ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমিই আমার হৃদয়হরণী

৩য় পর্ব

লেখক: আশু

#তুমিই_আমার_হৃদয়হরণী পর্ব-৩

#লেখিকা_আশু

গাড়ি এসে থামল ইমাদের বাড়ির সদর দরজায়। ইরফান নেমে গাড়ি লক করতে করতে আরিমানকে বলল, "চল দোস্ত, ভেতরে চল। ফুফু আজকে গরুর মাংসের বিরিয়ানি রান্না করেছে। খেয়ে যাবি।"

আরিমান একবার আড়চোখে ইমার দিকে তাকাল, যে কিনা ততক্ষণে গাড়ি থেকে নেমে হনহন করে বাড়ির ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। আরিমান মৃদু হেসে ইরফানের কাঁধে হাত রেখে বলল, "আজ থাক ইরফান। ডিপার্টমেন্টের কিছু খাতা দেখা বাকি আছে। আরেকদিন এসে তোর ফুফুর হাতের বিরিয়ানি খাব।"

"আচ্ছা ঠিক আছে, সাবধানে যাস," ইরফান আর জোর করল না। আরিমান একটা রিকশা ডেকে রওনা দিল, কিন্তু ওর অবচেতন মন তখনও গাড়ির আয়নায় দেখা ইমার সেই রাগে থমথম করা মুখটার কথাই ভাবছিল।

ভেতরে ঢুকতেই ইমার মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেল। ড্রইংরুমে বড় চাচা আর ফুফু বসে গল্প করছিলেন, আর সোফার এক কোণে মুখ ভার করে বসে ছিল তিশা। ইমাকে ঢুকতে দেখেই তিশা একটু চড়া গলায় বলল, "কী রে ইমু, এত দেরি হলো যে? আর তুই ইরফান ভাইয়ার গাড়িতে ফিরলি? তোকে তো আরিমান ভাইয়ার কেবিনের দিকে যেতে দেখলাম।"

ফুফু চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বললেন, "আরিমান এসেছিল নাকি রে? ইরফান তো ওকে নিয়ে এলো না!"

ইমা নিজের ভেতরের ক্ষোভটা চেপে রেখে শান্ত গলায় বলল, "না ফুফু, উনি আসেননি। ওনার নাকি অনেক কাজ।" তিশার দিকে একটা তীক্ষ্ণ নজর হেনে ও আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে সোজা নিজের ঘরে চলে গেল।

তিশা ইমার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, "ভেতরে ভেতরে এত নাটক, অথচ মুখে কত অনীহা! আরিমান ভাইয়াকে এভাবে ও নিজের পেছনে ঘোরাচ্ছে, আর বাড়ির সবাই ভাবছে ইমা কত অবুঝ!" তিশার মনের ভেতরে ঈর্ষার আগুনটা আরেকটু দাউদাউ করে জ্বলে উঠল।

রাত একটা।

সারাদিনের ক্লান্তি আর মানসিক অশান্তিতে ইমার চোখে ঘুম নেই। ও টেবিল ল্যাম্পটা জ্বেলে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে ভাবছিল, কীভাবে এই সেমিস্টারটা পার করবে। আরিমানের মতো একটা মানুষের অধীনে প্রতিদিন ক্লাস-ল্যাব করা মানে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা।

হঠাৎ ওর ফোনের নোটিফিকেশন টিউনটা বেজে উঠল। এই মাঝরাতে কার মেসেজ হতে পারে? স্ক্রিনটা অন করতেই ইমার হার্টবিট যেন এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে গেল। একটা অজানা নাম্বার থেকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ এসেছে। প্রোফাইল পিকচার নেই, কিন্তু টেক্সটটা দেখেই ও বুঝতে পারল প্রেরক কে।

"পরশুদিনের মধ্যে সেল বায়োলজির প্রথম দুটো চ্যাপ্টারের নোটস কমপ্লিট করে আমার টেবিলে জমা দেবে। কোনো ভুল যেন না থাকে। আর হ্যাঁ, রাতের বেলা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে হাওয়া খাওয়া বন্ধ করো, ঠাণ্ডা লাগলে ল্যাবের কাজ পেন্ডিং পড়ে থাকবে।"

ইমা ধড়ফড় করে বিছানা থেকে উঠে বসল। ও দ্রুত পায়ে হেঁটে গিয়ে ব্যালকনির স্লাইডিং ডোরটা সরাল। রাস্তা পুরো অন্ধকার, শুধু ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোটা এসে পড়েছে ওদের গেটের সামনে। ইমা নিচে তাকিয়ে চারপাশটা ভালো করে দেখল। কেউ কোথাও নেই। তাহলে আরিমান কীভাবে জানল ও ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকে? ও কি তবে সব সময় নজর রাখছে ওর ওপর? ইমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসতে লাগল। ও দ্রুত ঘরে ঢুকে দরজাটা লক করে দিল।

ফোনে টাইপ করল, "আপনি আমার ওপর স্পাইং করছেন? হাউ ডেয়ার ইউ!"

মেসেজটা সেন্ড করার সাথে সাথেই 'ডাবল ব্লু টিক' পড়ে গেল। ওপাশ থেকে রিপ্লাই আসতেও দেরি হলো না।

"স্পাইং করার মতো সস্তা কাজ আরিমান সিকদার করে না, ইমু। আমার চোখ এমনিতেই সব দেখতে পায়। এখন ফোন রেখে ঘুমাও। কাল সকালে যেন ক্লাসে লেট না দেখি।"

ইমা রাগে ফোনটা অফ করে দিল। এই মানুষটা দিন দিন ওর জন্য একটা অবসেসনে পরিণত হচ্ছে। ও কিছুতেই আরিমানের এই মানসিক খেলায় হার মানবে না।

পরদিন ইউনিভার্সিটিতে পা রাখতেই ইমা বুঝতে পারল আজকে কিছু একটা অদ্ভুত ঘটতে চলেছে। ডিপার্টমেন্টের নোটিশ বোর্ডের সামনে ছাত্র-ছাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। ইমা কৌতূহল নিয়ে ভিড় ঠেলে সামনে যেতেই দেখল, সেখানে একটা নতুন নোটিশ টাঙানো হয়েছে। আগামী মাস থেকে ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে একটা ফিল্ড ট্রিপ এবং রিসার্চ প্রজেক্টের আয়োজন করা হয়েছে। আর সেই প্রজেক্টের কো-অর্ডিনেটর এবং গাইড হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আরিমান সিকদার-কে। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা ও খেল তালিকার একদম নিচে নিজের নাম দেখে।

প্রজেক্টের স্টুডেন্ট লিড এবং আরিমানের ডিরেক্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে: মিস ইমা রহমান (রোল - ২৩)।

ইমার মাথাটা মুহূর্তের মধ্যে চক্কর দিয়ে উঠল। পুরো করিডোরের সবাই ওকে নিয়ে ফিসফিস করছে। কেউ ভাবছে ও কত লাকি, আর ইমা মনে মনে ভাবছে, এই মানুষটা ওকে জ্যান্ত কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করছে।

ও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। রাগে কাঁপতে কাঁপতে ও সোজা গিয়ে দাঁড়াল আরিমানের কেবিনের দরজার সামনে। কোনো পারমিশন না নিয়ে, নক না করেই ও এক ঝটকায় দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকে গেল।

আরিমান তখন একমনে একটা রিসার্চ পেপার পড়ছিল। দরজার শব্দে ও চশমাটা খুলে ডেস্কে রাখল। ইমার এই উগ্র রূপ দেখেও ওর মুখে কোনো বিস্ময় নেই, বরং এক অদ্ভুত শান্ত ভাব।

"আপনার সাহস কী করে হয় স্যার?" ইমা ডেস্কের ওপর দুই হাত রেখে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, "আপনি জেনেবুঝে এই প্রজেক্টে আমার নাম দিয়েছেন! আপনি আমার পার্সোনাল লাইফের রিজেকশনের শোধ আমার প্রফেশনাল লাইফে নিচ্ছেন!"

আরিমান আস্তে করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ও টেবিলটা ঘুরে এসে ইমার খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। দুই হাত পকেটে গুঁজে আরিমান ইমার চোখের দিকে তাকাল।এবং গলার স্বর এতটাই নিচু যে তা শুধু ইমার কান পর্যন্তই পৌঁছাল।

"রিজেকশন? তুমি সত্যিই ভাবো ইমু, তোমার একটা 'না' আরিমান সিকদারকে থামিয়ে দিতে পারে? প্রজেক্টের নামটা আমিই দিয়েছি, কারণ আমি তোমাকে চব্বিশ ঘণ্টা আমার চোখের সামনে রাখতে চাই। তুমি আমার থেকে যত দূরে যাওয়ার চেষ্টা করবে, এই আরিমান সিকদার তোমাকে তত কাছে টেনে আনবে। এবার বলো, প্রজেক্টটা ড্রপ করার কোনো রাস্তা আছে তোমার কাছে?"

আরিমানের চোখের সেই তীব্র, অন্ধকার চাতুর্য দেখে ইমা এক পা পিছিয়ে গেল। ও বুঝতে পারল, ও এক ভয়ঙ্কর জালের ভেতর আটকা পড়ে গেছে।

আরিমানের এত কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ওর চোখের সেই তীব্র, চেনা জেদ দেখে ইমার গলাটা যেন আটকে গেল। কেবিনের এসি-র ঠাণ্ডা বাতাসেও ওর কপালে সূক্ষ্ম ঘামের বিন্দু জমে উঠেছে। ও আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে উল্টো ঘুরে প্রায় দৌড়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো।

করিডোরে আসতেই ও লম্বা একটা দম নিল। ইমার ফর্সা, মায়াবী মুখটা রাগে আর উত্তেজনায় একদম টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। এমনিতেই ইমা দেখতে বেশ ডাগরচোখা ওর টানা টানা কালো চোখ দুটোতে সবসময় এক ধরনের চঞ্চলতা খেলা করে। কোমরের নিচ পর্যন্ত নেমে যাওয়া ঘন কালো চুলগুলো ও সাধারণত একটা ক্লিপ দিয়ে কোনোমতে আটকে রাখে, যার কিছু অবাধ্য গোছা সারাক্ষণ ওর কপালে আর গালে এসে পড়ে। আজ একটা নেভি ব্লু কুর্তির সাথে সাদা স্কার্ফ জড়িয়ে ও ইউনিভার্সিটিতে এসেছে, যেখানে কোনো আড়ম্বর নেই, অথচ এই সাদামাটা রূপেই ইমাকে ভীষণ সতেজ আর অনন্য দেখায়।

কিন্তু আয়নায় নিজের এই চেহারা দেখে ইমার নিজের ওপরই রাগ হলো। আরিমান সিকদার নামের এই মানুষটা ওর সব শান্তি কেড়ে নিয়েছে!

দেখতে দেখতে ফিল্ড ট্রিপের দিনটি চলে এলো। সকাল সাতটায় ইউনিভার্সিটির মেইন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে প্রজেক্টের পুরো টিম। ইমা একটা হালকা পিচ রঙের কুর্তি আর জিন্স পরে এক কোণে দাঁড়িয়ে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে অপেক্ষা করছিল। সকালের মিষ্টি রোদে ওর গায়ের ফর্সা রঙটা যেন আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।

ঠিক তখনই একটা কালো রঙের গাড়ি এসে থামল গেটের সামনে। ড্রাইভ করছিলেন ইরফান, আর পেছনের সিট থেকে নামল আরিমান। আজ আরিমানকে দেখে ইমা সহ উপস্থিত অন্য ছাত্র-ছাত্রীরাও কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সবসময় ফরমাল শার্ট-প্যান্ট আর চোখে চশমা পরা সেই খিটখিটে লেকচারার যেন আজ পুরোপুরি উধাও!

আরিমানের পরনে আজ একটা জলপাই রঙের ক্যাজুয়াল লিনেন শার্ট, যার ওপরের দুটো বোতাম খোলা, আর হাতা দুটো বরাবরের মতোই কনুই পর্যন্ত নিখুঁতভাবে গুটানো। সাথে ম্যাচিং করা কালো গ্যাবার্ডিন প্যান্ট আর পায়ে প্রিমিয়াম লেদারের ক্যাজুয়াল জুতো। চোখে আজ সেই চশমাটা নেই, তার বদলে জায়গা করে নিয়েছে একটা ব্র্যান্ডেড ব্ল্যাক সানগ্লাস। চশমাটা সরে যাওয়ায় ওর তীক্ষ্ণ চোয়াল আর ধারালো নাকটা যেন আরও বেশি আকর্ষণীয় লাগছে। আরিমান গাড়ি থেকে নেমে চুলগুলো হাত দিয়ে একবার পেছনের দিকে সরাতেই ডিপার্টমেন্টের বাকি মেয়েদের মধ্যে একটা মৃদু ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেল।

ইরফান গাড়ি থেকে নেমে ইমার কাছে এসে বলল, "ইমু, তোদের প্রজেক্টের সাইটটা তো আমাদের নতুন ফ্যাক্টরির ওদিকেই। তাই ভাবলাম আরিমানকে একবারে ড্রপ করে দিয়ে যাই। তুই সাবধানে যাবি, আর আরিমানের কথা শুনবি।"

ইমা ভাইয়ার কথায় মাথা নাড়ল ঠিকই, কিন্তু ওর চোখ চলে গেল আরিমানের দিকে। আরিমান সানগ্লাসটা সামান্য নামিয়ে চশমা ছাড়া সেই গভীর চোখ দুটো দিয়ে সোজা ইমার দিকে তাকাল। ওর ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত অহংকারী কিন্তু তৃপ্ত একটা হাসি। ও যেন ইমার চোখের পলকহীন চাউনি দেখে মনে মনে খুব মজা পেয়েছে।

আরিমান এগিয়ে এসে গম্ভীর কিন্তু কেতাদুরস্ত গলায় বলল, "গুড মর্নিং এভরিওয়ান। আশা করি সবাই সময়মতো চলে এসেছে। আমাদের জার্নিটা একটু লম্বা, তাই কেউ যেন বাসে কোনো ঝামেলা না করে। মিস ইমা রহমান, প্রজেক্ট লিড হিসেবে সবার অ্যাটেনডেন্স শিটটা আমার কাছে জমা দিন।"

ইমা নিজের ব্যাগ থেকে খাতাটা বের করে আরিমানের দিকে এগিয়ে দিল। দেওয়ার সময় ইমার আঙুল ভুলবশত আরিমানের শক্ত হাতের তালুতে ছোঁয়া লেগে গেল। একটা মৃদু বৈদ্যুতিক শকের মতো অনুভূতি হতেই ইমা চট করে হাতটা সরিয়ে নিল।

আরিমান খাতাটা নিতে নিতে নিচু গলায় বলল, "ট্রিপে নজরটা কাজের দিকে রেখো, আমার দিকে নয়।"

ইমা চোখ বড় বড় করে তাকাল। এই মানুষটা সবার সামনেও এমন কথা বলতে পারে! ও রাগে গজগজ করতে করতে বাসের দিকে পা বাড়াল।

বাস ছাড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ইমার ফোনে একটা মেসেজ এলো। তিশার মেসেজ।

"শুনলাম তুই আরিমান ভাইয়ার সাথে ঢাকার বাইরে ট্রিপে যাচ্ছিস? ইমা, তুই মুখে ওনাকে অপছন্দ করার ভান করিস, আর ভেতরে ভেতরে ওনার কাছাকাছি থাকার এত বড় সুযোগ হাতছাড়া করিস না, তাই না? মনে রাখিস, আরিমান ভাইয়াকে আমি পছন্দ করি। তুই ওনার থেকে দূরে থাকলেই ভালো করবি।"

মেসেজটা পড়ে ইমার মাথাটা আরও গরম হয়ে গেল। একদিকে আরিমানের এই অদ্ভুত জাল, অন্যদিকে তিশার এই অমূলক ঈর্ষা সব মিলিয়ে ইমা বুঝতে পারল, এই ফিল্ড ট্রিপটা ওর জীবনের অন্যতম বড় একটা ঝড় নিয়ে আসতে চলেছে।

চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন