ফন্ট সাইজ:
থিম:
কে বাঁশি বাজায় রে

পর্ব 13

লেখক: মিথুবুড়ি

#কে_বাঁশি_বাজায়_রে
#মিথুবুড়ি
#পর্ব_১৩

কানে ইয়ারফোন গুঁজে স্নেহা হাঁটছে আপনমনে। ঠোঁটে হালকা গুনগুন একটা রোমান্টিক গান আর মনে একগুচ্ছ কদমফুলের মতো সোনালী ঝিলিক। ছোট ছোট অনুভূতিগুলো তার তনুমন আঁকড়ে আছে অবলীলায়। যেন ফাগুনের হাওয়া হালকা, মিষ্টি, আর গভীরভাবে আবিষ্ট করা। গান আর অনুভব মিলেমিশে এমন সূত্র গড়েছে যা বুঝি কেবল হৃদয়ই অনুভব করতে পারে।

পূর্ণিমা সন্ধ্যার আলোয়, রজনীগন্ধার ঘ্রাণে ভেজা মন নিয়ে স্নেহা উদাস চোখে তাকিয়ে থাকে রূপসাগরের পানে। প্রজাপতির পাখাগুলো আকাশে রঙ ছড়িয়ে দেয়, আর সেই রঙে স্নেহার স্বপ্নও ঢেউ তোলে। ভালোবাসা এই শব্দের ব্যাখ্যা সবাই করে নিজের মতো করে। কেউ তা পায় না জানতেই, কেউ তা হারায় বুঝতেই না পেরে। কিন্তু স্নেহা? তার ভালোবাসা নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই। অচেনা এক মানব, ধীরে ধীরে এসে জায়গা করে নিয়েছে তার হৃদয়ের কিনারায়। ভালোবাসা জমেছে, রঙ ধরেছে, আর সে নিজেই যেন হারিয়ে ফেলেছে নিজেকে সেই রঙ্গণে। বারবার কানে বাজে কালকের সেই কথা,

"তোমার রিনঝিনে হাসি আজ বৃষ্টি হয়ে নেমেছে।"

তখন গাড়িতে স্নেহার অবস্থা যেন দেখার মতো৷ লজ্জায় দুই গাল টকটকে লাল, চোখের পাতা কাঁপছে আর মুখের কোণে একটুকরো লাজুক হাসি। ভাবতেই গাল গরম হয়ে আসে। হঠাৎ সামনে তাকাতেই স্নেহার মনে বাজে দুষ্টু শয়তানি। ইয়ারফোন খুলে সাবধানে ব্যাগে রাখে। তারপর গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করে তার বিশেষ নাটকীয়—'দ্যা ম্যালোড্রামা অফ স্নেহা!'

"আহা-আহা... ইহি, ইহি...!"

অদ্ভুত ঠাসানো শব্দে কান থেকে ফোন নামিয়ে রণয় পেছন ঘুরে তাকাতেই ক্ষুদ্ধ দৃষ্টিতে ধরা পড়ে গলা খাঁকারি, দুষ্টু হাসি, আর একরাশ চঞ্চলতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি জীবন্ত উচ্ছ্বাস। হাসোজ্জল স্নেহাকে দেখে রণয়ের তীক্ষ্ণ চোখের অভিব্যক্তি এক লহমায় বদলে যায়। তড়িৎ ফোন কেটে পকেটে রেখে ব্যগ্র পায়ে এগিয়ে আসে, থেমে দাঁড়ায় একদম স্নেহার সামনে। স্নেহা ফ্রিজড! রণয়ের হাতের পিঠে ঠেকেছে তার কপালে। আলতো এক ক্ষীণ ছোঁয়ায় এক নিমেষেই লোকটা যেন শুষে নেয় তার সমস্ত প্রাণশক্তি। মাথায় গাঁথা দুষ্ট বুদ্ধিগুলো হোঁচট খেয়ে নুয়ে পড়ে, মাথা নিচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে স্নেহা। রণয়ের রাশভারি কণ্ঠে ভেসে আসে উৎকণ্ঠা মোড়ানো প্রশ্ন,

"জ্বর এসেছিল?"

এই একটুখানি শব্দে ছিল যত্ন, ছিল একরাশ উদ্বেগ, ছিল এমন এক প্রভা, যা নরম আলোয় মৃদু মৃদু কাঁপে ভালোবাসার আঙিনায়। স্নেহা কিছু বলতে পারে না। ঠোঁট কাঁপে কিন্তু শব্দ আসে না। সে মনে মনে ভাবতে থাকে,'আপনি আমাকে ভীষণ লোভী করে দিচ্ছেন মসাই। এই ছোট ছোট যত্নের লোভে পড়ে যাচ্ছি আমি। আর কিছু চাই না, শুধু একটু করে গভীরভাবে আমাকে পড়ুন। এই প্রথম জীবনে কারো প্রতি জন্মালো প্রত্যাশা। দয়া করে হতাশ করবেন না, ভেঙে যাব, তছনছ হয়ে যাব!"

"তোতাপাখি?"

রণয়ের ডাকে ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে আসে সে। মুখ তুলে তাকাতেই দেখে রণয় আগে থেকেই তাকিয়ে আছে গভীর, চিন্তিত চোখে। স্নেহা আবার মাথা নিচু করে ফেলল। দৃষ্টি পড়ে মাটিতে। কুণ্ঠিত মনের কোনঠাসা আলগোছে আড়াল করে ভাঙা গলায় আওড়ালো,

"না... শুধু গলা বসে গেছে।"

রণয়ের গলায় খানিক ক্ষোভ, খানিক অভিমান, আর অতল যত্ন মিশে একাকার,"বারবার বলেছিলাম, জানালার বাইরে হাত দিও না। শোনোনি তো? সবসময় না করেও লাভ নেই, জোর গলায় না বললে পাত্তাই দাও না। এখন কার কষ্ট হচ্ছে, হুঁ?"

স্নেহা চুপ। চোখ নামিয়ে রণয়ের প্রতিটা কথা শুনতে থাকে নিরবভাবে। মনে হতে থাকে এই মানুষটার প্রতিটা কথাই যেন তার নিজের ভাষায় বলা কিছু না বলা অনুভব। হঠাৎ করেই রণয়ের সেই স্মৃতিগুলো তাকে ভরিয়ে দেয়, চেপে ধরে গলা। স্নেহার মনে পড়ে কাল গাড়িতে রণয়ের দেওয়া সাবধানী বাণীগুলা—‘স্নেহা, হাত বাইরে দিও না। ঠান্ডা লেগে যাবে।’‘তোতাপাখি, স্টপ ডুয়িং দিস।’‘হাত সরাও, আমি গ্লাস তুলে দিচ্ছি।’‘এই যে হাঁচি দিচ্ছ, নিহাল টিস্যু দে, হাত মুছে ফেলো।’‘আদিল, কুশন দে তো।’‘চা খাবে? গাড়ি থামাবো?’

সারাটা সময় লোকটা পাশে ছিল। আগলে ছিল একবার নরম কণ্ঠে, একবার কঠিন চোখে। স্নেহা বুঝতে পারে কেউ তার উপর এভাবে অধিকার ফলাচ্ছে এই প্রথম। আচ্ছা, "ভালোবাসি" না বলেও কি ভালোবাসা যায় না? যদি যায়, তবে এই লোকটা তার হৃদয়ের প্রতিটি কোণে ভালোবাসা এঁকে গেছে। চোখে জল এসে যায়। তবুও সে কিছু বলে না। শুধু চায় আরও একবার রণয়ের গলার সেই উদ্বেগ-ভেজা ডাক শুনতে।

"চল।"

চমকে ওঠে স্নেহা। বাঁধা হাতের দিকে তাকিয়ে বলল,"কোথায়?"

"হাসপাতালে।"

হতভম্ব স্নেহা বিস্ময়ে তাকায়,"কেন?"

"ইউ নিড ট্রিটমেন্ট।"

"আরে আমি ঠিক আছি। সামান্য গলা বসেছে শুধু।"

"আমি কোনো রিস্ক নিতে চাই না। চল।"

"রিস্ক? কিসের রিস্ক?"

"তোমাকে নিয়ে।"

"আমার কি হয়েছে? চা খেলে ঠিক হয়ে যাবে।"

একটু থেমে ঘাড় সম্পূর্ণ উঁচিয়ে রণয়ের চোখে চোখ রাখে স্নেহা। তারপর ভুরু নাচাতে নাচাতে বলল,"আর আপনি আমাকে নিয়ে এত উত্তেজিত হচ্ছেন কেন, মসাই? কেস কী?"

স্নেহার হাত ছেড়ে এবার একটু গম্ভীর হয় রণয়। বুকে হাত বেঁধে নিম্নবর্গের স্নেহার সামনে পাহাড়ের ন্যায় সটান দাঁড়ায়। সরু চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলল। শীতল অথচ গভীর গলায় বলল,"কারণ আমার কাছে তোমার সুস্থ থাকাটা বেশি ইম্পর্ট্যান্ট।"

"কেন?"

"কারণ আমি…"

"হ্যাঁ, আপনি?"

"আমি…...

"আমি কি বলুন না।"

"আমি তোমার…...

"আমার কী?" স্নেহার স্বরে কাঁপন, চোখে জানার অসীম আকাঙ্ক্ষা।

রণয় হঠাৎ ঠোঁটে চাপা হাসি নিয়ে বলে উঠল,"কারণ, সিনিয়র এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে ক্যাম্পাসের পিচ্চিদের দেখে রাখা আমার দায়িত্ব।"

ফোলা বেলুনের মতো চুপসে যায় স্নেহা। চোখের দৃষ্টি পড়ে রণয়ের শক্তপোক্ত বুক বরাবর। তার এভাবে মুহূর্তেই ভেঙে যাওয়া দেখে ঠোঁট চেপে হাসে রণয়। কিন্তু এক শ্বাসে আবার যেন ফুলে ওঠে স্নেহা, তবে এবার রাগ আর অভিমানের মিশ্রণে। ফুঁসতে ফুঁসতে গমগমে গলায় সে বলে ওঠে,"আসছি ভাইয়া।"

সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে ওঠে রণয়ের,'ভাইয়া? কে কার ভাইয়া?"

"আপনি আমার ভাইয়া।"

"হোয়াট রাবিশ?"

"আপনিই তো বললেন সিনিয়র।"

"তো?"

"তো আপনি আমার ভাইয়া… কিউট ভাইয়া… রণয় ভাইয়া।"

তাজ্জব হয়ে যায় রণয়! এই মেয়ে তো রীতিমতো ডগায় ডগায় চলে! একটা দীর্ঘ তপ্ত শ্বাস ফেলল সে,"ক্লাসে যাও। আমি চা পাঠাচ্ছি।"

"না ভাইয়া।"

"আবার ভাইয়া?" ধমকে ওঠে রণয়।

"সরি ভাইয়া।"

ঠোঁট গোল করে তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে রণয়। মহা ভুল করেছে এই উড়নচণ্ডী মেয়ের সাথে লাগতে গিয়ে!

"আসছি ভাইয়া।"

"ক্লাসে যাও।"

"আমি ক্যান্টিনে যাব, ভাইয়া।"

"চুপচাপ ক্লাসে যেতে বলছি।"প্রতিটি শব্দ চিবালো রণয়।

"আচ্ছা ভাইয়া!"

চপল হেসে চোখের পলকে উধাও হয়ে যায় স্নেহা। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা রণয় স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নাঃ, আজ আর এই মেয়ের সামনে পড়া যাবে না। তাহলে ভাইয়া ভাইয়া বলে মাথা খারাপ করে দিবে।

_______

"ভাই, ভাই, ভাই…!"

হস্তদন্ত হয়ে ক্লাবঘরে ছুটে আসে আদিল। হাঁপাচ্ছে রীতিমতো। সবাই কপাল কুঁচকে তাকায় তার দিকে। সে হাঁপাতে হাঁপাতে সোজা গিয়ে দাঁড়ায় রণয়ের সামনে। যেন কোনো নির্যাতিত ভিকটিম, আর্জি জানাচ্ছে, এমনভাবে বলতে শুরু করে,

"ভাই, আজকে একটা বিহিত করতেই হবে। ঐ মেয়েটা....."

"ভাইয়া, ভাইয়া, ভাইয়া…!"

আরেকজনের দৌঁড়ানোর শব্দ! চটপচট জুতোর আওয়াজ যত এগোয়, ক্লাবঘরের বাতাসে তত বাড়ে চাপ। এবার হাঁপাতে হাঁপাতে ক্লাবঘরে ঢোকে স্নেহা। উড়ন্ত গতিতে দৌড়ে গিয়ে আদিলের পাশে থেমে কোমরে হাত রেখে হালকা ঝুঁকে হাঁপাতে থাকে সে। সবার চোখ গোল! ঘটনা বিশ্লেষণে যাওয়ার পূর্বে স্নেহাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত গভীরভাবে স্ক্যান করে নিল রণয়। তারপর উঠে গিয়ে টেবিল থেকে পানি এগিয়ে দেয় স্নেহার দিকে। তড়াৎ পানির গ্লাস লুফে নিয়ে স্নেহা ঢকঢক করে পুরো গ্লাস সাভার করে ফেলল।

ভেতর থেকে ভেঙে যায় আদিল! ভাই তাকে পানি না দিয়ে এই মেয়েকে দিল? মনে মনে কান্না চেপে ভাবে সে, কয়েকদিনের মধ্যে সম্পর্ক এত বদলে গেল? না! আজ আর সে চুপ থাকবে না।

"ভাই, আমি আগে আসছি। বিচার আগে করতে হবে।"

স্নেহাও গ্লাস নামিয়ে তড়িঘড়ি করে বলল,"আমি আগেই আসতাম, একটু পড়ে গেছিলাম। তাই আগে আমিই বলব।"

স্নেহার কথা শুনে রণয়ের চোখ তৎক্ষণাৎ গেল ওর পায়ের দিকে। বুড়ো আঙুলের পাশটা ছুলে লাল হয়ে আছে। কিছু বলবে, এমন সময় গর্জে ওঠে আদিল,

"আমি আগে এসেছি, আমি বলব! ইট'স লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার!"

"খ্যাঁতা পুড়ি আপনার ইংলিশের! লেডিস ফার্স্ট!"

"আবার ইংলিশ!"

"একশোবার বলব! আমি সায়েন্সের স্টুডেন্ট।"

"আমি কর্মাসের।"

"কর্মাসে ইংলিশ নেই!"

"তাও আমি বলব! আই রিপিট…"

"কিন্তু বিচার আমি-ই দেব আগে!"

"আমি দিব! ভাই, আমার কথা আগে শুনেন!"

"না ভাইয়া, আমারটা শুনবেন আগে!"

"আমার ভাই! আমারটাই আগে শুনবে!"

"আমার ভাইয়া!"

"আমার ভাই!"

"আমার ভাইয়া!"

"চুুুুুুুুুপ!!!" দু'টোর অবিশ্রাম চেঁচামেচিতে অতিষ্ঠ হয়ে
প্রচণ্ড জোরে চেঁচিয়ে উঠল রণয়। আকাশচুম্বী হুংকারে দুজনেই মিইয়ে গেল। ওদের এই কাণ্ডকারখানা দেখে ঠোঁট চেপে হাসছে নিহাল আর সাজন। দৃশ্যটা যেন কোনো হাইস্কুল নাটক! রণয় একবার তাকায় আদিলের দিকে, এরপর স্নেহার দিকে। দুজনেরই মুখ নিচু। রণয় স্নেহার দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলে উঠল,

"এই মেয়ে, কে তোমার ভাইয়া?"

স্নেহা মিইয়ে গিয়েও নিচু গলায় বলে,"আপনি… রণয় ভাইয়া।"

"আর একবার ভাইয়া ডাকলে, ভাইয়ার উৎপত্তির সূত্র দেখে দেব!"

রণয়ের ধমকে চোখে পানি এসে যায় স্নেহার। লজ্জায়, অপমানে সে আড়চোখে আশপাশ দেখল! আদিল বিজয়ের হাসি দেয়, হাসিতে তার গাল চওড়া হয়ে যায়। কিন্তু সেই হাসি স্থায়ী হয় না বেশিক্ষণ। রণয়ের কণ্ঠ গম্ভীর। স্নেহার দিকে তাকিয়ে সে বলল,

"কী হয়েছে, বলো।"

সুযোগ পেয়ে মাথা তোলে স্নেহা। ভেজা গলায়, কান্না চেপে সে বলল,"উনি… আমার চা খেয়ে ফেলেছেন। এরপর ওনার এঁটো চা এনে আমাকে দিয়েছেন খাওয়ার জন্য!"

"এই! একদম মিথ্যে কথা বলবে না, ফাটা বাঁশ!" দাপুটে কণ্ঠে আদিল হুশিয়ারী দিল।

"দেখেছেন! আবার আমার ওপর ঝাড়ি মারছে।" শিশু দৃষ্টিতে রণয়ের দিকে চেয়ে কোমল গলায় অভিমানে জানাল স্নেহা।

আদিল কিছু বলবে, হা করে মুখ খুলতেই রণয় হাত তোলে থামিয়ে দেয় তাকে। আদিল যেন মাটির নিচে গিয়ে লুকোতে চায়! তার চোখে অপমান, মনজোড়া আক্ষেপ ঠাসা। এই মেয়ে তো বারবার সবার সামনে তাকে রাক্ষস বানাচ্ছে!

রণয় বুকের ওপর দুই হাত গুটিয়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়াল। দু'জনই অপরাধীর মতো মাথা নত করে আছে। রণয় কিছুক্ষণ শীতল, গোয়েন্দাসুলভ দৃষ্টিতে তাদের পর্যবেক্ষণ করল। তারপর ধীর ভঙ্গিতে চোখ ফেরাল আদিলের দিকে,"আদিল, তোর ব্যাখ্যা কী?"

কাচুমাচু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ায় আদিল। তারপর ধরা গলায় বলতে লাগল,"ভাই, তখন আপনি বলার পর আমি আদা আর তেঁতুল দিয়ে স্পেশাল চা বানিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম। অনেকটা যাওয়ার পর হঠাৎ একটা মেয়ের সাথে ধাক্কা লাগে। কিছুটা চা পড়ে যায়৷ সময় কম ছিল, তাই নতুন করে আর আনতে যাইনি। কিন্তু এই মেয়ে আমার কথা শুনছেই না। তখন থেকে বলছে, আমি ওর চা খেয়ে ফেলছি। আমি… রাক্ষস।"

ফাঁকা শ্বাস ফেলে রণয়। তারপর নিরবচ্ছিন্ন তপ্ত শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে নিজের অপারগতা স্বীকার করে বলল,"দোষ আমারই। ভুলে গিয়েছিলাম, এক জঙ্গলে কখনো দুটো বাঘ থাকতে পারে না।"

স্নেহার চোখে এবার হালকা অনুশোচনা রেশ। একটু ধৈর্য নিয়ে তখন কথাটা শুনলে হয়তো এমনটা হতো না! রণয় চোখে ইশারা করতেই আদিল গুটিগুটি পায়ে বেরিয়ে গেল।

"ঐ দিন যেই মলমটার কথা বলছিলাম, ওটা নিয়ে আয়।"

নিহালকে নির্দেশ দেয় রণয়। নিহাল মাথা নাড়িয়ে চলে যায়। আর তাদের স্পেস দিতে সাজনও বেরিয়ে পড়ে রুম থেকে।

স্নেহাও যেতে নিলে হঠাৎ রণয়ের হাতের স্পর্শে থেমে যায় সে। রণয় নিয়ে এনে ওকে কাউচে বসিয়ে দেয়। স্নেহা মাথা নিচু করে বসে চুপচাপ আঙুল কচলাতে থাকে। মুখে কথা নেই, চোখে কেবল লজ্জা আর দ্বিধা। রণয় স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। সময় পার হয়। নিহাল এসে মলম দিয়ে চলে গেল, কিন্তু রণয় তখনও শুধু তাকিয়েই রইল। হঠাৎ উঠে দাঁড়ায় সে। এরপর হাঁটু গেঁড়ে বসে স্নেহার সামনে। রণয় পায়ে হাত রাখতেই কেঁপে ওঠে স্নেহা। পা সরাতে চাইলে রণয় শক্ত করে ধরে রাখে, আর আলতো করে হাত রাখে তার হাঁটুর ওপর। স্নেহার সারা গায়ে শিহরণ বয়ে যায়।

"কি করছেন, কী?" কণ্ঠে সূক্ষ্ম কম্পন নিয়ে প্রশ্ন করে স্নেহা।

রণয়ের বিলম্বহীন জবাব,"কাজ।"

"পায়ে ধরছেন কেন?" জড়তায় ধরে আসে রমণীর কণ্ঠ।

কম্পমান কণ্ঠে প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে ভেসে এলো পুরুষালী বিমুগ্ধ কণ্ঠস্বর,"রাণীর সেবা করার জন্য।"

"রাণী?" অবিশ্বাসে চোখ গোল হয় স্নেহার।

জবাব না দিয়ে রণয় নিপুণ হাতে অতিশয় যত্নে মলম লাগিয়ে দেয় ক্ষতস্থানে। তার চোখেমুখে নেই কোনো সংকোচ, নেই বিন্দুমাত্র অহমিকা। কাজ শেষে মাথা তোলে সে, সরাসরি স্নেহার চোখে চোখ রাখে। মৃদু হেসে আওড়াল,

"আমার রাণী।"

স্নেহার তনুমন কেঁপে ওঠে থরোথরো করে। দু’হাতে খামচে ধরে বসার কুশন। রণয় উঠে দাঁড়ায়, বলল,"চলো, তোমায় পৌঁছে দিই।"

"না না…"

"কেন?"

"ভাইয়াব্বু কাছেই আছে।"

রণয় খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলল,"আচ্ছা, অন্তত গেট পর্যন্ত দিয়ে আসি।"

"না। আপনি পাশে থাকলে সবাই যেভাবে তাকিয়ে থাকে, এতে আমার অস্বস্তি হয়!"

রণয়ের ওষ্ঠপুটে এক ফালি হাসি দোলা দিল। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ঘাড় সামান্য কাত করে অত্যন্ত সূক্ষ্মতার সাথে সে সেই হাসিটুকু আড়াল করল। রণয় আর জোর করল না। স্নেনারর দ্বিধাটা সে বুঝে নেয়।

"ঠিক আছে। যাও।"

স্নেহা ধীরে ধীরে ওঠে দাঁড়ায়। আশপাশে আর কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা দরজার দিকে হাঁটা ধরে। দরজায় পৌঁছে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে এক পলক তাকায়, তারপর চেঁচিয়ে বলে উঠল,

"বাই কিউট ভাইয়া!"

বিদ্যুৎগতিতে দৌড়ে বেরিয়ে যায় সে!

রণয় এক হাত কোমরে রেখে দরজার দিকে হতাশ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর শরীরটা একটু এলিয়ে দিয়ে হঠাৎ-ই প্রাণ খুলে হেসে ফেলল। বুনো ও চঞ্চল এক মেয়ের ছোঁয়ায় তার জীবনের কাঠখোট্টা জগৎটা যেন ধীরে ধীরে রঙিন হয়ে উঠছে!

~চলবে.........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 13 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন