সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স, ফার্স্ট ক্লাস—এগুলো কি আর বাসায় শুয়ে শুয়ে অসুস্থ হয়ে পাওয়া যায়?”

তিবা তাকিয়ে দেখে, স্নেহার চোখের কোণে চিকচিক করছে জল। গড়িয়ে পড়তে চাইলেও স্নেহা নিজেকে শক্ত করে আটকে রেখেছে। আর থাকতে পারে না তিবা, দুই বাড়িয়ে কাঁপতে থাকা শরীরটা আলতো করে জড়িয়ে ধরে। স্নেহা মৃদু হাসে। তাচ্ছিল্যে, বেদনায় আর হাহাকারে। সেই হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ে নিরিবিল করিডোরের কোণায় কোণায়, প্রতিধ্বনিত হয় চারপাশ জুড়ে। মনে হয়, কেউ যেন বুকভরা ব্যথা গিলে ফেলে জোর করে হাসছে। তিবা একদম চুপ। সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা তার মুখে নেই, শুধু অনুভব করতে পারছে স্নেহার ভেতর জমে থাকা একরাশ পাথরচাপা অভিমান।

হঠাৎ তিবার চোখ পড়ে স্নেহার হাতের দিকে। আঁতকে ওঠে সে। দ্রুত আলতো হাতে স্নেহার কব্জিটা নিজের মুঠোয় তুলে নেয়। তার নিজের চোখদুটোও জলে ভিজে আসে। ভেজা কণ্ঠে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে,

“হাতে কি হয়েছে?”

স্নেহা দীর্ঘ তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ঠোঁট গোল করে সে তিবার কাছ থেকে আসল সত্যটা চেপে যায়। জন্ম থেকেই স্নেহার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। অল্পতেই শরীর ভেঙে পড়ে। তাছাড়া ওর রক্তের গ্রুপটাও বেশ দুর্লভ। কাল রাতে ব্যথায় হাতটা ফ্যাকাসে হয়ে এতই করুণ রূপ ধারণ করেছিল যে ইনফেকশনের আশঙ্কা ছিল। তাই আর কোনো ঝুঁকি নেয়নি স্নেহ। ব্যান্ডেজ করিয়ে নিয়েছে।

_____

"স্নেহা তাফসি কে?"

ক্লাস চলাকালীন হঠাৎ দারোয়ানের ডাকে চমকে ওঠে স্নেহা। সকলের দৃষ্টি একযোগে গিয়ে পড়ে তার ওপর।

“চারু ভবনে ডাকছে, গার্ডিয়ান এসেছে।”

বলে দারোয়ান চলে যায়। স্নেহার বুক ধক করে ওঠে। গার্ডিয়ান? আব্বু? অসম্ভব! তাহলে ভাইয়াব্বু? চোখে এক টুকরো হাসি খেলে যায় ওর। নিশ্চিত জেনে গেছে এতক্ষণে স্নেহা যে, পেটে ব্যথা নিয়েই ক্যাম্পাসে এসেছে। নিশ্চয়ই চিন্তায় কাজ করতে পারছিল না, তাই চলে এসেছে! একটুখানি শান্তির শীতলতা ছুঁয়ে যায় স্নেহার বুক। হালকা হাসিতে ঠোঁট বেয়ে আলতো করে নেমে আসে প্রশান্তি।

চারু ভবনের দিকে পা বাড়ায় সে। কিন্তু সেখানে পৌঁছেই থমকে দাঁড়ায়। চতুর্দিকে নিস্তব্ধতা। কেউ নেই। সম্পূর্ণ ভবন নিঃসঙ্গ ও ফাঁকা। কেমন অপার্থিব লাগছে আজ চারুকলা ভবনটাকে! এই ভবনে সে আগে কখনো আসেনি। কিন্তু তাকে এখানে ডাকল কেন? তাও আবার এমন খালি জায়গায়?

জিজ্ঞাসু চোখে চারিদিকে তাকায় স্নেহা। কী হতে চলেছে এখানে? তৎক্ষণাৎ হঠাৎ মনে পড়ে, একবার গল্প করতে করতে স্নেহ বলেছিল চারুকলার কথা। প্রায়ই ছাদে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিত সে। হয়তো স্নেহ ছাদে আছে, এই ভেবে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায় স্নেহা। তৃতীয় তলায় উঠতেই কানে আসে অদ্ভুত শব্দ। স্নেহ আছে ভেবে আগ্রহে এগিয়ে যায় স্নেহা। কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা সংকোচন। হঠাৎ এক হেঁচকা টানে শিউরে ওঠে স্নেহা। কিছু বোঝার আগেই কেউ তাকে টেনে নিয়ে গিয়ে এক রুমের দেওয়ালের সাথে চেপে ধরে।

