#কে_বাঁশি_বাজায়_রে
#মিথুবুড়ি
#পর্ব_১০
নিশুতি গ্রামে প্রচলিত একটি বহুল পরিচিত
প্রবাদ আছে—"বাপেরও বাপ আছে।"
আয়না হলো একটি অদ্ভুত বস্তু—যার নিখাদ বক্ষে প্রতিফলিত হয় মানুষের নিজস্ব সত্তা, অনুরণিত হয় আত্মার অবয়ব। রণয় নামের এই মানবাভিধান ঠিক সেই আয়নারই জীবন্ত রূপ। নিঃশব্দ, কিন্তু প্রখর। নম্র, তবে অদম্য। আয়নার মতোই সে কাউকে বাড়তি রং চড়িয়ে দেখে না বা দেখায় না।যে যেমন, তাকে ঠিক তেমনই ফুটিয়ে তোলে।
ঠান্ডা মাথার সূক্ষ্ম কৌশলী রণয়, যার প্রতিটি পদক্ষেপে জড়িয়ে থাকে একরাশ অজানা রহস্য। তার একমাত্র নীরব হাতিয়ার তার নিস্তব্ধতা। এই কোলাহলপূর্ণ সমাজে গলা চড়িয়ে নয়, বরং রণয় বারবার প্রমাণ করে ক্ষমতা মূলত মস্তিষ্ক থেকে আসে, পেশি থেকে নয়। তার দুই চোখে সর্বদা শিকারী পাখির শানিত সতর্কতা। তার চিন্তাভাবনা বিপজ্জনক হলেও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত। সে ভয়ংকর, এতটাই ভয়ংকর যে, সমস্যার গোড়াতেই বিষ ঢেলে মূল থেকে আগাছা উপড়ে ফেলে। দুর্বল বা নিপীড়িতকে পিষে ফেলা তার স্বভাব নয়, বরং যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বীর চোখে চোখ রেখে বুদ্ধি ও যোগ্যতা দিয়ে জয়ী হওয়াতেই তার আসল স্বাচ্ছন্দ্য।
সকালবেলা অচেনা নম্বর থেকে ফোনটা আসতেই সজাগ হয়ে ওঠে রণয়ের সচেতন মস্তুিক। নম্বরটি ছিল কাস্টমাইজড, তাই রং নম্বরের প্রশ্নই ওঠে না।
আগের দিনের ঘটনাপ্রবাহ রণয়ের মনে ভেসে ওঠে। আদিল এসেছিল তার বাসায়। মি. রেদোয়ান রণয়ের জন্য নিজের গাড়িটি পাঠিয়েছিলেন। বাইপাস রোডে আদিলের বাসা হওয়ায় মাঝরাতে সেখান থেকে গাড়ি পাওয়া কঠিন ছিল, তাই রণয় নিজেই ওকে লিফট দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। আদিলও দ্বিধাহীনভাবে সুযোগটি গ্রহণ করে।
এয়ারপোর্ট থেকে রণয় আদিলকে নিয়ে সবচেয়ে আগে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু মাঝপথে প্রবল ঝড়ে গাছ ভেঙে রাস্তা বন্ধ থাকায় প্রাকৃতিক বাধা সৃষ্টি হয়। সময় নষ্ট না করে রণয় চটজলদি গাড়িটি ঘুরিয়ে নিজের বাড়ির দিকে যায়, যা ছিল প্রতিপক্ষের ছকের সম্পূর্ণ বাইরে।
আদিল যখন নিরাপদে রণয়ের পাশে ঘুমাচ্ছিল, তখন অজানা সেই ঘাতক ফোন করে জানায় আদিল নাকি ক্যাম্পাসে বড় বিপদে পড়েছে। শয়তানি চালের পুরো নকশা মুহূর্তেই বুঝে ফেলে রণয়, কিন্তু প্রতিপক্ষকে তা টের পেতে দেয় না। তাদের ফাঁদে পা না দিয়ে বরং সে শুরু করে নিজের চাল। ওদের পাতা ফাঁদেই যেন ওরা নিজেরা আটকে পড়ে, ওমন সূক্ষ্ম কৌশল বুনে তোলে সে।
