ফন্ট সাইজ:
থিম:
কে বাঁশি বাজায় রে

পর্ব 6

লেখক: মিথুবুড়ি

#কে_বাঁশি_বাজায়_রে
#মিথুবুড়ি
#পর্ব_০৬

জুলাইয়ের সকাল মানেই স্নিগ্ধ প্রশান্তির ছোঁয়া। রাতের বৃষ্টিতে ধোয়া গাছপালা আরও সবুজ হয়ে ওঠে, ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধে বাতাস ভরে যায়। মেঘের ফাঁক গলে উঁকি দেওয়া কোমল রোদ আর শীতল বাতাস প্রকৃতিকে করে তোলে প্রাণবন্ত ও সতেজ।

ক্লাসে ঢুকে নিজের সিটে বসতেই জানালার বাইরের দৃশ্য দেখে স্নেহার ভ্রু-দ্বয় কুঁচকে উঠল। ঘাড় ঘুরিয়ে তিবাকে জিজ্ঞেস করল,

"কী হয়েছে রে? মেয়েটা ওভাবে কাঁদছে কেন? দেখতে তো সিনিয়রই মনে হচ্ছে।"

তিবার মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। একঝলক ওদিকে তাকিয়ে আবারও চোখ নামিয়ে নিস্পৃহ সুরে উত্তর দিল,

"প্রেমের ভুত মাথায় চেপেছিল। বেশি সাহস দেখাতে গিয়ে এখন চোখের জলে নদী ভাসাচ্ছে।"

স্নেহা তাজ্জব হয়ে গেল। কথার আগা-মাথা কিছুই বুঝতে না পেরে কৌতূহলে ঝুঁকে বলল,

"কী হয়েছে, খুলে বলবি তো?"

তিবার বিরক্তি এবার যেন উপচে পড়ল। সকাল থেকে এই নাটক দেখতে দেখতে সে বড্ড ক্লান্ত। ঠোঁট উল্টে বলল,

"চকলেট বয়কে গিয়ে প্রপোজ করেছিল। এমন মোক্ষম জবাব দিয়েছে, ব্যস! তখন থেকেই এই কান্নাকাটি শুরু।"

স্নেহা চোখ গোল গোল করে তাকাল, "জবাব দিয়েছে মানে? গায়ে হাত তুলেছে নাকি?"

এবার সত্যিই রেগে গেল তিবা। চোখ গরম করে গলায় ঝাঁঝ এনে বলল,

"আহা, আজব তো! মারবে কেন? হি ইজ সাচ আ জেন্টলম্যান! মেয়েদের গায়ে হাত তোলে না। ধমক দিয়েই সাইজ করে দিয়েছে। ব্যস, তাতেই মেয়েটির হালুয়া টাইট!"

বলেই রণয়ের ভাবনায় দুই হাতে নিজের গাল চেপে ধরে লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গি করতে লাগল তিবা। পাশে বসে থাকা স্নেহা মুখে ভেংচি কেটে মনে মনে গালাগাল দিল রণয়কে। ইহ্, জেন্টলম্যান না ছাই! মেয়েদের গায়ে হাত তোলে না! কেউ তো জানেই না লোকটা আসলে ভেতরে ভেতরে কতটা শয়তান!

স্নেহার মনের কোণে ভেসে উঠল সেই দিনটার স্মৃতি। রণয়, বাইরে থেকে সেই শান্ত-ভদ্র চেহারার লোকটা—হঠাৎ করেই আঙুল বাড়িয়ে দিয়েছিল স্নেহার ঠোঁটে। সেই শক্ত, বলিষ্ঠ আঙুলের ছোঁয়া… রাগ, ভয়, লজ্জা আর অজানা শিহরণ যেন একসূত্রে গলা টিপে ধরেছিল স্নেহার।

"কিরে, এখনো মাস্ক পরে আছিস কেন? খোল তো!"

তিবার কথায় হঠাৎ চমকে উঠল স্নেহা। ভাবনার ঘোর কাটিয়ে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াল সে। কথা ঘোরানোর উদ্দেশ্যে তিবাকে টেনে ধরে বলল,

"চল তো ক্যান্টিনে, সকালে কিছুই খাওয়া হয়নি।"

দুজনে দোতলায় নেমে এল। মুখে কথা বলছিল ঠিকই, কিন্তু হঠাৎ স্নেহার পা থমকে গেল। সামনেই রণয়, সাথে তার সাঙ্গপাঙ্গরা। রণয় বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে হাত নেড়ে কথা বলছে, হাসছে। স্নেহার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

‘ভয় পাবি না স্নেহা, একদম না।’
মনে মনে নিজেকে শক্ত করে এগিয়ে গেল সে। কিন্তু আচমকাই চোখাচোখি হয়ে গেল রণয়ের সাথে। সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নিল স্নেহা। মাথা নিচু করে না তাকিয়েই গটগট করে হেঁটে পার হয়ে যেতে চাইল।

রণয়ের দলটা পাশ কাটিয়ে যেতেই বুক থেকে যেন একটা জমে থাকা নিশ্বাস হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে এল। হাফ ছেড়ে বাঁচল সে! কিন্তু মাত্র দু-পা এগিয়েছে, ঠিক তখনই পেছন থেকে গম্ভীর আওয়াজ,

"এই মেয়ে, দাঁড়াও!"

স্নেহার পা দুটো যেন মাটিতে জমে গেল। শরীর অবশ হয়ে এল। ধীরে ধীরে পেছনে ঘুরল সে। সামনে এসে দাঁড়াল রণয়, তার দম্ভভরা ভঙ্গিতে। কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে, মেরুদণ্ড সোজা আর বুক চিতিয়ে, নিরেট চোখে তাকিয়ে আছে সে। সেই দৃষ্টি যেন অদৃশ্য বন্ধনে স্নেহাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলছে।

এক পলক তাকিয়েই স্নেহা আবার চোখ নামিয়ে নিল। সবার সামনে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা আর মাথা নিচু করে থাকাটা তার ভীষণ লজ্জার মনে হচ্ছে। মনে মনে ভাবল, এটা কি লোকটার সিগনেচার স্টাইল? সবসময় এভাবে বুক টান করে দাঁড়ায় কেন লোকটা? আর হঠাৎ আমাকেই বা এভাবে দাঁড় করালো কেন? আজ কী করবে? সবার সামনে ধমকাবে? অপমান করবে?’

চিন্তায় স্নেহার গলা শুকিয়ে এল, নিজের অলক্ষ্যেই কষ্ট করে একটা শুকনো ঢোক গিলল সে।

"নাকে কী হয়েছে?"

নিরেট কণ্ঠে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেয় রণয়। চমকে ওঠে স্নেহা। মুহূর্তেই ভয় আর লজ্জায় গলার কাছে এসে নিঃশ্বাস আটকে যায় যেন। মাটি ফুঁড়ে যদি এখনই গলে যাওয়া যেত! যেটার ভয় সে সারাদিন করছিল, ঠিক সেটাই হলো। এত চেষ্টা করে সারাদিন লুকিয়ে রাখা গেল না। চেষ্টা সব বৃথা!

ঘটনাটা ঘটেছিল কাল দুপুরে। গোসলের পর ছাদে জামা মেলতে গিয়েই চোখ পড়েছিল পাশের বাড়িওয়ালার গাছের কাঁচা আমে। ছোটবেলা থেকেই অফ-সিজনের কাঁচা আম আর টক খাওয়ার বাতিক আছে স্নেহার। বাড়িওয়ালার লাগানো গাছটার ওপর নজর ছিল অনেকদিন থেকেই। সন্ধ্যার সময় লোভ সামলাতে না পেরে ছাদ থেকে আমটা চুরি করতে যায় সে।

ছাদে তখন কেউ ছিল না। নিঃশব্দে আম চুরি করে নিতে পারলেও, ধরা পড়ার তাড়াহুড়োয় পাশের লেবু গাছের একটা ধারালো কাঁটা সোজা গেঁথে বসে তার নাকে! রাতে ব্যথা বাড়ে, জায়গাটা ফুলে লাল হয়ে ওঠে। ভাই স্নেহ দেখলে ভীষণ বকাঝকা করবে, সেই ভয়ে রাতে তাড়াহুড়ো করে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সকালে উঠেও মুখ ধুয়ে মাস্ক পরেই সোজা ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়, যাতে স্নেহ কিছু টের না পায়। কিন্তু এই লোকটা... কীভাবে সব টের পেয়ে যায়?

"কী হলো?"

আবারও প্রশ্নটা ভেসে আসে। এবার রণয়ের গলা আরও গাঢ়, আরও দৃঢ়।

স্নেহার পা দুটি মাটিতে জমে আটকে যায়। মুখ তুলে তাকানোর মতো ন্যূনতম সাহসটুকুও খুঁজে পায় না সে। ধরা পড়ে যাওয়ার তীব্র লজ্জায় চোখের কোণে জল জমে ওঠে। অন্যদিকে রণয় একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টি গভীর আর পর্যবেক্ষকনীয়। স্নেহার অজান্তেই মাস্কটা একটু নিচে সরে গিয়েছিল। সেই ফর্সা মুখের মধ্যিখানে লালচে দাগটা যেন মরুভূমির বুকে হঠাৎ জেগে ওঠা নীল নদ, যা রণয়ের নজর এড়ায়নি।

"কিরে, কী হয়েছে? আমাকেও তো কিছু বললি না!" স্নেহার হাত ঝাঁকিয়ে জানতে চায় তিবা।

মেজাজ এক লহমায় বিগড়ে যায় স্নেহার। এই লোকটাকে দিকে কে এমন হাঁ করে তাকাতে বলেছিল? এখন নির্ঘাৎ সব সামলাতে হবে একশোটা মিথ্যে বলে! হাতের তালু চুলকাতে চুলকাতে মুখে অস্বস্তির ছাপ এনে আমতা-আমতা করে সে বলল স্নেহা,

"ইয়ে... মানে... পিম্পল।"

রণয়ের চোখ দুটি ঈষৎ কুঁচকে যায়। ঘাড় কাৎ করে সংশয়ের দৃষ্টিতে তাকায় সে। একটু এগিয়ে আসতে নিয়েছিল, ঠিক তখনই তীক্ষ্ণ শব্দে বেজে ওঠে তার মোবাইল ফোনটি। ফোনটা কানে ধরে রণয় অন্যদিকে সরে যেতেই স্নেহা যেন নতুন জীবন ফিরে পায়। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বুকে হাত দিয়ে কয়েকবার ফুঁ দেয় সে।

"তোমাকে জানো এখন কিসের মতো লাগছে?" পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আদিল বাঁকা হেসে এগিয়ে এলো।

চোয়াল শক্ত করে আদিলের দিকে তাকায় স্নেহা। দাঁতে দাঁত চেপে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করে, "কিসের মতো?"

"কিরণমালার নকুলের মতো!" বলে হো-হো করে দাঁত কেলিয়ে নির্লজ্জের মতো হাসতে থাকে আদিল।

"তাও ভালো! অন্তত কোনো গাধার মতো লাগছে না!"

রাগে গজগজ করতে করতে তিবাকে পেছনে ফেলে রেখেই দ্রুত হেঁটে চলে যায় স্নেহা। পেছনে আদিলের হাসির বেগ আরও বাড়ে। পেটে হাত চেপে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ার জোগাড়। হাসি থামিয়ে আদিল নিজেই বিড়বিড় করে,

"আমি শরম পাইয়া হাসি, আর মানুষ ভাবে আমার লজ্জা-শরম নাই, তাই হাসি!"

তিবা ভ্রু কুঁচকে পেছনে ফিরে একবার ভেংচি কাটে, তারপর স্নেহার পিছু নিতে এক পা বাড়ায়। কিন্তু পেছন থেকে আদিলের হাঁক,

"এই তিব্বত!"

কঠিন চোখে ঘুরে দাঁড়ায় তিবা। আর চুপ থাকা সম্ভব নয়। এবার তেড়ে গিয়ে আদিলের মুখোমুখি দাঁড়ায় সে,

"এই! আপনি কি কখনো কাউকে তার সঠিক নামে ডাকতে পারেন না?"

আদিল দুই হাত তুলে হালকা ফাজলামির ভঙ্গিতে বলে, "এই মেয়ে, চোখ নামাও। সিনিয়র হই তোমার। নামাও বলছি!"

খেলার মাঠে যেন রেফারির বাঁশি বেজে উঠল! বাধ্য মেয়ের মতো নিমেষেই চোখ নামিয়ে ফেলে তিবা। তা দেখে আদিলের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে । একটু কাছে এসে রসিকতার সুর মিলিয়ে সে বলল,

"গুড! বান্ধবীর মতো এতটা বেপরোয়া নও দেখছি। আই লাইক ইট।"

সামান্য থেমে আবার প্রশ্ন করে, "জানো আমি এখানে কেন এসেছি?"

এবার কৌতূহল সামলাতে না পেরে চোখ তুলে তাকায় তিবা,"কেন?"

"তোমাকে দেখতে।"

"ফ্লার্ট করছেন?"

"উঁহু! পটানোর চেষ্টা করছি।"

"কখনো পারবেন না।"

"দেখা যাক না!"

"ওকে।"

একটু ইতস্তত করে তিবা আবার জিজ্ঞেস করে, "আচ্ছা শুনুন..."

"বলো জান!"

মুহূর্তেই ফস করে হেসে ফেলে তিবা। তবে পরক্ষণেই সামলে নিয়ে চোখ গরম করে তাকায়। গলার স্বর গম্ভীর করে বলল,

"রণয় ভাইয়ার কি কারও সাথে রিলেশন আছে?"

"না, নেই।"

"তাহলে উনি এভাবে সবাইকে রিজেক্ট করে দেন কেন?"

"আরে, এই রকম মেজাজ নিয়ে প্রেম হয় না... হয় মারামারি! ভাইয়ের যা মেজাজ!"

"কীহ্! উনি মারামারি করেন?"

"না! ভাই তো নিজে এসবে হাত লাগায় না। তবে ভাইয়ের হাতের মাইরটা... উফ! কড়াইতে ভাজা গরম চপ মনে হয়!"

"খেয়েছেন নাকি কখনো?" বাঁকা চোখে তাকিয়ে হেসে ফেলে তিবা।

"আরে না! তবে দেখেছি। ভাই রাগলে একদম অন্য মানুষ হয়ে যায়।"

তিবা ভ্রু কুঁচকে জানতে চায়, "কী রকম?"

আদিল ধমকে উঠল,"এই মেয়ে, এত কিছু জেনে কী করবে? শুনে রাখো, তুমি শুধু আমার! অন্য কারও দিকে তাকালে চোখ দুটো কাটা চামচ দিয়ে তুলে মেয়োনিজ লাগিয়ে খেয়ে ফেলব!"

খানিক থেমে এবার খানিকটা গম্ভীর গলায় যোগ করে,"আর আমাদের ভাইয়ের এসব প্রেম-ভালোবাসার সময় নেই। সারাদিন তো তোমাদের মতো মেয়েরাই ভাইয়ের প্রেমে হাবুডুবু খায়!"

তেতে ওঠে তিবা। গলার স্বরে বিরক্তি এনে বলল, "আর আপনি? একটু আগেও তো আমার সাথে ফ্লার্ট করছিলেন!"

আদিল ঠোঁট গোল করে একপা পিছিয়ে যায়। চোখেমুখে গভীর বিস্ময় আর নাটুকে ভঙ্গি ফুটিয়ে তুলে বলল, "কখন? কে আপনি আন্টি? আমি তো আপনাকে চিনিই না!"

বলতে পকেট থেকে একটা কাল্পনিক চশমা বের করে চোখে পরার ভঙ্গি করে আদিল। তারপর চুলে হাত চালিয়ে পাশ কাটিয়ে সটান হেঁটে চলে যায়। হতবাক হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে তিবা। মনে মনে চিৎকার করে ওঠে,

"কীহ্! আন্টি?!"

______

নিশ্ছিদ্র নীরবতা ভেঙে ঘড়ির এলার্মে জেগে ওঠে স্নেহা। প্রতিদিনের মতো আজও ভার্সিটি থেকে ফিরে ঘুমিয়েছিল সে। তবে আজ একটু দেরিতে। ফিরেই ধরা পড়েছিল ভাইয়ের কাছে। যদিও চোখ রাঙানো ছাড়া কিছুই বলেনি স্নেহ। তবে ভাইয়ের চোখে তখন ছিল একরাশ উদ্বেগ। সঙ্গে সঙ্গে বোনকো টেনে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল, মলমও এনেছে। এখন ফোলা ও লালচে ভাব কিছুটা কমেছে।

ঘুম ভেঙে শরীরের ক্লান্তি ঝেড়ে ফ্রেশ হয়ে টেবিলে এসে বসে স্নেহা। একগাদা অ্যাসাইনমেন্ট জমে আছে। একটু পরই স্নেহ নাস্তা নিয়ে এসে সব চেক করবে, তার আগেই যতটা সম্ভব শেষ করতে হবে ভেবে ব্যাগ খুলতেই চোখ আটকে যায় অচেনা জিনিসে। ছোট্ট একটা কাঁচের বোতল, দেখতে অনেকটা সিরামের সিসির মতো। দামি কোনো ব্র্যান্ডের বলেই মনে হচ্ছে। অথচ সে তো এমন কিছু কখনো ব্যবহার করেনি বা করে না। লেবেলে কোরিয়ান ভাষায় লেখা, পড়া যায় না কিছুই। ফোনে নাম লিখে গুগলে সার্চ করতেই বিস্ময়ে থ হয়ে যায় সে। এটি তো পিম্পলের ট্রিটমেন্ট সিরাম!

কিন্তু সেটা তার ব্যাগে এলো কী করে? হয়তো কেউ ভুল করে রেখে গেছে। লাঞ্চ টাইমে ব্যাগটা ক্যান্টিনে রেখে গিয়েছিল স্নেহা, তখনই হয়তো কিছু একটা হয়েছে। কাল গিয়ে খুঁজে দেখতে হবে, যার জিনিস তাকে ফেরত দিতে হবে।

স্নেহর পায়ের শব্দ পেতেই তাড়াতাড়ি ব্যাগে জিনিসটা লুকিয়ে ফেলে কলম তুলে নেয় স্নেহা। স্নেহ রুমে ঢুকে স্নেহাকে পড়তে দেখে তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। ভাইবোনের চোখাচোখি হতেই স্নেহাও সৌহার্দ্যে হেসে উঠল। স্নেহ বোনের হাসির বিপরীতে অমায়িক হেসে নাস্তার ট্রে টেবিলে রেখে চলে যায় ভ্যানিটির সামনে। নরম স্বরে ডাকে,

"স্নেহু, ছোট বাটিটা নিয়ে এখানে আয়, মাথায় তেল দিয়ে দিই। পরে পড়িস।"

স্নেহার চোখ পড়ে ট্রের ওপর হালকা নাস্তা আর কাঁচা আম মাখা। খুশিতে ডগমগ সে। আমের বাটিটা নিয়ে ছুটে গিয়ে আহ্লাদে জড়িয়ে ধরে ভাইকে।

"আমার ভাই বেস্ট ভাই।"

স্নেহ বোনকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খায়। অতঃপর ওকে সামনে বসিয়ে চুলে তেল দিতে দিতে ধীর স্বরে বলল,

"আর কখনো যেন এমন কিছু না শুনি… গট ইট?"

"গট ইট।" টক আম খেয়ে চটপটে শব্দ করে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয় স্নেহা।

"আব্বু ডেকেছিল একটু আগে।"

"ওহ! কী বলল তোমার আব্বু?"

নিক্ষিপ্ত শান্ত স্বরে প্রশ্ন করে স্নেহা। ভাইয়ের হাতটা হঠাৎ থমকে যায়। বোনের এমন ঠান্ডা গলায় যেন ভেতরটা কেঁপে ওঠে তার। স্নেহ তাকায় স্নেহার মলিন মুখের দিকে। বোনের অভিমানী মুখের দিকে তাকাতেই তার বুকের ভেতরটা ফেটে যায়। তবে এই মুহূর্তে কথা বাড়াতে চায় না সে। চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বলল,

"আব্বুর স্কুলের প্রিন্সিপালের ছেলের জন্য তোকে চেয়েছে। ছেলে ডাক্তার। ছবি দেখিয়েছে আব্বু, ভীষণ হ্যান্ডসাম।"

"আমার ভাইয়াব্বুর থেকেও সুন্দর?"

কথা শেষ হওয়ার আগেই চট করে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় স্নেহা। শব্দ করে হাসে স্নেহ। বোনের নাক টেনে দিয়ে বলল,

"জি, আমার থেকেও অনেক হ্যান্ডসাম।"

"মোটেই না!" সঙ্গে সঙ্গে স্নেহার তীব্র প্রতিবাদ। আবারও হেসে ফেলল স্নেহ। মুচকি হেসে বলল,

"কথা তো শেষ করতে দে মা! ছেলেটা কিছুদিন পর দেশের বাইরে যাবে পিএইচডির জন্য। বিয়ের পর তোকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে। তবে আব্বু না করে দিয়েছে; বলেছে, আগে তোকে আরও পড়াবে, তারপর বিয়ে।"

"ওহ!" তার তাচ্ছিল্য মেশানো হাসি।

স্নেহ বোনের চুলে হাত বুলোতে বুলোতে বলল,"আমি হলেও না করে দিতাম। এত দূরে আমার কলিজার টুকরোকে রেখে কীভাবে থাকতাম আমি?"

স্নেহর গলা ধরে আসে, চোখ নামিয়ে নেয় সে। স্নেহা ঘুরে ভাইয়ের গলা জড়িয়ে ধরে ঘন ঘন মাথা নাড়িয়ে জেদি গলায় বলল,

"আমি কোথাও যাবো না তোমাকে ছাড়া, ভাইয়াব্বু!"

স্নেহ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। চোখে নিঃশব্দ জল, তবুও মুখে শান্ত হাসি। স্মিত স্বরে সে বলল,

"মেয়ে মানুষকে একদিন যেতেই হয়, বোন। এটাই তো তাদের লিখন। তবে আমি এভাবে কারোর হাতে তোকে তুলে দিতে পারি না। এখন পর্যন্ত যত ভালো প্রস্তাব এসেছে, সব রিজেক্ট করেছি। কারণ আমি জানি আমার বোন ডিজার্ভ করে দ্য বেটার দ্যান বেস্ট। সারা পৃথিবী চষে ফেলবো, খুঁজে আনবো এমন এক রাজকুমার, যে তোকে বুঝবে, ভালোবাসবে, তোর জন্য সারা দুনিয়ার সাথে লড়তে পারবে। তোকে কোনোদিন অসম্মান হতে দেবে না। আর... সে হবে তোদের রাজ্যের সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ। কারণ, আমার বোন শুধু ভালো নয়, বেস্ট আমার বোন। সেরা প্রাপ্য তার।"

‘সুদর্শন’ কথাটা শুনতেই স্নেহার চোখের সামনে যেন একজন অদৃশ্য মানব ভেসে ওঠে। তার মুখটা ঝাপসা, কিন্তু শরীরের বলিষ্ঠতা, লম্বা লম্বা পা আর মিষ্টি ঘ্রাণ যেন চারপাশের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। যার সবকিছুতেই একধরনের অদম্য আকর্ষণ। তার উপস্থিতি ঘরের বাতাসকেও যেন পাল্টে দেয়, শরীরের প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে পড়ে অচেনা শিহরণ। স্নেহার মনে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে ‘কাকে চাই স্নেহার মন?’

ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে আসা টিভির খবরে স্নেহার ধ্যান ভেঙে যায়। টিভিতে দেখানো খবরটি ছিল দেশের উত্তরে বিরোধী পক্ষের সাবেক এমপির বাড়িতে দুর্বৃত্তদের আগুন দেওয়ার ঘটনা। খবরের মধ্যে রাজনৈতিক আশঙ্কা ফুটে উঠছিল, যা স্নেহের মনে স্নায়ুচাপ সৃষ্টি করেছিল।

স্নেহ তেল দিয়ে স্নেহার চুলে সুন্দর করে বেনুনি পাকিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

"খেয়ে পড়তে বস।" সে চলে যায়।

স্নেহা টেবিলে বসে ভাবতে থাকে এটা নিশ্চয়ই ওই অসভ্য লোকটারই কাজ! রণয়ের পরিকল্পনাগুলো যে কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, তা ভালো করেই জানে স্নেহা। সেদিন ক্লাসে গিয়ে কিছু কথোপকথন সে শুনেছিল, যেগুলো এখনো তার মনে গেঁথে আছে।

"ভাই, শফিককে কি ছেড়ে দেব?"

সাজন সুচারু চোখে চেয়ে প্রশ্নটা ছুড়ে দেয় রণয়ের দিকে। ক্ষীণ ক্ষণিকের জন্য রণয়ের চোখ দিয়ে যেন আগুনের ফুলকি ঠিকরে বের হয়। অলক্ষ্যেই শুষ্ক ঢোক গিয়ে সাথে সাথে মাথা নিচু করে ফেলে সাজন। উপলব্ধি করতে পারে, পাবলিক প্লেসে কথাটা তুলে চরম ভুল করে ফেলেছে সে।

রণয় চোখ-মুখ কঠোর করে গম্ভীর গলায় শুধায়,"কতদিন হলো?"

"সতেরো দিন, ভাই।"

"আর তিন দিন রেখে ছেড়ে দিস।"

"অবস্থা বেশি ভালো না, ভাই... বারবার জ্ঞান হারাচ্ছে," নিচু গলায় জবাব দেয় সাজন।

রণয় কঠোর চোখে তাকিয়ে শ্লেষের সাথে বলে, "আমি সমান-সমানে বিশ্বাসী। কুড়ি দিনের হিসেব কুড়ি দিনেই মিটবে।"

স্নেহা ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে কথাগুলো শুনেছিল বুড়ো বটগাছের আড়াল থেকে। তখন থেকেই রণয় আর তার সঙ্গীদের কথায় সে অদৃশ্য আতঙ্ক অনুভব করে। রণয়ের চোখের গভীর নিষ্ঠুরতা তখন স্নেহার কাছে কম্পন হয়ে উঠেছিল, প্রতিটি কথার ধারালো আঘাত যেন তার মনে ভয়ের মেঘ আরও ঘন করে তুলছিল।

পড়ার টেবিলে বসে স্নেহা চেষ্টা করছিল মাথার সব দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে বইয়ে মনোযোগ দিতে, কিন্তু কিছুতেই তা সম্ভব হচ্ছিল না। তার পুরো মনজুড়ে তখন শুধুই রহস্যময় সিরামটার চিন্তা। অস্থির হাতে ব্যাগ থেকে সিরামটা বের করে সে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে লাগল।

হঠাৎ-ই স্নেহার নজরে এলো, ব্যাগটা আজ যেন একটু বেশিই ফুলে আছে! চেইনটা খুলতেই সে হতভম্ব হয়ে গেল। বিস্ময়ে তার চোখ দুটো বোয়াল মাছের মতো বড়ো বড়ো হয়ে গেল। ব্যাগের ভেতরে একটি কাঁচের জারে থরে থরে সাজানো ছোট ছোট রঙিন হাওয়াই-মিঠাই! স্নেহা চমকে উঠল। এগুলো হঠাৎ কোথা থেকে এলো?

ক্ষণিকের জন্য ভয়ের মেঘ কেটে তার চোখে-মুখে ফুটে উঠল শিশুসুলভ উচ্ছাস। ছোটবেলায় গ্রামে দূর-দূরান্ত থেকে আসা ফেরিওয়ালারা কাচের জারে করে এভাবেই হাওয়াই-মিঠাই বিক্রি করত। এতদিন পর আবার সেগুলো দেখে স্নেহার হৃদয়ে যেন শৈশবের হারানো দিনগুলোর মিষ্টি স্মৃতি জেগে উঠল। কিছুদিন আগেই ভার্সিটির গেটের সামনে দেখেছিল বটে, কিন্তু পরিমাণ এত কম ছিল যে মন ভরেনি। তবে আজ ব্যাগে এতগুলো একসাথে পেয়ে স্নেহা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। আর কোনো কিছু না ভেবেই আনন্দের সাথে সবগুলো হাওয়াই-মিঠাই লুফে নিল।

________

সকাল সকালই রণয়ের মেজাজটা সপ্তমে চড়ে আছে। দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে শক্ত চোয়ালে সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দেয়ালে নিজের বিকৃত নামের দিকে। ক্লাবঘরের দরজার ঠিক ওপরে একসময় দাউদের কলমে গর্বভরে লেখা ছিল—"প্রান্তিক তাজওয়ার রণয়"। কেউ একজন আজ তা ঘেঁটে দিয়ে উগ্র রাগে লিখে রেখেছে—"রণয় বণয়×অসভ্য লোক+ ভণ্ড নেতা" কালির আঁচড়ে আঁকা অপমান যেন কাটা গায়ে নুনের ছিটার মতো জ্বলছে। রণয়ের চোখ দু'টো তখন উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরি।

পেছনে ফাঁকা ঢোক গিলে দাঁড়িয়ে আছে নিহাদ আর আদিল। সাধারণত এই ক্লাবঘরে ছাত্র সংগঠনের বাইরের কারো প্রবেশ নিষেধ। দলীয় সদস্যরাও নির্দিষ্ট সময় ছাড়া পা রাখে না। এ কারণে দরজাটা অধিকাংশ সময় খোলা থাকে, তালা দেওয়ার প্রয়োজন খুব একটা পড়ে না। আর ঠিক এই সুযোগটাই কেউ অত্যন্ত চতুরতার সাথে কাজে লাগিয়েছে। দরজাটা কেবল ভেজানো ছিল।

রণয় তড়িৎ গতিতে কক্ষে ঢুকে পড়ল। তার পেছন পেছন আদিল আর নিহাদও ভয়ে ভয়ে ভেতরে প্রবেশ করল । কোনোদিকে না তাকিয়ে রণয় সোজা নিজের ডেস্কের সামনে গিয়ে ল্যাপটপে সিসিটিভির ফুটেজ দেখতে শুরু করল। আদিল আর নিহাদ বোকার মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল, যেন তারাই আসল অপরাধী। তারা বেমালুম ভুলেই গিয়েছিল ক্লাবঘরের প্রতিটি কোণে নিজ হাতে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়েছিল রণয়।

রণয় প্রথমে দুই ঘণ্টা আগের ফুটেজ খতিয়ে দেখতে শুরু করল। তার ভার্সিটিতে পৌঁছানোর নির্ধারিত সময় সকাল দশটা। এই সময় কেউ ভুল করেও বাঘের খাঁচার ধারেকাছে ঘেঁষে না। অথচ সকাল ছয়টা থেকে নয়টার মাঝে ফুটেজে সন্দেহজনক কিছুই ধরা পড়ল না। রণয়ের কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর হলো। ঠোঁট কামড়ে সে এবার ঠিক নয়টার পরের ফুটেজ প্লে করল। ভেতরে তখন একটাই জ্বলন্ত প্রশ্ন—কে এই স্পর্ধা দেখাল?

হঠাৎ-ই রণয়ের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক ঝলক বাঁকা হাসি। ল্যাপটপটা বন্ধ করে সে আয়েশি ভঙ্গিতে চেয়ারে পায়ের ওপর পা তুলে বসে গা এলিয়ে দিল। এরপর পকেট থেকে ফোন বের করে আদিলের নম্বরে দ্রুত হাতে টেক্সট পাঠাল।

টুং করে শব্দ করে উঠল আদিলের ফোন। কিন্তু রণয়ের সামনে ফোন বের করে দেখার মতো ন্যূনতম সাহসও তার বুকজুড়ে নেই। রণয় কেবল কড়া চোখে মাথা নেড়ে ইশারা করল। ভয়ে ভয়ে পকেট থেকে ফোনটা বের করল আদিল। মেসেজটা পড়ামাত্রই তার চোখ দুটো ছানাবড়ার মতো গোল হয়ে গেল। বিস্ময়ে থতমত সে তাকাল রণয়ের দিকে, যার ভাবভঙ্গি এ মুহূর্তে একদম শান্ত নদীর মতো নিস্তরঙ্গ। রণয় আবারও একটা কড়া ইশারা করতেই আদিল কোনো বাক্যব্যয় না করে বেরিয়ে গেল।

হতভম্ব নিহাদ কিছু বুঝতে না পেরে কলের পুতুল হয়ে সোফায় গিয়ে বসে পড়ল। সে কিছুতেই মেলাতে পারছে না রণয় আসলে কী চাইছে? চোখের সামনে থেকেও মেসেজ পাঠানোর মানে কী? তার মাথা একদম গুলিয়ে যাচ্ছে।

মাত্র দশ মিনিটের মাথাতেই আদিল দৌড়ে ফিরে এল। তার হাতে একটা ছোট কাঁচের জার। জারটা দেখে নিহালের মুখ হা হয়ে গেল। বিপরীতে রণয়ের ঠোঁটের কোণে খেলে গেল কুটিল শয়তানি হাসি। সে ধীরেসুস্থে হাত বাড়িয়ে আদিলের কাছ থেকে জারটা নিল। এরপর ছিপি খুলে জারটা ফ্লোরে উল্টো করে ধরতেই বেরিয়ে এলো কয়েকটা তেলাপোকা।

মুহূর্তেই পুরো কক্ষ কেঁপে উঠল এক গগনবিদারী চিৎকারে! আদিল আর নিহাদ শিউরে ওঠে কান চেপে ধরল। এদিকে রণয় চোখ বুঁজে ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে। টেবিলের নিচ থেকে হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে এল কেউ একজন। তাড়াহুড়ো করে বেরোতে গিয়ে রণয়ের পায়ের সাথে ধাক্কা খেয়ে সে আবার ফ্লোরে গড়িয়ে পড়ল।

মেয়েটি আর কেউ নয়—স্নেহা। নিজেকে সামলে নিয়ে সে কোনোমতে দৌঁড়ে বেরিয়ে আসে। ফড়িং এর মতো লাফাতে লাফাতে জামাকাপড় ঝাড়তে শুরু করল। দৃশ্যটা দেখে মনে হচ্ছিল কোনো পাগল যেন নাচের তালে তালে আত্মরক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছে!

আকাশ থেকে পড়ল আদিল আর নিহাদ। এই মেয়েটা এই কাণ্ড ঘটিয়েছে? আর এতোক্ষণ সে টেবিলের নিচে লুকিয়ে ছিল? এইটুকু একটা মেয়ের কী স্পর্ধা! স্বয়ং রণয়ের সামনে, একদম বাঘের খাঁচায় বসে ছিল এতোক্ষণ! এখন তাদের কাছে সব পরিষ্কার যে রণয় মুখে কিছু না বলে এসএমএস পাঠিয়েছিল। সে মুখে একটা কথাও বলেনি, কারণ শিকার তো তখন তার পায়ের নিচেই ওত পেতে ছিল। প্রতিশোধ নেওয়ার একেবারে সোনার সময়!

দু’হাতে সশব্দে তালি বাজাতে বাজাতে এগিয়ে এল আদিল। ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের চওড়া হাসি ঝুলিয়ে সে ব্যঙ্গ করে বলে উঠল,

"বাহ্ বাহ্! ওয়াও! তোমার তো দেখছি ঝগড়া করার পাশাপাশি আরও একটা দারুণ গুণ আছে দেখি! আস্ত একটা চুন্নি মেয়ে!"

আদিলের কথায় স্নেহার লাফালাফি মুহূর্তেই থেমে গেল। হাতেনাতে ধরা পড়ে যাওয়ার কারণে ওর মুখটা বেলুনের মতো চুপসে গেছে। কে জানত, অসভ্য লোকটা আজ এত তাড়াতাড়ি এসে পড়বে! লজ্জায় সে একদম স্তব্ধ, দৃষ্টিও নিচু। ভয় আর অপমানে ভেতরটা বারবার কেঁপে কেঁপে উঠছে। তার ওপর আবার এই গাধার বাচ্চা, আদিলের কুৎসিত আর অসম্মানজনক কথাগুলো যেন গায়ে বিঁধছে তীরের মতো। ঠোঁট কেঁপে কেঁপে উঠছে কান্নায়, কিন্তু না।স্নেহা কখনো কাঁদবে না। অন্তত এই লোকগুলোর সামনে তো নয়ই! সে যে দুর্বল নয়, তা নিজেকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছে সে। কান্না লুকিয়ে রাখতে গিয়ে রক্তাভ ঠোঁট কাঁপছে অনবরত।

স্নেহার এই অসহায় অথচ জেদি রূপ রণয়ের চোখ এড়াল না। ওদিকে আদিল থামার কোনো লক্ষণই দেখাচ্ছে না। তাচ্ছিল্যের সুরে বলেই চলেছে,

"গাধা চোরের চেয়ে অনেক ভালো, জানো? গাধা অন্তত মানুষের কাজে আসে, ইতিহাসে এর অনেক প্রমাণ আছে। আর তুমি? তুমি তো আস্ত একটা রাক্ষসী! সত্যি করে বলো তো, কোন দলের লোক তোমাকে পাঠিয়েছে? নিশ্চিত কোনো গোপন ফাইলপত্র চুরি করতে এসেছ! কোথায় রেখেছ, বলো!"

কথাটা বলতে বলতে আদিল আরও একধাপ এগিয়ে গেল স্নেহার দিকে।

"আদিল, ডোন্ট টাচ হার।"

আদিল দ্বিতীয় কদম ফেলল৷ তার বাঁ-হাত শূন্যে উঠল স্নেহাকে ছোঁয়ার জন্য। কিন্তু সে হাত শূন্যে থাকা অবস্থাতেই ডেস্কের ওপর প্রান্ত থেকে হুংকারের ন্যায় ভেসে এলো রণয়ের রাশভারি কণ্ঠস্বর। তার চোখের সেই ধেয়ে আসা ধারালো দৃষ্টিতে থমকে দাঁড়িয়ে গেল আদিল। আশ্চর্যও হলো।

রণয় এবার দৃষ্টি ফেরাল স্নেহার দিকে। মেয়েটার চোখ দুটো ছলছল করছে, কান্নায় একদম টলোমলো, যেন যেকোনো মুহুর্তে উপচে পড়বে। আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না স্নেহা। থরথর করে কাঁপা ওষ্ঠযুগল আর টইটম্বুর আঁখিদ্বয় নিয়ে এক দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

দৃশ্যটা দেখে কেমন যেন একটা অস্বস্তি আর খারাপ লাগা ঘিরে ধরল রণয়কে। মনে হচ্ছে কাজটা একটু বেশিই বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। সিসিটিভি ফুটেজে রণয় স্পষ্ট দেখেছিল, তার আসার শব্দ পেয়ে তড়িঘড়ি করে টেবিলের নিচে লুকিয়ে পড়েছিল স্নেহা। ওকে একটু ভয় দেখানোর উদ্দেশ্য ছিল ঠিকই, কিন্তু পরিস্থিতি যে এতটা বিষিয়ে উঠবে তা রণয় ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। স্নেহার চোখে-মুখে ফুট ওঠা ভয় আর অপমানের ভাঙন দেখে রণয়ের বুকের ভেতরটা এখন কেমন যেন খচখচ করে উঠছে।

"ভাই, আমি একশো পার্সেন্ট শিওর, এই মেয়ে নিশ্চিত কিছু না কিছু সরিয়েছে। আপনি শুধু একবার ওকে আমার হাতে ছেড়ে দেন, আমি ওকে মজা দেখাচ্ছি!" হাতার শার্ট গুটাতে গুটাতে দাদাগিরির ভঙ্গির সাথে বলল আদিল।

"উফফ, চুপ করবি তুই? তোকে না একব

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 6 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন