ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার

পর্ব 10

লেখক: আরজিনা খাতুন

#প্রেম আমার
#পর্ব - ১০

টোটোটি রাস্তার একপাশে এসে থামল। ঈশিতা চালকের দিকে দৃষ্টিপাত করে মৃদু কণ্ঠে বলল,

— মামা, টোটোটা থামান। আমি এখানে নামব।

চালক তার নির্দেশমতো টোটো থামিয়ে দিলেন। ঈশিতা নেমে ভাড়ার কথা জিজ্ঞাসা করল,

— মামা, কত হয়েছে?

— দশ টাকা, মামুনি।

ঈশিতা নিজের ব্যাগের দিকে তাকিয়ে কিছুটা ইতস্তত করে বলল,

— মামা, আমার কাছে তো খুচরো টাকা নেই। আপনি কি ভাঙতি দিতে পারবেন?

চালক মাথা নেড়ে জানালেন,

— না, মামুনি। এই মুহূর্তে আমার কাছেও ভাঙতি নেই।

ঈশিতা আর কোনো দ্বিধা না করে ব্যাগ থেকে একশো টাকার একটি নোট বের করে তাঁর হাতে দিয়ে বলল,

— মামা, আপনি এই একশো টাকাটাই রেখে দিন। আপনাকে আর ফেরত দিতে হবে না।

কথাটি শুনে লোকটির মুখমণ্ডলে বিস্ময় ও কৃতজ্ঞতার আভা ফুটে উঠল। তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বললেন,

— সত্যি বলছি, মামুনি, তুমি খুব ভালো মেয়ে। আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন। তোমার জীবনটা সুখে ভরে উঠুক।

ঈশিতা মৃদু হাসল।

— হুম, মামা। আমার জন্য দোয়া করবেন।

কথা শেষ করে সে টিউশনির স্থানের দিকে পদক্ষেপ বাড়াল। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই পেছন থেকে লোকটির কণ্ঠস্বর ভেসে এল,

— মামুনি, শোনো! টাকাটা নিয়ে যাও কিন্তু!

ঈশিতা পেছন ফিরে তাকিয়ে স্নিগ্ধ কণ্ঠে উত্তর দিল,

— না, না, মামা। আপনি রেখে দিন।

এরপর আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সে পুনরায় নিজের গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলল।

ঠিক সেই মুহূর্তেই পরিচিত একটি কণ্ঠস্বর তার পদক্ষেপে ছেদ টানল।

— মেহু!

কণ্ঠস্বরটি কর্ণগোচর হতেই ঈশিতা যেন আকস্মিক বিস্ময়ে থমকে দাঁড়াল। এই স্বর তার হৃদয়ের অন্দরমহলে কতখানি পরিচিত, তা নতুন করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই।

সে দ্রুত পেছন ফিরে তাকাল। সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে তার সেই প্রেমপুরুষ—নিহাদ চৌধুরী।

ঈশিতার কণ্ঠে বিস্ময়ের আভাস ফুটে উঠল।

— আপনি! আপনি এখানে?

নিহাদ ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টেনে উত্তর দিল,

— তোমাকে দেখতে এসেছিলাম।

— ওহ!

ঈশিতা আর কোনো কথা খুঁজে পেল না। অথচ তার চোখের ভাষায় তখন একরাশ বিস্ময়, আনন্দ ও অনুচ্চারিত অভিমান একাকার হয়ে রয়েছে।

কিছুক্ষণ পর সে বলল,

— আচ্ছা, প্রেমপুরুষ, আমি তাহলে চললাম। বেশ?

নিহাদ সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল।

— হুম, যাও। তবে টিউশন শেষ করে এখানেই এসে দাঁড়াবে।

ঈশিতা মৃদু হেসে বলল,

— আচ্ছা, নিষ্ঠুর পুরুষ!

নিহাদ আর কোনো উত্তর দিল না। শুধু তার দিকে একবার তাকিয়ে রইল। তারপর ঈশিতা নিজের গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হলো, আর নিহাদের দৃষ্টি অনুসরণ করল তার চলে যাওয়ার পথ।

---

প্রায় দুই ঘণ্টা অতিবাহিত হলো।

টিউশনির পাঠ শেষ করে ঈশিতা যখন বাইরে বেরিয়ে এল, তখন তার দৃষ্টি স্বভাবতই আশপাশে নিহাদকে খুঁজতে লাগল। কিছুটা দূরেই পরিচিত মুখটি চোখে পড়ল। নিহাদ তখনও তার প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।

ঈশিতা কাছে এসে প্রশ্ন করল,

— আপনি এখানে কেন? বাড়ি যাননি?

নিহাদ স্বাভাবিক কণ্ঠে উত্তর দিল,

— না। আমিও একটা টিউশনিতে গিয়েছিলাম। ভাবলাম, তোমাকে সঙ্গে করে বাড়ি পৌঁছে দিই।

কথাটি বলে সে ঈশিতার হাতে হেলমেটটি তুলে দিল। তারপর বাইকের আসনে বসে তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— ওঠো, মেহু।

ঈশিতা মৃদু স্বরে উত্তর দিল,

— হুম, প্রেমপুরুষ।

সে বাইকে উঠে বসতেই নিহাদ যত্নসহকারে তার মাথায় হেলমেটটি পরিয়ে দিল। ছোট্ট এই যত্নটুকুর মধ্যে নিহাদের যে স্বভাবসিদ্ধ মমতা লুকিয়ে রয়েছে, তা ঈশিতার কাছে নতুন নয়; বরং এই সামান্য আচরণগুলোর মধ্যেই সে বারবার নিজের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান পায়।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইকটি তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলল।

শরতের রাতগুলো বড় মায়াময়। রাত্রির নীলিমায় পূর্ণিমার চাঁদ যেন তার সমস্ত রৌপ্যাভ আভা ছড়িয়ে দিয়ে পৃথিবীকে এক অপার্থিব স্নিগ্ধতায় আচ্ছন্ন করে রেখেছে। শুভ্র মেঘের খণ্ডগুলো ধীরলয়ে চন্দ্রালোকের পাশ দিয়ে ভেসে চলেছে—কখনো চাঁদের মুখ আড়াল করছে, আবার কখনো লুকোচুরি শেষে তাকে পুনরায় উন্মুক্ত করে দিচ্ছে।

দূরবর্তী কাশবনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদুমন্দ বাতাসে কাশফুলের শুভ্র শিরাগুলো দুলে উঠছে। কোথাও শিউলির মাদকতাময় সুবাস বাতাসের সঙ্গে মিশে রাত্রির পরিবেশকে আরও স্নিগ্ধ করে তুলেছে। চারপাশের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে মাঝেমধ্যে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক, আর বৃক্ষপত্রের মর্মরধ্বনি যেন প্রকৃতির নিজস্ব কোনো গোপন সংগীত।

মনে হয়, শরতের এই নিশীথিনী কোনো অদৃশ্য লেখকের হাতে রচিত এক অসমাপ্ত প্রেমকাব্য—যার প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে মিশে রয়েছে জোছনা, নিস্তব্ধতা, মায়া আর কিছু অনির্বচনীয় অনুভূতি।

বাইকটি একসময় থামল।

ঈশিতা নেমে চারপাশে দৃষ্টিপাত করল। অপরিচিত পরিবেশ দেখে তার কপালে বিস্ময়ের ভাঁজ পড়ল।

— প্রেমপুরুষ, এটা কোথায় নিয়ে এলেন আমাকে?

নিহাদ বাইকটি যথাস্থানে রেখে তার দিকে তাকাল।

— যেখানে নিয়ে যাচ্ছি, চলো।

ঈশিতা আর প্রশ্ন করল না। নিহাদের পাশে পাশে হাঁটতে শুরু করল। কিছু দূর অতিক্রম করার পর তারা এসে উপস্থিত হলো একটি ছোট্ট চায়ের দোকানের সামনে।

দোকানটি খুব আড়ম্বরপূর্ণ নয়; তবু তার চারপাশের শরৎকালীন সৌন্দর্য, স্নিগ্ধ রাতের আবেশ আর দূরের কাশবনের শুভ্রতা মিলে স্থানটিকে এক স্বতন্ত্র মাধুর্য দান করেছে। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন নিজের সৌন্দর্যের সামান্য অংশ এই সাধারণ চায়ের দোকানটির সঙ্গেও ভাগ করে নিয়েছে।

নিহাদ একটি নির্দিষ্ট স্থানের দিকে ইঙ্গিত করে বলল,

— ঈশিতা, এখানে বসো। আমি একটু আসছি।

ঈশিতা সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বসে পড়ল।

প্রায় পাঁচ মিনিট পর নিহাদ ফিরে এল। তার হাতে দুটি চায়ের কাপ এবং দুই প্যাকেট প্রজাপতি বিস্কুট।

সে ঈশিতার সামনে এসে এক কাপ চা এগিয়ে দিয়ে বলল,

— এই নাও, ঈশিতা। ধরো।

ঈশিতা চায়ের কাপটি হাতে নিল। শরতের মায়াবী রজনীতে পাশাপাশি বসে দুটি মানুষ চায়ের উষ্ণতায় নিজেদের ক্ষুদ্র অথচ মূল্যবান মুহূর্তগুলোকে উপভোগ করতে লাগল। মাঝেমধ্যে একজনের দৃষ্টি অন্যজনের চোখে গিয়ে নিবদ্ধ হচ্ছিল। সেই দৃষ্টিপাতে ছিল না কোনো উচ্চকিত ঘোষণা, ছিল না অনুভূতির দীর্ঘ ব্যাখ্যা—ছিল কেবল একে অপরের সান্নিধ্যে থাকার নীরব প্রশান্তি।

দুজনের সামনে রাখা চায়ের কাপ থেকে ধীরে ধীরে ধোঁয়া উঠছিল। আর তাদের মাঝখানে সময় যেন নিজের গতিকে কিছুক্ষণের জন্য মন্থর করে দিয়েছিল।

কিছুক্ষণ পর নিহাদ বলল,

— চলো।

ঈশিতা কাপটি যথাস্থানে রেখে উঠে দাঁড়াল।

— হুম, মেহু, চলো।

এরপর তারা পুনরায় নিজেদের গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হলো।

প্রায় এক ঘণ্টা পর ঈশিতা এসে পৌঁছাল নিজেদের বাড়ির সামনে। রাত তখন আনুমানিক সাড়ে নয়টা। বাড়ির বাইরে বিশেষ কোনো কোলাহল নেই; চারপাশও বেশ নিস্তব্ধ।

ঈশিতা নিহাদের দিকে তাকিয়ে বিদায় জানাল। তারপর বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করার জন্য এগিয়ে গেল।

কিন্তু হঠাৎই ঈশানের কণ্ঠস্বর কানে আসতেই সে পেছন ফিরে তাকাল।

— ওই বনু! এতক্ষণ কোথায় ছিলি?

ঈশিতা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিল,

— ভাইয়া, দুটো টিউশন ছিল। তাই একটু দেরি হয়ে গেছে।

বস্তুত, সোমবার ঈশিতাদের দুটি টিউশন থাকায় তার দেরি করে বাড়ি ফেরাটা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। ঈশানও বিষয়টি নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন তুলল না।

নিজের ঘরে প্রবেশ করে ঈশিতা পোশাক পরিবর্তন করল। একটি কালো সালোয়ার-কামিজ পরে নিজেকে কিছুটা পরিপাটি করে নিল। তারপর সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে মায়ের কাছে এসে বলল,

— আম্মু, ভাত দাও।

ফাহিমা বিবি তখন রান্নাঘরের কাজে ব্যস্ত। মেয়ের কথা শুনে তিনি বললেন,

— হুম, ঈশিতা। একটু অপেক্ষা কর। তোর ভাইয়ার এক বন্ধু আসবে। ওরা আসুক, তারপর তোদের খেতে দিচ্ছি।

ঈশিতা কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করল,

— কেন, আম্মু?

মা কাজ করতে করতেই উত্তর দিলেন,

— তোর ভাইয়ার বন্ধুর আব্বু-আম্মু কয়েক দিনের জন্য দেশের বাইরে যাবেন। তাই ছেলেটা এই কয়েক দিন আমাদের বাড়িতে থাকবে।

— ওকে, আম্মু।

এরপর ঈশিতা প্রায় বিশ মিনিট ধরে মাকে রান্নার কাজে সাহায্য করল। কখনো প্রয়োজনীয় জিনিস এগিয়ে দিল, কখনো অন্য কাজে হাত লাগাল। ঘরোয়া ব্যস্ততার মধ্যেই সময় গড়িয়ে যাচ্ছিল।

সহসা কলিংবেলের শব্দ শোনা গেল।

ঈশিতা মনে মনে ভাবল, হয়তো ঈশান এসেছে। কিন্তু পরক্ষণেই মায়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এল,

— ঈশিতা, যা তো মা, দরজাটা খুলে দে।

— হুম, মা। যাচ্ছি।

ঈশিতা দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে সেটি খুলল। আর দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা পরিচিত মুখটি দেখামাত্রই সে বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে গেল।

নিহাদ!