কিন্তু আচমকা সেই ছকে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় স্নেহা। স্নেহার অনিচ্ছাকৃত উপস্থিতি রণয়ের পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আনতে বাধ্য করে। ঘাতকদের ভয়ংকর নীলক নকশাটি যে স্নেহার জীবনকে করত, তাই প্রেয়সীকে রক্ষা করতে রণয় মুহূর্তের মধ্যে নিজের কৌশলের গতিপথ বদলে দেয়।
রাজনৈতিক অঙ্গনে পা রাখার পর থেকেই রণয়কে নানা ধরণের ছায়া-আক্রমণ বা চক্রান্তের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কেউ আড়াল থেকে পেছনে ছু রি চালাতে চেয়েছে, কেউ বা পায়ের নিচে গভীর গর্ত খুঁড়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত রণয়কে পরাজিত করতে পারেনি কেউ। তবে সেদিনের ঘটনাটা ছিল একেবারেই হিসেবি ও সুপরিকল্পিত। রণয় বোঝে, এর পেছনে এমন কেউ রয়েছে, যে অত্যন্ত সাংঘাতিক এবং ঠান্ডা মাথার কুয়াশাচ্ছন্ন খেলোয়াড়।
তবে এমন অতর্কিত ও বিপজ্জনক আক্রমণও কখনো কখনো আশীর্বাদ হয়ে আসে৷ অন্তত যদি তার বিনিময়ে প্রেয়সীর চোখের পাতায় ঠোঁট রেখে একটুখানি গভীর ও নিবিড় চুমু পাওয়া যায়! আহা! ঘটনা আর যাই হোক, মন্দ বলতে পারছে না রণয়। তার মন এখন বেশ ফুরফুরে। হালকা আর সতেজ। মনে মনে সে বাঁকা হেসে ভাবে—এমন যদি প্রতিদিন হতো! প্রতিদিন একটা করে হামলা, আর প্রতিদিন একটা করে মিষ্টি অনুভূতির স্পর্শ! প্রেমিকার ছোঁয়ায় যদি প্রতিটা সকাল এমন সুন্দরভাবে জেগে উঠতো, তবে জীবনটা বোধহয় কবিতার মতো হয়ে উঠতো।
তবে এখন তার প্রয়োজন ঘুম। ভাবনা শেষ হতেই গাড়ি থেকে নেমে সোজা নিজের রুমের দিকে পা বাড়ায় সে।
ড্রয়িং রুমে তখন চায়ের কাপ হাতে চুপচাপ বসে ছিলেন মি. রেদোয়ান। খবরের কাগজের আড়ালে তাঁর চোখ দুটি খোলা থাকলেও মুখে ছিল পাহাড়সম গম্ভীরতা। রিডিং চশমার নিচ দিয়ে তীক্ষ্ণ নজরে তিনি লক্ষ্য করছিলেন ছেলেকে।
রণয় সিঁড়িতে প্রথম পা রাখতেই পেছন থেকে ভেসে আসে বাবার গভীর ও গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
"প্রান্তিক।"
রণয় থমকে দাঁড়ায়। ধীর পায়ে ঘুরে তাকায়। কণ্ঠে কিছুটা ক্লান্তি মিশিয়ে বলল,
"আব্বু, খুব টায়ার্ড… রাতে কথা বলি?"
মি. রেদোয়ান কাগজটি সামান্য নিচে নামিয়ে শান্ত গলায় প্রশ্ন করেন,"শুনলাম আজ ক্যাম্পাসে তোমার উপর হামলা হয়েছে?"
বসার ঘরের বাতাস যেন মুহূর্তের মধ্যে কিছুটা ভারী হয়ে ওঠে। রণয়ের চোখে খানিক বিষ্ময় খেলে গেল। বিন্দুমাত্র আবেগ না মিশিয়ে অকপটে প্রশ্নটি ছুড়ে দেন মি. রেদোয়ান। তাঁর গম্ভীর কণ্ঠস্বরের ধাক্কা গিয়ে পৌঁছে যায় সোজা রান্নাঘর অবধি। রান্না ফেলে ছটফট করতে করতে ছুটে আসেন মিসেস রুকাইয়া। ছেলের শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে থাকেন কোথায় কোথায় আঘাত লেগেছে, ঠিক কোনখানে যন্ত্রণার ছাপ। আহাজারি ভরা কণ্ঠে শুরু হয় তাঁর মাতৃত্বের বিলাপ। মায়ের এই অন্তহীন ভালোবাসা আর উদ্বিগ্নতা যেন থামতেই চায় না।
রণয় কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়,"আম্মু কিচ্ছু হয়নি তো। একদম ঠিক আছি আমি।"
কিন্তু মায়ের মন কি আর সে কথা মানে! ওড়নার কোণ দিয়ে সযত্নে ছেলের মুখ মুছে দিয়ে হাত, কপালে আর গালে চুমু খেতে থাকেন তিনি। ভয়ে ও আশঙ্কায় মায়ের কান্নার জলে ভিজে যায় ওড়নার প্রান্ত। এত কান্না ও হুলুস্থুল দেখে এবার বিরক্ত হয়ে ওঠেন মি. রেদোয়ান। ধীর পায়ে সামনে এসে রুক্ষ স্বরে তিনি স্ত্রীকে নির্দেশ দেন,"যাও, ওর জন্য খাবার রেডি করো। এখন ছেলের একটু রেস্ট দরকার।"
স্বামীর কথায় রান্নাঘরের দিকে ছুটে যান মিসেস রুকাইয়া। ছেলে অসুস্থ মানেই এখন একশো পাঁচ পদের রান্না বসাতে হবে! একদিকে চুলার ব্যস্ততা, অন্যদিকে ডাক্তারের খোঁজ...কী খেলে হাতের ক্ষত দ্রুত শুকোবে, কার থেকে ভালো পরামর্শ পাওয়া যাবে! শুরু হয়ে যায় চিরচেনা সেই মাতৃত্বের অন্তহীন ছোটাছুটি।
মা রান্নাঘরে অদৃশ্য হতেই রণয় ঘুরে দাঁড়ায় বাবার মুখোমুখি। চোখের পলকে তার দৃষ্টিতে জমে ওঠে একরাশ পুঞ্জীভূত বিরক্তি।
"আব্বু, তুমি এখনো আমার পেছনে লোক লাগিয়ে রেখেছো? আমি তো আগেই বলেছিলাম, আই ওয়ান্ট ফ্রিডম।"
মি. রেদোয়ান অত্যন্ত ধীর ও শান্ত গলায় উত্তর দেন,"তুমি আমার একমাত্র ছেলে, প্রান্তিক। তোমাকে নিয়ে ভয় হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। এই অল্প বয়সে নিজের যোগ্যতায় যেভাবে তুমি সমাজে জায়গা করে নিয়েছ, তাতে শত্রু তৈরি হওয়াটাই তো স্বাভাবিক নিয়ম।"
"আমি নিজেকে নিজে প্রটেক্ট করতে পারি, আব্বু।"
"আমি জানি তুমি পারো। কিন্তু একজন বাবা হিসেবে তোমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমারই দায়িত্ব। আর বিশ্বাস করো, তোমার পেছনে আমি কাউকে লাগিয়ে রাখিনি; তোমার মতো ছেলের পেছনে সেটার দরকারও পড়ে না। খবরগুলো এমনিতেই আমার কানে এসে পৌঁছায়। ধরে নাও, আমার নেটওয়ার্কটা একটু বেশি শক্তিশালী।"
রণয়ের চোখে-মুখে চেপে বসে ভারি অসন্তোষ। সে কখনো চায় না কেউ তাকে তার বাবার ছায়া দেখে চিনুক। নিজের ঘাম ও যোগ্যতায় সে নিজের পরিচয় তৈরি করতে চায়। কারণ, সাধনা ছাড়া বিনা পরিশ্রমে পাওয়া কোনো পরিচয়েরই তো আসলে কোনো প্রকৃত মূল্য নেই।
হঠাৎ করেই যেন সুর পাল্টে ফেলেন মি. রেদোয়ানের গলা। নির্দয় স্বরে তিনি প্রশ্ন করেন,"কী ব্যবস্থা করলে ওই জানোয়ারগুলোর?"
"কিছু পালিয়ে গেছে। তবে চারজনকে ধরা সম্ভব হয়েছে। এখন তারা গোডাউনে উল্টো করে ঝুলছে। তবে এখনো মুখ খোলেনি।"
কথাটা শোনামাত্রই ফুসে ওঠেন মি. রেদোয়ান। তাঁর দৃষ্টি হয়ে ওঠে চিলতে ছুরির মতো তীক্ষ্ণ, আর কণ্ঠে বইতে থাকে রাগের উত্তাল ঢেউ,"সবগুলোকে এবার হিংস্র কুকুর দিয়ে ছিঁড়িয়েই মারব আমি!"
রাগে তখন গজগজ করছেন মি. রেদোয়ান৷ চোখে-মুখে বইছে আগুনের ঝিলিক। রণয় খুব হালকা একটা হাসি দিয়ে বাবার কাঁধে স্নেহের ছোঁয়া রাখে। আশ্বস্ত করে বলল,"এত হাইপার হওয়ার কিছু নেই, আব্বু। রণয়ের একটা চুলও কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা এই পৃথিবীতে এখনো কারো জন্মায়নি।"
ছেলের এমন দৃঢ়তা দেখে মি. রেদোয়ানের গলা এবার কিছুটা ভারী হয়। গভীর আকুতি নিয়ে তিনি বলেন,"সামনের সংসদ নির্বাচনে আমি তোমাকে দেখতে চাই, প্রান্তিক। আমার জায়গায়, আমার এই আসনে—শুধু তুমি।"
রণয়ের তাত্ক্ষণিক বিরোধিতা,"না আব্বু। ছাত্রলীগ আমি ছাড়তে পারব না। কখনো না।"
"তুমি চাইলে একজন যোগ্য সংসদ সদস্য হতে পারবে। সম্পূর্ণ নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে, নিজের পরিচয়ে।"
"আমি সেটা চাইনি। ছাত্রলীগ আমার কোনো সাধারণ পরিচয় নয়, ওটা আমার আবেগ। আমার শেকড় ওখানেই গাঁথা। ওই জায়গাটা আমি কখনো ছাড়তে পারব না। এটাই আমার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত।"
মি. রেদোয়ান মৃদু স্মিত হেসে গভীর ও অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে ছেলের চোখের দিকে তাকান,"তুমি কিন্তু ইতিমধ্যে আবেগের জায়গা থেকে কিছুটা নড়েচড়ে বসেছ, প্রান্তিক।"
রণয়ের কপালে জমে ওঠে একরাশ কুঁচকানো ভাঁজ। ভ্রু কুঁকড়ে বাবার চপল মুখের দিকে তাকায় সে,"মানে?"
"মানে আগে তুমি বলতে, ছাত্রলীগ আমার ‘প্রথম’ আবেগ। আর এখন বলছ, ছাত্রলীগ আমার আবেগ। খেয়াল করে দেখেছ, ওই ‘প্রথম’ শব্দটা আজ তোমার মুখ থেকে হারিয়ে গেছে।"
কিয়ক্ষৎ থমকে দাঁড়ায় রণয়। মাথাটা নিচু করে ফেলে। মনে হয়, সে যেন নিজের ভেতরেই নিজের কোনো এক হারিয়ে যাওয়া অংশকে খুঁজছে। হঠাৎ করেই তার ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে ওঠে। অভিন্ন অস্থিরতা আর অজানা সংশয় ঘিরে ধরে তাকে।
'প্রথম'… শব্দটা সত্যি কেন মিসিং হলো? সে নিজেও জানে না কেন সে ওই শব্দটি উচ্চারণ করল না! কেন আচমকা হারিয়ে গেল তার মুখ থেকে এই একটি শব্দ?
কথা না বাড়িয়ে, মাথা না তুলে নিঃশব্দ পদক্ষেপে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে যায় রণয়। ছেলের প্রস্থানের দিকে তাকিয়ে পেছনে দাঁড়িয়ে মিচকে মুচকি হাসেন মি. রেদোয়ান। ছেলের চোখের কোণে জমে থাকা ওই অপ্রকাশিত ভাষাটুকু অভিজ্ঞ জাদুকরের মতো ঠিকই পড়ে ফেলেন তিনি।
________
টানা বারো ঘণ্টা ঘুমিয়েছে রণয়। দু'দিনের জমে থাকা সমস্ত ক্লান্তি পুষিয়ে নিয়েছে তার শরীর। অলস ভঙ্গিতে ফোনটা হাতে নিতেই চোখ ছানাবড়া। দুশোরও বেশি মিসড কল! আর প্রতিটি কলের পাশেই জ্বলজ্বল করছে সাজনের নাম। অতর্তিকে বুকটা কেঁপে উঠল। কল ব্যাক করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল সাজনের কাঁপা কণ্ঠ। মুহূর্তেই রণয়ের মস্তিষ্কে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি লাগল।
কল কেটে হন্তদন্ত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল সে। সোজা গিয়ে ঢুকল ড্রয়িংরুমে। মি. রেদোয়ান বরাবরের মতো আজও বেশ আয়েশ করে বসে চা খাচ্ছেন। সামনে টিভিতে চলছে সকালের সংবাদ। রণয়ের উদভ্রান্ত চেহারা দেখে ওনার মুখে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, যেন এই মুহূর্তটার জন্যই তিনি অপেক্ষা করছিলেন। টিভির স্ক্রলে তখন ব্রেকিং নিউজ ভেসে উঠছে—
[ব্রেকিং নিউজ:]
আজ সকাল ছয়টার দিকে সাভারের হোসেন টাওয়ারের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে চার যুবকের ছিন্নভিন্ন দে হ। প্রত্যেকের বয়স আনুমানিক বিশ থেকে বাইশ বছর। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তারা সকলেই মাদকাসক্ত ছিল এবং সম্ভবত নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছাদেই পার্টি করছিল। পারস্পরিক বিবাদে জড়িয়ে একে অন্যের ওপর হামলা চালায় এবং ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে নিচে পড়ে তাদের মৃত্যু হয়। লাশগুলো ইতোমধ্যে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
– [সময় সংবাদ]
রণয়ের চোখ দুটো থমকে গেল স্ক্রিনে। বিস্ময়ে পাথর হয়ে সে তাকিয়ে রইল বাবার দিকে। মি. রেদোয়ান পিরিজে পড়ে থাকা শেষ বিস্কুটটা চায়ে চুবিয়ে মুখে তুললেন। তারপর নির্বিকার চিত্তে চ্যানেল পাল্টাতে পাল্টাতে শান্ত গলায় বললেন, "সাজনরা তোমাকে না পেয়ে আমায় ফোন করেছিল।"
রণয়ের গলায় কচকচে বিস্ময়, "আর তুমি... তুমি মিথ্যে করে মৃত্যুর গল্প সাজিয়ে দিলে?"
মি. রেদোয়ান চোখ তুলে তাকালেন না, কেবল বললেন,"মৃত্যু কখনো নাটক হয় না, প্রান্তিক। এর পেছনে থাকে সুনির্দিষ্ট কারণ।"
"কী ছিল ওদের মৃত্যুর কারণ?"
"তোমার হিংস্রতা।"
"আব্বু!"
