# প্রেম আমার
# পর্ব -৭

সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছে গেল ঈশিতা ও রুহিশা। মূলত তাদের টিউশনির জায়গার কাছেই ক্যাফেটি অবস্থিত, তাই সেখানে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগল না।
ক্যাফের দরজায় পা রাখতেই আচমকা ঝরে পড়ল কয়েকটি লাল গোলাপের পাপড়ি। মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল ঈশিতা। বিস্ময়ে তার চোখ দুটো বড় হয়ে এল। চারদিকে তাকিয়ে দেখল, গোটা ক্যাফেটি একেবারে ফাঁকা। কোথাও কারও উপস্থিতি নেই। তবে কি তারা ভুল জায়গায় চলে এসেছে?
মনের মধ্যে একরাশ প্রশ্ন নিয়ে ধীরে ধীরে ভেতরে এগিয়ে গেল সে।
কী অপূর্ব সাজসজ্জা! মৃদু আলোয় সজ্জিত গোটা ক্যাফেটি যেন কোনো এক স্বপ্নের রাজ্য। প্রতিটি কোণে যত্নের ছোঁয়া, টেবিলজুড়ে গোলাপের পাপড়ি, আর চারদিকে ছড়িয়ে থাকা এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ। দেখে মনে হচ্ছে, কেউ নিজের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে সাজিয়েছে এই জায়গাটুকু।
ঈশিতা মুগ্ধ চোখে চারপাশটা পরখ করতে করতে হঠাৎই লক্ষ করল, ক্যাফের এক কোণে কেউ একজন বসে আছে। মৃদু আলোর আড়ালে তার মুখটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।
কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে কী যেন একটা ভেবে মৃদু স্বরে ডেকে উঠল ঈশিতা—
“প্রেমপুরুষ!”
শব্দটা যেন বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই চারপাশে ভেসে উঠল এক অচেনা সুর। মৃদু সেই সুর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল গোটা ক্যাফেতে। ঈশিতা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল সেদিকে।
“নীল অন্ধকার প্রেম বারে বার,
এই বুকে ঢেউ তোলে বাঁধা।
ভাঙা সুখ, লাজে রাঙা বুক,
তোলে স্বপ্নেরই মেলা...
প্রেম আমার, ওহ...
প্রেম আমার...”
সুরের প্রতিটি শব্দ যেন ঈশিতার হৃদয়ের গভীরে গিয়ে স্পর্শ করছিল। কিন্তু পরক্ষণেই গান গাওয়া মানুষটির কণ্ঠস্বর চিনতে পেরে থমকে গেল সে।
এ যে তার চেনা কণ্ঠ!
এ যে তার হৃদয়ের সবচেয়ে আপন মানুষটির কণ্ঠস্বর!
নিহাদ!
হ্যাঁ, এ তো তার নিহাদ ভাই!
ধীরে ধীরে নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল নিহাদ। হাতে একটি লাল গোলাপ নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এল ঈশিতার দিকে। তার চোখে ছিল একরাশ মুগ্ধতা, ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। ঈশিতার সামনে এসে খুব যত্ন করে তার কানের পাশে একটি গোলাপ গুঁজে দিল সে।
তারপর ঈশিতার কানের কাছে মুখটা সামান্য ঝুঁকিয়ে গভীর, আবেগমাখা কণ্ঠে বলে উঠল—
“তোমাকে ভালোবাসি, ঈশিতা। কোনো শর্তে নয়, কোনো হিসাবের খাতায় তোমার নাম লিখে নয়। ভালোবাসি ঠিক সেইভাবে, যেভাবে আকাশ ভালোবাসে তার অসংখ্য তারাকে, যেভাবে নদী ছুটে চলে তার আপন গন্তব্যের দিকে।
আমার এই বেপরোয়া, অগোছালো জীবনে তুমি যেন একটুকরো শান্তির ঠিকানা। আমি চাই, তোমার হাসির কারণ হতে, তোমার অভিমানের দিনে তোমার কাছে ফিরে আসতে, তোমার প্রতিটি আনন্দের মুহূর্তে পাশে থাকতে। হয়তো আমি সব সময় নিখুঁত মানুষ হয়ে উঠতে পারব না, হয়তো কখনো ভুল করব, তোমাকে কষ্টও দিয়ে ফেলব। কিন্তু তোমাকে ভালো রাখার চেষ্টায় কোনো দিনও পিছিয়ে থাকব না।
আমার প্রতিটি গল্পের নায়িকা হয়ে, আমার সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়ে, আমার অসম্পূর্ণ জীবনটাকে পূর্ণতা দেবে?