তার প্রেমপুরুষ!

ঈশিতা যেন মুহূর্তের জন্য নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারল না। যে মানুষটিকে কিছুক্ষণ আগেই বিদায় জানিয়ে এসেছে, সেই মানুষটিই এখন তাদের বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছে!

তার বিস্ময় অবশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। পেছন থেকে ঈশানের কণ্ঠস্বর ভেসে এল,

— বনু, দেখ! এ আমার বন্ধু। ওর যত্ন নিস, কেমন?

ঈশিতা আমতা আমতা করে উত্তর দিল,

— হুম, ওকে, ভাইয়া।

কথাটি বললেও তার মনের ভেতর তখন এক অদ্ভুত আলোড়ন চলছে। ঈশান যে নিজের বন্ধুকে বাড়িতে নিয়ে আসবে, আর সেই বন্ধুটি যে তার প্রেমপুরুষ নিহাদ হবে—এমন অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না।

ঈশান মাকে উদ্দেশ করে বলল,

— মা, খেতে দাও। নিহাদের খুব খিদে পেয়েছে।

তারপর নিহাদের কানের কাছে মুখ নিয়ে চাপা স্বরে বলে উঠল,

— কী রে, শ্বশুরবাড়ি কেমন লাগছে, ভাই?

নিহাদও সুযোগ ছাড়ল না। মৃদু স্বরে জবাব দিল,

— তোর বোনটাকে আমার করে দে। তাহলে শ্বশুরবাড়ি একেবারে বেস্ট লাগবে, জানোয়ার!

ঈশান ঠোঁটের কোণে হাসি চেপে রাখল। বন্ধুর কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে তার বিশেষ অসুবিধা হলো না।

এদিকে ফাহিমা বিবি স্নেহমিশ্রিত কণ্ঠে বললেন,

— নিহাদ, এসো বাবা। বসো।

নিহাদ বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিল,

— হুম, আন্টি। বসছি।

এরপর পরিবারের সকলে একসঙ্গে খেতে বসল। কিন্তু ঈশিতা প্রায় আধঘণ্টা আগেই নিজের ঘরে চলে গিয়েছে; এতক্ষণেও তার আর দেখা নেই।

ফাহিমা বিবি ঈশানকে বললেন,

— ঈশান, যা তো, তোর বনুকে ডেকে নিয়ে আয়।

— হুম, মা। যাচ্ছি।

ঈশান উঠে দাঁড়াতেই নিহাদ তাকে থামিয়ে বলল,

— এই ঈশান, শোন না। আমি একটু ওয়াশরুমে যাব।

কথাটি শুনে ঈশান পেছন ফিরে বন্ধুর দিকে তাকাল। তার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক রহস্যময় হাসি। হয়তো সে ইতিমধ্যেই বন্ধুর অভিপ্রায় কিছুটা আঁচ করতে পেরেছে।

— হুম, চল।

দুজন একসঙ্গে ঈশিতার ঘরের সামনে এসে উপস্থিত হলো।

নিহাদ ঈশানকে বলল,

— ঈশান, তুই যা। আমি ঈশিতাকে নিয়ে আসছি।

ঈশান মৃদু হেসে সম্মতি জানাল।

— হুম, যাচ্ছি।

ঈশান চলে যাওয়ার পর নিহাদ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকবার কড়া নাড়ল। প্রায় তিন মিনিট পর দরজাটি খুলে গেল।

আর দরজার ওপারে ঈশিতাকে দেখে নিহাদের মুখে মুহূর্তেই মুগ্ধতার হাসি ফুটে উঠল।

— হায় হায়! আমার বউটাকে কী সুন্দর লাগছে!

বস্তুত, ঈশিতা এইমাত্র গোসল সেরে বেরিয়েছে। তার পরনে নীল রঙের একটি সালোয়ার-কামিজ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চুল শুকানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল সে, ঠিক সেই সময়েই নিহাদের আবির্ভাব।

অপ্রত্যাশিতভাবে তাকে সামনে দেখে ঈশিতা কিছুটা বিরক্তির ভান করে বলল,

— ও বউ, মেহু! কী হয়েছে? আমি এসেছি, তুমি খুশি নও?

নিহাদ মৃদু হাসল।

— হুম, প্রেমপুরুষ। খুব, খুব খুশি। তবে—

— তবে কী?

নিহাদ এবার কণ্ঠস্বর কিছুটা নিচু করে বলল,

— ভাইয়া যদি কিছু বুঝতে পারে, তখন?

ঈশিতা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দিল,

— তোমার ভাইয়া কিছুই বুঝতে পারবে না।

কথাটি বলেই সে যেন নিজের অবস্থানের প্রতি আরও নিশ্চিত হয়ে উঠল। কিন্তু নিহাদ আর দূরত্ব বজায় রাখল না। ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এসে ঈশিতার কোমর আলতোভাবে জড়িয়ে ধরল এবং তাকে নিজের নিকটে টেনে নিল।

তার কণ্ঠে এবার খুনসুটির পরিবর্তে ফুটে উঠল গভীর স্নেহের আকুতি।

— ও মেহু, আমাকে ভালোবাসো? বলো না, মেহু।

ঈশিতা লজ্জামিশ্রিত কণ্ঠে উত্তর দিল,

— হুম, ভালোবাসি, প্রেমপুরুষ। ভালোবাসি আপনাকে।

নিহাদের মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। ঈশিতা অবশ্য পরক্ষণেই চারপাশের কথা স্মরণ করে তাকে সতর্ক করল,

— আবার ছাড়ুন। কেউ চলে আসবে।

নিহাদ মৃদু হেসে তাকে ছেড়ে দিল।

— হুম, যাচ্ছি। তবে রাত দেড়টার মধ্যে ছাদে চলে আসবে।

ঈশিতা তার দিকে তাকিয়ে রইল। নিহাদ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, কিন্তু তার বলা শেষ কথাটি ঈশিতার মনে রয়ে গেল।

---

রাত তখন দেড়টা।

সারাদিনের ক্লান্তি ঈশিতার শরীর ও মনে গভীর অবসাদ এনে দিয়েছে। চোখের পাতায় ঘুমের ভার, শরীরজুড়ে বিশ্রামের আকুতি। তবু নিহাদের সঙ্গে দেখা করার কথা মনে পড়তেই সে ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে উঠে বসল।

ঘড়ির কাঁটার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে অবশেষে ছাদের উদ্দেশে এগিয়ে গেল সে।

বাইরে তখন শরতের এক গভীর নিশীথিনী। নির্মল নীল আকাশের বুকে পূর্ণচন্দ্র নিঃশব্দে আলো ছড়িয়ে রয়েছে। তার রৌপ্যাভ জ্যোৎস্নায় ছাদের প্রতিটি কোণ যেন এক অলৌকিক স্নিগ্ধতায় স্নাত। দূরের কাশবন মৃদুমন্দ বাতাসের স্পর্শে ধীরে ধীরে দুলছে; জোছনার আলোয় শুভ্র কাশফুলগুলোকে মনে হচ্ছে রাতের অন্ধকারে জ্বলে থাকা অসংখ্য ক্ষুদ্র প্রদীপ।

বাতাসে ভেসে আসছে সদ্যফোটা শিউলির কোমল সুবাস। চারপাশের নিস্তব্ধতা এমন নিবিড় যে মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল এই মুহূর্তে বহুদূরে কোথাও হারিয়ে গেছে।

ঈশিতা ছাদে এসে চারদিকে দৃষ্টিপাত করল। প্রথমে কোথাও নিহাদকে দেখতে পেল না। কিন্তু হঠাৎই ছাদের এক কোণে একটি অবয়ব চোখে পড়তেই সে বিস্ময়ে থমকে দাঁড়াল।

ঠিক সেই মুহূর্তে তার কর্ণকুহরে ভেসে এল এক মধুর, পরিচিত কণ্ঠস্বর। কণ্ঠটির সুরে বৃষ্টির আবেশ, মনের কথা প্রকাশ করার আকুলতা আর ভালোবাসার কোমল অনুরণন মিশে রয়েছে।—যেখানে প্রিয় মানুষটির আগমনে দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যাওয়া এবং হৃদয়ের সমস্ত না-বলা কথা তার কাছে উজাড় করে দেওয়ার অনুভূতি সুরের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছিল।

সেই কণ্ঠস্বর ঈশিতার হৃদয় ছুঁয়ে গেল।

সে আর স্থির থাকতে পারল না। ধীরে ধীরে নিহাদের দিকে এগিয়ে গেল।

নিহাদও তার উপস্থিতি টের পেয়ে মুখ তুলে তাকাল। ঈশিতাকে সামনে দেখেই তার চোখে ফুটে উঠল স্নিগ্ধ হাসি। পরম মমতায় সে ঈশিতাকে নিজের নিকটে টেনে নিল, যেন দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে তার সমস্ত প্রশান্তি ফিরে এসেছে।

শরতের সেই মায়াবী নিশীথে দুটি হৃদয় আবারও একে অপরের সান্নিধ্যে আশ্রয় খুঁজে নিল। ঈশিতা নিহাদের কাঁধে মাথা রাখল। সারাদিনের ক্লান্তি, সমস্ত ব্যস্ততা আর মনের গোপন অস্থিরতা যেন ধীরে ধীরে প্রশমিত হয়ে এল। নিহাদও তাকে যত্ন করে আগলে রাখল—যেন এই ছোট্ট মুহূর্তটুকুকে পৃথিবীর সমস্ত ব্যস্ততা থেকে আড়াল করে রাখতে চায়।

কিছুক্ষণ পর ঈশিতা আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু কণ্ঠে প্রশ্ন করল,

— আচ্ছা, প্রেমপুরুষ, ওখানে কিছু দেখতে পাচ্ছেন?

নিহাদও আকাশের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। তারপর অত্যন্ত গম্ভীর হওয়ার ভান করে উত্তর দিল,

— হুম, পাচ্ছি তো। একটা কম দামি চাঁদ।

কথাটি শুনে ঈশিতা তৎক্ষণাৎ তার কাঁধ থেকে মাথা তুলে বিস্ময় ও অভিমানের সুরে বলল,

— ইস্! কী বলছেন এসব? চাঁদ আবার কম দামি হয় নাকি?

নিহাদ এবার তার দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমিমাখা হাসি ফুটিয়ে বলল,

— দামি চাঁদ তো আমার কাঁধের ওপর মাথা রেখে বসে আছে।

কথাটি শুনে ঈশিতা আর কোনো উত্তর খুঁজে পেল না। তার মুখে লজ্জামিশ্রিত হাসি ফুটে উঠল। সে আবারও নিহাদের কাঁধে মাথা রাখল, যেন এই মানুষটির কাছেই তার সমস্ত অভিমান, লজ্জা আর ভালোবাসার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।

কিছুক্ষণ অন্তর নিহাদ ঈশিতার মুখের দিকে তাকাচ্ছিল। ধীরে ধীরে মেয়েটির চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। সারাদিনের ক্লান্তি আর রাতের স্নিগ্ধ প্রশান্তির কাছে অবশেষে হার মানল তার জেগে থাকার সমস্ত চেষ্টা।

ঈশিতা নিঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়ল নিহাদের কাঁধে মাথা রেখে।

নিহাদ তার দিকে তাকিয়ে রইল। মুখে কোনো কথা নেই, অথচ দৃষ্টিতে জমে রয়েছে গভীর মমতা। সে আরও যত্নে ঈশিতাকে আগলে রাখল, যেন সামান্যতম অস্বস্তিও তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে।

শরতের চাঁদ তখনও আকাশে জেগে আছে। কাশবনের ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে চলেছে, শিউলির সুবাস ভেসে আসছে দূর থেকে। আর ছাদের এক নির্জন কোণে নিহাদ নীরবে আগলে রেখেছে তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে।

কখনো কখনো ভালোবাসার গভীরতা প্রকাশের জন্য দীর্ঘ প্রতিশ্রুতির প্রয়োজন হয় না। প্রিয় মানুষটির ক্লান্ত মাথাটুকু নিজের কাঁধে আশ্রয় দেওয়া, তার ঘুমন্ত মুখের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা, কিংবা সমস্ত পৃথিবীর কোলাহলের মাঝেও তাকে নিঃশব্দে আগলে রাখার মধ্যেই ভালোবাসার সবচেয়ে কোমল প্রকাশ লুকিয়ে থাকে।

সেই নিশীথে ঈশিতা নিজের শান্তির আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল নিহাদের কাঁধে। আর নিহাদ—সে যেন নিজের সমগ্র পৃথিবীটাকেই বুকে ধারণ করে বসে ছিল।

জোছনামাখা শরতের রাতটি নিঃশব্দে সাক্ষী হয়ে রইল তাদের এই ছোট্ট অথচ গভীর মুহূর্তের—যেখানে কোনো আড়ম্বর নেই, কোনো উচ্চকিত ঘোষণা নেই; আছে কেবল দুটি হৃদয়ের সান্নিধ্য, মায়া আর অনুচ্চারিত ভালোবাসা।

চলবে ইনশাল্লাহ
পর্ব -১১

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 10 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন