# প্রেম আমার
# পর্ব - ২২

রিসেপশনের সন্নিকটে পৌঁছাতেই ঈশিতার পদযুগল আচমকা থমকে গেল। সম্মুখে দৃষ্টিপাত করতেই তার সমস্ত সাহস যেন মুহূর্তের মধ্যে স্তিমিত হয়ে এল। সেখানে উপস্থিত রয়েছে ঈশানসহ নিহাদের পরিবারের প্রায় সকল সদস্য। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় ঈশিতা আর এক পা অগ্রসর হওয়ার সাহস পেল না। নীরবে একপাশে দাঁড়িয়ে রইল সে।
ঈশিতার মুখশ্রীর আকস্মিক পরিবর্তন লক্ষ করে রুহি মৃদু স্বরে ডেকে উঠল—
“ঈশিতা!”
নিজের ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে ঈশিতা দৃষ্টি ফেরাল।
“হ্যাঁ, বল।”
রুহি কিছুটা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে প্রশ্ন করল—
“এবার কী হবে?”
ঈশিতা ক্ষণকাল নীরব রইল। অতঃপর দৃঢ় অথচ বিষণ্ণ কণ্ঠে উত্তর দিল—
“জানি না। তবে আমাকে যে করেই হোক, তাঁর কাছে যেতেই হবে।”
রুহি তার মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আমি বুঝতে পারছি তোর মনের অবস্থা, ঈশিতা। কিন্তু এখন কীভাবে যাবি বল?”
ঈশিতা একবার রিসেপশনের দিকে দৃষ্টিপাত করে বলল—
“একটু অপেক্ষা করি। সবাই চলে গেলে তারপর যাব।”
“জি, কিন্তু চিকিৎসকেরা যদি অনুমতি না দেন?”
ঈশিতার কণ্ঠে এবার একরাশ আকুলতা ঝরে পড়ল।
“প্রয়োজনে তাঁদের পায়ে পড়ে অনুরোধ করব, তবুও তাঁর সঙ্গে একবার দেখা না করে ফিরব না।”
রুহি আর কোনো যুক্তি দেখাল না। সে জানে, ঈশিতার এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার ক্ষমতা তার নেই।
“আচ্ছা, তোর যা ইচ্ছা।”
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর রুহি বলল—
“ঈশিতা, তুই এখানেই দাঁড়া। আমি একটু আসছি।”
ঈশিতা কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাল।
“কোথায় যাবি?”
“আরে, দাঁড়া না একটু!”
“জি।”
রুহি কয়েক পা অগ্রসর হতেই পেছন থেকে ঈশানের কণ্ঠ ভেসে এল—
“রুহি!”
ডাক শুনে রুহি তৎক্ষণাৎ পেছন ফিরে তাকাল।
“হ্যাঁ?”
ঈশান ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল—
“এখানে কী করছ?”
রুহি কিছুটা ইতস্তত করে উত্তর দিল—
“ভাইয়া, আসলে ঈশিতা আসতে চেয়েছিল।”
কথাটি শুনে ঈশানের মুখমণ্ডল গম্ভীর হয়ে উঠল।
“ও আসতে চাইবে, আর তুই ওকে নিয়ে চলে আসবি? তোর একটুও কমন সেন্স নেই?”
রুহি মাথা নিচু করে ফেলল।
“ভাইয়া, সরি।”
ঈশান বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠল—
“এখন সরি বললে কী হবে?”
কথাটি বলেই সে চারপাশে দৃষ্টিপাত করল।
“ঈশিতা কোথায়?”
রুহি হাত তুলে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে দেখিয়ে দিল।
“ওই যে।”
ঈশানের দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখা গেল, ঈশিতা করিডরের একপ্রান্তে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার অবয়বেই ক্লান্তির ছাপ সুস্পষ্ট। দীর্ঘ প্রতীক্ষা, মানসিক উদ্বেগ আর প্রিয় মানুষটির জন্য জমে থাকা উৎকণ্ঠা যেন তার সমস্ত শক্তি শুষে নিয়েছে।
ঈশান বিষয়টি বুঝতে পারলেও ঈশিতাকে উদ্দেশ করে কিছু বলল না। বোনের মতো মেয়েটির মনের অবস্থা সে অনুমান করতে পারছিল।
অতঃপর রুহির দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিল—
“তুই বুনুর কাছে যা। আর আমি সবাইকে বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করছি।”
রুহি যেন আশ্বাসের আভাস পেল।
“জি, ভাইয়া। একটু তাড়াতাড়ি করবেন, প্লিজ।”
ঈশান সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল—
“জি, যাও তুমি।”
“হুম।”
রুহি ঈশিতার দিকে এগিয়ে গেল। আর ঈশান ফিরে গেল পরিবারের সদস্যদের কাছে।
---
প্রতীক্ষার অবসান
দীর্ঘ ত্রিশ মিনিট অতিবাহিত হলো।
রাতের নিস্তব্ধতা ক্রমশ হাসপাতালের করিডরে ছড়িয়ে পড়েছে। অবশেষে নিহাদের পরিবারের কোনো সদস্যই আর সেখানে উপস্থিত রইলেন না। একে একে সকলের প্রস্থান ঘটতেই ঈশিতার হৃদয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার হলো।
যে প্রতীক্ষা এতক্ষণ তাকে অস্থির করে রেখেছিল, এবার যেন সেই প্রতীক্ষার অবসানের ক্ষীণ সম্ভাবনা দেখা দিল।
রুহির সঙ্গে ধীর পায়ে রিসেপশনের দিকে এগিয়ে গেল ঈশিতা। কাউন্টারের ওপারে কর্তব্যরত এক তরুণী নার্সকে দেখতে পেয়ে সে বিনীত কণ্ঠে ডেকে উঠল—
“আপা!”
নার্সটি মুখ তুলে তাকালেন।
“জি, বলুন।”
ঈশিতা কিছুটা ইতস্তত করে প্রশ্ন করল—
“আপা, নিহাদ চৌধুরীর কেবিনটা কোথায়, একটু বলতে পারবেন?”
নার্সটি তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন—
“জি, বলতে পারব। কিন্তু আপনি কে? ওনার পরিবারের সবাই তো চলে গেছেন।”
ঈশিতা এক পা এগিয়ে এল।
“আপা, আমাকে একটু ওনার কাছে নিয়ে যাবেন? প্লিজ, আপা।”
নার্সটির মুখে পেশাগত গাম্ভীর্য ফুটে উঠল।
“দেখুন, আপা, এভাবে তো আপনাকে অনুমতি দিতে পারি না। আপনি ওনার কে হন, সেটা তো জানি না।”
ঈশিতার কণ্ঠ ক্রমশ করুণ হয়ে উঠল।
“আপা, আমি ওনার খুব কাছের একজন মানুষ। বিশ্বাস করুন, ওনাকে একবার দেখাটা আমার ভীষণ প্রয়োজন।”
নার্সটি মাথা নাড়লেন।
“বললাম তো, এখন যাওয়া যাবে না। হাসপাতালের কিছু নিয়মকানুন রয়েছে। আমি সেগুলোর বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারব না। আপনি কাল সকালে আসুন, তারপর দেখা যাবে।”
কথাগুলো শুনে ঈশিতার মুখখানি মলিন হয়ে গেল। সে আকুল কণ্ঠে পুনরায় অনুরোধ করল—
“আপা, প্লিজ, এমন করবেন না। আমার প্রেমপুরুষ অসুস্থ। আমি ওনার কাছে না গিয়ে থাকতে পারছি না। একবার শুধু দেখতে চাই তাঁকে। আর কিছু চাই না, আপা।”
নার্সটি এবার কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন—
“আহা, বুঝতে পারছি আপনার কথা। কিন্তু আমারও তো কাজ আছে। সবার জন্য নিয়ম ভাঙা সম্ভব নয়।”
ঈশিতা আর কোনো কথা বলল না।
নীরবে সেখান থেকে সরে এসে কিছুটা দূরে রাখা একটি আসনে বসে পড়ল সে। তার পাশেই বসল রুহি।
কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল নিস্তব্ধতায়।
অবশেষে রুহি মৃদু স্বরে ডাকল—
“ঈশিতা!”
কোনো উত্তর এল না।
সে আবারও ডাকল—
“ঈশিতা!”
এবার যেন বহুকষ্টে নিজের কণ্ঠ ফিরে পেল মেয়েটি।
“জি?”
রুহি তার দিকে তাকিয়ে বলল—
“এখন চল, বাড়ি যাই। কাল আবার আসব।”
কথাটি শুনতেই ঈশিতা রুহির দুই হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। এতক্ষণ ধরে বুকের মধ্যে জমিয়ে রাখা সমস্ত কষ্ট যেন অশ্রু হয়ে তার চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল।
কাঁপা কণ্ঠে সে বলে উঠল—
“আজ আমার জন্যই তাঁর এই অবস্থা, রুহি। আমি কীভাবে তাঁকে এভাবে ফেলে চলে যাব বল? কীভাবে যাব তাঁকে ছাড়া?”
রুহি বন্ধুর হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।
“জি, আমি বুঝতে পারছি তোর কষ্টটা। কিন্তু এখানে বসে থাকলে তো কিছুই হবে না।”
ঈশিতা অশ্রুসিক্ত চোখে তার দিকে তাকাল।
“রুহি, তুই যদি বাড়ি যেতে চাস, চলে যা। আমি এখন যেতে পারব না। আচ্ছা, তুই একবার ভেবে দেখ তো—এখানে যদি আমার ভাইয়া থাকত, আর তাঁর এমন অবস্থা হতো, তাহলে তুই কী করতিস?”
প্রশ্নটি শুনে রুহি কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল।
অতঃপর মৃদু স্বরে বলল—
“আমি জানি না, ঈশিতা। তবে একটা কথা জানিস? সেই মানুষটা তো আমাকে ভালোবাসে না।”
ঈশিতা তার দিকে তাকিয়ে রইল।
“জি?”
রুহি আর কিছু বলল না।
ঠিক সেই মুহূর্তে পাশের কেবিনের দরজা খোলার শব্দ ভেসে এল। ঈশিতা চমকে পেছন ফিরে তাকাল। দরজাটি কিছুটা ফাঁক হয়ে থাকায় ভেতরের রোগীকে সম্পূর্ণ দেখা যাচ্ছিল না। কেবল শরীরের সামান্য অংশ চোখে পড়ল। লোকটি নিদ্রামগ্ন, মুখে অক্সিজেন মাস্ক।
দৃশ্যটি দেখামাত্র ঈশিতার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
সে রুহির হাত চেপে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল—
“রুহি!”
“জি, বল।”
ঈশিতা কাঁপা আঙুলে কেবিনটির দিকে ইঙ্গিত করল।
“দেখ!”
রুহি অবাক হয়ে তাকাল।
“কী?”
ঈশিতা যেন নিজের আবিষ্কারে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছে না।
“আমার প্রেমপুরুষ!”
রুহি বিস্মিত হয়ে বলল—
“কী যে বলিস তুই!”
ঈশিতা আরও একবার তাকিয়ে বলল—
“আরে, ভালো করে দেখ না!”
রুহি এবার মনোযোগ দিয়ে কেবিনের ভেতরে দৃষ্টিপাত করল। রোগীকে সম্পূর্ণ দেখা না গেলেও অবয়বটি সত্যিই নিহাদ ভাইয়ার মতো মনে হলো।
সে ঈশিতার দিকে ফিরে বলল—
“দাঁড়া, আমি নার্সকে জিজ্ঞাসা করে আসছি।”
ঈশিতা ব্যাকুল কণ্ঠে বলল—
“জি, একটু তাড়াতাড়ি যা।”
রুহি দ্রুত পায়ে রিসেপশনের দিকে এগিয়ে গেল।
“আপা!”
নার্সটি মুখ তুলে তাকালেন।
“জি, বলুন।”
রুহি পাশের কেবিনটির দিকে ইঙ্গিত করে প্রশ্ন করল—
“আপা, ওই কেবিনে যে রোগী আছেন, ওনার নামটা কি বলতে পারবেন?”
নার্সটি স্বাভাবিক কণ্ঠে উত্তর দিলেন—
“নিহাদ চৌধুরী।”
নামটি শুনে রুহির আর কোনো সন্দেহ রইল না।
সে কিছুটা ইতস্তত করে বলল—
“আপা, আপনাকে একটা কথা বলব?”
“জি, বলুন।”
রুহি ঈশিতার দিকে হাত তুলে দেখাল।
“ওই যে মেয়েটা বসে আছে, ও হলো নিহাদ চৌধুরীর অর্ধাঙ্গিনী। ওরা দুজন একে অপরকে ভীষণ ভালোবাসে। কিন্তু কিছু ভুল-বোঝাবুঝির কারণে আজ এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আপা, আপনি একটু ওর অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করুন। এতক্ষণ ধরে মেয়েটা শুধু একবার ওনাকে দেখার জন্য অপেক্ষা করছে।”
নার্সটি বিস্মিত দৃষ্টিতে রুহির দিকে তাকালেন।
“কী বলছেন এসব? ওনার তো এখনো বিয়ে হয়নি!”
