ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার

পর্ব 8

লেখক: আরজিনা খাতুন

#প্রেম আমার
#পর্ব – ৮

ক্যাফের নিরিবিলি পরিবেশে আজ যেন কথার ফুলঝুরি ফুটিয়েছে ঈশিতা। নিহাদের সঙ্গে রুহির পরিচয়, তাদের বন্ধুত্ব এবং নানান বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে করতেই কখন যে সময়ের কাঁটা আপন গতিতে বহুদূর এগিয়ে গিয়েছে, সে সম্পর্কে কারও বিশেষ হুঁশ ছিল না। অবশেষে দেরি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রুহি ঈশিতাকে ক্যাফেতে রেখেই বিদায় নিল।

রুহি চলে যেতেই ঈশিতার মুখাবয়বে দুশ্চিন্তার ছায়া ঘনিয়ে এল। অপরিচিত শহরের পথে একাকী বাড়ি ফেরার চিন্তায় সে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল।

“আচ্ছা, প্রেমপুরুষ! আমি এবার বাড়ি ফিরব কীভাবে?”

নিহাদ ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা টেনে তার দিকে তাকাল। অতঃপর আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল,

“কোনো চিন্তা নেই, মেহু। তোমাকে আমি পৌঁছে দেব। এতটুকু ব্যাপার নিয়ে আমার জানের এত দুশ্চিন্তা কিসের?”

ঈশিতার কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও স্পষ্ট হলো।

“কিন্তু ভাইয়া যদি জানতে পারেন, তাহলে তো ভীষণ সমস্যা হবে!”

“ঈশান জানতে পারলে কোনো সমস্যা হবে না।”

কথাটি শ্রবণমাত্র ঈশিতা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। বিস্ফারিত নয়নে নিহাদের মুখপানে তাকিয়ে সে প্রশ্ন করল,

“আপনি কী করে জানলেন আমার ভাইয়ার নাম ঈশান?”

নিহাদ যেন তার প্রশ্নে খানিকটা অবাক হলো। তারপর অত্যন্ত স্বাভাবিক কণ্ঠে উত্তর দিল,

“কেন, জানব না কেন? ও তো আমার বন্ধু। সেই ছোটবেলার দোস্ত!”

ঈশিতার বিস্ময়ের সীমা রইল না। যে মানুষটিকে নিয়ে তার হৃদয়ে এত আবেগ, সেই মানুষটির সঙ্গে তার সহোদর ভাইয়ের এত নিবিড় বন্ধুত্ব—অথচ এত দিন সে বিন্দুমাত্র আঁচও করতে পারেনি!

তবু মনের কোণে জমে থাকা আশঙ্কাটুকু তাকে স্বস্তি দিল না।

“কিন্তু ভাইয়া যদি আমাদের সম্পর্কের কথা জানতে পারেন, তাহলে কখনোই মেনে নেবেন না।”

নিহাদ এবার তার দিকে খানিকটা ঝুঁকে আশ্বাসের সুরে বলল,

“তুমি এত কিছু ভেবো না, মেহু। তোমার পাশে তোমার প্রেমপুরুষ রয়েছে। আমি থাকতে তোমার এত চিন্তা কিসের?”

কথোপকথনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে দুজনে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে এল। পথের দিকে এগোতেই ঈশিতা অনুভব করল, কেউ একজন তার হাতখানি নিজের মুঠোয় আবদ্ধ করে রেখেছে। দৃষ্টি নামিয়ে তাকাতেই বুঝতে পারল, মানুষটি আর কেউ নয়—তার সেই দুরন্ত প্রেমপুরুষ।

“আচ্ছা, মেহু! তুমি কি আমাকে একটু শান্তিতে বাঁচতে দেবে? ইয়েস অর নো?”

নিহাদের এমন আকস্মিক প্রশ্নে ঈশিতা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল।

“আচ্ছা বাবা, সরি! সরি!”

“হুম। আর শোনো, এরপর থেকে আমার সঙ্গে রাস্তায় বেরোলে আমার হাতটা ধরে থাকবে। বুঝেছ?”

কথাটির মধ্যে এমন এক অদ্ভুত অধিকারবোধ ছিল যে ঈশিতার মুখে অনিচ্ছাসত্ত্বেও লজ্জার আভা ছড়িয়ে পড়ল।

গাড়ির নিকট পৌঁছে নিহাদ চালকের আসনের পাশের দরজাটি খুলে দিল।

“ওঠো, ঈশিতা।”

ঈশিতা খানিকটা ইতস্তত করে প্রশ্ন করল,

“আমি কি আপনার সঙ্গে যাব?”

“হ্যাঁ, আমার সঙ্গেই যাবে। এবার ওঠো তো!”

নিহাদের নির্দেশে ঈশিতা ধীর পায়ে গাড়িতে উঠে বসল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখল, নিহাদ সেখানে নেই। বিস্মিত হয়ে সে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। প্রায় দুই মিনিট অপেক্ষা করেও তার দেখা না পেয়ে ঈশিতা সামনের দিকে এগোতে উদ্যত হলো।

ঠিক তখনই তার দৃষ্টি আটকে গেল পরিচিত একটি অবয়বে।

নিহাদ এগিয়ে আসছে, তার দুই হাতে দুটি আইসক্রিম।

ঈশিতার চোখেমুখে বিস্ময় ফুটে উঠল।

“এগুলো কার জন্য, নিহাদ ভাই?”

“তোমার জন্য। তোমার প্রিয় আইসক্রিম, তাই না?”

ঈশিতা অবাক দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

“আপনি কী করে জানলেন?”

নিহাদ রহস্যময় হাসি হেসে উত্তর দিল,

“এমনিই জানি। তোমার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা আছে আমার।”

কথাটি বলে সে ঈশিতার আরও কাছে এগিয়ে এল। মুহূর্তের মধ্যেই ঈশিতার কোমরের কাছে হাত রেখে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল। আকস্মিক ঘটনায় ঈশিতা চমকে উঠল। নিহাদ তার কাঁধের কাছে মুখ নামিয়ে মৃদু স্বরে বলে উঠল,

“আমি সব জানি, মেহু। I know everything about you.”

ঈশিতা অপ্রস্তুত হয়ে চারপাশে তাকাল। জনসমক্ষে এমন আচরণে তার অস্বস্তি হচ্ছিল।

“ছাড়ুন! কী করছেন আপনি? এটা রাস্তা!”

নিহাদ নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিল,

“তো কী হয়েছে? আমি আমার মেহুকে একটু আদর করছি। তাতে কার কী আসে যায়?”

“প্লিজ, ছাড়ুন আমাকে।”

ঈশিতার কণ্ঠের অস্বস্তি উপলব্ধি করে নিহাদ অবশেষে তাকে ছেড়ে দিল।

“আচ্ছা, ঠিক আছে। এবার গাড়িতে ওঠো।”

ঈশিতা কোনো কথা না বলে গাড়িতে গিয়ে বসল। তার মুখে জমে রইল অভিমানের নীরবতা। নিহাদ চালকের আসনে বসে তার দিকে তাকাতেই বুঝতে পারল, মেয়েটির মন ভালো নেই।

“কী হয়েছে, মেহু? মন খারাপ কেন? কিছু হয়েছে? আমাকে বলো।”

“কিছু হয়নি। আমার আবার কী হবে? আপনি তো একেবারে অসভ্য লোক!”

কথাটি শুনে নিহাদ ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল।

“কী বললে? আমাকে অসভ্য বললে, মেহু?”

“হুম! তা ছাড়া আর কী বলব? এভাবে কেউ রাস্তাঘাটে—”

ঈশিতার কথা শেষ হওয়ার আগেই নিহাদ দুষ্টুমি মেশানো হাসি নিয়ে তার দিকে একটু ঝুঁকে পড়ল। নিজের অনভিপ্রেত আচরণে ঈশিতা আরও অস্বস্তিতে পড়ে গেল।

“এই যে, অসভ্য লোক! দূরে থাকুন। ছাড়ুন আমাকে!”

ঈশিতার আপত্তি শুনে নিহাদ নিজেকে সামলে নিয়ে সরে বসল। কয়েক মুহূর্ত গাড়ির ভেতর নীরবতা বিরাজ করল। তারপর সে গাড়ি চালু করল।

পথের দুপাশে ছুটে চলা দৃশ্যাবলির দিকে তাকিয়ে ঈশিতা মনে মনে বিড়বিড় করল,

‘ইশ্! কী অসভ্য একটা মানুষ! অথচ এই মানুষটার কাছেই আমার সমস্ত অভিমান এসে হার মেনে যায়।’

অবশেষে গাড়ি এসে নির্দিষ্ট গন্তব্যে থামল। ঈশিতা গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির দিকে পা বাড়াতেই পেছন থেকে নিহাদের কণ্ঠ ভেসে এল।

“ঈশিতা!”

নিজের নামটি শুনে সে থমকে দাঁড়াল।

এই প্রথম সামনাসামনি নিহাদের কণ্ঠে নিজের নাম শুনল সে। এত দিন যার কাছে সে কেবল মেহু, সেই মানুষটির মুখে নিজের নামটি যেন তার হৃদয়ে অন্য রকম এক অনুভূতির জন্ম দিল।

নিহাদ পুনরায় বলল,

“কাল স্কুলে যাবে কিন্তু!”

ঈশিতা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

“আচ্ছা।”

নিহাদ বিদায় জানিয়ে বলল,

“ওকে, বাই, মেহু।”

ঈশিতাও হাসিমুখে উত্তর দিল,

“হ্যাঁ, বাই, প্রেমপুরুষ।”

বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতেই ঈশিতা দেখতে পেল, তার মা ও ভাইয়া বসে রয়েছেন। তাদের এভাবে একসঙ্গে বসে থাকতে দেখে সে মনে মনে বিস্মিত হলো।

‘ভাইয়া এখন এখানে কেন?’

তার হাতে তখনও সেই বইগুলো, যেগুলো নিহাদ তাকে দিয়েছে।

ঈশান বোনের হাতে এতগুলো বই দেখে প্রশ্ন করল,

“এই ঈশিতা, তোর হাতে এত বই কোথা থেকে এল?”

প্রশ্ন শুনে ঈশিতা কিছুটা ঘাবড়ে গেল।

“আসলে... মা, আমার এক বন্ধু দিয়েছে।”

কথাটি বলেই সে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাল।

কিন্তু ঈশান যেন সবই জানে—এমন নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

“হুম, আমি জানি। ওগুলো তোকে তোর বন্ধু রুহি দিয়েছে।”

ভাইয়ের এমন অপ্রত্যাশিত সহযোগিতায় ঈশিতা মনে মনে অবাক হয়ে গেল। সে আর কোনো প্রশ্ন না করে নিজের ঘরে চলে এল।

ঘরের দরজা বন্ধ করে বইগুলো নিয়ে এগিয়ে গেল নিজের ছোট্ট উপন্যাসের সংগ্রহশালার দিকে। আলাদা করে রাখা বইয়ের তাকে আগে থেকেই চৌদ্দটি উপন্যাস সাজানো ছিল। আজ সেখানে নতুন করে আরও ছাব্বিশটি বই যুক্ত হলো।

মুহূর্তের মধ্যে ঈশিতার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আনন্দে।

একজন উপন্যাসপ্রেমী পাঠিকার কাছে প্রিয় বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া যে কতখানি আনন্দের, তা কেবল তার মতো বইপাগল মানুষই উপলব্ধি করতে পারে। যত্ন করে বইগুলো সাজিয়ে রেখে সে মনে মনে ভাবল, এই ছোট্ট সংগ্রহ একদিন আরও সমৃদ্ধ হবে।

অতঃপর সে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এশার নামাজ আদায় করল। নামাজ শেষে পড়তে বসে গেল।

---

রাত তখন ১০টা ৩৯ মিনিট।

ঈশিতা খাবারের থালাটি হাতে নিয়ে ঈশানের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। ভাইয়ের ঘরে প্রবেশ করতে গিয়েই হঠাৎ তার পা থমকে গেল।

ভেতর থেকে ভেসে আসছে পরিচিত একটি কণ্ঠস্বর।

নিহাদ!

ঈশিতা দরজার আড়াল থেকে লক্ষ করল, তার ভাই নিহাদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলছে। মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত বিস্ময় বুঝি আজ তার ভাগ্যেই লেখা হয়েছে।

কোনো কথা না বলে সে ঘরে প্রবেশ করল এবং খাবারটি ঈশানের শয্যার পাশের ছোট্ট টেবিলে রেখে ফিরে যেতে উদ্যত হলো।

ঠিক তখনই মুঠোফোনের ওপাশ থেকে নিহাদের কণ্ঠ শোনা গেল,

“আমার মেহু এসেছিল বুঝি?”

ঈশান অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,

“তুই কী করে বুঝলি?”

নিহাদের কণ্ঠে ফুটে উঠল গভীর আত্মবিশ্বাস।

“তোর বোনের নিশ্বাস পর্যন্ত অনুভব করতে পারি আমি। সেখানে ওর হাঁটাচলা কিংবা পোশাকের শব্দ চিনতে পারা তো অতি সাধারণ ব্যাপার!”

ঈশান মৃদু হেসে বলল,

“তাই নাকি? এত ভালোবাসা কোথায় রাখিস, দোস্ত?”

নিহাদ এক মুহূর্তও দেরি করল না। নিজের বুকের বাঁ দিকে হাত রেখে বলল,

“আরে, এখানে! বুঝলি?”

দুই বন্ধুর কথোপকথনের প্রতিটি শব্দ ঈশিতার কর্ণগোচর হলো। সে আর দাঁড়াল না। নিঃশব্দে নিজের ঘরে ফিরে এল।

ঘরের নির্জনতায় বসে তার মনজুড়ে জন্ম নিল এক অদ্ভুত অনুভূতি। একদিকে নিহাদের ভালোবাসার গভীরতা তাকে আপ্লুত করে, অন্যদিকে ভাইয়ের সঙ্গে নিহাদের বন্ধুত্ব তাদের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে মনে অজানা আশঙ্কা জাগায়।

সে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল,

‘এ কেমন ভালোবাসা, আল্লাহ? মানুষটাকে যত জানছি, ততই যেন তার মায়ায় জড়িয়ে পড়ছি। কিন্তু আমাদের এই ভালোবাসা কি কখনো পূর্ণতা পাবে? নাকি কোনো একদিন পরিস্থিতির কাছে হার মেনে নিতে হবে আমাদের?’

প্রশ্নগুলোর উত্তর তার জানা নেই। তবু হৃদয়ের গহিনে সে একটিই প্রার্থনা সযত্নে লালন করে—যে মানুষটিকে সে নিজের প্রেমপুরুষ বলে মেনে নিয়েছে, ভাগ্য যেন তাকেই তার জীবনের শেষ ঠিকানা করে দেয়।

কিছুক্ষণ পর মুঠোফোনের পর্দায় নিহাদের বার্তা ভেসে উঠল। ঈশিতা তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল।

নিহাদ: আসসালামু আলাইকুম, মেহু।

ঈশিতা: ওয়ালাইকুমুস সালাম।

নিহাদ: কী করছ?

ঈশিতা: বসে আছি। তুমি?

নিহাদ: তোমার ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলছিলাম। বলো, খাওয়াদাওয়া হয়েছে?

ঈশিতা: হুম, হয়েছে।

নিহাদ: ওকে, বাই, মেহু। আজ তোমাকে খুব একটা সময় দিতে পারব না। দুঃখিত, আমার একটু কাজ আছে।

ঈশিতা: ওকে, বাই।

নিহাদ: এই মেহু, প্লিজ রাগ করো না।

ঈশিতা: না, না। আমি রাগ করিনি।

নিহাদ: গুড গার্ল। এবার ঘুমিয়ে পড়ো। নিজের যত্ন নিও।

ঈশিতা বার্তাটি পড়ে মৃদু হাসল। তার অভিমান বেশিক্ষণ স্থায়ী হওয়ার কথা নয়। কেননা, যে মানুষটির একটি ছোট্ট বার্তাতেই তার সমস্ত মন খারাপ মিলিয়ে যায়, তার প্রতি রাগ পুষে রাখার সাধ্যই বা কতটুকু?

---

ভোর ৫টা ২০ মিনিট।

শরতের ভোর যেন স্নিগ্ধতার এক অপরূপ উপাখ্যান রচনা করে চলেছে। আকাশের বিস্তৃত নীলিমায় তখনও রাত্রির শেষ প্রহরের গাঢ় ছায়া লেগে রয়েছে। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো ভোরের ক্ষীণ আলোয় মুক্তোর মতো ঝলমল করছে। দূর দিগন্তে সাদা কাশফুলের সারি মৃদুমন্দ বাতাসের দোলায় দুলে দুলে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যকে আরও মনোহর করে তুলেছে।

পাখিদের মধুর কলতান আর শীতল বাতাসের পরশে চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে এক অপার্থিব প্রশান্তি।

অথচ এই শান্ত প্রকৃতির আড়ালেই এক কিশোরীর হৃদয়ে দানা বেঁধেছে এক গভীর প্রেমের অনুভব। তার সমস্ত চিন্তা, সমস্ত কল্পনা আর প্রতিটি নিঃশব্দ প্রার্থনার কেন্দ্রবিন্দুতে আজ একজনই মানুষ—নিহাদ চৌধুরী, তার প্রিয় প্রেমপুরুষ।

ঈশিতা নামাজে বসে একান্ত নিবেদনে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করল। তার প্রার্থনার প্রতিটি শব্দে মিশে রইল নিহাদের প্রতি গভীর মমতা, তার কল্যাণকামনা এবং তাদের সম্পর্কের পবিত্র পরিণতির আকাঙ্ক্ষা।

কত শত প্রার্থনা যে সে করেছে, তার হিসাব একমাত্র আল্লাহই জানেন। পৃথিবীর আর কেউ নয়।

নামাজ শেষে ফ্রেশ হয়ে এক কাপ কফি হাতে নিয়ে সে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল। শরতের মেঘলা আকাশ যেন বিশাল এক নীলচে চাদরে সমগ্র শহরকে আবৃত করে রেখেছে। চারদিকে কুয়াশার আবছায়া, বাতাসে শিশিরস্নাত শীতলতা।

কফির কাপে চুমুক দিয়ে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে ঈশিতা মৃদু স্বরে বিড়বিড় করল,

‘ভালোবাসি, প্রেমপুরুষ। ভীষণ ভালোবাসি আপনাকে।’

তার কণ্ঠস্বর বাতাসে মিলিয়ে গেল। কিন্তু হৃদয়ের গহিনে উচ্চারিত সেই স্বীকারোক্তি যেন আরও গভীরভাবে শিকড় গেড়ে বসল।

সময়ের স্রোত আপন গতিতে এগিয়ে চলল।

সকাল সাড়ে নয়টা।

স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ঈশিতা। পরনে শুভ্র বোরকা, কাঁধে স্কুলব্যাগ। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসতেই মায়ের কণ্ঠে তার পদক্ষেপ থমকে গেল।

“ঈশিতা, আজ স্কুলে না গেলে হয় না?”

ঈশিতা মায়ের দিকে ফিরে তাকাল।

“কিন্তু মা, আজ তো আমার প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস আছে।”

ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে ঈশান বলে উঠল,

“হুম, মা। ঈশিতার আজ প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস আছে।”

ভাইয়ের মুখে কথাটি শুনে ঈশিতা বিস্ময়ে তার দিকে তাকাল।

‘ভাইয়া তো জানেই না আজ আমার প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস আছে! তাহলে এমনভাবে বলল কেন?’

তার মনে অজানা এক আশঙ্কা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। গত রাতের ঘটনাগুলো একে একে স্মৃতিতে ভেসে উঠল—নিহাদের সঙ্গে ঈশানের ভিডিও কল, বইগুলো নিয়ে ভাইয়ের অস্বাভাবিক নির্লিপ্ততা, আর আজ সকালে মায়ের এমন আকস্মিক প্রশ্ন।

সবকিছুর মধ্যে যেন কোথাও একটি অদৃশ্য যোগসূত্র লুকিয়ে রয়েছে।

কিন্তু সেই যোগসূত্রটি ঠিক কী, তা সে বুঝে উঠতে পারল না।

“এই বনু, চলবে নাকি?”

ঈশানের ডাকে ঈশিতার ভাবনার জগতে ছেদ পড়ল।

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, চলো।”

ঈশান দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ঈশিতা তার পিছু পিছু হাঁটতে লাগল।

শরতের সেই মায়াবী সকালে প্রকৃতি ছিল শান্ত, স্নিগ্ধ ও মনোরম। অথচ ঈশিতার হৃদয়ে তখন অজস্র প্রশ্নের আনাগোনা।

সে জানত না, আসন্ন দিনগুলো তার জীবনে কোন নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে। জানত না, তার প্রেমপুরুষকে ঘিরে থাকা রহস্যের পর্দা কখন উন্মোচিত হবে।

শুধু এটুকুই জানত—নিহাদ চৌধুরী নামের মানুষটি ধীরে ধীরে তার হৃদয়ের এমন এক স্থানে অধিষ্ঠিত হয়েছে, যেখান থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়ার কথা কল্পনা করাও তার পক্ষে অসম্ভব।

আর এই ভালোবাসার পরিণতি কী হবে, সেই উত্তর সময়ের কাছেই তোলা রইল।

চলবে ইনশাল্লাহ
পর্ব -৯

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 8 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন