#কে_বাঁশি_বাজায়_রে
#মিথুবুড়ি
#পর্ব_১১
কেটে গেছে বেশ কিছুদিন। এরই মাঝে শেষ হয়েছে স্নেহার পরীক্ষা। আজ ছিল শেষ দিন। এই ক'টা দিনে একবারও রণয়ের সামনে পড়েনি স্নেহা। বলা ভালো, ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেছে। মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে নয়, বরং সেদিনের, সেই মুহুর্তের ছায়াটা ওর গায়ে এখনও শিহরণ জাগায়। রণয়ও বুঝেছিল বিষয়টা, তাই দূরে সে-ও থেকেছে। এক অলিখিত চুক্তিতে পরিণত হয়েছিল তাদের এই চোর-পুলিশ খেলা।
সেদিন টিএসসিতে দাঁড়িয়ে তিবার সাথে ফুচকা খাচ্ছিল স্নেহা। হঠাৎ কব্জিতে প্রবল ঝাঁকুনি! চমকে গিয়ে পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখা গেল রণয়ের জ্বলে ওঠা চোখ। চাহনিতে যেন ঝড় আর বজ্রপাত, বিদ্যুৎ ছুটে বেড়াচ্ছে দৃষ্টিতে। শরীর কেঁপে ওঠে স্নেহার। তার চেয়েও বেশি চমকে যায় সে পাশের মেয়েটিকে দেখে। মেয়েটি ফুঁপিয়ে কাঁদছে অঝোর ধারায়।
হঠাৎ-ই আদিল একটি ছেলেকে টেনে এনে ছুড়ে ফেলল স্নেহার সামনে। ছেলেটি মুখ থুবড়ে পড়ল মাটিতে।
নাক থেকে গড়িয়ে পড়ছে তাজা র ক্ত। ছেলেটি মাথা তুলতেই গলা শুকিয়ে যায় স্নেহার। খুব চেনা একটি মুখ! ভীড় জমে যায় মুহুর্তেই।
রণয় গর্জে ওঠে,"স্নেহা, স্ল্যাপ হার।"
নিঃশব্দে ঝাঁকুনি খায় সময়টা। স্নেহা কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। ভয়ে তার মুখ ঝাপসা হয়ে আসে। তিবার কব্জি আঁকড়ে ধরে সে দাঁড়িয়ে থাকে কাচুমাচু আর নির্বাক হয়ে। দৃশ্যটা দেখে রণয়ের রাগ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। দাঁতে দাঁত চেপে, গলায় যেন বিষ ঢেলে সে বলে উঠল,"কী হলো, শুনতে পাচ্ছো না? থাপ্পড় মারো ওকে। যতক্ষণ না তোমার হাত ব্যথা পায়।"
এরপর রণয় ঘুরে তাকাল আদিলের দিকে। তার এক ইশারায় আদিল, সাজন ও নিহাল আবারও ঝাঁপিয়ে পড়ল ছেলেটির ওপর। একের পর এক ঘুষি, লাথি আর চড়ে প্রকম্পিত হতে লাগল চারপাশ।
ওদিকে কান্নায় ভেঙে পড়ে মেয়েটি। গলা কেঁপে ওঠে তার, কান্নার শব্দে ভারী হয়ে ওঠে বাতাস। রণয় এবার মেয়েটির দিকে এগিয়ে গেল। ঠোঁটের কোণে নিষ্ঠুর বিদ্রূপ আর চোখে তীব্র ঘৃণা ফুটিয়ে তুলে তর্জনী উঁচিয়ে প্রতিটি শব্দ চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করল,"ভুল মানুষের জন্য, ভুল জায়গায় হাত দিয়েছো।"
এবার ধীরে ধীরে সবকিছু পরিষ্কার হতে শুরু করে স্নেহার কাছে। মেয়েটির নাম তানিশা, থার্ড ইয়ারের জিওলজি ডিপার্টমেন্টের ছাত্রী। আর যাকে জনসমক্ষে পিষে ফেলা হচ্ছে, সে তানিশার বয়ফ্রেন্ড, পড়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।
কয়েকদিন আগে তানিশাকে ক্যাম্পাসে নিতে এসে প্রথম স্নেহাকে দেখেছিল ছেলেটি। তারপর থেকেই শুরু হয় তার নিত্যদিনের উপস্থিতি। বাহানা ছিল তানিশা, কিন্তু আসল লক্ষ্য ছিল স্নেহা। স্নেহা এসবের কিছুই জানত না, বুঝত না। ছেলেটিও কখনো সরাসরি কথা বলার সুযোগ পায়নি। কারণ যখনই সে কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, কোথা থেকে যেন কেউ না কেউ এসে তাকে আটকে দিয়েছে।
যখন সরাসরি পারল না, তখন ছেলেটি শুরু করল অন্য এক খেলা। তথ্য জোগাড়! ধীরে ধীরে সে খুঁজে বের করল স্নেহার ফেসবুক আইডি এবং পাঠাল ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। কিন্তু স্নেহা তা গ্রহণ করল না। সোশ্যাল মিডিয়ার রঙিন দুনিয়ায় সে বরাবরই অনুপস্থিত মানুষ। তার পুরো সময়টুকুই বরাদ্দ থাকে কেবল বই, ক্লাস আর পরীক্ষা-আতঙ্কের জন্য।
কিন্তু ছেলেটি তো দমে যাওয়ার পাত্র নয়। প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত সে মেসেজ পাঠিয়ে যেতে লাগল। টেক্সটের ভেতরে ছিল বাজে ইঙ্গিত আর বিকৃত লালসা। স্নেহা কোনো দিনই সেসবে সাড়া দেয়নি, রাখেনি কোনো রিপ্লাই। আর এই নিয়ে ফাটল ধরতে শুরু করে তানিশার সম্পর্কে। প্রেমিকের অবহেলায় তানিশার মনে দানা বাঁধতে শুরু করে সন্দেহ আর অবিশ্বাস। একদিন সুযোগ বুঝে ছেলেটির ফোন হাতে নেয় তানিশা। চ্যাট বক্স খুলতেই তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সমস্ত মেসেজ আর কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত।
কিন্তু ছেলেটি সব অস্বীকার করে বসল। নির্লজ্জের মতো সে সাফ জানিয়ে দিল 'স্নেহাই তো আমাকে প্রথম মেসেজ দিয়েছে! স্নেহাই আগ বাড়িয়ে এসেছে সব সময়।'
বোকা তানিশা সেই মিথ্যা বিশ্বাস করে বসল। আর সেই অন্ধ বিশ্বাস থেকেই জন্ম নিল দাবানল। শুরু হলো স্নেহার পেছনে লাগা। চোখরাঙানি, ফিসফিসে কথা আর মানসিক চাপ তৈরি করা হতে লাগল তার ওপর। তবে স্নেহার চারপাশে যেন কোনো অদৃশ্য বলয় সবসময় তাকে রক্ষা করে চলত, যার কারণে ছেলেটির সাহস হতো না সরাসরি সামনে আসার।
তবুও সে থামেনি। প্রতিদিন একটু একটু করে তানিশার কান ভারী করে সে বলতে থাকে,'ও আমার পেছনে লেগে আছে।' তানিশাও বিশ্বাস করতে শুরু করে। একসময় স্নেহা তানিশার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করেছিল পূর্বপরিচয়ের খাতিরে, কিন্তু সে ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে তার সামনে অপেক্ষা করছে একটি কুৎসিত ও বিকৃত পৃথিবী।
এরপরেই তানিশা শুরু করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, ছাড়ে না এমনকি পরিবারকেও। অতি সংবেদনশীল স্নেহা সেদিন সারারাত কেঁদেছিল। এবং সবশেষে সবকিছুর অবসান ঘটাতে সে তানিশাকে ব্লক করে দেয়। সবটা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু এখানেই শেষ হয়না। তানিশা একের পর এক ফেক অ্যাকাউন্ট বানিয়ে তাকে হ্যারেজ করতে শুরু করে, সোশ্যাল মিডিয়ায় চালায় নির্মম বুলিং। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে স্নেহা তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টটাই চিরতরে ডিলিট করে দেয়।
"স্নেহা!"
রণয়ের গর্জনে স্নেহার ভাবনার জগৎ মুহূর্তে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। ঘোর কাটতেই সে বাস্তবে ফিরে আসে। রণয়ের দু'চোখে তখন দাউদাউ করে জ্বলছে ক্রোধের আগুন। আদিলদের দিকে তাকিয়ে সে চেঁচিয়ে ওঠে,"আমি না বলা পর্যন্ত থামবি না!"
আদিল মাথা নেড়ে সায় দেয়। চারপাশের ছাত্রছাত্রীদের ভিড়ের মাঝে ওরা একরকম পৈশাচিক উল্লাসে কাজ চালিয়ে যায়। ভয়ের চোটে কেউ এগিয়ে আসার সাহস পায় না। থরথর করে কাঁপতে থাকা স্নেহার শরীরটা যেন ভেতরে ভেতরে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। রণয় ওর কব্জি খপ করে ধরে টেনে সামনে নিয়ে আসে এবং সোজাসুজি দাঁড় করিয়ে দেয় তানিশার মুখোমুখি। তারপর রণয়ের কণ্ঠে বিষ মেশানো কড়া প্রশ্ন,
"স্নেহা, তুমি কি নোংরা মেয়ে?"
টলমল চোখে স্নেহা তাকায় রণয়ের পানে। তার চোখ দুটো বলতে চায়, ‘না, আমি তো এমন নই!’ কিন্তু আজ রণয়ের চোখে একফোঁটাও করুণা নেই, গলার স্বরে নেই কণামাত্র নরম ছোঁয়া। কেবল পাথুরে নির্দেশ,"জাস্ট ইয়েস অর নো।"
স্নেহা মাথা নাড়ে,"না।"
রণয় তৎক্ষণাৎ ফের প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,"তোমার পরিবার খারাপ?"
"না।"
"তোমার ভাইয়া খারাপ?"
"না।" এবার স্নেহার চোখের কোণ দুটো শক্ত হয়ে ওঠে। ক্ষোভে টনটন করে ওঠে তুলতুলে চোয়াল। রণয় তখন সোজাসাপ্টা শুনিয়ে দেয় চরম সত্যটা,"তাহলে এতগুলো মিথ্যে অপবাদ মাথা পেতে নিচ্ছো কেন? অপরাধের প্রতিবাদ না করা, আর অপরাধ করা তো একই সমান!"
এই কথায় স্নেহার সারা শরীর শিউরে ওঠে। এতদিন ধরে চোখের জলের নিচে লুকিয়ে রাখা পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আচমকা ঠিকরে বেরিয়ে আসে তার চোখে। আর পিছু হটে না সে, সোজা রণয়ের চোখে চোখ রাখে। রণয় চোখের ইশারায় তাকে সবুজ সঙ্কেত দেয়। আর তার পরের দৃশ্যপটে মুহূর্তে পুরো ক্যাম্পাসে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। তারপর... বজ্রপাতের মতো হঠাৎ-ই একটার পর একটা....একটা, দুটো, তিনটে, চারটা, পরপর পাঁচটা কড়া চড় বসে যায় তানিশার গালে। চড়ের আওয়াজে চারপাশ যেন কেঁপে ওঠে। তানিশার মুখখানা অপমানে লাল হয়ে গেছে। যন্ত্রণায় সে গাল চেপে ধরে ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাঁদছে। তিব্বা ছুটে এসে স্নেহার হাত চেপে ধরে। স্নেহা হাঁপাচ্ছে, রাগে তার সারা মুখ ফুঁসছে। ভাইয়ের বিরুদ্ধে কোনো কুৎসা সে কখনোই সহ্য করতে পারে না! রণয়ের ঠোঁটের কোণে তখন অদৃশ্য বিজয়ের মিষ্টি হাসি খেলে যায়।
শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে রণয় এবার এগিয়ে যায় ওই ছেলেটির দিকে। এক পা দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে ছেলেটির হাত, "এই হাত দিয়েই বাজে কথাগুলো লিখেছিলি, তাই না?"
ব্যথায় কুকড়ে ওঠে ছেলেটি। রণয় এক হাঁটু গেটে বসে দুহাতে তার কলার চেপে ধরে। তারপর শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে সোজাসুজি একটা ঘুষি বসিয়ে দেয় তার নাকে। ফিনকি দিয়ে র ক্ত ছুটে বের হয়। এরপর আর রণয় থামে না! একটার পর একটা ঘুষি পড়তেই থাকে। উন্মাদের মতো সে চিৎকার করে ওঠে, "হারামজাদা, এত বড় সাহস তোর! তোর কলিজা ছিঁড়ে কুত্তাকে খাওয়াব আমি!"
চারপাশের সবাই যেন পাথরের মূর্তি হয়ে গেছে। কেউ টু শব্দ করার সাহস পাচ্ছে না, কেউ এগিয়ে আসছে না সাহায্য করতে। সবাই কেবল বোবা দর্শক। তিব্বা ততক্ষণে স্নেহাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরেছে। অতিরিক্ত র ক্তপাত দেখে স্নেহার বুক ফেটে দম আটকে আসছে। ওর শরীরে প্যানিক অ্যাটাকের স্পষ্ট লক্ষণ ফুটে উঠছে। গা কেমন যেন ঠান্ডা হয়ে আসছে, চোখের দৃষ্টি হয়ে পড়ছে ঝাপসা। তীব্র ঝড়ের মতো স্নেহার মাথায় তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—রণয় এসব জানল কী করে? কেন সে তার জন্য এতখানি রিয়্যাক্ট করছে?
এই প্রথম সে রণয়কে এমন ভয়ংকর রূপে দেখল। নির্ভরতার যে মানুষটিকে সে এতদিন চিনেছে, আজ সে যেন ধ্বংসাত্মক বজ্র হয়ে নেমে এসেছে! আদিলরা কোনোভাবেই রণয়কে টেনে সরাতে পারছে না। ছেলেটি ততক্ষণে নিথর হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, কখন যেন অজ্ঞান হয়ে গেছে। তবুও রণয়ের পা বারবার আছড়ে পড়ছে তার বুকের ওপর। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না স্নেহা। শরীরটা হঠাৎ বড্ড ভারহীন ঠেকে। অবস্থা বেগতিক দেখে তিব্বা একপ্রকার জোর করেই টেনেহিঁচড়ে স্নেহাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়।
______
নিশ্ছিদ্র বিষণ্ণতায় ডুবে থাকা স্নেহার চোখে তখন একগুঁয়ে জেদ। মুখর প্রশ্নবোধক চাহনি নিয়ে সে তাকিয়ে আছে টিস্যু পেপারে মোড়ানো সতেরোটি কালো গোলাপের দিকে৷ এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন সমাধানহীন কোনো কঠিন গাণিতিক ধাঁধাঁ ভেদ করার চেষ্টা করছে সে।
সেদিনের পর থেকে আর একটি ফুলও সে ফেলে দেয়নি। ফেলতে ফেলতে, বারবার প্রশ্ন করতে করতে আর অন্তহীন প্রতীক্ষায় সে আজ ক্লান্ত। রাতের পর রাত সে কাটিয়েছে নির্ঘুম, শুধু সেই অজানা ছায়ামানুষটির অপেক্ষায়। অথচ প্রতিবারই সে এসেছে তখনই, যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে স্নেহার ক্লান্ত চোখ।
তার প্রতিটি আগমনে রেখে যাওয়া এই কালো গোলাপগুলোও কোনো সাধারণ প্রেমের প্রতীক নয়, লাল গোলাপের আবেগ এখানে অনুপস্থিত। এ যেন ভালোবাসা নয়, নিষ্ঠুর বিদ্রুপ! নাকি তিবার সেই কথাটিরই প্রতিচ্ছবি? সত্যিই কি তবে আশিক জ্বীন?
এমন হাজারো অমীমাংসিত প্রশ্নে আচ্ছন্ন স্নেহা আচমকা পায়ের শব্দে চমকে ওঠে। দ্রুত বালিশের নিচে লুকিয়ে ফেলে অশরীরী সেই গোলাপগুলো। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে স্নেহ। মুখে তার চিরচপরিচিত অমায়িক হাসি আর কোমল দৃষ্টিতে তাকিয়ে ক্লান্ত বোনের পাশে এসে বসে স্নেহ। স্নেহা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না৷ ভাইয়ের বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে নামিয়ে রাখে জমে থাকা আবেগের সবটুকু ভার। স্নেহার চুলে পরম মমতায় বিলি কাটতে কাটতে স্নেহ মিষ্টি স্বরে বলল,
"ফটাফট রেডি হয়ে নে, স্নেহু।"
"কোথায় যাব?"
হালকা হেসে স্নেহ উত্তর দেয়,"একটু ঘুরে আসি। অনেক দিন তোকে ঠিকমতো সময় দেওয়া হচ্ছে না। আর তোর তো পরীক্ষাও শেষ, এই সময়টুকু শুধু তোর। চল, একটু রিফ্রেশ হয়ে আসা যাক।"
শোনামাত্রই স্নেহা উচ্ছ্বসিত হয়ে লাফিয়ে ওঠে, মুখ ফেটে বেরিয়ে আসে আনন্দচিৎকার,"ওয়াও... হুররররররররর..."
বিকেলের নরম আলো গায়ে মেখে দুই ভাইবোন রওনা দেয় দিয়াবাড়ির পথে। শরতের স্নিগ্ধ প্রকৃতি যেন তাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল৷ কাশফুলের শুভ্র ঢেউ, সবুজ ঘাসের গালিচা আর হালকা রোদের মায়াবী পরশ। মনে হয় প্রকৃতি যেন আপন হাতে লিখছে তাদের নতুন কোনো গল্প। স্নেহর সাদা শার্টের সাথে মিলিয়ে স্নেহা পরেছে সাদা কুর্তি। দুই ভাই-বোনেই আজ মিশে গেছে প্রকৃতির রঙের সাথে।
সারা বিকেল ধরে তাদের হাসি-ঠাট্টা, ঘোরাঘুরি আর ছবি তোলার মধ্য দিয়ে কাটে একটি রঙিন দিনলিপি। চিকন সরু রাস্তায় বাইক রেখে স্নেহ তখন স্নেহার ছবি তুলছিল। সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে, অথচ স্নেহার ক্যামেরা-প্রীতি থামার নামই নিচ্ছে না। একটি অফিসিয়াল ফোন আসায় একটু দূরে সরে যায় স্নেহ। স্নেহা তখনও সেলফি তুলতে ব্যস্ত।
গঠাৎ বাতাসে ভেসে আসে ছিন্নভিন্ন আর্তনাদ,
"আআআ...!
বুকের ভেতরটা মোচর দিয়ে ওঠে। হাত থেকে ফোনটা ঝোপের মধ্যে ছিটকে পড়ে। উন্মাদের ন্যায় ছুটে যায় স্নেহা। পাকা রাস্তায় উপুড় হয়ে পড়ে আছে স্নেহ। সাদা শার্ট র ক্তে ভিজে লাল হয়ে গেছে, কপাল বেয়ে নামছে র ক্তের ধারা, কনুইয়ের চামড়া ছিটকে বেরিয়ে এসেছে মাংস। ছুটে গিয়ে ভাইকে বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে স্নেহা। তার চোখের সামনে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। ভয়ে হাত-পা কাঁপতে শুরু করে। কান্নায় কণ্ঠ আটকে গেছে। জোরে একটা চিৎকার করার শক্তিও যেন তার নেই।
সন্ধ্যার ছায়া নেমে এসেছে। চারপাশ বড্ড নিঃসঙ্গ। এই নির্জন রাস্তায় আশেপাশে কেউ নেই। না কোনো গাড়ি, না কোনো মানুষ। তাড়াতাড়ি নিজের ওড়না খুলে স্নেহার মাথায় শক্ত করে বেঁধে দেয় স্নেহা। তবুও র ক্তপাত থামে না। ভাইয়ের এই করুণ অবস্থা দেখে স্নেহার শরীর ক্রমশ অবশ হয়ে আসতে থাকে, কান্নার বাঁধ ভেঙে সে প্রায় জ্ঞান হারানোর উপক্রম।
ঠিক তখনই দূরে গাড়ির হেডলাইটের আলো দেখা যায়।এগিয়ে আসছে একটা অটো। আশার ক্ষীণ আলো ঝিলিক দিয়ে ওঠে স্নেহার চোখে। অটো থেকে নেমে আসে চারজন অচেনা যুবক। র ক্তমাখা আহত অবস্থায়ও স্নেহ নিজের সবটুকু সর্তকতা একত্র করে বোনকে আড়াল করে শরীরের সাথে আগলে রাখে। কাঁপা হাতে পকেট থেকে ফোনটা বের করে ৯৯৯-এ ডায়াল করতে চায় সে।
"ভাইয়াব্বু! আমি ওদের চিনি... ঐদিন আমাকে ওরাই সাহায্য করেছিল!"
স্নেহ তাও স্নেহাকে নিবিড় বাঁধন থেকে আলগা করে না।
ছেলেগুলো সামনে আসতেই স্নেহও তাদের চিনে ফেলল। চেনা মুখ, গলির সামনে প্রায়শই দেখা যায়। দেখলেই তারা লম্বা করে সালাম দিত। ওদের সাহায্যে স্নেহকে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হলো কাছের একটি হাসপাতালে।
স্নেহর মাথায় তিনটি সেলাই লেগেছে, আর হাতে রয়েছে মাইনর ইনজুরি। রং সাইড থেকে আসা এক মাতাল বাইকচালক তাকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। স্নেহকে কেবিনে রেখে ওষুধ কিনতে নিচে নেমেছিল স্নেহা। সীমান্ত তাফসিরকে ফোন করা হয়েছে। তিনি ইতোমধ্যে রওনা দিয়েছেন।
ওষুধ হাতে নিয়ে স্নেহা যখন ঘুরে দাঁড়াল, আচমকা চমকে উঠল সে। রণয় হন্তদন্ত হয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটে আসছে। তার মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাসে, চোখ লালচে, কপালে চুল এলোমেলো। চোখাচোখি হতেই রণয় দৌড়ে কাছে চলে এল। স্নেহার জামায় রক্ত দেখে তার পদযুগলের গতি থেমে গেল। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল অজানা আশঙ্কায়। দরাজ কণ্ঠে সে জানতে চাইল,
"কোথায় লেগেছে?"
"মাথায়।"
রণয়ের শঙ্কিত চোখ জোড়া কুঁচকে গেল। মাথায়! অথচ কোথাও কোনো ক্ষত দেখা যাচ্ছে না! তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে পা থেকে মাথা পর্যন্ত খুঁটিয়ে দেখল স্নেহাকে। এরপর আগের চেয়েও অনেক বেশি তীব্রতায় পুনরায় প্রশ্ন করল,
"কোথায়?"
"মাথায়।"
"কার মাথায়?"
"ভাইয়াব্বু।"
ঠোঁট গোল করে দীর্ঘ গরম নিঃশ্বাস ছাড়ল রণয়। এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত চাপা উত্তেজনা বেরিয়ে এল সেই নিঃশ্বাসের সাথে। এই মেয়ে সিরিয়াস মুহূর্তেও মশকরা করে! আদিলের মতো একদম বাঁচাল একটা। এতোক্ষণ রণয়ের চোখমুখে যে আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার বিদ্যুৎ খেলে গিয়েছিল, তা যেন রণয়ের ব্যক্তিত্বের সাথে মানানসই নয়। স্নেহার কাছে রণয়কে এমন বিচলিত রূপে দেখতে ভালো লাগে না। সে তো হ্যান্ডসাম, সচল এবং শক্তিশালী, অথচ তার এই বিশাল উত্তেজনা একেবারেই বেমানান।
এদিকে স্নেহার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেগুলো বেকুবের মতো দাঁত কেলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । আসলে তাদেরও তো কোনো দোষ নেই, কারণ কথা পুরো শেষ হওয়ার আগেই রণয় ফোন কেটে দিয়েছিল! রণয় ওদের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙাতেই ছেলেগুলো ভয়ে মাথা নিচু করে ফেলল।
ছোট ছোট চোখে সন্দেহের তীক্ষ্ণতা ফুটিয়ে তুলে স্নেহা জিজ্ঞেস করল,"আপনি এখানে কী করছেন, মসাই?"
রণয় এদিক-সেদিক তাকিয়ে স্নেহার সন্দেহভাজন দৃষ্টি এড়িয়ে গেল। শুষ্ক কেঁশে বলল,"দলের এক ছেলে এখানে অ্যাডমিটেড, তাকে দেখতে এসেছি।"
"ওহ...!"
নিচু স্বরে বলে চুপ হয়ে গেল স্নেহা। তার দৃষ্টি নত ও নিবিষ্ট। কিছুক্ষণ তার দিকে চেয়ে রইল রণয়। তারপর হঠাৎ গলা ঝেড়ে গমগমে স্বরে বলল,
"গিয়ে রেস্ট নাও। কান্না করে তো একদম চোখমুখ ফুলিয়ে ফেলেছ।"
স্নেহার চোখ আবারও ভিজে এল। তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অংশ হলো এই স্নেহ। দুজন দুজনের জানপ্রাণ। দুনিয়ায় ভাই-বোনের সম্পর্কের চেয়ে সুন্দর আর কি-ই বা হতে পারে! যার ভাই আছে, তার মাথার ওপর থাকে বিশাল বটবৃক্ষের ছায়া। আর যার বোন আছে, তার গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল আছে।
স্নেহা ঘুরে পা বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই হঠাৎ রণয় পেছন থেকে তার ওড়নার একটি অংশ টেনে ধরল। সে এবার মেয়েটির কথা মাথায় রেখেছে। স্নেহা অপ্রত্যাশিত স্পর্শ পছন্দ করে না। তাই রণয় এবার আর শরীরে স্পর্শ করল না। কিন্তু এই ক্ষুদ্র ঘটনার আকষ্মিকতায় নিশ্বাস আটকে গেল স্নেহার। প্রখর অনুভূতিগুলো যেন লোমকূপ কামড়ে ধরল। রাগের পরিবর্তে কুণ্ঠিত মুখ নিয়ে সে ঘুরে তাকাল রণয়ের দিকে। তার চোখের দিকে তাকাতেই স্নেহা চমকে উঠল। সে কিছুতেই বুঝতে পারে না, এত দ্রুত একজন মানুষের ভাবভঙ্গি কীভাবে এত বদলে যেতে পারে! একটু আগেও যে ছিল স্বাভাবিক, হঠাৎ কী হলো তার? চোখেমুখে এখন আতঙ্ক আর উদ্বিগ্নতার ছাপ কেন? স্নেহার দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে থাকে রণয়, যেন কিছু বলতে চাইছে!
"কিছু বলবেন?"
রণয় একগুঁয়ে, কাতর দৃষ্টিতে নিঃশব্দে চেয়ে রইল। স্নেহাও অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রইল। তার চোখে একরাশ কৌতূহল। সেই কৌতূহলের আগুনে এক বালতি পানি ঢেলে দিতে রণয়ের কেবল একটি শব্দই যথেষ্ট ছিল।
"তোতাপাখির ব্যাটারির চার্জ নেই আজ?"
সঙ্গে সঙ্গে চোয়াল শক্ত হয়ে গেল স্নেহার। শান্ত রক্ত, তপ্ত হয়ে তরতরিয়ে ওঠে গেল মস্তিষ্কে। ঝাঁঝিয়ে ওঠে দাঁতে দাঁত চেপে সে বলল,
"অসভ্য, অসভ্য, অসভ্য লোক!"
হনহনিয়ে চলে গেল স্নেহা। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেগুলো বোকা বনে গেল। এই মেয়ে রণয়ের সাথে এমন কথা বলে দিব্যি চলে গেল, অথচ রণয় তাতেই হাসছে?
রণয় আর সামনে এগোল না। বেরিয়ে এসে সোজা নিজের গাড়িতে উঠল। গন্তব্য প্রেসক্লাব। মিটিংয়ের মাঝখানে কল পেয়ে সে ছুটে এসেছিল। এখন আবার মিটিংয়ে যোগ দিতে হবে। সবাই তার জন্য অপেক্ষা করছে। একের পর এক ফোন কল আসছেই। রণয় ফোনটা সাইলেন্ট করে সিটের ওপর রেখে দিল।
দৃঢ় দৃষ্টিতে গাড়ি ড্রাইভ করছে সে৷ অথচ ভেতরটা অদ্ভুত শান্তিতে ভরে গেছে। ঠোঁটের কোণে ঝুলছে নরম হাসি। সেই হাসি বজায় রেখেই গাড়ি চালাতে চালাতে মৃদুস্বরে সে আওড়াল,
"এই খুসকো হৃদয়ে তুমি ছিলে প্রবল ঝড়ের তাণ্ডব। ভাসিয়ে দিয়েছো গো মেয়ে আমায়।"
~চলবে.........