ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার

পর্ব 23

লেখক: আরজিনা খাতুন

# প্রেম আমার
# পর্ব - ২৩

রাত্রির গভীরতা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে লাগল। নিস্তব্ধ রজনীর নিবিড় আঁধারে চারপাশ যখন ধীরে ধীরে নিদ্রার চাদরে আচ্ছাদিত, তখন ঈশিতা সম্পূর্ণরূপে ঘুমের অতল গভীরে নিমজ্জিত। নিহাদের বক্ষে মস্তক স্থাপন করে পরম নিশ্চিন্তে নিদ্রামগ্ন হয়ে আছে সে। তার কেশরাশির কোমল স্পর্শ অনাবৃত বক্ষে অনুভূত হলেও নিদ্রার গভীরতা এতটাই প্রবল যে, সেই স্পর্শের উপস্থিতি সম্পর্কে অবগত হওয়ার মতো চেতনা তার মধ্যে অবশিষ্ট নেই।

কিছুক্ষণ অতিবাহিত হওয়ার পর নিহাদের তন্দ্রাচ্ছন্ন চেতনা ধীরে ধীরে জাগ্রত হতে শুরু করল। অর্ধনিমীলিত নয়নে সে অনুভব করল, তার শীতল বক্ষে কোনো এক উষ্ণ অস্তিত্বের স্নিগ্ধ পরশ। বিস্ময়মিশ্রিত কৌতূহলে অধোবদন হতেই তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো বক্ষলগ্না প্রেয়সীর মুখশ্রীর ওপর।

সিদরাতুল ঈশিতা রহমান!

তারই বক্ষে মস্তক রেখে পরম নিশ্চিন্তে নিদ্রামগ্ন হয়ে আছে মেয়েটি।

দৃশ্যটি অবলোকন করতেই নিহাদের অধরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল। অতঃপর মৃদু স্বরে আপনমনেই বিড়বিড় করে উঠল সে—

“এতটা শান্তশিষ্ট হয়ে থাকলে কি আর আমার হাতে মার খেতে হতো, হুম?”

কথাটির মধ্যে ছিল একরাশ দুষ্টুমি, অথচ সেই দুষ্টুমির অন্তরালে লুকিয়ে ছিল প্রেয়সীর প্রতি সীমাহীন স্নেহ ও মায়া।

বাস্তবের এক অদ্ভুত অনুভূতি এই যে, প্রিয় মানুষটিকে নিদ্রামগ্ন অবস্থায় দেখলে তার পরিচিত মুখশ্রীও যেন নতুন করে ধরা দেয়। সমস্ত অভিমান, অভিযোগ আর চপলতা পেরিয়ে তখন কেবলই এক অনাবিল প্রশান্তি বিরাজ করে তার মুখমণ্ডলে। মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি থেকে দূরে, কোনো এক মায়াময় আশ্রয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে সে।

নিহাদের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম ঘটল না। তার অর্ধাঙ্গিনী ঈশিতার শান্ত, স্নিগ্ধ মুখশ্রী যেন মুহূর্তের জন্য বাস্তবের সমস্ত কোলাহলকে স্তব্ধ করে দিল। যে মেয়েটি জাগ্রত অবস্থায় কথায় কথায় অভিমান করে, সামান্য বিষয়েও মুখ ভার করে বসে থাকে, সেই মেয়েটিই এখন তার বক্ষে শিশুর ন্যায় নিশ্চিন্তে নিদ্রামগ্ন।

নিহাদ ধীরে ধীরে ঈশিতার কেশবিন্যাসের বাঁধন খুলে দিল। মুক্ত কেশরাশি বক্ষের ওপর ছড়িয়ে পড়তেই সে সযত্নে আঙুল বুলিয়ে দিল সেই কেশের ভাঁজে। অতঃপর এক গভীর দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করল—

“কবে যে তোকে হালালভাবে নিজের করে পাব, মেহু জান!”

কথাটির পর তার দৃষ্টি আচমকাই স্থির হয়ে গেল ঈশিতার মুখশ্রীর এক পাশে দৃশ্যমান ক্ষতচিহ্নটির ওপর। শুভ্র ত্বকের ওপর দাগটি যেন অস্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মুহূর্তেই তার মুখের কোমল অভিব্যক্তিতে গাম্ভীর্যের ছায়া নেমে এল। প্রেয়সীর সেই ক্ষতচিহ্ন তার অন্তরে এক অদৃশ্য অস্বস্তির জন্ম দিল।

অতি সতর্কতায় ঈশিতার মস্তক নিজের উরুর ওপর স্থাপন করে দিল নিহাদ। তারপর ধীরে ধীরে উঠে বসল সে। হাতের ব্যথাটা আগের তুলনায় কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। অথচ প্রেয়সীর সান্নিধ্যে থাকায় নিজের শারীরিক অসুবিধার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার অবকাশই পায়নি সে।

একটানা শুয়ে-বসে থাকার অভ্যাস নেই নিহাদের। তাই কিছুক্ষণ বাইরে হাঁটাচলা করার অভিপ্রায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এল সে।

কেবিনের বাইরে পা রাখতেই তার দৃষ্টি পড়ল রুহির ওপর। মেয়েটি করিডরের এক পাশে বসে নিঃশব্দে মুঠোফোনের পর্দায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ছিল। নিহাদকে দেখামাত্রই সে সোজা হয়ে বসে ডাকল—

“ভাইয়া!”

নিহাদ স্বাভাবিক গাম্ভীর্যে উত্তর দিল,
“জি?”

“কেমন আছেন এখন?”

“জি, এখন ভালো।”

“ঈশিতা কোথায়, ভাইয়া?”

“কেবিনে আছে।”

রুহি মুচকি হেসে বলল,
“আচ্ছা, তা-ই জানি! নিজের বউয়ের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন, তাই না? যান, যান, আপনাদের ব্যক্তিগত সময়ে আর ব্যাঘাত ঘটাচ্ছি না।”

রুহির কথায় নিহাদ ভ্রু কুঁচকে তাকাল। অতঃপর গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল—

“এই পিচ্চি মেয়ে, আমাদের মাঝখানে নাক গলানোর চেষ্টা করবে না। বলে দিলাম, নেক্সট টাইম যেন এসব মন্তব্য আর শুনতে না হয়। বুঝেচ?”

নিহাদের গম্ভীর স্বর শুনে রুহির মুখখানি মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল। সে তো নিছক মজা করেই কথাগুলো বলেছিল! অথচ সেই সামান্য কথাতেই নিহাদ ভাইয়া তাকে বকুনি দিয়ে বসলেন।

মনে মনে বিরক্তি প্রকাশ করে বিড়বিড় করল সে—

“সব কটা একই দলের! প্রেমে পড়লেই যেন মানুষজনের স্বভাব-চরিত্র পাল্টে যায়!”

এদিকে নিহাদ রিসেপশনের কাছাকাছি পৌঁছাতেই কর্তব্যরত এক তরুণী নার্স তাকে উদ্দেশ করে ডেকে উঠলেন—

“স্যার!”

নিহাদ দৃষ্টি ফেরাল।
“জি?”

“এখন আগের চেয়ে ভালো আছেন তো?”

“জি, ভালো আছি।”

নার্সটি কিছুক্ষণ ইতস্তত করে পুনরায় প্রশ্ন করলেন—

“আচ্ছা স্যার, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?”

“জি, বলুন।”

“ওই যে মেয়েটি আপনার সঙ্গে আছে, উনি কি আপনার গার্লফ্রেন্ড?”

প্রশ্নটি শুনে নিহাদের মুখের অভিব্যক্তি সামান্য পরিবর্তিত হলো। দৃঢ় অথচ শান্ত কণ্ঠে সে উত্তর দিল—

“She is not my girlfriend. She is my wife.”

নার্সের মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

“যাই বলুন স্যার, মেয়েটি কিন্তু ভীষণ ভালো। আপনাকে যে কতটা ভালোবাসে, তা ওর চোখেমুখেই বোঝা যায়।”

নিহাদ এবার কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাল।

“হঠাৎ এমন কথা বলছেন কেন?”

নার্সটি বলতে শুরু করলেন—

“জানেন স্যার, আপনার পরিবারের লোকজন আসার আগেই মেয়েটি এখানে এসেছিল। কিন্তু তখন পরিস্থিতির কারণে ওকে আপনার কাছে পাঠাতে পারিনি। পরে যখন আপনার পরিবারের সদস্যরা চলে গেলেন, তখন মেয়েটি আমাদের পরিচিত একজন স্টাফ নার্সের কাছে গিয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চাইল।

“আপনার কাছে আসার জন্য ও কতবার যে অনুরোধ করেছে! অথচ তখনই ওকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ওই বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করেছে মেয়েটি। আমরা অনেক ভেবেচিন্তে, পরিস্থিতি বিবেচনা করে অবশেষে ওকে আপনার কাছে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলাম।”

কথাগুলো শ্রবণ করার পর নিহাদ আর কোনো উত্তর দিল না।

তার মুখে সেই চিরপরিচিত গাম্ভীর্য অটুট রইল। তবে অধরের কোণে ক্ষীণ এক হাসির রেখা ফুটে উঠল, যা তার অন্তরের গোপন অনুভূতির নীরব সাক্ষ্য বহন করছিল।

সাড়ে তিন ঘণ্টা!

শুধুমাত্র তার কাছে আসার জন্য এতটা সময় অপেক্ষা করেছে ঈশিতা?

মেয়েটির এই নীরব ভালোবাসার কথা জেনে নিহাদের হৃদয়ের গভীরে এক অদ্ভুত অনুভূতির সঞ্চার হলো। যে ভালোবাসা উচ্চকণ্ঠে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করে না, অথচ অপেক্ষার প্রতিটি মুহূর্তে নিজের গভীরতা প্রকাশ করে—ঈশিতার ভালোবাসা যেন ঠিক তেমনই।

কিছু না বলেই নিজের প্রস্থানের পথ ধরল সে।

কেবিনে ফিরে এসে দেখল, ঈশিতা তখনো একইভাবে নিদ্রামগ্ন। তার শান্ত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে নিহাদের চোখেমুখে আবারও স্নিগ্ধতার আভাস ফুটে উঠল।

ধীর পায়ে প্রেয়সীর নিকটবর্তী হয়ে তাকে সামান্য সরিয়ে দিল সে, অতঃপর নিজেও শয্যায় শুয়ে পড়ল।

বাইরের পৃথিবী তখনো নিজস্ব গতিতে চলমান, অথচ কেবিনের এই ক্ষুদ্র পরিসরে যেন সময়ের প্রবাহ কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছে।

---

রজনীর অবসান ঘটিয়ে ধীরে ধীরে পূর্বাকাশে আলোর আভা ফুটে উঠল। রাতের গভীর অন্ধকার বিদায় নিয়ে পৃথিবীকে নতুন দিনের আগমনী বার্তা জানিয়ে দিল।

ভোরের কোমল আলোয় ঈশিতার নিদ্রাভঙ্গ হলো।

প্রথমেই নিজের শরীরের ওপর এক ভারী অস্তিত্বের উপস্থিতি অনুভব করল সে। বিস্মিত দৃষ্টিতে নিচের দিকে তাকাতেই বুঝতে পারল, নিহাদ তাকে দুই বাহুর বন্ধনে এমনভাবে আবদ্ধ করে রেখেছে যে, সামান্য নড়াচড়া করাও দুষ্কর।

তবুও ঈশিতা কিছু বলল না।

নীরবে আবারও চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করল। কিন্তু চোখের পাতায় নিদ্রা ফিরে এল না। দিনের আলো ফুটেছে বেশ কিছুক্ষণ হলো, অথচ নিহাদের ঘুম ভাঙার কোনো লক্ষণ নেই।

অবশেষে ঈশিতা আলতো করে নিহাদের গায়ে হাত রেখে মৃদু স্বরে ডাকল—

“প্রেমপুরুষ!”

নিহাদ তন্দ্রাচ্ছন্ন কণ্ঠে উত্তর দিল—

“জি?”

“কেমন আছেন?”

“জানি না।”

উত্তরটি শুনে ঈশিতার বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, নিহাদ সম্পূর্ণ ঘুমিয়ে নেই। বরং তার ধারণা, এতক্ষণ ধরে মানুষটি জেগেই ছিল। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন করল না সে।

কিছুক্ষণ পর ঈশিতা বলল—

“ছাড়ুন আমাকে।”

নিহাদ যেন কথাটি শুনতেই পেল না। বরং বাহুর বন্ধন আরও দৃঢ় করে তাকে নিজের নিকটবর্তী করে নিল।

“জি না।”

ঈশিতা বিরক্তি প্রকাশ করে বলল—

“আহ্, ছাড়ুন না! এভাবে চেপে ধরে রাখলে তো আমি একেবারে চ্যাপ্টা হয়ে যাব! এমনিতেই আপনি একটা মোটা লোক!”

কথাটি শুনে নিহাদের চোখের পাতা মুহূর্তেই খুলে গেল।

“কী বললে? আমি মোটা? এত বড় সাহস তোমার!”

ঈশিতা নির্ভীক ভঙ্গিতে উত্তর দিল—

“জি, অনেক বড় সাহস!”

কথাটি শেষ হতে না হতেই নিহাদ দুষ্টুমির বশে ঈশিতার গলার নিচে দাঁত বসিয়ে দিল।

“আহ্! ছাড়ুন!”

আকস্মিক ব্যথায় ঈশিতার চোখের কোণে অশ্রু জমে উঠল। কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়তেই নিহাদের সমস্ত দুষ্টুমি মুহূর্তের মধ্যে স্তিমিত হয়ে গেল।

সে সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সংযত করল।

“এই যে, কাঁধছো কেন?”

ঈশিতা অভিমানভরা কণ্ঠে বলল—

“ছাড়ুন!”

নিহাদ তার চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু দেখতে পেয়ে এবার সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে গেল। কণ্ঠে কোমলতা এনে জিজ্ঞাসা করল—

“আচ্ছা, বল তো, এটা কী?”

ঈশিতা মুখ ফিরিয়ে উত্তর দিল—

“জানি না।”

নিহাদ মৃদু হাসল।

“এটাকে বলে লাভ বাইট, মেহু। ভালোবাসার চিহ্ন।”

ঈশিতা আর কোনো উত্তর দিল না। কেবল নীরবে তার কথা শুনতে লাগল।

কিছুক্ষণ পর সে পুনরায় প্রশ্ন করল—

“আচ্ছা, আপনি আমাকে আঘাত করেন কেন?”

নিহাদ ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমির হাসি টেনে বলল—

“আঘাত? তোমাকে? না, ঈশিতা! তোমাকে তো শুধু একটু বিরক্ত করি। কারণ তুমি রাগ করলে তোমার মুখটা আরও বেশি মায়াবী হয়ে ওঠে।”

ঈশিতা ভ্রু কুঁচকে বলল—

“তবে এবার তো আমি রাগ করিনি। অভিমান করেছি।”

নিহাদ এবার তাকে সযত্নে নিজের কোলে বসিয়ে নিল। তারপর এমন এক ভঙ্গিতে মুখ খুলল, যেন পৃথিবীর সমস্ত অভিমানের ভার আজ তাকেই বহন করতে হবে।

“আহারে, আমার ম্যাডামজি! এত অভিমান করে থাকতে হয়? তুমি অভিমান করলে যে আমার বুকের বাঁ দিকটা একেবারে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়!”

ঈশিতা মুখ গোমড়া করে বলল—

“অভিমান ভাঙল না।”

নিহাদ বিস্মিত হওয়ার ভান করে বলল—

“কী বলো! আমার মেহু জানের এখনো অভিমান ভাঙেনি?”

ঈশিতা তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে ভেংচি কাটল।

“জি না।”

নিহাদ কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ নিজের মুখখানি ঈশিতার কাঁধের কাছে নিয়ে গিয়ে মৃদু স্বরে গুনগুন করতে শুরু করল—

“কত দিন ভেবেছি শুধু
দেখব যে তোমায়,
ক্লান্তিহীন তুমি ছিলে
আমার কল্পনায়।
এই ছবি উঠল ভেসে
চোখেরই পাতায়…”

গুনগুনানি থামতেই তার উষ্ণ নিঃশ্বাস ঈশিতার ঘাড়ের কাছে এসে পড়ল। ঈশিতা সামান্য কেঁপে উঠল। অন্যের নিঃশ্বাসের স্পর্শ তার বরাবরই অস্বস্তিকর লাগে।

সে মৃদু স্বরে ডাকল—

“প্রেমপুরুষ!”

“জি?”

“আমি এবার আসি।”

নিহাদ সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করল—

“এক্ষুনি?”

“জি।”

মেয়েটির যাওয়ার কথা শুনে নিহাদ আর তাকে আটকে রাখল না। কেবল শান্ত কণ্ঠে বলে উঠল—

“আল্লাহ হাফেজ, মেহু জান।”

ঈশিতা মৃদু স্বরে উত্তর দিল—

“জি, আল্লাহ হাফেজ, প্রেমপুরুষ।”

---

কেবিন থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতেই ঈশিতার দৃষ্টি পড়ল রুহির ওপর। তাকে সেখানে দেখে বিস্ময়ে বলে উঠল—

“রুহি!”

রুহি মুখ তুলে তাকাল।

“জি, বলেন।”

“তুই এখনো বাড়ি যাসনি?”

“জি না। আপনাকে এভাবে রেখে যেতে ইচ্ছা করছিল না।”

ঈশিতা মৃদু হেসে বলল—

“ও আচ্ছা!”

রুহি এবার দুষ্টুমিভরা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল।

“তা বলি, নিজের প্রেমপুরুষের সঙ্গে তো বেশ সময় কাটালেন! এবার চলুন। নাহলে আপনার শ্বশুরবাড়ির লোকজন এসে যদি আমাকে ধোলাই দেয়, তখন কী হবে?”

ঈশিতা মুখ নামিয়ে মৃদু স্বরে বলল—

“জি, কিন্তু যেতে ইচ্ছা করছে না।”

রুহি কথাটি শুনে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ যেন কোনো একটি বিষয় তার নজরে পড়ল। সে ঈশিতার গলার নিচের দিকে ইঙ্গিত করে প্রশ্ন করল—

“এই ঈশিতা, দাঁড়া তো! ওটা কী?”

ঈশিতা দ্রুত নিজের পোশাকের অংশটি ঠিক করে নিয়ে বলল—

“কী আবার? কিছু না।”

রুহির মুখে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।

“ওহ্! বুঝেছি।”

ঈশিতা চোখ ছোট করে তাকাল।

“কী বুঝেছিস, শুনি?”

রুহি আর কোনো উত্তর দিল না। কেবল মুচকি হেসে অন্যদিকে তাকাল।

কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সে আবার প্রশ্ন করল—

“আচ্ছা ঈশিতা, একটা কথা বল তো—তুই নিহাদ ভাইয়াকে কতটা ভালোবাসিস?”

প্রশ্নটি শুনে ঈশিতার মুখশ্রী মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে উঠল। তার দৃষ্টি যেন অদৃশ্য কোনো এক দূরত্বে নিবদ্ধ হলো, যেখানে নিহাদ নামের মানুষটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার সমস্ত অনুভূতি, সমস্ত আবেগ আর অনন্ত প্রত্যাশা।

ধীর অথচ দৃঢ় কণ্ঠে সে উত্তর দিল—

“যে ভালোবাসার কোনো সমাপ্তি নেই, কোনো সীমারেখা নেই, সেই ভালোবাসাই আমি নিহাদ চৌধুরীকে বাসি। আমার ভালোবাসাকে কোনো নির্দিষ্ট পরিমাপে মাপা সম্ভব নয়, রুহি। কারণ সে শুধু আমার প্রিয় মানুষ নয়—সে আমার হৃদয়ের এমন এক অংশ, যাকে নিজের থেকে আলাদা করে কল্পনা করাও আমার পক্ষে অসম্ভব।”

ঈশিতার কথাগুলো শুনে রুহির মুখের দুষ্টুমিভরা হাসি ধীরে ধীরে স্নিগ্ধতায় রূপ নিল। সে সস্নেহে ঈশিতার হাতটি ধরে বলল—

“জি, এভাবেই ভালোবেসে যা, বোন। মন থেকে দোয়া করি, তোদের এই ভালোবাসা যেন সারাজীবন অটুট থাকে। জীবনের যত বাধাই আসুক না কেন, তোরা যেন একে অপরের হাত কখনো ছেড়ে না দিস। দেখবি, আল্লাহ চাইলে কোনো বাধাই তোদের ভালোবাসার চেয়ে বড় হতে পারবে না।”

ঈশিতা নীরবে হাসল।

সেই হাসির অন্তরালে লুকিয়ে ছিল একরাশ স্বপ্ন, এক বুক ভালোবাসা আর প্রিয় মানুষটিকে ঘিরে অসংখ্য অপ্রকাশিত প্রত্যাশা।

ভালোবাসা যে কেবল পাশাপাশি থাকার নাম নয়; বরং দূরত্বের মাঝেও একজনের জন্য অন্যজনের হৃদয়ে অবিচল হয়ে থাকার নাম—ঈশিতা যেন নিজের অজান্তেই সেই সত্যকে ধারণ করে চলেছে।

নিহাদ চৌধুরী আর সিদরাতুল ঈশিতা রহমানের গল্পের পথচলা তাই এখনো অব্যাহত। তাদের জীবনের সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা সময়ই জানে।

তবে তাদের ভালোবাসার গল্পে এখনো অনেক অধ্যায় লেখা বাকি।

চলবে, ইনশাআল্লাহ।
পর্ব — ২৪

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 23 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন