পর্ব ১৮
# প্রেম আমার
পরের দিন সকালটা অদ্ভুত সুন্দর ছিল।
আকাশজুড়ে হালকা মেঘ। রোদের তেজ খুব বেশি নয়, বাতাসে শরতের মিষ্টি একটা গন্ধ। স্কুলের মাঠে তখনও সকালের কোলাহল পুরোপুরি জমে ওঠেনি। কেউ বই হাতে ছুটছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করছে, আবার কেউ শেষ মুহূর্তে খাতা খুলে পড়া দেখে নিচ্ছে।
ইশিতা গেট দিয়ে ঢুকতে ঢুকতেই রুহি আর সাদিয়াকে দেখতে পেল।
রুহি দূর থেকেই হাত নাড়ল।
—“এইদিকে আয়!”
ইশিতা ব্যাগটা একটু ঠিক করে তাদের কাছে এগিয়ে গেল।
—“কী হয়েছে?”
—“কিছু না। চল।”
ইশিতা হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থেমে গেল।
করিডোরের অন্য প্রান্তে নিহাদ দাঁড়িয়ে আছে।
তার নিজের ক্লাসের কয়েকজন ছেলের সঙ্গে কথা বলছে। মুখে সেই চেনা শান্ত ভাবটা। হাতে একটা বই, মাঝে মাঝে পাতাগুলো উল্টে দেখছে। চারপাশে যতই হৈচৈ থাকুক, নিহাদকে দেখলে মনে হয় সে যেন নিজের একটা আলাদা নীরব জগতের মধ্যে আছে।
ইশিতার চোখ অজান্তেই কয়েক মুহূর্ত তার ওপর আটকে রইল।
ঠিক তখনই নিহাদের চোখও এদিকে উঠল।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
কিন্তু—
নিহাদ শুধু একবার তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিল।
কোনো হাসি নেই।
কোনো পরিচিত অভিবাদনও নেই।
ইশিতা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল।
কী হলো?
গতকাল পর্যন্ত তো সব ঠিকই ছিল।
সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই রুহি তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল।
—“চল, ক্লাসে যাই।”
ইশিতা আর কিছু বলল না।
কিন্তু ক্লাসে বসার পরও তার মাথায় একটা কথাই ঘুরতে লাগল—
নিহাদ আজ তার দিকে তাকিয়ে এমনভাবে চোখ সরিয়ে নিল কেন?
প্রথম ক্লাস শেষ হলো।
তারপর দ্বিতীয়।
তারপর টিফিনের ঘণ্টা বাজল।
ইশিতা ব্যাগ থেকে খাবার বের করলেও খাওয়ার দিকে তার মন নেই। বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে।
অবশেষে দূরে নিহাদকে দেখা গেল।
সে তার নিজের ক্লাস থেকে বেরিয়ে করিডোর দিয়ে হাঁটছে। পাশে তাহসিন।
ইশিতা উঠে দাঁড়াল।
রুহি অবাক হয়ে বলল,
—“কোথায় যাচ্ছিস?”
—“একটু আসছি।”
সে করিডোরে বেরিয়ে এল।
নিহাদ তখন বেশ কিছুটা সামনে চলে গেছে।
—“নিহাদ!”
ডাক শুনে নিহাদ থামল।
ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে তাকাল।
ইশিতা কাছে এসে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
তারপর ইশিতা বলল,
—“আপনি আমার ওপর রাগ করেছেন?”
নিহাদের মুখে কোনো পরিবর্তন হলো না।
সে শান্ত গলায় বলল,
—“না।”
ইশিতা তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
—“মিথ্যে বলছেন।”
নিহাদ এবার সামান্য ভ্রু তুলল।
—“কেন?”
—“কারণ আপনি আজ একবারও আমার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলেননি।”
নিহাদ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল।
তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
—“সব সময় কথা বলতে হয় নাকি?”
কথাটা খুব সাধারণ।
কিন্তু ইশিতা বুঝতে পারল, এর ভেতরে অভিমান লুকিয়ে আছে।
সে একটু নরম হয়ে বলল,
—“তাহলে কী হয়েছে বলুন।”
নিহাদ উত্তর দিল না।
শুধু বইটা হাতে ঠিক করে নিল।
ইশিতা আরও একটু কাছে এসে বলল,
—“আমি কি কিছু করেছি?”
নিহাদ এবার তার দিকে তাকাল।
চোখে রাগ নেই।
শুধু একরাশ চুপচাপ অভিমান।
—“তোমার মনে হলে তুমি কিছু করেননি, তাহলে কিছু হয়নি।”
কথাটা বলেই সে চলে যেতে শুরু করল।
ইশিতা কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ বুঝতে পারল।
গতকাল সে হয়তো নিহাদের একটা কথাকে গুরুত্ব দেয়নি। ব্যস্ততার মধ্যে তাকে অপেক্ষা করিয়েছিল। কিংবা এমন কোনো ছোট্ট ব্যাপার, যা তার কাছে তেমন কিছুই ছিল না—কিন্তু নিহাদের কাছে হয়তো ছিল।
ইশিতা ধীরে ধীরে তার পেছনে গেল।
—“প্রেম পুরুষ…
নিহাদ থামল।
ইশিতা এবার খুব শান্ত গলায় বলল,
—“আমি যদি ভুল করে থাকি, তাহলে সরি।”
নিহাদ কিছু বলল না।
ইশিতা একটু হাসার চেষ্টা করে বলল,
—“ইচ্ছে করে করিনি।”
নীরবতা।
করিডোরের জানালা দিয়ে বাতাস এসে দুজনের মাঝখান দিয়ে চলে গেল।
নিহাদ ধীরে বলল,
—“তুমি সবকিছু এত সহজে ভুলে যাও।
ইশিতার মুখটা একটু মলিন হয়ে গেল।
—“আমি চেষ্টা করব আর না ভুলতে।”
নিহাদ তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
—“ঠিক আছে।”
ইশিতা যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
—“রাগ নেই?”
নিহাদ সামান্য হাসল।
—“ছিল।”
—“এখন?”
—“একটু আছে।”
ইশিতা অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
—“এখনও?
নিহাদ মাথা নাড়ল।
—“হুম।”
ইশিতা এবার একটু অভিমানী গলায় বলল,
—“আমি তো সরি বললাম!”
নিহাদের ঠোঁটের কোণে এবার স্পষ্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।
—“জানি।”
—“তাহলে?”
—“তোমাকে একটু বুঝতে দিতে হবে যে আমি রাগ করেছিলাম।”
ইশিতা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে ফেলল।
—“আপনি না… খুব শান্তভাবে রাগ করেন।”
নিহাদও মৃদু হাসল।
—“চিৎকার করে রাগ করা আমার স্বভাব না।”
ইশিতা মাথা নাড়ল।
—“জানি।”
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ইশিতা আস্তে করে বলল,
—“তাহলে এখন কথা বলবেন?”
নিহাদ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“হুম।”
একটা ছোট্ট উত্তর।
কিন্তু সেই একটুকু শব্দেই ইশিতার মুখে আবার হাসি ফুটে উঠল।
কখনো কখনো সম্পর্কের অভিমান খুব বড় কোনো ঘটনার জন্য হয় না।
একটা উপেক্ষা,
একটা না বলা কথা,
অথবা প্রিয় মানুষটির কাছ থেকে একটু কম সময় পাওয়াই যথেষ্ট।
আর সেই অভিমান ভাঙানোর জন্যও দরকার হয় না অনেক কিছু।
শুধু একজনের নরম হয়ে বলা—
“আমি যদি ভুল করে থাকি, সরি।”
আর অন্যজনের চুপচাপ ক্ষমা করে দেওয়া।
নিহাদের সেই ছোট্ট “হুম”-এর পর ইশিতার মুখে যে হাসিটা ফুটে উঠেছিল, সেটা আর লুকোনো গেল না।
দুজনেই কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।
হঠাৎ পাশের ক্লাসের ঘণ্টা বেজে উঠতেই নিহাদ ঘড়ির দিকে তাকাল।
—“তোমার ক্লাস আছে।”
ইশিতা একটু অবাক হয়ে বলল,
—“আপনারও তো।”
—“হুম।”
নিহাদ চলে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই ইশিতা আবার ডাকল,
—“নিহাদ…”
সে থেমে পেছনে তাকাল।
ইশিতা একটু ইতস্তত করে বলল,
—“আর রাগ করবেন না, প্লিজ।”
নিহাদের চোখে এবার খুব হালকা একটা হাসি ফুটল।
—“দেখা যাবে।”
এইটুকু বলেই সে নিজের ক্লাসের দিকে চলে গেল।
ইশিতা কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের অজান্তেই মৃদু হেসে ফেলল।
কিন্তু সে যে এতক্ষণ কোথায় ছিল, সেটা রুহির চোখ এড়ায়নি।
ক্লাসে ঢুকতেই রুহি তার পাশে এসে বসে ফিসফিস করে বলল,
—“কী ব্যাপার?”
ইশিতা ভান করে খাতা খুলতে খুলতে বলল,
—“কী ব্যাপার আবার?”
—“এই যে এতক্ষণ কোথায় ছিলি?”
—“এমনিই।”
সাদিয়া পাশ থেকে মুচকি হেসে বলল,
—“এমনিই গেলে মানুষ এত হাসিমুখে ফিরে আসে?”
ইশিতা এবার দুজনের দিকে তাকাল।
—“তোরা না একদম অসহ্য!”
রুহি হেসে বলল,
—“আমরা কিছুই বলিনি।”
ইশিতা আর কথা বাড়াল না।
খাতা খুলে কলম হাতে নিল।
কিন্তু লেখার বদলে খাতার এক কোণে অজান্তেই একটা ছোট্ট ফুল আঁকতে শুরু করল।
তারপর নিজের অজান্তেই মনে পড়ল নিহাদের শেষ কথাটা—
“দেখা যাবে।”
ইশিতার ঠোঁটের কোণে আবার হাসি ফুটল।
রুহি সেটা দেখে আরও কাছে ঝুঁকে বলল,
—“ওহ্! ব্যাপারটা বেশ গুরুতর মনে হচ্ছে।”
—“চুপ কর।”
—“আচ্ছা, আচ্ছা।”
সাদিয়া দুজনকে দেখে হেসে ফেলল।
ক্লাস চলতে লাগল।
কিন্তু ইশিতার মনটা আজ আর খারাপ নেই।
মাঝে মাঝে দূরের করিডোর দিয়ে কেউ হাঁটলে তার চোখ অনিচ্ছায় দরজার দিকে চলে যাচ্ছিল।
কেন যাচ্ছিল, সেটা সে নিজেও জানে।
---
স্কুল ছুটির ঘণ্টা বাজতেই চারদিকে আবার ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল।
রুহি আর সাদিয়া ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
ইশিতা তাদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে গেটের কাছে এসে থামল।
রুহি বলল,
—“তুই আসছিস না?”
—“তোরা যা। আমি আসছি।”
—“কোথায় যাচ্ছিস?”
ইশিতা একটু থেমে বলল,
—“একটু কাজ আছে।”
রুহি চোখ ছোট করে তাকাল।
—“কাজ?”
ইশিতা কিছু বলার আগেই সাদিয়া রুহির হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল।
—“চল, ওর কাজ আছে।”
রুহি যাওয়ার সময় পেছন ফিরে শুধু মুচকি হেসে বলল,
—“বুঝেছি!”
ইশিতা মাথা নাড়ল।
কিছুক্ষণ পর করিডোরটা একটু ফাঁকা হয়ে এলো।
ঠিক তখনই নিহাদ নিজের ক্লাস থেকে বেরিয়ে এল।
হাতে বই। কাঁধে ব্যাগ।
ইশিতাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে থেমে গেল।
—“তুমি এখনও যাওনি?”
ইশিতা মাথা নাড়ল।
—“না।”
—“কেন?”
ইশিতা একটু হাসল।
—“আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।”
নিহাদ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর শান্ত গলায় বলল,
—“আমার জন্য?”
ইশিতা মাথা নাড়ল।
—“হুম।”
নিহাদের মুখে খুব সামান্য একটা হাসি ফুটল।
—“কেন?”
ইশিতা এবার একটু লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে বলল,
—“সকালের রাগটার জন্য।”
—“সেটা তো শেষ।”
—“জানি।”
—“তাহলে?”
ইশিতা ধীরে বলল,
—“তবুও মনে হচ্ছিল… আপনাকে একটা কথা বলা বাকি আছে।”
নিহাদ চুপ করে রইল।
ইশিতা তার দিকে তাকিয়ে খুব নরম গলায় বলল,
—“আজ থেকে চেষ্টা করব, আপনার কোনো কথা যেন অকারণে উপেক্ষা না করি।”
নিহাদ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর বলল,
—“এত কিছু ভাবার দরকার নেই।”
—“কিন্তু আমি ভাবব।”
—“কেন?”
ইশিতা মৃদু হেসে বলল,
—“কারণ আপনি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।”
কথাটা বলেই সে চোখ নামিয়ে ফেলল।
নিহাদও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তার শান্ত মুখে এবার লুকোনো একটা হাসি।
—“চলো।”
ইশিতা অবাক হয়ে তাকাল।
—“কোথায়?”
—“বাইরে। সবাই চলে যাচ্ছে।”
ইশিতা তার পাশে হাঁটতে শুরু করল।
দুজনের মাঝে কোনো বড় কথা নেই।
কোনো নাটকীয় মুহূর্তও নেই।
শুধু পাশাপাশি হাঁটার সেই নীরবতাটুকু।
তবুও ইশিতার মনে হচ্ছিল—
আজকের দিনটা যেন একটু অন্যরকম।
সকালের অভিমানটা না হলে হয়তো সে বুঝতেই পারত না, একজন মানুষকে নিজের জীবনে কতটা জায়গা দিয়ে ফেলেছে সে।
আর নিহাদ?
সে কিছু বলল না।
শুধু হাঁটতে হাঁটতে একবার ইশিতার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে আবার সামনে তাকাল।
কিছু অনুভূতির জন্য শব্দের দরকার হয় না।
কিছু অনুভূতি শুধু নীরবতায় থেকেই যায়—
আর ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে ওঠে।
চলবে ইনশাল্লাহ
পর্ব -১৯