"যে এমন একটা চাল চালতে পারে, সে কোনো ছেলেখেলার মানুষ নয়। তারা তোমার ডেরায় ঢুকে শিকার ছিনিয়ে নিয়েছে। সে ভালো করেই জানে, তুমি সত্যিটা জানলে তার পতন অবশ্যম্ভাবী।"
"পতন নয়, ধ্বংস হবে। ছিন্নভিন্ন ধ্বংস।" রণয়ের ধূসর চোখ দুটো থেকে যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে অগ্নিশিখা।
"শত্রুকে দুর্বল ভেবে ছেড়ে দিলে সে ছায়া হয়ে আরও হিংস্র হয়ে ফিরে আসে।"
বাবার পাশে গিয়ে ধপ করে বসে পড়ল রণয়। মাথা নিচু, দৃষ্টি স্থির ফ্লোরে গেঁথে আছে। শক্ত হয়ে আছে চোয়াল, চোখের গভীরে পুঞ্জীভূত হচ্ছে প্রতিশোধের আগুন।
মি. রেদোয়ান কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন ছেলের মুখের দিকে। তারপর আলতো করে এক হাত রাখলেন তার কাঁধে। চমকে বাবার দিকে তাকাল রণয়। নরম কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে মি. রেদোয়ান বললেন, "নিজেকে অপরাধী ভেবো না। ওরা ভাড়াটে খু নি ছিল। খু নিদের এভাবেই মরতে হয়, হিসেব মিটে গেছে। ওদের পরিবারকে আমি ক্ষতিপূরণ পাঠিয়ে দেব, বাকি সব সামলাবে আমার পি.এ।"
একটু থেমে, আরও গভীর গলায় তিনি যোগ করলেন,"এখন তোমার একমাত্র কাজ— বিশ্বাসঘাতকটাকে খুঁজে বের করা। চোখের ভাষা পড়ে ফেলার সেই গড-গিফটেড ক্ষমতাটা আবার জাগিয়ে তোলো, প্রান্তিক। সে আমাদের খুব কাছের কেউ ছিল, তা না হলে গোপন আস্তানার খবর সে জানত না। তোমার নিজের গড়া সাম্রাজ্যে ঢুকে এভাবেই শিকার ছিনিয়ে নেওয়া এত সহজ কথা নয়।"
বাবার প্রতিটা শব্দ যেন একেকটা তীক্ষ্ণ ছুরি হয়ে বিধল রণয়ের মস্তিষ্কে। সে আর এক মুহূর্তও বসে রইল না। সোজা উঠে দাঁড়াল। তার সমস্ত মুখাবয়বে ফুটে অগ্নিলাভার ন্যায় আভা দিয়ে উঠল নৃশংস রূপ। হাতের আঙুলগুলো মটমট শব্দে ফোটাতে ফোটাতে সে ঠান্ডা গলায় আওড়াল,
"এইবার যার পালা, তার রক্ত দিয়েই লিখব আমার বিচার।"
------------
বিশাল এক জনশূন্য মাঠ। চারপাশ গিলে খেয়েছে গভীর অন্ধকার। আকাশজুড়ে ভারী কালো মেঘের রাজত্ব। তারই আড়ালে ঢাকা পড়েছে চাঁদের আলো। ক্ষণে ক্ষণে চলা বজ্রপাতের তীব্র বিদ্যুৎ চমক ভেদ করে চলে যায় মাঠের গাঢ় নিস্তব্ধতা। সেই ক্ষণিকের আলোয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে রণয়ের চোখের ভেতরে জমে থাকা অবিশ্বাস্য ক্রোধ। প্রতিবার বিদ্যুৎ চমকে ওঠার সাথে সাথে যেন তার দৃষ্টি আরও ধারালো, আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে।
হঠাৎ করেই সামনের শূন্যতায় মিলিয়ে থাকা এক অদৃশ্য ব্যক্তির দিকে সে ছুঁড়ে দেয় বরফশীতল অথচ ভেতর পুড়িয়ে দেওয়া দৃষ্টি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রণয়। গলা চিরে বেরিয়ে আসে একরাশ পুঞ্জীভূত ক্ষোভ,
"তাহলে তুই-ই সেই বিশ্বাসঘাতক?"
চারপাশ জুড়ে থমথমে নৈঃশব্দ্য। কোনো উত্তর আসে না।
"সামনে দাঁড়িয়ে গলা জড়িয়ে ধরিস, আর পেছন থেকে পিঠে ছুরি বসাস?"
কিছুক্ষণ থেমে, আরও ভারী হয়ে ওঠে রণয়ের কণ্ঠস্বর,
"বন্ধুত্ব যদি বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে তুই আজ সেই ভিত্তিটাকেই মুড়ে ফেলেছিস। আজ মর্মে মর্মে বুঝলাম, ইস্পাতের ছুরির থেকেও অনেক বেশি ধারালো বিশ্বাসঘাতকতা।"
রণয়ের কণ্ঠ যেন এক বুক অভিমান আর ক্ষোভে ধরে আসে। হঠাৎ করে রণয়ের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে সেই ব্যক্তি। কাঁপতে থাকা হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রণয়ের পায়ের পাতা। অবজ্ঞায় পা ঝেড়ে তাকে দূরে সরিয়ে দেয় রণয়। কিন্তু লোকটি নাছোড়বান্দার মতো আবারও জড়িয়ে ধরে তার পা। কান্নায় ভেঙে পড়ে সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল,
"প্লিজ, রণয়! আমাকে মাফ করে দে! লোভে অন্ধ হয়ে আমি একটা মস্ত বড় ভুল করে ফেলেছি। শেষবারের মতো একটা সুযোগ দে ভাই… তোর চোখের দিকে তাকাতেও আজ আমার লজ্জা করছে। তুই যা বলবি, আমি তাই করব!"
রণয়ের পাথুরে কণ্ঠে এবার একটু যেন টোল খায়, বরফ গলতে শুরু করে,"কিসের লোভ? একটা এমপি পদ? এটা আমাকে বললে তো আমি নিজেই সব ব্যবস্থা করে দিতাম! তুই… তুই আমাকে একটুও বিশ্বাস করলি না, দোস্ত?"
কান্নায় বুক ফেটে যায় লোকটির, ভাঙা গলায় সে আহাজারি করে,"আমি লজ্জিত, রণয়… খুব লজ্জিত। তুই ছাড়া আজ আমার আর কেউ নেই, আমি কিচ্ছু না।"
রণয় ধীরে ধীরে ঝুঁকে তার দিকে। তার দৃষ্টি এখন একদম শূন্য, অথচ সেই শূন্যতার ভেতরই যেন দাউদাউ করে জ্বলছে প্রতিশোধের আগুন।
"আমার হাতের পোষা কবুতর কখন উড়বে, কতদূর গিয়ে থামবে—সব আমার জানা। তুই পিঠে আঘাত করেছিস। এখন প্রতিঘাতের জন্য প্রস্তুত থাক।"
ভয়ে শিউরে ওঠে লোকটি। হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে, "না, দোস্ত… এভাবে বলিস না প্লিজ! তোর পায়ে পড়ছি, আমার ওপর কোনো বদলা নিস না।"
রণয় আরও গভীর, আরও শীতল গলায় আওড়ায়,"সম্পর্কের হিসেব চুকিয়ে আমি কখনো বদলা নিই না… আমি নিজে বদলে যাই। আর বিশ্বাস কর, নিজেকে বদলে ফেলার যে আনন্দ, তা কাউকে ধ্বংস করে বদলা নিলেও পাওয়া যায় না, প্রাণের দোস্ত!"
আকাশের গর্জন ছাপিয়ে বিকট অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে রণয়। মেঘের মেঘগর্জনের সাথে সেই নিষ্ঠুর হাসি মিশে গিয়ে চারপাশের বাতাসে বুনে দেয় হাড় হিম করা আতঙ্ক।
লোকটি আরও একবার হুমড়ি খেয়ে পড়ে তার পায়ে, আর্তনাদ করে,"রণয় ভাই… শেষবারের মতো ক্ষমা করে দে! তুই তো জানিস, আমাকে ছাড়াও তুই চলতে পারবি না…"
রণয় ঠোঁটের এককোণ সামান্য কুঁচকে, রুষ্ট গলায় চিবিয়ে চিবিয়ে বলে গেল,"একা চলার শক্তি আমি নিজের ভেতরে সবসময়ই রাখি।"
তারপর জোরালো এক লাথিতে তাকে দূরে ফেলে দিয়ে হনহন করে হেঁটে চলে যায় রণয়। আর তার পেছনে অন্ধকারে পড়ে থাকে অনুশোচনীয় কান্না, ক্ষমাভিক্ষার আকুতি আর বিশ্বাসঘাতকের চূর্ণ-বিচূর্ণ অহংকার।
~চলবে......
বলুন তো, আড়ালের মাস্টারমাইন্ড টা কে?