# পর্ব -২৭
#প্রেম আমার
বিদ্যালয়ের শেষ ঘণ্টা ধ্বনিত হতেই সমগ্র প্রাঙ্গণে যেন মুহূর্তের মধ্যে কোলাহলের সঞ্চার হলো। এতক্ষণ শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ থাকা শিক্ষার্থীরা একে একে নিজেদের গন্তব্যের অভিমুখে অগ্রসর হতে লাগল। কারও মুখে বাড়ি ফেরার তাড়া, কারও চোখেমুখে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ সময় কাটানোর আকাঙ্ক্ষা। অথচ এই চিরপরিচিত ব্যস্ততার মাঝেও ঈশিতার মনোজগৎ জুড়ে বিরাজ করছিল এক অদ্ভুত অস্থিরতা।
আজ বিদ্যালয়ে নিহাদ চৌধুরীকে কিছু কথা বলার অভিপ্রায় ছিল তার। কথাগুলো খুব সাধারণ, অথচ কেন জানি না, নিহাদের সম্মুখে দাঁড়িয়ে সেগুলো উচ্চারণ করার সাহসটুকু সে সঞ্চয় করে উঠতে পারেনি। কতবার যে মনে মনে কথাগুলো সাজিয়েছে, তার হিসাব নেই। কিন্তু প্রতিবারই নিহাদের শান্ত দৃষ্টির সম্মুখীন হয়ে তার সমস্ত বাক্য যেন কণ্ঠনালিতে এসে থমকে গিয়েছে।
“ঈশিতা, কী হয়েছে তোর? সেই কখন থেকে দেখছি, কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে আছিস!”
ঈশানের কণ্ঠস্বরে চিন্তাজগৎ থেকে বাস্তবে প্রত্যাবর্তন করল ঈশিতা। ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসার চেষ্টা করল সে।
“কই, কিছু হয়নি তো!”
ঈশান ভ্রু কুঁচকে বোনের মুখপানে তাকাল। ঈশিতার এই এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা তার অজানা নয়। ছোটবেলা থেকেই বোনটির মুখের সামান্য পরিবর্তন দেখেও সে তার মনের অবস্থা আঁচ করার চেষ্টা করে এসেছে।
“কিছু হয়নি, অথচ মুখখানা এমন করে রেখেছিস কেন? চল, বাড়ি ফিরতে হবে।”
ঈশিতা আর কোনো উত্তর দিল না। ভাইয়ের পাশাপাশি পা মিলিয়ে বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ অতিক্রম করল সে। পথের দুপাশে শরতের স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে পড়েছে। আকাশের বুকে ভেসে বেড়ানো শুভ্র মেঘগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল, তারাও যেন নিজ নিজ গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। অথচ ঈশিতার মন পড়ে রইল এমন একজন#প্রেম আমার
মানুষের কাছে, যার সঙ্গে আজও তার অনেক কথা বলা বাকি।
কিছুক্ষণ পর ভাই-বোন নিজেদের বাড়িতে পৌঁছাল। ঈশান নিজের ঘরের দিকে চলে গেলে ঈশিতাও নিঃশব্দে নিজের কক্ষে প্রবেশ করল। বিদ্যালয়ের পোশাক পরিবর্তন করে জানালার পাশে এসে দাঁড়াল সে। বাইরে বিকেলের আলো ক্রমশ ম্লান হয়ে আসছে। অথচ তার অন্তরে জমে থাকা প্রশ্নগুলোর কোনো অবসান নেই।
অবশেষে সমস্ত দ্বিধার অবসান ঘটিয়ে সে মুঠোফোনটি হাতে তুলে নিল। নিহাদের নামটি পর্দায় দৃশ্যমান হতেই তার আঙুল কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করল—
ঈশিতা: আসসালামু আলাইকুম। আশা করি, আপনি সুস্থতার সঙ্গে বাড়িতে পৌঁছেছেন। বিদ্যালয়ে আপনাকে একটি কথা বলার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু পরিস্থিতির কারণে আর বলা হয়ে ওঠেনি। যদি আপনার আপত্তি না থাকে, তবে কিছুক্ষণ আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই।
বার্তাটি প্রেরণ করার পর ঈশিতা মুঠোফোনের পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল। সময় যেন অস্বাভাবিক ধীরগতিতে অতিবাহিত হতে লাগল। কয়েক মুহূর্ত পরেই অপর প্রান্ত থেকে প্রত্যুত্তর এল।
নিহাদ: ওয়ালাইকুমুস সালাম। আলহামদুলিল্লাহ, আমি ভালো আছি। আশা করি, তুমিও ভালো আছ। অবশ্যই, বলো। তোমার কথা শোনার জন্য আমি আছি।
নিহাদের উত্তরটি পড়ে ঈশিতার মুখে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তবু মনের কথাগুলো প্রকাশ করার পূর্বে সে আরেকবার ভাবল। কিছু অনুভূতি এমনই হয়—হৃদয়ের গভীরে যাদের অবস্থান, তাদের কাছেই সেগুলো ব্যক্ত করা সবচেয়ে কঠিন।
ঈশিতা: আসলে, কয়েক দিন ধরে একটা বিষয় নিয়ে ভাবছি। মাঝে মাঝে মনে হয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই বদলে যায়। মানুষের অভ্যাস, পছন্দ, এমনকি একে অপরের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও। তাই না?
নিহাদ: হ্যাঁ, সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন আসাটা স্বাভাবিক। তবে সব পরিবর্তন সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়, এমন নয়। কিছু পরিবর্তন মানুষকে আরও পরিণত করে, আর কিছু সম্পর্ককে নতুন করে বুঝতে শেখায়।
ঈশিতা: কিন্তু যদি একসময় পরিচিত মানুষগুলোও অপরিচিত হয়ে যায়? যদি যাদের সঙ্গে প্রতিদিন কথা বলতে অভ্যস্ত, একদিন তাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগটুকুও না থাকে?
বার্তাটি পাঠিয়ে ঈশিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিজের প্রশ্নের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অনুভূতিগুলো নিহাদ বুঝতে পারবে কি না, সে জানে না। তবে এই মুহূর্তে তার অন্তরের কথাগুলো কাউকে বলতে ইচ্ছা করছিল, আর সেই কাউকে হিসেবে নিহাদের কথাই তার মনে এসেছিল।
নিহাদ: দূরত্ব তৈরি হলেই যে মানুষ অপরিচিত হয়ে যায়, তা নয়, ঈশিতা। কখনো কখনো পরিস্থিতি মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়, কিন্তু পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস আর আন্তরিকতা অটুট থাকলে দূরত্বের মধ্যেও সম্পর্কের অস্তিত্ব বজায় থাকে।
ঈশিতা: আপনার কি সত্যিই এমনটা মনে হয়?
নিহাদ: শুধু মনে হয় না, আমি বিশ্বাসও করি। তবে একটা কথা মনে রেখো—কোনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব একা একজনের নয়। দুজনেরই আন্তরিকতা প্রয়োজন। আর সব অনুভূতি প্রকাশ করতে না পারলেও, নীরবতার অর্থ বুঝতে শেখাটাও গুরুত্বপূর্ণ।
নিহাদের কথাগুলো পড়ে ঈশিতা কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে রইল। মানুষটি খুব বেশি কথা বলে না, নিজের অনুভূতিও সহজে প্রকাশ করে না। অথচ তার সামান্য কয়েকটি বাক্যের মধ্যেই এমন এক আশ্বাস লুকিয়ে থাকে, যা ঈশিতার সমস্ত অস্থিরতাকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও প্রশমিত করে দেয়।
ঈশিতা: জানেন, আপনার সঙ্গে কথা বললে আমার অনেক কিছুই সহজ মনে হয়। অথচ বিদ্যালয়ে আপনার সামনে দাঁড়ালে ঠিক কী বলব, সেটাই ভুলে যাই। আজও কত কথা বলার কথা ভেবেছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই বলা হলো না।
নিহাদ: সব কথা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। তবে নিজের মনের কথা নিজের কাছেও গোপন করে রেখো না। আর আমার সামনে কথা বলতে দ্বিধা হলে, সময় নিয়ে বলবে। আমি তাড়াহুড়ো করে তোমার কাছ থেকে কোনো উত্তর প্রত্যাশা করি না।
ঈশিতা: আপনার সঙ্গে কথা না হলে দিনটা কেমন যেন অসম্পূর্ণ মনে হয়। কথাটা হয়তো আপনার কাছে খুব সাধারণ, কিন্তু আমার কাছে নয়। জানি না কেন এমন হয়।
বার্তাটি পাঠানোর পর ঈশিতার হৃদস্পন্দন যেন ক্ষণিকের জন্য বেড়ে গেল। কথাটি কি বেশি বলে ফেলা হলো? নিহাদ কী ভাববে? এমন অসংখ্য প্রশ্ন তার মনে উঁকি দিতে লাগল।
অন্যদিকে, নিজের ঘরে বসে মুঠোফোনের পর্দায় ঈশিতার বার্তাটি পড়ল নিহাদ। তার মুখের অভিব্যক্তিতে বিশেষ কোনো পরিবর্তন ঘটল না, তবে দৃষ্টিতে ফুটে উঠল এক গভীর মনোযোগ। কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে প্রত্যুত্তর দিল—
নিহাদ: কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলাটা অভ্যাসের চেয়েও বেশি কিছু হয়ে ওঠে। তাদের উপস্থিতি দিনের সাধারণ মুহূর্তগুলোতেও আলাদা অর্থ যোগ করে। তবে অনুভূতির সৌন্দর্য তখনই অক্ষুণ্ণ থাকে, যখন তার সঙ্গে বিশ্বাস ও সম্মান বজায় থাকে।
ঈশিতা বার্তাটি পড়ে মৃদু হাসল। নিহাদ সরাসরি কিছু বলল না, অথচ তার কথার মধ্যে এমন এক আন্তরিকতা ছিল, যা ঈশিতার মনকে অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিল।
ঈশিতা: আগামীকাল বিদ্যালয়ে আপনার সঙ্গে একটু নিরিবিলিতে কথা বলতে পারি? আজ যে কথাটা বলতে চেয়েছিলাম, সেটা সামনাসামনি বলতেই চাই।
নিহাদ: অবশ্যই পারবে। তোমার যখন সুবিধা হবে, জানিয়ো। তবে নিজের ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি কোরো না। যা বলার আছে, ধীরে-সুস্থে বলবে।
ঈশিতা: জি, বলব ইনশাআল্লাহ। আজ তাহলে রাখি। আল্লাহ হাফেজ।
নিহাদ: আল্লাহ হাফেজ, ঈশিতা। ভালো থেকো।
মুঠোফোনের পর্দা নিভে যাওয়ার পরও ঈশিতা বেশ কিছুক্ষণ সেটির দিকে তাকিয়ে রইল। আজকের কথোপকথন তার মনের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেয়নি, কিন্তু অস্থিরতার ভেতর একটুখানি স্বস্তি এনে দিয়েছে। আগামীকাল কী হবে, নিহাদের সামনে দাঁড়িয়ে সে আদৌ নিজের মনের কথাগুলো প্রকাশ করতে পারবে কি না—এসবের কোনো নিশ্চয়তা তার কাছে নেই।
তবু আজকের রাতটি তার কাছে অন্য রকম হয়ে রইল।
অন্যদিকে, নিহাদও মুঠোফোনটি পাশে রেখে জানালার বাইরে তাকাল। শরতের সন্ধ্যা ইতিমধ্যে রাত্রির গভীরতায় বিলীন হয়েছে। চারপাশে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা, অথচ তার চিন্তার জগতে যেন একটি নামই বারবার ফিরে আসছে—ঈশিতা।
কিছু কথা বলা হয়ে ওঠে না, কিছু অনুভূতি প্রকাশের পূর্বেই নীরবতার আড়ালে আশ্রয় নেয়। তবু সেই অনুচ্চারিত অনুভূতিগুলোই কখনো কখনো মানুষের হৃদয়ে সবচেয়ে গভীর ছাপ রেখে যায়।
আর এভাবেই, একটি অসমাপ্ত কথোপকথনের রেশ বুকে নিয়ে, দুজন মানুষ অপেক্ষা করতে থাকল পরবর্তী দিনের জন্য—যে দিন হয়তো কিছু প্রশ্নের উত্তর মিলবে, কিংবা জন্ম নেবে আরও কিছু নতুন প্রশ্ন।
" প্রেম আমার "
শরতের স্নিগ্ধ প্রভাতে প্রকৃতি যেন আপন সৌন্দর্যের সমস্তটুকু উজাড় করে পৃথিবীর বুকে এক মায়াবী আবেশ ছড়িয়ে দিয়েছে। পূর্বদিগন্তে উদিত সূর্যের কোমল কিরণ শিশিরসিক্ত ঘাসের ওপর প্রতিফলিত হয়ে চারপাশকে অপূর্ব স্নিগ্ধতায় ভরিয়ে তুলেছে। দূর মসজিদ থেকে ভেসে আসা ফজরের আজানের ধ্বনি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতেই চারপাশে শুরু হলো নতুন দিনের ব্যস্ততা।
রহমান পরিবারের বাড়িতেও সকাল থেকেই কর্মব্যস্ততার অন্ত ছিল না।
ঈশিতা নিজের কক্ষে বসে বিদ্যালয়ের বইখাতা গুছিয়ে নিচ্ছিল। গতরাতের কথোপকথনের পর থেকে তার অন্তঃকরণে এক অদ্ভুত অস্থিরতা বিরাজ করছে। আজ বিদ্যালয়ে নিহাদের সঙ্গে দেখা হবে, হয়তো গতকাল অসমাপ্ত থেকে যাওয়া কথাগুলোও বলা হয়ে উঠবে। কিন্তু নিজের মনের গভীরে জমে থাকা অনুভূতিগুলো কীভাবে প্রকাশ করবে, সেই ভাবনাই তাকে বারবার দ্বিধাগ্রস্ত করে তুলছিল।
“ঈশিতা! আর কতক্ষণ লাগবে তোর?”
বাইরে থেকে ঈশানের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“হয়ে গেছে, ভাইয়া! আসছি।”
কথাটি বলেই ঈশিতা বইখাতাগুলো ব্যাগে ভরে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এল। ঈশান তখন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। বোনকে দেখে একবার ঘড়ির দিকে তাকাল সে।
“প্রতিদিন একই অবস্থা! সময়ের দিকে তোর কোনো খেয়াল আছে? বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় হলে তবেই তোর সব কাজ মনে পড়ে!”
ঈশিতা মুখ নিচু করে বলল, “আর দেরি করব না, ভাইয়া।”
“শুধু বললেই হবে না। নিজের কাজের প্রতি একটু দায়িত্বশীল হতে শেখ। সব সময় অন্য কাউকে তোকে মনে করিয়ে দিতে হবে কেন?”
ঈশিতা আর কোনো প্রত্যুত্তর দিল না। সে জানত, ভাইয়ের সঙ্গে তর্কে জড়ালে অকারণেই সময় নষ্ট হবে। ঈশান স্বভাবতই গম্ভীর; কোনো বিষয়ে একবার সতর্ক করলে সেই কথা অগ্রাহ্য করা তার কাছে সহজ নয়।
দুজন একসঙ্গে সকালের খাবার খেতে বসল। ঈশান লক্ষ করল, ঈশিতা অন্যমনস্কভাবে খাবার গ্রহণ করছে। মাঝে মাঝেই তার দৃষ্টি দূরে কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে, যেন শরীর এখানে থাকলেও মন পড়ে রয়েছে অন্য কোনো চিন্তার জগতে।
“কী হয়েছে তোর?”
ঈশানের প্রশ্নে ঈশিতা চমকে উঠল।
“কিছু হয়নি তো!”
“তাহলে এমন অন্যমনস্ক হয়ে আছিস কেন? আমি কথা বলছি, আর তুই শুনছিস কি না, সেটাও বুঝতে পারছি না।”
“ভাবছিলাম একটু।”
“কী নিয়ে ভাবছিলি?”
ঈশিতা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, “এমনিই, ভাইয়া। বিশেষ কিছু না।”
ঈশান ভ্রু কুঁচকে বোনের দিকে তাকাল।
“দেখ, ঈশিতা, আমি তোকে অকারণে বকাঝকা করি না। কিন্তু তোর কোনো সমস্যা হলে সেটা গোপন করে রাখার অভ্যাসটা আমার একদম পছন্দ নয়। সব কথা আমাকে বলতে হবে, এমন দাবি করছি না; তবে এমন কিছু করবি না, যাতে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনিস। বুঝেছিস?”
ঈশিতা মৃদু স্বরে উত্তর দিল, “জি, বুঝেছি।”
“তাহলে মন দিয়ে খাওয়া শেষ কর। তারপর একসঙ্গে বেরোব।”
ভাইয়ের কঠোর কথাগুলোর আড়ালে লুকিয়ে থাকা উদ্বেগটুকু ঈশিতার অজানা নয়। ছোটবেলা থেকেই ঈশান তাকে আগলে রেখেছে। কখনো শাসন করে, কখনো রাগ দেখিয়ে, আবার কখনো কোনো কথা না বলেই তার প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো এগিয়ে দিয়ে। তার ভালোবাসার প্রকাশভঙ্গি কোমল নয়, কিন্তু সেই ভালোবাসার গভীরতা নিয়ে ঈশিতার মনে কখনো সংশয় জাগেনি।
খাওয়া শেষ করে দুজন বিদ্যালয়ের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।
শরতের সকালটি ছিল মনোরম। পথের দুপাশে সবুজ বৃক্ষরাজি, দূর আকাশে ভেসে চলা শুভ্র মেঘমালা আর মৃদুমন্দ বাতাসে পরিবেশটি যেন এক স্নিগ্ধ সৌন্দর্যে সজ্জিত হয়ে উঠেছিল। ঈশান নিজের মতো করে নানা বিষয়ে কথা বলছিল, আর ঈশিতা তার পাশে নীরবে হেঁটে চলছিল।
হঠাৎ ঈশান লক্ষ করল, বোনটি তার কথার যথাযথ উত্তর দিচ্ছে না।
“ঈশিতা, আমি তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করছি।”
“হ্যাঁ, ভাইয়া?”
“কথা শুনছিস না কেন?”
“শুনছি তো!”
“শুনলে উত্তর দিচ্ছিস না কেন? তোর এই অন্যমনস্কতা আমার একদম ভালো লাগছে না।”
ঈশিতা এবার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
“আচ্ছা, আর এমন হবে না।”
ঈশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “সব সময় এমনভাবে কথা বলিস, যেন আমি তোকে অকারণে শাসন করি! তোর ভালো-মন্দ দেখব না তো কে দেখবে?”
ঈশিতা আর কিছু বলল না। বরং ভাইয়ের কথায় তার ঠোঁটের কোণে স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল। এই কঠোর মানুষটির রাগের সঙ্গে তার পরিচয় বহুদিনের; তাই তার কথার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা মমতাটুকু বুঝতে ঈশিতার বিশেষ অসুবিধা হয় না।
কিছুক্ষণ পর তারা বিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারে এসে পৌঁছাল।
বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে তখন শিক্ষার্থীদের আনাগোনা বেড়েছে। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে মত্ত, কেউ শ্রেণিকক্ষের দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলেছে, আবার কেউ দিনের প্রথম ঘণ্টা বাজার পূর্বেই নিজের আসনে পৌঁছানোর তাগিদে ব্যস্ত।
ঈশান বোনের দিকে তাকিয়ে বলল, “সোজা নিজের শ্রেণিকক্ষে যাবি। অকারণে করিডরে দাঁড়িয়ে থাকবি না। আর কোনো প্রয়োজন হলে আমাকে জানাবি।”
ঈশিতা একটু বিরক্তির সুরে বলল, “ভাইয়া, আমি এখন আর ছোট নেই!”
ঈশান গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকাল।
“আমার কাছে তুই এখনো সেই ছোট বোনটাই আছিস। বড় হয়েছিস বলেই যে সবকিছু বুঝে গেছিস, এমন নয়। পৃথিবীতে অনেক কিছু আছে, যেগুলো অভিজ্ঞতা দিয়ে শিখতে হয়। তাই বলে নিজের ইচ্ছেমতো সব সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে থাকবি না।”
ঈশিতা আর তর্ক করল না। নীরবে মাথা নেড়ে ভাইয়ের সঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করল।
ঠিক সেই সময় করিডরের অপর প্রান্তে নিহাদ চৌধুরীকে দেখতে পেল সে।
বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল নিহাদ। পরনে পরিপাটি বিদ্যালয়ের পোশাক, মুখে চিরপরিচিত গাম্ভীর্য। তার স্বভাবের মধ্যে এমন এক সংযম ছিল, যা তাকে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র করে তুলত। চারপাশে এত কোলাহল থাকা সত্ত্বেও তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের জগতে স্থির হয়ে আছে।
ঈশিতার পদক্ষেপ অজান্তেই ধীর হয়ে এল।
গতকাল সন্ধ্যায় নিহাদের সঙ্গে হওয়া কথোপকথনটি তার মনে পড়ে গেল। কত সহজভাবে মানুষটি তার কথাগুলো শুনেছিল! কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে তাকে তাড়াহুড়ো করায়নি, কোনো অনুভূতি প্রকাশ করার জন্যও বাধ্য করেনি। অথচ সেই সামান্য আন্তরিকতাই ঈশিতার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল।
নিহাদও একসময় তার দিকে তাকাল।
দুজনের দৃষ্টি ক্ষণিকের জন্য মিলিত হলো। নিহাদ মৃদু মাথা নেড়ে অভিবাদন জানাল। ঈশিতাও সংযত হাসিতে তার প্রত্যুত্তর দিল।
কিন্তু এই সামান্য ঘটনাটুকুও ঈশানের দৃষ্টি এড়াল না।
“কাকে দেখে হাসছিলি?”
প্রশ্নটি শুনে ঈশিতা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল।
“একজন পরিচিত মানুষ, ভাইয়া।”
“পরিচিত মানুষ মানে?”
“আমাদের বিদ্যালয়েই পড়ে।”
ঈশান কয়েক মুহূর্ত বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
“দেখ, কারও সঙ্গে পরিচয় থাকা অন্যায় নয়। কিন্তু কার সঙ্গে কতটা মিশছিস, কীভাবে কথা বলছিস, সে বিষয়ে সচেতন থাকবি। কারও প্রতি অকারণে বিশ্বাস স্থাপন করবি না। মানুষকে চিনতে সময় লাগে।”
ঈশিতা এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল, “আমি কি এতটাই অবুঝ যে কিছুই বুঝি না?”
“আমি কি বলেছি তুই কিছুই বুঝিস না? বুঝিস বলেই তোকে আরও সতর্ক থাকতে বলছি। আমার কথা ভালো না লাগতে পারে, কিন্তু তোর কোনো ক্ষতি হোক, সেটা আমি মেনে নিতে পারব না।”
ঈশিতার মুখের অভিব্যক্তি কিছুটা নরম হয়ে এল। সে জানত, ঈশান তাকে সন্দেহ করার জন্য এসব বলছে না। বরং তার প্রতি অতিরিক্ত যত্নশীল বলেই ভাইটি সবকিছু আগে থেকে ভেবে রাখতে চায়।
“আচ্ছা, ভাইয়া। এবার যেতে দাও। ঘণ্টা বেজে যাবে।”
ঈশান ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, “যা। আর মন দিয়ে ক্লাস করবি।”
ঈশিতা নিজের শ্রেণিকক্ষের দিকে এগিয়ে গেল। ঈশানও নিজের শ্রেণিকক্ষের উদ্দেশে রওনা হলো। তবে যাওয়ার আগে একবার বোনের দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিল, সে ঠিক পথেই যাচ্ছে।
ঈশিতার মুখে তখন আর কোনো বিরক্তি ছিল না। বরং ভাইয়ের এই অতিরিক্ত সতর্কতা তাকে একদিকে যেমন খানিকটা বিব্রত করত, অন্যদিকে তেমনই নিরাপত্তার এক অদৃশ্য আশ্রয় দিত।
শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে নিজের নির্দিষ্ট আসনে বসে পড়ল সে। বই খুলে পাঠে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করল। শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতেই শিক্ষার্থীদের কথোপকথন স্তব্ধ হয়ে গেল। শুরু হলো পাঠদান।
কিন্তু ঈশিতার অন্তরের গভীরে তখনও একটি কথাই প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল—আজ তাকে নিহাদের সঙ্গে কথা বলতেই হবে।
গতকাল যে কথাটি বলার সাহস সে সঞ্চয় করতে পারেনি, আজ আর সেটি অসমাপ্ত রাখতে চায় না। তবু তার মনের মধ্যে এক অদ্ভুত সংকোচ কাজ করছিল। কীভাবে কথার সূচনা করবে, কোথা থেকে শুরু করবে, কিছুই যেন স্থির করতে পারছিল না।
অবশেষে কয়েকটি ক্লাস অতিবাহিত হলো। বিরতির ঘণ্টা বাজতেই শিক্ষার্থীরা একে একে শ্রেণিকক্ষের বাইরে বেরিয়ে এল।
ঈশিতা নিজের বইগুলো গুছিয়ে দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি করিডরের দিকে নিবদ্ধ হলো। কিছুক্ষণ পর নিহাদকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল।
কাছে এসে নিহাদ শান্ত স্বরে বলল, “ঈশিতা, তুমি কি আমার সঙ্গে একটু কথা বলতে চেয়েছিলে?”
ঈশিতা মৃদু মাথা নাড়ল।
“জি, আপনি যদি একটু সময় দেন।”
“অবশ্যই। বলো।”
ঈশিতা কথা বলতে উদ্যত হয়েছিল, ঠিক তখনই পেছন থেকে ঈশানের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল—
“ঈশিতা!”
পরিচিত কণ্ঠে সে ফিরে তাকাল। ঈশান দ্রুত পায়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছিল। তার দৃষ্টি প্রথমে বোনের ওপর, তারপর নিহাদের মুখের ওপর স্থির হলো।
“এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বিরতির সময় সীমিত। ক্লাসে যাওয়ার সময় হলে আবার দেরি করবি।”
ঈশিতা সংযত স্বরে বলল, “ভাইয়া, আমি একটু কথা বলছিলাম।”
“কথা পরে বলবি। এখন ক্লাসে যা।”
ঈশিতার মুখে ক্ষীণ অভিমানের ছায়া ফুটে উঠল।
“সব সময় এমন করো কেন? আমি কি কারও সঙ্গে দুটো কথা বলতেও পারব না?”
ঈশান কিছুক্ষণ নীরব থেকে দৃঢ় স্বরে বলল, “পারবি। কিন্তু কোন পরিস্থিতিতে, কীভাবে কথা বলছিস, সেটাও বুঝতে হবে। আমি তোকে সবকিছু থেকে আটকে রাখতে চাই না, ঈশিতা। আমি শুধু চাই, তুই যেন কোনো সমস্যায় না পড়িস।”
তার কণ্ঠে কঠোরতা থাকলেও শেষ কথাগুলোর মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠল বোনের প্রতি তার গভীর উদ্বেগ।
নিহাদ পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে শান্তভাবে বলল, “আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। ঈশিতা আমার সঙ্গে কিছু কথা বলতে চেয়েছিল। প্রয়োজনে পরে কথা হবে।”
ঈশান তার দিকে তাকাল।
“আমি আমার বোনের ব্যাপারে একটু বেশি সতর্ক। ওর ভালো-মন্দের বিষয়ে আমি কোনো অবহেলা করতে চাই না।”
নিহাদ সংযত কণ্ঠে উত্তর দিল, “আপনার উদ্বেগটা বুঝতে পারছি।”
ঈশান আর কোনো কথা বাড়াল না। বোনের দিকে তাকিয়ে বলল, “এবার ক্লাসে যা। আর টিফিনের সময় ঠিকমতো খাবি। পরে যেন শুনতে না হয়, সারাদিন কিছু খাসনি।”
ঈশিতা অভিমানী চোখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে শ্রেণিকক্ষের দিকে এগিয়ে গেল।
ঈশান কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের শ্রেণিকক্ষের দিকে পা বাড়াল। তার মুখে তখনও গাম্ভীর্য অটুট, কিন্তু অন্তরে বোনকে নিয়ে দুশ্চিন্তা যেন কিছুতেই প্রশমিত হচ্ছিল না।
অন্যদিকে, শ্রেণিকক্ষে ফিরে নিজের আসনে বসে পড়ল ঈশিতা। ভাইয়ের ওপর তার সামান্য অভিমান হয়েছিল বটে, কিন্তু সে জানত, ঈশান কখনো তার অমঙ্গল কামনা করতে পারে না। তার শাসনের প্রতিটি বাক্যের পেছনে রয়েছে বোনকে আগলে রাখার একান্ত আকাঙ্ক্ষা।
তবু নিহাদের সঙ্গে অসমাপ্ত কথোপকথনটি তার মনে রয়ে গেল।
আজও কি কথাগুলো অব্যক্ত থেকে যাবে?
নাকি বিদ্যালয়ের শেষ প্রহরে আবারও কোনো সুযোগ এসে উপস্থিত হবে?
জানালার বাইরে শরতের মেঘগুলো ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছিল। শ্রেণিকক্ষের ভেতরে শিক্ষক পাঠদান করে চলেছেন, শিক্ষার্থীরা মনোযোগ দিয়ে শুনছে। আর সেই পরিচিত পরিবেশের মাঝখানে বসে ঈশিতা নীরবে অপেক্ষা করছিল উপযুক্ত মুহূর্তটির জন্য।
সে জানত না, আগামী কয়েক ঘণ্টায় কী ঘটবে। শুধু এটুকুই জানত—কিছু কথা আজ তাকে বলতেই হবে।
কারণ, কিছু অনুভূতি দীর্ঘদিন ধরে হৃদয়ের গভীরে জমিয়ে রাখলে সেগুলো একসময় নীরবতাকেও ভারী করে তোলে।
আর ঈশিতার সেই নীরবতার অন্তরালে ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছিল এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
চলবে ইনশাল্লাহ
পর্ব - ২৮