# প্রেম আমার
# পর্ব - ১৩
সময় যাই নিজের গতিতে কেটে গেলো ২ তো মাস ।
____
নতুন বছরের প্রথম সকাল।
চারপাশ যেন অন্যরকম লাগছিল। রাতের শেষ আতশবাজির রেশ তখনও আকাশের কোথাও কোথাও মিলিয়ে যায়নি। ভোরের হালকা কুয়াশা সরিয়ে সূর্যের নরম আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল চারদিকে। পাখিদের ডাক, দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসা আজানের সুর আর শীতের সকালের মিষ্টি হাওয়া—সব মিলিয়ে দিনটার শুরুটাই যেন সুন্দর কোনো গল্পের মতো।
ঈশিতা ঘুম থেকে উঠে জানালার পর্দা সরাতেই মুখে এসে পড়ল সকালের আলো।
কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সে।
নতুন বছর।
একটা নতুন বছর মানেই তো নতুন কিছু আশা, নতুন কিছু স্বপ্ন, আর পুরোনো কিছু স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া।
হঠাৎ বিছানার পাশে রাখা ফোনটা বেজে উঠল।
ঈশিতা ফোন হাতে নিতেই একের পর এক মেসেজ চোখে পড়ল।
“Happy New Year, Eshita!”
বন্ধুদের মেসেজ দেখে মুচকি হাসল সে।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে ডাক এল—
—ঈশিতা! আর কত ঘুমাবি? নিচে আয়!
মায়ের গলা।
ঈশিতা তাড়াতাড়ি ফোনটা রেখে বলল,
—আসছি মা!
কিছুক্ষণ পর তৈরি হয়ে নিচে নামতেই দেখল, পুরো বাড়িটাই যেন উৎসবের সাজে সেজে উঠেছে। দরজার পাশে ফুলের মালা, বসার ঘরে ছোট্ট একটা সাজানো গাছ, টেবিলের ওপর নানা রকম মিষ্টি আর ফল।
ঈশিতা অবাক হয়ে বলল,
—এত আয়োজন!
মা হেসে বললেন,
—নতুন বছর বলে কথা। বছরের প্রথম দিনটা সুন্দর করে কাটাতে নেই?
ঈশিতা হেসে মায়ের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
কিছুক্ষণ পর দরজা দিয়ে ঢুকল নিহাদ।
আজ তার পরনে ছিল সাদামাটা কালো পাঞ্জাবি। হাতে কয়েকটা প্যাকেট।
ঈশিতা তাকে দেখে কিছুটা অবাক হয়ে বলল,
—আপনি এত সকালে?
নিহাদ প্যাকেটগুলো টেবিলে রেখে শান্ত গলায় বলল,
—নতুন বছরের দিনেও কি আসতে পারব না?
ঈশিতা কিছু বলার আগেই নিহাদ একটা ছোট্ট বাক্স তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
—এটা তোমার জন্য।
ঈশিতা অবাক হয়ে বাক্সটার দিকে তাকাল।
—আমার জন্য?
—হুম।
—কী আছে?
নিহাদ মুচকি হেসে বলল,
—খুললেই জানতে পারবে।
ঈশিতা বাক্সটা খুলতেই ভেতরে একটা ছোট্ট ডায়েরি দেখতে পেল। ডায়েরির কভারে সুন্দর করে লেখা—
“New Year, New Memories.”
ঈশিতার চোখে আনন্দ ফুটে উঠল।
—খুব সুন্দর!
নিহাদ বলল,
—তুমি তো অনেক কিছু লিখে রাখো। তাই ভাবলাম বছরের প্রথম দিন থেকেই নতুন একটা জায়গা থাকুক।
ঈশিতা ডায়েরিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর আস্তে করে বলল,
—ধন্যবাদ আপনাকে।
নিহাদ শুধু মাথা নেড়ে হাসল।
সকালের নাশতা শেষ হওয়ার পর সবাই ঠিক করল, দুপুরে বাড়ির কাছের বড় বাগানে সবাই মিলে সময় কাটাবে।
বাগানে পৌঁছাতেই দেখা গেল, সেখানে ছোটখাটো আয়োজন করা হয়েছে। কেউ ব্যাডমিন্টন খেলছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ গল্প করছে।
ঈশিতার বান্ধবীরা তাকে টেনে নিয়ে গেল ছবি তুলতে।
নিহাদ একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল।
হঠাৎ ইশান এসে তার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
—কী দেখছিস এত মন দিয়ে?
নিহাদ চোখ সরিয়ে বলল,
—কিছু না।
ইশান হেসে বলল,
—হ্যাঁ, বুঝেছি। কিছু না!
নিহাদ তাকে কড়া দৃষ্টি দিতেই ইশান হাসতে হাসতে সরে গেল।
অন্যদিকে ঈশিতা তখন ফুলের বাগানের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিল। শীতের রোদে তার চারপাশটা যেন আরও উজ্জ্বল লাগছিল।
হঠাৎ একটা ছোট্ট বাচ্চা দৌড়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল।
—আপু, আমার ছবি তুলবে?
ঈশিতা হেসে নিচু হয়ে বলল,
—অবশ্যই।
সে বাচ্চাটার ছবি তুলতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর বাচ্চাটার মা এসে তাকে নিয়ে গেল।
ঈশিতা উঠে দাঁড়াতেই দেখল, নিহাদ তার দিকে তাকিয়ে আছে।
—কী?
নিহাদ বলল,
—তোমার একটা জিনিস বদলায়নি।
—কী?
—ছোটদের দেখলেই তোমার মুখের হাসিটা অন্যরকম হয়ে যায়।
ঈশিতা একটু থেমে বলল,
—সবাইকে হাসতে দেখলে ভালো লাগে।
নিহাদ কিছু বলল না।
শুধু কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে অন্যদিকে চলে গেল।
দুপুরে সবাই মিলে খাবারের আয়োজন করল। বিরিয়ানি, কাবাব, সালাদ, মিষ্টি—টেবিল ভরে গেল নানা রকম খাবারে।
খেতে বসে ইশান হঠাৎ বলল,
—আজ একটা খেলা হবে।
সবাই আগ্রহ নিয়ে তাকাল।
—কী খেলা?
ইশান বলল,
—প্রত্যেকে একটা করে কাগজে নতুন বছরের একটা ইচ্ছে লিখবে। তারপর সব কাগজ একটা বাক্সে রাখা হবে। শেষে সবাই একটা করে কাগজ তুলে পড়বে।
সবাই রাজি হয়ে গেল।
ঈশিতাও একটা কাগজ নিল।
কিছুক্ষণ ভেবে সেখানে লিখল—
“এই বছর যেন প্রিয় মানুষগুলোকে আরও বেশি হাসতে দেখতে পারি।”
কাগজটা ভাঁজ করে বাক্সে রেখে দিল সে।
কিছুক্ষণ পর সবাই একটা করে কাগজ তুলল।
হাসি-ঠাট্টায় পুরো জায়গাটা জমে উঠল।
শেষে নিহাদের পালা এল।
সে একটা কাগজ তুলে খুলল।
কয়েক সেকেন্ড পড়ার পর তার মুখে অদ্ভুত একটা হাসি ফুটে উঠল।
ইশান বলল,
—কী লেখা?
নিহাদ কাগজটা ভাঁজ করে বলল,
—কিছু না।
—আরে পড়!
নিহাদ মাথা নাড়ল।
—এটা ব্যক্তিগত।
সবাই হেসে উঠল।
ঈশিতা দূর থেকে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো, নিহাদের কাগজে কী লেখা থাকতে পারে?
বিকেলের দিকে সবাই বাড়ি ফিরে এল।
সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। আকাশে কমলা আর গোলাপি রঙের মিশেল।
ঈশিতা নিজের ঘরে এসে নতুন ডায়েরিটা খুলল।
প্রথম পাতায় লিখল—
“১ জানুয়ারি।
নতুন বছরের প্রথম দিন।
আজ বুঝলাম, নতুন বছর আসলে শুধু ক্যালেন্ডারের একটা নতুন পাতা নয়। কিছু মানুষ, কিছু মুহূর্ত আর কিছু অদ্ভুত অনুভূতিও নতুন করে জীবনের পাতায় জায়গা করে নেয়।”
লেখা শেষ করে কলমটা নামিয়ে রাখল সে।
ঠিক তখনই ফোনে একটা মেসেজ এল।
নিহাদ।
“ডায়েরির প্রথম পাতায় কী লিখলে?”
ঈশিতা অবাক হয়ে গেল।
সে দ্রুত লিখল—
“আপনি কীভাবে জানলেন আমি লিখছি?”
কয়েক মুহূর্ত পর উত্তর এল—
“অনুমান।”
ঈশিতা মুচকি হেসে আবার লিখল—
“আপনার অনুমান এত ঠিক হয় কীভাবে?”
নিহাদের উত্তর এল কিছুক্ষণ পর—
“সবকিছু জানার দরকার হয় না। কিছু মানুষকে বুঝতে শিখলেই হয়।”
মেসেজটা পড়ে ঈশিতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ডায়েরিটা বন্ধ করে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো নেমে এসেছে।
নতুন বছরের প্রথম দিনটা শেষ হয়ে আসছে।
কিন্তু ঈশিতার মনে হচ্ছিল, এই বছরের গল্পটা হয়তো সবে শুরু হয়েছে।
আর অন্যদিকে, নিজের ঘরে বসে নিহাদ সেই কাগজটার দিকে তাকিয়ে ছিল, যেটা দুপুরে বাক্স থেকে তুলেছিল।
কাগজে লেখা ছিল—
“এই বছর যেন প্রিয় মানুষগুলোকে আরও বেশি হাসতে দেখতে পারি।”
নিহাদ ধীরে ধীরে কাগজটা ভাঁজ করে ডায়েরির ভেতর রেখে দিল।
তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,
—নতুন বছরটা তোমার জন্য সুন্দর হোক, ঈশিতা।
বাইরে তখন শীতের রাত নেমে এসেছে।
পুরোনো বছরের সব গল্প পেছনে রেখে নতুন বছর তার প্রথম দিনের শেষ প্রহরে দাঁড়িয়ে।
কিন্তু সামনে যে গল্প অপেক্ষা করছে, তার কিছু পাতা এখনও কারও জানা নেই।
রাত তখন অনেকটা গভীর।
সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘরের আলো নিভিয়ে জানালার পাশে বসে ছিল নিহাদ। বাইরে ঠান্ডা বাতাস, দূরে কয়েকটা বাড়ির আলো আর আকাশজুড়ে অসংখ্য তারা।
তার হাতে সেই ছোট্ট কাগজটা।
দুপুরে সবাই যখন নতুন বছরের ইচ্ছা লিখেছিল, তখন নিহাদও একটা ইচ্ছে লিখেছিল। কিন্তু কাউকে পড়তে দেয়নি।
সে আবার কাগজটা খুলল।
সেখানে মাত্র কয়েকটা লাইন—
“আমি চাই, ঈশিতা যেন কখনো নিজেকে একা মনে না করে।
ওর জীবনে যত কঠিন সময়ই আসুক, আমি যেন ওর পাশে থাকার মতো একজন মানুষ হতে পারি।
আর যদি কোনোদিন ও আমার ওপর বিশ্বাস করে, সেই বিশ্বাসটা যেন কোনোদিন ভাঙতে না দিই।”
নিহাদ কিছুক্ষণ চুপ করে লেখাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের মনেই বলল,
—এটাই আমার নতুন বছরের ইচ্ছে।
ঠিক তখনই ফোনে একটা মেসেজ এল।
ঈশিতা লিখেছে—
“ঘুমাননি?”
নিহাদ মুচকি হেসে উত্তর দিল,
“না। তুমি?”
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—
“আমিও না। আজকের দিনটা নিয়ে ভাবছি।”
নিহাদ লিখল,
“কেমন গেল দিনটা?”
ঈশিতা উত্তর দিল,
“খুব ভালো। অনেকদিন পর মনে হলো একটা দিন সত্যিই মনে রাখার মতো।”
মেসেজটা পড়ে নিহাদের মুখে হাসি ফুটল।
সে লিখতে চেয়েছিল—
“আমার জন্যও।”
কিন্তু শেষ পর্যন্ত শুধু লিখল—
“তাহলে নতুন বছরের প্রথম দিনটা সফল।”
ঈশিতা আবার মেসেজ করল—
“আপনার নতুন বছরের ইচ্ছেটা কী?”
নিহাদ কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর লিখল—
“একদিন বলব।”
ঈশিতা লিখল—
“কবে?”
নিহাদ জানালার বাইরে তাকিয়ে উত্তর দিল—
“যেদিন মনে হবে তুমি সেটা শোনার জন্য প্রস্তুত।”
ঈশিতা আর কোনো উত্তর দিল না।
নিহাদ ফোনটা পাশে রেখে দিল।
তারপর ডায়েরির ভেতর কাগজটা যত্ন করে রেখে দিয়ে ধীরে ধীরে বলল—
—কিছু ইচ্ছে সবাইকে বলা যায় না। কিছু ইচ্ছে সময়ের অপেক্ষায় থাকে।
নতুন বছরের প্রথম রাতটা নীরবে কেটে গেল।
আর নিহাদের সেই গোপন ইচ্ছেটা রয়ে গেল তার ডায়েরির পাতায়—একটা প্রতিশ্রুতির মতো।
চলবে ইনশাল্লাহ
পর্ব -১৪