ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার

পর্ব 26

লেখক: আরজিনা খাতুন

# প্রেম আমার
#পর্ব -২৬

সময় তার চিরপরিচিত আবাহিত গতিতে বয়ে চলে আপন মহিমায়, আর মানুষও সেই সময়ের স্রোতে ভেসে ছুটে চলে জীবনের অনিশ্চিত গন্তব্যের পানে। গ্রীষ্মের প্রখর রৌদ্র যেন প্রকৃতির বুকে এঁকে দিয়েছে এক ভিন্নতর চিত্রপট। নীলাকাশের বিস্তীর্ণ ক্যানভাসে শুভ্র মেঘের দল আপন খেয়ালে ভেসে বেড়াচ্ছে, আর সূর্যের তপ্ত কিরণ ছড়িয়ে পড়ছে ধরিত্রীর বুকে। বাতাসের উষ্ণ পরশেও যেন লুকিয়ে রয়েছে এক অদ্ভুত ব্যস্ততা—প্রকৃতি তার নিজস্ব ছন্দে এগিয়ে চলেছে নিরন্তর। এরই মাঝে নিঃশব্দে অতিবাহিত হয়ে গেল প্রায় দুটি মাস। সময়ের আবর্তনে বদলে গেছে অনেক কিছু, পাল্টেছে জীবনের চেনা সমীকরণ; অথচ কিছু অনুভূতি আজও রয়ে গেছে হৃদয়ের গহিনে, সময়ের কাছে নতিস্বীকার না করে।
তবে সময়ের মহিমায়ার জালে জড়িয়ে পড়া সিদরাতুল ঈশিতা রহমান আর নিহাদ চৌধুরির ভালোবাসার কোনো সমাপ্তি হয় নি দুজনেই যেন নিজের অজান্তেই সময় এর সাথে সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের পূর্ণতার দিকে ছুটে যাচ্ছে ।নতুন শিক্ষাবর্ষের সূচনায় দ্বাদশ শ্রেণির গণ্ডিতে পা রেখেছে নিহাদ চৌধুরী। স্কুলজীবনের শেষ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে তার, সামনে উচ্চমাধ্যমিকের ব্যস্ততা, ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন আর জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের হাতছানি।”সবার মনেই যেন জমে উঠেছে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা। এতগুলো বছর যে বিদ্যালয়ের আঙিনায় কেটেছে হাসি-আনন্দ, দুষ্টুমি আর অসংখ্য স্মৃতির আবেশে, আজ সেই চেনা প্রাঙ্গণ ছেড়ে যাওয়ার সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই হৃদয়ের গহিনে জমাট বাঁধছে এক অব্যক্ত মায়া। কেউই যেন মন থেকে মেনে নিতে পারছে না—আর মাত্র কিছুদিন, তারপরই শেষ হবে এই বিদ্যালয়জীবনের দীর্ঘ পথচলা। পরিচিত শ্রেণিকক্ষ, করিডোরের প্রতিটি কোণ, বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো অমূল্য মুহূর্তগুলো ধীরে ধীরে পরিণত হবে স্মৃতির পাতায়। অথচ মনটা আজও পড়ে আছে সেই চেনা দিনগুলোর মায়ায়, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তে মিশে রয়েছে জীবনের এক টুকরো ভালোবাসা।

আজ মূলত সবাই মিলে এই কথা নিয়েই কাটালো কয়েক টা ক্লাস । কিভাবে সবাই নিজের নিজের গন্তব্যে পৌঁছাবে কিভাবেই বা ছেড়ে যাবে এই চিরচেনা স্থান ।
বিদ্যালয়ের বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণে তখন নবপ্রভাতের কর্মচঞ্চলতা ক্রমশ পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। গ্রীষ্মের তপ্ত রৌদ্রের আবরণ ভেদ করে সূর্যের কিরণ এসে পড়েছে করিডোরের মেঝেতে, আর সেই আলোকচ্ছটার মধ্য দিয়েই শিক্ষার্থীদের অবিরাম পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে চিরপরিচিত শিক্ষাঙ্গন। কোথাও বন্ধুদের পুনর্মিলনের উচ্ছ্বাস, কোথাও নতুন শিক্ষাবর্ষের পরিকল্পনা, আবার কোথাও আসন্ন পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে গভীর আলোচনা—সব মিলিয়ে বিদ্যালয়ের প্রতিটি কোণে যেন জীবনের এক স্বতন্ত্র কাব্য রচিত হচ্ছে।

