# প্রেম আমার
# পর্ব - ১৭
দাদিমাকে হারানোর পর দেখতে দেখতে ষোলোটা দিন কেটে গেল। সময় নিজের নিয়মে এগিয়ে চললেও ঈশিতার কাছে দিনগুলো যেন এখনও কোথাও আটকে আছে। বাড়ির পরিবেশ আগের তুলনায় অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে ঠিকই, কিন্তু দাদিমার অনুপস্থিতিটা এখনও প্রতিটা কোণায় অনুভব করা যায়।
তার মাঝেই আজ সাদিয়ার জন্মদিন।
সকাল থেকেই রুহি ঈশিতাকে বাইরে যাওয়ার জন্য জোর করছিল। শেষ পর্যন্ত রুহির জেদের কাছে হার মেনে বিকেলের দিকে ঈশিতা, রুহি আর সাদিয়া পার্কে এসে পৌঁছাল। কিছুক্ষণ পর তাদের সঙ্গে যোগ দিল তাহসিনও।
জন্মদিনের আনন্দে কিছুক্ষণের মধ্যেই চারপাশটা হাসি-ঠাট্টায় ভরে উঠল। সাদিয়া কেক কাটল, রুহি একের পর এক ছবি তুলতে লাগল। ঈশিতাও অনেকদিন পর বন্ধুদের সঙ্গে কিছুটা স্বাভাবিকভাবে হাসল।
সময়টা বেশ ভালোই কাটছিল।
একসময় সবাই পার্কের খোলা মাঠের পাশে বসে গল্প করছিল। ঠিক তখনই রুহির চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক উপস্থিত
সে ধীরে ধীরে ঈশিতার কাছে ঝুঁকে অউরাল
— “এই, একটা কাজ করবি?”
ঈশিতা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— “কী কাজ?”
রুহি আরও নিচু গলায় বলল,
— “নিহাদ ভাইকে একটু প্র্যাঙ্ক করি?”
কথাটা শুনেই ঈশীতা মাথা নাড়ল।
— “না না! উনি ভয় পেয়ে যাবেন।”
— “আরে, পরে তো বলে দেব এটা প্র্যাঙ্ক ছিল।”
তাহসিন কথাটা শুনে হেসে বলল,
— “তোমাদের মাথায় যে কী কী আসে!”
শেষ পর্যন্ত রুহির জেদের কাছে সবাই রাজি হয়ে গেল। ঈশিতার মুখে তখনও একটু দ্বিধা।
রুহি ফোনটা হাতে নিয়ে সবার থেকে একটু দূরে সরে গেল। তারপর নিহাদের নম্বরে কল করল।
কয়েকবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে নিহাদের গলা শোনা গেল।
— “হ্যালো?”
রুহি সঙ্গে সঙ্গে গলার স্বর বদলে ফেলল।
— “ভাইয়া, আমি রুহি। আপনি নিহাদ ভাই তো?”
— “হ্যাঁ। কী হইসে?”
রুহি এবার একটু কাঁপা গলায় বলল,
— “ভাইয়া... ঈশিতা খুব অসুস্থ।”
কথাটা শুনতেই নিহাদের গলার স্বর বদলে গেল।
— “কী হইসে মেহুর?”
— “আমি ঠিক জানি না ভাইয়া... তবে ওর অবস্থা ভালো না।
এক মুহূর্তও দেরি করল না নিহাদ।
— “তোমরা কোথায় আছো?”
রুহি সঙ্গে সঙ্গে পার্কের লোকেশন পাঠিয়ে দিল।
ফোন কেটে যাওয়ার পর রুহি ফিরে এল।
— “চল, এবার শুরু করি।”
ঈশিতাকে মাঠের মাঝখানে শুইয়ে দেওয়া হলো। চোখ বন্ধ করে নিঃশব্দে পড়ে রইল সে। রুহি পাশে বসে তার মুখে সামান্য পানি দিতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর দূর থেকে দ্রুত পায়ে একজনকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল।
নিহাদ।
মাঠের মাঝখানে ঈশিতাকে পড়ে থাকতে দেখেই তার মুখের রং বদলে গেল। সে প্রায় দৌড়ে গিয়ে ঈশিতার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল।
— “মেহু!”
কোনো সাড়া না পেয়ে
নিহাদ কাঁপা হাতে ঈশিতাকে নিজের দিকে টেনে নিল।
— “এ মেহু, কী হইসে তোর?”
ঈশিতা চোখ বন্ধ করে রইল।
নিহাদের অস্থিরতা আরও বেড়ে উঠলো নিজেকে যেনো সামলাতে পারছে না
— “মেহু, চোখ খোল। আমার কথা শুনতে পারছিস?”
আবারো
— “তুই আমাকে এভাবে ভয় পাইয়ে দিস না, মেহু... চোখ খোল।”
তার গলায় এমন একটা ভয় মিশে ছিল যে মুহূর্তের জন্য রুহিরও নিজের দুষ্টুমিটা মনে পড়ে গেল।
কিন্তু তাহসিন তখন মুখ ঘুরিয়ে হাসি চাপছিল।
নিহাদ ঈশিতাকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে অস্থির হয়ে উঠল।
— “মেহু, চোখ খোল… তুই আমার কথা শুনতে পারছিস?”
সাড়া নেই।
নিহাদ আরও একবার ডাকল -
— “মেহু… তুই চোখ খুলছিস না কেন?”
তারপর যেন শেষবার নিশ্চিত হওয়ার জন্য নিহাদ ধীরে ধীরে ঈশিতার মুখের একদম কাছে ঝুঁকে এল। তার মুখ ঈশিতার মুখের খুব কাছে আসতেই ঈশিতার চোখের পাতা হালকা কেঁপে উঠল।
পরক্ষণেই ধীরে ধীরে চোখ খুলল ঈশিতা।
চোখ মেলেই এতটা কাছে নিহাদকে দেখে সে কয়েক মুহূর্ত নির্বাক হয়ে রইল।
নিহাদও থমকে গেল।
তারপর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে একটু সরে গিয়ে নরম গলায় বলল—
— “তুমি ঠিক আছো তো, মেহু?”
নিহাদ বুঝতে পারব এটা সত্যি না .......
নিহাদ চারপাশে একবার তাকিয়ে কঠিন গলায় বলল,
— “এখানে কী হয়েছে?”
কেউ কোনো উত্তর দিল না।
নিহাদ আবার ঈশিতার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “আমি জিজ্ঞাসা করছি, এখানে কী হয়েছে?”
ঈশিতা মাথা নিচু করে চুপ করে রইল।
নিহাদের কণ্ঠ আরও কঠিন হয়ে উঠল,
— “তুমি চুপ করে আছো কেন? আমি তোমাকেই জিজ্ঞাসা করছি।”
ঈশিতা কোনো উত্তর দিল না।
— “তুমি জানো, আমি কী অবস্থায় এখানে এসেছি?”
বেশ কিছুক্ষণ সবাই চুপ থাকলো
— “ফোনে যখন শুনলাম তুমি অসুস্থ, তখন এক মুহূর্তও দেরি করিনি। আর এখন জানতে চাইছি কী হয়েছে, অথচ তুমি একটা কথাও বলছো না?”
ঈশিতা ধীরে ধীরে চোখ তুলল, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না।
নিহাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— “মেহু, আমার দিকে তাকিয়ে বলো—এটা কার পরিকল্পনা ছিল?”
রুহি এবার আস্তে করে বলল,
— “ভাইয়া… আসলে আমরা একটু মজা করতে চেয়েছিলাম।”
নিহাদ রুহির দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু কঠিন গলায় বলল,
— “এটাকে তুমি মজা বলছো?”
রুহি আর কিছু বলতে পারল না।
নিহাদ আবার ঈশিতার দিকে তাকাল।
— “আর তুমি? তুমি এই প্র্যাঙ্কে রাজি হয়েছিলে?”
ঈশিতা মাথা নিচু করে রইল।
নিহাদ রেগে গিয়ে চিললিয়ে বলল,
— “একবারও কি মনে হয়নি, তোমার এমন একটা খবর শুনে আমি কতটা চিন্তায় পড়ব?”
নিহাদ কয়েক মুহূর্ত একদৃষ্টিতে ঈশিতার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মুখে তখন আর কোনো স্বস্তি নেই। কয়েক মিনিট আগের আতঙ্কটা যেন ধীরে ধীরে তীব্র রাগে পরিণত হয়েছে।
সে গম্ভীর গলায় বলল,
— “ঈশিতা, আমি তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করছি।”
ঈশিতা মাথা নিচু করে চুপ করে রইল।
— “এটা কেন করলে?”
কোনো উত্তর নেই।
— “আমি তোমার সঙ্গে কথা বলছি, মেহু।”
ঈশিতা এবারও নীরব।
আসলে সে ইচ্ছে করে চুপ করে ছিল না। কী বলবে, সেটাই বুঝতে পারছিল না। সে ভেবেছিল সামান্য একটা মজা হবে। কিন্তু নিহাদ যে এতটা ভয় পেয়ে যাবে, সেটা তার কল্পনাতেও ছিল না।
নিহাদ আবার বলল,
— “তুমি কি জানো, ফোনে যখন শুনলাম তুমি অসুস্থ, তখন আমি কী অবস্থায় ছিলাম?”
ঈশিতার চোখে পাশোনোনি জমে উঠল।
— “আমি এক মুহূর্তও ভাবিনি এটা মজা হতে পারে। শুধু মনে হচ্ছিল তোমার কিছু একটা হয়েছে।”
নিহাদের গলা কেঁপে উঠল।
— “আমি এখানে ছুটে এসেছি। আর এসে দেখি তুমি চোখ বন্ধ করে পড়ে আছো!”
রুহি আস্তে বলল,
— “নিহাদ ভাই, আমরা সত্যিই বুঝতে পারিনি…”
নিহাদ রুহির দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলল,
— “তোমরা বুঝতে পারোনি, ঠিক আছে। কিন্তু ঈশিতা তো জানত।”
ঈশিতা আরও মাথা নিচু করে ফেলল।
নিহাদ এবার তার দিকে এগিয়ে এসে বলল,
— “তুমি অন্তত একবার ভাবতে পারতে, মেহু।”
ঈশিতার ঠোঁট কেঁপে উঠল।
— “সরি…”
নিহাদ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— “শুধু সরি বললেই হবে?”
ঈশিতা চুপ।
তার মুখটা ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে। চোখের কোণে জমে থাকা পানিটুকু এবার গড়িয়ে পড়ল।
নিহাদ রাগে মুঠো শক্ত করল। মুহূর্তের উত্তেজনায় তার হাত উঠতে গিয়েও নিজের সর্ব চেষ্টা দিয়ে থেমে গেল।
কয়েক সেকেন্ড সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে হাত নামিয়ে নিল।
রাগের আড়ালে তখন নিজের ভয়টাই যেন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
— “আমি তোমার ওপর রাগ করেছি, কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম।”
ঈশিতা ধীরে চোখ তুলল।
নিহাদ নিচু গলায় বলল,
— “কিন্তু তোমাকে ভয় দেখানো বা কষ্ট দেওয়া আমার উদ্দেশ্য না।”
ঈশিতা কোনো উত্তর দিল না।
সে শুধু চোখ মুছে দাঁড়িয়ে রইল।
নিহাদ কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
— “ দ্বিতীয় দিন যেন এমন টা ন হয় mehu "
নিহাদের রাগ তখনও কমেনি।
— “আমি তোমাকে কতবার বলব, মেহু? এমন করে আমাকে ভয় পাইয়ে দিও না!”
ঈশিতা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। চোখের পানি একের পর এক গড়িয়ে পড়ছিল।
নিহাদ আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ঈশিতার শরীরটা হঠাৎ দুলে উঠল।
— “মেহু!”
নিজেকে সামলাতে না পেরে ঈশিতা সোজা নিহাদের দিকে হেলে পড়ল।
নিহাদ এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে নিজের মেহুজন কে নিজের সাথে আঁকড়ে নেয়।
ঈশিতা চোখ বন্ধ করে তার ওপর ভর দিয়ে রইল। তার মুখ ফ্যাকাশে, নিঃশ্বাসও ভারী।
নিহাদের সমস্ত রাগ মুহূর্তের মধ্যে থেমে গেল।
— “মেহু, চোখ খোলো… কী হয়েছে?”
ঈশিতা কোনো উত্তর দিল না।
নিহাদ তাকে শক্ত করে ধরে রুহির দিকে তাকাল।
— “রুহি, একটু পানি দাও।”
রুহি দ্রুত এগিয়ে এল।
আর নিহাদ তখন প্রথমবার বুঝতে পারল—রাগের চেয়ে ঈশিতাকে নিয়ে তার ভয়টাই অনেক বেশি।.....
চলবে ইনশাল্লাহ
পর্ব -১৮