#তুমিই_আমার_হৃদয়হরণী পর্ব-৪
#লেখিকা_আশু
বাস চলতে শুরু করল। আরিমান বসেছে বাসের একদম সামনের সিটে, আর ইমা বসেছে ঠিক তার দুই সারি পেছনে জানালার ধারে। বাসের উইন্ডশিল্ডের আয়নায় তাকাতেই ইমা দেখল, আরিমান সানগ্লাসটা খুলে সিটে হেলান দিয়ে বসে আছে, আর আয়নার ভেতর দিয়ে ওর সেই ধারালো চোখ দুটো ঠিক ইমার ওপরই স্থির হয়ে আছে। ইমা তড়িঘড়ি করে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল, কিন্তু ওর কানের ভেতর বাসের ছাত্র-ছাত্রীদের গান-বাজনার শোরগোলের বদলে নিজের হার্টবিটের আওয়াজই যেন বেশি চড়া শোনাল।
ঘণ্টাখানেক পর বাস হাইওয়ের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় ছুটে চলেছে। পিচ রঙের কুর্তির হাতায় আঙুল জড়াতে জড়াতে ইমা মনে মনে তিশার মেসেজটার কথা ভাবছিল।
"তিশাপু কেন বুঝছে না যে এই মানুষটা একটা আস্ত সাইকো!" ইমা বিড়বিড় করল। ঠিক তখনই বাসের কাচের প্রতিফলনে ও দেখল, আরিমান নিজের সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। সানগ্লাসটা এখন ওর শার্টের কলারে ঝুলছে, আর চশমা ছাড়া সেই ধারালো চোখে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য।
আরিমান দুই সারি পেরিয়ে এসে ঠিক ইমার সিটের পাশে দাঁড়াল। বাসের ঝাঁকুনিতে ও ওপরের হ্যান্ডেলটা একহাতে শক্ত করে ধরল, যার ফলে ওর হাতের সুগঠিত পেশিগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। ও নিচু হয়ে ইমার দিকে তাকিয়ে বলল, "মিস ইমা রহমান, প্রজেক্টের প্রথম ফেজের ডেটা শিটগুলো বের করুন। আমাদের সাইটে পৌঁছানোর আগেই এগুলো একবার রিচেক করতে হবে।"
ইমা সোজা হয়ে বসে মুখটা শক্ত করে বলল, "স্যার, বাসের ভেতরে এত ঝাঁকুনিতে ডেটা শিট দেখা সম্ভব নয়। আমার মাথা ঘুরাচ্ছে।"
আরিমান এক মুহূর্ত ইমার ফর্সা, ক্লান্ত মুখের দিকে তাকাল। ওর টানা টানা চোখ দুটোতে সত্যিই কিছুটা ক্লান্তির ছাপ। আরিমান ওর গলার স্বর কিছুটা নরম করে বলল, "মাথা ঘুরাচ্ছে? সকাল থেকে কিছু খেয়েছ?"
"আপনার সেটা না জানলেও চলবে," ইমা মুখ ফিরিয়ে নিল।
আরিমান আর কোনো কথা না বলে সোজা নিজের সিটে ফিরে গেল। ইমা ভাবল, যাক বাবা, খিটখিটে লোকটা অন্তত পিছু ছাড়ল। কিন্তু মিনিট দুয়েকের মাথায় আরিমান আবার ফিরে এলো। এবার ওর হাতে একটা ছোট ফ্লাস্ক আর একটা ক্যাটবেরি সিল্ক চকোলেট।
ও চকোলেট আর ফ্লাস্কটা ইমার কোলের ওপর রেখে একদম হুকুমের সুরে বলল, "চকোলেটটা পুরোটা শেষ করবে। আর এই ফ্লাস্কে লেবুর শরবত আছে, এটা ইরফান স্পেশালি তোমার জন্য গাড়িতে দিয়ে দিয়েছিল। অবাধ্যতা না করে দুটোই শেষ করো, নয়তো সাইটে গিয়ে ল্যাবের কাজ ডাবল করে দেব।"
ইমা চকোলেটটার দিকে তাকাল। ও চকোলেট প্রচণ্ড পছন্দ করে, আর এই গরমে লেবুর শরবতের নাম শুনে ওর জিহ্বায় জল চলে এলো। ও আর রাগ ধরে রাখতে পারল না, ফ্লাস্কটা খুলে এক চুমুক দিতেই ওর শরীরটা যেন জুড়িয়ে গেল। ও আড়চোখে আরিমানের দিকে তাকাতেই দেখল, আরিমান এক কোণে দাঁড়িয়ে এক হাত পকেটে গুঁজে তীব্র তৃপ্তি নিয়ে ওকে দেখছে। ও যেন মনে মনে ভাবছে, "তোমাকে বশ করা আমার জন্য সময়ের ব্যাপার মাত্র, ইমু।"
বিকেলের দিকে বাস এসে পৌঁছাল গাজীপুরের এক প্রত্যন্ত রিসোর্টের সামনে, যেখানে ওদের প্রজেক্টের ল্যাব আর ফিল্ড সাইট তৈরি করা হয়েছে। চারপাশটা সবুজে ঘেরা, চমৎকার পরিবেশ। কিন্তু ইমার কপাল খারাপ, রিসোর্টের রুম বণ্টনের দায়িত্ব ছিল আরিমানের হাতে।
সবাই যখন নিজেদের রুমের চাবি নিয়ে চলে যাচ্ছে, ইমা তখন ডেস্কে দাঁড়িয়ে রইল। আরিমান একটা চাবি ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "রুম নাম্বার ২০৪। এটা তোমার রুম। ফ্রেশ হয়ে আধা ঘণ্টার মধ্যে লবিতে আসবে, প্রজেক্টের এরিয়াটা ঘুরে দেখতে যাব।"
পরদিন সকাল হতেই ফিল্ড প্রজেক্টের আসল কাজ শুরু হয়ে গেল। রিসোর্টের ঠিক পেছনেই একটা ছোটখাটো পাহাড়ি জঙ্গল আর ছড়া ঝর্ণার মতো পাহাড়ি খাল। ছাত্র-ছাত্রীদের দলবল সব টেস্ট টিউব আর খাতা-কলম নিয়ে নেমে পড়েছে স্যাম্পল কালেকশনে।
ইমা একটা হালকা হলুদ রঙের কুর্তি পরে হাতে ক্লিপবোর্ড নিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছিল। রোদ বাড়ার সাথে সাথে ওর ফর্সা মুখটা গরমে লাল হয়ে উঠেছে, আর কপালে জমেছে ছোট ছোট ঘামের বিন্দু। ও একমনে মাটির আর্দ্রতার রিডিং লিখছিল, ঠিক তখনই পেছন থেকে এক জোড়া শক্ত হাত এসে ওর হাতের ক্লিপবোর্ডটা এক এক ঝটকায় কেড়ে নিল।
ইমা চমকে উঠে তাকিয়েই দেখল আরিমান দাঁড়িয়ে আছে। আজ ওর চোখে চশমা নেই, তার বদলে সেই কিলার ব্ল্যাক সানগ্লাসটা কপালে ওঠানো। পরনে একটা নেভি ব্লু পোলো শার্ট, যা ওর চওড়া কাঁধের সাথে একদম পারফেক্টলি ফিট হয়ে আছে।
"সারাদিন এই রোদের মধ্যে টো টো করে ঘুরলে প্রজেক্টের কাজ কবে শেষ হবে, মিস ইমা?" আরিমান একদম গম্ভীর গলায় বলল।
ইমা মুখ ফুলিয়ে বলল, "আমি তো কাজই করছিলাম স্যার! আপনিই তো এসে ডিস্টার্ব করলেন। দিন আমার খাতা!"
"খাতা দেব, তবে একটা শর্তে। ওই যে সামনের টিলাটা দেখছ? ওখানে একটা রেয়ার ফাঙ্গাসের স্যাম্পল আছে। ওটা শুধু তুমি আর আমি গিয়ে নিয়ে আসব। বাকিরা সবাই এখানে নদীর পাড়ে কাজ করুক," আরিমান বেশ একটা অফিশিয়াল টোন বজায় রেখে বলল।
কিছুক্ষণ হাঁটার পরই ইমা বুঝল ও চরম ভুল করেছে আরিমানের কথায় রাজি হয়ে। পাহাড়ি জঙ্গলটা বেশ ঘন, আর তার চেয়েও বড় কথা আরিমান সিকদার মানুষটা লম্বা লম্বা পায়ে এত দ্রুত হাঁটছে যে ইমার ছোট ছোট পায়ে ওর সাথে তাল মেলানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
"এই যে স্যার! একটু আস্তে হাঁটুন। আমি কি রোবট নাকি?" ইমা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।
আরিমান পেছনে ফিরে তাকাল। ইমার এই ক্লান্ত, রাগী রূপটা দেখে ওর ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। ও সানগ্লাসটা চোখে দিয়ে বলল, "বায়োলজির স্টুডেন্ট হয়ে এত কম স্ট্যামিনা? ইরফান তো বলেছিল তুমি নাকি বাসায় সারাদিন শুধু ঘুমাও আর চিপস খাও। এখন বুঝছি কেন!"
"ভাইয়া একটা আস্ত পচা! আপনার কাছে আমার নামে এসব বানিয়ে বানিয়ে বলে!" ইমা রেগে গিয়ে আরিমানকে ওভারটেক করে হনহন করে সামনে হাঁটতে লাগল।
"ইমু, ওদিকে যেও না! ওদিকের রাস্তাটা পিচ্ছিল!" আরিমান পেছন থেকে ডেকে উঠল।
কিন্তু ইমা তখন রাগে অন্ধ। ও আরিমানের কথা শুনলই না। আর ঠিক তখনই ঘটল অঘটনটা। একটা ভেজা মাটির ঢালু জায়গায় পা পিছলে গেল ইমার।
"ইই মা রে!" একটা জোরালো চিৎকার দিয়ে ইমা ধপাস করে গড়িয়ে পড়ে গেল নিচের একটা ঝোপের মধ্যে।
আরিমান এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে প্রায় লাফিয়ে নিচে নেমে এলো। ওর মুখের সেই গম্ভীর ভাব উধাও, সেখানে এখন স্পষ্ট আতঙ্ক। ও ঝোপের ভেতর থেকে ইমাকে টেনে বের করল। ইমার হলুদ জামায় কাদা লেগে একাকার, আর ডান পায়ের গোড়ালিটা চেপে ধরে ও তখন চোখ বন্ধ করে কান্না শুরু করে দিয়েছে।
"কোথায় লেগেছে? দেখি!" আরিমান হাঁটু গেড়ে ইমার সামনে বসল। ওর কণ্ঠস্বরে এবার আর কোনো 'স্যার' সুলভ ভাব নেই, এক তীব্র ব্যাকুলতা।
"উঁহু... ধরবেন না আমাকে! সব আপনার জন্য হয়েছে! জংলি লোক একটা!" ইমা কাঁদতে কাঁদতে আরিমানের দিকে রাগে তাকিয়ে।
আরিমান কোনো কথা না বলে আলতো করে ইমার ডান পা-টা নিজের হাতের ওপর তুলল। গোড়ালিটা একটু নাড়াতেই ইমা আবার চিৎকার করে উঠল, "আহহহ! মরে গেলাম!"
"মচকে গেছে। এই অবস্থায় এক পা-ও হাঁটতে পারবে না," আরিমান চট করে নিজের সানগ্লাসটা শার্টের কলারে আটকে এক ঝটকায় ইমাকে নিজের পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল।
ইমা একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। ওর কান্না এক সেকেন্ডে গায়েব! ও দুই হাত দিয়ে আরিমানের চওড়া কাঁধটা জড়িয়ে ধরে চোখ বড় বড় করে তাকাল। আরিমানের বুকটা তখন দ্রুত ওঠানামা করছে, আর ওর শরীর থেকে আসা সেই চেনা পারফিউমের তীব্র সুবাস ইমার মাথাটা আরও ঝিমঝিম করিয়ে দিল।
" ছাড়ুন! আমি নিজে হাঁটতে পারব!" ইমা অস্বস্তিতে ছটফট করতে চাইল।
আরিমান ইমার কোমরে আর পিঠে নিজের হাতের বাঁধন আরও শক্ত করে বুক কাঁপানো গলায় বলল, "একদম চুপচাপ চড়ে থাকো ইমু। বেশি নড়াচড়া করলে দুজনেই নিচে খাদে পড়ে যাব। আর আমার কোলে থাকাটা যদি তোমার ভালো লেগে থাকে, তবে সেটা সোজাসুজি স্বীকার করলেই পারো!"
ইমা লজ্জায় আর রাগে লাল হয়ে আরিমানের শার্টের কলারটা খামচে ধরে মুখটা ওর বুকের আড়ালে লুকিয়ে ফেলল। ও মনে মনে টের পাচ্ছিল, আরিমানের এই শক্ত বুকের ভেতর ওর নিজের হার্টবিটটাও কেমন যেন তাল হারিয়ে ফেলছে।
রিসোর্টে ফিরে আসার পর ল্যাবের ফার্স্ট এইড দিয়ে ইমার পায়ে একটা ব্যান্ডেজ বেঁধে দেওয়া হলো। বিকেল গড়িয়ে রাত নামল। রাতের খাবার শেষ করে রিসোর্টের লবিতে সব ছাত্র-ছাত্রীরা মিলে একটা জমজমাট আড্ডার আয়োজন করেছে। কেউ গিটার বাজাচ্ছে, কেউ গল্প করছে। ইমা একটা সোফায় পা টান টান করে বসে সব দেখছিল।
আরিমান একটু দূরে শিক্ষকদের টেবিলে বসে কফি খাচ্ছিল, কিন্তু ওর চোখ জোড়া বারবার ঘুরেফিরে ইমার ওপরই এসে থমকে যাচ্ছিল।
রাত যখন সাড়ে এগারোটা, আড্ডা শেষ করে সবাই যার যার রুমে চলে গেল। ইমাও দেওয়াল ধরে ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে নিজের রুমে দিকে এগোচ্ছিল। করিডোরের এই অংশটায় লাইটের আলোটা একটু কম, বেশ একটা মায়াবী অন্ধকার চারিপাশে।
ঠিক তখনই ইমার ঘরের দরজার ঠিক সামনে আসতেই পেছন থেকে একটা চেনা ছায়া এসে ওর পথ আগলে দাঁড়াল। ইমা চমকে ওঠার আগেই আরিমান এক হাত দিয়ে ইমার কোমর জড়িয়ে ধরে অন্য হাত দিয়ে ওর মুখটা চেপে ধরল। এক ঝটকায় ও ইমাকে করিডোরের দেওয়ালের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল।
দেওয়ালের ঠাণ্ডা ভাব আর আরিমানের শরীরের তীব্র উষ্ণতা এই দুইয়ের মাঝে পড়ে ইমার দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়। আরিমান ওর মুখের ওপর থেকে হাতটা সরাল, কিন্তু নিজের মুখটা ইমার মুখের এত কাছাকাছি নিয়ে এলো যে ওদের নাকের ডগা প্রায় ছুঁয়ে যাচ্ছে।
"আজকে দুপুরে কোলে চড়ে খুব তো রাগ দেখাচ্ছিলে? এখন এই মাঝরাতে করিডোরে একা পেয়ে যদি আমি আমার অপমানের বাকি শোধটা তুলে নিই?"
আরিমানের গলার স্বর একদম নিচু, ফিসফিসানি, কিন্তু তাতে এক অদ্ভুত নেশা জড়ানো। ওর চোখ দুটো যেন ইমার কাঁপতে থাকা ঠোঁটের ওপর এসে আটকে গেছে।
"আ... আরিমান ভাইয়া... প্লিজ ছাড়ুন। কেউ দেখে ফেলবে," ইমা এবার আর 'স্যার' বলতে পারল না, ভয়ে আর লজ্জায় ওর মুখ থেকে আসল ডাকটাই ব্যকুল হয়ে বেরিয়ে এলো।
ইমার মুখে নিজের নাম শুনে আরিমানের চোখের চাতুর্য যেন আরও গভীর হলো। ও ইমার কানের লতির কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, "উঁহু, এত সহজে তো ছাড়ছি না হৃদয়হরণী। তুমি না বলেছিলে আমি বড্ড খিটখিটে? তা, এই খিটখিটে লোকটার খাঁচায় বন্দী হয়ে থাকতে কেমন লাগছে ইমু?"
বলতে বলতে আরিমান ইমার নরম গালে আলতো করে নিজের হাতের আঙুলটা ছোঁয়াল। ইমা চোখ বন্ধ করে দেওয়ালটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ও বুঝতে পারছিল, এই খিটখিটে প্রফেসরের প্রেমের জাল থেকে পালানোর আর কোনো পথ ওর জানা নেই।
চলবে....