#প্রেম আমার
#পর্ব - ২৯
শাপলাপুকুরের দিকে অগ্রসর হতেই ঈশিতা ও নিহাদের দৃষ্টির সম্মুখে উন্মোচিত হলো প্রকৃতির এক অপরূপ নৈসর্গিক দৃশ্যপট। বিস্তীর্ণ জলরাশির বুকে সবুজ শাপলাপাতার সমারোহ, তারই ফাঁকে ফাঁকে প্রস্ফুটিত শুভ্র শাপলাগুলো যেন নীলাভ জলের বুকে ছড়িয়ে দিয়েছে স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের অপার্থিব আভা। শরতের নির্মল আকাশে ভেসে বেড়ানো শুভ্র মেঘমালার প্রতিবিম্ব পুকুরের স্থির জলে সৃষ্টি করেছে এক মায়াময় চিত্রকল্প। পুকুরের চারপাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বৃক্ষরাজির ঘন সবুজ ছায়া পরিবেশটিকে দিয়েছে এক নিবিড় প্রশান্তি। মৃদুমন্দ সমীরণের স্পর্শে শাপলাপাতাগুলো যখন আন্দোলিত হচ্ছিল, তখন জলের বুকে সৃষ্ট ক্ষুদ্র তরঙ্গগুলো মনে হচ্ছিল প্রকৃতির নীরব ভাষায় রচিত কোনো গীতিকবিতা।
দূরবর্তী বৃক্ষশাখায় পাখিদের কলতান, তীরবর্তী ঘাসের ওপর ছড়িয়ে থাকা সোনালি রোদের শেষ আভা এবং জলজ ফুলের মৃদু সুবাস—সব মিলিয়ে স্থানটি যেন নাগরিক জীবনের সমস্ত কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন এক নির্জন স্বর্গরাজ্য। পুকুরের এক পাশে কাঠের তৈরি একটি দোলনা বৃক্ষের ছায়ায় স্থির হয়ে রয়েছে, আর অপর প্রান্তে বাঁধা কয়েকটি ছোট নৌকা জলের মৃদু দোলায় ধীরে ধীরে আন্দোলিত হচ্ছে।
গোধূলির সোনালি আলোয় শাপলাপুকুরের সৌন্দর্য আরও মায়াবী হয়ে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি তার সমস্ত স্নিগ্ধতা ও মাধুর্য একত্র করে এই ক্ষুদ্র জলাশয়ের বুকে সযত্নে ছড়িয়ে দিয়েছে—যেখানে সময়ের তাড়াহুড়ো থেমে যায়, আর প্রতিটি নিঃশ্বাসে অনুভূত হয় এক অনির্বচনীয় প্রশান্তি।
শাপলাপুকুরের তীরবর্তী পথ ধরে ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে চলল নিহাদ ও ঈশিতা। চারপাশের মনোরম দৃশ্যাবলি ঈশিতার হৃদয়ে এক অনির্বচনীয় আনন্দের সঞ্চার করছিল। কখনো সে পুকুরের বুকে প্রস্ফুটিত শাপলাগুলোর দিকে তাকাচ্ছিল, কখনো বৃক্ষশাখায় বসে থাকা পাখিদের কলকাকলিতে মুগ্ধ হচ্ছিল। তার চোখেমুখে ছড়িয়ে থাকা সেই শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস লক্ষ করে নিহাদের অধরপ্রান্তে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল।
— কী হলো, মেহু জান? প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে কি পৃথিবীর বাকি সবকিছু ভুলে গেলে?
ঈশিতা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
— সবকিছু ভুলে যাইনি। তবে জায়গাটা ভীষণ সুন্দর, তাই না? মনে হচ্ছে, এখানে বসে সারাটা বিকেল কাটিয়ে দেওয়া যায়।
নিহাদ চারপাশে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
— জায়গাটা সুন্দর, স্বীকার করছি। তবে কোনো স্থানের সৌন্দর্য কেবল তার প্রকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; কখনো কখনো সেই স্থানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মুহূর্তগুলোই তাকে স্মরণীয় করে তোলে।
কথাটির অন্তর্নিহিত অর্থ উপলব্ধি করতে ঈশিতার খুব একটা সময় লাগল না। সে আড়চোখে নিহাদের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল,
— তার মানে, আজকের দিনটাকে স্মরণীয় করে রাখার দায়িত্বও আপনার?
— আমার ওপর দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তোমার জুড়ি মেলা ভার।
— আমি তো শুধু একটা সাধারণ প্রশ্ন করলাম!
— তোমার সাধারণ প্রশ্নের আড়ালেও যে অসাধারণ সব আবদার লুকিয়ে থাকে, তা আমার অজানা নয়।
ঈশিতা অভিমানী ভঙ্গিতে মুখ ফিরিয়ে নিল। নিহাদ তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল, তারপর পুকুরের তীরবর্তী বৃক্ষছায়ায় স্থাপিত কাঠের দোলনাটির দিকে ইঙ্গিত করল।
— আচ্ছা, ওদিকে যাবে?
দোলনাটির দিকে তাকাতেই ঈশিতার চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক দেখা দিল।
— সত্যি? আপনি আমার সঙ্গে বসবেন?
— আগে বলো, বসার পর নতুন কোনো আবদার নিয়ে হাজির হবে না তো?
— উঁহু! আমি একদম শান্ত হয়ে বসে থাকব।
নিহাদ সন্দেহপ্রবণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল।
— তোমার এই আশ্বাসের ওপর কতখানি ভরসা করা যায়, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
— আপনি না! সব সময় আমাকে নিয়ে এমন করেন কেন?
ঈশিতার কণ্ঠে অভিমানের আভাস ফুটে উঠতেই নিহাদ হেসে ফেলল।
— আচ্ছা, আর খেপাচ্ছি না। চলো।
দুজন দোলনাটির কাছে এসে দাঁড়াল। নিহাদ প্রথমে দোলনাটির কাঠামো পরীক্ষা করে নিল, তারপর ঈশিতাকে সাবধানে বসতে সাহায্য করে নিজেও তার পাশে উপবিষ্ট হলো। দোলনাটি তখন স্থির। তাদের চারপাশে বৃক্ষের নিবিড় ছায়া, সম্মুখে শাপলায় সুশোভিত জলরাশি, আর দূর আকাশে গোধূলির ক্রমশ গাঢ় হয়ে আসা রং।
ঈশিতা চারপাশের দৃশ্যাবলি উপভোগ করতে করতে হঠাৎ বলল,
— জানেন, আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, জীবনের সব ব্যস্ততার মাঝখানে এমন কিছু মুহূর্ত থাকা উচিত, যেখানে কোনো তাড়া থাকবে না, কোনো দুশ্চিন্তা থাকবে না। শুধু নিজের মতো করে কিছুটা সময় কাটানো যাবে।
নিহাদ মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনল।
— তোমার কথাটা যথার্থ। মানুষ প্রতিনিয়ত ভবিষ্যতের পেছনে ছুটতে গিয়ে বর্তমানের ছোট ছোট আনন্দগুলোকে উপেক্ষা করে ফেলে। অথচ পরবর্তী সময়ে স্মৃতির পাতায় ফিরে তাকালে দেখা যায়, সেই সাধারণ মুহূর্তগুলোরই মূল্য সবচেয়ে বেশি।
ঈশিতা মৃদু স্বরে বলল,
— তাহলে আজকের দিনটাও মনে রাখবেন?
নিহাদ তার দিকে তাকাল। দৃষ্টিতে ছিল এক ধরনের স্থিরতা, কণ্ঠে আন্তরিকতার সুর।
— কিছু মুহূর্ত মনে রাখার জন্য আলাদা করে প্রতিজ্ঞা করতে হয় না, মেহু জান। সময় পেরিয়ে গেলেও সেগুলো আপনাআপনিই স্মৃতির অংশ হয়ে থাকে।
কথাটি শুনে ঈশিতা আর কিছু বলল না। সে নিঃশব্দে নিহাদের কাঁধে মাথা রাখল। নিহাদও তাকে কোনো প্রশ্ন করল না। প্রকৃতির স্নিগ্ধ নীরবতার মধ্যে পাশাপাশি বসে রইল দুজন।
কিছুক্ষণ পর ঈশিতার দৃষ্টি পুকুরের অপর প্রান্তে বাঁধা একটি ছোট নৌকার দিকে পড়ল। তার চোখেমুখে আবারও কৌতূহলের আভাস ফুটে উঠল।
— প্রেম পুরুষ?
— বলো, মেহু জান।
— আমরা নৌকায় চড়ব?
নিহাদ ধীরে ধীরে তার দিকে মুখ ফেরাল। তারপর এমনভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, যেন জীবনের সমস্ত কঠিন দায়িত্বের তালিকা এই মুহূর্তেই তার সামনে উপস্থিত হয়েছে।
— আমি জানতাম, তোমার শান্ত হয়ে বসে থাকার প্রতিশ্রুতি বেশিক্ষণ স্থায়ী হবে না।
ঈশিতা সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসে বলল,
— আমি কি খুব বেশি কিছু চেয়েছি? একটু নৌকায় চড়তে চেয়েছি শুধু!
— না, খুব বেশি কিছু চাওনি। কিন্তু তোমার প্রতিটি আবদারের শেষে আমাকে যে নতুন কোনো পরিকল্পনার সম্মুখীন হতে হয়, সেটাই আমার দুর্ভাগ্য।
— তা হলে আমি একাই যাব!
কথাটি বলেই ঈশিতা মুখ ফিরিয়ে নিল। নিহাদ তার অভিমানী মুখের দিকে তাকিয়ে হাসি সংবরণ করল।
— আচ্ছা, মহারানি। তোমার নৌকাভ্রমণের ইচ্ছাও পূরণ করা হবে। তবে মাঝি থাকবেন, নৌকায় সাবধানে বসবে, আর কোনো রকম দুষ্টুমি করবে না।
ঈশিতার মুখ মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
— জি, প্রেম পুরুষ!
তার আকস্মিক উচ্ছ্বাস দেখে নিহাদ মাথা নাড়ল।
— এই যে! একটু আগেও অভিমানে মুখ ভার করে বসেছিলে, আর এখন মনে হচ্ছে, সমগ্র পৃথিবীর আনন্দ তোমার হাতে এসে ধরা দিয়েছে।
ঈশিতা হাসতে হাসতে বলল,
— কারণ, আমার প্রেম পুরুষ পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষ!
নিহাদ ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল।
— এই প্রশংসার পেছনে নিশ্চয়ই আরও কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে।
— না তো!
— আচ্ছা, দেখা যাক। তোমার এই নির্দোষ মুখের আড়ালে আর কতগুলো আবদার লুকিয়ে আছে।
দুজন দোলনা থেকে উঠে নৌকার দিকে এগিয়ে গেল। মাঝির সহায়তায় নিরাপদে নৌকায় উঠে বসতেই নৌকাটি ধীরে ধীরে জলরাশির ওপর ভেসে চলল। চারদিকে শাপলার সমারোহ, মাথার ওপর বিস্তৃত শরতের আকাশ আর অস্তগামী সূর্যের শেষ আলোকচ্ছটা—সব মিলিয়ে তাদের সামনে উন্মোচিত হলো এক অপরূপ দৃশ্যপট।
ঈশিতা মুগ্ধ দৃষ্টিতে চারপাশের সৌন্দর্য অবলোকন করতে লাগল। আর নিহাদ নীরবে তার দিকে তাকিয়ে রইল। ঈশিতার আনন্দময় মুখাবয়বের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তার মনে হলো, জীবনের সমস্ত ব্যস্ততার মাঝেও এমন কিছু মানুষ থাকে, যাদের সামান্য সুখই হৃদয়ের গভীরে প্রশান্তি এনে দেয়।
সেদিনের সেই শাপলাপুকুর, গোধূলির সোনালি আলো আর দুটি মানুষের পাশাপাশি কাটানো সময়—সবকিছুই যেন অজান্তে তাদের জীবনের স্মৃতির পাতায় একটি নতুন অধ্যায় রচনা করতে শুরু করল।
কিন্তু সেই বিকেলের আনন্দময় মুহূর্তগুলোর অন্তরালে যে আরও কিছু অপ্রকাশিত অনুভূতি ধীরে ধীরে ডানা মেলছিল, তার আভাস তখনও তারা কেউ সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করতে পারেনি।
নৌকাটি ধীরে ধীরে পুকুরের ঘাটে এসে ভিড়ল। গোধূলির শেষ আলো ততক্ষণে প্রকৃতির বুক থেকে বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পশ্চিম দিগন্তে সূর্যের রক্তিম আভা ক্রমশ ম্লান হয়ে এসেছে, আর শাপলাপুকুরের শান্ত জলরাশির ওপর নেমে পড়েছে সন্ধ্যার স্নিগ্ধ ছায়া।
নিহাদ প্রথমে নৌকা থেকে নেমে ঈশিতার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। ঈশিতা তার হাত ধরে সাবধানে ঘাটে অবতরণ করল। তারপর পুকুরের দিকে একবার ফিরে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— ইশ্! সময়টা যদি আরেকটু থেমে থাকত!
নিহাদ তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
— সময়কে থামিয়ে রাখার ক্ষমতা মানুষের নেই, মেহু জান। তবে বাড়ি ফিরে যাওয়ার আগে আরও কিছুক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি।
ঈশিতা সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে ফিরে তাকাল।
— সত্যি?
— হ্যাঁ, তবে বেশি দেরি করা যাবে না। সন্ধ্যা হয়ে আসছে।
— আচ্ছা, আর দেরি করব না।
কথাটি বলেও ঈশিতা কয়েক মুহূর্ত পুকুরের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখেমুখে এমন এক মায়াময় প্রশান্তি, যেন এই বিকেলের প্রতিটি দৃশ্য সে নিজের স্মৃতির গভীরে সযত্নে সংরক্ষণ করে রাখতে চাইছে।
কিছুক্ষণ পর নিহাদই নীরবতা ভাঙল।
— এবার চলবে, নাকি এখানেই রাত কাটানোর পরিকল্পনা রয়েছে?
ঈশিতা মুখ ফিরিয়ে তার দিকে তাকাল।
— আপনি না! একটু সুন্দর মুহূর্ত উপভোগ করতেও দেন না।
— সুন্দর মুহূর্ত উপভোগ করার বিরোধিতা করছি না। শুধু মনে করিয়ে দিচ্ছি, তোমার বাড়িতে নিশ্চয়ই কেউ অপেক্ষা করছেন।
কথাটি শুনে ঈশিতা আর কোনো প্রতিবাদ করল না। সে জানত, নিহাদের এই সতর্কতার পেছনে রয়েছে তার প্রতি আন্তরিক যত্ন। তাই দোলনাটির দিকে একবার শেষবারের মতো তাকিয়ে ধীর পদক্ষেপে নিহাদের পাশে এসে দাঁড়াল।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। পুকুরপাড়ের সরু পথটির দুপাশে ছড়িয়ে থাকা ঘাসের ওপর শিশিরের ক্ষীণ আভাস জমতে শুরু করেছে। দূরের বাড়িগুলো থেকে ভেসে আসছে মানুষের কথোপকথন, কোথাও সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বালানোর প্রস্তুতি, আবার কোথাও আজানের সুমধুর ধ্বনি পরিবেশকে এক পবিত্র প্রশান্তিতে আচ্ছন্ন করে তুলেছে।
ঈশিতা কিছুক্ষণ নীরব থেকে হঠাৎ প্রশ্ন করল,
— প্রেম পুরুষ, আজকের দিনটা আপনার কেমন লাগল?
নিহাদ তার দিকে তাকাল।
— তোমার কেমন লেগেছে, সেটাই আগে বলো।
ঈশিতা মৃদু হেসে উত্তর দিল,
— আমার খুব ভালো লেগেছে। অনেক দিন পর এমন একটা বিকেল কাটালাম, যেখানে পড়াশোনা, পরীক্ষা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হয়নি। শুধু নিজের মতো করে সময় কাটিয়েছি।
নিহাদ শান্ত কণ্ঠে বলল,
— তা হলে আজকের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে।
— আপনারও ভালো লেগেছে?
— তোমার আনন্দ দেখে আমারও ভালো লেগেছে।
ঈশিতা কয়েক মুহূর্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মৃদু অভিমান মিশিয়ে বলল,
— আপনি নিজের ভালো লাগার কথা কখনো সরাসরি বলতে পারেন না কেন?
নিহাদ হেসে মাথা নাড়ল।
— সব অনুভূতি কি কথায় প্রকাশ করতে হয়, মেহু জান?
— না, তবে মাঝে মাঝে বললে ক্ষতি কী?
— আচ্ছা, তা হলে শুনে রাখো—আজকের বিকেলটা আমারও ভালো লেগেছে। বিশেষ করে, তোমার ছোট ছোট আবদার আর সেগুলো পূরণ করার পর তোমার মুখের হাসিটুকু।
ঈশিতার মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
— এই তো! এতক্ষণে একটা ভালো কথা বললেন।
— তোমার কাছ থেকে ভালো কথার স্বীকৃতি পাওয়াও যে কত বড় অর্জন, তা আজ উপলব্ধি করলাম।
ঈশিতা হেসে উঠল। তার হাসির সঙ্গে মিশে গেল সন্ধ্যার বাতাসে পাতার মর্মরধ্বনি।
কিছুক্ষণ পর তারা পুকুরের প্রবেশপথের কাছে এসে পৌঁছাল। সেখানে দাঁড়িয়ে নিহাদ বাইকের চাবিটি হাতে নিয়ে ঈশিতার দিকে তাকাল।
— এবার বাড়ির পথে রওনা হওয়া যাক?
ঈশিতা মাথা নাড়ল।
— জি, প্রেম পুরুষ।
নিহাদ বাইকের কাছে এগিয়ে গেল, আর ঈশিতা তার পাশে দাঁড়িয়ে নিজের শাড়ির আঁচলটি সযত্নে গুছিয়ে নিল। দিনের শেষ আলোয় তার মুখাবয়বে তখনও লেগে রয়েছে বিকেলের আনন্দের মৃদু আভা।
বাইক চালু করার আগে নিহাদ একবার তার দিকে ফিরে তাকাল।
— ঠিকমতো বসবে, আর সাবধানে থাকবে। বুঝেছ?
ঈশিতা মৃদু হেসে বলল,
— জি, বুঝেছি। আপনি কি আমাকে একটুও বিশ্বাস করেন না?
— বিশ্বাস করি বলেই তো তোমাকে নিয়ে এত সতর্ক থাকি।
কথাটির উত্তরে ঈশিতা আর কিছু বলল না। শুধু নীরবে হাসল।
বাইকটি ধীরে ধীরে পুকুরপাড়ের পথ অতিক্রম করে প্রধান সড়কের দিকে এগিয়ে চলল। পেছনে রয়ে গেল শাপলায় ঘেরা জলরাশি, বৃক্ষছায়ার দোলনা আর গোধূলির সেই মায়াবী বিকেল। সামনে বিস্তৃত হলো সন্ধ্যার পথ, দুপাশে জ্বলে উঠতে শুরু করল পথবাতি।
ঈশিতা বাইকের পেছনে বসে চারপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে মনে ভাবছিল, দিনটি হয়তো অন্য অনেক দিনের মতোই সাধারণ একটি দিন হিসেবে শুরু হয়েছিল। অথচ তার সমাপ্তির মুহূর্তে এসে সেই দিনটিই যেন তার কাছে বিশেষ হয়ে উঠেছে।
আর নিহাদ বাইক চালাতে চালাতে অনুভব করছিল, ঈশিতার উপস্থিতি তার জীবনের পরিচিত পথগুলোকেও কখনো কখনো নতুন অর্থে পরিপূর্ণ করে তোলে।
এভাবেই সন্ধ্যার আবরণে ঢেকে যেতে লাগল তাদের পেছনে ফেলে আসা পথ। বাড়ির উদ্দেশে এগিয়ে চলল দুজন—সঙ্গে নিয়ে শাপলাপুকুরের স্নিগ্ধ সৌন্দর্য, কিছু মধুর কথোপকথন আর ভবিষ্যতে স্মরণ করার মতো এক টুকরো সুখস্মৃতি।
সন্ধ্যার ক্রমবর্ধমান অন্ধকার ভেদ করে বাইকটি আপন গতিতে এগিয়ে চলছিল। সড়কের দুপাশে জ্বলে ওঠা পথবাতিগুলো অন্ধকারের বুকে ছড়িয়ে দিচ্ছিল মৃদু আলোকচ্ছটা। কোথাও দোকানপাট বন্ধ করার ব্যস্ততা, কোথাও বাড়ি ফেরার তাড়া, আবার কোথাও সন্ধ্যার নীরবতায় মগ্ন হয়ে থাকা জনপদ—সব মিলিয়ে শহরের পরিচিত দৃশ্যাবলি ধীরে ধীরে রাতের আবরণে ঢেকে যাচ্ছিল।
বাইকের পেছনে বসে ঈশিতা এক হাতে নিজের আঁচল সামলে অন্য হাতে নিহাদের কাঁধ আঁকড়ে ধরে ছিল। তার মন তখনও পড়ে রয়েছে শাপলাপুকুরের সেই মায়াবী বিকেলে। বারবার মনে পড়ছে দোলনায় পাশাপাশি বসে থাকা, নৌকার শান্ত যাত্রা আর নিহাদের সঙ্গে কাটানো ছোট ছোট মুহূর্তগুলো।
চলবে ইনশাআল্লাহ
পর্ব -৩০