#কে_বাঁশি_বাজায়_রে
#মিথুবুড়ি
#পর্ব_০৯
"জীবন কিছু প্রশ্ন রেখে যায়, যার উত্তর কেবল সময়ের কাছে জমা থাকে৷ কিছু ভুল চিরকালের মতো অপরিবর্তনীয়, আর কিছু কষ্ট? সেগুলো কণ্ঠ পেরিয়ে বাইরে আসতে পারে না, কেবল বুকের গভীরে চাপা পড়ে গুমরে মরে।"
"বাদ দে না স্নেহা! তুই অতিরিক্ত ভাবছিস, হয়তো ওটা তোর মনের ভুল।"
"মনের ভুল হলে, ওই ফুলটা এল কোথা থেকে?"
"হয়তো আশিকের জ্বীনের মতো কোনো রোমান্টিক ভূত তোর ঘাড়ে চেপেছিল!" ঠোঁট টিপে হাসি লুকানোর চেষ্টা করে তিবা।
"তুই মজা নিচ্ছিস? সবটা তোর কাছে তামাশা মনে হচ্ছে?"
তিক্ত গলায় বলে উঠে পড়তে নেয় স্নেহা। কিন্তু তিবা হাত ধরে ওকে থামায়। এবার তিবার কণ্ঠস্বরও গম্ভীর হয়ে ওঠে।
"দেখ, এটা হয়তো কোনো দুষ্টু ছেলের ইয়ার্কি বা বদমাইশি। বিষয়টাকে প্লিজ অত সিরিয়াসলি নিস না, খামোখা প্যানিক করিস না তো!"
"কিন্তু তাই বলে…
কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায় স্নেহা। ভয়ে তার ঠোঁট কাঁপে। অজানা শঙ্কায় গলার স্বর আটকে যায়। তিবার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে, তবে সে আর কথা বাড়ায় না। চুপচাপ আড়চোখে তাকিয়ে থাকে স্নেহার থমথমে মুখের দিকে। স্নেহার বুক চিরে বেরিয়ে আসে ভারি দীর্ঘশ্বাস। মনে ঘুরপাক খাচ্ছে অজস্র প্রশ্ন, যেগুলোর কোনো উত্তর নেই। কাউকে বলেও বোঝানো যাচ্ছে না। এমনকি তিবাকেও সবটা বলেনি সে।
কাল রাতের ওই চিরকুট আর কালো গোলাপটা গার্বেজে ফেলে দিয়েছিল স্নেহা। নিজেকে বুঝিয়েছিল এসব স্রেফ তার কল্পনা। মাথা থেকে ভাবনাটা ঝেঁটিয়ে ফেলে সে পড়তে বসেছিল। রুটিনমাফিক রিভিশন সেরে একসময় গভীর ঘুমেও তলিয়ে গিয়েছিল সে।
কিন্তু রাতটা আর দশটা রাতের মতো ছিল না। ঘুমের ভেতরেই সে অনুভব করেছিল, কেউ যেন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে। কারও গায়ের গরম নিঃশ্বাস ছুঁয়ে যাচ্ছিল স্নেহার ত্বক। সেই সঙ্গে অদ্ভুত গন্ধ… মনে হচ্ছিল কেউ যেন তার শরীরের প্রতিটি কোষ শুঁকে দেখছে! স্নেহার অজান্তেই ভয়ে কুঁকড়ে গিয়েছিল তার শরীর। দুই হাতে শক্ত করে মুঠো ধরেছিল চাদরের। তবুও সে চোখ মেলতে পারেনি। ঘুমের ঘোরটা ছিল পাথরের মতো ভারী।
সকালে ঘুম ভাঙার পর প্রথমেই সে অনুভব করে, তার পুরো শরীর ঘামে ভেজা। অথচ সে বরাবরই ঠান্ডাপ্রিয়! ফ্যান চলা সত্ত্বেও এমন ঘাম হওয়ার কথা নয়। আস্তে আস্তে মনে পড়তে শুরু করে রাতের সেই গা শিউরে ওঠা অনুভূতিগুলো। তা মনে পড়তেই তার গলা শুকিয়ে আসে ভয়ে।
দ্রুত দরজার দিকে তাকায় সে। না, দরজা ভেতর থেকেই লক করা ছিল। নিজেকে সান্ত্বনা দেয়, নিশ্চয়ই বাজে স্বপ্ন ছিল। কিন্তু ক্লান্ত হয়ে বিছানা থেকে উঠে বসতেই তার চোখ আটকে যায় বালিশের পাশের একটা জিনিসে। আরেকটি কালো গোলাপ! চিৎকার করে ওঠে স্নেহা। পরমুহূর্তেই নিজের মুখ চেপে ধরে সে। থরথর করে কাঁপতে থাকে তার শরীর। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে হাত বাড়িয়ে ফুলটা তোলে সে। এই ফুল তো কালই সে গার্বেজে ফেলে দিয়েছিল! তবে এটা এখানে এল কী করে?
বালিশের নিচে রাখা একটা চিরকুট দেখে সে আরও স্তব্ধ হয়ে যায়। চিরকুটটা তুলে খুলতেই কাগজটা হাত থেকে খসে পড়ে মেঝেতে। আতঙ্কে দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়ায় সে। গাল, গলা, ঠোঁট....জামার ভেতর পর্যন্ত ভালো করে দেখে নেয়। না, শরীরে কোনো দাগ বা চিহ্ন নেই। দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মেঝেতে বসে পড়ে সে। দুই হাতে মাথা চেপে ধরে হাঁপাতে থাকে অনবরত। একটা সময় বিধ্বস্ত অবস্থায় হাঁটুতে মুখ গুঁজে ভেঙে পড়ে কান্নায়।
“গতরাতে কেউ ছিল... সত্যিই কেউ ছিল!"
"কিন্তু কে?"
"কেন এসেছিল?"
"কীভাবে এল?"
এই প্রশ্নগুলো একসঙ্গে তার মাথায় হিংস্র পশুর মতো কামড়াতে থাকে। এমন সময় দরজায় টোক... টোক শব্দ হশ। থরথরিয়ে কেঁপে ওঠে স্নেহা। ছুটে গিয়ে কালো গোলাপটা জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দেয় সে। আর চিরকুটটা ফেলে দেয় কমোডে এবং ফ্লাশ করে দেয়। কিন্তু তাতেও চিরকুটের লাইনটা একটা করাতের মতো তার মাথায় বারবার ঘুরতে থাকে,
"Don't you like my present, Sweetmeat?"
"আর কতক্ষণ এভাবে বসে থাকবি?"
তিবার ধাক্কায় স্নেহার ভাবনার সুতো ছিঁড়ে যায়। তখনও তার ভেতরটা থরথর করে কাঁপছে। কোনো হিসাবই যেন মিলছে না। মস্তিষ্ক জুড়ে দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন। কেন, কীভাবে, কে—সব উত্তর অধরা।
হঠাৎ-ই হুট করে উঠে দাঁড়ায় স্নেহা। তিবা চমকে বলে,"কিরে, কোথায় যাস?" তিবার চিন্তিত প্রশ্ন।
"আসছি একটু, বস।"
তিবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবে—মেয়েটার মাথায় আসলে চলছে কী! সকাল থেকেই ওকে বড্ড বেশি অদ্ভুত লাগছে। ভাবতে ভাবতে স্নেহা দৃষ্টির আড়াল হয়ে যায়।
অবচেতনায় হাঁটতে হাঁটতে স্নেহা এসে পৌঁছায় ক্লাবঘরের সামনে। আসতেই তার ভেতর অদ্ভুত অস্বস্তি আর ঘিনঘিনে অনুভূতি তৈরি হয়। এখন যদি কেউ দেখে ফেলে? কী জবাব দেবে সে? কেন এসেছে এখানে? যদি আদিলের সামনে পড়ে যায়! তাহলে একদম চোর সাজিয়ে সোজা কোর্টে চালান করে দেবে বাদরটা। আর ওই নবাব সাহেবই বা কোথায় আজ? একটু ধমক দিয়ে যে আদিলকে চুপ করিয়ে দেবে, তারও কোনো পাত্তা নেই। সেদিন তো বেশ হিরোগিরি করে গেল, আর আজ টিকিও নেই!
হঠাৎ ক্লাবঘর থেকে বেরিয়ে আসে সাজন। স্নেহাকে দেখে তার চোখ দুটো কিছুটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। স্মিত হেসে সে এগিয়ে আসে।
"আরে স্নেহা, কেমন আছ?"
স্নেহা হকচকিয়ে যায়। অপ্রভিত অবস্থায় আমতা আমতা করে কোনোমতে বলল,"জি... জ্বি ভাইয়া, ভালো।”
"পরীক্ষা কেমন হলো?"
"আলহামদুলিল্লাহ।"
"বাসায় যাচ্ছো তো? চলো, একসাথেই বের হই। আমিও গেটের দিকেই যাচ্ছি।"
"তিবা আমার জন্য ওয়েট করছে... আমি যাচ্ছি।"
তাড়াহুড়ো করে একটা খুচরো অজুহাত দিয়ে দ্রুত পা বাড়ায় সে। পদ্মকোমল মুখে হালকা লজ্জার আভা। সাজন বুঝতে পারে মেয়েটি বেশ অস্বস্তিতে পড়েছে, তাই সে আর পিছু ডাকে না। নিজের পথেই হাঁটতে শুরু করে।
হঠাৎ পেছনে ফেরে স্নেহা। কাচুমাচু কণ্ঠে ডেকে উঠল,"ভাইয়া!"
স্নেহার মিহি কন্ঠে সাজন সবিনয়ে ঘুরে দাঁড়ায়,"হুম, বল।"
দু’পা এগিয়ে আসে স্নেহা। চোখ নিচু, মুখে দ্বিধা আর সংকোচের মিশেল। হাত কচলাতে কচলাতে নিচু গলায় জানতে চায়,
"উনি আসেননি?"
ভ্রু কুঁচকে ফেলে সাজন। কিছুটা আন্দাজ করলেও না বোঝার ভান করে জিজ্ঞেস করে,"কোন উনি?"