চিৎকার করতে যাবে, ঠিক তখুনি মুখ চেপে ধরে একটি শক্ত, রুক্ষ, পুরুষালী হাত। মস্তিষ্ক থমকে যায়! শরীর জমে যায় ভয়ে। দুচোখ আঁটসাঁট করে বন্ধ করে রাখে স্নেহা। দ্রুত উঠতে-নামতে থাকে তার নিঃশ্বাস।

“হেই, ওপেন ইউর আইস।”

পরিচিত কণ্ঠে গা শিহরিত হয়ে ওঠে স্নেহার। ধীরে ধীরে জেগে ওঠে চিন্তা। পরিচিত সেই হালকা, ম্যানলি পারফিউমের গন্ধ... আস্তে আস্তে চোখ মেলে তাকায় স্নেহা। রণয়কে এতটা কাছ থেকে দেখে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যায় সে। রণয় ঝুঁকে আছে একদম তার মুখোমুখি, তাই আর তাকে ঘাড় তুলে তাকাতে হয় না উপরের দিকে।

সেদিনের বেয়াদবির কথাগুলো মনে হতেই শরীর কেঁপে ওঠে স্নেহার। তিবার কথা অনুযায়ী এখন যদি তাকে মেরে গুম করে দেওয়া হয়? এই কদিনে সে জেনেছে, রণয়ের রাগ কতটা ভয়ঙ্কর! মন্ত্রীর ছেলে হওয়ায় প্রিন্সিপাল থেকে প্রফেসর, কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না। চলে সে নিজের নিয়মে। তবে সে সকলের প্রিয় তার ভদ্রতার জন্য।

কিন্তু এখন...?
রণয় উপভোগ করছে স্নেহার আতঙ্কিত মুখভঙ্গি। অনড়ভাবে ঝুঁকে তাকিয়ে আছে স্নেহার কাঁপতে থাকা ঠোঁটের দিকে। স্নেহার ভয় বেড়ে যায় আরও। গলায় দলা পাকিয়ে আসে কান্না। জরাজীর্ণ গলায় সে বল,

“ভা… আ ভাইয়া… আআসছে… আআমার যেতে দিন।”

বলতে বলতে হেঁচকি উঠছে স্নেহার। গলার স্বর আর কান্নার দমকে কথাগুলো ভেঙে যাচ্ছে।

সরে না রণয়, না যেতে দেয় স্নেহাকে। ঝুঁকে একগুঁয়ে অনড় দৃষ্টিতে তাকিয়েই আছে। ঠোঁটের কোণায় একটুখানি শয়তানি হাসির ঝলকানি। সে কুটিল হেসে জানতে চাইল,

“কার ভাইয়া?”

“আ-আম আমার।”

“এখানে তো আমি ছাড়া কেউ নেই। আর না কেউ আসতে পারবে আমার অনুমতি ব্যতিত।”

চমকে ওঠে স্নেহা। তাহলে কী এটা একটা ফাঁদ? ষড়যন্ত্র করে ডেকে আনা হয়েছে তাকে! ওই দিন ভেংচি কেটে পালানোর জন্য, নাকি আদিলের সাথে ঝগড়া করার প্রতিশোধ নিতে এসেছে ওরা? তবে কি সবাই দলবদ্ধ হয়ে এসেছে? যদি সত্যি... যদি মে রে ফেলে, লা শ গু ম করে দেয়, তাও তো কেউ জানবে না! তিবা নিজেই তো বলেছিল!

ভাবনার ভারে চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে পড়ে। হঠাৎ হেঁচকি উঠে যায় স্নেহার। কাঁপতে থাকে সে। তাতেও রণয় তাকে একটুও ছাড়ে না। দুপাশে হাত রেখে দেয়ালে আটকে রেখেছে এখনো। স্নেহার চোখ ফুলে উঠেছে কান্নায়। রণয় সেই কান্নায় অমৃতের তৃপ্তি নিয়ে দেখল।

স্নেহার ওষ্ঠজোড়া কাঁপছে থরথরিয়ে। হঠাৎ ধমকে ওঠে রণয়,

“এই মেয়ে, স্টপ ক্রাইং। স্টপ!”

“আ..আ--পনি... আপনি আমাকে মেরে ফেলার জন্য এখানে এনেছেন, তাই না? আমি তো সেদিন সত্যিই সরি বলতে গিয়েছিলাম। একদম মন থেকে! বলেওছিলাম আপনাকে, কিন্তু আপনি তো শোনেনইনি... উল্টো ভয় দেখিয়েছিলেন। আমি সত্যি ইচ্ছে করে ভেংচি কাটিনি৷ ওটা জাস্ট... মুখ দিয়ে এসে পড়েছিল! প্লিজ, বিশ্বাস করুন আমাকে। আমি তিবার কসম খেয়ে বলছি, আর কখনো এমন করব না। আপনাদের কারো সাথে কথাও বলব না। প্রতিদিন সামনে পড়লে সালাম দেব, আপনাদের অ্যাসাইনমেন্টও করে দেব... তাও আমাকে মারবেন না, প্লিজ! আমি... আমি ভাইয়াব্বুর কাছে যাব… যাবববব! ভাইয়াব্বুওওওওওওওওও!"

কথাগুলোর মাঝেই একটা জোর হেঁচকি উঠে আসে স্নেহার। অসহায় সেই কণ্ঠে কেঁপে ওঠে আত্মার সুগভীর তলদেশ। স্নেহার আকুতি শুনে রণয় তো তাজ্জব বনে যায়!

“মেরে ফেলব মানে? এই মেয়ে, কী সব উল্টাপাল্টা বকছ? প্রতিদিন সালাম দেবে... মুখ দিয়ে এসে পড়েছিল... কী সব আবোলতাবোল বকছ?”

রণয়ের প্রশ্নে আবারও ফ্যাসফ্যাসে গলায় আহাজারি জুড়ে দেয় স্নেহা, “আমি আবার সরি বলছি! ওই দিন ওভাবে কথা বলাটা আমার ঠিক হয়নি। প্লিজ, ক্ষমা করে দিন আমাকে। আমি আর কোনোদিন আপনার সামনে আসব না, প্রমিজ!”

রণয় মুখটা গম্ভীর করে এবার প্রচন্ড শক্ত গলায় বলল,

“এই মেয়ে, থামাবে তোতাপাখির মতো এই অনর্গল বকবক?”

স্নেহা নাক টেনে, ভয়ে ভয়ে একদম ক্ষীয়মাণ স্বরে বলেল,“স্নেহা... আমার নাম স্নেহা।”

রণয় এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ায়। শক্ত করে ঠোঁট চেপে ধরে সে, কোনোমতে হাসিটা চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে। মনে মনে ভাবে, এবার নির্বাচনের ব্যানার বানানোর সময় এই মেয়ের জন্যও একটা বানাতে হবে। যেখানে প্রকাণ্ড অক্ষরে লেখা থাকবে— ‘স্নেহা, আমি স্নেহা। আমার নাম স্নেহা!’ তাহলে অন্তত আর কাউকে কষ্ট করে বারবার নাম মনে করিয়ে দিতে হবে না।

কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা। এরপর খানিকটা গম্ভীর ও গভীর গলায় প্রশ্ন করে রণয়, “হাতে কী হয়েছে?”

প্রশ্নটা শুনে আবার আঁতকে ওঠে স্নেহা। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় তার।

“কী হলো? বলছ না কেন?” রণয়ের গলায় এবার সামান্য অস্থিরতার কাঁপন। কৌতূহলের সাথে তাতে মিশে আছে এক চিলতে প্রচ্ছন্ন উদ্বেগ।

স্নেহা মুখ নিচু করে কাঁপা গলায় বলল, “বা... বাইক থেকে পড়ে গিয়েছিলাম।”

ডাহা মিথ্যা কথা! তবু এই মুহূর্তে রণয়ের চোখ থেকে সত্যিটা লুকাতে এটাই সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। রণয় তীব্র সন্দেহ নিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকায় স্নেহার দিকে। কাল সন্ধ্যায়ও তো মেয়েটা একদম ঠিকঠাক ছিল, তাহলে হঠাৎ কী এমন ঘটল?

স্নেহার ঘন ঘন হেঁচকির শব্দে রণয়ের কল্পনার ঘোর কাটে। মেয়েটার চোখ-মুখ কেঁদে একদম ফুলে লাল হয়ে গেছে, পলকহীন চোখের পাতা দুটো অনবরত কাঁপছে।

হঠাৎ-ই রণয়ের দৃষ্টি গিয়ে থমকে দাঁড়ায় স্নেহার কাঁপা কাঁপা ঠোঁট দুটোর ওপর। কান্নার তোড়ে ঠোঁট দুটো বারবার ভেঙে আসছে, আর চিবুকটা কাঁপছে থরথর করে। একদম বাচ্চাদের মতো অবুঝ ভঙ্গিতে ঠোঁট উল্টে কাঁদছে সে। এই সামান্য দৃশ্যটুকুই রণয়কে মুহূর্তের মধ্যে রহস্যময় ঘোরের গভীরে নিয়ে যায়। সেদিন গাড়িতে বসে মনে আসা সমস্ত উদ্ভ্রান্ত ভাবনাগুলো যেন আবার তাড়া করে ফেরে তাকে। এই প্রথমবার নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অদ্ভুত দুর্বলতা অনুভব করে রণয়। মনে হয়, সে বুঝি নিজেকে হারিয়ে ফেলছে।

নিজের ভেতরের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও নিষিদ্ধ ইচ্ছাকে দমন করতে দ্রুত স্নেহার থেকে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়ায় রণয়। ঘন নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালায়।

স্নেহা অশ্রুসজল চোখে মাথা তুলে তাকায়। তার ঠোঁট দুটো তখনো কাঁপছে, চোখের পাতায় জড়িয়ে আছে ভেজা জলকণা।

রণয় আর এক সেকেন্ডও শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। তার মনের ভেতর জমে ওঠা তীব্র অস্থিরতা এক ঝটকায় কণ্ঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে,

“এই মেয়ে, ঠোঁট কাঁপানো বন্ধ করো। বন্ধ করো বলছি! এক্ষুনি!”

ধমকের মতো কথাগুলো বেরিয়ে আসে, তবে তার দৃষ্টি ততক্ষণে অন্যদিকে ঘুরে গেছে। স্নেহা কিছুই বুঝতে পারে না, কেবল একরাশ প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল রণয়ের মাদকীয় চোখ দুটোই।

হঠাৎ রণয় ক্ষিপ্র বেগে আবারও এগিয়ে আসে, এক ধাক্কায় স্নেহার মুখের বড্ড কাছে এসে দাঁড়ায়। এতটাই কাছে যে, রণয়ের তপ্ত নিশ্বাস এসে আছড়ে পড়ে স্নেহার মুখে। অচেনা আকর্ষণে স্নেহা অদ্ভুতভাবে শিহরিত হয়ে ওঠে। ভয় আর বিভ্রান্তিতে পিছিয়ে যেতে গিয়ে পিঠ ঠেকে যায় শক্ত দেয়ালে।

"এই নেশায় আমাকে নাজেহাল করো না, মেয়ে৷ ধ্বংস তোমারই নিশ্চিত হবে!"

রণয়ের গভীর কথার অর্থ বুঝতে না পেরেই স্নেহা বলল,"আমাকে যেতে..." কথা শেষ করতে পারে না স্নেহা। অকস্মাৎ রণয়ের তর্জনী এসে থামিয়ে দেয় তার ঠোঁটের স্পন্দন। বিস্ফোরণ চোখ মুহুর্তেই কপালে উঠে যায় স্নেহার। স্নায়ুর প্রতিটি কোষে যেন বিদ্যুৎ ছুটে যায় তির্যক বেগে। গলায় আটকে আসে নিশ্বাস, বুকের ভেতরটা এমনভাবে ধুকপুক করে ওঠে যেন ভেতরে অজস্র করতাল বাজছে। শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাভাবিক ছন্দ কেঁপে ওঠে বারবার। জীবনে এই প্রথম কোনো পুরুষের এত কাছাকাছি আসা, এতটা গা ঘেঁষে স্পর্শ অনুভব করা। শরীর যেন হঠাৎ-ই অসাড় হয়ে পড়ে। সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে সে।

স্নেহা ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে নিলে সন্তপর্ণে ওকে ধরে ফেলে রণয়। ঠোঁট থেকে সরে যাওয়া আঙুল এবার স্নেহাকে আগলে নেয় তার শক্ত বুকের মধ্যিখানে।

স্নেহার অবশ শরীরটা তখন রণয়ের বুকের সাথে লেপ্টে রয়েছে। ঘটনার আকষ্মিকতায় রণয়ের মনে উঁকি দেয় হাজারটা প্রশ্ন। এটা কি সেই একই মেয়ে? যে সুযোগ পেলেই গায়ে পড়ে ঝগড়া করে, অদম্য সাহসে চোখে চোখ রেখে কথা বলো? আর এখন এতটা নিঃসহায়, এতটা কোমল? এই সামান্য স্পর্শেই এভাবে কাবু হয়ে গেল?

তবে রণয়ের ভুল ভাঙতে সময় লাগে না। পরের মুহূর্তেই স্নেহা নিজের সমস্

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 4 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন