#প্রেম আমার
#পর্ব -৩
সামিয়া তার মামার সঙ্গে টুকটাক কথা বলার পর মামী ফাহিমা রহমানের কাছে এগিয়ে গেল। চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে সে জিজ্ঞেস করল,
— মামী মা, ঈশিতা কোথায় বলো তো? এসে থেকে ওকে একবারও দেখলাম না!
সামিয়ার কথা শুনে ফাহিমা বিবি মৃদু হেসে উত্তর দিলেন,
— দেখো তো মা, ও বোধ হয় নিজের ঘরেই আছে। যাও, ওর সঙ্গে দেখা করে এসো।
মামির কথা শুনে সামিয়া ঈশিতার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। ঘরের সামনে এসে দেখল, দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। একটু বিরক্ত হয়েই সে দরজায় ধাক্কা দিল।
— ঈশিতা! এই ঈশিতা! দরজা খোল!
কয়েকবার ধাক্কা দেওয়ার পর অবশেষে দরজা খুলে দিল ঈশিতা।
ঈশিতাকে দেখেই সামিয়া কিছুটা অবাক হয়ে গেল। মেয়েটার চোখ-মুখ এত লাল কেন? চোখের কোণে জমে থাকা জল আর মুখের বিষণ্নতা দেখেই তার মনে সন্দেহ জাগল, নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে।
তবে সামিয়াকে কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ না দিয়েই ঈশিতা আনন্দে তাকে জড়িয়ে ধরল।
— আপু! কেমন আছো?
ঈশিতার এমন উচ্ছ্বাস দেখে সামিয়ার মুখেও হাসি ফুটে উঠল। সে বোনকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
— আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি, বুনু। তুই কেমন আছিস, তাই বল। আর তোর চোখে পানি কেন? কাঁদছিলি কেন রে? কী হয়েছে তোর? কে কিছু বলেছে তোকে?
আপু এতগুলো প্রশ্ন একসঙ্গে করায় ঈশিতা কিছুটা অবাক হয়ে গেল। সে তাড়াতাড়ি চোখ মুছে বলল,
— কই, আপু! আমি কাঁদছি না তো!
কিন্তু সামিয়া যেন তার কথা বিশ্বাস করতেই পারল না। ঈশিতার চোখ-মুখ দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, সে কেঁদেছে। সামিয়া ছোট বোনকে খুব ভালো করেই চেনে। তাই বারবার জিজ্ঞেস করেও যখন কোনো উত্তর পেল না, তখন আরেকটু জোর করল।
অবশেষে ঈশিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— আপু, তোমার সঙ্গে আমার খুব জরুরি একটা কথা আছে। তাড়াতাড়ি ঘরে এসো।
ঈশিতা সামিয়ার চেয়ে প্রায় দুই বছরের ছোট। সামিয়া এখন একাদশ শ্রেণিতে পড়ে, আর ঈশিতা তার থেকে দুই ক্লাস নিচে। দুজন একই স্কুলে পড়ে। বয়সে বড় হওয়ার পাশাপাশি সামিয়ার প্রতি ঈশিতার অগাধ বিশ্বাসও রয়েছে। নিজের মনের অনেক কথাই সে আপুর সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে।
সামিয়া বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, কথাটা নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আর দেরি না করে ঘরে ঢুকে পড়ল।
ঈশিতা দরজাটা বন্ধ করে সামিয়ার পাশে এসে বসল। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর হঠাৎ প্রশ্ন করল,
— আচ্ছা, সামিয়া আপু, একতরফা ভালোবাসা কি খুব কষ্টদায়ক?
প্রশ্নটা শুনে সামিয়া অবাক হয়ে বোনের দিকে তাকাল।
— হ্যাঁ, বুনু। একতরফা ভালোবাসা খুব কষ্টের। কিন্তু হঠাৎ এমন কথা জিজ্ঞেস করছিস কেন?
ঈশিতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে আবার বলতে শুরু করল,
— আচ্ছা, আপু, যদি কোনো মানুষ কাউকে একতরফাভাবে ভালোবাসে, কিন্তু নিজের প্রিয় মানুষটাকে না পায়, তাহলে সে কি খুব কষ্ট পায় না? আর যদি সেই মানুষটা তাকে ভালোবাসার বদলে খুব খারাপভাবে কিছু বলে, তাহলে কি সে আরও বেশি কষ্ট পায়? ও আপু, বলো না! আপু, বলো!
কথাগুলো বলতে বলতে ঈশিতার চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
সামিয়া বোনের চোখের জল দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর স্নেহভরা কণ্ঠে বলল,
— হ্যাঁ, বুনু। কেউ যদি তোকে একতরফাভাবে ভালোবাসে, তাহলে তোর কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হলে তার কষ্ট হওয়াটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে তুই যদি তাকে খুব খারাপভাবে কিছু বলিস, তাহলে সে আরও বেশি আঘাত পেতে পারে। ভালোবাসার মানুষটির কাছ থেকে কষ্ট পেলে অনেক সময় মানুষের মন ভেঙে যায়।
কথাগুলো শুনে ঈশিতা আরও অস্থির হয়ে উঠল। সে কিছুক্ষণ ইতস্তত করে আবার বলল,
— আচ্ছা, আপু, যদি কোনোভাবে আমি এমন কোনো কাজ করে ফেলি, তাহলে?
সামিয়া এবার পুরোপুরি বোনের দিকে মনোযোগ দিল।
— কী করেছিস তুই, ঈশিতা? আমাকে খুলে বল।
ঈশিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল,
— জানো তো, আপু, কিছুদিন আগে একটা ছেলের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। তারপর থেকে তার সঙ্গে প্রায়ই কথা হতো। কথা বলতে বলতে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, সে আমাকে খুব, খুব ভালোবাসে। কিন্তু সে কখনো নিজের অনুভূতিগুলো আমার কাছে সেভাবে প্রকাশ করেনি। আমিও তাকে কিছু বলিনি। কিন্তু একদিন হঠাৎ সে আমাকে সব কথা বলে দিল।
কথাগুলো বলতে বলতে ঈশিতার গলা কেঁপে উঠল।
এরপর গত বাইশ দিনের ঘটনাগুলো একে একে সামিয়াকে বলতে শুরু করল সে। কীভাবে তাদের পরিচয় হয়েছিল, কীভাবে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল, কীভাবে ছেলেটি নিজের ভালোবাসার কথা জানিয়েছিল—কিছুই বাদ দিল না ঈশিতা।
সামিয়া নীরবে সব শুনে গেল। বোনের প্রতিটি কথা মন দিয়ে শুনতে শুনতে তার মুখের অভিব্যক্তিও ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল।
সব কথা বলা শেষ হলে সামিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করল,
— আচ্ছা, ঈশিতা, ছেলেটার নাম কী?
ঈশিতা নিচু স্বরে উত্তর দিল,
— আপু, ছেলেটার নাম নিহাদ।
নামটা শোনামাত্রই সামিয়া যেন কেঁপে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল তার।
নিজেকে সামলে নিয়ে সে ঈশিতার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— তুই কি আর কিছু জানিস, ঈশিতা?
ঈশিতা মাথা নেড়ে উত্তর দিল,
— না, আপু। আমি আর তেমন কিছু জানি না। তবে জানি, ছেলেটার বয়স সতেরোর বেশি। আর উনি চৌধুরী পরিবারের একমাত্র ছেলে।
কথাগুলো শোনার পর সামিয়ার আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না।
নিহাদ চৌধুরী!
যে মানুষটাকে সে প্রায় পাঁচ বছর ধরে নিজের মনের গভীরে ভালোবেসে এসেছে, সেই মানুষটাই ভালোবাসে তার নিজের ছোট বোনকে!
সামিয়া কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে বসে রইল। মনে হচ্ছিল, তার চারপাশের সবকিছু হঠাৎ থমকে গেছে। এত দিন ধরে মনের মধ্যে লুকিয়ে রাখা অনুভূতিগুলো যেন মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠল।
মনে মনে সে বিড়বিড় করে বলল,
‘আল্লাহ! তুমি আমাকে এত বড় পরীক্ষার মুখে কেন দাঁড় করালে? যে মানুষটাকে আমি প্রায় পাঁচ বছর ধরে নিজের মনের মধ্যে জায়গা দিয়ে রেখেছি, সেই মানুষটাই আমার বোনকে ভালোবাসে!’
সামিয়া আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। কোনো রকমে নিজেকে সামলে ঈশিতার ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
সামিয়াকে এভাবে চলে যেতে দেখে ঈশিতা কিছুটা অবাক হলেও তাকে আর ডাকল না। সে বুঝতে পারল না, তার বলা কথাগুলো আপুর মনে কতটা ঝড় তুলে দিয়েছে।
সামিয়া নিজের ঘরে পৌঁছাতেই তার মা হালিমা বিবি তার পিছু পিছু সেখানে এলেন। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়েই তিনি বুঝতে পারলেন, কিছু একটা হয়েছে।
হালিমা বিবি সামিয়ার মনের কথা অনেকটাই জানতেন। তিনি জানতেন, সামিয়া নিহাদকে ভালোবাসে। এটাও জানতেন, নিহাদ অন্য কাউকে ভালোবাসে। কিন্তু সেই মানুষটি যে তাঁর নিজের ভাইয়ের মেয়ে, তা তিনি জানতেন না।
ঈশিতার মুখে নিহাদের নাম শোনার পর সামিয়ার যে কী অবস্থা হয়েছে, তা বুঝতে তাঁর আর বাকি রইল না।
মেয়েকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে হালিমা বিবি তার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
— দেখো, মামণি, তোমার ভাগ্যে হয়তো এটাই লেখা ছিল। এখন আর কী করবে বলো? ভালোবাসা তো জোর করে পাওয়া যায় না, মা।
সামিয়া মায়ের দিকে তাকাল। চোখ দুটো তখন জলে ভরে উঠেছে।
— আমি জানি, মা। আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন। কিন্তু তাকে হারানোর এই আক্ষেপ আমি কীভাবে মেটাব, বলো? বলো না, মা! আমি নিহাদকে ছাড়া বাঁচব কীভাবে? আমি ওকে পাঁচ বছর ধরে ভালোবাসি, মা! পাঁচ বছর! তুমি বুঝতে পারছ না? আমি জানি, ঈশিতা নিহাদকে ভালোবাসে না। কিন্তু নিহাদ তো ঈশিতাকে ভালোবাসে! আমি কী করব, মা? কী করব আমি?
কথাগুলো বলতে বলতে সামিয়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।
হালিমা বিবি মেয়েকে বুকে টেনে নিলেন। স্নেহভরে তার চোখের জল মুছে দিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু মেয়ের মনের কষ্ট কি আর এত সহজে দূর করা যায়?
কিছুক্ষণ পর সামিয়াকে ঘুমাতে বলে হালিমা বিবি ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
বাইরে বেরোতেই দেখলেন, ঈশিতা তার ঘরের দিকে আসছে।
ঈশিতা ফুফুর সামনে এসে জিজ্ঞেস করল,
— ফুফু, সামিয়া আপু কোথায় গো? আমার ঘর থেকে চলে এল যে! যাবে না বলেছিল তো!
হালিমা বিবি মুখে স্বাভাবিক ভাব ফুটিয়ে উত্তর দিলেন,
— ঈশিতা, তোর আপুর মাথাটা ধরেছে। ওকে একটু ঘুমাতে দে।
ঈশিতা কথাটা শুনে মাথা নাড়ল।
— আচ্ছা, ফুফু।
এরপর আর কোনো প্রশ্ন না করে ঈশিতা নিজের ঘরের দিকে ফিরে গেল।
অন্যদিকে ঘরের ভেতর সামিয়া নীরবে বসে রইল। মনের মধ্যে তখন একই নাম বারবার ফিরে আসছে—নিহাদ চৌধুরী।
পাঁচ বছরের ভালোবাসা আর নিজের ছোট বোনের প্রতি মায়া—দুটোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে সামিয়া যেন বুঝে উঠতে পারছিল না, তার মনের কষ্টটা কাকে বোঝাবে।
চলবে ইনশাল্লাহ
পর্ব-৪