এরই মধ্যে করিডোরের অপর প্রান্ত থেকে আগমন ঘটল সিদরাতুল ঈশিতা রহমানের। পাশে তার কয়েকজন সহপাঠিনী, কথোপকথনের অবকাশে মুখে মৃদু হাসির রেখা। পরনে পরিপাটি পোশাক, অবগুণ্ঠিত কেশরাশির পরিবর্তে সুশৃঙ্খলভাবে আবৃত মাথা, আর চোখেমুখে এক প্রশান্ত সৌন্দর্যের আভাস। বান্ধবীদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সে যখন সিঁড়ির নিকটবর্তী স্থানে এসে উপস্থিত হলো, ঠিক তখনই সম্মুখ দিক থেকে এগিয়ে আসা একটি পরিচিত অবয়বের প্রতি তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো।

নিহাদ চৌধুরী।

দ্বাদশ শ্রেণির নবীন শিক্ষাবর্ষে পদার্পণকারী যুবকটির চলনে-বলনে বরাবরের মতোই সংযমের ছাপ। মুখাবয়বে প্রশান্ত গাম্ভীর্য, দৃষ্টিতে স্থিরতা, আর ব্যক্তিত্বে এমন এক অনাড়ম্বর দৃঢ়তা, যা তাকে সমবয়সিদের ভিড়েও স্বতন্ত্র পরিচিতি প্রদান করে। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কোনো একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে করতেই সে এগিয়ে আসছিল। কিন্তু ঈশিতার উপস্থিতি দৃষ্টিগোচর হওয়ামাত্র তার মনোযোগ যেন অনায়াসেই স্থানান্তরিত হলো সেই পরিচিত মুখটির দিকে।

অপরদিকে ঈশিতার পদক্ষেপেও যেন ক্ষণিকের স্থবিরতা নেমে এল। পরিচিত মানুষটির সঙ্গে পুনরায় সম্মুখীন হওয়ার এই সাধারণ মুহূর্তটুকু তার অন্তরে অদ্ভুত এক প্রশান্তির সঞ্চার করল। ভালোবাসার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের হলেও প্রতিটি সাক্ষাতের মধ্যে যে এক নতুন অনুভূতির জন্ম হতে পারে, ঈশিতা যেন বারবার তারই সাক্ষ্য বহন করে। চোখাচোখি হতেই নিহাদের অধরে ফুটে উঠল মৃদু হাসির রেখা। ঈশিতাও দৃষ্টির ভাষায় সেই হাসির প্রত্যুত্তর জানিয়ে বান্ধবীদের কাছ থেকে সামান্য সরে এল।

নিহাদ ততক্ষণে তার নিকটবর্তী হয়েছে।

— আসসালামু আলাইকুম।

ঈশিতার কণ্ঠে উচ্চারিত সম্ভাষণটুকু ছিল কোমল, অথচ তাতে মিশে ছিল পরিচিত এক আন্তরিকতা।

— ওয়ালাইকুমুস সালাম।

নিহাদ প্রত্যুত্তর জানিয়ে ঈশিতার মুখাবয়বের দিকে তাকাল।

— কেমন আছ তুমি?

— আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?

— আলহামদুলিল্লাহ, ভালো। তবে তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, আজ তোমার মেজাজ বেশ ভালো।

নিহাদের মন্তব্যে ঈশিতা সামান্য বিস্মিত হলো। তারপর ভ্রু কুঞ্চিত করে বলল,

— কেন? আমার মেজাজ ভালো থাকলে কি আপনার কোনো সমস্যা আছে?

— সমস্যা থাকার তো কথা নয়। কিন্তু তোমার এই প্রশ্নোত্তরের ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, আমার কথার মধ্যে কোনো অপরাধ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা চলছে।

ঈশিতা এবার মৃদু হেসে ফেলল। নিহাদের সঙ্গে তার এই কথোপকথনের ধরনটি নতুন নয়। দীর্ঘদিনের পরিচয়, পারস্পরিক বোঝাপড়া আর সম্পর্কের গভীরতা তাদের কথার মধ্যেও এমন এক স্বাভাবিকতা এনে দিয়েছে, যেখানে সামান্য খুনসুটিও অনায়াসে স্নেহের প্রকাশ হয়ে ওঠে।

— আপনি সব সময় এমন করেন কেন বলুন তো? একটা সাধারণ কথা বললেও তার মধ্যে কত কিছু খুঁজে বের করেন!

— আর তুমি এমনভাবে উত্তর দাও, যেন পৃথিবীর সমস্ত প্রশ্নের জবাব তোমার কাছেই সংরক্ষিত রয়েছে।

— বেশ তো! তাহলে আজ থেকে আমাকে কোনো প্রশ্ন করবেন না।

— আচ্ছা, সেই ব্যবস্থাই করা যেতে পারে।

নিহাদের এমন নির্বিকার উত্তর প্রত্যাশা করেনি ঈশিতা। সে মুহূর্তেই মুখ গম্ভীর করে ফেলল।

— সত্যিই আর কথা বলবেন না?

নিহাদ এবার আর হাসি সংবরণ করতে পারল না।

— এই তো! কথা না বলার কথা শুনেই তোমার আপত্তি শুরু হয়ে গেল।

ঈশিতা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ঠোঁটের কোণে অনিচ্ছাসত্ত্বেও হাসির আভাস ফুটে উঠেছে। নিহাদকে সে যতই গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ হিসেবে জানুক, তার এই মৃদু পরিহাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মমতাটুকু ঈশিতার অজানা নয়।

কিছুক্ষণ পর নিহাদ নিজেই কথার প্রসঙ্গ পরিবর্তন করল।

— আচ্ছা, তোমাদের নতুন শিক্ষাবর্ষের ক্লাস কেমন চলছে?

— এই তো, চলছে। তবে আপনারা তো এবার দ্বাদশ শ্রেণিতে উঠেছেন। আপনাদের নিশ্চয়ই এখন থেকে অনেক পড়াশোনা করতে হবে?

— সেটা তো করতেই হবে। সামনে উচ্চমাধ্যমিক। সময় নষ্ট করার সুযোগ খুব একটা নেই।

কথাটি বলেই নিহাদ সামান্য বিরতি নিল। তার দৃষ্টিতে তখন এক ধরনের বাস্তববোধের প্রতিফলন। জীবনের এই পর্যায়ে এসে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতন হওয়া যে অপরিহার্য, তা সে যথেষ্ট উপলব্ধি করে। তবে সেই উপলব্ধির সঙ্গে ঈশিতাকে ঘিরে থাকা অনুভূতিগুলোর কোনো বিরোধ নেই—অন্তত তার কাছে বিষয়টি তেমনই।

ঈশিতা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,

— জানেন, এই কথাটাই আমার মাঝে মাঝে কেমন যেন লাগে।

নিহাদ তার দিকে তাকাল।

— কোন কথাটা?

— এই যে, স্কুলজীবনটা ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসছে। এতগুলো বছর এখানে কাটালাম। অথচ মনে হয়, এই তো সেদিন প্রথম এই বিদ্যালয়ে এসেছিলাম। এখন আবার সবাই আলাদা আলাদা পথে এগিয়ে যাবে।

ঈশিতার কণ্ঠে এবার আর খুনসুটির আভাস রইল না। বরং তার কথার অন্তরালে প্রকাশ পেল পরিচিত পরিবেশকে হারিয়ে ফেলার এক অনুচ্চারিত আশঙ্কা। বিদ্যালয়ের প্রতিটি পরিচিত স্থান, সহপাঠীদের সঙ্গে কাটানো সময়, শ্রেণিকক্ষের অসংখ্য স্মৃতি—সবকিছুই যে একদিন অতীত হয়ে উঠবে, সেই উপলব্ধি তাকে অদ্ভুতভাবে আবেগপ্রবণ করে তুলেছে।

নিহাদ মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনল। তারপর শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

— পরিবর্তন তো জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ, ঈশিতা। কোনো একটি সময়কে চিরকাল একইভাবে ধরে রাখা সম্ভব নয়। আজ আমরা বিদ্যালয়ে আছি, কাল হয়তো অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করব। মানুষের অবস্থান বদলাবে, দায়িত্ব বদলাবে, জীবনের পরিধিও বিস্তৃত হবে। কিন্তু তাই বলে অতীতের মূল্য কিংবা সেই সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর গুরুত্ব তো মুছে যায় না।

ঈশিতা নীরবে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

নিহাদ আবার বলল,

— বরং সময়ের পরিবর্তনই আমাদের বুঝিয়ে দেয়, কোন স্মৃতিগুলো আমাদের কাছে কতখানি মূল্যবান। যে দিনগুলোকে আজ সাধারণ বলে মনে হচ্ছে, ভবিষ্যতে হয়তো সেই দিনগুলোর কথাই সবচেয়ে বেশি মনে পড়বে।

কথাগুলো শুনে ঈশিতার চোখেমুখে ধীরে ধীরে প্রশান্তির আভাস ফুটে উঠল।

— আপনি মাঝে মাঝে এমন সব কথা বলেন যে, তখন আর কোনো উত্তর খুঁজে পাই না।

— সব কথার উত্তর দিতে হয় না। কিছু কথা বুঝতে পারলেই যথেষ্ট।

— তার মানে, আপনি মনে করেন আমি সবকিছু বুঝি না?

— আমি এমন কিছু বলেছি নাকি?

— না, বলেননি। তবে আপনার কথা শুনলে মাঝে মাঝে এমনই মনে হয়।

নিহাদ মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

— তোমার সঙ্গে কথা বলার সময় সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, তুমি আমার সাধারণ কথাকেও অসাধারণ অর্থ প্রদান করতে সক্ষম।

ঈশিতা এবার প্রাণখুলে হেসে উঠল। তার হাসির শব্দে পাশ দিয়ে অতিক্রম করা দু-একজন শিক্ষার্থী কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকালেও সে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করল না। নিহাদের উপস্থিতিতে এমন নির্ভার হয়ে ওঠার সুযোগ সে সব সময় পায় না; তাই এই সামান্য মুহূর্তটুকুও তার কাছে অমূল্য।

হঠাৎ ঈশিতার দৃষ্টি নিহাদের কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটির দিকে গেল।

— আচ্ছা, আপনার ব্যাগে এত বই কেন? আজ কি সব বই নিয়ে এসেছেন?

— দ্বাদশ শ্রেণিতে উঠেছি বলে কি বইগুলো বাড়িতে রেখে আসব?

— তা নয়। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই এত প্রস্তুতি দেখে মনে হচ্ছে, আপনি এখন থেকেই পরীক্ষার হলে বসে গেছেন।

— প্রস্তুতি আগে থেকে না নিলে শেষ মুহূর্তে তোমার মতো অযথা চিন্তা করতে হবে।

কথাটি শুনে ঈশিতা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল।

— এই যে! আমি আবার অযথা চিন্তা করি কখন?

— এইমাত্র তো বিদ্যালয়জীবন শেষ হওয়ার আগেই তার জন্য বিষণ্ণ হয়ে পড়লে।

— সেটা অযথা চিন্তা নয়। সেটা অনুভূতি।

নিহাদ কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,

— আচ্ছা, মেনে নিলাম। তোমার অনুভূতিগুলো নিয়ে আপাতত কোনো বিতর্কে যাচ্ছি না।

— খুব ভালো। অন্তত আজ একটা বুদ্ধিমানের মতো কথা বললেন।

— ধন্যবাদ। তোমার কাছ থেকে এমন প্রশংসা পাওয়া যে কতটা দুর্লভ, তা আমার অজানা নয়।

ঈশিতা আবারও হেসে উঠল।

ঠিক সেই মুহূর্তেই বিদ্যালয়ের ঘণ্টাধ্বনি সমগ্র প্রাঙ্গণে প্রতিধ্বনিত হলো। করিডোরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে হঠাৎ ব্যস্ততা বেড়ে গেল। কেউ দ্রুত শ্রেণিকক্ষের দিকে এগিয়ে চলল, কেউ আবার বন্ধুর সঙ্গে অসমাপ্ত কথোপকথন শেষ করার চেষ্টা করল। ঈশিতাও সময়ের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বুঝতে পারল, তার আর এখানে দাঁড়িয়ে থাকা উচিত নয়।

— আচ্ছা, আমার এখন ক্লাসে যেতে হবে। পরে কথা হবে, ইনশাআল্লাহ।

নিহাদ মাথা নাড়ল।

— ঠিক আছে। সাবধানে যেয়ো।

ঈশিতা কয়েক পা এগিয়ে গিয়েও থমকে দাঁড়াল। তারপর পুনরায় ফিরে তাকিয়ে বলল,

— আর শুনুন!

— বলো।

— আজ কিন্তু বাড়ি ফিরে আমাকে মেসেজ করবেন। আপনার সঙ্গে একটা কথা আছে।

নিহাদ সামান্য বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করল,

— কী কথা?

— সেটা এখন বলা যাবে না।

— তাহলে মেসেজ করার আগে অন্তত বিষয়টা সম্পর্কে সামান্য ধারণা দেওয়া যায় না?

— না। সবকিছু কি আগেভাগেই জানতে হবে?

কথাটি বলেই ঈশিতা মৃদু হেসে নিজের শ্রেণিকক্ষের দিকে এগিয়ে গেল। তার পদক্ষেপে তখন এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত চাঞ্চল্য, আর মুখাবয়বে খেলা করছে রহস্যময় হাসির রেখা।

নিহাদ কয়েক মুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মাথা নেড়ে নিজের শ্রেণিকক্ষের অভিমুখে অগ্রসর হলো। ঈশিতার শেষ কথাটি তার মনে কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই কৌতূহলের সঙ্গে মিশে রয়েছে এক অনির্বচনীয় ভালো লাগা।

জীবনের বৃহত্তর পরিসরে হয়তো এই সাক্ষাৎ ছিল নিতান্তই ক্ষুদ্র একটি ঘটনা। না ছিল কোনো বিশেষ আয়োজন, না ছিল আবেগের নাটকীয় বহিঃপ্রকাশ। ছিল কেবল পরিচিত দুটি মানুষের সামান্য কথোপকথন, কিছু হাসি-পরিহাস, ভবিষ্যৎ নিয়ে কয়েকটি ভাবনা আর বিদায়ের আগে রেখে যাওয়া একটি ছোট্ট প্রতিশ্রুতি।

অথচ ভালোবাসার সৌন্দর্য বোধ হয় এখানেই—যেখানে প্রতিটি মুহূর্তকে অসাধারণ করে তোলার জন্য বিশেষ কোনো উপলক্ষের প্রয়োজন হয় না। প্রিয় মানুষের উপস্থিতি, তার কণ্ঠের পরিচিত সুর কিংবা অকারণে অভিমান করার স্বাধীনতাটুকুই কখনো কখনো একটি সাধারণ দিনকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য যথেষ্ট হয়ে ওঠে।

আর সেই সাধারণ দিনের বুকেই, অজান্তে, জমা হতে থাকে ভবিষ্যতের অসংখ্য স্মৃতির বীজ।

______________

বর্তমানে ঈশিতার বিদ্যালয়ে আসার পরিমাণও বেশ খানিকটা কমে গিয়েছে। সামনে মাধ্যমিক পরীক্ষা, তাই পড়াশোনার বাড়তি চাপ সামলাতে গিয়ে দিনগুলো তার কাটছে ভীষণ ব্যস্ততায়। বইয়ের পাতা, পড়ার টেবিল আর আসন্ন পরীক্ষার প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে নিজের জন্য অবসরটুকুও যেন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠেছে। তবুও এই ব্যস্ততার ভিড়ে একে অপরের জন্য সময় বের করে নিতে ভোলে না তারা। দিনের শত ব্যস্ততা, পড়াশোনার অগণিত চাপ আর হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও নিহাদ ও ঈশিতা নিজেদের মতো করে খুঁজে নেয় একটুখানি অবসর, যেখানে জমে থাকা কথাগুলো ভাগ করে নেওয়া যায়, দূরত্বের মাঝেও অনুভব করা যায় পরস্পরের সান্নিধ্য। যেন সময়ের ব্যস্ত আবর্তেও তাদের দুজনের জন্য বরাদ্দ রয়ে গেছে একান্ত নিজস্ব কিছু মুহূর্ত, যেখানে পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে ওঠে কেবল তাদের দুজনের উপস্থিতি।বিদ্যালয়ের ঘণ্টাধ্বনিতে সূচিত হলো নতুন শিক্ষাদিবসের আনুষ্ঠানিকতা। করিডোরের কোলাহল ক্রমশ স্তিমিত হয়ে শিক্ষার্থীদের পদচারণা যখন নির্দিষ্ট শ্রেণিকক্ষের অভিমুখে নিবদ্ধ হলো, তখন নিহাদ চৌধুরীও ধীর পদক্ষেপে নিজের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করল। দ্বাদশ শ্রেণির নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিককার দিনগুলোতে সহপাঠীদের মধ্যে যেমন উৎসাহের সঞ্চার ঘটেছে, তেমনই আসন্ন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ভাবনাও ক্রমশ তাদের মনোজগতে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছে।

শ্রেণিকক্ষের জানালার পাশে নির্ধারিত আসনে উপবিষ্ট হয়ে নিহাদ ব্যাগ থেকে প্রয়োজনীয় বইপত্র বের করে নিল। বাইরে তখনও গ্রীষ্মের রৌদ্র তীব্র প্রতাপে পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। জানালার ফাঁক গলে প্রবেশ করা উষ্ণ বাতাস শ্রেণিকক্ষের পর্দাকে মৃদু আন্দোলিত করছে। অথচ পরিবেশের এই পরিচিত দৃশ্যাবলির মধ্যেও নিহাদের চিন্তাধারার একাংশ বারবার ফিরে যাচ্ছিল করিডোরে ঘটে যাওয়া সেই সামান্য কথোপকথনের দিকে।

ঈশিতার অভিমানমিশ্রিত প্রশ্ন, তার অনাবিল হাসি এবং বিদায়ের প্রাক্কালে রেখে যাওয়া রহস্যময় কথাটি—সবকিছুই যেন অজান্তে তার মনোজগতে স্বতন্ত্র স্থান করে নিয়েছে।

‘আজ কিন্তু বাড়ি ফিরে আমাকে মেসেজ করবেন। আপনার সঙ্গে একটা কথা আছে।’

কথাটি স্মরণ হতেই নিহাদের অধরে ক্ষীণ হাসির রেখা পরিলক্ষিত হলো। ঈশিতার স্বভাব তার অজানা নয়। কখনো তুচ্ছ কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে দীর্ঘ অভিমানের অবতারণা, কখনো আবার সামান্য কথার আড়ালে লুকিয়ে রাখা অগণিত প্রশ্ন—এসবই তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের পরিচিত অনুষঙ্গ। তবুও আজকের কথাটির মধ্যে এমন এক রহস্যময়তা ছিল, যা তার স্বাভাবিক কৌতূহলকে খানিকটা উসকে দিয়েছে।

— কী ব্যাপার, একা একাই এত হাসছিস কেন?

পাশ থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বরে চিন্তাচ্ছেদ ঘটল নিহাদের। মুখ তুলে তাকিয়ে দেখল, তার বন্ধু ইশান পাশের বেঞ্চে এসে বসেছে। মুখাবয়বে দুষ্টুমির আভাস, দৃষ্টিতে স্পষ্ট কৌতূহল।

নিহাদ পুনরায় বইয়ের পাতায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করে নির্বিকার কণ্ঠে বলল,

— তোর কি মনে হয়, হাসার জন্যও কারও অনুমতি নিতে হয়?

ইশান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

— অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু তোর মতো সর্বদা গম্ভীর প্রকৃতির মানুষের মুখে হঠাৎ এমন রহস্যময় হাসি দেখলে কৌতূহল জাগাটাই স্বাভাবিক।

— নিজের কৌতূহল নিজের কাছেই রাখ।

— ওহ্! বুঝেছি। নিশ্চয়ই ঈশিতার কোনো কাণ্ডকারখানা চলছে!

ইশানের মন্তব্যে নিহাদ এবার তার দিকে দৃষ্টিপাত করল। চোখেমুখে সেই চিরপরিচিত গাম্ভীর্য ফুটে উঠলেও বন্ধুর ঠাট্টায় বিরক্তির পরিবর্তে সামান্য অপ্রস্তুতভাবই প্রকাশ পেল।

— ইশান!

— আচ্ছা, আচ্ছা! আর কিছু বলছি না। তবে একটা কথা বলি, তোর এই গম্ভীর মুখের আড়ালে যে এত কাহিনি লুকিয়ে আছে, সেটা ভাবলেই অবাক লাগে।

নিহাদ কোনো প্রত্যুত্তর দিল না। কেবল বইয়ের পাতা উল্টে দেওয়ার ভঙ্গিতে নিজের মনোযোগ পড়াশোনায় নিবদ্ধ করার চেষ্টা করল। ইশানও আর বিষয়টি নিয়ে অযথা পরিহাস করল না। বন্ধুটির ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রতি তার যথেষ্ট শ্রদ্ধা রয়েছে; তাই হাস্যকৌতুকের সীমা অতিক্রম করার অভ্যাস তার নেই।

কিছুক্ষণের মধ্যেই শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের আগমন ঘটল। শুরু হলো পাঠদানের আনুষ্ঠানিকতা। বোর্ডে একের পর এক বিষয়বস্তু লিখিত হতে লাগল, শিক্ষক ব্যাখ্যা করতে থাকলেন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের বিভিন্ন দিক। অন্যান্য শিক্ষার্থীর মতো নিহাদও মনোযোগ দিয়ে পাঠ অনুসরণ করছিল। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি বরাবরই সুস্পষ্ট। আবেগকে জীবনের অংশ হিসেবে স্বীকার করলেও দায়িত্বের প্রতি অবহেলা করার মানুষ সে নয়।

তবুও অবচেতন মনের এক কোণে ঈশিতার সেই শেষ কথাটি বারবার ফিরে আসছিল।

অন্যদিকে বিদ্যালয়ের অপর একটি শ্রেণিকক্ষে বসেও ঈশিতার মন সম্পূর্ণরূপে পাঠে নিবিষ্ট হতে পারছিল না। শিক্ষিকার কণ্ঠে ব্যাখ্যা করা পাঠ্যবিষয় তার কর্ণগোচর হচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু মনোযোগের গভীরে কোথাও যেন অন্য এক ভাবনার আনাগোনা অব্যাহত ছিল। বারবার মনে পড়ছিল করিডোরে নিহাদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো।

নিহাদের সেই শান্ত স্বর, কথার মধ্যে লুকিয়ে থাকা মৃদু পরিহাস আর পরিবর্তন সম্পর্কে তার যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা—সবকিছুই ঈশিতার মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তির জন্ম দিয়েছিল। সে জানে, নিহাদ সহজে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে না। তার ভালোবাসার প্রকাশও অনেকাংশে সংযত, কথার চেয়ে কাজে অধিক সুস্পষ্ট। আর সেই সংযত স্বভাবের অন্তরালেই ঈশিতা খুঁজে পেয়েছে এমন এক নির্ভরতা, যার মূল্য তার কাছে অপরিসীম।

হঠাৎ পাশ থেকে সাদিয়া মৃদু স্বরে ডাকল,

— ঈশিতা, কী হয়েছে তোর? সকাল থেকে দেখছি কেমন অন্যমনস্ক হয়ে আছিস।

ঈশিতা চমকে তাকাল।

— কই, কিছু হয়নি তো!

সাদিয়া সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

— কিছু হয়নি? তাহলে ম্যাডাম এতক্ষণ ধরে একই পাতার দিকে তাকিয়ে আছিস কেন?

ঈশিতা তৎক্ষণাৎ বইয়ের পাতা উল্টে দিল। তার এই অপ্রস্তুত আচরণ দেখে সাদিয়া হাসি সংবরণ করতে পারল না।

— বুঝেছি, বুঝেছি। নিশ্চয়ই বিশেষ কোনো ব্যক্তির চিন্তায় আমাদের বিদুষী মহোদয়ার পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটেছে!

ঈশিতা এবার তার হাতের ওপর আলতো চাপ দিয়ে ফিসফিস করে বলল,

— সাদিয়া, চুপ কর! ম্যাডাম শুনতে পেলে কিন্তু সমস্যা হবে।

— আচ্ছা বাবা, চুপ করলাম। তবে ছুটির সময় সব শুনব।

ঈশিতা আর কোনো উত্তর দিল না। কেবল মৃদু হাসল। কিন্তু তার হৃদয়ের অন্তঃস্থলে যে ক্ষুদ্র কৌতূহলটি ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছিল, তা সহজে উপেক্ষা করার মতো ছিল না। আজ বাড়ি ফিরে নিহাদকে যে কথাটি বলবে বলে স্থির করেছে, সেটি আদৌ কীভাবে উপস্থাপন করবে, সেই ভাবনাই তাকে বারবার দ্বিধাগ্রস্ত করে তুলছিল।

সময়ের নিজস্ব গতিতে অতিবাহিত হতে লাগল শিক্ষাদিবসের অবশিষ্ট প্রহরগুলো। একের পর এক শ্রেণি, পাঠদান, সহপাঠীদের সঙ্গে কথোপকথন—সবকিছুর মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল বিদ্যালয়ের কর্মব্যস্ত দিন। কখনো শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল শিক্ষার্থীরা, কখনো আবার বিরতির অবকাশে সহপাঠীদের সঙ্গে মেতে উঠল হাসি-পরিহাসে।

নিহাদ যথারীতি নিজের পড়াশোনায় মনোনিবেশ করে রইল। মাঝেমধ্যে ইশান কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে এলে সে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিচ্ছিল, আর অবসরে খাতায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো লিখে নিচ্ছিল। অন্যদিকে ঈশিতাও পাঠের প্রতি মনোযোগ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করল। যদিও সকালের কথোপকথনের স্মৃতি এবং নিজের অজানা পরিকল্পনাটি তার চিন্তার অন্তরালে নীরবে অবস্থান করছিল।

অবশেষে দীর্ঘ শিক্ষাদিবসের সমাপ্তিলগ্ন উপস্থিত হলো।

বিদ্যালয়ের করিডোরে শেষবারের মতো প্রতিধ্বনিত হলো ছুটির ঘণ্টাধ্বনি। মুহূর্তের মধ্যেই শ্রেণিকক্ষগুলোতে শুরু হয়ে গেল শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততা। কেউ বইপত্র ব্যাগে গুছিয়ে নিতে লাগল, কেউ বন্ধুর সঙ্গে পরদিনের পড়া নিয়ে আলোচনা করতে করতে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। জানালার বাইরে গ্রীষ্মের রৌদ্র তখনও উজ্জ্বল, অথচ ব

চলবে ইনশাল্লাহ
পর্ব - ২৭

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 26 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন