#প্রেম আমার
#পর্ব - ২৮
“এভাবেই সময়ের অমোঘ নিয়মে অতিবাহিত হয়ে গেল দুটি দিন।”
হৃদয়ে জমে থাকা কথা গুলো এখনও ঠিক ভাবে বলতে পারিনি ঈশিতা তবুও যেনো আজ অনেক টাই খুশি
শরতের এক স্নিগ্ধ প্রভাত ধীরে ধীরে অপরাহ্ণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। নীলাকাশের বিস্তীর্ণ ক্যানভাসে শুভ্র মেঘের ভেলাগুলো আপন খেয়ালে ভেসে বেড়াচ্ছে। মৃদুমন্দ সমীরণের স্পর্শে বৃক্ষশাখার পাতাগুলো আন্দোলিত হয়ে প্রকৃতির বুকে এক অনির্বচনীয় সুরের সৃষ্টি করছে। চারপাশে বিরাজমান সেই স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের মধ্যেও রহমান পরিবারের গৃহকোণে আজ যেন অন্য রকম এক ব্যস্ততার আবির্ভাব ঘটেছে।
নিজের কক্ষের সম্মুখে কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে দাঁড়িয়ে রইল ঈশিতা। অন্তরে সুপ্ত আনন্দের ক্ষীণ অনুরণন, চোখেমুখে অপ্রকাশিত ব্যাকুলতা, আর অধরপ্রান্তে বারবার ফুটে উঠেও মিলিয়ে যাওয়া এক টুকরো হাসি—সব মিলিয়ে তার আচরণে আজ এক অদ্ভুত পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছিল।
আজ সে নিহাদের সঙ্গে দেখা করবে।
চিন্তাটুকু মনে উদিত হতেই হৃদয়ের গভীরে এক অনির্বচনীয় শিহরণ অনুভব করল ঈশিতা। অথচ এই সামান্য ইচ্ছেটুকু বাস্তবায়িত করাও তার পক্ষে সহজসাধ্য নয়। কারণ, তার মা ফাহিমা রহমান যথেষ্ট নিয়মনিষ্ঠ; বিশেষত ঈশিতার বাইরে যাওয়ার বিষয়ে তিনি অযথা প্রশ্রয় দিতে নারাজ। আর ঈশান রহমান—বোনের প্রতি যার স্নেহের প্রকাশ অধিকাংশ সময়েই কঠোর শাসনের আবরণে আচ্ছাদিত—তার অনুমতি ব্যতীত ঈশিতার পক্ষে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রায় অসম্ভব।
তবু আজ তাকে চেষ্টা করতেই হবে।
মনের মধ্যে সাহস সঞ্চয় করে মায়ের কক্ষের দিকে এগিয়ে গেল সে। ফাহিমা রহমান তখন কিছু প্রয়োজনীয় কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। মেয়েকে সামনে এসে দাঁড়াতে দেখে তিনি মুখ তুলে তাকালেন।
“কী হয়েছে, ঈশিতা? কিছু বলবি?”
ঈশিতা মায়ের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর যথাসম্ভব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, “মা, তোমাকে একটা কথা বলব?”
“বল।”
“মা, আজ আমি আমার বান্ধবীদের সঙ্গে একটু ঘুরতে যেতে চাই। অনেক দিন কোথাও যাওয়া হয়নি। ওদের সঙ্গে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে বিকেলের মধ্যেই বাড়ি ফিরে আসব।”
কথাগুলো বলার সময় ঈশিতার কণ্ঠে ছিল এক ধরনের বিনীত আকুতি। সে জানত, মায়ের সম্মতি পাওয়াটাই সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।
ফাহিমা রহমান কাজ থামিয়ে মেয়ের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন।
“ঘুরতে যাবি মানে? কোথায় যাবি, কারা যাবে, কখন ফিরবি—এসব কিছু না জানিয়ে হঠাৎ করে ঘুরতে যাওয়ার কথা বললেই কি আমি অনুমতি দিয়ে দেব?”
ঈশিতা তাড়াতাড়ি বলল, “না মা, হঠাৎ করে বলছি না। আসলে ওরা অনেক দিন ধরেই বলছিল। আজ সবাই একসঙ্গে সময় পেয়েছি, তাই ভাবলাম—”
“ঈশিতা, কথার পিঠে কথা বলিস না। তোদের বয়সে বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কোথায় যাচ্ছিস, কার সঙ্গে থাকছিস, কখন ফিরছিস—এসব নিশ্চিত না হয়ে আমি তোকে অনুমতি দিতে পারব না।”
মায়ের কণ্ঠে দৃঢ়তা ছিল সুস্পষ্ট। ঈশিতার মুখের হাসিটুকু ক্রমশ ম্লান হয়ে এল।
“মা, আমি তো বললাম, বিকেলের মধ্যেই ফিরে আসব। তোমাকে না জানিয়ে তো কোথাও যাচ্ছি না।”
“সেটা ভালো কথা। কিন্তু তুই জানিস, তোর নিরাপত্তার ব্যাপারে আমি কোনো আপস করতে চাই না। আজ আর যাওয়ার দরকার নেই। অন্য কোনো দিন দেখা যাবে।”
কথাটি বলেই ফাহিমা রহমান পুনরায় নিজের কাজে মনোনিবেশ করলেন।
ঈশিতা কিছুক্ষণ মায়ের পাশে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। অন্তরের মধ্যে যে ক্ষীণ আশাটুকু নিয়ে সে এসেছিল, মুহূর্তেই তা যেন নিরাশার ভারে অবনত হয়ে পড়ল। তবু সে সহজে হাল ছাড়ার পাত্রী নয়। মায়ের মন গলানোর শেষ প্রচেষ্টাটুকু করেও যখন কোনো লাভ হলো না, তখন বিষণ্ণ মুখে সেখান থেকে সরে এল।
ঠিক সেই সময় করিডরের অপর প্রান্ত থেকে ঈশানের আগমন ঘটল।
বোনের মুখের অভিব্যক্তি দেখেই সে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল, “কী হয়েছে তোর? মুখ এমন করে রেখেছিস কেন?”
ঈশিতা প্রথমে কিছু বলতে চাইল না। কিন্তু ভাইয়ের পুনঃপুন প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত সমস্ত ঘটনা খুলে বলল।
“ভাইয়া, আমি আজ বান্ধবীদের সঙ্গে একটু ঘুরতে যেতে চাইছিলাম। মা কিছুতেই অনুমতি দিল না।”
ঈশান গম্ভীর স্বরে বলল, “মা অনুমতি দেয়নি, তার নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। তুই কি একবারও ভেবেছিস, তোকে নিয়ে মা কেন চিন্তা করে?”
“কিন্তু ভাইয়া, আমি তো বেশি দূরে যাব না! আর আমি তোমাদের না জানিয়ে কোথাও যাচ্ছি না।”
ঈশান কয়েক মুহূর্ত নীরবে বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ঈশিতার চোখেমুখে যে আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে, তা তার দৃষ্টি এড়াল না। সে জানে, বোনের আবদার প্রতিবার মেনে নেওয়া সমীচীন নয়; আবার অকারণে তার প্রতিটি ইচ্ছাকে প্রত্যাখ্যান করাও উচিত নয়।
“কোথায় যাবি?”
ঈশিতা যেন প্রশ্নটির জন্যই অপেক্ষা করছিল।
“বাড়ির কাছাকাছি একটা জায়গায়। খুব বেশি দূরে নয়। বিকেলের আগেই ফিরে আসব।”
“কারা থাকবে?”
ঈশিতা কয়েকজন বান্ধবীর নাম বলল। ঈশান মনোযোগ দিয়ে সব শুনল। তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “শোন, ঈশিতা। আমি তোকে অনুমতি দিতে পারি, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তুই নিজের ইচ্ছেমতো যা খুশি করবি।”
ঈশিতার মুখে ক্ষীণ আশার আলো ফুটে উঠল।
“সত্যি, ভাইয়া?”
“আমি কথা শেষ করিনি। আগে আমার শর্তগুলো শোন।”
ঈশিতা তৎক্ষণাৎ চুপ করে গেল।
ঈশান একে একে বলতে শুরু করল, “প্রথমত, যেখানে যাওয়ার কথা বলেছিস, তার বাইরে কোথাও যাবি না। দ্বিতীয়ত, যাদের সঙ্গে যাওয়ার কথা বলেছিস, তাদের সঙ্গেই থাকবি। তৃতীয়ত, সন্ধ্যা হওয়ার আগেই বাড়ি ফিরবি। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা—কোনো সমস্যা হলে সেটা লুকিয়ে রাখবি না। পরিস্থিতি যেমনই হোক, আমাকে সত্যিটা জানাবি।”
ঈশিতা মাথা নেড়ে বলল, “আচ্ছা, ভাইয়া। তোমার সব কথা মনে রাখব।”
ঈশান ভ্রু কুঁচকে পুনরায় বলল, “শুধু মুখে সম্মতি দিলেই হবে না। আমি চাই না, তোর অসতর্কতার কারণে মা-বাবাকে কোনো দুশ্চিন্তায় পড়তে হোক। তুই এখন যথেষ্ট বড় হয়েছিস, তাই নিজের সিদ্ধান্তের দায়িত্বও বুঝতে শিখতে হবে।”
বোনের মুখের উচ্ছ্বাস কিছুটা সংযত হয়ে এল। ঈশানের কণ্ঠে এমন এক দৃঢ়তা ছিল, যার অবাধ্য হওয়ার সাহস তার সচরাচর হয় না।
“জি, ভাইয়া। আমি সাবধানে থাকব।”
ঈশান আরও একবার বোনের দিকে তাকিয়ে বলল, “ঠিক আছে। যেতে পারিস। তবে মনে রাখিস, আমার বিশ্বাসের মর্যাদা যেন নষ্ট না হয়।”
কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে চলে গেল।
ঈশিতা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। তারপর তার মুখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল। ভাইয়ের কঠোর শর্তগুলো তার আনন্দকে বিন্দুমাত্র ম্লান করতে পারল না। বরং বহু প্রতীক্ষিত অনুমতি লাভের আনন্দে তার অন্তঃকরণ পরিপূর্ণ হয়ে উঠল।
কিন্তু তার মনের গোপন অভিপ্রায়ের কথা ঈশান জানত না।
ঈশিতা মাকে বান্ধবীদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার কথা বললেও, আজকের সাক্ষাতের অন্তরালে নিহাদের উপস্থিতিই ছিল তার অপেক্ষার প্রধান কারণ। বান্ধবীদের সঙ্গে সময় কাটানোর পরিকল্পনা তার কাছে অজুহাতের চেয়েও বেশি কিছু ছিল না; অন্তত নিজের হৃদয়ের কাছে সে সত্যটি অস্বীকার করতে পারছিল না।
---
নিজের কক্ষে ফিরে এসে ঈশিতা আলমারির দরজাটি খুলল। সারি সারি সাজানো পোশাকের মধ্যে থেকে তার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো একটি লাল পাড় সাদা শাড়ির ওপর।
শাড়িটির শুভ্র জমিনে রক্তিম পাড়টি যেন অনাড়ম্বর সৌন্দর্যের মধ্যে এক অপূর্ব বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। সাদা রঙের স্নিগ্ধতা আর লালের নিবিড় আভা মিলেমিশে তাতে ফুটিয়ে তুলেছে এক চিরন্তন বাঙালিয়ানার নান্দনিক রূপ।
ঈশিতা ধীরে ধীরে শাড়িটি হাতে তুলে নিল।
আজ এই শাড়িটিই পরবে সে।
সযত্নে শাড়িটি পরিধান করে আয়নার সম্মুখে এসে দাঁড়াল ঈশিতা। শুভ্র শাড়ির ভাঁজগুলো যথাযথভাবে গুছিয়ে নিয়ে লাল পাড়টি কাঁধের ওপর সুনিপুণভাবে সাজিয়ে দিল। পরনের শাড়িটি তার স্বাভাবিক সৌন্দর্যে যোগ করেছে এক অনাড়ম্বর আভিজাত্য। অতিরিক্ত সাজসজ্জার কোনো প্রয়োজন তার ছিল না; বরং তার সহজাত স্নিগ্ধতাই যেন এই পোশাকের সঙ্গে নিবিড় সামঞ্জস্য স্থাপন করেছে।
ঘন কালো কেশরাশি যত্নসহকারে আঁচড়ে সে পিঠের ওপর ছড়িয়ে দিল। কপালের কাছ থেকে কয়েকটি চুল স্বাভাবিকভাবে নেমে এসে তার মুখমণ্ডলে কোমলতার পরশ বুলিয়ে দিল। প্রশস্ত ললাট, সুস্পষ্ট ভ্রুরেখা, দীর্ঘ পল্লবাবৃত নয়নযুগল, মসৃণ গণ্ডদেশ আর অধরপ্রান্তের মৃদু গোলাপি আভা—সব মিলিয়ে ঈশিতার মুখশ্রীতে ফুটে উঠল এক অনাবিল স্নিগ্ধতা।
তার চোখজোড়া ছিল বিশেষভাবে মায়াবী। সেখানে যেমন ছিল সারল্যের স্বচ্ছ প্রতিফলন, তেমনই অন্তর্লীন অনুভূতির এক দুর্বোধ্য গভীরতা। হাসলে গালে যে ক্ষীণ টোলের আভাস ফুটে উঠত, তা তার মুখের স্নিগ্ধতাকে আরও মধুর করে তুলত। লাল পাড় সাদা শাড়ির শুভ্র আবরণে তাকে মনে হচ্ছিল শরতের কোনো স্নিগ্ধ প্রভাতে প্রস্ফুটিত শিউলিফুল—বাহুল্যহীন অথচ অনিন্দ্যসুন্দর।
ঈশিতা কানে ছোট্ট একজোড়া দুল পরল। হাতে পরল সরু কয়েকটি চুড়ি। কপালে ক্ষুদ্র একটি টিপ এঁকে নিয়ে শেষবারের মতো আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল।
তার চোখেমুখে আজ এক অদ্ভুত ব্যাকুলতা।
নিজেকে সাজিয়ে তোলার মধ্যে কোনো আত্মপ্রদর্শনের অভিপ্রায় ছিল না; বরং বিশেষ একজন মানুষের সামনে উপস্থিত হওয়ার পূর্বে নিজের স্বাভাবিক সৌন্দর্যটুকুকে একটু যত্নে গুছিয়ে নেওয়ার নীরব আকাঙ্ক্ষাই তাকে এমন করে তুলেছিল।
“ঈশিতা, তৈরি হয়েছিস?”
বাইরে থেকে ঈশানের কণ্ঠ ভেসে এল।
ঈশিতা তাড়াতাড়ি দরজা খুলে বেরিয়ে এল। তাকে দেখে ঈশান কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। বোনের পরনে লাল পাড় সাদা শাড়ি দেখে তার ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল।
“শাড়ি পরে যাচ্ছিস কেন?”
ঈশিতা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “এমনিই, ভাইয়া। পরতে ইচ্ছা হলো।”
“ঘুরতে যাওয়ার জন্য এত সাজগোজের কী দরকার?”
“ভাইয়া, আমি কি একটু ভালো করে সেজেও যেতে পারব না?”
ঈশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “পারবি। কিন্তু সময়ের দিকে খেয়াল রাখবি। আর একটা কথা—যেখানে যাওয়ার কথা বলেছিস, সেখানেই যাবি। আমাকে যেন পরে অন্য কিছু শুনতে না হয়।”
ঈশিতা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
“আচ্ছা, ভাইয়া।”
ঈশান আরও কিছুক্ষণ বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “আর সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরবি। দেরি হলে কিন্তু আমি নিজেই খোঁজ নিতে বেরোব।”
কথাটির মধ্যে হালকা ধমকের সুর থাকলেও ঈশিতার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
“ঠিক আছে, ভাইয়া। এবার যাই?”
“যা। সাবধানে থাকিস।”
ঈশিতা বাড়ির দরজা অতিক্রম করল। পেছন থেকে ঈশানের দৃষ্টি যে তার গতিবিধির ওপর নিবদ্ধ ছিল, তা সে অনুভব করলেও আর ফিরে তাকাল না।
---
বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে এগিয়ে যাওয়ার পর পরিচিত পথের কোলাহল ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে এল। রাস্তার দুপাশে ছায়াঘন বৃক্ষরাজি, দূরে বিস্তৃত সবুজের আভাস আর শরতের কোমল বাতাসে পরিবেশটি যেন এক নির্জন প্রশান্তির আবেশে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে।
ঈশিতার পদক্ষেপে আজ এক অদ্ভুত ব্যস্ততা। তবু তার চলনে ছিল সংযম, মুখে ছিল স্বাভাবিক থাকার ব্যর্থ প্রচেষ্টা। অন্তরের মধ্যে যে আবেগের উন্মেষ ঘটেছে, তা সে কারও সামনে প্রকাশ করতে চায় না। বিশেষত ঈশানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর প্রশ্নবাণের কথা মনে পড়তেই তার মনে একটুখানি সংশয় জেগে উঠল।
তবু আজকের সাক্ষাৎ তার কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
কিছুটা পথ অতিক্রম করতেই দূরে একটি পরিচিত অবয়ব তার দৃষ্টিগোচর হলো।
নিহাদ চৌধুরী।
শরতের স্নিগ্ধ অপরাহ্ণে দাঁড়িয়ে থাকা নিহাদকে দেখে মনে হচ্ছিল, শুভ্রতার সমস্ত অনাবিল সৌন্দর্য যেন প্রকৃতি তার অবয়বে সুনিপুণভাবে সঞ্চারিত করেছে। পরনে তার ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি, যার অনাড়ম্বর অথচ আভিজাত্যপূর্ণ সৌকর্য তার ব্যক্তিত্বে সংযোজন করেছে এক অনির্বচনীয় মহিমা। দীর্ঘদেহী অবয়ব, প্রশস্ত স্কন্ধদেশ, ঋজু দেহভঙ্গি এবং সুগঠিত মুখাবয়বের সম্মিলনে তার উপস্থিতি হয়ে উঠেছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল।
কপালের ওপর অসতর্কভাবে ছড়িয়ে থাকা ঘন কৃষ্ণকেশ তার মুখমণ্ডলের গাম্ভীর্যে সংযোজন করেছে এক অনাড়ম্বর মাধুর্য। সুস্পষ্ট চোয়ালরেখা, সুডৌল নাসিকা, সুসংবদ্ধ অধরযুগল এবং দীর্ঘ পল্লবাবৃত গভীর কৃষ্ণাভ নয়নদ্বয়—সবকিছু মিলিয়ে তার মুখাবয়বে প্রতিফলিত হয়েছে এক দুর্বোধ্য ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি।
তার দৃষ্টিতে এমন এক স্থৈর্য বিদ্যমান, যার অন্তরালে অনুভূতির বিচিত্র অনুরণন থাকলেও বহিরঙ্গে তার সামান্যতম প্রকাশ পরিলক্ষিত হয় না। মনে হয়, অন্তঃকরণের গভীরতম অনুভূতিগুলোকেও সে সংযমের অদৃশ্য আবরণে আচ্ছাদিত রাখতে অভ্যস্ত। তার ব্যক্তিত্বে ছিল না অকারণ আত্মপ্রদর্শনের প্রবণতা, ছিল না দৃষ্টি আকর্ষণের কোনো কৃত্রিম প্রয়াস। বরং তার স্বাভাবিক গাম্ভীর্য, পরিমিত বাক্যালাপ এবং অনাড়ম্বর চলনভঙ্গির মধ্যেই নিহিত ছিল এক অনন্য আকর্ষণ।
সাদা পাঞ্জাবির শুভ্রতা যেন তার স্বভাবের সেই শান্ত, সংযত ও গম্ভীর দিকটিকেই আরও সুস্পষ্ট করে তুলেছে। শরতের কোমল আলো এসে নিবিড়ভাবে আশ্রয় নিয়েছিল তার মুখমণ্ডলে। মৃদুমন্দ সমীরণের স্পর্শে কপালসংলগ্ন কয়েকটি কেশগুচ্ছ সামান্য আন্দোলিত হতেই সে অন্যমনস্কভাবে সেগুলো সরিয়ে দিল।
অতঃপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করল পথের দিকে।
তার অপেক্ষার অবসান ঘটতে আর বেশি দেরি নেই।
দূর থেকে ঈশিতাকে এগিয়ে আসতে দেখতেই নিহাদের দৃষ্টি কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।
লাল পাড় সাদা শাড়িতে আবৃত ঈশিতার অবয়ব যেন শরতের শুভ্রতার বুকে রক্তিম আভাসের এক অনুপম সংযোজন। তার পদক্ষেপে ছিল লজ্জাশ্রিত সংযম, দৃষ্টিতে অনুচ্চারিত ব্যাকুলতা আর মুখমণ্ডলে এমন এক স্নিগ্ধতা, যা অনায়াসেই চারপাশের সমস্ত কোলাহলকে মুহূর্তের জন্য বিস্মৃত করে দিতে পারে।
নিহাদ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
সে হয়তো অসংখ্যবার ঈশিতাকে বিদ্যালয়ের পরিচিত পোশাকে দেখেছে, তার সঙ্গে কথাও বলেছে; কিন্তু আজকের এই রূপ যেন তার চেনা মানুষটির মধ্যেই এক নতুন পরিচয়ের আভাস বহন করছে।
ঈশিতা কাছে এসে থামল। দুজনের মধ্যে কয়েক মুহূর্তের নীরবতা নেমে এল।
অবশেষে নিহাদই সেই নীরবতার অবসান ঘটাল।
“তুমি এসেছ?”
প্রশ্নটি অত্যন্ত সাধারণ, অথচ তার কণ্ঠের সংযত কোমলতা ঈশিতার অন্তরে এক অদ্ভুত আলোড়ন সৃষ্টি করল।
ঈশিতা মৃদু হেসে বলল, “জি। আপনি অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন?”
নিহাদ সামান্য মাথা নাড়ল।
“না, খুব বেশি সময় হয়নি।”
তারপর একবার ঈশিতার দিকে তাকিয়ে পুনরায় দৃষ্টি সরিয়ে নিল। কথার চেয়ে নীরবতায় অভ্যস্ত মানুষটির পক্ষে নিজের বিস্ময় প্রকাশ করা সহজ ছিল না। তবু তার চোখের গভীরে এক মুহূর্তের জন্য যে মুগ্ধতার ছায়া প্রতিফলিত হলো, তা সম্পূর্ণভাবে আড়াল করা গেল না।
ঈশিতা সেই দৃষ্টি লক্ষ করেও কিছু বলল না। বরং লজ্জার ক্ষীণ আভা তার গণ্ডদেশে ছড়িয়ে পড়ল।
শরতের মৃদু বাতাসে তার শাড়ির লাল পাড়টি সামান্য আন্দোলিত হলো। দূর আকাশে মেঘেরা আপন গতিতে ভেসে চলেছে, আর তাদের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি মানুষ যেন নিজেদের চারপাশের জগৎ থেকে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
একদিকে শুভ্র পাঞ্জাবি পরিহিত নিহাদ—যার গাম্ভীর্যের অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে অনুচ্চারিত অনুভূতির এক বিস্তৃত জগৎ।
অন্যদিকে লাল পাড় সাদা শাড়িতে সজ্জিতা ঈশিতা—যার চোখের গভীরে আজ জমে রয়েছে অসংখ্য প্রশ্ন, অপ্রকাশিত অভিমান আর এমন কিছু কথা, যেগুলো এত দিন ধরে কেবল তার অন্তঃকরণেই আশ্রয় পেয়েছে।
তারা কেউই তখনও জানত না, আজকের এই সাক্ষাৎ তাদের সম্পর্কের কোন নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে।
শুধু সময় নিঃশব্দে এগিয়ে চলেছিল, আর শরতের সেই অপরাহ্ণ সাক্ষী হয়ে রইল দুটি মানুষের অনুচ্চারিত অনুভূতির।
নিহাদ বাইকের পাশে এসে দাঁড়াতেই ঈশিতার দৃষ্টি অনিচ্ছাসত্ত্বেও তার দিকে নিবদ্ধ হলো। সাদা পাঞ্জাবিতে নিহাদকে আজ যেন শরতের শুভ্রতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি মনে হচ্ছিল। তার প্রশস্ত কাঁধ, সুঠাম অবয়ব, সুশৃঙ্খল চুল আর মুখাবয়বের শান্ত গাম্ভীর্য তাকে এক অনন্য ব্যক্তিত্বে উদ্ভাসিত করেছিল। অন্যদিকে, লাল পাড় সাদা শাড়িতে ঈশিতাকে মনে হচ্ছিল শুভ্রতার বুকে আঁকা একখণ্ড রক্তিম কবিতা। কোমল মুখশ্রী, দীর্ঘ কালো কেশরাশি, মায়াবী চোখের গভীরতা আর ললাটে ছড়িয়ে থাকা স্নিগ্ধ আভা তার সৌন্দর্যকে করে তুলেছিল অনিন্দ্যসুন্দর।
নিহাদ বাইকে উঠে বসতেই ঈশিতা ধীর পায়ে তার পেছনে গিয়ে বসল। শাড়ির আঁচলটি যত্নসহকারে সামলে নিয়ে সে আলতো করে নিহাদের পাঞ্জাবির পেছনের অংশ আঁকড়ে ধরল। মুহূর্তের জন্য তার হৃদয়ে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। নিহাদ স্থির হাতে বাইকের হ্যান্ডেল ধরে ধীরে ধীরে যাত্রা শুরু করল।
শরতের স্নিগ্ধ বাতাসে ঈশিতার শাড়ির আঁচল বারবার উড়ে উঠছিল। পথের দুপাশে সারি সারি বৃক্ষরাজি, দূর আকাশে ভেসে চলা শুভ্র মেঘমালা আর রৌদ্রছায়ার লুকোচুরি তাদের যাত্রাপথকে করে তুলেছিল অপার্থিব সুন্দর। কখনো জনাকীর্ণ রাজপথ, কখনো বৃক্ষশোভিত নির্জন পথ অতিক্রম করে বাইকটি এগিয়ে চলল অজানা গন্তব্যের দিকে।
ঈশিতা নীরবে বসে রইল নিহাদের পেছনে। তার দৃষ্টি কখনো পথের দুপাশে ছড়িয়ে থাকা প্রকৃতির সৌন্দর্যে আটকে যাচ্ছিল, কখনো অন্যমনস্ক হয়ে নিবদ্ধ হচ্ছিল নিহাদের প্রশস্ত পিঠে। বাতাসে ভেসে আসা নিহাদের পরিচিত সুবাস তার হৃদয়ের গভীরে এক অজ্ঞাত প্রশান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছিল। অন্যদিকে, নিহাদের মুখাবয়বে ফুটে থাকা প্রশান্তির আড়ালে যেন লুকিয়ে ছিল এক গভীর তৃপ্তি।
তাদের মধ্যে কোনো কথোপকথন ছিল না; ছিল না কোনো শব্দের কোলাহল কিংবা অনুভূতির প্রকাশ। অথচ সেই নীরবতার মধ্যেই যেন অসংখ্য অনুচ্চারিত অনুভূতি আপন অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিল। বাইকের চাকা নিরবচ্ছিন্নভাবে পথের বুকে গড়িয়ে চলল, আর সোনালি রোদে তাদের ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে উঠল।
সময়ের প্রবাহে পথ বদলাতে লাগল, বদলাতে লাগল চারপাশের দৃশ্যপটও। কিন্তু সেই মুহূর্তে ঈশিতা ও নিহাদের মাঝখানে বিরাজ করছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি—যেখানে শব্দের কোনো প্রয়োজন ছিল না, নীরবতাই ছিল সমস্ত অনুভূতির একমাত্র ভাষা।
অবশেষে নিহাদের বাইক এসে থামল একটি মনোরম শাপলাপুকুরের সামনে। পুকুরের বিস্তীর্ণ জলরাশি জুড়ে ফুটে রয়েছে অসংখ্য শ্বেতশুভ্র শাপলা ফুল। কোথাও সবুজ পাতার আড়ালে লুকিয়ে আছে অর্ধপ্রস্ফুটিত কুঁড়ি, কোথাও-বা মৃদুমন্দ বাতাসে দুলছে পূর্ণ প্রস্ফুটিত শাপলা। চারপাশের সবুজ বৃক্ষরাজি, পাখির মিষ্টি কলতান আর শরতের সোনালি বিকেল পরিবেশটিকে করে তুলেছে মায়াবী। পুকুরপাড়ে বেশ কয়েকটি যুগল নিজেদের মতো করে সময় কাটাচ্ছে।
নিহাদ বাইক থেকে নেমে ঈশিতার জন্য অপেক্ষা করল। লাল পাড় সাদা শাড়িতে ঈশিতাকে আজ অপরূপ সুন্দর লাগছিল। তার দীর্ঘ কালো কেশরাশি আর মায়াবী চোখের স্নিগ্ধতা যেন শাপলায় ঘেরা প্রকৃতির সৌন্দর্যকেও ম্লান করে দিচ্ছিল। অন্যদিকে, সাদা পাঞ্জাবিতে নিহাদের দীর্ঘদেহী অবয়ব, শান্ত মুখশ্রী আর ব্যক্তিত্বপূর্ণ উপস্থিতি তাকে করে তুলেছিল অনন্য। পুকুরপাড়ে এত যুগল থাকলেও তাদের দুজনের সৌন্দর্য ও যুগলবন্দিতে যেন এক আলাদা মাধুর্য ছিল।
ঈশিতা ধীরে ধীরে পুকুরের দিকে এগিয়ে গেল। তার চোখে তখন অগণিত শাপলা ফুলের মুগ্ধতা। জলের বুকে ফুটে থাকা সাদা ফুলগুলো দেখে তার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক টুকরো হাসি। নিহাদ নীরবে তার পাশে এসে নিশ্বদে ঈশিতা কোমর আঁকরে ধরে নিজের সাথে আঁকড়ে নিয়ে তপ্ত সরে অউরালো
"তোমার সান্নিধ্য বহুবার প্রাপ্ত হয়েছি, অথচ আজকের ন্যায় এতখানি মোহনীয় রূপে তোমাকে কখনো প্রত্যক্ষ করিনি।”
ঈশিতা কিছু বলল না লজ্জায় লজ্জিত হয়ে পড়ছে বার বার মেয়েটা .
চলবে ইনশাআল্লাহ
পর্ব - ২৯