স্নেহার তখন নিজের চুল নিজেই টেনে ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। তবুও নিজেকে শক্ত করে, বুক ফুলিয়ে অকপটে সে বলেই ফেলে,
"আপনাদের লিডার... সারাক্ষণ ধমকায় যে, উনি!"
সাজন ঠোঁট কামড়ে হালকা হাসে,"ওহ! তুমি ভাইয়ের কথা বলছ? উনি তো ঢাকাতে নেই, ভোর পাঁচটার ফ্লাইটে কক্সবাজারে গেছেন।"
স্নেহার কণ্ঠস্বর হঠাৎ,অতর্কিতে নরম হয়ে আসে,"আসবে না?"
"না, দশ দিন থাকতে হবে। একটা দলীয় কাজে গিয়েছেন তো।"
খবরটা শুনে হঠাৎ করেই অজানা রাগ দানা বাঁধে স্নেহার ভেতর। কোনো সৌজন্যতা না দেখিয়েই গাম্ভীর্যপূর্ণ পায়ে সে সেখান থেকে চলে যায়। সাজন এক হাত পকেটে গুঁজে, অন্য হাতে ঠোঁট চেপে হাসতে হাসতে নিজের পথ ধরে।
_________
"গাড়ি পাচ্ছো না বুঝি?"
চেনা কণ্ঠে স্নেহা ঘাড় বাঁকায়। দেখে, সাজন হাসিমুখে তার দিকেই এগিয়ে আসছে।
"এই গরমে আর কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে?"
সাজনের কথায় কিছুটা লজ্জায় পড়ে যায় স্নেহা। একটু আগে যেভাবে তড়িঘড়ি করে চলে এসেছিল, তার জন্য মনে মনে খানিকটা অনুশোচনাও হয়। আলতো হাসি দিয়ে সে বলল,"এই টাইমে আসলে রিকশার একটু সংকটই হয় বটে।"
"দাঁড়াও, আমি দেখছি।"
কাউকে ফোন করে সাজন। তারপর মাত্র দু’মিনিটের মধ্যে একটা রিকশা এসে হাজির! অবাক হয়ে তাকায় স্নেহা। এত তাড়াতাড়ি রিকশা? দেখলে মনে হয় সবকিছু যেন আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। সাজন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তাকে রিকশায় তুলে দেয়। তারপর হালকা গলায় রিকশাওয়ালাকে সাবধান করে বলল,
"মামা, সাবধানে নিয়ে যাবেন। স্নেহা, তোমার ভাইয়া যেদিন থাকবে না, সেদিন এই রিকশাতেই যাতায়াত করবে, ঠিক আছে?"
অতঃপর রিকশাওয়ালার দিকে তাকিয়ে সে বলল,"মামা, গাড়ি ছাড়ো।"
স্নেহা কিছু একটা বলতে যাওয়ার আগেই সাজন হাত তুলে রিক্সা ছাড়ার নির্দেশ দেয়। অতঃপর নিজ ছন্দে রিকশা চলতে শুরু করে। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে স্নেহা। তার মাথার ভেতরে তখন যেন কোনো কিছুই আর ঢুকছে না!
________
কক্সবাজারের অন্যতম বিলাসবহুল রিসোর্টটি আজ রঙিন আলোয় অপরূপ সাজে সেজে উঠেছে। জমকালো এই আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে স্বয়ং প্লেসক্লাব সভাপতি উপস্থিত থেকে স্বাগতম জানাচ্ছেন রণয়দের। ভিআইপি কর্নারে ধবধবে স্যুট-বুটে পরিপাটি হয়ে, পায়ে পা তুলে গম্ভীর ভঙ্গিতে বসে আছে রণয় আর অনির্বাণ।
নির্ধারিত সময়েই শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। দলের সদস্যরা ফুলের ব্রুচ পরিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানায় তাদের। এমন সময় রণয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয় লাল গোলাপের একটি সুবাসিত ডাল। ফুলের পাপড়ির দিকে চোখ পড়তেই ঘড়ির কাঁটা যেন থেমে যায়। চোখের পলকে সেই ফুলের মাঝে মিলিয়ে যায় স্নেহার মায়াবী মুখচ্ছবি। একদৃষ্টিতে ফুলটির দিকে তাকিয়ে থাকে সে। মরুভূমির মতো শুষ্ক ঠোঁটের কোণে অজান্তেই খেলে যায় স্নিগ্ধ হাসি। কেমন যেন এক আবেশে বুঁদ হয়ে ফিসফিস করে আওড়ে ওঠে সে,
"ফুল তুমি সুন্দর, সুশ্রী…
তবে আমার তোতাপাখি থেকে না।”
কথাটা স্পষ্ট ভেসে আসে অনির্বাণের কানে। সে চমকে ওঠে। পাশে বসা বন্ধুর দিকে তেরছা চোখে তাকিয়ে, পরক্ষণে কিছুটা ঝুঁকে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,'বেটা, তুই তো একদম গেলি! প্রোগ্রামে মন দে।"
কিন্তু রণয়ের দৃষ্টি তখনো আটকে আছে ফুলের মাঝে। তার গলার স্বরে অদ্ভুত নির্ভারতা,
❝চোখকে পাহারা দেওয়া যায়,
কিন্তু, মনের বিদ্রোহ থামে কই?
আমি শব্দ ভুলে যাওয়া এক পাঠক,
তবু মুখস্থ শুধু তুমি—আমার প্রিয় ফুল❞
অনির্বাণ নিস্তব্ধ। কিছুটা বিস্মিতও বটে। ফুল অপছন্দ করা কাঠ-কঠিন রণয়ের মুখে হঠাৎ এমন কাব্যিক ভাষা! সে অবাক হয়ে ভাবে রণয় কি ইচ্ছে করে বদলে যাচ্ছে, নাকি স্নেহার মায়াবী ছোঁয়াটাই তাকে পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে?
______
গ্রীষ্মের অন্তিমে ক্লান্ত সূর্যের অগ্নিমূর্তি যেন ছায়া গ্রাস করে নিয়েছে শহরকে। প্রতিদিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত চাকরিজীবীদের জন্য এই সময়টা নিঃসন্দেহে নির্মম পরীক্ষা। রোদ যেন আজ আর আলো নয়, একপ্রকার নিঃশ্বাসরুদ্ধ করা বিষ। বিশেষ করে যারা সকালে ঘুম ছাড়তে পারেন না, তাদের কাছে এই রোদ অভিশাপস্বরূপ। এমনই এক রুক্ষ সকালের অস্বস্তি নিয়ে রণয় চলেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী কার্জন হলের দিকে।
ক্লান্তির ছাপ গাঢ় হয়েছে তার চোখে-মুখে। চোয়ালের পাশ দিয়ে লাল আভা ঝলসে উঠছে, চোখের সাদা অংশে ঘুমহীন রাতের ক্ষোভ জ্বলে উঠেছে আগুনের রেখায়। কাল রাতে প্রতিশ্রুতি ছিল দ্রুত ফেরার, কিন্তু বাস্তবটা হলো ভিন্ন। পার্টি চলেছে রাত দুটো পর্যন্ত, আর ঘুম বলতে যা বোঝায় তা মাত্র দুঘণ্টার গল্প। অথচ সব উপেক্ষা করে একরোখা জেদের তাগিদে রণয় ফিরেছে রাত তিনটার ফ্লাইটে। কিন্তু সকালবেলা অচেনা নম্বর থেকে আসা একটি ফোন কল সব ওলটপালট করে দিয়েছে। বিরক্তি আর চাপা ক্ষোভ ঝাড়তে ঝাড়তে সে এগোচ্ছে ক্যাম্পাসের দিকে।
হঠাৎ... পা থমকে যায়। কোনো অদৃশ্য টানে থেমে যায় চলমান রণয়। হৃদযন্ত্র তার স্পন্দন হারায়। সকাল সকাল এমন বিস্ময়ের জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। রোদে ক্লান্ত, বিরক্ত মুখে যেই না সে চোখ তোলে, সময়ের গায়ে ধাক্কা খায় তার দৃষ্টি। সামনে থেকে দৌড়ে আসছে স্নেহা। গোল মুখে মিশে আছে ভোরের নিসর্গ। চোখের নিচের ফোলাভাব যেন শিশুসুলভ মাধুর্যে ঢেকে দিয়েছে তাকে। কলাপাতা রঙের কুর্তি আর কালো স্কিনি প্যান্ট সবুজের মাঝে তৈরি করেছে স্নিগ্ধ স্বচ্ছতা। পায়ে চিকন ফিতার কালো বেল্টের জুতো, যার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে তুলতুলে পায়ের আঙুল। এই প্রথম রণয় এভাবে লক্ষ্য করল স্নেহার পা। এতখানি সৌন্দর্য কি সত্যিই সম্ভব?
হঠাৎ হাতে স্নেহার টান। কিছু না বুঝেই তার টানে ছুটতে শুরু করে রণয়। ভেতরের সব প্রশ্ন হারিয়ে যায় স্নেহার ভয়ের ভেতর। হলের পেছনের দেয়ালের আড়ালে থেমে যায় দুজন। হাঁপাতে থাকে স্নেহা। রণয় তার দৃষ্টি সরাতে পারে না। মেয়েটার চোখে কিছু একটা আছে; যা ভয় পায়, আবার প্রতিরোধেও প্রস্তুত। নরম কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে রণয় জিজ্ঞেস করল,
"কী হয়েছে? তুমি এখানে এভাবে?"
স্নেহা রণয়ের ঠোঁটে আঙুল রাখল। মেয়েটা ভয়ে হাঁপাচ্ছে,"হুঁশশ! শব্দ করবেন না, ওরা এসে পড়বে।"
ভ্রু কুঁচকে যায় রণয়ের,"ওরা কে?"
রণয় যেই না আড়াল থেকে বেরিয়ে সামনে এগোতে যায়, স্নেহা তাকে টেনে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরে। রণয় কিছু বলার অভিপ্রায়ে মুখ খুলতে যাবে, ওমনি স্নেহা পা উঁচু করে এক হাতে রণয়ের মুখ চেপে ধরে। মুহূর্তেই স্তব্ধতা নেমে আসে। বিস্ময়ে বড় হয়ে যায় রণয়ের ধূসর রঙের নেত্রজোড়া। নিশ্বাস ভারী হতে থাকে ক্রমশ। স্নেহা দেয়ালের ওপাশে তাকাতে তাকাতে ফিসফিসিয়ে বলল,
"জলদি ফোন করে আপনার ছেলেদের বলুন এখানে আসতে, এক্ষুনি!"
এদিক-ওদিক তাকিয়ে কী যেন খুঁজছে স্নেহা। চোখে উদ্বেগ আর ঠোঁটে অনির্বচনীয় আতঙ্ক। রণয়ের নিশ্চুপ ভঙ্গিতে মুহূর্তের জন্য ধৈর্য হারিয়ে ফেলল সে। আর সেই দৃষ্টিতেই যেন আটকে যায় সময়। রণয়ের গভীর দৃষ্টি তার ভেতর স্রোতের মতো নেমে এসে ঝড় তোলে। লজ্জা আর সংকোচে চোখ নামিয়ে নেয় স্নেহা, সরে যায় দূরে।
অদূর হতে ভেসে আসে অনেকগুলো পায়ের ছুটন্ত শব্দ। আঁতকে ওঠে স্নেহা। আবারও রণয়ের হাত ধরে টেনে পেছনের গেটের দিকে ছুটতে থাকে। তবে দুর্ভাগ্যবশত গেটটি তালাবদ্ধ ছিল। কান্না পেয়ে যায় স্নেহার।
স্নেহার চোখে জল টলমল করে ওঠে। ঘুরে দাঁড়িয়ে সে ভেজা গলায় বলল,"আপনি তো লম্বা, এক লাফে ওপাশে চলে যেতে পারবেন। প্লিজ, যান!"
রণয়ের মাঝে কোনো হেলদোল নেই। সে শুধু অনুভব করছে স্নেহার উপস্থিতি এত কাছ থেকে। তবে হঠাৎ স্নেহার এমন কথায় তার কপালে ভাঁজ পড়ে, চোখ কুঁচকে সে প্রশ্ন করে,
"আর তুমি?"
স্নেহা দ্রুত জবাব দেয়,"আমি লুকিয়ে পড়ব কোথাও। এখন সময় নষ্ট করলে চলবে না।"
"যদি তোমাকে দেখে ফেলে?"
"আহ, কথা বাড়াবেন না। যা বলছি তাই করুন!"
রণয় একটু তেরছা চোখে তাকায়। এই অদ্ভুত, বোকা মেয়েটা নিজের বিপদের কথা না ভেবে তাকে বাঁচাতে মরিয়া। তাতে একরকম নরম হাসি এসে পড়ে তার চোখের কোণে। খানিকক্ষণ চুপ থেকে সে বলল,"কোনো দরকার নেই, আসো। আমি তোমাকে হেল্প করছি।"
রণয় যখন হাত বাড়িয়ে এগোয়, স্নেহা পিছিয়ে যায়, "না না, আমি আপনার কোলে উঠব না!"
রণয় বাঁকা হাসিতে তাকায়,"তো কোলে উঠতে কে বলছে তোমাকে? ব্যাগ দাও।"
স্নেহার কাঁধ থেকে ব্যাগ নিয়ে নেয় রণয়। মাথা নিচু করে লজ্জায় গুটিয়ে যায় স্নেহা। তবে চমকে ওঠে রণয়কে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসতে দেখে।
"প্রথমে হাঁটুতে পা রাখবে, তারপর কাঁধে। বুঝেছ?"
চোখ বড় হয়ে যায় স্নেহার, "কী! আপনার শরীরে পা রাখব আমি?!"
রণয়ের বলতে ইচ্ছে হয়েছিল,"তুমি চাইলে আমার বুকেও পা রাখতে পারো। ওখানটার রাজত্ব টা তো তোমারই।"
তবে তা না হয়ে রণয়ের গলা এবার হয়ে ওঠে দৃঢ় ও তীক্ষ্ণ,"টাইম নেই ড্যামিট। এখন এখান থেকে নিরাপদে বের হও তুমি। বাকিটা আমি দেখছি।"
চুপসে যায় স্নেহা রণয়ের গম্ভীর ধমকে। ভোঁতা মুখে নির্দেশমতো প্রথমে রণয়ের হাঁটুতে পা রাখে, এরপর কাঁধে পা দিতে গিয়েই থমকে যায়। ভেতরে শিরশিরে শিহরণ বয়ে যায়। হঠাৎ পায়ে ঠান্ডা স্পর্শে চমকে ওঠে স্নেহা। রণয় তার পা শক্ত করে ধরে রেখেছে কাঁধে, যাতে তার শরীর ভারসাম্য না হারায়। মুহূর্তেই কাঁটা দিয়ে ওঠে স্নেহার শরীরজুড়ে।
কোনোরকমে দেয়ালের ওপরে উঠতেই চোখ কপালে ওঠে তার। ওপাশে প্রায় পঞ্চাশ জন যুবক দাঁড়িয়ে! কারো হাতে হকিস্টিক, কারো হাতে মোটা বাঁশ, কারো হাতে ব্যাট। সবার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আদিল, সাজন ও নিহাল।
স্নেহাকে দেখেই তেঁতে গিয়ে চিৎকার করে ওঠে আদিল,"এই মেয়ে এখানে এসেও ঝামেলা করছে! যেখানে ঝামেলা, সেখানেই তুমি। একেবারে ঝামেলানাশক মেয়ে!"
চুপ করে থাকে না স্নেহাও। চোখে আগুন নিয়ে সে উত্তর দেয়,"না না, আমি তো দেখতে এলাম আপনি আদৌ কোনো কাজে আসেন কিনা। কারণ শুনেছি, খালি কলসি বেশি বাজে!"
আদিলের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। ঠোঁট ফাঁক করে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই ওপাশ থেকে ভেসে আসে রণয়ের দাপুটে কণ্ঠ,
"সাজন, গাড়ি রেডি আছে?"
"জি ভাই, গেটের সামনেই।"
বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে যায় স্নেহার তার মানে সবই ছিল পূর্বপরিকল্পিত! লোকটা আগেই দলবলকে খবর দিয়ে রেখেছিল, অথচ একবারও তা তাকে জানায়নি। এতখানি ভয় পেতে দেখেও একটা কথাও বলেনি! অভিমানে ফুলে ওঠে তার গাল। মুখটা বাচ্চার মতো ফোলা করে সে ওখানেই বসে থাকে, দেয়াল টপকে আর নিচে নামে না।
ওপাশের ছেলেরা ততক্ষণে একসঙ্গে তেড়ে আসতে থাকে দেয়ালের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে যায় রণয়। কঠিন গলায় ওপাশ থেকে সে চিৎকার করে বলল,
"সাজন, টেক হার ইন আ সেফ প্লেস।"
কিন্তু আতঙ্কে যেন পাথর হয়ে যায় স্নেহা। অস্ত্রে সজ্জিত সেই হিংস্র ভিড় দেখে সে আর নিজেকে সামলাতে পারে না। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সে আবার লাফিয়ে পড়ে রণয়ের দিকেই। স্নেহার এই কাণ্ড আর এতো উঁচু দেয়াল থেকে উড়ন্ত ঝাপ দেখে ক্ষণিকের জন্য ভড়কে যায় রণয়। কিন্তু কালবিলম্ব না করে ক্ষিপ্র গতিতে ছুটে গিয়ে শক্তহাতে ওকে নিজের বাহুডোরে জড়িয়ে কোলে তুলে নেয়।
সামনে অবধারিত বিপদের আভাস পেয়ে রণয়ের মুখ দিয়ে অসচেতনভাবেই বেরিয়ে আসে,"ওহ শিট।"
তৎক্ষণাৎ বিদ্যুৎবেগে রণয়ের মস্তিষ্কে সতর্কবার্তা ছুটে গেল। একটুও দেরি না করে সে কোমর ধরে একটানে অন্যভাবে তুলে নেয় স্নেহাকে। অতর্কিত এই কাণ্ডে শিউরে উঠে স্নেহা দুই হাতে পেঁচিয়ে ধরে রণয়ের গলা, দুই পা দিয়ে জড়িয়ে ধরে কোমর। ভয় আর অচেনা উত্তাপে মাথাটা সেঁধিয়ে যায় রণয়ের ঘাড়ের গভীরে। রণয়ের চোখ দুটো তখন কঠিন আর রক্তাভ। সে চায় না একটিবারের জন্যও স্নেহার অস্তিত্ব কারোর নজরে আসুক। স্নেহাকে কেউ চিনে ফেললে আগামীতে বিপদের তীর ওর ওপর দিয়েই ছোঁড়া হবে।
রণয় স্নেহার কানের কাছে মুখ এনে দৃঢ় গলায় ফিসফিসিয়ে বলল,
"লিসেন তোতাপাখি, যা কিছুই হোক, আমার গলা ছাড়বে না আর মাথা তুলবে না। তুমি এখন সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় আছো। ওকে, সুইটহার্ট?"
"হু-হুম..." কাঁপা গলায়, অস্পষ্ট স্বরে সম্মতি জানায় স্নেহা।
এরপরই রণয় নেমে পড়ে পুরোনো যুদ্ধক্ষেত্রে। অনেক দিন পর মাঠে ফিরেছে এক অভিজ্ঞ খেলোয়াড়। তার একেকটি ঘুষি যেন একেকটি বজ্রাঘাত, নিমিষেই কয়েকজন প্রতিপক্ষ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এরই মাঝে আদিলের দলও এসে যোগ দেয় সংঘর্ষে। শুরু হয় দগ্ধকর উত্তেজনার রণক্ষেত্র।
হঠাৎ-ই স্নেহা ঢলে পড়ে রণয়ের বাহুতে! চমকে ওঠে রণয়। দুই হাত দিয়ে শক্ত করে স্নেহাকে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে সে। সাজনকে চোখের ইশারায় কী যেন বুঝিয়ে দ্রুত গেটের দিকে ছুটে যায় রণয়। গেটের কাছে পৌঁছাতেই নিহাল গাড়ির ঢোর খুলে দেয়। গাড়ির ভেতরে স্নেহাকে আলতো করে সিটে এলিয়ে দিয়ে রণয় তার মুখে পানির ছিটে দিতে থাকে।
"তোতাপাখি... তোতাপাখি... ওঠো... প্লিজ, স্পিক আপ।"
অস্থিরতা আর উৎকণ্ঠায় ঘর্মাক্ত হয়ে ওঠে রণয়ের ফর্সা মুখশ্রী। সে নিরলস স্নেহার মুখে পানি দিতে থাকে আর গাল চাপড়ে ডাকতে থাকে। হঠাৎ চোখ বুঁজা অবস্থাতেই
চেঁচিয়ে ওঠে স্নেহা,"আরে! পানি দিচ্ছেন কেন? আমার ময়েশ্চারাইজার গলে যাবে!"
স্নেহা তড়িঘড়ি করে তিক্ত মুখে হাত দিয়ে মুখের পানি মুছতে থাকে। পুরোটাই যে স্নেহার একটা নাটক, তা বুঝতে পেরে রণয়ের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। রণয়ের চোখে বিদ্যুতের ঝলক দেখে স্নেহা চুপসে যায়। তার ভ্রুকুটি এক নিমেষে স্নেহার মুখের সব কথা কেড়ে নেয়।
"মানে, তুমি অজ্ঞান হওনি?" রণয়ের কণ্ঠে ক্ষোভ মেশানো ক্ষীণ ধিক্কার।
ধরা পড়ে গিয়ে স্নেহা এবার মিইয়ে যাওয়া হাসিতে দাঁত কেলিয়ে বলল,"হয়েছি তো... অর্ধেক।"
"অর্ধেক মানে?" রণয়ের কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ে।
"মানে, শুধু চোখ বন্ধ করে ছিলাম।"
"চোখ বন্ধ করলেই কি কেউ জ্ঞান হারায়?" সন্দিহান চোখে তাকায় রণয়।
"হুম... চোখ বন্ধ করলেও তো মস্তিষ্ক সচল থাকে, কিন্তু অজ্ঞান হলে সবই থেমে যায়। আমি তখন আপনাদের সব কথা শুনতে পাচ্ছিলাম।"
"তাহলে এই নাটক করলে কেন?" পাথরের মতো গম্ভীর শোনায় রণয়ের কণ্ঠ।
স্নেহা ভণ্ডামি বাদ দিয়ে এবার শান্ত স্বরে বলল, "আপনাকে ওই মারামারির মাঝ থেকে সরাতে চেয়েছিলাম। খুব ভয় লাগছিল।"
হঠাৎ রণয় হাত রাখল স্নেহার গালে। রণয়ের উষ্ণ ছোঁয়া পেতেই স্নেহার সমস্ত শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে। সে চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে রণয়ের চোখের দিকে, সেখানে শুধুই অসহায়তা। এই দৃশ্যটা ভেতর থেকে বিদীর্ণ করে দেয় স্নেহাকে।
রণয়ের কণ্ঠস্বর তখন কেমন যেন অদ্ভুত শোনাল,"আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম তো।"
অভ্যন্তরে তরঙ্গ খেলে গেল। সুতীব্র আবেগে স্নেহা দুই হাতে কাপড় আঁকড়ে ধরে। লোকটার স্পর্শ, তার এই অদ্ভুত কণ্ঠস্বর...সবকিছু একসঙ্গে মিলে তার যেন নিঃশ্বাস আটকে আসার উপক্রম হলো। কিন্তু রণয়ের হাতের দিকে নজর পড়তেই আঁতকে ওঠে স্নেহা।
"এই, আপনার হাত থেকে তো রক্ত পড়ছে!"
সঙ্গে সঙ্গে চেপে ধরে রণয়ের হাতের কাটা অংশ। তখনও ফোঁটা ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। নিজের ওড়না থেকে খানিকটা অংশ ছিঁড়ে নিয়ে তা দিয়ে অত্যন্ত যত্নে রক্তাক্ত হাতটি জড়িয়ে দেয় স্নেহা। রণয় নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মুগ্ধ চোখে।অচেনা আবেগে চোখের কোণে জল জমে ওঠে স্নেহার৷ তবে তা গড়িয়ে পড়ার আগেই বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে আলতো করে মুছে দেয় রণয়।
চমকে উঠে চোখ তোলে স্নেহা। চোখের পাতা তখনও কাঁপছে অবিরাম। রণয় মাথা নাড়িয়ে ধীর গলায় বলল,
"আমার সামনে অন্তত না, তোতাপাখি। প্লিজ।"
অবোধ নয়নে চেয়ে থাকে স্নেহা। এই নরম শব্দগুলো যেন তাকে গলিয়ে দেয়, বুকের ভেতর তোলে প্রবল ঝড়। মনে ছড়িয়ে পড়ে উতলা স্রোত। রণয় এগিয়ে আসে, ঘুচে যায় দুজনের মাঝের সমস্ত দূরত্ব। কোমল হাতে স্নেহার মাথার পেছনে আলতো করে আগলে ধরে তার টলমল চোখের পাতায় ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয় সে।
অভ্যন্তর শিউরে উঠল স্নেহার। শরীরজুড়ে বৈদুত্যিক তরঙ্গ খেলে গেল। প্রবল আবেগে সে খামচে ধরে রণয়ের শার্টের কাপড়। নিঃশ্বাস যেন আটকে আছে গলার কাছে, স্পন্দন থেমে গেছে মুহূর্তের জন্য। রণয় মুচকি হেসে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে ফিরে বসে। স্নেহাকে একটু সময় দেয় নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার জন্য।
কিছুটা সময় কেটে যায়। স্নেহা নতমুখে, নিঃশব্দে বসে রইল। সেই যে চোখ নামিয়েছে, আর তোলেনি। ফ্রন্ট মিররে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে ওঠে রণয়, যেন স্নেহার এই আড়ষ্ট অবস্থা বেশ উপভোগ করছে সে।
গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর গলায় সে বলে উঠল,
"এত কাঁপাকাঁপির কিছু হয়নি, এটা ছিল প্রণয়ের প্রথম ছোঁয়া।"
পরক্ষণেই কিছুক্ষণ আগের ঘটনাগুলো মস্তিষ্কে নাড়া দিতেই একটু থেমে ভ্রু কুঁচকে সে প্রশ্ন করল,
"এত সকালে তুমি ক্যাম্পাসে কী করছিলে? আজ তো অফ ডে।"
এবার মুখ খোলে স্নেহা। নিচু গলায় বলল,'রাশেদ স্যার বলেছিলেন কিছু নোটস দেবেন। কিন্তু গিয়ে দেখি আর কেউ আসেনি। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ফিরে আসার সময় আড়াল থেকে শুনলাম কয়েকজন ছেলে আপনাকে মা রার প্ল্যান করছে। ঠিক তখনই দেখলাম আপনিও এদিকে আসছেন। বাকিটা তো…
তড়তড়িয়ে পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেল রণয়ের। নম্রতা ভেঙে হিংস্র প্রাণীর মতো গর্জে উঠল সে,
"আর ইউ আউট অফ ইউর মাইন্ড? স্যার বলল আর তুমি একা নাচতে নাচতে চলে এলে? ভাই কোথায় তোমার?'
গুটিয়ে যায় স্নেহা। মিনমিন করে প্রত্যুত্তর দেয়,"ভাইয়া নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিল।"
রণয়ের কথা থেকে যেন আগুন ঝরতে লাগল, চোখে জ্বলছে ক্রোধের অগ্নি,"নেক্সট টাইম এমন দুঃসাহস দেখানোর চেষ্টাও করবে না। গট ইট?"
নীরবে মাথা ওপর-নিচ করে সায় দেয় স্নেহা। হঠাৎ এক ধাক্কায় গাড়ি ব্রেক কষে দেয় রণয়। আঁতকে ওঠে স্নেহা। কিছু না বলে পেছন ফিরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে থাকে রণয়। চোখে তার একগুঁয়ে দৃষ্টি, ঠোঁটদুটো শক্ত করে আঁটা। যেন সময় থমকে গেছে সেখানে। স্নেহা অস্থির হয়ে আঙুল নিয়ে খেলা করতে থাকে, তবুও রণয়ের মুখ থেকে কোনো কথা বের হয় না।
অবশেষে রণয়ের পুরুষালি ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এল,"হেই,চোখ তুলে তাকাও।"
স্নেহা মুখ নিচু করেই মিনমিন করে বলল, "কেন?"
"এই দুটো চোখ যে খুব পড়েছে মনে... এই কথাটা কীভাবে বলি?"
রণয়ের বিলম্বহীন, অকপট জবাবে একেবারে থমকে যায় স্নেহা। ধীরে ধীরে চোখ তোলে সে, তবে সেই চাহনি স্থায়ী হয় না বেশিক্ষণ। লজ্জায়, আর অদ্ভুত ঘোরে আর কাঁপা স্বরে মুহূর্তেই চোখের পাতা আবার নেমে আসে নিচে। রণয় মৃদু হাসে, এরপর ইগনিশনে চাবি ঘোরায়।
"চলো, বাসায় পৌঁছে দিচ্ছি। ভাইকে ফোন করে জানিয়ে দাও।"
________
স্নেহাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে রণয় যখন আবার ক্যাম্পাসে ফিরে আসে। সরাসরি গিয়ে হাজির হলো প্রফেসর রাশেদের কেবিনে। ওদিকের পরিস্থিতি আদিল নিজেই সামলে নিয়েছে। মারামারিতে তার জুড়ি মেলা ভার।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই প্রফেসর রাশেদ রণয়ের হঠাৎ উপস্থিতিতে কিছুটা চমকে গেলেন, তবে তা বুঝতে দিলেন না। মুখে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে তিনি এগিয়ে এলেন।
"আরে রণয়! কোনো দরকার ছিল?"
কোনো প্রত্যুত্তর করল না রণয়। ঝড়ের বেগে এগিয়ে গিয়ে সজোরে লাথি বসল প্রফেসরের সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গায়। অতর্কিত এই আঘাতে প্রফেসরের মুখশ্রী মুহূর্তেই নীল বর্ণ ধারণ করল। ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে দুহাতে গোপনাঙ্গ চেপে ধরে তিনি ফ্লোরে বসে পড়লেন। তখন পুরো রুমজুড়ে কেবল ভেসে আসছে তাঁর মৃদু গোঙানির শব্দ। আগুনঝরা