রুহি শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল—
“আপা, ওদের সম্পর্কটা হয়তো আপনার জানা নেই। তবে ওদের ভালোবাসাটা সত্যি। আপনি নিজেই একবার মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখুন। ওর চোখে যে উৎকণ্ঠা, তা ভাষায় বোঝানো সম্ভব নয়।”
নার্সটি এবার ঈশিতার দিকে তাকালেন। দূর থেকে মেয়েটির অশ্রুসিক্ত মুখশ্রী স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। তার দৃষ্টিতে এমন এক আকুলতা, যেন একটি মাত্র অনুমতির অপেক্ষায় তার সমস্ত পৃথিবী থমকে আছে।
নার্সটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
“আমি বুঝতে পারছি মেয়েটার কষ্টটা। কিন্তু আমার হাতে তো সব সিদ্ধান্ত নেই।”
রুহি অনুনয় করে বলল—
“আপা, প্লিজ! অন্তত একবার ওকে দেখা করার সুযোগ দিন।”
নার্সটি কিছুক্ষণ নীরব থেকে অবশেষে বললেন—
“আচ্ছা, দাঁড়ান। আমি দেখি কী করা যায়।”
---
নার্সটি ধীর পায়ে ঈশিতার কাছে এগিয়ে এলেন। তার কাঁধে আলতো করে হাত রেখে ডাকলেন—
“আপা!”
ঈশিতা যেন গভীর কোনো চিন্তার অতল থেকে ফিরে এল।
“আপা?”
নার্সটি তার মুখের দিকে তাকিয়ে কোমল কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন—
“ভালোবাসেন ওনাকে?”
প্রশ্নটি শুনে ঈশিতা এক মুহূর্তও দেরি করল না।
“জি, আপা।”
“কাকে?”
ঈশিতা পাশের কেবিনটির দিকে তাকাল।
“ওই কেবিনে যিনি আছেন, তাঁকে।”
নার্সটির কণ্ঠে এবার স্নিগ্ধতা ফুটে উঠল।
“দেখা করতে চান?”
ঈশিতা সঙ্গে সঙ্গে নার্সটির হাত আঁকড়ে ধরল।
“জি, আপা। খুব দেখতে চাই। প্লিজ, আমাকে একবার যেতে দিন।”
নার্সটি মৃদু হেসে বললেন—
“তাহলে যান।”
কথাটি যেন ঈশিতার কানে বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না। সে বিস্ময়ে নার্সটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
“সত্যি, আপা?”
“হ্যাঁ, তবে ভেতরে গিয়ে কোনো রকম অসুবিধা করবেন না। রোগীর বিশ্রামের প্রয়োজন। আর কোনো সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জানাবেন।”
ঈশিতার চোখে আনন্দাশ্রু চিকচিক করে উঠল।
“ধন্যবাদ, আপা। অনেক অনেক ধন্যবাদ!”
নার্সটি মৃদু হেসে বললেন—
“কোনো ব্যাপার না। ভালোবাসার মানুষকে একবার দেখার জন্য এতটা ব্যাকুলতা দেখলে মন তো নরম হয়ই।”
ঈশিতা আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। ধীর অথচ ব্যাকুল পদক্ষেপে কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল সে।
দরজাটি অর্ধেক ভেজানো ছিল। ঈশিতা কাঁপা হাতে দরজার ওপর স্পর্শ করতেই সেটি ধীরে ধীরে খুলে গেল।
কেবিনের ভেতরে প্রবেশ করার পূর্বমুহূর্তে তার অধর কেঁপে উঠল।
মনের গভীর থেকে নিঃশব্দে উচ্চারিত হলো একটি নাম—
“প্রেমপুরুষ!”
নিজের কণ্ঠের কম্পনেই যেন চমকে উঠল ঈশিতা।
কেবিনের ভেতরে পা রাখতেই তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল শয্যায় শুয়ে থাকা মানুষটির ওপর।
নিহাদ চৌধুরী!
তারই প্রেমপুরুষ!
কিন্তু এ কেমন দৃশ্য?
যে মানুষটির চোখে সর্বদা গাম্ভীর্যের দীপ্তি, কথায় থাকে দৃঢ়তা, আর উপস্থিতিতে চারপাশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমীহ করে চলে—সেই মানুষটিই আজ নিথর হয়ে শয্যায় শুয়ে আছে। মুখে অক্সিজেন মাস্ক, শরীরের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসার চিহ্ন। চিরচেনা মুখশ্রীর সেই কঠোর অভিব্যক্তিও যেন কোথায় হারিয়ে গেছে।
ঈশিতার মনে হলো, তার সমস্ত পৃথিবী যেন এক নিমেষে কেঁপে উঠল।
মানুষটা এমন হয়ে গেল কীভাবে?
সে ধীরে ধীরে নিহাদের শয্যার নিকটবর্তী হলো। কিন্তু কাছে গিয়েই তার দৃষ্টি আটকে গেল নিহাদের হাতে।
হাতের মাঝ বরাবর ব্যান্ডেজ বাঁধা। ব্যান্ডেজের ওপর কয়েকটি ক্ষুদ্র রক্তের দাগ। মাথাতেও ব্যান্ডেজ জড়ানো।
দৃশ্যটি দেখে ঈশিতার সমস্ত শরীর শিউরে উঠল।
তার বুকের ভেতরটা যেন কেউ মুঠো করে চেপে ধরেছে।
এ কি সেই নিহাদ, যে সবসময় তাকে আগলে রাখে? যে মানুষটি তার সামান্য অভিমানেও অস্থির হয়ে ওঠে? যে মানুষটি হাসতে হাসতে তার সমস্ত রাগ ভাঙিয়ে দেয়?
আজ সেই মানুষটিই নিজের যন্ত্রণা নিয়ে নিঃশব্দে শুয়ে আছে।
ঈশিতা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। কিছুটা দূর থেকে একটি চেয়ার টেনে নিয়ে নিহাদের শয্যার পাশে বসে পড়ল।
তার দৃষ্টি নিবদ্ধ রইল নিহাদের মুখশ্রীর ওপর।
কিছুক্ষণ পর অত্যন্ত মৃদু স্বরে সে ডাকল—
“প্রেমপুরুষ!”
কোনো উত্তর এল না।
ঈশিতা আরও একবার ডাকল—
“ও প্রেমপুরুষ!”
এবার তার কণ্ঠ যেন মাঝপথেই ভেঙে গেল।
"আপনাকে এই অবস্থায় দেখে অভ্যস্ত না আমি আমি পারছি না আপনাকে এই ভাবে দেখতে আমার পুরো দুনিয়া ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে আপনি ঠিক হয়ে যান না ও প্রেম পুরুষ”
নিহাদ নীরব।
কেবিনের যন্ত্রপাতির মৃদু শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই।
ঈশিতা নিজের দুই হাত একত্র করে নিহাদের হাতের কাছে রাখল।
“এই যে, শুনতে পাচ্ছেন? নিষ্ঠুর পুরুষ, আমি আপনাকে চাই। আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই। আপনার সেই গম্ভীর কণ্ঠটা শুনতে চাই। আপনি আমাকে বকুন, রাগ করুন, অভিমান করুন—তবুও এভাবে চুপ করে থাকবেন না। আমি যে আপনার এই নীরবতা সহ্য করতে পারছি না!”
অপর প্রান্ত থেকে কোনো সাড়া এল না।
ঈশিতা ব্যর্থ হলো তার প্রিয় মানুষটিকে জাগিয়ে তুলতে।
চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু মুছে সে কিছুক্ষণ নিহাদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ করেই তার অধরে ভেসে উঠল একটি সুর।
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে গুনগুন করে উঠল সে—
♡ রাগ কইরো না মনের মানুষ,
মাফ কইরা দাও আমারে।
মনের মন্দির থেকে
ভালোবাসি তোমারে।
আমি মাছ, তুমি বরশি,
টান দিলেই আসব! ♡
গানটির প্রতিটি শব্দ যেন ঈশিতার অন্তরের গভীর থেকে উঠে আসছিল। তার কণ্ঠে ছিল অনুতাপ, আকুলতা আর প্রিয় মানুষটিকে ফিরে পাওয়ার ব্যাকুল প্রার্থনা।
গান শেষ হওয়ার পর কেবিনে আবারও নেমে এল নিস্তব্ধতা।
হঠাৎ ঈশিতা অনুভব করল, তার ওড়নায় যেন মৃদু টান পড়েছে।
সে বিস্মিত হয়ে নিচের দিকে তাকাল।
নিহাদের হাত!
অচেতন অবস্থাতেও তার একটি হাত ঈশিতার ওড়নার প্রান্ত আঁকড়ে ধরে রয়েছে।
দৃশ্যটি দেখে ঈশিতার চোখ বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল।
“প্রেমপুরুষ?”
সে ধীরে ধীরে নিজের হাত বাড়িয়ে নিহাদের আঙুলগুলোর দিকে তাকাল। হাতের সেই ক্ষীণ মুঠোয় যেন অদ্ভুত এক অনুভূতি লুকিয়ে রয়েছে। বাইরে থেকে কোনো সাড়া নেই, কোনো কথা নেই; অথচ তার ওড়নার প্রান্তটি ছেড়ে দেয়নি নিহাদের হাত।
ঈশিতার চোখ বেয়ে আবারও অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
সে খুব সাবধানে চেয়ারটি শয্যার আরও কাছে টেনে নিল। তারপর নিহাদের হাতের পাশে নিজের হাত রেখে ফিসফিসিয়ে বলল—
“দেখেছেন, প্রেমপুরুষ? আপনি আমাকে ছেড়ে থাকতে পারেন না। ঘুমের মধ্যেও আমার ওড়না ধরে রেখেছেন। তাহলে জেগে উঠে আমাকে এত কষ্ট দেন কেন?”
কথাটি বলেই সে ম্লান হাসল।
“জানেন, আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, আপনাকে হারিয়ে ফেলব। আমি জানি না, আমার কী হতো তখন। শুধু জানি, আপনাকে ছাড়া আমার চারপাশের সবকিছু কেমন শূন্য হয়ে যায়।”
নিহাদ তখনো নিদ্রামগ্ন। চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধের প্রভাবে তার চেতনা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
ঈশিতা আর তাকে জাগানোর চেষ্টা করল না।
কেবল শয্যার পাশে বসে রইল। মাঝে মাঝে তার মুখের দিকে তাকাচ্ছে, কখনো আবার নীরবে দোয়া করছে—আল্লাহ যেন তার প্রিয় মানুষটিকে দ্রুত সুস্থ করে দেন।
সময় ধীরে ধীরে গড়িয়ে যেতে লাগল।
একসময় দীর্ঘ প্রতীক্ষা, মানসিক ক্লান্তি আর চোখের অবিরাম অশ্রুতে ঈশিতার নিজেরও চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। শয্যার পাশে বসে থাকতে থাকতে কখন যে তার মাথাটি ধীরে ধীরে নিহাদের বক্ষের ওপর হেলে পড়ল, সে নিজেও বুঝতে পারল না।

অবশেষে প্রিয় মানুষটির বুকের কাছেই নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়ল ঈশিতা।
একই কক্ষের নীরবতায় পাশাপাশি রইল দুটি মানুষ—একজন গভীর ওষুধঘুমে আচ্ছন্ন, অন্যজন সমস্ত উদ্বেগ ভুলে তার সান্নিধ্যে ক্লান্তির ঘুমে নিমজ্জিত।
সেই মুহূর্তে ঈশিতার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় ছিল নিহাদের বুকের কাছটুকু। আর নিহাদের নিঃশব্দ মুঠোয় আটকে থাকা ঈশিতার ওড়নার প্রান্ত যেন তাদের অপ্রকাশিত অনুভূতির এক ক্ষুদ্র সাক্ষী হয়ে রইল।
হয়তো ভালোবাসার সব কথা মুখে উচ্চারণ করতে হয় না। কখনো কখনো একটি নীরব স্পর্শ, একটি অবিচল অপেক্ষা কিংবা অচেতন হাতের ক্ষীণ মুঠোও বলে দেয় হৃদয়ের গভীরে কতখানি মায়া জমে আছে।
বাইরে তখন রাতের নিস্তব্ধতা আরও গভীর হয়েছে।
আর হাসপাতালের সেই ছোট্ট কেবিনে, সমস্ত দুঃশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তার মাঝেও, পাশাপাশি ঘুমিয়ে রয়েছে দুটি ক্লান্ত হৃদয়।
চলবে, ইনশাআল্লাহ।
পর্ব -২৩