#তুমিই_আমার_হৃদয়হরণী পর্ব-৫
#লেখিকা_আশু
ফিল্ড ট্রিপের কাজ শেষ করে পরের দিনই পুরো টিম নিয়ে বাস ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। তবে ট্রিপের ওই রোমাঞ্চকর সমাপ্তির পর, ফেরার পুরোটা সময় ইমা আর আরিমানের মধ্যে একটা রহস্যময় নীরবতা কাজ করছিল। দুজনের কেউই কোনো কথা বলল না। আরিমান বাসের একদম সামনের সিটে চোখ বন্ধ করে, সিটের সাথে মাথা হেলান দিয়ে স্থবির হয়ে বসে ছিল। ওর চেনা চটপটে ভাবটা একদম গায়েব। আর ইমা পেছনের সিটে বসে বারবার সামনের উইন্ডশিল্ডের আয়নায় আরিমানের দিকে তাকাচ্ছিল। আবছা আলোয় আরিমানের ফ্যাকাশে আর ক্লান্ত মুখটা দেখে ভাবল, হয়তো মাথা ব্যথার কারণে লোকটার এমন ছন্নছাড়া অবস্থা লাগছে।
ঢাকায় পৌঁছানোর পর ইমার পায়ের ব্যথাটা যেন এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে গেল। গোড়ালিটা ফুলে একদম আলু হয়ে গেছে, পা মাটিতে ফেলার কোনো কায়দাই নেই। বাসায় পৌঁছাতেই বড় চাচা আর ফুফু ইমার এই অবস্থা দেখে মাথায় হাত দিয়ে রীতিমতো হইচই বাঁধিয়ে দিলেন। তড়িঘড়ি করে ডাক্তার ডাকা হলো। ডাক্তার এসে এক্স-রে রিপোর্ট দেখে গম্ভীর মুখে তিন দিনের কড়া 'বেড রেস্ট' লিখে দিলেন। সাথে সাফ জানিয়ে দিলেন—এই তিন দিন ভার্সিটি যাওয়া তো দূরের কথা, বিছানা থেকে পা নিচে নামানোও একদম নিষেধ!
বিছানায় শুয়ে শুয়ে ইমার অলস দিন কাটছিল ঠিকই, কিন্তু ওর মন কোনোভাবেই ঘরে টিকছিল না। আজ দুদিন ধরে ও ভার্সিটি যায় না। ওই খিটখিটে, জেদি লোকটা এখন কেমন আছে? ও কি এখনো রেগে আছে, নাকি ওর শরীরটা সত্যিই খারাপ? বড় ভাইয়া ইরফানের কাছে ইমা শুনেছে, আরিমান নাকি ভীষণ অসুস্থ, প্রচণ্ড জ্বর এসেছে ওর।
এই দীর্ঘ দুদিনে আরিমানের পক্ষ থেকে কোনো মেসেজ বা কল আসেনি। এই নীরবতা ইমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত শূন্যতা আর চড়তে থাকা অস্থিরতা তৈরি করছিল। বিছানায় ছটফট করতে করতে ইমা একটা জিনিস টের পাচ্ছিল—ও মনে মনে আরিমানের ওই খিটখিটে স্বভাব, গম্ভীর চোখের শাসন আর মাঝরাতের মিষ্টি পাগলামিটা বড্ড বেশি মিস করতে শুরু করেছে। এই অনুভূতিটা ও নিজের কাছেও এখন আর অস্বীকার করতে পারছে না।
দেখতে দেখতে কেটে গেল তিন দিন। আজ তৃতীয় দিন, রাতের বেলা। বাইরে তখন আকাশ ভেঙে ঝুম বৃষ্টি নামছে। ইমা ঘরের জানালা দিয়ে বাইরের সেই অন্ধকার আর বৃষ্টির ছাঁট দেখছিল। সারা বাড়ি নিস্তব্ধ। ঠিক তখনই ঘরের লাগোয়া ব্যালকনির স্লাইডিং কাচের ওপাশে একটা বিশাল ছায়া নড়ে উঠল!
ইমা ভয়ে একদম জমে গেল। এই মাঝরাতে, এই তুমুল বৃষ্টিতে চোর নাকি? ও লাঠি গোছের কিছু একটা খুঁজতে যাবে, ঠিক তখনই কাচের ওপাশ থেকে কেউ খুব মৃদুভাবে টোকা দিল। ইমা বুক ধকধকানি নিয়ে চোরের দিকে এগোলো। কিন্তু আবছা আলোয় চশমা আর সেই পরিচিত ধারালো মুখের অবয়বটা স্পষ্ট হতেই ওর চোখ চড়কগাছ! আরিমান সিকদার! এই মাঝরাতে, জল-ঝড় উপেক্ষা করে, মই বেয়ে ও দোতলার ব্যালকনিতে উঠে এসেছে?
ইমা দ্রুত গিয়ে স্লাইডিং ডোরটা একটুখানি ফাঁক করে ফিসফিস করে রেগেমেগে বলল, "আপনার কি মাথা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে স্যার? এই রাতে ব্যালকনি দিয়ে কেন এসেছেন?"
আরিমান কোনো কথা বলল না। ইমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো শক্তিও যেন ওর ছিল না। ও ইমাকে আলতো একটা ধাক্কা দিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। ইমা কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই আরিমান হঠাৎ করেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইমার গায়ের ওপর ঢলে পড়ল!
ইমা একদম ভড়কে গেল। আরিমানের এই বিশাল, চওড়া আর ভারী দেহের ভার সামলানোর ক্ষমতা ওর এই দুর্বল শরীরে ছিল না। ফল যা হওয়ার তাই হলো—দুজনে মিলে একসাথেই ফ্লোরের ওপর আছড়ে পড়ল। তবে পড়ার ঠিক শেষ মুহূর্তে আরিমান যেন অবচেতনভাবেই খেয়াল রাখল ইমার পায়ে যাতে নতুন করে চোট না লাগে। ও নিজেকে কিছুটা ঘুরিয়ে নিয়ে নিচে পড়ল, আর ইমা পড়ল ওর বুকের ওপর।
ফ্লোরে পড়ার পর ইমা খেয়াল করল আরিমানের শরীরটা যেন একটা জ্বলন্ত চুল্লি! তীব্র জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে ওর।
আরিমান হুট করেই ইমার হাতটা নিজের তপ্ত মুঠোয় শক্ত করে টেনে ধরল। ইমা হকচকিয়ে আরিমানের একদম কাছাকাছি ফ্লোরে বসে পড়ল। ও নিজেকে ছাড়ানোর শক্তি পাচ্ছিল না।
"তুই তিন দিন ধরে কলেজে যাস না ইমু... ল্যাবটা একদম অন্ধকার লাগছিল," আরিমান জড়িয়ে যাওয়া গলায়, খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল। ওর হাতের তালুর তীব্র উত্তাপ ইমার ঠাণ্ডা চামড়ায় বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়ল। ও আবার বলল, "আমার জ্বর কমানোর একটাই ওষুধ আছে, জানিস? আমার বউয়ের হাতের সেবা। এখন বল, তুই কবে আসছিস আমার বাড়িতে?"
"কিসব উল্টোপাল্টা বকছেন আরিমান ভাইয়া?" ইমা কোনোমতে নিজের লজ্জা আর বিব্রতাবোধ সামলে নিয়ে বলে উঠল।
আরিমান ইমার হাতটা নিজের বুকের ওপর আরও শক্ত করে চেপে ধরে চোখ দুটো বুজে ফেলল। এক পরম শান্তিতে, বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ও বলল, "তোকে ছাড়া এই আরিমান সিকদারের আর কোনো গতি নেই, বুঝলি আমার হৃদয়হরণী?"
ইমা এবার একদম চুপ হয়ে গেল। আরিমানের এই জ্বরের ঘোরে, এই অসহায় অবুঝের মতো ভালোবাসা প্রকাশের ধরনটা ওর মনের একদম গহীনে গিয়ে খুব জোরে একটা ধাক্কা দিল। ওর চোখ দুটো কেমন যেন ভিজে এল।
আরিমান এবার ইমার কোলের ওপর মাথাটা আরও একটু আরাম করে গুছিয়ে নিল। গলার স্বর নেশাতুর আর জড়িয়ে জড়িয়ে বলতে লাগল, "আমার বউ তোকেই হতে হবে, বুঝলি? কিচ্ছু করা লাগবে না তোর। আমার জাস্ট ৩ টা বাচ্চাকাচ্চা লাগবে, ব্যস! তাহলেই হবে। আর কিছু করা লাগবো না তোর..."
আরিমানের মুখে এমন প্রকাশ্য আর লজ্জাহীন কথাবার্তা শুনে ইমা এবার লজ্জায় লাল হয়ে গেল। ও চোখ রাঙিয়ে ফিসফিস করে ধমক দিয়ে বলল, "অসভ্য লোক একটা! আপনি এখন সোজা নিজের বাসায় যাবেন, নাকি আমি এখনই চেঁচিয়ে বাড়ির লোক ডাকব? সবাইকে বলব যে আমাদের কলেজের গম্ভীর প্রফেসর মাঝরাতে আমার রুমে এসে মাতলামি করছে?"
আরিমান জ্বরের ঘোরেই হাহা করে এক চিলতে হেসে বলল, "আমি কি ভয় পাই নাকি? ডাক সবাইকে! এক্কেবারে আজকেই ঢাকঢোল পিটিয়ে তোকে বউ করে নিয়ে বাসর, হানিমুন সব সেরে ফেলব..."
আরিমানের মুখে এই বাসর-হানিমুনের কথা শুনে ইমা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ও চট করে নিজের নরম হাতের তালুটা দিয়ে আরিমানের মুখটা চেপে ধরল। রাগে, লজ্জায় আর অপমানে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, "লজ্জা-শরম সব ধুয়ে খেয়েছেন আপনি? কীসব আজেবাজে বকছেন! আপনাকে আমি এই জীবনেও বিয়ে করছি না। আপনার বিয়ের দাওয়াত আমি পেট পুরে খাব, মনে রাখবেন!"
আরিমান নিজের মুখের ওপর থেকে ইমার হাতটা আলতো করে সরিয়ে দিল। তারপর ওর মুখটাতে একটা প্রবল আভিজাত্য আর গম্ভীর ভাব এনে বলল, "বিয়ে না করলি নাই, তুই শুধু আমার বউ হয়ে যাস! নিকাহ করে ফেলব, ওসব বিয়ে-টিয়ে উৎসবের দরকার নাই... ইমু!"
কথাটা বলতে বলতেই আরিমান দেয়াল ধরে কোনোমতে টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল এবং ব্যালকনির দিকে হাঁটা দিল। ইমাও আর স্থির থাকতে পারল না, ও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ওর পেছনে পেছনে ব্যালকনিতে এলো।
আরিমান যখন রেলিং গলে নিচে ঝোলানো মই দিয়ে নামতে যাবে, ইমা হুট করেই ওর শার্টের কোণাটা শক্ত করে টেনে ধরল। নিচু গলায়, একটু আমতা আমতা করে বলল, "সাবধানে নামুন। আর শুনুন... দ্বিতীয়বার যদি আপনাকে এভাবে আমার রুমে দেখি, সোজা পুলিশে দেব!"
আরিমান মইয়ের ওপর এক পা দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে সেই চেনা বাঁকা হাসিটা হাসল। বলল, "জো হুকুম, মাই ডল My doll!"
আরিমানের মুখে এই ঘোর জ্বর আর বৃষ্টির মধ্যেও এমন আজব আদিখ্যেতা শুনে ইমা চোখ ছোট ছোট করে বলল, "নট ডল! আই এম এ গার্ল!"
"ইয়াহ... মাই গার্ল!" আরিমান চোখ টিপ দিয়ে বলল।
ইমা আর কথা না বাড়িয়ে রাগী মুখে ওর নিচের দিকে যাওয়ার পথটার দিকে তাকিয়ে রইল। নিচে তখন বৃষ্টিতে ভিজে একসা হচ্ছিলেন শাওন। এই শাওন হলো আরিমানের জানের দোস্ত, যে কিনা মাত্র কালই আমেরিকা থেকে দেশে ফিরেছে! আর আজই এই বেচারাকে মই ধরার অ্যাসিস্ট্যান্ট বানিয়ে ধরে এনেছে আরিমান।
এদিকে নামতে গিয়ে আরিমান জ্বরের দুর্বলতায় মইয়ের একটা ধাপে সামান্য একটু হোঁচট খেল। কিন্তু ওপর থেকে ইমা তাকিয়ে আছে দেখে ও চট করে নিজেকে সোজা করে নিল। মুখ অবয়বে এমন একটা শক্ত আর হিরোসুলভ ভাব আনল, যেন কিছুই হয়নি! ও যে ইমার সামনে 'সুপারহিরো' সাজার এই কাঁচা ভানটা করছে, ইমা সেটা ওপর থেকে বেশ বুঝতে পারল। ও মুখ টিপে মুচকি হাসতে লাগল।
নিচে নেমে, গেটের দিকে যাওয়ার আগে আরিমান হঠাৎ ওপরের দিকে তাকাল। তারপর ইমার উদ্দেশ্যে বাতাসে একটা জোরদার 'ফ্লাইং কিস' ছুঁড়ে মারল। সেটা দেখে ইমা নিজের ডান হাতটা মাথার পাশে গোল করে ঘুরিয়ে 'পুরো পাগল নাকি আপনি?'—এমন একটা ইশারা করল।
তা দেখে আরিমান দাঁত বের করে হেসে বাতাসে আরেকটা ফ্লাইং কিস ছুড়ল।
নিচে দাঁড়িয়ে শাওন এই পুরো রোমান্টিক থিয়েটার হা হয়ে দেখছিল। আরিমান এসে শাওনের কাঁধে একটা ভর দিয়ে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসতে হাসতে বলল, "ইসসস... কী মিষ্টি রে শাওন! ওরে আমার লাগবেই লাগবে, খুব তাড়াতাড়ি!"
শাওন নিজের ভিজে যাওয়া ক্যাপটা ঠিক করতে করতে গভীর আফসোসের সুরে বলল, "দোস্ত, তোর আর ইরফানের তো ডাবল উইকেট পড়ে যাচ্ছে। আমারও একটা লাগবে রে ভাই! আমি কি এখানে ঘাস কাটার জন্য আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে এসেছি? আমারে একটা অন্তত ধরিয়ে দে!"
আরিমান শাওনের গালে আলতো করে একটা চড় মেরে হেসে বলল, "আমেরিকাতে থেকে কিছু পারলি না, বাংলাদেশে এসে পারবি? তোর দ্বারা হবে না ব্রো! তুই বরং এখন গাড়িটা স্টার্ট দে।"
অপরদিকে ঘরের ভেতর ব্যালকনির দরজা আটকে ইমা বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করতে লাগল। ওর ঠোঁটের কোণে তখন এক চিলতে সুখের হাসি। ইমা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিল, এই খিটখিটে, খ্যাপাটে মানুষটার পাগলামি এখন ওর মনের কোণেও ধীরে ধীরে এক গাঢ় ভালোবাসার রঙ ধরাতে শুরু করেছে।