বলো না, মেহু! এই বেপরোয়া ছেলেটার অর্ধাঙ্গিনী হয়ে, তার অসমাপ্ত গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়টা হবে?
সারাজীবনের জন্য আমার হাতটা ধরবে?”
কথাগুলো শেষ হতেই ঈশিতা ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকাল নিহাদের দিকে।
কিন্তু পরক্ষণেই তার মুখের সমস্ত হাসি যেন মুহূর্তে মিলিয়ে গেল।
চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে হঠাৎই অতীতের সেই ভয়াবহ স্মৃতি মনে পড়ে গেল তার। সেই দুর্ঘটনা, সেই মুহূর্ত, আর সেই মানুষটি—যার সঙ্গে তার জীবনের এক দুঃসহ স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে।
ঈশিতার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সে এক পা পিছিয়ে গিয়ে বিস্মিত, কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল—
“কে আপনি?”
নিহাদ থমকে গেল।
ঈশিতা অবিশ্বাসের চোখে তার দিকে তাকিয়ে আবারও বলে উঠল—
“আপনি নিহাদ ভাই হতেই পারেন না! কোনো দিনও না! আমার নিহাদ ভাই আমাকে এভাবে কখনো মারতেই পারে না। তিনি তো আমাকে ভালোবাসেন... তাহলে আপনি কে?”
কথাগুলো বলতে বলতে ঈশিতার কণ্ঠস্বর ভেঙে এল। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুগুলো একে একে গড়িয়ে পড়তে লাগল।
“আমার নিহাদ ভাই কোথায়? বলুন না, আমার নিহাদ ভাই কোথায়? তাঁকে নিয়ে আসুন... প্লিজ!”
ঈশিতার প্রতিটি প্রশ্ন যেন নিহাদের বুকের ভেতর তীক্ষ্ণ বেদনার মতো বিঁধছিল। যে মেয়েটির মুখে সে এতক্ষণ নিজের জন্য ভালোবাসার স্বীকৃতি শোনার স্বপ্ন দেখছিল, সেই মেয়েটিই এখন তাকে চিনতে পারছে না—অথচ তার চোখের জল মুছে দেওয়ার মানুষটিও সে নিজেই।
নিহাদ ধীরে ধীরে ঈশিতার কাছে এগিয়ে এল। খুব আলতো করে তার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠল—
“আমার দিকে তাকাও, ঈশিতা। ভালো করে তাকাও। আমি তোমার নিহাদ ভাই। আমিই তোমার প্রেমপুরুষ, তোমার সেই পাগলটা, যে তোমাকে ছাড়া নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনাও করতে পারে না। বিশ্বাস করো, মেহু... আমি তোমার নিহাদ।”
কথাগুলো বলার সময় নিহাদের চোখেও জমে উঠেছিল অনুশোচনার ছায়া।
“প্লিজ, ঈশিতা, আমাকে ক্ষমা করে দাও। সেদিনের জন্য... সেদিন আমি নিজের রাগ সামলাতে পারিনি। রাগের মাথায় তোমার গায়ে হাত তুলেছিলাম। জানি, শুধু সরি বললেই সেই কষ্ট মুছে যাবে না। জানি, আমার ভুলের জন্য তোমার মনে যে আঘাত লেগেছে, তার দায় আমারই।
কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য আমি সত্যিই অনুতপ্ত। তুমি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত তোমার। শুধু একবার আমার কথাগুলো শোনো, মেহু... প্লিজ!”
নিহাদের কণ্ঠে ছিল অনুতাপ, চোখে ছিল ক্ষমা পাওয়ার আকুলতা। সে জানত, ভালোবাসার দাবি করলেই ভালোবাসার মানুষের কাছে ক্ষমা চাওয়া যায় না; সেই অধিকার ফিরে পেতে হয় নিজের কাজের মাধ্যমে।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে ধীরে ধীরে ঈশিতার কাছ থেকে দূরে সরে গেল।
তারপর ক্যাফের অন্য প্রান্তে রাখা একটি বড় বুকেটের সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল নিহাদ। বুকেটির ভেতরে সাজানো রয়েছে ছাব্বিশটি উপন্যাসের বই। বইগুলোর ওপর ছড়িয়ে আছে গোলাপের পাপড়ি, আর তার মাঝখানে রাখা একটি ছোট্ট চিরকুট।
ঈশিতা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল।
নিহাদ মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে শিশুসুলভ আবদারে বলে উঠল—
“বউ হবে, বউ... মেহু, বলো না, বউ হবে?”
একটু থেমে আবারও বলতে শুরু করল সে—
“নিহাদ চৌধুরীর একমাত্র অর্ধাঙ্গিনী হবে? সাহেব চৌধুরীর আদরের বউমা হয়ে এই বাড়িতে আসবে? আমার মায়ের অভিমানের সঙ্গী হবে, তাঁর মুখের হাসির কারণ হবে?
বলো না, মেহু... হবে?
আমার একাকিত্বের একমাত্র ঠিকানা হবে? আমার সব গল্পের শেষ পাতায় তোমার নাম লিখতে দেবে
আমি তোমাকে শুধু আমার স্ত্রী হিসেবে চাই না, ঈশিতা। আমি চাই, তুমি আমার সর্ব প্রথম ও সর্ব শেষ ঠিকানা হয়ে থেকো
বলো না, মেহু... আমার একান্ত ঠিকানা হবে?”
নিহাদের কথাগুলো শুনে ঈশিতা আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। তার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা অশ্রু। তবে সেই অশ্রুর ভেতরে ঠিক কতটা অভিমান, কতটা ভালোবাসা আর কতটা পুরোনো কষ্ট মিশে ছিল, তা হয়তো সে নিজেও জানত না।
ঠিক তখনই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রুহিশা আর চুপ করে থাকতে পারল না।
হালকা হাসি মুখে এনে সে বলে উঠল—
“ও ইস্যু, রাজি হয়ে যা না! আমার জিজু এতক্ষণ ধরে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। আর কত কষ্ট দিবি মানুষটাকে?”
রুহিশার কথা শুনে ঈশিতা একবার তার দিকে তাকাল। তারপর আবারও চোখ ফেরাল নিহাদের দিকে।
সামনে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা মানুষটিকে দেখে তার মনে পড়ে গেল কত শত মুহূর্ত, কত অভিমান, কত না-বলা কথা। মানুষটি তার জীবনের সবচেয়ে আপনজন, অথচ সেই মানুষটির কাছ থেকেই সে একদিন গভীর কষ্ট পেয়েছিল। ভালোবাসা আছে বলেই কি সব কষ্ট এক মুহূর্তে ভুলে যাওয়া যায়?
হয়তো যায় না।
তবু ভালোবাসা কখনো কখনো নতুন করে শুরু করার সাহস জোগায়। আর ক্ষমা মানেই সব ভুলে যাওয়া নয়; কখনো কখনো তা দুজন মানুষের একসঙ্গে ভালো হয়ে ওঠার প্রথম পদক্ষেপ।
ঈশিতা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল নিহাদের দিকে।
তারপর অশ্রুভেজা চোখে মৃদু হেসে বলল—
“হুম, প্রেমপুরুষ... আমি তোমার অর্ধাঙ্গিনী হব। তোমার সুখ-দুঃখের সঙ্গী হব, তোমার একাকিত্বের পাশে দাঁড়াব। তবে একটা কথা মনে রেখো, নিহাদ ভাই... ভালোবাসার সঙ্গে বিশ্বাসটাও খুব জরুরি। আমি চাই, আমাদের সম্পর্কটা এমন হোক, যেখানে অভিমান থাকবে, মান-অভিমান থাকবে, কিন্তু একে অপরকে কষ্ট দিয়ে নয়—একে অপরকে বুঝে আমরা সবকিছু ঠিক করে নেব।
আমি তোমার পাশে থাকতে চাই। তোমার সঙ্গে জীবনের প্রতিটি ঋতু দেখতে চাই। কথা দিলাম, তোমার হাত ধরে সুন্দর একটা ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করব।”
ঈশিতার মুখে সম্মতি শুনে নিহাদের চোখেমুখে যেন এক মুহূর্তে হাজারটা প্রদীপ জ্বলে উঠল।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তারপর ঈশিতার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
ঈশিতা মৃদু হেসে সেই হাতটি ধরল।
সেই মুহূর্তে মৃদু আলোয় সাজানো ক্যাফেটি যেন আরও বেশি সুন্দর হয়ে উঠল। চারদিকে গোলাপের পাপড়ি, বাতাসে মিষ্টি সুবাস, আর দুজন মানুষের চোখে এক নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
রুহিশা দূরে দাঁড়িয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। তার মনে হচ্ছিল, এতক্ষণ ধরে সাজানো এই সুন্দর মুহূর্তটি যেন সত্যিই কোনো উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে এসেছে।
সময় গড়িয়ে গেল। দেখতে দেখতে ঘড়ির কাঁটা রাত আটটার ঘরে পৌঁছে গেল।
এতক্ষণে ক্যাফের কোলাহলহীন পরিবেশে আবারও নেমে এসেছে নীরবতা। ঈশিতা চুপচাপ বসে আছে, আর তার পাশেই বসে রয়েছে নিহাদ। দুজনের মাঝখানে জমে আছে কত কথা, কত অনুভূতি, কত না-বলা প্রতিশ্রুতি।
হঠাৎই নিহাদ ঈশিতার দিকে তাকাল।
মেয়েটির মুখে শরতের আকাশের মতো এক অদ্ভুত কোমলতা। তার চোখের কোণে তখনো অশ্রুর ক্ষীণ আভাস, অথচ ঠোঁটের কোণে ফুটে রয়েছে একটুকরো লাজুক হাসি।
নিহাদ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু কণ্ঠে গেয়ে উঠল—
“কথা-কবিতায় প্রেম
জাগে হায় এ বুকে...
নেশা নেশা, এ কী নেশা চোখে,
ভুলে থাকতে পারি না তোকে...”
গান গাইতে গাইতে নিহাদের দৃষ্টি একবারের জন্যও ঈশিতার মুখ থেকে সরল না।
শরতের আকাশে তখন মেঘেদের আনাগোনা। জানালার বাইরে মৃদু বাতাসে গাছের পাতাগুলো দুলছে। সেই আকাশের সমস্ত কোমলতা যেন এসে মিশেছে ঈশিতার মুখের মায়াবী আভায়।
কী অদ্ভুত সুন্দর সেই মুখ!
নিহাদের মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য একদিকে আর তার মেহুর মুখের এই মায়াভরা হাসি অন্যদিকে। কতদিন ধরে সে এই মুহূর্তটির স্বপ্ন দেখেছে! কতবার কল্পনায় ঈশিতার হাত ধরে নিজের ভবিষ্যতের ছবি এঁকেছে!
আজ সেই স্বপ্নের একটি অংশ যেন বাস্তবের আলোয় ধরা দিয়েছে।
তবু নিহাদ জানে, আজকের এই সুন্দর মুহূর্তই তাদের গল্পের শেষ নয়। বরং এখান থেকেই শুরু হবে এক নতুন অধ্যায়—যেখানে ভালোবাসার পাশাপাশি থাকবে বিশ্বাস ফিরে পাওয়ার চেষ্টা, ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি, আর দুজন মানুষের একে অপরকে নতুন করে চিনে নেওয়ার গল্প।
ঈশিতা জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
আর নিহাদ?
সে তখনো তার মেহুর দিকে তাকিয়ে আছে।
যেন চোখের ভাষায় বলে যাচ্ছে—
“তুমি শুধু আমার ভালোবাসা নও, মেহু। তুমি আমার অসমাপ্ত গল্পের সেই অধ্যায়, যাকে ছাড়া আমার গল্প কোনো দিন পূর্ণ হবে না।”
চলবে ইনশাল্লাহ
পর্ব -৮