#কে_বাঁশি_বাজায়_রে
#মিথুবুড়ি
#পর্ব_১২
"ভাই...!"
ফোনে চোখ রেখে উদাসীন ভঙ্গিতেই বসে থাকে রণয়। তার নিজের মতো চলে আঙুলের কারসাজি। ওদিকে ছটফট করতে থাকে আদিল। মুখে কিছু বলার সাহস নেই, আবার স্বভাবসুলভ নাছোড়বান্দা স্বভাবের কারণে চুপ করেও থাকতে পারে না সে। একটু দম নিয়ে নিচু স্বরে আবার ডেকে ওঠে,
"ভাই!!"
এবার তেড়ে আসে রণয়। ভয় পেয়ে দৌড়ে গিয়ে সাজনের পেছনে গিয়ে লুকায় আদিল। সাজন সরে যাওয়ার চেষ্টা করতেই তার শার্ট খামচে ধরে সে। ক্ষিপ্ত রণয়ের গলা গম্ভীর হয়ে গর্জে ওঠে,
"আর একবার বিরক্ত করলে খবর আছে তোর।"
সাপের মতো সাজনের পিছন থেকে উঁকি দেয় আদিল। বজ্রগম্ভীর ধমকে মিইয়ে গিয়ে মিনমিন করে বলল,"বিরক্ত করব না ভাই, শুধু একটা কথা বলব।"
রণয় শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে গম্ভীর মুখে গিয়ে বসল কাউচে। ঠান্ডা গলায় নির্দেশ দিল, "যা বলবি, সোজাসুজি বল।"
সাহস সঞ্চয় করে সামনে এসে মাথা নিচু করে দাঁড়ায় আদিল। তারপর চাপা গলায় বলল,"ভাই, আমি পারব না ঐ মেয়েকে ভাবি ডাকতে।"
ভ্রু কুঁচকে যায় রণয়ের,"কোন মেয়ে?"
আদিল গাল ফুলিয়ে ঘাড় নাড়ে,"ঐ… ফাটা বাঁশ।"
"মানে?"
"মানে স্নেহা তাফসি।"
"তাহলে কে বলেছে ভাবি ডাকতে?" রণয়ের ওমন নির্লিপ্ত উত্তর শুনে চোখ গোল গোল করে তাকায় আদিল, চমকে যায় সাজন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আদিল। সে জানে রণয় যা অনুভব করে, মুখে তা সহজে প্রকাশ করে না। এবার আরেকটু জোর গলায় সে বলল,
"একদিন না একদিন তো বলতেই হবে ভাই! আপনি যেই মরা মরছেন… ইয়ে… ঐ দিন যেভাবে ছেলেটাকে পিটিয়েছিলেন! আর ঐ মেয়ের সমস্যা আছে ভাই।"
সবজান্তা সুরে রণয় বলে ওঠে,"আমার সব জানা। ও ফুলের মতো স্বচ্ছ, স্নিগ্ধ।"
সাথে সাথে প্রতিবাদ করে ওঠে আদিল,"আপনি সব জানেন না ভাই।"
"কী জানি না?" রণয় ফোন রেখে সোজা হয়ে বসল। দৃষ্টি রাখল আদিলের কুণ্ঠিত মুখাবয়বে।
"এই মেয়ের উপর ভূতের আছর আছে ভাই।"
"ভূত বলে কিছু নেই।"
"জ্বীন আছে ভাই। আশিক জ্বীন।"
"আশিক জ্বীন?"
"হ্যাঁ ভাই, প্রেমিক জ্বীন! প্রতিদিন রাতে এই মেয়েকে ফুল দিয়ে যায়।"
শব্দ করে হেসে ওঠে নিহাল আর আলামিন। সাজন ঠোঁট চেপে হাসি লুকানোর চেষ্টা করে। রণয় রেগে ধমকালো সবাইকে,"আহ! চুপ সবাই।"
মুহূর্তে চারপাশ স্তব্ধ হয়ে যায়। রণয় ঠান্ডা স্বরে আদিলকে জিজ্ঞেস করে,"এসব তোকে কে বলল?"
একটু আশকারা পেয়ে পাশেই বসে পড়ে আদিল। তার কণ্ঠে তখন গম্ভীর মুরুব্বিয়ানা,"গোপন সূত্রে জেনেছি ভাই। অনেক দিন ধরেই এসব চলছে। মেয়েটা এখন একটা ভালো কবিরাজ খুঁজছে।"
"তাহলে কবিরাজ খুঁজে দিতে সাহায্য কর।"
"মরে গেলেও না।"
"কেন?" বাঁকা চোখে তাকায় রণয়।
জ্বলে ওঠে আদিল,"এই মেয়ে আমাকে উঠতে বসতে অপদস্ত করে! সবার সামনে আমাকে ওই রিনা খান ‘গাধা’ বলে ডাকে!"
রণয়ের ঠোঁটের কোণে একটুকরো হাসি খেলে যায়। চাপা হেসে সে বলল,"তাহলে এভাবেই ভাবি ডাকবি।"
বেচারা আদিলের চোখ দিয়ে বুঝি জল গড়ার উপক্রম হয়! গলা কাঁপিয়ে সে বলল,"ভাই, আপনি যদি এই মেয়েকে বিয়ে করেন, তবে কয়দিন পরে আর দেশে থাকা যাবে না। লায়লা-মজনুর কাহিনি বাদ দিয়ে ‘আশিকী’ মুভির সিজন থ্রি-র শুটিং শুরু হয়ে যাবে বাংলাদেশের মাটিতে, ঐ মেয়ের আশিক জ্বীনের কারণে!"
"ঠিক আছে, তোর জন্য উগান্ডার টিকিট কাটছি।"
একদম মিইয়ে যায় আদিল। মনে মনে ভাবে, এই জন্যই কারোর উপকার করতে নেই! মাথা নিচু করে মিনমিন করে সে শেষবারের মতো মানবজাতির জন্য একটি উপকার করার আগ্রহ প্রকাশ করল। বলল,"আমি আপনার জন্য এতো গুরুত্বপূর্ণ খবর এনেছি, আর আপনি আমাকে দেশছাড়া করছেন?"
"তোর গুরুত্বপূর্ণ মানেই ফালতু জোকস।"
রণয়ের এই ভাবলেশহীন জবাবেও হার মানে না আদিল। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,"জোকস না ভাই, জান্সের ব্যাপারে।"
রণয়ের কপাল কুঁচকে যায়। ভ্রু তে কুঞ্চন ফেলে গম্ভীর গলায় সে জানতে চায়,"জান্স মানে?"
দাঁত কেলিয়ে আদিল জবাব দেয়,"জান।"
"কার?"
"আপনার।"
এক নিমিষেই রণয়ের সকল উদাসীনতা উবে গেল। চকচকে কৌতূহল খেলে গেল নেত্রদ্বয়ে।
"কী খবর, এখনই বল।"
মনে মনে বিজয়ের মুচকি হাসি হাসে আদিল। এরপর গলায় কৃত্রিম গাম্ভীর্য এনে সে বলতে শুরু করে,
"রাউজকে আমার আব্বুও চাকরি করেন। কাল তিনি এসে আমাকে স্নেহার একটা ছবি দেখিয়ে বললেন—‘এই মেয়েটাকে চেনো?’ আমি ‘হ্যাঁ’ বলার পর তিনি বললেন, ‘একবার ভালোভাবে খোঁজ নিয়ে দেখিস তো, কারো সাথে কোনো সম্পর্ক আছে কি না।’ কারণ জানতে চাইলে আব্বু বললেন—সেখানকার প্রিন্সিপালের ছেলে স্নেহাকে বিয়ে করতে চায়। বিয়ের প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু স্নেহার আব্বু সরাসরি না বলে দিয়েছেন। তবে ছেলেটা মানতে নারাজ। সে জেদ ধরেছে, এই মেয়েকেই তার চাই। এখন সে খুঁটিনাটি খোঁজ নিচ্ছে, কেন পরিবার রাজি হলো না।"
এক মুহূর্ত থেমে রণয় শুধু নিরেট ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল,"ছেলে কী করে?"
"ডাক্তার। ঢাকা মেডিকেলে আছে।"
_____
পরপর দুটো অস্ত্রোপচারের ধকল শেষে ক্লান্ত ভঙ্গিতে নিজের চেম্বারে বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন ডক্টর রুপম। নিস্তব্ধ দুপুরে হঠাৎ দরজায় কড়া নড়তেই বিরক্তির সুরে আসুন বলে সোজা হয়ে বসলেন তিনি। দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল তিনজন মানুষ। প্রথম দর্শনেই বোঝা যায়, অভিজাত কোনো বংশের প্রতিনিধি তারা। মধ্যমণি ব্যক্তিটির দেহে শৃঙ্খলিত ফিটনেসের ছাপ স্পষ্ট। নির্দ্বিধায় সে এসে চেয়ারে বসল পায়ের উপর পা তুলে। আর দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জনের দৃষ্টি সোজা, কাঁধ টানটান। ডক্টর রুপম কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে অবশেষে চিনে ফেললেন সামনের মানুষটিকে। মুখে স্মিত হাসি ফুটিয়ে তিনি বলে উঠলেন,
"হেই প্রান্তিক তাজওয়ার রণয়, সান অফ মিনিস্টার রেদোয়ান তাজওয়ার, রাইট? নিউজফিডে আপনার মুখশ্রী বেশ পরিচিত।"
রণয় অদৃশ্য হেসে ঘড়ি ঠিক করতে করতে মুখ না তুলেই উত্তর দিল, "হ্যাঁ, তবে সামান্য এক ভুল রয়ে গেছে।"
"সরি?" থমকে যান ডক্টর রূপম।
"ইউব্লিউ অব স্নেহা তাফসি।" আকাশচুম্বী গম্ভীরতা কণ্ঠে রেখে স্বগোতক্তির মতো আওড়ালো রণয়।
ফের এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন ডক্টর রুপম। কথাটিকে কিঞ্চিৎ অদ্ভুত মনে হলেও তিনি তা গুরুত্ব দিলেন না। এক নাম তো অনেকেরই হতে পারে। এক চিলতে অস্বস্তির রেশটুকু কাটাতে ডক্টর রুপম গলা খাঁকারি দিয়ে সৌজন্য বজায় রেখে জিজ্ঞেস করলেন,"বলুন, কীভাবে সাহায্য করতে পারি আপনাকে?"
রণয়ের দূরদর্শী ঠান্ডা চোখ দু'টো সোজা গিয়ে পড়ল ডক্টর রূপমের ওপর। ঠোঁটের ফাঁক গলে বেরিয়ে এল শীতল ধ্বনি,
"রোগ সারিয়ে।"
রণয়ের কণ্ঠস্বর ও চাহনিতেও ভিন্ন তীব্রতা অনুভব করেও ডক্টর রুপম যথাসম্ভব কণ্ঠে পেশাদারিত্ব বজায় রেখে বললেন,
"কী রকম রোগ?"
রণয় বুকের বাম পাশে হাত রাখে "বুকের যন্ত্রণায় ভুগছি।"তার চোখ তখনও ফোনে আবদ্ধ।
ডক্টর রুপম হেসে বলে উঠলেন,"আপনি তো বেশ মজার মানুষ মনে হচ্ছে!"
"আই’ম প্রিটি সিরিয়াস," কণ্ঠটা এবার বেশ কড়াকড়ি।
"ওহ, সরি। কবে থেকে ব্যথা শুরু?"
এবার ফোনটা টেবিলে রেখে সোজা হয়ে বসল রণয়। তার চিবুকের রেখায় কঠোরতা খেলে গেল। গলা নামিয়ে ধীরে ধীরে সে বলল,
"যেদিন থেকে জানতে পেরেছি, আমার খাঁচার পাখিটার দিকে এক বনের শিকারির চোখ পড়েছে। সেই ভাবনাটাই বুকের মধ্যে অসহ্য চাপ সৃষ্টি করে। কখনও মনে হয়, সেই সাহসী শিকারির সাহসটাকে রাস্তায় চেপে পিষে, একটা এক্সিডেন্ট কেস বানিয়ে দিই।"
শীতল কণ্ঠে কথাগুলো বলার সঙ্গেই রণয় হাত বাড়াল টেবিলে রাখা পানির গ্লাস ধরার উদ্দেশ্যে। তার হাতের ছায়া ফোনের ওপর পড়তেই ফোনের স্ক্রিনে জ্বলে উঠল আলো। আর তাতেই ফোনের ওয়ালপেপারে স্পষ্ট ভেসে উঠল স্নেহার মুখ! দৃশ্যটি দেখামাত্র ডক্টর রুপমের চোখে বিদ্যুৎ খেলে গেল। গলা শুকিয়ে এল তার। ফাঁকা ঢোঁক গিলে পানি খুঁজতে তিনি হাত বাড়াতেই রণয় নিজেই গ্লাস এগিয়ে দেয়। ডগডগ করে পুরো গ্লাস শেষ করে ফেললেন ডক্টর রূপম। তা ধীরস্থির ভাবে ওঠে দাঁড়াল রণয়। নিজের কুঁচকে থাকা শার্টের হাতা গুছিয়ে নিয়ে হীম শীতল গলায় বলে গেল,
"আশা করি খুব শীঘ্রই আমার রোগ সারিয়ে দেবেন, ডক্টর।"
হনহন করে চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেল রণয়। পেছনে ছায়ার মতো তাকে অনুসরণ করল নিহাল আর আদিল। এদিকে ভয়ে ডক্টর রুপমের কপাল ঘেমে উঠল।
_________
পুরো ক্যাম্পাস চষে ফেলেও স্নেহার দেখা পেল না রণয়। প্রশস্ত ও সুঠাম বুক জুড়ে ঝড়ের মতো বইছে নিঃশ্বাস, গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঘামের ধারা। হন্যে হয়ে খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে লাইব্রেরির সামনে এসে তার পা জোড়া বিদ্রোহ ঘোষণা করে থমকে গেল।
জানালার পাশের রিডিং টেবিলে মাথা এলিয়ে নির্বিঘ্নে ঘুমিয়ে আছে স্নেহা। সূর্যের কোমল সোনালি রোদ স্নেহার কোমল মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে আলতো করে। দৃশ্যটি দেখে হঠাৎ করেই ঈর্ষা জাগল রণয়ের মনে। সূর্য কী অনায়াসেই না ছুঁতে পারে মেয়েটিকে, অথচ সে পারে না!
তখনও লাইব্রেরিতে বারো-তেরো জন ছাত্রছাত্রী উপস্থিত ছিল। কেউ দল বেঁধে, কেউবা একা। হঠাৎ করেই তারা উচ্চস্বরে হেসে ওঠে, সেই অট্টহাসি ভেঙে দেয় লাইব্রেরির স্তব্ধতা। হাসির শব্দে দু’বার কেঁপে ওঠে ঘুমন্ত স্নেহা। রণয় আঙুলে টোকা দিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। চোখাচোখি হতেই সে সবাইকে বাইরে চলে যাওয়ার ইশারা করল। আশ্চর্য বিষয় হলো, কেউ একটি প্রশ্নও করল না। সবাই নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল।
সবাই চলে যেতেই রণয় এগিয়ে গিয়ে জানালার পাশে টেবিল ঘেঁষে হালকা ঝুঁকে বসল। তার শরীরে ঢাকা পড়ে গেল রোদটুকু। রোদের আলো সরে গিয়ে ছায়া পড়তেই ঘুমের ভেতর হালকা হেসে ওঠে স্নেহা। সেই অবুঝ হাসি দেখে দম আটকে আসার উপক্রম হলো পুরুষটির।
মাথায় তখন চঞ্চল শয়তানি বুদ্ধি খেলল রণয়ের। সে একটু সরে দাঁড়াতেই রোদের তীক্ষ্ণতা ফিরে এল, তাতে সামান্য নড়ে উঠল স্নেহা। রণয় আবারও দাঁড়িয়ে গিয়ে আড়াল করে দিল সূর্যকে। এভাবে কয়েকবার লুকোচুরি খেলার পর একসময় স্নেহার পাশে নিঃশব্দে এসে বসল সে। একগুঁয়ে দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই মুখের পানে। শিশুর মতো ঠোঁট ফুলিয়ে ঘুমাচ্ছে মেয়েটি, গা ছুঁয়ে বইছে তার উষ্ণ শ্বাস। কী এক দুর্বোধ্য মায়ায় আচ্ছন্ন এই মুখাবয়ব!
একটু পর চোখ মেলে মাথা তুলল স্নেহা। হালকা ভেজা চোখে তাকাতেই হঠাৎ তার চোখ গিয়ে পড়ল রণয়ের ঘুমন্ত মুখের ওপর। চমকে গেল সে! আতঙ্কে ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশটা দেখল, লাইব্রেরিতে সে ছাড়া আর কেউ নেই!
তড়িঘড়ি করে ব্যাগ গোছাতে গিয়ে শেষ মুহূর্তে রণয়ের মুখের ওপর নজর পড়তেই স্নেহার হাত থেমে গেল। এই রেখে দিতে চাওয়া মুহূর্তের কোনো ব্যাখ্যা চলে না। অদৃশ্য মোহাব্বত তাকে মোহাবিষ্ট করে রুখে দিল। ধীরে চেয়ার টেনে কাছে এসে নৈঃশব্দে বসল সে। উষ্ণ তালুতে গাল ঠেকিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল রণয়ের ঘুমন্ত মুখের দিকে।
একটা মানুষ ঘুম ঘুম চোখে এতটা নির্দোষ, এতটা কোমল কীভাবে হতে পারে? অথচ সে-ই কি না সজাগ হলে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে! রণয়ের চিবুকের রেখায় রোদের খেলা দেখতে দেখতে স্নেহা ফিসফিস করে নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করল,
"আবেগ আর নেই নিয়ন্ত্রণে, তাই এখন আমি ধ্বংসের প্রান্তে... কী নাম দিই এই সুপ্ত অনুভবটিকে?"
হঠাৎই তার চোখ আটকে গেল রণয়ের নিচের ঠোঁটের সেই ছোট্ট কালো তিলটিতে। ক্ষীণ বিন্দুটি যেন চুম্বকের মতো তাকে টানছে। হাত বাড়িয়ে স্নেহা আলতো করে ছুঁয়ে দিল তিলটি। পরমুহূর্তেই শক্ত করে তার হাত চেপে ধরল রণয়!
চমকে লাফিয়ে ওঠে স্নেহা। সে পালানোর চেষ্টা করতেই রণয় ওকে টেনে বসিয়ে দিল। চোখ ছোট করে তাকিয়ে নাটকীয় স্বরে বলে উঠল,"আমার ঘুমের সুযোগ নিচ্ছিলে? বললেই তো পারতে, দেখিয়ে দিতাম শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিলটা। সেটা আসলে....
কথা শেষ করতে পারল না রণয়। লজ্জা ও আক্রোশে স্নেহা হাত দিয়ে তার মুখ চেপে ধরল। মেয়েটির কপাল পর্যন্ত লজ্জায় লাল বর্ণ ধারণ করেছে, কান দিয়ে যেন ধোঁয়া বের হওয়ার উপক্রম!
এতকিছুর পরও একটুও বাধা দিল না রণয়। সে শুধু নীরবে, নৈঃশব্দে স্নেহার হাতের তালুতে ছোট ছোট চুমু আঁকতে লাগল। রণয় যে তার হাতে চুমু খাচ্ছে বুঝতে পেরে স্নেহা দ্রুত হাত সরিয়ে নিল। তার চোখদুটো গর্জে উঠল রাগে। চোখ রাঙিয়ে নিচুস্বরে ফুঁসে উঠল সে,"কী সমস্যা আপনার? কেন এভাবে আমার পিছে লেগে আছেন?"
রণয় শান্ত গলায় স্বীকার করল,"কারণ তোমার চোখে যা দেখেছি, তা আর কারোর চোখে দেখিনি।"
রণয়ের এই অকপট স্বীকারোক্তি যেন এক ফালি ধারালো ছুরির মতো কেটে বসল স্নেহার বুক। নিঃশব্দে সে যেন ভেতরে ভেতরে গলে পড়তে লাগল। কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেল না। ঠিক যেমন করে অন্ধকার আকাশের বুকে হঠাৎ একঝলক নির্মল আলো ছড়িয়ে পড়ে, তেমনই তার মনের আকাশেও আলোড়ন বয়ে গেল।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল রণয়। স্নেহার দিকে তাকিয়ে গমগমে গলায় বলল,"বাসায় যাবে না? চলো, লিফট দিই।"
একটু থেমে সে আবার যোগ করল,"তোমার ভাইয়া আসবে তো? আকাশটা ভালো দেখাচ্ছে না।"
নিচু গলায় স্নেহা উত্তর দিল, "না, আসবে না।” সে টেবিলের নিচ দিয়ে দ্রুত ফোন বের করে স্নেহকে মেসেজ পাঠিয়ে দিল "না আসতে"।
"ওকে, চলো আমার সাথে।"
"আপনার সাথে?"
স্নেহার অবুঝ প্রশ্নে রণয় গ্রীবা বাঁকিয়ে তাকাল। একপলক তাকিয়ে মন্ত্রতাড়িত কণ্ঠে আওড়াল,
"চলো, তোমার ব্যক্তিগত মানুষটার সাথে।"
স্নেহার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। রণয় এগোতেই স্নেৃহাও বাধ্য মেয়ের মতো তার পিছু নিল। পার্কিং লটে যেতেই স্নেহার পা দুটো থমকে গেল। কারণ, তার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁত কেলিয়ে চব্বিশ কপাটি হাসি দিচ্ছে আদিল, আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে নিহাল।
দাঁতে দাঁত চেপে রণয়ের দিকে ফিরে স্নেহা ফুঁসে উঠল,"ওরাও যাবে?"
রণয় গাড়ির চাবি ঘুরিয়ে গাড়ির দিকে যেতে যেত নির্লিপ্ত গলায় বলল, "এই ঠান্ডার ওয়েদারে খালি গাড়িতে গিয়ে রিস্ক নিতে চাচ্ছি না। তাই ওদেরও সঙ্গে নিয়ে নিলাম।"
স্নেহার ইচ্ছা করছে লোকটার গলা টিপে ধরতে। ভদ্র দেখতে লোকটা কী নিদারুণ তাকে লজ্জায় ফেলে দিচ্ছে! রণয় ফ্রন্ট ডোর খুলে দিতেই স্নেহা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ গিয়ে সিটে বসল। আর পেছনের সিটে গিয়ে বসল আদিল আর নিহাল।
গাড়ি চলতে শুরু করল। হুট করেই স্নেহার চোখ গিয়ে পড়ল তার সামনের ড্যাশবোর্ডের স্টিকারে, যেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা—"The seat is Reserved for my sweetheart"
স্নেহা বোকা নয়, আবার সে অত সহজে কিছু ভুলেও যায় না। সেদিনই তো সে বলেছিল এই সিটটা তার পছন্দ হয়েছে।আর আজকে এই সিট রিজার্ভ বলে একদম সিল মেরে দিয়েছে! তারপর ওই যে সম্মোহনভরা কথা—সুইটহার্ট! এ তো চেনা ডাক! নিজের অন্তরের ভেতর চলা বেসামাল ঝড় কোনোমতে সামলে স্নেহা রণয়ের দিকে তাকাল।
রণয় তখন পূর্ণ মনোযোগে ড্রাইভ করছে। তার চোয়ালে অসম্ভব গম্ভীর রূপ। রণয়ের এই গম্ভীর চোয়ালটাই স্নেহার সবচেয়ে বেশি পছন্দ।
স্নেহা একদম নিচু স্বরে ফিসফিস করল, ঠিক ততটুকু নিচুতে, যতটুকু শুনলে কেবল রণয়ই শুনতে পাবে,"আমি আপনার সুইটহার্ট?"
স্বরটা অত্যন্ত মৃদু ছিল। কিন্তু যার মনোযোগ পূর্ণ তার কান এড়ায় কী করে? স্নেহার ঠোঁট থেকে প্রশ্নটা ঝরে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই রণয় ঘাড় ঘুরিয়ে সোজা তার দিকে তাকাল।একইভাবে ঠোঁট উল্টে হিসহিসিয়ে সে জবাব দিল,"নো, ইউ আর মাই সুইটমিট!"
শহরের বুকে ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামে। ট্রাফিক জ্যামে আটকে পড়ে গাড়িটা। গাড়ির ভেতরে তখন পিনপতন নিস্তব্ধতা, কেবল বাইরে পড়ার ঝমঝম বৃষ্টির শব্দ। হঠাৎ গাড়ির কাচে টোকা পড়ল। রণয় জানালার কাচ নামাতেই দেখা গেল, একটা ছোট ছেলে ঠান্ডায় থরথর করে কাঁপছে আর তার হাতে একগুচ্ছ তাজা বকুল ফুলের মালা।
স্নেহা পার্স খুলে টাকা বের করবে ভাবছে, তার আগেই রণয় পকেট থেকে কয়েকটা হাজার টাকার নোট বের করে ছেলেটার সব মালা একসঙ্গে কিনে নিল!
ছেলেটা হাঁ হয়ে তাকিয়ে রইল। তার মলিন মুখে তখন বিজয়ের চওড়া হাসি। টাকাটা হাতে নিয়ে খুশি মনে দৌড়ে চলে গেল সে। বকুল ফুলের মালাগুলো রণয় তুলে দিল স্নেহার কোলে। স্নেহা প্রথমে বিস্ময়ে ফুলের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর চাইল রণয়ের পানে। তার চোখজুড়ে তখন মুগ্ধতার আলো ঝলমল করছে। অথচ রণয় একদম নির্লিপ্তভাবে ফোনে চোখ গুঁজে রইল! স্নেহা আনমনে ফুলের তোড়াটা নাকে গুঁজে বকুলের মায়াবী ঘ্রাণ নিতে লাগল।
এদিকে পেছনের সিটে বসা আদিলের অবস্থা তখন শোচনীয়। ভিতর থেকে তার পেট ফেটে যাওয়ার জোগাড়, কিন্তু রায়ের ভয়ে রা করতেও পারছে না। আসার আগে রণয় তাকে যথেষ্ট পরিমাণ মলম লাগিয়ে তবেই গাড়িতে তুলেছে। আর নিহাল এককোণে চুপচাপ বসে দিব্যি গেম খেলেছে।
হঠাৎ করেই স্নেহার চোখ গিয়ে পড়ল পাশের লেনে থাকা একটা গাড়ির ওপর। বৃষ্টির মধ্যে এই ভারী জ্যামে গাড়িটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে কেঁপে দুলছে। চোখ কুঁচকে কৌতুহলী হয়ে স্নেহা রণয়ের দিকে ঘুরে বসল। বলল,' আচ্ছা, ওই গাড়িটা ওভাবে নড়ছে কেন?"
স্নেহা আঙুল দিয়ে সেদিকে ইশারা করতেই গাড়িতে উপস্থিত তিনজন সেদিকে তাকাল। নিহাল গম্ভীর মুখে সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে মিটিমিটি হাসতে লাগল। আদিল আর নিজের হাসি ধরে রাখতে না পেরে তার আসল রূপে ফিরেই এল। দু’হাতে মুখ চেপে ধরে অত্যন্ত নাটকীয় ও নাজুক ভঙ্গিতে সে বলল,"ওই গাড়িতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে।
তাই এভাবে কাঁপছে।"
আদিলের কথা শেষ হওয়া মাত্রই রণয়ের গলা চিরে একটা গাঢ় গর্জন বেরিয়ে এল, যা পুরো গাড়িকে কাঁপিয়ে দিল। স্নেহা চমকে গিয়ে ছিটকে বসল। আদিল সঙ্গে সঙ্গে চুপসে গেল। নিহাল কোণে মুখ লুকিয়ে কোনোমতে ঠোঁট চেপে হাসি আটকাতে লাগল।
স্নেহা অবশ্য কিচ্ছুই বুঝতে পারল না। এতটা রেগে যাওয়ার মতো কী বলল আদিল? বিরক্তিতে মুখ কালো করে রণয় একটানে উইন্ডো গ্লাস তুলে দিল। তারপর হর্ন বাজাতে শুরু করল। চরম বিরক্তি নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে সে বিড়বিড় করে
"কোনো টাইমসেন্স নেই শালাদের!"
~চলবে.......