#প্রেম আমার
#পর্ব - ১২

উজ্জ্বল শরতের এক মনোরম প্রভাত। নীল আকাশের বিস্তীর্ণ ক্যানভাসে সাদা তুলোর মতো মেঘের আনাগোনা। কোমল সূর্যালোকের স্নিগ্ধ পরশে প্রকৃতির প্রতিটি অনুষঙ্গ যেন নবসৌন্দর্যে উদ্ভাসিত। বাতাসের মৃদুমন্দ প্রবাহে দুলছে শুভ্র কাশফুলের সারি, সবুজ ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো সূর্যের আলোয় হীরকখণ্ডের মতো ঝলমল করছে। বৃক্ষের পত্রপল্লবের ফাঁক গলে মাটিতে এসে পড়ছে আলোর চিকন রেখা, আর দূর থেকে ভেসে আসছে পাখিদের কিচিরমিচির। প্রকৃতির এই নির্মল, সজীব ও মায়াবী সৌন্দর্যে শরতের সকালটি যেন এক অপার্থিব মাধুর্যে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এমনই এক মনোরম প্রভাতের বুকে নিজেদের নির্দিষ্ট গন্তব্যের উদ্দেশে ব্যস্ত দুই প্রেমের ফুল—নিহাদ ও ঈশিতা। তাদের যাত্রাপথে শরতের স্নিগ্ধতা যেমন ছায়া ফেলেছে, তেমনই দুজনের কথোপকথনের অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে ভালোবাসার চিরচেনা মান-অভিমান, মৃদু পরিহাস আর একে অপরকে হারিয়ে ফেলার অজ্ঞাত আশঙ্কা।
বাইকের পেছনে বসে ঈশিতা নিহাদের পিঠের দিকে তাকিয়ে ক্ষণকাল নীরব রইল। অতঃপর হঠাৎই প্রশ্ন করে বসল,
— আচ্ছা, প্রেমপুরুষ! আপনি আমাকে কখনো ছেড়ে যাবেন না তো?
নিহাদ যেন এমন প্রশ্নেরই অপেক্ষায় ছিল। ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমিমাখা হাসি টেনে সে নির্বিকার কণ্ঠে উত্তর দিল,
— হুম, একশোবার যাব।
কথাটি কর্ণগোচর হতেই ঈশিতার মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তে বদলে গেল। তার কণ্ঠে অভিমান ঘনিয়ে উঠল।
— নিষ্ঠুর পুরুষ! এভাবে কেন কষ্ট দেন আমাকে?
ঈশিতার অভিমানী কণ্ঠ শুনে নিহাদ আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। মৃদু হেসে বলল,
— আরে, বউজান! কখনো ছেড়ে যাব না আপনাকে। এতটুকু বিশ্বাসও নেই আপনার আমার ওপর?
কথার ফাঁকেই বাইক এসে থামল তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলে। যাত্রার সমাপ্তি ঘটলেও ঈশিতার মনে নিহাদের কথাগুলোর রেশ তখনও রয়ে গেছে।
নিহাদ বাইক থামিয়ে পেছন ফিরে তাকাল।
— নামো, মেহু।
— হুম।
ঈশিতার সম্মতি পেয়ে নিহাদ তার মাথা থেকে হেলমেটটি খুলে দিল। তারপর নিজে স্কুলের দিকে পদক্ষেপ বাড়াল। কিন্তু কয়েক পা এগিয়েই যেন কোনো এক অদৃশ্য আকর্ষণে থেমে গেল সে। ঘাড় ফিরিয়ে আরও একবার ঈশিতার দিকে তাকাল।
তার দৃষ্টিতে ছিল নিঃশব্দ স্নেহের আভাস, যেন চোখের আড়াল হওয়ার পূর্বেও প্রিয় মানুষটিকে একবার দেখে নেওয়া তার নিত্যদিনের অভ্যাস।
— মেহু, ছুটি হওয়ার পর এখানেই থাকবে। বুঝলে?
ঈশিতা মৃদু হাসি নিয়ে উত্তর দিল,
— ওকে, নিষ্ঠুর পুরুষ!
নিহাদ আর কিছু বলল না। কেবল একবার তাকিয়ে নিয়ে পুনরায় স্কুলের দিকে এগিয়ে গেল। আর ঈশিতা তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল কয়েকটি মুহূর্ত।
---
— চল, রুহি! এই ক্লাসটা বাঙ্ক করি।
ঈশিতার প্রস্তাব শুনে রুহি বিশেষ আপত্তি করল না।
— হুম, চল, ঈশিতা।
সেদিন ইতিমধ্যে পরপর তিনটি ক্লাস করে ঈশিতা, রুহি ও সাদিয়া বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। একঘেয়ে পাঠদানের মাঝে তাদের মনোযোগও ক্রমশ শিথিল হয়ে আসছিল। ফলত, অবশিষ্ট একটি ক্লাসে অনুপস্থিত থাকার দুরভিসন্ধি নিয়ে তিন বান্ধবী নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে নিল।
তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কিছুক্ষণ স্কুলের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোর পর নিহাদদের ক্লাসরুমের দিকে অগ্রসর হলো তারা। প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থান পরিভ্রমণ করে অবশেষে গন্তব্যে পৌঁছাতেই পরিচিত একটি কণ্ঠস্বর তাদের পদক্ষেপে ছেদ টানল।
— ঈশিতা!
কণ্ঠস্বরটি শুনে ঈশিতার সমস্ত শরীর যেন মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। এই কণ্ঠস্বর তার অপরিচিত নয়; বরং এই স্বরেই তার হৃদয়ের গভীরে সুপ্ত অনুভূতিগুলো বারবার আলোড়িত হয়।
সে বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে বলল,
— আপনি এখানে, প্রেমপুরুষ?
নিহাদ ভ্রু সামান্য উঁচু করে উত্তর দিল,
— তো কোথায় থাকব? এটা আমাদের ক্লাসরুম। আচ্ছা, তোমরা এতক্ষণ কোথায় ছিলে? অনেকক্ষণ ধরে ক্লাস বাঙ্ক করেছ, তাই না?
ঈশিতা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। এত সহজে তাদের অনুপস্থিতি ধরা পড়ে যাবে, তা সে কল্পনাও করেনি।
— আপনি কী করে জানলেন?
নিহাদের কণ্ঠ এবার গম্ভীর হয়ে উঠল।
— আমি একটু আগেই তোমাদের ক্লাসে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে তোমাদের কাউকেই দেখতে পাইনি। আর দ্বিতীয়বার যেন কোনো ক্লাস বাঙ্ক করতে না দেখি।
ঈশিতা মাথা নিচু করে নীরব রইল। তার মুখে আর কোনো যুক্তি খুঁজে পাওয়া গেল না।
নিহাদ এবার তার দিকে কয়েক পা এগিয়ে এল। কণ্ঠে কঠোরতার আভাস এনে উচ্চারণ করল,
— Understood? দ্বিতীয়বার যেন এমন ঘটনা না ঘটে। এখন ক্লাসে যাও।
নিহাদের এমন গম্ভীর রূপ ঈশিতার কাছে একেবারেই অপরিচিত নয়। তবু প্রিয় মানুষটির মুখে কঠোর নির্দেশ শুনলে তার অন্তরে এক ধরনের সংকোচের সৃষ্টি হয়।
সে তৎক্ষণাৎ সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বলল,
— জি। আর ক্লাস বাঙ্ক করব না। সরি।
নিহাদ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল,
— হুম, যাও তাহলে।
ঈশিতা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে রুহি ও সাদিয়ার সঙ্গে ফিরে যাওয়ার জন্য পেছন ফিরল। কিন্তু কয়েক পা এগিয়েই তার মনে হলো, সঙ্গের দুজনের উপস্থিতি যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।
চারদিকে তাকিয়ে সাদিয়া ও রুহিকে কোথাও দেখতে পেল না সে।
মুহূর্তের মধ্যেই ঈশিতার মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল।
‘উফ্! এদের জ্বালায় বাঁচি না!’
অগত্যা একাই নিজের ক্লাসের দিকে রওনা হলো সে।
ক্লাসরুমে প্রবেশ করে দেখতে পেল, রুহি একা বসে আছে। ঈশিতাকে দেখেই সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তাকাল।
ঈশিতা তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বিরক্তির সুরে বলল,
— এই জানোয়ার! তুই আর সাদিয়া কি মাঝেমধ্যে অদৃশ্য হয়ে যাস নাকি?
রুহি এমন ভাব করল, যেন তার এই আচরণের পেছনে অত্যন্ত যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে।
— কী আর করব বল? বান্ধবী হয়ে আমি কারও মাঝে কাবাব মে হাড্ডি হতে চাই না। তাই চলে এলাম। একদিকে তাহসিন ভাইয়া সাদিয়াকে নিয়ে চলে গেলেন, অন্যদিকে তোমার বড় আমাকে চলে যেতে বললেন। এখন আমি কী করতে পারি, বল?
রুহির কথা শুনে ঈশিতা চোখ সরু করে তার দিকে তাকাল।
— হুম, হুম! বুঝেছি। আর সাফাই গাইতে হবে না।
রুহি এবার প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বলল,
— শোন, টিফিনের সময় হয়ে গেছে। চল, একটু বাইরে গিয়ে বসি।
---
ঘড়ির কাঁটা তখন দুপুর দেড়টার ঘর স্পর্শ করেছে। বিদ্যালয়ের করিডরে টিফিনের বিরতি শুরু হওয়ায় শিক্ষার্থীদের আনাগোনায় চারপাশ মুখর হয়ে উঠেছে।
ঈশিতা ও রুহি ক্লাসরুমের বাইরে একটি নিরিবিলি স্থানে গিয়ে বসল। দুজনেই নিজেদের ভাবনায় মগ্ন ছিল। ঈশিতার মনে তখনও সকালবেলার কথোপকথন, নিহাদের গম্ভীর মুখ আর তার প্রতি প্রকাশিত স্নেহের স্মৃতি ঘুরপাক খাচ্ছিল।
সহসা একটি দৃঢ় হাতের স্পর্শে সে চমকে উঠল। বিস্ময়ে মাথা উঁচু করে তাকাতেই তার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো পরিচিত মুখটির ওপর।
নিহাদ!
প্রিয় মানুষটিকে সামনে দেখে ঈশিতার মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তে বদলে গেল।
নিহাদ তাকে উদ্দেশ করে বলল,
— ঈশিতা, শোনো।
ঈশিতা মৃদু স্বরে উত্তর দিল,
— হুম, প্রেমপুরুষ। বলুন।
এরপর নিহাদ ও ঈশিতা একটি কমনরুমে গিয়ে সময় কাটাল। প্রায় ত্রিশ মিনিট ধরে দুজনের মধ্যে কথোপকথন চলল। বাইরের ব্যস্ততা থেকে দূরে সেই স্বল্প সময়টুকুতে ঈশিতার মন যেন কিছুটা প্রশান্তি খুঁজে পেল।
কিন্তু সময় যে নিঃশব্দে গড়িয়ে যাচ্ছে, তা তার খেয়ালেই ছিল না।
সহসা একটি কঠোর কণ্ঠস্বর তার চিন্তার সূত্র ছিন্ন করল।
— ঈশিতা! এসব কী হচ্ছে?
কণ্ঠস্বরটি হালিমা ম্যামের।
ঈশিতা চমকে উঠে পেছনে তাকাল। শিক্ষিকার গম্ভীর মুখাবয়ব দেখে তার অন্তরাত্মা যেন সংকুচিত হয়ে এল।
— সরি, ম্যাম। এক্সট্রিমলি সরি। তবে, ম্যাম—
কথা শেষ করার আগেই হালিমা ম্যাম তাকে থামিয়ে দিলেন।
— তবে কী? আমি নিজের চোখে দেখছি, তুমি পেছনে কারও সঙ্গে কথা বলছ। Just get out from my classroom!
কঠোর বাক্যগুলো ঈশিতার হৃদয়ে গভীর আঘাত হানল। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছে সে বরাবরই শৃঙ্খলাপরায়ণ ছাত্রী হিসেবে পরিচিত। এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন তাকে আগে কখনো হতে হয়নি। ফলে শিক্ষিকার তিরস্কার তার কাছে কেবল অপমানজনকই নয়, একই সঙ্গে অত্যন্ত বেদনাদায়ক হয়ে উঠল।
সে কোনো প্রতিবাদ করল না। নীরবে ক্লাসরুমের বাইরে এসে দাঁড়াল।
চারপাশে শিক্ষার্থীদের আনাগোনা চলছিল, অথচ ঈশিতার কাছে যেন সমস্ত পরিবেশ নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছিল। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
সহসাই তার চোখের কোণ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
— মেহু!
পরিচিত কণ্ঠস্বরটি কানে আসতেই ঈশিতা চমকে উঠল। নিহাদকে সামনে দেখে সে দ্রুত মাথা নিচু করে নিল। মনে হলো, নিজের দুর্বলতাকে তার কাছেও প্রকাশ করতে চায় না।
কিন্তু নিহাদের দৃষ্টি এড়ানো সহজ নয়।
সে ধীরে ধীরে ঈশিতার কাছে এগিয়ে এল। তারপর আলতো করে তার চোয়াল স্পর্শ করে মুখটি উঁচু করল। তার কণ্ঠে এবার আর কঠোরতার লেশমাত্র নেই; বরং সেখানে মিশে রয়েছে গভীর উদ্বেগ ও স্নেহ।
— কী হয়েছে, বউ? এভাবে কাঁদছ কেন? তুমি জানো না, তোমাকে কাঁদতে দেখলে আমার কষ্ট হয়?
ঈশিতা কোনো উত্তর দিল না। তার চোখ থেকে আবারও অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
নিহাদ আরও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল।
— বলো, মেহু। কী হয়েছে তোমার? এভাবে কাঁদছ কেন? হালিমা ম্যাম কি তোমাকে কিছু বলেছেন? আমাকে বলো।
প্রিয় মানুষটির কণ্ঠে এমন অকৃত্রিম মমতা শুনে ঈশিতার এতক্ষণকার সংযম যেন ভেঙে পড়ল। যে কষ্টটুকু সে নিজের মধ্যে চেপে রাখতে চেয়েছিল, তা আর গোপন করে রাখা সম্ভব হলো না।
সে অনুভব করল, এই মানুষটির কাছে নিজের মনের সমস্ত কথা প্রকাশ করে দেওয়া যায়। তার দুর্বলতা, তার অপমানবোধ, তার অশ্রু—সবকিছুর জন্যই যেন নিহাদের কাছে একটি নিরাপদ আশ্রয় রয়েছে।
অতঃপর সে ধীরে ধীরে মুখ খুলল।
---
প্রায় দশ মিনিট ধরে ঈশিতা নিহাদের কাছে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল। হালিমা ম্যামের তিরস্কার, ক্লাসরুম থেকে বের করে দেওয়া এবং সেই মুহূর্তে তার নিজের কেমন লেগেছিল—কিছুই আর গোপন রাখল না।
নিহাদ নীরবে তার সমস্ত কথা শুনল। তার মুখের অভিব্যক্তি ক্রমশ গম্ভীর হয়ে উঠছিল। ঈশিতার চোখের জল তার মনে যে গভীর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে, তা তার নীরব দৃষ্টিতেই স্পষ্ট হয়ে উঠল।
কিছুক্ষণ পর সে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— দেখো, ঈশিতা, আমি হয়তো এত বড় কেউ নই যে কোনো শিক্ষকের ভুল বিচার করার অধিকার নিজের হাতে তুলে নেব। কিন্তু একটা কথা তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, বউ—যার কারণে আজ তোমাকে এই অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তার এই আচরণের জবাব আমি অবশ্যই চাইব।
কথাগুলোর মধ্যে নিহাদের ক্ষোভ ও ঈশিতার প্রতি গভীর মমতা পাশাপাশি প্রকাশ পেল।
ঈশিতা তার কথা শুনে নিশ্চুপ হয়ে গেল। নিহাদের প্রতিটি শব্দের তাৎপর্য উপলব্ধি করার মতো মানসিক অবস্থা তখন তার ছিল না। তার ছোট্ট মনে কেবল একটি অনুভূতিই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল—নিহাদ তার কষ্টকে উপেক্ষা করেনি।
আর কখনো কখনো ভালোবাসার মানুষের পাশে থাকার আশ্বাসটুকুই সমস্ত দুঃখের ভার কিছুটা লাঘব করে দেয়।
---
ছুটির পূর্বে পরপর তিনটি ক্লাস শেষ করে ঈশিতা বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এসে দাঁড়াল। রুহি আজ আগেভাগেই চলে গেছে; তার টিউশনের সময় হয়ে গিয়েছিল।
অতএব, এখন সে একাই অপেক্ষা করছে নিহাদের জন্য।
শরতের বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছিল। বিদ্যালয়ের সামনে শিক্ষার্থীদের ভিড় ক্রমশ কমে যাচ্ছে। কেউ অভিভাবকের সঙ্গে বাড়ি ফিরছে, কেউ আবার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে পথের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
ঈশিতা নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। তার দৃষ্টি বারবার রাস্তার দিকে চলে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই বাইকের পরিচিত শব্দ কানে এল।
সে মাথা তুলে তাকাতেই বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল।
নিহাদের স্কুলের পোশাকে রক্তের ছোপ!
দৃশ্যটি দেখে ঈশিতার বুকের ভেতর যেন আতঙ্কের শীতল স্রোত বয়ে গেল। নিহাদ বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক প্রবেশপথ দিয়ে আসেনি; সে এসেছে অন্য দিক থেকে। তার পোশাকের এই অবস্থা দেখে ঈশিতার মনে মুহূর্তের মধ্যে অসংখ্য আশঙ্কা দানা বাঁধল।
সে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে উঠল,
— প্রেমপুরুষ!
নিহাদ বাইক থামিয়ে তার দিকে তাকাল।
— হুম, মেহু?
ঈশিতা এক পা এগিয়ে এসে তার পোশাকের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
— কী হয়েছে আপনার? এমন অবস্থা কী করে হলো?
নিহাদ বিষয়টিকে তুচ্ছ করে দেখানোর চেষ্টা করল।
— কিছু হয়নি, মেহু। টেনশন করো না।
কিন্তু ঈশিতার উদ্বেগ তাতে প্রশমিত হলো না। বরং তার কণ্ঠে এবার অভিমানের সঙ্গে রাগও মিশে গেল।
— আমি কি আপনাকে বলেছি যে কিছু হয়েছে কি না, সেটা নিজে থেকে ধরে নিতে? আমি জানতে চেয়েছি, কী হয়েছে!
নিহাদ তার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
— এই পাকা বুড়ি, চুপ করে বাইকে ওঠো!
ঈশিতা আর কথা বাড়াল না। তবে তার মনের উদ্বেগ একটুও কমল না। নীরবে বাইকে উঠে বসল সে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইক এসে থামল একটি সুবিশাল শপিং মলের সামনে।
নিহাদ তাকে নামতে বলল।
— নামো, ঈশিতা।
ঈশিতা চারপাশে তাকিয়ে বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল,
— কেন? এটা তো শপিং মল! এখানে কেন?
নিহাদের কণ্ঠে এবার স্পষ্ট নির্দেশের সুর।
— নামতে বলেছি, তাই নামবে। That’s it.
ঈশিতা আর আপত্তি করল না।
— ওকে।
এরপর দুজন একসঙ্গে শপিং মলের ভেতরে প্রবেশ করল।
---
শপিং মলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেই ঈশিতা বুঝতে পারল, নিহাদের এখানে আসার উদ্দেশ্য নেহাত সামান্য নয়। বিভিন্ন দোকানের ঝলমলে সাজসজ্জা, সারিবদ্ধ পোশাক এবং ক্রেতাদের ব্যস্ততার মধ্যে নিহাদ যেন নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে চলেছে।
প্রায় ত্রিশ মিনিট ধরে কেনাকাটা চলল।
ঈশিতার জন্য প্রায় সত্তরটি সালোয়ার-কামিজ কেনা হলো। একের পর এক পোশাক বাছাই করতে করতে নিহাদ যেন ক্লান্তির নামটিও ভুলে গেছে। ঈশিতা প্রথমদিকে অবাক হয়ে সবকিছু দেখছিল; পরে তার বিস্ময় ধীরে ধীরে বিরক্তি ও অবিশ্বাসে রূপ নিতে লাগল।
অন্যদিকে নিজের জন্যও নিহাদ কম কেনাকাটা করল না। সে প্রায় পঞ্চান্নটি ব্লু শার্ট এবং আরও প্রায় বিশটি বিভিন্ন রঙের শার্ট কিনল।
এত বিপুল পরিমাণ পোশাক কেনার পরও নিহাদের উৎসাহে কোনো ভাটা পড়ল না।
হঠাৎ সে ঈশিতাকে ডাকল,
— বউ! ও বউ!
নিহাদের কণ্ঠে এমন আকস্মিক উচ্চতা শুনে ঈশিতা চমকে তাকাল। তাকে এভাবে ডাকতে আগে কখনো দেখেনি সে। বিস্ময়মিশ্রিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে উত্তর দিল,
— হুম, বলো, বরজান।
নিহাদ নির্দেশ দিল,
— তুমি ট্রায়াল রুমে গিয়ে একটা সালোয়ার-কামিজ পরে আসো। আমি জাস্ট পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি। এখানেই থাকবে, বুঝলে?
ঈশিতা সম্মতি জানিয়ে ট্রায়াল রুমের দিকে এগিয়ে গেল।
কিন্তু নির্ধারিত পাঁচ মিনিট অতিক্রান্ত হওয়ার পরও নিহাদের দেখা মিলল না। অবশেষে প্রায় ছয় মিনিট পর সে ঈশিতার সামনে এসে দাঁড়াল।
তাকে দেখে ঈশিতার বিস্ময়ের সীমা রইল না।
নিহাদের হাতে রয়েছে প্রায় বিশ জোড়া কানের দুল এবং দশ জোড়া নূপুর। সেগুলোর মধ্যে একটি নূপুরের প্রতি তার দৃষ্টি বিশেষভাবে আটকে গেল। নকশা, কারুকার্য ও আভিজাত্যে সেটি অন্যগুলোর তুলনায় স্বতন্ত্র; স্পষ্টতই সেটির মূল্যও অনেক বেশি।
অন্যদিকে ঈশিতা নিজের পছন্দ করা সালোয়ার-কামিজটি পরে ট্রায়াল রুম থেকে বেরিয়ে এসেছে।
গাঢ় রঙের পোশাকটিতে তার সৌন্দর্য যেন আরও স্নিগ্ধ হয়ে উঠেছে। নিহাদ এক মুহূর্তের জন্য তার দিকে তাকিয়ে রইল। দৃষ্টিতে ফুটে উঠল নিঃশব্দ মুগ্ধতা।
মনে মনে উচ্চারণ করল,
‘মাশাআল্লাহ!’
ঈশিতা তার দৃষ্টির অর্থ বুঝতে না পেরে মৃদু স্বরে ডাকল,
— প্রেমপুরুষ!
নিহাদ যেন ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে এল।
— হ্যাঁ, বলো, মেহু।
ঈশিতা এবার নিজের মনের প্রশ্নটি আর চেপে রাখতে পারল না।
— এত টাকা খরচ করছেন কেন?
নিহাদ তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে উত্তর দিল,
— ভালোবেসে টাকার পরোয়া করতে নেই, মেহু। ভালোবেসে সর্ব হারাতে রাজি —সেটা হোক টাকা কিংবা জীবন।
নিহাদের কণ্ঠে উচ্চারিত কথাগুলো ঈশিতাকে মুহূর্তের জন্য নির্বাক করে দিল। তার হৃদয়ের গভীরে যেন কথাগুলো বিশেষ কোনো অনুভূতির জন্ম দিল। কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজের বিস্ময় আড়াল করে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— বাপের টাকা নষ্ট করতেই বেশ ভালো লাগে, তাই না?
কথাটি শুনে নিহাদ ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল। ঈশিতার কোমরের পাশে আলতো করে হাত রেখে তাকে নিজের সাথে আঁকড়ে নিলো । তার চোখে তখন মৃদু দুষ্টুমির আভাস
— You know, Mehu, এটা আমার পরিশ্রমের টাকা। আমি পড়াশোনার পাশাপাশি একটা বিজনেস চালাই।
কথাটি শুনে ঈশিতা স্তব্ধ হয়ে গেল।
নিহাদ পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনা করে—এমন কথা সে আগে কখনো শোনেনি। তার কাছে নিহাদকে এত দিন মূলত একজন মেধাবী, দায়িত্বশীল ও যত্নশীল মানুষ হিসেবেই মনে হয়েছে। অথচ তার জীবনের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক যে এত দিন অজানা রয়ে গেছে, তা উপলব্ধি করে ঈশিতা কিছুটা বিস্মিত হলো।
নিজের পূর্ববর্তী মন্তব্যটির কথা মনে পড়তেই তার মনে অনুশোচনার সঞ্চার হলো। সে আর কোনো কথা বলল না; নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।
নিহাদ তার মুখের পরিবর্তিত অভিব্যক্তি লক্ষ করল।
— মেহু, সরি। কিছু মনে করো না।
ঈশিতা তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়ল।
— সরি তো আমার বলার কথা। তবে আপনি—
নিহাদ তার কথা শেষ হতে দিল না।
— বাদ দাও ওসব কথা। আমি আমার মেহুর কাছে একবার কেন, হাজারবার ক্ষমা চাইতেও রাজি।
কথাটি বলার সময় নিহাদের কণ্ঠে এমন এক আন্তরিকতা ছিল, যা ঈশিতার সমস্ত অভিমানকে ক্রমশ প্রশমিত করে আনল।
কিছুক্ষণ পর নিহাদ তার কাছ থেকে সামান্য দূরে সরে দাঁড়াল। তারপর হঠাৎ হাঁটু গেড়ে ঈশিতার সামনে বসে পড়ল।
অপ্রত্যাশিত এই আচরণে ঈশিতা হতভম্ব হয়ে গেল।
নিহাদ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— ঈশিতা, পা-টা রাখো।
ঈশিতা বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল,
— কেন?
— আমি বলছি, তাই।
কিন্তু ঈশিতার মনে অস্বস্তি হচ্ছিল। অন্য কারও পায়ের ওপর নিজের পা রাখা তার কাছে কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগছিল। সে ইতস্তত করতে লাগল।
নিহাদ তার দ্বিধা লক্ষ করেও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এল না। অত্যন্ত আলতোভাবে ঈশিতার পায়ের পাতা স্পর্শ করে সেটি নিজের পায়ের ওপর স্থাপন করল।
তারপর হাতে থাকা নূপুরগুলোর মধ্য থেকে সেই বিশেষ নূপুরটি বের করল, যেটির প্রতি তার দৃষ্টি আগে থেকেই নিবদ্ধ ছিল।
নূপুরটির সূক্ষ্ম কারুকার্য আর আভিজাত্যের চেয়েও যেন বড় হয়ে উঠল সেটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নিহাদের অনুভূতি। সে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে নূপুরটি ঈশিতার পায়ে পরিয়ে দিল।
সেই ক্ষুদ্র মুহূর্তে তার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গিতে প্রকাশ পেল এক গভীর মমতা। যেন মূল্যবান অলংকারটি কেবল ঈশিতার পায়ে পরিয়ে দেওয়াই তার উদ্দেশ্য নয়; বরং নিজের সমস্ত স্নেহ, ভালোবাসা ও আন্তরিকতাকে সেই নূপুরের সঙ্গে জড়িয়ে দিতে চায় সে।
ঈশিতা নীরবে তাকিয়ে রইল নিহাদের দিকে।
তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা মানুষটি—যে কিছুক্ষণ আগেও তাকে খুনসুটিতে মাতিয়ে রেখেছিল, যে নিজের রক্তমাখা পোশাকের কথা গোপন করে তার উদ্বেগ এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল, সেই মানুষটিই এখন এমন যত্নে তার পায়ে নূপুর পরিয়ে দিচ্ছে।
ঈশিতার অন্তরে অনুভূতির এক অদ্ভুত আবেশ ঘনীভূত হলো।
বাইরে শরতের কোমল আলো তখনও শপিং মলের কাচের জানালা ভেদ করে ভেতরে এসে পড়ছে। আর সেই আলোর নিচে, ব্যস্ত পৃথিবীর কোলাহলের মাঝখানে, নিহাদ নিঃশব্দে তার ভালোবাসার আরেকটি অধ্যায় রচনা করে চলেছে।
একটি নূপুরের মৃদু ঝংকারে যেন ঈশিতার হৃদয়ের গভীরে অনুরণিত হয়ে উঠল এমন এক অনুভূতি, যার ভাষা হয়তো শব্দে সম্পূর্ণ প্রকাশ করা যায় না।
কারণ কিছু ভালোবাসা উচ্চারিত প্রতিশ্রুতির চেয়েও গভীর—তা প্রকাশ পায় ছোট ছোট যত্নে, অনুচ্চারিত অনুভূতিতে এবং প্রিয় মানুষের পায়ে পরিয়ে দেওয়া একটি নূপুরের মধ্যেও..
চলবে ইনশাল্লাহ
পর্ব - ১৩