ফন্ট সাইজ:
থিম:
কে বাঁশি বাজায় রে

পর্ব 7

লেখক: মিথুবুড়ি

#কে_বাঁশি_বাজায়_রে
#মিথুবুড়ি
#পর্ব_০৭

"মুরুব্বী মুরুব্বি, উমহু উমহু~"

মাত্রই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বসেছিলেন টুপি-পরা একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ভদ্রলোক। ঠিক তখুনি আকস্মিক এই আক্রমণে লজ্জায় যেন মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করল লোকটার। আদিল এক লাফ দিয়ে আরেক ধাপ এগিয়ে এসে একদম বয়োজ্যেষ্ঠার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মুখে একটা বলদ মার্কা হাসি ঝুলিয়ে বলল,

"যেখানে-সেখানে পানি ছেড়ে বন্যা বইয়ে দেবেন না, দাদু! আমাদের ক্যাম্পাসের নাদুসনুদুস গাছগুলো কিন্তু খুব সংবেদনশীল!"

লজ্জায় বৃদ্ধের অবস্থা দফারফা। শেষ বয়সে এসে কিনা এক হাঁটুর বয়সী ছেলের মুখে এমন অপমান সইতে হচ্ছে! কী পাপ যে করেছিলেন, তাই আজ ছেলের বউকে ভার্সিটিতে পৌঁছে দিতে এসে এই বিপত্তি! একটু বেগ পেয়েছিল বটে, তবে শহরের রাস্তাঘাটে তো এর চেয়েও কত কী ঘটে। কই, সেখানে তো কেউ কিছু বলতে আসে না! নিশ্চয়ই সকালে উঠে বুড়ি বউয়ের মুখ দেখে বের হয়েছিলেন, তাই দিনটাই কুফা গেছে! সারাটা জীবন তো জ্বালিয়ে মারলই, এখন শেষ বয়সে এসেও তার জন্যই এই অপমান সহ্য করতে হচ্ছে!

ভদ্রলোক যখন মনে মনে জীবন আর বউকে অভিশাপ দিচ্ছেন, তখন পাশ থেকে ভেসে এল আরেকটি গলা,

"আঙ্কেল, গাছে গাছে না ঢেলে বরং এই গাধাটার গায়েই ঢেলে দিন! এর জৈব সার খুব দরকার। দেখছেন না, পুষ্টির অভাবে একদম মাঝখান থেকে শুকিয়ে ভেঙে পড়ছে।"

বৃদ্ধের ধ্যান ভাঙল। তিনি হতচকিত চোখে তাকালেন পাশে এসে দাঁড়ানো স্নেহার দিকে। খোঁচা মারা কথাটা শুনেই পিছন ফিরে একদম ক্ষেপে উঠল আদিল। সোজা তাকাল স্নেহার চোখের দিকে। এমন এক দৃষ্টি দিল, যেন কাঁচা গিলে খাবে ওকে! কিন্তু আদিলের এই ক্ষীপ্ত চেহারা দেখে স্নেহা দমার বদলে বরং হেসে ফেলল সে। হাসতে হাসতেই এগিয়ে এসে দাঁড়াল আদিলের মুখোমুখি। তারপর তর্জনী উঁচিয়ে একটু কড়া সুরেই বলল,

"কার সাথে কীভাবে কথা বলতে হয়, সেই সৌজন্যবোধটুকুও জানা নেই? ওই দিন তো বেশ বড় বড় কথা বলেছিলেন, ‘গাধারা নাকি অন্তত মানুষের উপকার করে!’ এই দেখুন তার নমুনা!"

এবার আদিলও আঙুল তুলে তেড়ে এল। স্নেহা সামান্য পিছিয়ে গেল বটে, তবে তার কপালে স্পষ্ট বিরক্তির ভাঁজ। আদিল চিল চিৎকার করে উঠল,

"এই মেয়ে! এখন তুমি আমাকে শেখাবে আমি কার সাথে কীভাবে কথা বলব? ফাটাবাঁশ একটা!"

"অবশ্যই শেখাব। তবে আপনার মতো গাধাকে পড়ানোর মতো ধৈর্য আমার নেই, বাবু। চলুন, আপনাকে ভালো দেখে কোনো কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করিয়ে দিয়ে আসি। হাতেখড়ি থেকে শুরু করে শিষ্টাচার সব নতুন করে শেখাবে। আর ফি নিয়ে ভাববেন না, ফুল স্পনসরশিপ আপস অন মি।"

"কখনোই না!" গলার রগ ফুলিয়ে চেঁচিয়ে উঠল আদিল।

স্নেহা চুলগুলো ঝাকুনি দিয়ে গা দুলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নিরুদ্দেগ ভঙ্গিতে আওড়াল,"আচ্ছা, আচ্ছা, ইট্‌স ওকে! আল্লাহ তো আর জাহান্নাম এমনি এমনি বানাননি, কাউকে না কাউকে তো সেখানে যেতে হবেই।"

স্নেহার উত্তরের পর আদিল একদম তাজ্জব বনে গেল।

"জাহান্নাম?! আমি তো শুধু ক্যাম্পাসের পরিবেশ রক্ষা করতে চেয়েছিলাম! সাধারণ একটা ঘটনা কীভাবে এক লাফে হেল-এর জার্নি হয়ে গেল!"

মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল আদিল।একজন আদর্শ নাগরিক হিসেবে পরিবেশ রক্ষা করা কি তার দায়িত্ব নয়? কিন্তু... যদি সত্যিই ওপরওয়ালা তার এই আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে থাকেন? না না, কাজটা বোধহয় ঠিক হয়নি!

হঠাৎ প্যানিক অ্যাটাক ওঠার মতো করে আদিল পেছনে ঘুরে বলল, "আঙ্কেল! আমাকে মাফ করে দেন......

আবার চমকে উঠল সে। "কই? কোথায় গেলেন উনি? এই তো এক্ষুনি এখানেই ছিলেন! আঙ্কেলললল!!!"

চারপাশে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও মুরুব্বির আর কোনো পাত্তা পাওয়া গেল না। মুহূর্তের মধ্যে আদিলের মাথায় যেন চিন্তার পাহাড় ভেঙে পড়ল।

_______

❝সোনা মিস ইউ,
ও মিস ইউ, তোকে কাছে চাই…❞

আইপডে পছন্দের গান ছেড়ে, মিউজিকের তালে তালে দুলতে দুলতে ক্লাবে ঢুকছিল নিহাদ। হঠাৎ কাকের গলার মতো কর্কশ ও বিরক্তিকর আওয়াজ পেয়ে কপাল কুঁচকে পেছনে তাকায় রণয়। রণয়ের সেই কঠিন চোখের দৃষ্টি আর কুঁচকানো ভ্রু দেখে নিহালের গান নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায়।

রণয় তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ অফিশিয়াল মিটিংয়ে ব্যস্ত ছিল। ল্যাপটপের স্ক্রিনে তার গভীর মনোযোগ। কিন্তু ক্লাবের বাইরে থেকে ভেসে আসা হট্টগোল আর নিহালের বেসুরো গান... দুইয়ের তরঙ্গ মিলিয়ে তার মেজাজ সপ্তমে চড়ে বসে। সশব্দে ল্যাপটপটা আটকে রণয় হঠাৎ-ই নিহালের ওপর অহেতুক চটে যায়। তার এই রুদ্ররূপ দেখে নিহাল ভয়ে কাচুমাচু হয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকে।

রণয় আরও ক্ষিপ্ত হয়ে সামনের টেবিলে ধুপ করে ঘুসি মেরে গর্জে ওঠে,"বাইরে কিসের এতো শোরগোল?"

"প্রেমের দ্বন্দ্ব, ভাই!"

রুমে ঢুকতে ঢুকতে উপহাসের সুরে হেসে উত্তর দেয় আদিল। তার উপস্থিতিতে নিহাল যেন স্বস্তির শ্বাস ফেলে বাঁচল।ভাবল আজকের মতো হয়তো রণয়ের রাগ থেকে বেঁচে গেল সে।

রণয় কৌতূহলী ও বিরক্ত ভ্রু জোড়া আরও কুঁচকে জানতে চায়, "মানে? কাকে নিয়ে এই ঝামেলা?"

"ভার্সিটির নতুন অ্যাটেনশন গার্ল—মিস স্নেহা তাফসি। ওরফে ফাটা বাঁশ! " নাটকীয় ভঙ্গিতে হাত-পা নেড়ে বলে আদিল।

আদিলের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ দেখে নিহালের ইচ্ছে করে একটা হাতুড়ি এনে এখনই ওর মাথাটা ফাটিয়ে দিতে! রণয়ের মেজাজ কোন পর্যায়ে আছে সেদিকে খেয়াল না রেখে কীভাবে যে ছেলেটা ফাজলামো করে! পরিস্থিতি সামলাতে নিহাল তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "আমি যাচ্ছি ভাই, এক্ষুনি বাইরের ঝামেলা মিটিয়ে মাঠ খালি করে আসছি।"

"দাঁড়া।"

রণয়ের গম্ভীর গলায় নিহাল থমকে যায়। প্রশ্নবোধক চোখে ফিরে তাকায় তার দিকে। রণয় চেয়ারে গা হেলান দিয়ে, চোখ দুটি বুজে শান্ত কিন্তু তীব্র কণ্ঠে শুধায়,

"মেয়ে নিয়ে যারা ঝগড়া করে, তারা কাপুরুষ। পুরুষ মানুষ শুধু আশায় বসে থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী বাড়ায় না। যা তার, তা ছিনিয়ে নেয়। মা র খাক, ম রে যাক... এদের বেঁচে থেকেও কোনো লাভ নেই। যাদের নিজেদের ভালোবাসাকে আগলে রাখার সাহসটুকু নেই, তারা ম রে থাকলেই ভালো!"

__________

হঠাৎ বিকট বজ্রপাতের শব্দে ফোন থেকে চোখ সরিয়ে নেয় রণয়। তাকায় খোলা জানালার দিকে। আস্ত আকাশটাই যেন আজ ঢেকে গেছে কুচকুচে কালো মেঘে! থেমে থেমে বিকট শব্দে গর্জে উঠছে বিদ্যুৎ। রণয়ের জন্মগত অপছন্দ এই বৃষ্টিকে। আবহ জানান দিচ্ছে, যেকোনো মুহূর্তেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামবে। চারদিকে বইছে একধরনের দামাল ও শীতল হাওয়া। বাতাসের ধাক্কায় জানালার পাল্লাগুলো দেয়ালের সাথে সশব্দে আছড়ে পড়ছে, যা রণয়ের কানে বেশ কর্কশ হয়ে বিঁধছে।

বিরক্ত হয়ে চোখ ফেরায় আদিল আর নিহালের দিকে। কানে আইপড গুঁজে দু'জনেই গেমের ভেতর ডুব মেরেছে, যেন এই দুনিয়ার কেউ-ই নয় তারা! রণয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেই এগিয়ে যায় জানালাটা বন্ধ করে দিতে। কিন্তু কে জানত, এই জানালার পাশেই থমকে যাবে তার পৃথিবী!

নিচে তাকাতেই রণয়ের চোখ আটকে যায় অপূর্ব এক মেঘময়ূরীর ওপর। হারিয়ে যায় তার সমস্ত দৃষ্টি। আঠারোর এক তরুণী—নাম তার স্নেহা। দাঁড়িয়ে আছে খোলা আকাশের নিচে। স্নিগ্ধ মুখখানা সামান্য উঁচিয়ে তাকিয়ে আছে কালো মেঘের পানে, যেন ব্যাকুল প্রতীক্ষায় আছে কবে নামবে বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা, আর সে নিজেকে সঁপে দেবে প্রকৃতির নিবিড় আশ্রয়ে।

রণয়ের চোখ স্থির হয়ে আসে, ক্ষণিকের জন্য পলক ফেলতে পর্যন্ত ভুলে যায় সে। সাধারণ একটি সাদা কামিজে অপার্থিব সুন্দর লাগছে মেয়েটিকে! আজ তার চুলগুলো খোলা, যা কোনো বাঁধন মানতে চাইছে না। বাতাসে উড়ছে আপন ছন্দে। আর স্নেহা? সে যেন একমনে পান করে চলেছে প্রকৃতির সবটুকু স্বাদ। নিজেও জানে না, ঠিক এই মুহূর্তে তাকে কতটা স্বর্গীয় দেখাচ্ছে! হঠাৎ করেই দু’হাত দু’দিকে মেলে দিল স্নেহা, বুকভরে টেনে নিল শীতল হাওয়া।

রণয়ের সমস্ত সত্তা থমকে গেল। অপলক দৃষ্টিতে বন্দি হলো তার মন। তবে পরমুহূর্তেই চারপাশের হালকা গুনগুন শব্দে ছিন্ন হলো সেই ধ্যান। রণয় খেয়াল করল, আশেপাশে আরও কিছু ছেলে দাঁড়িয়ে আছে আর তাদের লোলুপ চোখও ঠিক একই লক্ষ্যে। মুহূর্তেই রণয়ের চোয়াল শক্ত হয়ে এল, হিংসায় জ্বলে উঠল ভেতরটা! ক্ষিপ্ত পায়ে ছুটে গেল আদিলের দিকে। এক ঝটকায় ওর কান থেকে আইপড ছিনিয়ে নিয়ে সজোরে ছুড়ে ফেলে দিল দূরে। আদিল কিছু বুঝে ওঠার আগেই রণয়ের গর্জন ফেটে পড়ল বজ্রের মতো,

"নিচে গিয়ে এক্ষুণি মাঠ খালি করবি! তারপর তোরা দু'জন সোজা বেরিয়ে যাবি এখান থেকে! একটা ছেলেও যেন ওই মাঠে আর না থাকে! গো... ফাস্ট!"

আদিল আর নিহালের মধ্যে অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক মুহূর্ত আগেই যে লোকটা মাঠে রক্তারক্তি হওয়ার জন্য গর্জে উঠেছিল, সেই এখন নিজে যেয়ে মাঠ খালি করতে বলছে! কী তাজ্জব ব্যাপার! কিন্তু রণয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করার সাহস কারোরই নেই। চুপচাপ বেরিয়ে যায় দু’জন।

রণয় আবার ফিরে এসে দাঁড়ায় জানালার পাশে। বাইরে তখন নিঃশব্দে নামতে শুরু করেছে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। রণয় অপলক চোখে চেয়ে থাকে সেই রমণীর দিকে, যে প্রকৃতিকে ভালোবেসে একদম নিজের করে নিয়েছে। বুকভরে গ্রহণ করছে বর্ষার স্পর্শ, বিলিয়ে দিচ্ছে নিজেকে একান্ত ভালোবাসায়। চারপাশের কোনো হুঁশ নেই তার। সে স্রেফ ডুবে আছে অপার্থিব ঘোরে। ফোঁটা ফোঁটা জলকণা মিশে যাচ্ছে তার কোমল শরীরে, যেন আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে তার রূপের দ্যুতি! তার ঠোঁটের গাঢ় গোলাপি রঙে ঘনিয়ে উঠেছে তীব্র আকর্ষণ, আর চোখের ঠিক নিচে থাকা ছোট্ট কালো তিলটি বৃষ্টিতে ভিজে আরও বেশি নজরকাড়া হয়ে উঠেছে!

রণয়ের দৃষ্টি আটকে থাকে। চুম্বকের মতো বিঁধে থাকে তার ওপর। নিঃশ্বাসে স্বগতভাষণের মতো সে বলে ওঠে,"ওহে আমার মেঘময়ূরী... যত ইচ্ছা ভিজিয়ে নাও নিজেকে! তোমার এই স্নিগ্ধ রূপ আর কেউ দেখবে না। এক একমাত্র গুণী আকাশ, আর আমি এই ভাগ্যবান দর্শক ছাড়া।"

এদিকে নিচে নেমেই আদিল আর নিহাল চোখের ইশারায় সবাইকে মাঠ থেকে বের করে দেয়। কাজ শেষে নিহাল কেটে পড়তে চাইলে আদিল তাকে শক্ত করে চেপে ধরে। এত সহজে তো ছেড়ে দেওয়া যায় না! ছোটবেলা থেকেই সিআইডি হওয়ার বড্ড শখ ছিল আদিলের। তবে উচ্চতার জন্য না হলেও, এখন অন্তত একটা রহস্য উদ্ঘাটনের সুযোগ এসেছে! চারপাশে সন্দেহভাজন কিছু খুঁজতে খুঁজতে আদিলের চোখ যায় ক্লাব ঘরের জানালার দিকে। রণয় দাঁড়িয়ে আছে জানালার পাশে, তার ঠোঁটের কোণে ঝুলছে অবিশ্বাস্য অপার্থিব হাসি। রণয়ের মতো ওমন পানসে মানুষের মুখে এমন মৃদু হাসি দেখা সত্যিই বিরল!

আদিল রণয়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাতেই আঁতকে ওঠে সে। চোখ দুটো কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়। স্নেহা?! সিরিয়াসলি? রোকেয়া হলের সামনের কাঠগোলাপ গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে একমনে বৃষ্টিতে ভিজছে স্নেহা৷ অবিশ্বাসে থমকে তাকিয়ে থাকে আদিল আর নিহাল। মুহূর্তের মধ্যে দু’জনের অনুসন্ধানী মুখখানা থমথমে হয়ে যায়। তারপর একই সাথে, একই সুরে বলে ওঠে দু'জন,"আমি যা ভাবছি... তুইও কি ঠিক তাই ভাবছিস?"

আদিল কপালে হাত দিয়ে ধপাস করে বসে পড়ে। শেষমেশ এই ঝগড়ুটে মেয়েটার প্রেমেই পড়ে গেল তার ভাই? এখন এই মেয়েকে ভাবি বলে ডাকতে হবে? না, না, না! ভাবতেই নিজের গালে নিজেই সজোরে দুটো চড় বসিয়ে দেয় আদিল।

পাশে দাঁড়ানো নিহাল বিড়বিড় করে,"এজন্যই তো ভাই সবসময় তোকে ওর থেকে দূরে থাকতে বলত! এখন বুঝতে পারছি কেন ক্যাম্পাসে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। নিশ্চয়ই তলে তলে সবাইকে থ্রেট দিয়ে রেখেছে। আমি নিশ্চিত, ভাই সাজনকে দিয়ে এসব করাচ্ছে... এই জন্যই শালা ইদানিং এত ব্যস্ত থাকে!"

কথাগুলো আর শুনতে পারল না আদিল। বুকের ভেতর যেন কিছু একটা চিৎকার করে উঠল। নিঃশ্বাস চেপে মাঠের দিকে ছুটে গেল সে। এই ধাক্কা সহ্য করার মতো শক্তি অন্তত তার নেই! মাথার ওপর আজ আস্ত আকাশটা ভেঙে পড়েছে! কি আশ্চর্য কাণ্ড! আল্লাহ! আল্লাহ! আল্লাহ!

প্রিয় নারীর মাঝে বোধহয় কোনো অলৌকিক চুম্বক থাকে। তা না হলে যে মানুষটা বৃষ্টিকে চিরকাল ঘৃণা করে এসেছে, সে-ও কীভাবে এমন মোহাচ্ছন্ন হয়ে বৃষ্টির ধারায় ভেসে আসে?

রণয় এক পা এক পা করে এগিয়ে এসে স্নেহার ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। সে তখনও মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্নেহার দিকে চেয়ে আছে। রণয়ের ভেজা স্কাই-ব্লু শার্টটা তার সুগঠিত শরীরে জড়িয়ে গেছে, জলভেজা কাপড়ের আড়ালে স্পষ্ট ভেসে উঠছে মাংসপেশির রেখা। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক অপার সৌন্দর্য ঘেরা লাস্যময়ী নারী। মরুভূমির বুকে যেন ছোট্ট জলশয়ে সাঁতার কাটছে এক জলপরী। চারপাশ সম্পর্কে কোনো হুঁশ নেই স্নেহার। সে ভিজে চলেছে আপন মনে।

রণয় বুকের ওপর হাত বেঁধে কাঠগোলাপ গাছটায় হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। তার চিরচেনা হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের কথা মস্তিষ্ক থেকেই উবে যায়। ভেজা পাতার সুবাস, মাটির সোঁদা ঘ্রাণ আর স্নেহার নিঃশব্দ উপস্থিতি যেন সময় থমকে দিয়েছে। রণয় শুধু চেয়ে থাকে, অপলক চোখে চেয়েই থাকে।

হঠাৎ কী মনে করে মাঝারি আকৃতির কাঠগোলাপ গাছটা শক্ত হাতে ঝাঁকিয়ে দেয় সে। ঝরঝর করে ঝরে পড়ে একঝাঁক শুভ্র কাঠগোলাপ রূপকথার ফুলবৃষ্টি হয়ে। স্নেহা চমকে উঠে পেছনে ফিরে তাকায়। চোখাচোখি হয় দু’জনের। ভয় আর বিস্ময়ে শিউরে উঠলেও সে সরে যেতে পারে না। রণয়ের চোখে যে অদ্ভুত, অচেনা ভাষা, যা বোঝা যায় না, কিন্তু তার আকর্ষণ তীব্র ও অপ্রতিরোধ্য। স্নেহা সরতেও পারে না, কিছু বলতেও পারে না। শুধু শান্ত হয়ে সময়টাকে অনুভব করে।

বৃষ্টির দাপট ধীরে ধীরে কমে আসে। রণয় একধাপ এগিয়ে গিয়ে নিচু হয়ে থাকা একটি ডাল থেকে কাঠগোলাপ তুলে নেয়। তারপর সন্তপর্ণে অলক্ষ্যে গুঁজে দেয় স্নেহার কানের লতিতে। অনাকাঙ্ক্ষিত এই স্পর্শে শিউরে ওঠে স্নেহা। রণয়ের ঠান্ডা আঙুলের ছোঁয়ায় তার ক্ষুদ্র শরীরটায় কাঁপন ধরে যায়। স্নেহা মাথা নিচু করে ফেলে। এই শ্রাবণ-ভেজা দুপুরেও তার গাল দুটো অনুভূতির উত্তাপে যেন জ্বলতে থাকে। হৃদয়ের গহীনে অচেনা শিহরণ ছড়িয়ে পড়ে। পায়ের আঙুলগুলো লজ্জায় সিঁটিয়ে আসে।

এই অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্যের বিপরীতে রণয়ের ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে একচিলতে মৃদু হাসি। চোখের কোণে অপার নেশা মেখে অত্যন্ত ধীরকণ্ঠে প্রশ্ন করে সে,"এ কি তবে আমাদের প্রথম বৃষ্টিবিলাস, মেঘময়ূরী?"

স্নেহার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে অজানা চাপে ভারী হয়ে ওঠে। এই মাতাল কণ্ঠ, চোখের গভীর মোহ... নিঃশ্বাস আটকে আসছে তার। সে মাথা তুলতে পারে না। লোকটা ঠিক কী চায়? কেন এভাবে তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে? লজ্জায় যেন পাথরের মতো জমে গেছে সে। এই মধুর অনুভূতিটুকুও এখন শাস্তির চেয়ে কম কিছু মনে হচ্ছে না।

হঠাৎ ক্লিক! ক্যামেরার সাউন্ডে চমকে উঠে তাকায় স্নেহা। দেখে, রণয় তার দিকে ফোন ধরে ছবি তুলছে! স্নেহা দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নেয়। ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল,"কী... কী করছেন?"

রণয় কোনো উত্তর দেয় না। চুপচাপ চেয়ে থাকে লজ্জা-রাঙা গাল দুটোর দিকে। আপাদমস্তক দেখে নেয় স্নেহাকে। শরীরের সামান্যতম অংশও অনাবৃত নয়, অথচ তার শালীনতার মাঝেই লুকিয়ে আছে স্বর্গীয় উন্মাদনা! রণয়ের ঠোঁটে হালকা হাসি খেলে যায়। যেখানে রূপের প্রদর্শনী দিয়ে আকর্ষণ তৈরির প্রতিযোগিতা চলে, সেখানে এই মেয়েটি মন জয় করে নিয়েছে তার শালীনতা আর শিশুসুলভ পবিত্রতায়।

এসব ভেবে নিজের ভেতরেই তীব্র অস্থিরতা অনুভব করে রণয়। দ্রুত পা বাড়ায় চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। এই মেয়েটার সামনে আর কিছুক্ষণ থাকলে নিশ্চিত অনর্থ ঘটে যাবে! এর প্রতিটি অঙ্গভেঙ্গিতে লুকানো সম্মোহন সৃষ্টিকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে। রণয় নিজেকে দূরে সরিয়ে নিতে চায়।

"চলে যাচ্ছেন?"

থমকে যায় রণয়। ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। আবার চোখাচোখি হয় দু’জনের। গম্ভীর, ঠান্ডা গলায় রণয় জবাব দেয়,"রূপবতীদের আশপাশ থাকা অস্বস্তিকর!"

স্নেহা দু’হাতে কামিজ চেপে ধরে। বুকের ভেতরের ধুকপুকানি যেন হাড়গোড় ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসতে চায়! নিজেকে শান্ত করতে নিচু হয়ে মাটিতে পড়ে থাকা ফুল কুড়াতে শুরু করে সে।

রণয়ের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। এগিয়ে এসে কিছুটা অবাক হয়েই জানতে চায়, "মাটির ফুল কুড়াচ্ছ কেন?"

"ফুল আমার খুব পছন্দ," নিচু গলায় জবাব দিয়ে ওড়নার আঁচলে ফুলগুলো জমায় স্নেহা।

রণয় ঠোঁট কামড়ে কুঁচকানো চোখে তাকায়,"তাই বলে কুড়ানো ফুল?"

স্নেহা সোজা হয়ে দাঁড়ায়। ওড়নাটা ঠিকঠাক করে নিজেকে গুছিয়ে নেয় সে। তারপর ফুলগুলো ব্যাগে গুছিয়ে রেখে সরাসরি রণয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,

"ফুল মানেই তো মুগ্ধতা, ফুল মানেই এক টুকরো হাসি, ফুল মানেই একটুখানি ভালোলাগা, আর ফুল ভালোবাসা!"

কথাগুলো বলে প্রস্থান করে স্নেহা। আর পেছনে ফেলে যায় রণয়ের একজোড়া পলকহীন মুগ্ধ দৃষ্টি। যার রন্ধ্রে রন্ধ্রে তখন কেবল একটি শব্দই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে... ভালোবাসা!

~চলবে.........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 7 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন