ফন্ট সাইজ:
থিম:
কে বাঁশি বাজায় রে

পর্ব 8

লেখক: মিথুবুড়ি

#কে_বাঁশি_বাজায়_রে
#মিথুবুড়ি
#পর্ব_০৮

অল্পতেই যাদের ঠান্ডা লেগে যায়, তাদের কাছে বৃষ্টি একরকম অভিশাপ। গত দুই দিন ধরে ভোগার পর আজ কিছুটা সুস্থ হয়েছে রণয়৷ কিন্তু মুক্তি মেলেনি। মি. রেদোয়ান ছেলের পেছনে একরকম আঠার মতো লেগে আছেন। ব্যবসার সমস্ত ভার ছেলেকে বুঝিয়ে দিয়ে তিনি এখন নিজের রাজনৈতিক জীবনে পূর্ণ মনোযোগ দিতে চান। তাই আদরের দুলাল রণয়কে অসুস্থ শরীর নিয়েই জোর করে অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

তবে এতে রণয়ের খুব একটা বিশেষ আপত্তি নেই। সে ভালো করেই জানে রাজনীতি মানে কী পরিমাণ তৎপরতা! গত কয়েক বছরে তা সে হাড়ে হাড়ে শিখে গেছে। একসাথে রাজনীতি আর ব্যবসা সামলানো একজন মধ্যবয়সী মানুষের জন্য কতটা দুঃসহ, তা অনুধাবন করে রণয় ধীরে ধীরে ব্যবসার হাল ধরতে শুরু করেছে। অঢেল এই সাম্রাজ্যের একমাত্র উত্তরাধিকারী তো সে-ই!

বিশাল, বিলাসবহুল কেবিনে বসে রণয় গভীর মনোযোগ দিয়ে ফাইল দেখছে। পরনে নিখুঁত ফর্মাল পোশাক। এক হাতে ফাইলের পাতা ওল্টাচ্ছে, অন্য হাতে কড়া ফ্লেভারের ব্ল্যাক কফিতে চুমুক দিচ্ছে। ঠোঁটের নিচের কুচকুচে কালো তিলটি যেন কফির প্রতিটি চুমুকে আরও বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

একটা প্রচলিত প্রবাদ আছে—"ছেলেমানুষের এত সুন্দর হওয়া উচিত নয়, নজর লাগে।" আচ্ছা, এই রণয় কি জানে এই মুহূর্তে তাকে কতটা লোভনীয় দেখাচ্ছে? জানলে কি সে এমন রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে থাকত? জানলে কি এত নাটকীয়ভাবে কফিতে চুমুক দিত? এসি চলা স্বত্তেও বুকের দুটো বোতাম খোলা রেখে সুবিস্তৃত বুকটা এভাবে উন্মুক্ত করে রাখত না নিশ্চয়ই। বরং নিজেকে লুকিয়ে রাখত কোনো কঠিন হাই-সিকিউরিটির লকারে, যাতে পাছে কারও হুঁশ উড়ে যায়!

হঠাৎ কর্কশ শব্দে ফোন বেজে ওঠে। বিরক্ত হয় রণয়। ফাইল থেকে চোখ সরিয়ে ফোনের স্ক্রিনে তাকায়। কল রিসিভ করে কাঁধ আর কানের মাঝে তা চেপে ধরে, আর অন্য হাতে ফাইলগুলো গুছাতে থাকে। বাস্তব জীবনে রণয় একজন গোছানো, দায়িত্বশীল ও প্রবলভাবে ডেডিকেটেড মানুষ। ব্যস্ত গলায় সে সাড়া দেয়,

"হ্যাঁ অনি, বল।"

"কিরে, এখন কেমন লাগছে? বিকেলে আসব ভাবছি।"

"ফিলিং ফিট অ্যান্ড ফাইন।"

"তাহলে ক্যাম্পাসে এলি না কেন?"

"অফিসের ঝামেলায় পড়েছি ব্রো। তাই আসতে পারিনি। ভাবছিলাম মিটিং শেষে একবার ঢুঁ মেরে যাব, কিন্তু আর হয়ে ওঠেনি। এই মুহূর্তে প্রচণ্ড প্রেসার। লাস্ট উইকে চারটা শিপমেন্ট ডিলে হয়েছিল, সেগুলো সামাল দিতে গিয়েই হিমশিম খাচ্ছি।"

"ওয়াহ ম্যান! রাজনীতি আর ব্যবসা একসাথে সামলাচ্ছিস।ড্যাম কুল ডুড!"

"ফা ক ব্রো। শেয়ার মার্কেটের সাথে এক্সপোর্ট-ইমপোর্টও আমার ঘাড়ে গছিয়ে দিয়েছে আব্বু। সুন আই অ্যাম ফেড আপ অভ অল দিস।"

"চিল দোস্ত! তুই পারবি বলেই তো আঙ্কেল সব দায়িত্ব নিঃসন্দেহে তোর হাতে তুলে দিচ্ছেন। তোর মধ্যে সেই দৃঢ়তা আছে। আর, উনি তোকে কি কখনো জোর করেছেন নাকি?"

"আর বলিস না। আমি তো ভুলেই গেছিলাম, আমার চেয়ে আমার বাপের বড় ভক্ত তো তুই!"

"সো রুড অফ ইউ!" নাটকীয়ভাবে বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অর্ণিবাল। নিঃশ্বাসটা যেন হতাশায় মোড়া।

ঠোঁট কামড়ে মৃদু হাসে রণয়, কিন্তু সে হাসি তার দাঁত পর্যন্ত পৌঁছায় না। গলায় গম্ভীরতা বজায় রেখে সে বলল,"কী বলার ছিল বল জলদি, আমি বিজি।"

"ছিঃ দোস্ত, এভাবে বলতে পারলি!"

"হু।"

আবারও গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে অর্ণিবাল। এবার কিছুটা উদাস কণ্ঠে বলল,"কক্সবাজার প্রেস ক্লাবের সভাপতি তোকে কল দিচ্ছে, ধরছিস না। এখন আমাকে কল দিচ্ছে। কিছু জানালি না তো কী করবি? রিকোয়েস্ট করে করে যাচ্ছে, এবারও তোকে ভিআইপি গেস্ট করে আমন্ত্রণ পাঠিয়েছে।"

ফোনের সাইড বাটনে চাপ দেয় রণয়। স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে দেখে, সত্যিই অনেকগুলো মিসড কল জমে আছে। কিছুক্ষণ চিন্তা করে সে বলল, "বলে দে, যাব আমরা।"

স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে অর্ণিবাল। সে ভেবেই নিয়েছিল রণয় রাজি হবে না। রণয় এমনিতে খুব কম অনুষ্ঠানেই যায়, খানিকটা অসামাজিক স্বভাবের। অহেতুক সময় নষ্ট করতে সে মোটেও পছন্দ করে না। রাজনীতিতে আসার আগে তার জীবনের একমাত্র ফোকাস ছিল পড়াশোনা, আর সে ছিল ক্লাসের ফার্স্ট বয়। এখন রাজনীতিতেও সে ঢেলে দিয়েছে নিজের সর্বস্ব। কোনো কাজেই ফাঁকি দেয় না রণয়। সে অত্যন্ত স্ট্রিক্ট ও গম্ভীর চরিত্রের মানুষ।

"আচ্ছা। আমি তাহলে জানিয়ে দিচ্ছি। তিন দিনের একটা ট্যুরও হয়ে যাবে মোটামুটি। অনেকদিন তো কোথাও বের হওয়া হয় না ইলেকশন ইস্যুতে।"

"তোর দিদাকে বললেই পারতি! আর কয়েকদিন পর পরলোকগমন করলেই তো প্যারিস ট্যুরটা হয়ে যেত!"

"এইসব ওয়ার্ল্ড ট্যুর দিতে গেলে যে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মাতে হয়, দোস্ত!" নিচু স্বরে মিনমিনিয়ে বলল অর্ণিবাল। চারপাশে হঠাৎ নেমে এলো ঘন নীরবতা। কিছুক্ষণ পর রণয় নিজেই গলা উঁচিয়ে ফের কথার সুর ধরে,

"এইবার বাড়ির রাস্তা ক্লিয়ার। আর যারা আছেন, তারা অত তাড়াতাড়ি বিদায় নেবেন বলে মনে হচ্ছে না। তাই ফাইনাল সেমিস্টার শেষেই আমরা থাইল্যান্ড যাচ্ছি। অল স্পন্সরড বাই মি।"

মাথা নিচু করে একগুঁয়ে হাসে অর্ণিবাল। সে ভালো করেই জানে, রণয়ের কাছে এসব টাকার অঙ্ক কিংবা আয়োজন কোনো ব্যাপারই নয়। সব জায়গায় সবসময় বিল তো সেই-ই পরিশোধ করে। তবু একটা সীমা থাকা উচিত। কোথাও তো নিজস্বতা আর ব্যক্তিত্ব বলেও কিছু আছে! তাই কথার মোড় ঘোরাতে সে বলল,

"আচ্ছা, ওসব পরে দেখা যাবে। চল, কালকেই রওনা দিই।"

"না রে, পরশু। একদিন সময় লাগবে। আমি পাঁচটা প্লেন টিকিট কেটে রাখছি।"

"পাঁচটা মানে?"

"সাজন যাচ্ছে না আমাদের সাথে।"

"কেন? ও তো সবসময়ই তো আমাদের সাথে প্রোগ্রামে যায়।"

"ওকে বিশেষ কারণে রেখে যাচ্ছি। ওদের পরে আলাদা ট্যুরে পাঠাব।" রাশভারী সুরে বলে রণয়।

"ওহ।" একটু থেমে অর্ণিবাল আবার বলে, "চল না, দুদিন থাকি! বাকি কাজ সাজন সামলাক।"

"মন এখানে রেখে ওখানে গিয়ে টিকতে পারব না, দোস্ত।" রণয়ের বিরস কণ্ঠের স্বগতোক্তি প্রত্যুত্তর।

"মানে?" চোখ বড় করে চমকে ওঠে অর্ণিবাল। পরক্ষণেই কিছু একটা ভেবে সে চুপ করে যায়, আর কোনো প্রশ্ন করে না।

"আচ্ছা, তুই যা বলিস। পারলে রাতে ক্লাবে আসিস। রাখলাম।"

"ওকে।"

কল কেটে দেয় রণয়। ফোনটা টেবিলে রেখে সে মনোযোগ দেয় ল্যাপটপে। ক্ষণকালেই তার চোখ-মুখে ছড়িয়ে থাকে স্নিগ্ধ হাসি। বিমুগ্ধ গম্ভীর মুখটাতেও যেন উঁকি দেয় উষ্ণ কোমল ছোঁয়া। স্ক্রিনে ভার্সিটির কিছু ভিডিও প্লে হচ্ছে। এই নিয়ে চৌদ্দবারের মতো সে ব্যস্ততার মাঝেও ভিডিওগুলো দেখছে। পেলব হাতে ল্যাপটপটা আরও একটু কাছে টেনে নেয় সে। তারপর অচেনা এক আবেশে আচমকা নরম গলায় ফিসফিস করে বলে ওঠে,

"এত মায়া তোমায়, না ভালোবাসায়?
মেয়ে তুমি মায়া... না ভালোবাসা?"

______

গ্রীষ্মের শেষপ্রান্ত। সারা রাতের তাণ্ডব ঝড় শেষে আকাশ যেন মুক্তি পেয়েছে অন্ধকার মেঘের রাজ্য থেকে। অনুকূলের স্বভাবসিদ্ধ শাসন যেভাবে প্রকৃতিকে আয়ত্তে আনে, এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। নুঝিয়ে পড়া সবুজ পাতাগুলো ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। দক্ষিণ দিক থেকে মাঝে মাঝেই বইছে হিমেল শীতল হাওয়া, যেন ক্লান্ত শহরটাকে একটু পরশ বুলিয়ে দিতে চায়। সাদা মেঘের কুন্ডলীগুলো ধীরে ধীরে বিলীন হচ্ছে নীলচে আকাশে, আর তাদের ফাঁক গলে জেগে উঠছে হলুদ রোদ্দুর।

সাদা সফেদ বোল্ড প্রিন্টেড পর্দা ভেদ করে সেই সোনালি আলো এসে পড়ছে স্নেহার রুমের নীরব কোণে। চোখে আলো পড়তেই পিটপিট করে চোখ মেলে স্নেহা। আধোঘুমে হাতড়ে খুঁজে পায় তার ফেলে রাখা অবহেলিত ফোন। লক স্ক্রিনে চাপ দিতেই তার চোখ দু'টো বিস্ফোরিত হয়। দেরি হয়ে গেছে! এক ঝটকায় বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে ওঠে স্নেহা, তারপর সোজা ছুট দেয় ওয়াশরুমে।

শেষ রাতে ঘুমিয়েছিল স্নেহর বকাবকির পর। পরীক্ষার সময়ে ওর খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। সারা রাত ধরে চলে রিভিশনের ঝড়। স্নেহ আর সীমান্ত সাহেব আজ সকালে রওনা দিয়েছে গ্রামের দিকে, জমিসংক্রান্ত একটা বিশেষ কাজে। স্নেহ অবশ্য যেতে চায়নি, কারণ আজ স্নেহার পরীক্ষা। পরে স্নেহাই ভাইকে একরকম ঠেলেঠুলে পাঠিয়েছে এবং নিশ্চিত করেছে যে, সে একা একা ভার্সিটিতে নিরাপদে পৌঁছাতে পারবে। তবে যাওয়ার সময় স্নেহর মুখটা ছিল দেখার মতো!

তাড়াহুড়ো করে রেডি হয়ে বেরোতে যাচ্ছিল স্নেহা, হঠাৎ চোখ পড়ে টেবিলের দিকে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে দেখে, স্নেহ তার জন্য রেখে গেছে ফ্রোজেন ভেজে রাখা রুটি, সাথে ভাজি। সবকিছু খুব যত্নে গুছিয়ে রেখেছে হটপটে। আর তার ওপরে ছোট্ট একটা চিরকুট যাতে উকিল সাহেবের কড়া হুঁশিয়ারি,

"খাবার না খেয়ে এক পা-ও বাড়াবি না। আমি এসে চেক করব কিন্তু। আর হ্যাঁ, স্নেহু ফাইটিং!"

চিরকুটটা পড়ে স্নেহা মুচকি হাসে। তারপর রুটির একটা অংশ ছিঁড়ে মুখে পুরে নিয়ে ব্যাগটা কাঁধে ফেলে চটজলদি বেরিয়ে যায় সে । হাতে সময় মাত্র বিশ মিনিট।
নিউমার্কেট এরিয়া তো আবার এই শহরের জ্যামের রাজ্যপাটের রাজাধিরাজ!
______

শিপমেন্টের ঝামেলায় আজ সকাল সকালই অফিসে যেতে হয়েছে রণয়কে। মেজাজ বেশ চড়া, যেন আগুনের ঢেউ বইছে চোখে-মুখে। অফিসে এসেই চারজন অসাধু কর্মীকে নির্দ্বিধায় ছাঁটাই করে। মি. রেদোয়ান রাজনীতির ব্যস্ততায় ব্যবসার দিকে তেমন নজর দিতে পারেননি। আর সেই সুযোগটাই নিখুঁতভাবে কাজে লাগিয়েছিল দুর্নীতিবাজ এমডি। কিন্তু রণয় অফিসে পা রেখেই যখন হিসাবের খাতা হাতে তুলে নিল, সেদিন থেকেই শুরু হলো এমডির পতনের দিনপঞ্জি।

রণয় একে একে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে সমস্ত লেনদেন, দাবি করে সব ভ্যালিড ডকুমেন্ট। এত বছরের কোটি কোটি টাকার গরমিলের হিসাব এমডির পক্ষে দেওয়া তো অসম্ভবই! ফলস্বরূপ জালিয়াতির মামলায় সে এখন পুলিশ কাস্টডিতে। আর তার সমস্ত সম্পত্তি ব্যাংক সিল করে দিয়েছে।

রণয় এখন পুরো কোম্পানির জন্য আতঙ্কের নাম। তার চোখে চোখ পড়লেই বুক কাঁপতে থাকে সবার। মেজাজে একটুও শিথিলতা নেই। সামনে যাকে পাচ্ছে, ঝাঁঝালো রুষ্ট গলায় ধমকে দিচ্ছে। ভয়ে ম্যানেজার দূরে তটস্থ অবস্থায় দাঁড়িয়ে৷ সামনে এসে যে একটা কথা বলবে, সে-ই সাহস পাচ্ছে না কেউ। এরমধ্যে টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা অনবরত বেজে চলেছে। শেষমেশ একটু সাহস সঞ্চয় করে ম্যানেজার এগিয়ে এসে গলা খাসখাস করে মিনমিনে স্বরে বললেন,

"স্যার, আপনার ফোনটা… অনেকক্ষণ ধরে রিং হচ্ছে।"

রণয় তিক্ত মুখেই হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলে নেয়। কঠিন চোয়ালে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই সাজনের নাম দেখে তার গুরুগম্ভীর কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ে। কানে ফোনটা তোলার সাথে সাথেই ওপার থেকে ভেসে আসে সাজনের ব্যস্ত ও উদ্বিগ্ন কণ্ঠ,

"ভাই… স্নেহা ভাবি কাঁদছে। আ.....

আর কিছু বলার সুযোগ পেল না সাজন। হুট করে ফোনটা কেটে দিল রণয়। ওপাশে সাজন থমকে যায়। রণয়ের এমন রূঢ় আর অদ্ভুত আচরণ তার কাছে ছিল অপ্রত্যাশিত ও বিস্ময়াভূত।

______

রোকেয়া হলের সামনের কাঠগোলাপ গাছের নিচের বেঞ্চিতে বসে অঝোরে কাঁদছে স্নেহা। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গেছে বেচারির। তার দুধে-আলতা মুখশ্রীর উপর লীলচে আভা ফুটে উঠেছে। ক্ষণে ক্ষণে পাতলা শরীরটা কাঁপছে টুপটাপ। ভাগ্যের উপর অভিমান করার শক্তিটুকুও যেন নিঃশেষ আজ। এই অল্প বয়সেই ক্লান্ত সে! জটিল জীবনচক্রের ভারে একেবারে হাঁপিয়ে উঠেছে। অভিযোগের বিশাল ভাণ্ডার যেন জমা হয়ে আছে কপালের উপর। চোখের পানিগুলোও যেন আজ কথা মানছে না। শুকাতে চাচ্ছে না কিছুতেই।

হঠাৎ ভারী পদছাপের শব্দে ভেজা চোখ তুলে সামনে তাকাতেই চমকে উঠল স্নেহা। রণয় দৌড়ে আসছে… সদাতজে চোখে-মুখে প্রচণ্ড অস্থিরতা। তার নিখুঁত সেট করা চুলগুলো এলোমেলো! দ্রুত দৌড়ের ছন্দে কাঁপছে তার বুকজোড়া দীর্ঘশ্বাস। স্নেহা স্থির হয়ে চেয়ে থাকে… দিকশূন্য দৃষ্টিতে, অবাক নয়নে। বুকের ভিতর জমে থাকা সব তিক্ততা যেন এক নিমিষেই গলে যায় রোদের মতো। সে অনুভব করে অদ্ভুত প্রশান্ত স্নিগ্ধতা, অজান্তেই কেঁপে ওঠে তার অবুঝ হৃদয়।

ফরমাল গেটআপে এই প্রথম রণয়কে দেখল সে। গায়ে ইন্ডিগো চেক শার্ট, অফ হোয়াইট শার্টের ওপর খোলা দুটি বোতাম, যার ফাঁকে সুঠাম বুকে আলো খেলে যাচ্ছে। কোমরে লেদার বেল্ট, পায়ে চেলসি বুট আর হাতে সেই চেনা ক্লারা অ্যান্টি-টার্নিশ ব্রেসলেট ও ঘড়ি। স্নেহার ভেতরটা থরথর করে দুলে ওঠে। বসন্ত যেন হঠাৎ এসে ছুঁয়ে গেল তাকে। সব ভুলে তার চোখ আটকে যায় লোকটার মুখে, সেই নিরেট চিবুকে, যেখানে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে উদ্বেগ আর আশঙ্কার দাগ।

রণয় ছুটে এসে সোজা স্নেহার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। তার কণ্ঠে বিস্ফোরণের মতো উৎকণ্ঠা,"স্নেহা! কী হয়েছে? হোয়াট হ্যাপেন্ড, সুইটহার্ট? কান্না করছ কেন?"

গলায় উত্তেজনার পারদ, চোখে গভীর প্রশ্নবোধক দৃষ্টি। যেন এখনই ভেঙে পড়বে উদ্বেগের ভারে। স্নেহা একদম নির্বা। তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না। মনে হয় সে যেন আটকে আছে কোনো নিঝুম ঘোরে। কেবল শুনতে পায় রণয়ের ডাক "স্নেহা"। আজ এই প্রথম লোকটা তার নাম ধরে ডাকল!

"কী হলো?" রণয় এবার হাত ঝাঁকিয়ে আবার জিজ্ঞেস করে। কণ্ঠে আগের চেয়েও অনেক বেশি উৎকণ্ঠা।

স্নেহা চমকে ওঠে। আটকে থাকা কান্নাটা আবার গলা চেপে ধরে। চোখের জল গড়িয়ে পড়ে অবাধ্য নদীর মতো। কোনোমতে দুহাতে মুখ চেপে ধরে হেঁচকাতে হেঁচকাতে সে বলে ওঠে,"ভাইয়াব্বু শহরে নেই… আমি বাসে আসতে গিয়ে জ্যামে আটকে পড়েছিলাম। দশ মিনিট দেরি হয়েছিল, তাই ম্যাম ঢুকতে দেয়নি..."

রণয়ের চিবুক শক্ত হয়ে আসে। তৎক্ষনাৎ সে সোজা উঠে দাঁড়ায়। তারপর স্নেহার কব্জি শক্ত করে ধরে ওকে টেনে তোলে। স্নেহা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই রণয় ওকে টেনে নিয়ে হাঁটা দেয়। সোজা যায় পরীক্ষা হলের সামনে। চারপাশে জমে ওঠে শত কৌতূহলী দৃষ্টি, ক্লাসরুমের ভেতরের সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে দরজার দিকে। লজ্জায় স্নেহার সারা শরীর কাঁপতে থাকে, সে মাথা নিচু করে রাখে। তখনও রণয়ের হাত শক্ত করে ধরা তার কব্জিতে।

পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রফেসর সালেহা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন। রণয়কে এমন রাগী ও মরিয়া রূপেরে তিনি কখনো দেখেননি। রণয়ের দৃষ্টি তখন ভীষণ কঠিন, চোখে যেন একপ্রকার চাপা বজ্রপাত লুকিয়ে আছে। তা দেখে সালেহার গলাটা খসখস করে ওঠে। তিনি খুব ভালো করেই জানেন এই রণয় কে। চারবারের সংসদ সদস্য রেদোয়ান তাজওয়ারের ছেলে, ছাত্রদলের দলনেতা এবং ভার্সিটির তুখোড় টপার।

প্রফেসর সালেহা কিছু একটা বলতে যাওয়ার আগেই রণয় তার কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব শান্ত রেখে বলে, "ওকে পরীক্ষায় বসতে দেওয়া হোক, ম্যাম।"

প্রফেসর সালেহা একটু ঘাবড়ে যান। রাজনীতির এই ভারী ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে না বলার কোনো উপায়ও তো নেই! তাই আমতা আমতা করে কৃত্রিম হেসে তিনি বলেন,"ওওহ, তোমার পরিচিত! আগে বললে না কেন। এই মেয়ে আসো, তোমার সিট যেখানে, সেখানে গিয়ে বসো। যাও।"

তিনি নিজে স্নেহার হাত ধরে নিয়ে গিয়ে ওকে সিটে বসতে দেন। রণয় ততক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে স্নেহার দিকে। স্নেহা সিটে বসে চোখ তুলতেই তাদের চোখের পলক এক হয়। রণয়ের চোখের ভাষা ওকে আশ্বস্ত করে। অতঃপর প্রফেসরের দিকে ঘুরে বেশ গম্ভীর গলায় বলে, "ওকে যেন একটু এক্সট্রা সময় দেওয়া হয়, ম্যাম।"

আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে যায় রণয়। চারপাশের সমস্ত তির্যক ও কৌতূহলী দৃষ্টিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে স্নেহা শক্ত হাতে কলম তুলে নেয়। এবার তার মনে আর কোনো ভয় নেই। চোখের পাতা নামিয়ে খাতার ওপর ঝুঁকে পড়ার পরেও তার মনে হতে থাকে, অদৃশ্য কেউ একজন যেন শক্ত হাতে পাহারা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার পাশে!

এক্সট্রা সময়ের দরকারই হয়নি স্নেহার। প্রশ্ন কমন পড়ায় যথাসময়ের আগেই সে পরীক্ষা শেষ করে ফেলে। ক্লাস থেকে বের হতেই করিডোরে দেখা হয়ে যায় তিবার সঙ্গে। ওর সিট পড়েছিল অন্য একটি কক্ষে। সকালের ঝড়ঝাপটা আর নাটকীয় ঘটনাটা স্নেহা পুরোটাই চেপে যায়। কারণ তিবা ভীষণ পজেসিভ স্বভাবের, আর এর মধ্যে রণয়ের নাম তুললেই সে "চকলেট বয়, চকলেট বয়" বলে পুরো মাথা গরম করে ফেলবে৷

হাসিখুশিতে দুই বন্ধু গেটের দিকে এগোতে থাকে। তিবা হঠাৎ প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,"আজকে হলে ঢুকতে তোর এত দেরি হলো কেন রে? আমি তো এসে তোকে খুঁজে পাইনি! গেটের ওই বখাটে ছেলেগুলো আবার কিছু বলেনি তো?"

স্নেহা মুচকি হেসে বলল,"না রে, জ্যামে পড়ে একটু আটকে গিয়েছিলাম। আর ওই ছেলেগুলো? ধুর, ওরা এখন আর আমার দিকে চোখ তুলেও তাকায় না! হঠাৎ করে সবার এত সুরুচি কীভাবে হলো কে জানে! আচ্ছা তিবা, বল তো আমি কি সত্যিই একটু কালো হয়ে গেছি?"

মুখ এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে ছোট্ট একটা পোজ দিয়ে জানতে চায় স্নেহা। তা দেখে উচ্চস্বরে হেসে ওঠে তিবা, সাথে হাসে স্নেধাও। এরপর তিবাকে রিকশায় তুলে দিয়ে স্নেহা একাই দাঁড়িয়ে থাকে রিকশার জন্য।

ঠিক তখনই আচমকা একটা দামি গাড়ি তীব্র গতিতে এসে ঠিক তার সামনে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ে! আকস্মিক এই ঘটনায় বেশ অপ্রস্তুত হয়ে যায় স্নেহা। পরক্ষণেই গাড়ির গ্লাস নামতেই ভেতরে রণয়কে দেখতে পেয়ে তার বুক থেকে যেন একটা পাথর নামে। স্বস্তি পায় সে। এখন আর রণয়কে দেখলে আগের মতো বুক কাঁপানো ভয় কাজ করে না, বরং অদ্ভুত এক ভালোলাগা আর উত্তেজনায় ভেতরটা দুলে ওঠে।

গাড়ির ফ্রন্ট ডোর খুলে দিয়ে রণয় জোরালো ও হুকুমের সুরে ব,"গেট ইন দ্য কার।"

কেন যেন তখন স্নেহার মাথা আর ঠিকমতো কাজ করে না। নিজেকে একটুও না বুঝিয়ে, কোনো প্রশ্ন না করেই সে চুপচাপ গিয়ে গাড়িতে গিয়ে বশে পড়ে। রণয় একবার ওর দিকে তাকিয়ে মৃদু অবাক হয়, তবে কিছু না বলে গাড়ি চালাতে শুরু করে। স্নেহা তখন চরম অস্বস্তিতে ভুগছে। চুপচাপ সিটে বসে নিজের আঙুলগুলো কচলাতে থাকে। মনে মনে ভাবতে শুরু করে সে কি ঠিক করল? এই লোকটা তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? গুমট মেরে মেরে কোথাও খুন করে ফেলবে না তো?!

তবে পরক্ষণেই আবার মনে হয় লোকটা যদি খারাপই হতো, তবে সকালে পরীক্ষার হলে সাহায্য করতে ছুটে আসত না! হুট করে তার কোলের ওপর ভারী কিছু একটা এসে পড়ায় স্নেহা চমকে ওঠে। তাকিয়ে দেখে, খাবারের টেকআউট বক্স! ভুরু কুঁচকে সে রণয়ের দিকে তাকায়।

"এ... এটা কী?"

রণয়ও উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, "এটা কী?"

"খাবার।"

"তো খাবারই।"

"তো আমি করব?"

"খাবার কী করে?"

"খায়!"

"তো হাতে নিয়ে বসে আছ কেন? খাও।"

"আমি খাব না।"

"সকালে কিছু খেয়ে এসেছ?"

"না তো।"

হঠাৎ করেই রণয়ের কণ্ঠস্বর ভারী ও গজগজে হয়ে ওঠে। স্টিয়ারিং শক্ত হাতে চেপে ধরে ধমকের সুরে সে বলল,"তাহলে চুপচাপ খাবারটা শেষ করো, কথা কম!"

রণয়ের ধমক খেয়ে একেবারে চুপসে যায় স্নেহা। আসলে পেটটাতেও তখন বেশ ভালোই খিদে পেয়েছিল। তাই আর কথা না বাড়িয়ে একরকম শিশুর মতোই সে প্যাকেট খুলে খেতে শুরু করে। ওকে অমন চুপচাপ খেতে দেখে রণয়ের ঠোঁটের কোণে অদৃশ্য, মায়াবী হাসি খেলে যায়।

কিছুক্ষণ পর গাড়িটা যখন স্নেহাদের এপার্টমেন্টের গলির দিকে ঘুরল, তখন অবাক হয়ে যায় স্নেহা। তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করে বসে,"আরে,এদিকে তো আমার বাসা!"

"তো? তুমি কি আমার বাসায় যাচ্ছ নাকি?" আড়চোখে চেয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে রণয়।

মুহূর্তে একদম চুপ মেরে যায় স্নেহা। মুখে আর কোনো শব্দ জোগায় না। এই বোকা বোকা কথাটার জন্য নিজের মাথাটাকে বুড়িগঙ্গা নদীতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে ইচ্ছে করছে তার! লজ্জায় জিভ কেটে সে ভাবছে, এখনই যেন মাটির নিচে দুজনে মিলে গলে যাওয়া যায়!

রণয় ভ্রু কুঁচকে পাশ থেকে জিজ্ঞেস করে,"কী ভেবেছিলে বলো তো?"

আতঙ্কে নিজের মাথায় ঠুকর মারার ভঙ্গি করে স্নেহা। ক্যাম্পাসের মাঝখানে কোমরে হাত দিয়ে ঝগড়া করা সেই মেয়েটা আজ এই লোকটার সামনে কথা হারিয়ে ফেলছে, বারবার অপদস্ত হচ্ছে। রণয়ের ঠোঁটের কোণে একচিলতে বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে। গাড়িতে বাজতে থাকা স্নিগ্ধ মিউজিকের তালে তালে হালকা সুরে গুনগুনিয়ে ওঠে সে,

"চোখ দিয়ে দেখি মুখ দিয়ে হাসি, আর ভাবি এই সে আমার মহারানী..."

তড়াক করে রণয়ের দিকে তাকায় স্নেহা। রেগে জিজ্ঞেস করে, "কী বললেন?"

রণয় নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সামনে তাকিয়ে জবাব দেয়,"কোথায়, কিছু বললাম নাকি? নামো, এসে গেছি।"

স্নেহা অবাক হয়ে জানালার বাইরে তাকায়। হ্যাঁ, ঠিকই তো গলির একদম সামনে! এই লোকটা ঠিকানা জানল কীভাবে? প্রশ্ন মাথায় আসলেও মুখে কিছু বলে না সে। ছটফট করে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। এই মানুষের সংস্পর্শ মানেই সর্বনাশ, পদে পদে ধরা খাওয়া! পেছনে না ফিরে চেঁচিয়ে বলে ওঠে,

"ধন্যবাদ!"

কিন্তু ঘুরে গিয়েও হঠাৎ থেমে দাঁড়াল স্নেহা। দেখল, রণয় অপলক তাকিয়ে আছে তার দিকে। চোখাচোখি হতেই রণয় বলে উঠল,

"কী হলো, যাও।"

"আপনি যাচ্ছেন না কেন?"

"তুমি আগে যাও।"

স্নেহা তবুও নড়ে না। মাটির দিকে তাকিয়ে পায়ের আঙুল দিয়ে মাটি কুটতে থাকে। তার মনের ভাব যেন ঠিকই পড়ে ফেলল রণয়। সে জিজ্ঞেস করে,

"কিছু বলতে চাচ্ছো?"

স্নেহা উপরনিচ মাথা নাড়ে।

"বলো।"

"আপনার গাড়িটা সুন্দর।"

রণয়ের মুখ কালো হয়ে যায়। সে হয়তো অন্য কিছু শুনতে চেয়েছিল। সে মুখ নিচু করতেই স্নেহা মুখ তুলে বলে ওঠে,

"স্পেশালি এই সিটটা।"

চকিতে চোখ তুলে তাকায় রণয়। স্নেহা আঙুল দিয়ে ইশারা করে দেখায়। রণয় তার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকায় পাশের সিটিতে, যেখানে এতক্ষণ বসে ছিল স্নেহা। কথাটির গভীর অর্থ বুঝতে পেরে অজান্তেই রণয়ের ঠোঁটের কোণে এক ফালি মিষ্টি হাসি ফুটে ওঠে। সে আনমনে বিড়বিড় করে,

"তাহলে আজ থেকে এই সিট আপনার জন্য রিজার্ভ করা হলো, ম্যাডাম।"

তবে পরক্ষণেই গম্ভীর হওয়ার ভান করে রণয় এমন ভাব করল যেন স্নেহার কথাটা সে পাত্তাই দেয়নি। স্নেহা তখনো দাঁড়িয়ে। রণয় ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে নাটকীয়ভাবে বলে উঠল,

"আমাকে একা রেখে যেতে ইচ্ছে করছে না বুঝি?"

স্নেহা এক দৌড়ে গলির ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল। পেছনে গাড়ির ভেতর বসে একদৃষ্টিতে অপসৃয়মাণ স্নেহার পথের দিকে তাকিয়ে রইল রণয়।

তারপর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে পাড়ার চায়ের স্টলের সামনে গিয়ে থামল। সেখানে আড্ডা দিচ্ছিল সেই দিনকার ছেলেরা। রণয়ের গাড়ি দেখামাত্রই তাদের লিডার নিজে এগিয়ে এল। গ্লাস নামাল রণয়। লিডার মাথা চুলকে সসম্মানে বলল,

"ভাই, কোনো সমস্যা হয়নি। ভাবিকে চব্বিশ ঘণ্টা নজরে রাখি। এলাকার কোনো ছেলের সাহস নেই ভাবির দিকে চোখ তুলে তাকানোর।"

রণয় বাঁকা হাসে। সে জানে কারও সেই সাহস নেইও। ম্যানিব্যাগ থেকে হাজার টাকার একটা হাফ বান্ডিল বের করে ছুড়ে দিল তাদের দিকে। লিডার সাপের মতো ক্ষিপ্রতায় সেটা লুফে নিল।

"পরশু সারারাত তোরা পার্টি করবি। কাল শহরের বাইরে যাচ্ছি। ক্যাম্পাসের দিকটা চোখে চোখে রাখবি। ২৪/৭ নজর থাকবে ওখানে। আর যদি সেদিনকার মতো কোনো গণ্ডগোল হয়... তাহলে তোদের অবস্থাও ওদের মতো করে দেব, বুঝলি?"

ছেলেরা উচ্ছ্বসিত হয়ে মাথা নাড়ল। রণয় ধুলো উড়িয়ে তৎক্ষণাৎ গাড়ি নিয়ে সেখান থেকে চলে গেল।

এরপর সোজা গেল একটি কার স্টিকার শপে। শপে পৌঁছে নিজের হাতে ফন্ট ডোরের, ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটের ড্যাশবোর্ডে নিজহাতে একটি স্টিকার লাগাল। যেখানে সুদৃশ্য অক্ষরে লেখা,

"This seat is reserved for my Sweetheart."

________

বাসায় ঢুকেই স্নেহা সবার আগে ফোনটা হাতে নেয়। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে স্নেহর পাঠানো অসংখ্য টেক্সট,

"না খেয়ে কিন্তু একদম যাবি না... এই বাসে উঠবি, সময় কম লাগবে... রোডের কর্নার ধরে হাঁটবি, একা একা রাস্তা পার হোস না, দরকার হলে ট্রাফিক পুলিশকে বলবি। মাথা ঠান্ডা রাখবি, সব প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক দিবি।"

আর শেষ মেসেজটি ছিল,"বাসায় ফিরেই আগে কল করবি আমাকে।"

মেসেজগুলো একদৃষ্টিতে পড়তে পড়তে স্নেহার মুখে তৃপ্তির ফাল্গুনী হাসি ঝরে পড়ে। সে সঙ্গে সঙ্গে কল করে স্নেহকে। কিন্তু ওপাশ থেকে কল কেটে দেওয়া হয়। পরক্ষণেই একটি মেসেজ আসে,

"ব্যস্ত আছি বাবু, ফ্রিজে খাবার আছে, গরম করে খেয়ে নিস। ফ্রি হয়ে কল দিচ্ছি।"

কিন্তু অলস স্নেহা কি আর তা করবে? আজ তো আরও না! লম্বা শাওয়ার শেষে সে সোজা গিয়ে বসল খাবার টেবিলে। দুপুরের খাওয়া শেষে এখন কিছু থিসিস রিভাইজ করতে হবে। ব্যাগ খুলে কলম বের করতে গিয়েই থমকে যায় ওর হাত। চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে যায়! ব্যাগের ভেতর এ কী লুকিয়ে আছে? একটা কালো গোলাপ! বাংলাদেশে যা প্রায় অবিশ্বাস্য। আর এটা এল কোত্থেকে?

গোলাপটার গায়ে গুঁজে দেওয়া ছোট্ট একটি চিরকুট। ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে সেটি তুলে নেয় স্নেহা। এরপর স্নায়ুচাপের ভেতরই খুলে পড়তে শুরু করে। মুহূর্তেই চারপাশ যেন একদম নিস্তব্ধ হয়ে আসে। শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বয়ে যায় শীতল স্রোত। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসে, চোখে একরাশ অবিশ্বাস। চিরকুটে সাইনপেনের স্পষ্ট আঁচড়ে লেখা,

"Let's catch up tonight, sweetmeat."

~চলবে.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 8 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন