ফন্ট সাইজ:
থিম:
কে বাঁশি বাজায় রে

পর্ব 5

লেখক: মিথুবুড়ি

#কে_বাঁশি_বাজায়_রে
#মিথুবুড়ি
#পর্ব_০৫

"ভাই, রমেশের একটা ব্যবস্থা এবার করতেই হবে।"

খবরের কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে এক ঝলক সাজনের দিকে তাকাল রণয়। ফের পেপারে চোখ রেখে শান্ত গলায় বলল,

"সময় হোক।"

সাজনের মুখে অসন্তুষ্টি। সে একধাপ এগিয়ে এসে নিচু গলায় জানাল,

"ভাই, কালও উত্তরার পার্টি অফিসে দলবল নিয়ে গিয়ে ভাঙচুর করেছে।"

রণয়ের শীতল কণ্ঠ,"ওর বাড়ি আস্ত আছে কিনা দেখে নিস।"

সাজন আর কিছু বলল না। স্মিত হেসে ক্লাবঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার আর কিছু বোঝার বাকি নেই। কারণ যা হওয়ার ছিল তা তো আগেই ঠিক করে রেখেছে রণয়।

______

"আজ ক্যান্টিনে খাব না, চল বাইরে ফুচকা খাই।" হঠাৎ চটপটে ভঙ্গিতে বলে ওঠে স্নেহা।

তিবা তাতে পাত্তাও না দিয়ে ফোনে একমনে স্ক্রল করে যেতে থাকে। তিবার এহেন নির্লিপ্তায় স্নেহার কপালে ভাঁজ পড়ে, ভ্রু কুঁচকে যায়। এই নিরাসক্তি আর সহ্য না পেরে সে এবার তিবার কাঁধ ধরে বায়না ধরে বসে,"কী হলো! চল না প্লিজ!"

তিবা ঝাঁঝিয়ে উঠল,"পাগল পেয়েছিস আমাকে? তোকে নিয়ে রাস্তার ফুচকা খাই, আর পরে তোর পেট খারাপ হোক। পরে স্নেহ ভাই এসে আমাকে ঝাড়ুক? নো থ্যাঙ্কস, বেবি!"

মুহুর্তেই স্নেহা ফোলা বেলুনের মতো চুপসে গেল। তবে সে-ও আর দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। শুরু হয়ে যায় তার চিরপরিচিত অধ্যায় 'দ্য মেলোড্রামা অফ স্নেহা তাফসি'। ইমোশনাল টাচ মারতে শুরু করে সে,

"ভেবেছিলাম কেউ বুঝুক না বুঝুক, তুই অন্তত বুঝবি আমাকে। জীবনের শেষ অবধি হাত ধরে থাকবি। শেষে দেখ, তুই-ও বদলে গেলি! জীবনে আর কী কষ্ট বাকি আছে বল? বেঁচে থাকলে আর কত কিছু দেখতে হবে! তার চেয়ে বরং মরে যাই আমি। চলে যাই, আমাকে ছেড়ে দে, ছেড়ে দে..."

তিবা খুব মন দিয়ে তার এই নাটকীয় অভিনয় দেখে। মনে মনে ভাবে, এই মেয়ে অভিনয়ে নিশ্চিত দশে দশ পাবে! তবে এখন আর আগের মতো এসব নাটকে তার গায়ে লাগে না। এই পুরোনো কৌশলগুলো তার কাছে একেবারেই আউট অফ মার্কেট লাগে।

তিবা ভালো করেই জানে, স্নেহা প্রচন্ড জেদ্দি। ফুচকা খাবে মানে খাবেই! চাওয়া না মেটা পর্যন্ত এই ড্রামা চলতেই থাকবে। ঠোঁট গোল করে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে তিবা। তারপর কাঁধে ব্যাগ তুলে দাঁড়িয়ে স্নেহার দিকে তাকিয়ে বিতৃষ্ণা ভরা মুখে বলল,

"হ্যাঁ বুঝেছি, তোর জীবনে কষ্টের শেষ নেই। মরতে হবে না, চল মা আমার! তোকে বি ষ খাইয়ে নিয়ে আসি।"

তিবার কথা শেষ হতে না হতেই স্নেহা ঝাঁপিয়ে পড়ে ওকে জড়িয়ে ধরল। হঠাৎ স্নেহার ওমন ঝড়ো আচরণে তিবা হোঁচট খেতে খেতে কোনোমতে বেঞ্চ ধরে নিজেকে সামলে নেয়। বেজায় বিরক্ত হয়ে বকাঝকা করতে গিয়েও সে দমে যায়। মেয়েটা যতক্ষণ বাইরে আছে, থাক না একটু নির্ভার! একটাই তো জীবন, ক’টা সুখই বা জোটে মেয়েটার কপালে? দুজন আপন মনে গল্প করতে করতে টিএসসির দিকে এগিয়ে চলে।

বাতাসে মিশে যায় দুই সখীর হাসির রিনঝিনে সুর। আজকের আবহাওয়াটা বড্ড অদ্ভুত ও শীতল, ঠিক যেন বৃষ্টি নামার ঠিক আগের মুহূর্তের আভাস। চারপাশে হালকা ঠান্ডা বাতাসের ছোঁয়া, মনে হয় আশেপাশে কোথাও সবে বৃষ্টি হয়ে গেছে। এই আবেশময় প্রকৃতি মনটাকেও অপূর্ব প্রশান্তিতে ভরে তুলেছে। দূর থেকে ভেসে আসছে পাখির কিচিরমিচির, আর পূর্ব দিক থেকে বয়ে আসা দমকা হাওয়া এলোমেলো করে দিচ্ছে কেশরাশি।

বটগাছের নিচে আসতেই ওষ্ঠযুগল হতে মিলিয়ে যায় পদ্ম কোমল হাসি। রোষে স্নেহার চোয়ালের পেশিগুলো টনটন করে ওঠে। সে ক্ষুব্ধ চোখে তাকায় আদিলের দিকে। আদিলের চোখেও তখন একই আগুন; যেন সাপে-নেউলে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে! চোখের পলক না ফেলে দুজনেই যেন একে অপরকে এক নজরেই ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে। এমন সময় নিহালের ধাক্কায় আদিল বাধ্য হয় মাথা নিচু করে ফেলে, অনেকটা পরাজিত যোদ্ধার মতো।

ভেংচি কেটে স্নেহা যখন দৃষ্টি ফেরায়, তখন তার চোখ গিয়ে পড়ে পাশের রণয়ের ওপর, যে অনেকক্ষণ ধরেই সেই চেনা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তার দিকে। লোকটার এই শীতল, একগুঁয়ে চাহনিতে স্নেহার শরীর কেঁপে ওঠে। সারা গায়ে বয়ে যায় অদ্ভুত শিহরণ। এই লোকটা তাকে খুব কাছ থেকে স্পর্শ করেছিল! তার উষ্ণ তর্জনী ছুঁয়ে গিয়েছিল স্নেহার ওষ্ঠ, নিঃশ্বাসে মিশে গিয়েছিল তার মুখাবয়ব! চোখে ছিল অচেনা ঘোর! বলিষ্ঠ শরীরের পটভূমিতে ঢলে পড়েছিল স্নেহা!

আশ্চর্যজনকভাবে, সেদিন লোকটার হৃদস্পন্দনও ছিল অস্বাভাবিক রকমের দ্রুত! শক্ত হাতের আঁকড়ে ধরা, সেই আগুনমাখা স্পর্শ...মনে পড়তেই স্নেহা তিবার হাত ধরে দ্রুত অন্য দিকে চলে যায়। পেছনে পড়ে থাকে রণয়ের বাঁকা ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা রহস্যময় বিদ্রূপ।

এদিকে দূর থেকে তিবাকে একসাথে দুটো ফুচকা খেতে দেখে আদিল ঘাড় নিচু করে বিড়বিড় করে বলে ওঠে,

"মুখ তো নয়, যেন গুহা। রাক্ষস একেকটা!"

এরপর স্নেহাও যখন মুখে একযোগে দুটো ফুচকা পুরে দেয়, তখন সে দাঁতে দাঁত পিষে ফিসফিস করে বলে ওঠে,

"রাক্ষসের বইন কুক্ষস!"

প্রতিদিনের মতো আজও সেই শতবর্ষী ঐতিহাসিক বটগাছের নিচে জমেছে আড্ডা। হাসি, ঠাট্টা, গল্প আর খুনসুটি সবই চলছিল আপন ছন্দে। হঠাৎ-ই পরিবেশের সেই ছন্দ ভাঙল ফুঁসতে থাকা গরগর শব্দে। উৎসুক সবার অনুসন্ধানী দৃষ্টি চলে গেল সামনের দিকে। আর তখনই রণয়ের চোখ গিয়ে আটকে পড়েছিল একটি চেনা মুখের ওপর। সেই দৃষ্টি এখনও অনড়।

আজ স্নেহা যে অন্য এক স্নেহা। প্রতিদিনের মতো পরনে পাশ্চাত্য টপস নেই। তার বদলে নরম তনুতে জড়িয়েছে জন্মদিনে ভাইয়ার দেওয়া সবুজ রঙের থ্রি-পিস। স্নেহার দুধে-আলতা গায়ে রঙে সবুজ পোশাকের ছোঁয়া যেন অনবদ্য সৌন্দর্যের দ্যুতি ছড়াচ্ছে। কপালের পাশে অবাধ্য বেবি-হেয়ারগুলোও আজ সুবিন্যস্তভাবে ক্লিপে আটকানো। এই আলতো পরিবর্তনটুকুই অলৌকিক বদল এনে দিয়েছে ওর রূপানুপাতে। আজ আর ওকে একদমই বাচ্চা, বাচ্চা লাগছে না। বরং অষ্টাদশীর চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে পূর্ণাঙ্গ, ম্যাচিউরিটি এবং আত্মবিশ্বাসী নারীর অমলিন ঔজ্জ্বল্য।

স্নেহার পায়ের দিকে তাকাতেই রণয়ের মানসপটে ভেসে উঠল গতকালের সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। দৌড়ানোর সময় স্নেহার পায়েল ছিঁড়ে একটি ছোট্ট মুক্তো ছিটকে পড়েছিল মাটিতে। সেটা হয়তো স্নেহার নিজেরও খেয়ালে ছিল না, কিন্তু রণয়ের নজর তা এড়ায়নি।

স্মৃতির টানে পকেট থেকে ওয়ালেটটা বের করল রণয়। একটু খুঁজতেই আঙুলের স্পর্শে ধরা দিল মুক্তোটি। অজান্তেই রণয়ের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল উষ্ণ
হাসি। হাতের মুঠোয় আলতো করে তুলে নিল পুঁচকে পার্লটা। ধূলিকণায় মিশে যেতে থাকা একটা তুচ্ছ, অযত্নে পড়ে থাকা বস্তু, যেটাকে সে যত্ন করে আগলে রেখে দিয়েছে নিজের সবচেয়ে ব্যক্তিগত জায়গাটায়।

"শি ইজ টু কিউট, নাহ?" হঠাৎ কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বলে উঠল অনির্বাণ।

রণয় একপলক বন্ধুর দিকে তাকাল। কোনো উত্তর না দিয়ে ধীরেসুস্থে মুক্তোটি আবার মানিব্যাগের ভেতরে যত্ন করে রেখে দিল। তারপর মিষ্টি নিঃশ্বাসে, মৃদু গলায় আওড়ালো,

"সৌন্দর্য কেবল চোখে মুগ্ধতা আনে,
কিন্তু আচরণ জয় করে নেয় আস্ত একটা হৃদয়।"

কথাটা বলার মুহূর্তেও রণয়ের ঠোঁটের কোণে লেগে ছিল মুগ্ধতায় ভরা নিঃশব্দ হাসি। অনির্বাণ অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল বন্ধুর প্রস্তরখচিত কঠিন মুখের দিকে। সেখানে তখন স্পষ্ট ফুটে উঠেছিল অনুভূতির এমন এক আলো, যা কোনো জাগতিক শব্দ দিয়ে হয়তো কখনোই বোঝানো সম্ভব নয়।

________

"কিরে, এভাবে টেনে নিয়ে আসলি কেন? ছাড় হাত!"

ঝটকা দিয়ে হাতটা ছাড়িয়ে নেয় তিবা। তারপর কামিজের হাতাটা ঠিক করতে করতে তিবা অবাক হয়ে তাকায় স্নেহার দিকে। খেয়াল করে দেখল স্নেহা বারবার উঁকিঝুঁকি মেরে পেছনে কী যেন দেখছে।

ভ্রু জোড়া কুঁচকে তিবা প্রশ্ন করে,"এভাবে বারবার পিছন ফিরে কী দেখছিস বল তো?"

তিবার প্রশ্নে চমকে ওঠে স্নেহা। মনের ভেতরের অস্থিরতা কীভাবে প্রকাশ করবে সে? কীভাবে বলবে যে, চোখ দুটো ব্যাকুল হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে সেই অসভ্য লোকটাকে, সে পিছু পিছু আসছে কি না তা দেখছে! গতকালের অপ্রীতিকর ঘটনার পর থেকে লোকটার ওপর আর বিন্দুমাত্র ভরসা রাখা পারছে না সে। স্নেহা যতই নিজেকে আড়াল করে রাখতে চায়, লোকটা যেন ঠিক ততটাই অনাহূতভাবে সামনে এসে দাঁড়ায়।

বিগত দু’দিন ধরে অজানা আতঙ্কে দিন কাটছে স্নেহার। মনে হচ্ছে, এই বুঝি লোকটা আচমকা সামনে এসে তার হাত ধরে টেনে কোনো ফাঁকা ঘরে নিয়ে যাবে! তারপর… কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে দেবে কোথাও!

না, না… আল্লাহ মাফ করুক! এখনই ম র লে চলবে না! অজানা আশঙ্কায় শিউরে উঠে শুকনো একটা ঢোক গিলে নেয় স্নেহা। বুকটা কেমন যেন তোলপাড় করছে। এখানে আর এক মুহূর্ত থাকা মানেই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসা।

স্নেহা অস্থির গলায় তিবাকে বলল,"চল, আজ আর ক্লাস করতে হবে না… বাসায় ফিরে যাই।"

তিবার চোখ কপালে,"ওমা! ভূতের মুখে রাম রাম?"

"আরে চল না প্লিজ… আর ভালো লাগছে না সত্যি।"

"আচ্ছা ঠিক আছে, চল। কিন্তু স্নেহ ভাইয়া?"

"বাসায় গিয়ে ফোন করে জানিয়ে দিব।"

"ঠিক আছে, চল বের হওয়া যাক।"

দু’জন একসঙ্গে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে গেল। ভার্সিটি থেকে স্নেহার বাসা পঁচিশ মিনিটের পথ। স্নেহার পড়াশোনার সুবিধার কথা ভেবে স্নেহ ভাইয়া নিউ মার্কেটের পাশের গলিতে বাসা নিয়েছে। তিবার গন্তব্য অবশ্য অন্য দিকে। সে খালামনির বাসায় থেকে পড়াশোনা করছে। তাই ক্যাম্পাসের বাইরে এসে দু’জন নিজ নিজ পথের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

বাস থেকে নামার পর স্নেহার বাসায় পৌঁছাতে কিছুটা পথ হেঁটে যেতে হয়। গলিটা বড্ড নিস্তব্ধ, আলো-হাওয়ার আনাগোনাও কম, জনমানবের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। এই প্রথম স্নেহা এখান দিয়ে একা হাঁটছে। এতদিন সবসময় স্নেহ পাশে থাকত। ছোট-বড় যেকোনো প্রয়োজনেই ভাই তার ছায়াসঙ্গী। ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে স্নেহার বুকের ভেতরটাই শূন্যতা আর ভয়ের ঢেউ আছড়ে পড়ছে।

প্রতিদিন ভার্সিটি যাওয়া-আসার পথে গলির মুখে একদল বখাটে ছেলেকে বসে থাকতে দেখত সে। তাদের অশ্লীল চোখগুলো গিলে খেতে চাইত স্নেহাকে। কিন্তু এতদিন স্নেহ পাশে থাকায় মুখে কিছু বলার সাহস পেত না তারা। কিন্তু আজ তো সে সম্পূর্ণ একা। এলাকার কাউকেই চেনে না সে। ছেলেগুলো যদি আজও ওখানে থাকে?

ভাবতেই পুরো শরীর হিম হয়ে আসে। ভয়ে পা দুটো যেন অবশ হয়ে আসছে। মনে মনে আয়াতুল কুরসি আর সৃষ্টিকর্তার নাম জপতে জপতে পা বাড়ায় স্নেহা। কিন্তু কিছুটা এগোতেই তার আশঙ্কা সত্যি হয়ে দেখা দেয়। গলির খাঁজ থেকে ভেসে আসছে অসভ্য ছেলেগুলোর হাসিঠাট্টার শব্দ।

তক্ষণি থমকে যায় স্নেহার দুই পা। নারীর মন নিজের নিরাপত্তা নিয়ে সবসময়ই শঙ্কায় ভোগে। বিশেষ করে ইজ্জত আর সম্মানের প্রশ্নে এসে তারা বড্ড অসহায় হয়ে পড়ে। স্নেহা বুঝতে পারে না এখন তার কী করা উচিত। স্নেহকে কল দেবে? কিন্তু সে যদি এখন ব্যস্ত থাকে? আর একটা মানুষকে সে আর কত জ্বালাবে!

কোনো উপায় না দেখে বুকের ভেতর একচিলতে সাহস জমা করে স্নেহা। তারপর বুক ভরে শ্বাস নিয়ে নিঃশ্বাস চেপে, নিজের পদশব্দটুকুও আড়াল করে নিঃশব্দে এগোতে থাকে সামনের দিকে, যেন বাতাসও টের না পায় তার এই ভীতু উপস্থিতি।

"আরে, উকিলের বোন না?"

পেছন থেকে পরিচিত অসভ্য কণ্ঠস্বরটা ভেসে আসতেই শিউরে উঠল স্নেহা। পেছনে না তাকিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটার গতি বাড়ায় সে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না। সামনে থেকে তিনটি বখাটে ছেলে বাঁকা হেসে এগিয়ে এসে ওর পথ আটকে দাঁড়ায়।

বুকের ভেতরে যেন দমরুদ্ধ হয়ে আসে স্নেহার। চোখ দু'টো ছলকে ওঠে থরথরে আতঙ্কে। কাঁপানো গলায় ও ভেতরের শেষ সাহসটুকু জড়ো করে বলল,"রা... রাস্তা থেকে সরুন বলছি।"

স্নেহার থরথর করে কাঁপা কণ্ঠ শুনে গগনবিদারি বিদঘুটে হাসিতে ফেটে পড়ে ছেলেগুলো। সেই বিভৎস হাসিতে কেঁপে ওঠে স্নেহার ছোট্ট শরীরটা। বজ্জাতগুলোর দলনেতা আরও এক ধাপ এগিয়ে আসে। আতঙ্কে স্নেহা এক পা পিছিয়ে যায়।

ছেলেটি কুৎসিত হেসে বক্রস্বরে বলে,"কেন মামণি, না সরলে কী হবে শুনি?"

"হবে তো অনেক কিছুই। কতটুকু সামলাতে পারবি বল?"

আকস্মিক পেছন থেকে বাতাসের সাথে ভয়াল ও গম্ভীর গলার দাপট ভেসে আসতেই একেবারে গুটিয়ে যায় স্নেহা। সাহস করে পেছনে ঘুরে তাকানোর শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলল সে। ভয়ে আর অসহায়ত্বে ফুঁপিয়ে উঠল দুর্বোধ্য রমণী।

ঘটনাপ্রবাহে এবার অকস্মাৎ পরিবর্তন। বখাটে ছেলেগুলো হুট করেই ভয়ে পিছিয়ে যায়। যে ছেলেটি এগিয়ে এসেছিল, সে মৃদু হেসে কিছু বলতে যায়,"ভাই, আমরা তো জাস্ট......"

কিন্তু তার কথা শেষ করার আগেই অন্য এক যুবক এগিয়ে এসে তার কাঁধে শক্ত হাত রেখে তাকে থামিয়ে দেয়। তারপর সে সংযত দৃষ্টিতে স্নেহার দিকে তাকায়। স্নেহা তখনও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে, তার চোখ দিয়ে অঝোরে শ্রাবণের কালো মেঘ গড়িয়ে পড়ছে।

আগত ছেলেটির একটিমাত্র ইশারায় মুহূর্তের মধ্যে বারো-তেরো জন তরুণ এসে ঘিরে ফেলে পুরো দলটা। কিন্তু এমনভাবে যেন কত স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই তারা এসে দাঁড়াল চারপাশে। তাদের মধ্য থেকে একজন এগিয়ে এসে স্নেহার দিকে তাকিয়ে আন্তরিক হাসি দিয়ে বলে,"ভয় পাবেন না ভাবি।"

‘ভাবি’ শব্দটা শুনতেই চকিতে চোখ তুলে তাকায় স্নেহা। অশ্রুসজল চোখে স্নেহা ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই থতমত খেয়ে যায় ছেলেগুলো। পরক্ষণেই হতচকিত ভাব সামলে নিয়ে একগাল হেসে বলল,"স্যরি আপু, একদম ভয় পাবেন না। আপনি যান ভাব.....স্যরি স্যরি আপু! এই, আপুকে যেতে জায়গা দে।"

সামনের বখাটে ছেলেগুলো ততক্ষণে ভয়ে হতবিহ্বল হয়ে দুই পাশে সরে যায় এবং স্নেহার যাওয়ার পথ করে দেয়। আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ায় না স্নেহা। ওদের কোনো কথা গায়ে না মেখে, দম আটকে থাকা বুকটা নিয়ে তৎক্ষনাৎ দৃষ্টিসীমানার বাইরে হারিয়ে যায় দ্রুত গতিতে।

স্নেহা চোখের আড়াল হতেই পলকে বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট। ঘিরে থাকা তরুণগুলো একে একে গায়ের জোরে চেপে ধরে বখাটেদের কলার। কারও চুল, কারও জামা টেনে ধরে টেনেহিঁচড়ে একত্র করে আনে। ভয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকে বখাটেরা। হাতজোড় করে মিনতি করে বলে,"ভাই... ভাই, কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাদের?"

ওদের একজন জবাব দেয়,"ঢাবির ক্লাবে। তোদের সাইজ করার কড়া নির্দেশ আসছে ওপর থেকে।" হনহন করে ওদের টানতে টানতে অন্ধকার গলির ভেতরে নিয়ে যেতে থাকে তারা।

_______

"তুমি সুচ হয়ে যদি আবারও আমার জীবনে ফিরতে চাও, কথা দিলাম, আমিও তলোয়ার হয়ে তোমার সামনে দাঁড়াব।"

মেসেজটি সেন্ড করার সঙ্গে সঙ্গে নম্বরটা ব্লক করে দিল স্নেহা। তারপর পাশ ফিরে তাকাল সেই মেয়েটির দিকে, যার চোখের কোণে জমে আছে কান্নার সমুদ্র। মেয়েটি ফুঁপিয়ে উঠছে প্রতি মুহূর্তে। ফুলে ওঠা চোখদুটোতে ভেসে আছে অসহ্য যন্ত্রণার ছায়া।

মেয়েটির এমন অবস্থা দেখে স্নেহার মনটা হু হু করে উঠল। সে এগিয়ে গিয়ে দু’হাতে জড়িয়ে ধরল মেয়েটাকে। এতে যেন মেয়েটির বুকচিরে বেরিয়ে এলো চাপা কান্নার বাঁধভাঙা স্রোত। ভাঙা গলায় সে বলল,

"ও আমাকে এত বাজেভাবে কীভাবে ঠকাতে পারল স্নেহা? এত বছরের ভালোবাসা, অথচ পরিবারের জন্য এক নিমিষেই সব ভুলে যেতে বলল! ও কীভাবে পারল এমনটা করতে?"

স্নেহা শান্ত কণ্ঠে মেয়েটিকে সান্ত্বনা দিল,"নষ্ট চরিত্রের কাউকে ভালোবাসার চেয়ে একা থাকা অনেক ভালো। যে নিজের জন্য দাঁড়াতে জানে না, যার নিজের কোনো স্পাইন কিংবা পার্সোনালিটি নেই, তোমার হাত ধরার সাহস বা তোমার জন্য লড়ার শক্তি নেই, যে শুধু তোমায় ইউজ করে আর লুকিয়ে রাখে, তেমন ছেলের সাথে কখনোই ভবিষ্যৎ হতে পারে না। শোনো, মুভ অন করো। কারণ, অপেক্ষা যেমন অন্যের জন্য করতে হয়, তেমনি নিজের কাছে করা প্রতিজ্ঞাও রাখতে হয়। না হলে একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখে চোখ রাখাও কঠিন হয়ে যায়।"

স্নেহা আলতো হাতে মেয়েটির পিঠে হাত রাখল। শান্ত সুরে আবার বলতে শুরু করল,

"নতুন করে ভালোবাসা সহজ নয়, তবে অসম্মানের স্থানে বেঁচে থাকার চেয়ে সম্মান নিয়ে একা থাকা হাজার গুণ ভালো। মানুষ কি একরকম থাকে কখনো? থাকে না। সময়ের সাথে মানুষ বদলায়, তাদের অনুভব আর পছন্দও বদলায়। তুমিও বদলাবে।"

"সত্যি বলছ... আমি কি সত্যিই পারব?"

মাথা তুলে স্নেহার চোখে আশাবাদী দৃষ্টিতে তাকাল মেয়েটি। তার চোখের কোণ থেকে তখনও জল গড়াচ্ছে৷ তবে মুখে ফুটে উঠেছে একরাশ আলোর ঝিলিক।

স্নেহা মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে দু’চোখ বুজে মাথা নাড়ল,"পারবে।"

আবেগের বশে মেয়েটি আবারও জড়িয়ে ধরল স্নেহাকে। স্নেহা তাকে সময় দিল, বুকের ওপর হাত রেখে শান্ত হতে দিল কিছুক্ষণ। এরপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে নরম গলায় বলল,

"অনেক হয়েছে, এবার ক্লাসে যাও। আমারও যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।"

কৃতজ্ঞতা মিশ্রিত আন্তরিক হাসি দিয়ে মেয়েটি বিদায় নিল। স্নেহা-ও নিজের ক্লাসের দিকে পা বাড়াল। আজ তিবা আসবে না, বাসায় আত্মীয় এসেছে। ক্লাস টাইমের খানিক আগেই স্নেহা ক্যাম্পাসে চলে এসেছিল। একাই একটু হেঁটে বেড়াচ্ছিল। হঠাৎ ফাঁকা একটা রুমের দিক থেকে কান্নার শব্দ শুনে সে থমকে দাঁড়ায়। ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখে, একটি মেয়ে কারও কাছে আকুতি জানিয়ে কাঁদছিল, ভয়ার্ত শরীরটা মাঝে মাঝেই কেঁপে উঠছিল। কৌতূহলবশে স্নেহা এগিয়ে যায়। ডিপার্টমেন্ট আলাদা হলেও মাঠে এক-আধবার তাদের দেখা হয়েছিল আগে। সেই মুহূর্তে মেয়েটির কাউকে খুব প্রয়োজন ছিল, একটা শক্ত আলিঙ্গন প্রয়োজন ছিল। তাই স্নেহা নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল।

কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল স্নেহা। ঠিক তখুনি আড়াল থেকে ভেসে এলো একটি দাম্ভিক কণ্ঠস্বর,

"তোতাপাখির তো বেশ প্রেমো-জ্ঞানও আছে দেখছি!"

দেয়ালের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল রণয়। এই পথ দিয়েই সে যাচ্ছিল। হঠাৎ স্নেহার গলা শুনে দাঁড়িয়ে পড়েছিল রণয়। আর দাঁড়িয়ে থেকে স্নেহার বলা প্রতিটি ভারী কথা যেন গিলে খাচ্ছিল পরম আগ্রহে।

এভাবে রণয়ের সামনে পড়ে যাবে, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি স্নেহা। চমকে গিয়ে সে কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল। তবে পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে চিবুক শক্ত করে দুই হাতে কোমর আঁকড়ে ধরে রণয়ের দিকে জ্বলে উঠল,

"আপনি মেয়েদের কথা শুনছিলেন? ন্যূনতম ম্যানার্সটুকুও নেই আপনার?"

এগিয়ে আসে রণয়। কিছুটা দূরত্ব রেখে দু'হাত পকেটে গুঁজে সে দাঁড়ায় স্নেহার ঠিক বরাবর। স্নেহা এক পা পিছিয়ে যায়, তারপর ঘাড় তুলে সরাসরি তাকায় রণয়ের দিকে। ধীরে ধীরে চোখ বুলিয়ে নেয় তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত। চেনা সেই ম্যানলি লাইট পারফিউমের গন্ধ... দৃষ্টি ছুঁয়ে যায় লম্বা হাতের ভাসা রগগুলোতে, আর তারপর? তারপর গিয়ে থামে ঠোঁটের নিচের সেই ছোট্ট, কুচকুচে কালো তিলটায়। নীরব ভঙ্গিতে স্নেহার চোখের দিকে একইভাবে তাকিয়ে রইল রণয়ও।

কিন্তু স্নেহার দৃষ্টি তার ঠোঁটে যেতেই রণয়ের নিস্প্রভ দৃষ্টি ছলকে উঠল। পরক্ষণেই হঠাৎ মাথায় হানা দিল দুষ্টু বুদ্ধি। সে ঘাড় বাঁকিয়ে ঝুঁকে পড়ল স্নেহার ওপর। কপাল ছুঁয়ে থাকা এলোমেলো চুলের গোছা ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দিল। সেই উষ্ণ নিঃশ্বাসে কেঁপে উঠল স্নেহার শরীর। চাপা শিহরণে সে দু’হাতে কামিজের পাশ শক্ত করে চেপে ধরল।

রণয় আরেকটু ঝুঁকে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,

"Wanna taste it? Sweetheart !"

ইশারায় নিজের ঠোঁট দেখিয়ে বাঁকা হাসল রণয়। মুহূর্তেই আগুন হয়ে উঠল স্নেহা। তর্জনী তুলে চেঁচিয়ে উঠল,

"অসভ্য লোক! ছাড়ব না আপনাকে!"

রণয় সঙ্গে সঙ্গে এক মুঠোয় আঁকড়ে ধরল স্নেহার তর্জনী। মুখে চাপা হাসি ফুটিয়ে আকুল গলায় বলল,

"প্লিজ, ছেড়ো না।"

বিস্ময়ে হতবাক স্নেহা এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল। তারপর পায়ের পাতার ওপর ভর দিয়ে একটু উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে, সরাসরি চোখে চোখ রেখে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,

"I hate unexpected touch. আমার প্রিয় মানুষ ছাড়া কেউ আমাকে স্পর্শ করুক—তা আমি চাই না।"

রণয়ের চোখে তখন দুষ্টু হাসির ঝিলিক। দু’হাত বুকে গুঁজে ভ্রু নাচিয়ে সে জিজ্ঞেস করল,

"তা, কেমন মানুষ চাও তুমি?"

"আমার হলে শুধু আমারই হতে হবে। এক ইঞ্চিও সরে যাওয়া যাবে না, এক পারসেন্টও অন্য কারও হওয়া যাবে না। এমন কেউ!"

হনহন করে হেঁটে চলে গেল স্নেহা। রণয় দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বুকবেঁধে দাঁড়াল। পলাশরাঙা ঠোঁটের কোণে মৃদু আলোড়ন। তার চোখ আটকে রইল স্নেহার চলে যাওয়ার পথের দিকে... স্নেহা দৃষ্টির সীমানা থেকে হারিয়ে যেতেই সে চোখ বন্ধ করল, মাথাটা এলিয়ে দিল দেওয়ালের গায়ে। ঠোঁটের বাঁ-কোণ একপাশে হেলে পড়ল। খানিকবাদেই কণ্ঠনালি ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো কয়েক লাইন,

❝Ishq toh karta hai manmarzi
sunta nahi phir woh arzi
pyar mein na kar khudgarzi bewafa❞

_______

সামনে বিরোধী দলের সমাবেশ। চারদিক তেতে আছে, মাথা গরম সবার। কিছুক্ষণ আগে রণয় কয়েকজনকে বেশ ভালোমতোই ধমকেছে। তারপর আর ক্লাবে আসেনি সে৷ সরাসরি অফিসে চলে গেছে। জরুরি মিটিং আছে। সময় নষ্ট করার মানুষ নন রণয়। ‘দ্য ডিসেন্ট’, ‘পাংচুয়াল ম্যান অব রণয়’—এই নামটাই তাঁর চরিত্রের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। রাজনীতি সামলানোর পাশাপাশি পারিবারিক বিজনেসটাও সে নিজের মতো করে দারুণভাবে চালায়।

এখন ক্লাবে উপস্থিত আছে সাজন, নিহাদ, আলামিন আর অনির্বাণ। আদিলকে প্রায় আধঘণ্টা আগে পাঠানো হয়েছিল একটা দরকারে। কিন্তু সে তখনও ফেরেনি। অনির্বাণের মুখটা তাই শক্ত হয়ে আছে।

প্রায় বিশ মিনিট পর ক্লাবের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে আদিল। চোখ-মুখ উত্তেজনায় থমথমে৷ রাগে যেন ফুঁসছে সে। হাতে ধরা একটা পেনড্রাইভ টুপ করে রেখে দেয় অনির্বাণের টেবিলে। তারপর শরীরের সমস্ত ক্লান্তি আর ভার নামিয়ে বসে পড়ে সোফায়। পাশে রাখা পানির বোতলটা এক নিঃশ্বাসে শেষ করে ফেলে। এই পেনড্রাইভটা রণয় কিনেছে বিরোধী দলের এক নেতার বিশ্বস্ত লোকের কাছ থেকে।

অনির্বাণ ল্যাপটপ খুলে পেনড্রাইভটা চেক করতে শুরু করল। কাজ শেষ করে চোখ তুলল আদিলের দিকে। নিবিড়ভাবে তাকাল ওর চোখেমুখে। তারপর গম্ভীর, ভাস্কর্যের মতো শান্ত অথচ ভারী স্বরে জিজ্ঞেস করল,

"কী হয়েছিল? এত দেরি কেন?"

রুষ্ট কণ্ঠে, রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আদিল বলল,"ওই ঝগড়াটে মেয়েটা আজকেও আমাকে গাধার বাচ্চা বলেছে! এত বড় সাহস একটা টুকটুকে মেয়ের!"

রাগে গজগজ করতে করতে হঠাৎ থেমে গেল আদিল। পরমুহূর্তেই এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে গেল সে।

"আজ তো ও একেবারে একা ছিল... সাথেও কেউ ছিল না, ভাইও নেই৷ সুযোগটা একদম পারফেক্ট! আজ দেখিয়ে দেবো আদিল কে!"

শার্টের হাতা গুটিয়ে সে যখন দরজার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল, তখন পেছন থেকে অনির্বাণ স্মিত ও ঠান্ডা গলায় বলে উঠল,

"নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারতে চাইলে যা, না হলে চুপচাপ বসে থাক।"

আদিল থমকে গেল। ভ্রু কুঁচকে ঘুরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,

"মানে?"

"মানে, যেটা তোরা দেখিস না, সেটা আমি দেখি... যেটা তোরা বুঝিস না, ওটা আমি বুঝি।"

এই কথা বলে চোখ বন্ধ করে মাথাটা সোফায় এলিয়ে দিল অনির্বাণ। আদিল কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। মাথা চুলকাতে চুলকাতে গিয়ে আবার বসল সোফায়। একগুঁয়ে দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল সিলিংয়ের দিকে। মাথার কোষে কোষে চলছে চিন্তার ঘূর্ণি। প্যাচ বা জটিলতা বুঝতে সে একটু কাঁচা, তবে একেবারে সাদাসিধে ছেলেও সে নয়৷

গালে হাত দিয়ে আরও কিছুক্ষণ অনির্বাণের কথার মানে ধরার চেষ্টা চালাল সে। কিন্তু অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও যখন কিছুই মাথায় এল না, তখন বিরতিতে মুখ দিয়ে একটা ছোট্ট 'চ্' শব্দ বেরিয়ে এল।

সাজন ওর দিকে তাকিয়ে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,"কী হয়েছে?"

আদিল একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল,"পড়েছি এক মুশকিলে।"

নিহাদ ভ্রু কুঁচকে, একটু অধৈর্য গলায় জানতে চাইল,""কী ক্যাচাল করেছিস আবার?"

আদিল গলায় একরাশ হতাশা জমিয়ে বলল,"বাসা থেকে বিয়ের জন্য খুব চাপ দিচ্ছে আম্মু।"

অনির্বাণ সহজ সমাধান বলে দিল,"তো কর, সমস্যা কী?"

"সমস্যা হলো, বিয়ের জন্য রাজি হলে গার্লফ্রেন্ড অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। আবার রাজি না হলে আম্মু অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে! এখন আমি কী করি বলুন তো?"

সাজন একটু সন্দিগ্ধ স্বরে জিজ্ঞেস করল,"তো গার্লফ্রেন্ডের কথা কি বাড়িতে জানিয়েছিস?"

"আরে ভাই, গার্লফ্রেন্ডই তো নেই!"

আর এক মুহূর্তও সেখানে কেউ দাঁড়াল না। হনহনিয়ে একে একে সবাই ক্লাবঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পেছনে একা বসে রইল আদিল হতভম্ব আর তাজ্জব বনে গিয়ে। সে কিছুতেই বুঝতে পারল না সবাই এভাবে হুট করে চলে গেল কেন!

"আশ্চর্য! চলে গেল কেন সবাই?"

_____

ছাদের এককোণা থেকে বিষাক্ত ধোঁয়া অবিরত উড়ে যাচ্ছে আকাশের দিকে। মানবদেহের জন্য বি ষ, যার গায়ে স্পষ্ট খোদাই করা থাকে “ইহা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর”। তাওনকিছু অদ্ভুত প্রাণী অনায়াসে টেনে নেয় তা। দোতলার পুলসাইডে বসে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছে রণয় আর অনির্বাণ। মি. রেদোয়ানের এই “রংমহল ভিলা” রাজকীয়তা আর বিলাসিতার জীবন্ত প্রদর্শনী। দুটি সুইমিং পুল, ব্যক্তিগত জিম, লনের পাশে বিশাল ডাইনিং গার্ডেন আর সর্বত্র হাই সিকিউরিটির কড়া পাহারা। ওপরের পুলটি একমাত্র রণয়ের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য।

আজ রাতে স্টে-ওভারে এসেছে অনির্বাণ। কলেজ জীবন থেকে শুরু তাদের পথচলা। বন্ধু থেকে বেস্টফ্রেন্ড, আর আজ রাজনৈতিক সহকর্মী। রণয় জন্মসূত্রে রাজনৈতিক ঘরের সন্তান, আর অনির্বাণ এক্কেবারে সাধারণ পরিবারের ছেলে। ছোট থেকেই রাজনীতির প্রতি অদম্য আকর্ষণ ছিল অনির্বাণের। আর রণয়ের হাত ধরেই সে পা রাখে এই কূটনীতি-পাকানো জগতে। আজ নিজের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, কৌশল আর নিষ্ঠায় সে রাজনীতিতে নিজের শক্ত পরিচিতি গড়ে তুলেছে।

বন্ধুত্ব তো জাত, ধর্ম, শ্রেণি কিংবা দারিদ্র্যের তোয়াক্কা করে না। না হলে রণয়ের মতো রক্তে রাজনীতি নিয়ে জন্মানো ছেলে ক

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 5 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন