ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার

পর্ব 6

লেখক: আরজিনা খাতুন

#প্রেম আমার
#পর্ব — ৬

ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল ৫টা ৩৬ মিনিট। সারাদিনের শিক্ষাকার্যক্রম সমাপ্ত করে সবে বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করেছে সিদরাতুল ঈশিতা রহমান। বিদ্যালয়ের দীর্ঘ সময়ের ক্লান্তি তখনও তার অবয়বে সুস্পষ্ট, অথচ দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততার অবসান ঘটিয়ে পুনরায় নিজেকে প্রস্তুত করে নিতে তার বিশেষ বিলম্ব হলো না। টিউশনে যাওয়ার তাড়া রয়েছে।

নিজের কক্ষে প্রবেশ করে আলমারি খুলল ঈশিতা। সযত্নে রাখা পোশাকগুলোর মধ্য থেকে একটি মেহরুন রঙের বোরকা ও মানানসই হিজাব নির্বাচন করে পরিধান করল সে। অতঃপর আয়নার সম্মুখে দাঁড়িয়ে নিজের পোশাক-পরিচ্ছদ সুবিন্যস্ত করে নিল। পরিপাটি সাজসজ্জার মধ্যেও তার অবয়বে ছিল এক ধরনের স্নিগ্ধ সরলতা।

প্রস্তুতি সম্পন্ন করেই সে মুঠোফোনটি হাতে তুলে নিল। রুহিসাকে ফোন করে টিউশনে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চেয়েছিল, কিন্তু একাধিকবার চেষ্টা করেও বান্ধবীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারল না। ফলে কিছুটা নিরাশ হয়েই ফোনটি নামিয়ে রাখল সে।

ঠিক সেই মুহূর্তে মুঠোফোনে ভেসে এল একটি ক্ষুদ্র সংকেতধ্বনি।

টিং!

আকস্মিক শব্দে ঈশিতা সামান্য চমকে উঠল। পর্দার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতেই পরিচিত নামটি চোখে পড়ল—নিহাদ চৌধুরী।

ব্যস্ততার আবর্তে নিহাদকে বার্তা পাঠানোর কথা তার একেবারেই স্মরণে ছিল না। অথচ নিহাদের স্বতঃপ্রণোদিত বার্তা দেখে তার মুখাবয়বে মুহূর্তেই আনন্দের আভা ছড়িয়ে পড়ল। মানুষটি যে নিজে থেকেই তার খোঁজ নিয়েছে, এই সামান্য বিষয়টুকুও তার কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করল।

বার্তাটি খুলতেই পর্দায় ভেসে উঠল নিহাদের অভিমানমিশ্রিত দীর্ঘ অভিযোগ—

‘ওই মেহু, বাড়িতে এসেছ তো? তুমি জানো না, কেউ একজন আছে যে সব সময় তোমার কথা ভাবে। তোমাকে নিয়ে তার খুব চিন্তা হয়। তুমি কোথায় আছ, কী করছ, কার সঙ্গে কথা বলছ—এসব নিয়েই আমার টেনশন হয়। কেন তুমি এমন করো বলো তো? আমি কি বলিনি, বাড়ি ফিরেই আগে আমাকে মেসেজ দেবে? কিন্তু দেখো, তুমি সব ভুলে যাও!’

নিহাদের অভিযোগ পড়ে ঈশিতা মৃদু হেসে ফেলল। তার এই যত্নশীল অথচ অভিমানপ্রবণ স্বভাবটি ঈশিতার অজানা নয়। তবুও প্রিয় মানুষের এমন অনুযোগের মধ্যে যে এক ধরনের আন্তরিকতা লুকিয়ে থাকে, তা উপলব্ধি করতে তার বিশেষ অসুবিধা হলো না।

সে দ্রুত প্রত্যুত্তর লিখল—

‘ওকে, সরি, অচেনা আইডির মালিক! এবার থেকে বাড়ি এসেই তোমাকে মেসেজ দেব। প্রমিস! প্লিজ, রাগ করো না।’

নিহাদের উত্তর এল—

‘হুম, মেহু। রাগ করিনি। শুধু তোমাকে বোঝাচ্ছি।’

ঈশিতা আবার লিখল—

‘আচ্ছা, আমার প্রিয় অচেনা আইডির মালিক, আমার এখন টিউশন আছে। আমি পড়তে যাচ্ছি।’

নিহাদ জানতে চাইল—

‘কে নিয়ে যাবে তোমাকে?’

‘ভাইয়া মনে হয়।’

‘ওহ্। সাবধানে যেয়ো।’

‘আচ্ছা, বাই!’

‘বাই, মেহু জান।’

বার্তালাপের সমাপ্তি ঘটিয়ে ঈশিতা মুঠোফোনটি রেখে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এল। নিচতলায় পৌঁছাতেই দেখতে পেল, তার মা ফাহিমা বিবি ও ঈশান কোনো একটি বিষয় নিয়ে কথোপকথনে ব্যস্ত।

ঈশিতাকে দেখামাত্রই ঈশান তাড়া দিল,

— এই বনু, তাড়াতাড়ি আয়। নইলে তো তোর দেরি হয়ে যাবে!

ঈশিতা দ্রুত এগিয়ে এসে বলল,

— হ্যাঁ ভাইয়া, চলো চলো!

বেরিয়ে যাওয়ার আগে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে ঈশানের মোটরবাইকের কাছে এসে দাঁড়াল। ভাইয়ের হাত থেকে হেলমেটটি নিয়ে মাথায় পরে যথাযথভাবে বসে পড়ল পেছনের আসনে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই মোটরবাইকটি বাড়ির সীমানা অতিক্রম করে ব্যস্ত সড়কে মিশে গেল।

---

নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে ঈশান মোটরবাইক থামাল। ঈশিতাকে নামিয়ে দিয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জানিয়ে সে পুনরায় বাড়ির পথে রওনা হলো। আর ঈশিতা ধীর পদক্ষেপে টিউশনকেন্দ্রের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল।

আজ রুহিসা আসেনি। ফলে পরিচিত সঙ্গিনীকে পাশে না পেয়ে ঈশিতার মন কিছুটা বিষণ্ন হয়ে উঠল। সাধারণত দুজন একসঙ্গে পড়াশোনা করে, অবসরে নানা বিষয়ে কথোপকথনে মেতে ওঠে এবং বাড়ি ফেরার পথেও একে অপরের সঙ্গ উপভোগ করে। আজ সেই পরিচিত অভ্যাসের ব্যতিক্রম ঘটায় তার মধ্যে এক ধরনের নিঃসঙ্গতা অনুভূত হলো।

তবুও সময়ের দাবি মেনে সে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করল।

একটির পর একটি অধ্যায়ের ব্যাখ্যা, শিক্ষকের প্রশ্নোত্তর এবং অনুশীলনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হতে লাগল সময়। অবশেষে টিউশন শেষ হলে ঈশিতা প্রয়োজনীয় বইপত্র গুছিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল।

বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিতে গিয়েই তার উপলব্ধি হলো, প্রবল ক্ষুধায় শরীর যেন ক্রমশ অবসন্ন হয়ে পড়ছে। বিদ্যালয় থেকে ফেরার পর তাড়াহুড়ো করে প্রস্তুত হতে গিয়ে কিছু খাওয়া হয়নি তার। দীর্ঘ সময়ের অধ্যয়ন শেষে সেই অনাহারের প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে।

টিউশনকেন্দ্রের পাশেই অবস্থিত একটি রেস্তোরাঁর দিকে দৃষ্টি পড়তেই সে সেখানে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত নিল।

রেস্তোরাঁটির অভ্যন্তরভাগ ছিল পরিপাটি ও শান্ত। স্নিগ্ধ আলোকসজ্জা, সুবিন্যস্ত আসবাবপত্র এবং মৃদু কথোপকথনের আবহে স্থানটি বাইরের কোলাহল থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন এক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। ঈশিতা একটি নিরিবিলি টেবিল নির্বাচন করে বসে পড়ল এবং এক কাপ কফির আদেশ দিল।

অর্ডার দেওয়ার পর সে নীরবে অপেক্ষা করতে লাগল।

হঠাৎ অনুভব করল, কেউ তার বোরকার কাপড়ে টান দিচ্ছে।

আকস্মিক স্পর্শে সে কিছুটা বিস্মিত হলো। তবে মাথা তুলে তাকানোর আগেই কানে ভেসে এল এক পরিচিত অথচ বিরক্তিকর কণ্ঠস্বর—

— ওই বোরকাওয়ালি ম্যাডাম! ঠিক করে বসতে পারেন না নাকি?

কণ্ঠস্বরটি শ্রবণমাত্রই ঈশিতা যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।

এই স্বর তার অচেনা নয়। সকালের সেই অনভিপ্রেত ঘটনার স্মৃতি মুহূর্তেই তার মানসপটে পুনরুজ্জীবিত হলো। ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকাতেই সে দেখতে পেল, তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই একই যুবক—যে সকালে তাকে মোটরবাইক দিয়ে ধাক্কা দেওয়ার পর উল্টো চড় মেরেছিল।

যুবকটিকে চিনতে পারলেও ঈশিতার পক্ষে তার প্রকৃত পরিচয় জানা সম্ভব হলো না। কারণ, এর আগে কখনো তাকে সে দেখেনি। তবুও সকালের ঘটনার স্মৃতি তার মনে এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে, মুখের অবয়ব ও কণ্ঠস্বর চিনতে তার কোনো অসুবিধা হলো না।

অপ্রস্তুত পরিস্থিতিতে সে দ্রুত বলে উঠল,

— সরি, সরি, ভাইয়া! এক্সট্রিমলি সরি। আমি বুঝতে পারিনি যে আমার বোরকাটা এভাবে এলোমেলো হয়ে আছে।

যুবকটি আর কোনো উত্তর দিল না। নির্বিকার ভঙ্গিতে ঈশিতার কাছ থেকে দূরে একটি চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়ল।

অদ্ভুত এক অস্বস্তি ঈশিতাকে ঘিরে ধরল। একই টেবিলের দুই পাশে মুখোমুখি বসে থাকা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে যেন অদৃশ্য এক বিরূপতার প্রাচীর দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঈশিতা মনে মনে প্রার্থনা করল, যেন দ্রুত কফি এসে যায় এবং সে এখান থেকে চলে যেতে পারে।

কিছুক্ষণ পর ওয়েটার এগিয়ে এল।

— ম্যাম, আপনার কফি।

ঈশিতা কাপটি হাতে নিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে ধন্যবাদ জানাল। তারপর নীরবে কফি পান করতে শুরু করল।

কিন্তু তার শান্তিপূর্ণ অবস্থান বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।

আবারও সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর—

— ও বোরকাওয়ালি ম্যাডাম! কফিটা খেয়ে নিন, নইলে ঠান্ডা হয়ে যাবে যে!

যুবকের পরিহাসমিশ্রিত কথায় ঈশিতা বিরক্ত হলো। তবুও কোনো প্রতিবাদ না করে সে কফিতে শেষ চুমুক দিল, বিল পরিশোধ করল এবং রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াল।

কিন্তু দরজার কাছাকাছি পৌঁছানোর সময় আকস্মিকভাবে তার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেল। সামনের দিকে হেলে পড়ার মুহূর্তে সে অনুভব করল, কেউ একজন তাকে ধরে ফেলেছে।

একটি দুর্ঘটনা এড়াতে সক্ষম হওয়ার পর ঈশিতা ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকাল।

সেই যুবকই তাকে সামলে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।

অপ্রত্যাশিত সহায়তায় ঈশিতা কয়েক মুহূর্ত নির্বাক হয়ে রইল। তারপর কৃতজ্ঞতার স্বরে বলল,

— থ্যাঙ্ক ইউ, ভাইয়া। আমাকে এভাবে সাহায্য করার জন্য।

কিন্তু তার বাক্য সমাপ্ত হওয়ার অব্যবহিত পরেই যুবকটি পুনরায় তার গালে চড় মারল।

আকস্মিক আঘাতে ঈশিতা কেঁপে উঠল। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু আর সংবরণ করা সম্ভব হলো না; কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তার গাল বেয়ে।

যুবকটি ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠল,

— ঠিক করে চলাফেরা করতে পারো না? চোখে দেখতে পাও না, নাকি ইচ্ছা করেই মানুষের গায়ে পড়ো?

ঈশিতা কোনো প্রত্যুত্তর দিল না।

প্রতিবাদ করার মতো অসংখ্য কথা তার মনে জমা হলেও অপমান ও বিস্ময়ের অভিঘাতে সে যেন বাক্‌শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। সকালের ঘটনার পর আবারও একই আচরণের সম্মুখীন হওয়া তার কাছে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য বলে মনে হলো।

কোনো কথা না বলেই সে দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে এল।

বাইরের পরিবেশ তখনও পূর্বের মতোই স্বাভাবিক। পথচারীদের পদচারণা, যানবাহনের শব্দ কিংবা মানুষের দৈনন্দিন ব্যস্ততার কোথাও তার ব্যক্তিগত অপমানের কোনো প্রতিফলন নেই। অথচ তার অন্তর্জগতে তখন যেন এক তীব্র আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছে।

চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু মুছে নিয়ে সে বাড়ির পথে অগ্রসর হলো।

---

বাড়িতে পৌঁছে ঈশিতা কারও সঙ্গে কথা না বলেই সোজা নিজের কক্ষে প্রবেশ করল। অতঃপর দরজা বন্ধ করে বিছানার পাশে বসে পড়ল।

দিনভর ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো তার মনে একের পর এক ফিরে আসতে লাগল। সকালে বিদ্যালয়ের সামনে দুর্ঘটনা, অকারণে চড় খাওয়া, বিকেলে রেস্তোরাঁয় পুনরায় সেই যুবকের সম্মুখীন হওয়া এবং এবারও অপমানিত হয়ে ফিরে আসা—সবকিছু মিলিয়ে তার মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল।

সে বুঝতে পারছিল না, অপরিচিত মানুষটির এমন আচরণের প্রকৃত কারণ কী। কেনই বা সে বারবার তাকে অপমান করছে? সাহায্য করার পরও কেন এমন নিষ্ঠুর ব্যবহার?

এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর তার কাছে ছিল না।

কিছুক্ষণ পর মুঠোফোনটি হাতে নিয়ে সে নিহাদের কথোপকথনের পরিসর খুলল। প্রিয় মানুষটির সঙ্গে কথা বলার আকাঙ্ক্ষা তখন তার মনে প্রবল হয়ে উঠেছে। এতক্ষণ ধরে সংবরণ করে রাখা অভিমান ও কষ্ট যেন অবশেষে একটি নির্ভরযোগ্য আশ্রয় খুঁজে পেল।

নিহাদের বার্তা দেখে সে প্রত্যুত্তর দিল এবং পরপর ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনার বিবরণ জানাল। সকালের দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁর অপমানজনক পরিস্থিতি—কোনো কিছুই গোপন করল না।

ঈশিতার কথাগুলো পড়ে নিহাদ উপলব্ধি করল, সেই অপরিচিত যুবকের প্রতি তার প্রেয়সীর ক্ষোভ কতটা গভীর। তবে সে তৎক্ষণাৎ কোনো মন্তব্য করল না। বরং ঈশিতার মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে শান্তভাবে তার কথা শুনতে থাকল।

কিছুক্ষণ পর নিহাদ লিখল—

‘ওই মেহু, একটা কথা বলব?’

ঈশিতা উত্তর দিল—

‘হুম, নিশ্চয়ই বলো।’

‘আমি জানি না তুমি কী মনে করবে, তবে কাল আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই।’

বার্তাটি পড়ে ঈশিতা কিছুটা বিস্মিত হলো। সে কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে উত্তর দিল—

‘কাল কীভাবে? কাল তো আমার স্কুল নেই, তবে রাতে টিউশন আছে।’

নিহাদ লিখল—

‘শোনো মেহু, আমি তোমাকে একটা ঠিকানা দিচ্ছি। তুমি কাল টিউশন শেষে সেখানে আসবে। দরকার হলে কোনো বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে এসো, কিন্তু তোমাকে আসতেই হবে।’

ঈশিতা কিছুক্ষণ নীরব থেকে উত্তর দিল—

‘ঠিক আছে, অচেনা আইডির মালিক।’

‘হুম। কাল তাড়াতাড়ি আসার চেষ্টা করবে, কেমন?’

‘হুম, চেষ্টা করব। চিন্তা করো না, প্রেম পুরুষ।’

‘ঠিক আছে, মেহু জান।’

এরপর দীর্ঘ সময় ধরে চলল তাদের কথোপকথন। অভিমান, স্নেহ, খুনসুটি আর নানান দৈনন্দিন বিষয়ের মধ্য দিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা অতিবাহিত হয়ে গেল। ঈশিতার মনও ধীরে ধীরে কিছুটা হালকা হয়ে উঠল।

কথোপকথনের একপর্যায়ে রাত গভীর হলে সে ফোনটি রেখে নিচতলায় নেমে এল। সেখানে ঈশান তাকে দেখে প্রশ্ন করল,

— ওই বনু, তোর পড়াশোনা কেমন হচ্ছে?

ঈশিতা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিল,

— আই থিংক, গুড!

ঈশান তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। এরপর ঈশিতা খাবার গ্রহণ করে পুনরায় নিজের কক্ষে ফিরে এল।

রাতের নীরবতা তখন ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। জানালার বাইরে অন্ধকারের বিস্তার, দূর থেকে ভেসে আসা বিচ্ছিন্ন শব্দ আর ঘরের মৃদু আলোকচ্ছটার মধ্যে সে আবারও মুঠোফোনের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল।

কিছুক্ষণ পর নিহাদের বার্তা এল।

ঈশিতা উত্তর দিল—

‘ওয়ালাইকুমুস সালাম, প্রেম পুরুষ।’

নিহাদ জানতে চাইল—

‘কী করছ, মেহু?’

ঈশিতা লিখল—

‘এই পৃথিবীর কোনো এক প্রান্ত থেকে তোমার কথা ভাবছিলাম। বলো?’

নিহাদের প্রত্যুত্তরে ফুটে উঠল মৃদু স্নেহের আভাস। এভাবেই রাতের দীর্ঘ প্রহর অতিক্রম করে তাদের কথোপকথন চলতে থাকল।

অবশেষে রাত প্রায় আড়াইটার দিকে ঈশিতার মা তার পড়াশোনার সুবিধার্থে মুঠোফোনটি নিজের কাছে রেখে দিলেন। বাধ্য হয়ে কথোপকথনের সমাপ্তি ঘটিয়ে ঈশিতা শয্যাশায়ী হলো।

তবে ঘুমিয়ে পড়ার আগে তার মনে বারবার ফিরে এল নিহাদের সঙ্গে পরদিন দেখা করার প্রসঙ্গটি।

অচেনা সেই মানুষটির সঙ্গে এত দিনের ভার্চুয়াল পরিচয়ের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সামনাসামনি সাক্ষাৎ—ভাবনাটি তার মনে এক অদ্ভুত কৌতূহলের জন্ম দিল।

---

পরদিন প্রভাতের আলোয় আবারও জেগে উঠল নতুন দিনের পৃথিবী। ফজরের নামাজ আদায় করে ঈশিতা কিছুক্ষণ নিজের প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করল। ঘড়ির কাঁটা যখন সকাল ৯টা ৫০ মিনিট নির্দেশ করছে, তখন সে নিজের প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য আলমারির সামনে এসে দাঁড়াল।

আজ তার গন্তব্য শপিং মল।

নিহাদের সঙ্গে সাক্ষাতের পূর্বে তার জন্য কিছু উপহার কেনার পরিকল্পনা করেছে ঈশিতা। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে একটি কালো বোরকা ও হিজাব পরিধান করে সে নিজেকে পরিপাটি করে নিল। অতঃপর প্রয়োজনীয় অর্থ ও মুঠোফোন সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।

সড়কের পাশে এসে একটি রিকশায় উঠল সে। শহরের পরিচিত পথ অতিক্রম করতে করতে তার মনে বারবার ভেসে উঠছিল সেই মানুষটির কথা, যার সঙ্গে এত দিন ধরে কথোপকথন হলেও মুখোমুখি পরিচয় এখনো অধরা।

অবশেষে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে রিকশা থেকে নেমে শপিং মলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল ঈশিতা।

বিস্তীর্ণ বিপণিবিতানের আলোকোজ্জ্বল পরিবেশে বিভিন্ন দোকানের সারি, সুসজ্জিত পণ্যের প্রদর্শনী এবং ক্রেতাদের পদচারণায় চারপাশ মুখরিত হয়ে উঠেছে। ঈশিতা ধীরে ধীরে পুরুষদের পোশাকের একটি দোকানে প্রবেশ করল। সেখানে বেশ কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণের পর নিহাদের জন্য একটি কালো ব্র্যান্ডের শার্ট নির্বাচন করল।

এরপর ঘড়ির দোকানে গিয়ে একটি রাডো ব্র্যান্ডের হাতঘড়ি কিনল সে। উপহার দুটি যত্নসহকারে গুছিয়ে নেওয়ার পর তার মুখে ফুটে উঠল তৃপ্তির হাসি।

উপহার কেনা শেষ হলে শপিং মল থেকে বেরিয়ে সামনের একটি ফুলের দোকানে গেল ঈশিতা। বিভিন্ন বর্ণ ও প্রজাতির ফুলের সমাহারের মধ্য থেকে একটি সুদৃশ্য ফুলের তোড়া নির্বাচন করল। সবকিছু সযত্নে গুছিয়ে নিয়ে সে এবার রুহিসাদের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলো।

আজ সন্ধ্যায় সেখান থেকেই তার টিউশনে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে; বিষয়টি সে আগেই মাকে জানিয়ে রেখেছে।

রুহিসাদের বাড়িতে পৌঁছে ঈশিতা প্রথমেই বান্ধবীর জন্য কেনা উপন্যাসটি বের করল। রুহিসা তাকে হঠাৎ সামনে দেখে বিস্মিত হলেও পরক্ষণেই আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল।

— আরে, তুই! হঠাৎ করে এসেছিস যে!

ঈশিতা হেসে বলল,

— কেন, তোর বাড়িতে আসতে কি অনুমতি নিতে হবে?

— তা নয়। কিন্তু আগে জানালে তো ভালো লাগত!

— আচ্ছা, পরের বার জানিয়ে আসব।

দুজনের মধ্যে কিছুক্ষণ হালকা কথোপকথন চলল। এরপর ঈশিতা রুহিসার কক্ষে প্রবেশ করল। দরজা বন্ধ করে বিছানার পাশে বসতেই রুহিসা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

— এবার বল, কী হয়েছে? তোর মুখ দেখে মনে হচ্ছে, অনেক কথা জমে আছে।

ঈশিতা মৃদু হেসে বান্ধবীর দিকে তাকাল।

— তোকে অনেক কিছু বলার আছে।

এরপর সে নিহাদের সঙ্গে পরিচয়, তাদের দীর্ঘদিনের বার্তালাপ, পরদিন দেখা করার পরিকল্পনা এবং নিহাদের জন্য কেনা উপহারগুলোর কথা একে একে জানাতে শুরু করল।

রুহিসা মনোযোগ দিয়ে সব শুনছিল। কখনো বিস্মিত হচ্ছিল, কখনো হাসছিল, আবার কখনো বন্ধুর অনুভূতির গভীরতা উপলব্ধি করে নীরবে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকছিল।

ঈশিতার কাছে রুহিসা কেবল একজন বান্ধবী নয়; বরং এমন একজন বিশ্বাসভাজন, যার কাছে নিজের মনের কথা নির্দ্বিধায় প্রকাশ করা যায়।

তাই বহুদিন ধরে অন্তরে সঞ্চিত অনুভূতিগুলো উজাড় করে বলতে পেরে তার মনও কিছুটা হালকা হয়ে উঠল।

---

সময়ের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহে কেটে গেল আরও আটটি ঘণ্টা।

টিউশন শেষে ঈশিতা যখন নির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করল, তখন দিনের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে সন্ধ্যার আবহে রূপান্তরিত হচ্ছে। পশ্চিমাকাশে সূর্যের অবশিষ্ট আভা ক্রমশ ম্লান হয়ে আসছে; নগরীর ব্যস্ত সড়কগুলোতে জ্বলে উঠেছে কৃত্রিম আলোর সারি।

মুঠোফোনে সংরক্ষিত ঠিকানাটির দিকে আরেকবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিল ঈশিতা।

তার অন্তরে তখন একই সঙ্গে কাজ করছে কৌতূহল, উৎকণ্ঠা ও এক অনির্বচনীয় প্রত্যাশা।

আজ কি অবশেষে সে দেখতে পাবে সেই মানুষটিকে, যার সঙ্গে এত দিনের পরিচয় অথচ মুখচ্ছবি এখনো অদেখা?

নিহাদ চৌধুরী—তার অচেনা আইডির আড়ালে থাকা সেই পরিচিত মানুষটি—কেমন হবে?

প্রশ্নগুলোর উত্তর তখনও অজানা।

কিন্তু ঈশিতা জানত, আর কয়েকটি মুহূর্তের ব্যবধানেই হয়তো তার দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে।

আর সেই প্রতীক্ষার অন্তিম প্রান্তেই অপেক্ষা করছিল এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

চলবে ইনশাল্লাহ
পর্ব -৭

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 6 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন