#প্রেম আমার
#পর্ব - ৪
অভিমানের আড়ালে ভালোবাসা
ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর সাড়ে তিনটা।
ঈশিতা ধীরে ধীরে সামিয়ার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। ঘরে ঢুকে দেখল, সামিয়া বিছানায় শুয়ে ঘুমাচ্ছে। ঈশিতা নিঃশব্দে তার আপুর পাশে গিয়ে বসল। তারপর স্নেহভরে সামিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই বুঝতে পারল, তার শরীর বেশ গরম।
— আপু! তোমার তো জ্বর এসেছে!
কথাটা বলেই ঈশিতা তাড়াতাড়ি ওয়াশরুম থেকে পানি নিয়ে এল। এরপর একটি কাপড় ভিজিয়ে সামিয়ার কপালে জলপট্টি দিতে শুরু করল।
প্রায় এক ঘণ্টা ধরে আপুর পাশে বসে রইল সে। কখনো কপালে জলপট্টি দিচ্ছে, কখনো আবার গায়ে হাত দিয়ে জ্বরের তাপ বোঝার চেষ্টা করছে।
এক ঘণ্টা পর সামিয়ার জ্বর কিছুটা কমে এল।
জ্বর একটু কমতেই ধীরে ধীরে ঘুম ভাঙল তার। চোখ খুলে পাশে ঈশিতাকে বসে থাকতে দেখে কিছুটা অবাক হলো সামিয়া।
— বুনু, তুই কখন এলি এই ঘরে?
ঈশিতা মৃদু হেসে উত্তর দিল,
— এই তো, আপু, একটু আগেই এসেছি। তোমার গায়ে জ্বর এসেছে। ওষুধ খেয়েছ?
সামিয়া দুর্বল কণ্ঠে বলল,
— না, বুনু, খাইনি। থাক, এখন তেমন জ্বর নেই।
ঈশিতা আপুর কপালে হাত রেখে বলল,
— আপু, তোমার জ্বরটা একটু কমেছে ঠিকই, কিন্তু পুরোপুরি কমেনি। ওষুধটা খেয়ে নাও। তাহলে জ্বরটা আরও কমে যাবে।
সামিয়া ছোট বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। ঈশিতার এই যত্ন দেখে তার মনটা একটু শান্ত হয়ে এল।
রাতের নীরবতা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত দশটা।
ঈশিতা ফোন হাতে অনলাইনে এল। অনলাইনে আসতেই তার চোখ পড়ল পরিচিত একটি নামের ওপর—নিহাদ চৌধুরী।
নিহাদও অনলাইনে এসেছে!
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এত দিন পর অনলাইনে এসেও নিহাদ তাকে একটি মেসেজও করল না।
ঈশিতা কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজেই সাহস করে মেসেজ পাঠাল।
“Nihad bhaiya, sorry গো। আমি সেদিন প্রচণ্ড রেগে ছিলাম। প্লিজ, নিহাদ ভাইয়া, আমাকে ক্ষমা করে দাও। প্লিজ, নিহাদ ভাইয়া, প্লিজ!”
মেসেজ পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গেই নিহাদ সেটি সিন করল।
কিন্তু কোনো উত্তর এল না।
ঈশিতা অবাক হয়ে গেল। এমন তো কখনো হয়নি! সে মেসেজ করলে নিহাদ সব সময় উত্তর দিত। অথচ আজ তার মেসেজ সিন করেও কোনো উত্তর দিচ্ছে না!
ঈশিতা আবারও মেসেজ পাঠাল।
“ও নিহাদ ভাইয়া, প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দাও। প্লিজ, নিহাদ ভাইয়া!”
“প্লিজ, নিহাদ ভাইয়া, প্লিজ!”
আবারও মেসেজ সিন হলো। কিন্তু উত্তর এল না।
এভাবে ঈশিতা একের পর এক মেসেজ পাঠাতে থাকল। প্রতিবারই নিহাদ মেসেজগুলো সিন করছিল, কিন্তু কোনো উত্তর দিচ্ছিল না।
একসময় প্রায় পঞ্চাশটির মতো মেসেজ পাঠিয়ে ফেলল ঈশিতা। তবুও নিহাদের কোনো জবাব এল না।
অবশেষে ঈশিতা আরেকটি মেসেজ পাঠাল। তবে এবার তার মেসেজের ধরন ছিল একটু আলাদা।
“আচ্ছা, নিহাদ ভাইয়া, আপনি যদি আমার মরা মুখ দেখতে না চান, তাহলে মেসেজের রিপ্লাই দিন "
মেসেজটি পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গেই সিন হয়ে গেল।
আর এবার ঘটল সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা।
নিহাদ সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দিল।
“কী হয়েছে? কী তোমার?”
তারপর আরেকটি মেসেজ—
“কী মনে করো, আমি কি খেলার পুতুল? যখন খুশি আমাকে কষ্ট দেবে, আবার আমাকে ব্ল্যাকমেল করবে?”
ঈশিতা তাড়াতাড়ি উত্তর দিল,
“আসলে, নিহাদ ভাইয়া, সরি।”
“নিহাদ ভাইয়া, আমাকে ক্ষমা করবে না? ও ভাইয়া, প্লিজ!”
নিহাদের উত্তর এল,
“না, আমি তোমাকে ক্ষমা করব না। হয়েছে?”
ঈশিতা যেন কথাটা শুনে আরও অসহায় হয়ে পড়ল।
“ও নিহাদ ভাইয়া, প্লিজ এমন করো না। আমি নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারব না, যদি তুমি আমাকে ক্ষমা না করো। ও ভাইয়া, প্লিজ!”
নিহাদ এবারও নিজের সিদ্ধান্তে অটল রইল।
“আমি বললাম না, আমি তোমাকে ক্ষমা করতে পারব না! ধুর, যাও তো!”
ঈশিতা আবারও মেসেজ পাঠাল।
“ও ভাইয়া, ভাইয়া গো, প্লিজ এমন করো না! তুমি না আমার খুব ভালো একজন ফ্রেন্ড? তবে এমন করছ কেন? প্লিজ, আমাকে ক্ষমা করে দাও!”
কিছুক্ষণ পর নিহাদের উত্তর এল।
“দেখো, ঈশিতা, আমি একটা কথা বারবার বলি না। আমি যেটা চাই, তুমি কখনো আমাকে সেটা দিতে পারবে না। সুতরাং তোমাকে ক্ষমা করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।”
মেসেজটা পড়ে ঈশিতার বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
সে আবারও লিখল,
“ও নিহাদ ভাই, প্লিজ এমন করো না। প্লিজ, আমাকে ক্ষমা করে দাও!”
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ঈশিতা অউরালো
“আচ্ছা, বলো, তোমার কী চাই? আমি পারলে নিশ্চয়ই দেব।”
নিহাদ কথাটা পড়ে কিছুটা অবাক হলো। তারপর উত্তর দিল,
“আমি যা চাই, সেটা তুমি একাই দিতে পারবে। তবে তুমি দেবে কি না, সেটা তোমার ব্যাপার।”
ঈশিতা উত্তর দিল,
“কী চাও তুমি?”
নিহাদ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর আবার লিখল,
“তবে মনে রেখো, আমার একান্ত মেহুকে যদি আমি না পাই, তাহলে এই দিনটাই আমার জীবনের শেষ দিন হবে। I am sure I shall kill myself.”
মেসেজটা পড়ে ঈশিতা আতঙ্কিত হয়ে গেল।
সে তাড়াতাড়ি লিখল,
“আচ্ছা, তুমি কী চাও? বলো!”
এবার নিহাদ যেন এত দিন ধরে বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা সমস্ত অনুভূতি উজাড় করে দিল।
“আমি কী চাই, জানো? আমি শুধু তোমার ভালোবাসা চাই। তোমার সঙ্গে একটা জীবন নয়, প্রত্যেকটা জীবন কাটাতে চাই। তোমার সঙ্গে সংসার করতে চাই। হ্যাঁ, মেহু, আমি তোমাকে আমার অর্ধাঙ্গিনী বানাতে চাই। Nothing else, বুঝেছ? আমি শুধু তোমাকে চাই। আমার জীবনের প্রতিটি অংশে তোমাকে রাখতে চাই। প্লিজ, আমাকে ফিরিয়ে দিয়ো না। প্লিজ, Mehu, প্লিজ!”
মেসেজগুলো পড়ে ঈশিতা নির্বাক হয়ে গেল।
কী উত্তর দেবে সে? কীভাবেই বা এই কথাগুলোর জবাব দেবে?
কিছুক্ষণ পর সে লিখল,
“তবে, নিহাদ ভাইয়া, আমি কীভাবে এটা করব? আমার ফ্যামিলি কখনো এসব মেনে নেবে না। আমি পরিবারের অমতে গিয়ে এসব করতে পারব না।”
নিহাদ সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দিল,
“তাহলে তুমি কী চাও, ঈশিতা? ঠিক আছে, আমি যা বললাম, সেটাই হোক—হয় তুমি আমার হবে, নয়তো আজ আমার জীবনের শেষ দিন হোক। Okay, bye! ভালো থেকো। আর আমার জন্য দোয়া করো, যেন আল্লাহর কাছে গিয়ে ভালো থাকতে পারি।”
মেসেজটা পড়ে ঈশিতার হাত-পা যেন ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে দ্রুত লিখল,
“ও নিহাদ ভাই, প্লিজ এমন করো না! প্লিজ!”
নিহাদের উত্তর এল,
“কী এমন করব না? আমি তো বললামই, যদি তোমাকে না পাই, তাহলে...”
ঈশিতা আর কিছু ভাবতে পারল না। চোখের সামনে যেন অন্ধকার নেমে এল তার।
শেষ পর্যন্ত কাঁপা হাতে মেসেজ লিখল সে,
“না, নিহাদ! না! ঠিক আছে, তুমি যা চাও, তাই হবে। তুমি আমাকে না চাইলেও ঠিক আছে, আমি তোমারই হব। বাট, তুমি প্লিজ এমন করো না! প্লিজ!”
মুহূর্তের মধ্যেই নিহাদের উত্তর এল,
“Thank you, আমার অর্ধাঙ্গিনী! Thank you! প্লিজ, কখনো আমাকে ছেড়ে যেয়ো না।”
কিন্তু ঈশিতা আর কোনো উত্তর দিতে পারল না।
সে কীভাবে নিজের পরিবারের অনিচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে? নিজের মনেই প্রশ্ন জাগল তার—এটা কি ঠিক হচ্ছে?
কিন্তু গত কয়েক দিনে তার নিজের মনেও যে অনেক কিছু বদলে গেছে, তা সে অস্বীকার করতে পারল না। নিহাদের প্রতি তার অনুভূতিগুলো কখন যে বন্ধুত্বের সীমা ছাড়িয়ে ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে, সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
এখন তার মনে হচ্ছে, নিহাদকে হারানোর ভয়টা সে আর উপেক্ষা করতে পারছে না।
কী আর করার! এই মুহূর্তে তার কাছে এটাই যেন শেষ উপায় বলে মনে হলো।
কিছুক্ষণ পর ঈশিতা নিজেকে সামলে আবার মেসেজ পাঠাল,
“আচ্ছা, নিহাদ ভাইয়া, আমাদের পরিবার যদি কখনো রাজি না হয়, তখন আমরা কী করব?”
নিহাদ উত্তর দিল,
“আচ্ছা, ঈশিতা, তুমি কি জানো না, ভালোবাসা এমন একটা জিনিস, যেখানে দুজন মানুষ যদি একে অপরের প্রতি সত্যি থাকে, তাহলে পরিবার কিংবা অন্য কেউ তাদের সম্পর্কের পূর্ণতা আটকাতে পারে না?”
তারপর আরেকটি মেসেজ এল।
“আর যদি তোমার পরিবার রাজি না হয়, তাহলে আমি তোমার আব্বুর পায়ে পড়তেও রাজি। আমার শুধু একটাই আবদার থাকবে—প্রয়োজন হলে ভিক্ষা চাইব, তবুও তোমার আব্বু যেন আমাকে ফিরিয়ে না দেন!”
কিছুক্ষণ পর নিহাদ আরও লিখল,
“ও শ্বশুরমশাই, দান করবেন এই ভিক্ষুককে আপনার কন্যাকে, আপনার বাগানের ফুলকে? আমি আমার জীবন দিয়ে সেই ফুলকে রক্ষা করব!”
মেসেজগুলো পড়ে ঈশিতার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটুখানি হাসি ফুটে উঠল। তবে মনের ভেতরের দুশ্চিন্তাটা তখনও কাটেনি।
সে লিখল,
“জি, নিহাদ ভাইয়া, আমি সেটা জানি। তবে আমি এখনো অনেক ছোট। আমি কীভাবে এসব সামলাব?”
নিহাদের উত্তর এল,
“দেখো, ঈশিতা, তুমি যেমনই হও না কেন, আমার তোমাকেই চাই।”
ঈশিতা আর কিছু না ভেবে লিখল,
“ওকে, নিহাদ ভাইয়া।”
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর নিহাদ আবার মেসেজ পাঠাল,
“আচ্ছা, ঈশিতা, এখনো আমি তোমার ভাই লাগি?”
তারপর নিজেই লিখল,
“ধুর! জীবনটা পুরো তেজপাতা হয়ে গেল!”
মেসেজটা পড়ে ঈশিতার হাসি পেয়ে গেল।
সে তাড়াতাড়ি উত্তর দিল,
“আচ্ছা, আচ্ছা, সরি! আর ভাই বলব না। হয়েছে?”
নিহাদ সঙ্গে সঙ্গেই লিখল,
“হয়েছে মানে? একশোবার হয়েছে, আমার মেহু জান!”
ঈশিতা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। মুখে হাসি থাকলেও মনের গভীরে তখনও অনেক প্রশ্ন জমে আছে।
একদিকে নিহাদের প্রতি জন্ম নেওয়া নতুন অনুভূতি, অন্যদিকে পরিবারের কথা—সব মিলিয়ে তার মনটা অদ্ভুত এক দ্বিধায় আটকে গেল।
তবুও সেই রাতে তাদের কথোপকথন থামল না সহজে। অভিমান, ক্ষমা চাওয়া আর ভালোবাসার স্বীকারোক্তির মধ্য দিয়ে দুজনের সম্পর্ক যেন নতুন এক মোড় নিল।
কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পর সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা তখনও অজানা ছিল ঈশিতা ও নিহাদ—দুজনেরই।
চলবে ইনশাল্লাহ
পর্ব -৫