#তুমিই_আমার_হৃদয়হরণী পর্ব-৮
#লেখিকা_আশু
পরদিন সন্ধ্যাবেলা।
শহরের নামী রুফটপ রেস্তোরাঁটি আলো আর লাল-সাদা গোলাপের পাপড়ি দিয়ে রাজকীয়ভাবে সাজানো হয়েছে। চারদিকে মৃদু রোমান্টিক মিউজিক বাজছে। ইরফান, ফুফু, বড় চাচা, হিয়া আর শাওন সবাই উপস্থিত। ইমাকে নিয়ে আসা হয়েছে একটা গাঢ় লাল রঙের জমকালো শাড়িতে সাজিয়ে। দূর থেকে ওকে দেখলে ঠিক যেন এক রূপকথার পরী মনে হচ্ছিল। কিন্তু সেই পরীর চোখের নিচে যে কান্নার কালচে দাগ মেকআপ দিয়ে ঢাকা, তা কেউ টের পায়নি। ইমার বুকটা তখন দুরুদুরু কাঁপছিল, প্রতিটা সেকেন্ড ওর কাছে ফাঁসির মঞ্চের মতো লাগছিল। তৃষা এক কোণায় দাঁড়িয়ে ইমার দিকে কড়া নজর রাখছিল।
ঠিক রাত আটটায় রেস্তোরাঁর সব আলো নিভে গেল, আর ইমার ওপর এসে পড়ল একটা গোল স্প্টলাইট। ঠিক তখনই করিডোর দিয়ে হেঁটে এলেন আরিমান সিকদার।
পরনে কালো স্যুট, চুলগুলো নিখুঁতভাবে সেট করা, চোখে চশমা। আজ ওনাকে এতটাই হ্যান্ডসাম আর অভিজাত লাগছিল যে রেস্তোরাঁর সবাই ওনার দিকে তাকিয়ে রইল। আরিমানের হাতে একগুচ্ছ লাল গোলাপ আর মুখে এক স্বর্গীয় চিলতে হাসি। ও হেঁটে এসে ইমার ঠিক সামনে দাঁড়াল। ও ভাবছিল, এই কদিনের ইগনোর করার নাটকটার আজ এক মধুর সমাপ্তি ঘটবে।
আরিমান ইমার চোখের দিকে তাকাল। ইমার চোখ দুটো ছলছল করছে দেখে ও ভাবল এটা হয়তো আনন্দের অশ্রু। আরিমান সবার সামনে আলতো করে ইমার সামনে এক হাঁটু গেড়ে ফ্লোরে বসল। পকেট থেকে একটা মখমলের লাল বাক্স বের করে ওটার মুখ খুলল ও। ভেতরে জ্বলজ্বল করছে একটা হিরের আংটি।
আরিমান পুরো রেস্তোরাঁর নীরবতা ভেঙে গভীর, নেশালো কণ্ঠে বলল, "ইমু... আমি জানি আমি ভীষণ খিটছিটে, সারাক্ষণ ক্লাসে রাগ দেখাই, ইদানীং তোকে খুব ইগনোরও করেছি। কিন্তু বিশ্বাস কর, এই গম্ভীর মানুষটার ভেতরের পুরোটা হৃদয় জুড়ে শুধু তুই আছিস। তোর ওই চটপটে ভাব, আর তোর মিষ্টি হাসিটা ছাড়া এই আরিমান সিকদার এক মুহূর্তও বাঁচতে পারবে না। আমার জাস্ট তুই ছাড়া আর কোনো গতি নেই। উইল ইউ ম্যারি মি, মাই হৃদয়হরণী?"
আরিমানের এই নিখাদ, বুক কাঁপানো প্রপোজাল শুনে ফুফু আর হিয়া আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল। শাওন পেছন থেকে শিস দিয়ে উঠল, "উহু! দোস্ত আমার জাস্ট ফাটিয়ে দিয়েছে!"
কিন্তু ইমা? ইমা তখন কাঁপছিল। ও এক পলক কোণায় দাঁড়ানো তৃষার দিকে তাকাল। তৃষা নিজের পকেটে হাত দিয়ে বিষের শিশিটা ইশারা করল।
ইমার চোখের পানি তখন বাঁধ ভেঙে গাল বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ল। ও নিজের ভেতরের সবটুকু ভালোবাসা আর কান্না চেপে ধরে, মুখটা যতটা সম্ভব শক্ত আর নিষ্ঠুর বানিয়ে আরিমানের বাড়িয়ে দেওয়া গোলাপের তোড়াটা এক ঝটকায় হাত দিয়ে ফেলে দিল!
ঝনঝন করে গোলাপগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। পুরো রেস্তোরাঁ মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে গেল। সবার হাতের তালি থেমে গেল।
ইমা কান্নাভেজা চড়া গলায়, আরিমানকে সবার সামনে আঘাত করার জন্য বলল, "বন্ধ করুন আপনার এই সস্তা নাটক, স্যার! আপনার লজ্জা করে না? আপনি আমার কলেজের প্রফেসর, বয়সে আমার চেয়ে কত বড়!আপনি ভেবেছেন কী নিজেকে? দুদিন আমার পেছনে ঘুরঘুর করেছেন আর মই বেয়ে আমার রুমে এসেছেন বলে আমি আপনাকে বিয়ে করব? আপনার মতো একটা মানুষকে আমি মনে মনে চরম ঘেন্না করি! আপনার এই প্রপোজাল আর এই আংটি ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ারও যোগ্য না!"
ইমার মুখ থেকে এই বিষাক্ত, চরম অপমানজনক কথাগুলো শুনে আরিমানের মুখের সেই স্বর্গীয় হাসিটা এক সেকেন্ডে মিলিয়ে গেল। ও যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। যে ইমা কাল রাতেও ওনার হাত নিজের বুকের ওপর চেপে ধরেছিল, সে আজ সবার সামনে ওনাকে এভাবে ছুড়ে ফেলে দিল?
আরিমান ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। ওর চশমার আড়াল থেকে চোখ দুটো ব্যথায়, অপমানে আর অপলক বিস্ময়ে লাল হয়ে উঠল। ওর চওড়া বুকটা তখন ঘন ঘন ওঠানামা করছিল।
ইমা আর এক মুহূর্তও ওখানে দাঁড়াতে পারল না। ও শাড়ির কুচিটা হাত দিয়ে ধরে, কাঁদতে কাঁদতে একছুটে রেস্তোরাঁর এক্সিট গেটের দিকে চলে গেল। হিয়া "ইমা! ইমা!" বলে ওর পেছনে দৌড়াল।
পুরো রুফটপ জুড়ে তখন এক শ্মশানের নীরবতা। আরিমান ফ্লোরে পড়ে থাকা গোলাপগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল, ওনার হাতের আংটির বাক্সটা কাঁপছিল। আর এক কোণায় দাঁড়িয়ে তৃষা নিজের ঠোঁটে এক কুৎসিত, বিজয়ের হাসি ফুটিয়ে তুলল।
রেস্তোরাঁর সেই অভিশপ্ত রাতের পর পুরো সিকদার বাড়ি আর চৌধুরী বাড়ির আকাশটা এক লহমায় বদলে গেল। যে রুফটপ রেস্তোরাঁটি আলো আর আনন্দের জোয়ারে ভেসে যাওয়ার কথা ছিল, সেটি পরিণত হলো এক নির্মম রণক্ষেত্রে। সবার সামনে আরিমান সিকদারকে ছুঁড়ে দেওয়া ইমার সেই বিষাক্ত কথাগুলো শুধু একটা প্রপোজাল ভাঙেনি, ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল কতগুলো মানুষের বিশ্বাস ও সম্মান।
পরদিন সকাল হতেই ইমার জীবনে নেমে এলো নরককুণ্ড। বড় চাচা আর ফুফু ইমাকে ঘরের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে চরম তিরস্কার করলেন। বড় চাচা রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, "তোর এত বড় সাহস কীভাবে হলো ইমা? তুই একটা প্রফেসরের সাথে, আমাদের ঘরের এত বড় একজন শুভাকাঙ্ক্ষীর সাথে এই ধরনের নোংরামি করলি? যদি তোর ওনাকে পছন্দই না ছিল, তবে আগে কেন বলিসনি? এত মানুষের সামনে ওনাকে এভাবে বেইজ্জত করার অধিকার তোকে কে দিয়েছে?"
ফুফু ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "আজ আরিমানের বাবা-মায়ের কাছে আমরা মুখ দেখাব কীভাবে? আমরা তোকে কতটা ভালো ভাবতাম ইমা, কিন্তু তুই যে এতটা অহংকারী আর নিষ্ঠুর, সেটা আজ বুঝলাম। আজ থেকে এই বাড়িতে তোর কোনো জায়গা নেই।"
ইমার মা, যিনি সবসময় ইমার পাশে থাকতেন, তিনিও এবার মেয়ের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। ওনার একমাত্র মেয়ের এই আচরণ ওনাকে সমাজের সামনে এমনভাবে ছোট করেছে যে ওনার হার্ট অ্যাটাক হওয়ার দশা হয়েছিল। ইমাকে এসবে নিজেকে ঘরের ভেতর বন্দি করে রাখল। বাড়ির প্রতিটা মানুষের চোখে ইমার জন্য তখন কেবল তীব্র ঘৃণা, অবহেলা আর তিরস্কার। কেউ ইমার সাথে একটা কথাও বলত না। খাবারটা পর্যন্ত ওর ঘরের দরজার সামনে এনে রেখে যাওয়া হতো, যেন ও কোনো এক কুখ্যাত অপরাধী।
ইমা ঘরের এক কোণে হাঁটুতে মুখ গুঁজে পড়ে রইল। ওর চোখ দিয়ে অশ্রু নয়, যেন রক্ত ঝরছিল। ও কাউকে বলতে পারছিল না যে ও নিজের ইচ্ছায় এই কাজ করেনি। ও বলতে পারছিল না যে ওর নিজের বোন তৃষা ওনাকে বিষ খাওয়ার হুমকি দিয়ে এই নরকে ঠেলে দিয়েছে। সব কিছু থেকে আলাদা হয়ে ও এক জ্যান্ত লাশে পরিণত হলো।
টানা এক সপ্তাহ পর, গভীর রাতে একদিন ইরফান ইমার ঘরে ঢুকল। ইমার এই কঙ্কালসার চেহারা, চোখের নিচের কালচে দাগ আর ঘরের ভেতরের গুমোট অন্ধকার দেখে ইরফানের বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। ও গিয়ে ইমার হাত দুটো শক্ত করে ধরল।ইরফান যেন বুঝেছিল ওর বোন এমন নয়। কোনো ভুল হচ্ছে।
"ইমা, অনেক হয়েছে। আমি তোকে ছোটবেলা থেকে চিনি। তুই কাউকে এভাবে আঘাত করতে পারিস না, বিশেষ করে আরিমানকে যাকে তুই নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসিস। তোকে কেউ বাধ্য করেছে, তাই না? আজ তোকে সবটা বলতে হবে। আমি তোর বড় ভাই, তোকে এই নরক থেকে বের করব। বল ইমা, কে তোকে বাধ্য করেছে?" ইরফান কড়া গলায় জেরা করল, ওর চোখে ছিল সত্য জানার তীব্র আকুলতা।
ইমা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। ও আর পারছিল না এই বোঝার ভার একা বইতে। ও ভাঙা গলায় বলতে শুরু করল, "ভাইয়া... আপু... তৃষা আপু..." ইমা একে একে সবটা খুলে বলল। জন্মদিনের আগের রাতে তৃষা কীভাবে ওর ঘরে বিষের শিশি নিয়ে ঢুকেছিল, কীভাবে নিজেকে শেষ করার হুমকি দিয়ে আরিমানকে অপমান করতে বাধ্য করেছিল সবটা বলে ইমা ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ল।
ইরফানের চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠল। ও দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "তৃষা! এত বড় শয়তান ও? নিজের বোনের জীবন এভাবে ধ্বংস করল? আমি আজই ওকে এই বাড়ি থেকে লাথি মেরে বের করব! আরিমানকে ফোন করে সব সত্য জানাব—"
"না ভাইয়া! আল্লাহর দোহাই লাগে না!" ইমা চট করে ইরফানের পা জড়িয়ে ধরল, "তুমি আমার মাথার কসম খাও ভাইয়া, তুমি কাউকে কিছু বলবে না। তুমি যদি আজ আপুকে বের করে দাও বা আরিমান স্যারকে সব বলো, আপু সত্যিই নিজেকে শেষ করে দেবে। ও একটা সাইকো, ভাইয়া! আমি আমার বোনের মৃত্যুর কারণ হতে পারব না। তুমি আমার কসম খাও, তুমি নিজের মুখ বন্ধ রাখবে!"
ইরফান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নিজের আদরের ছোট বোনটার এই অসহায় আত্মসমর্পণ আর কসমের বাঁধনে ও এক্কেবারে নিরুপায় হয়ে গেল। ও বুঝতে পারল, ইমার হাত-পা নিজের বোনই এক অদৃশ্য সুতো দিয়ে বেঁধে দিয়েছে। এক বুক হাহাকার আর রাগ নিয়ে ইরফান ইমার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, কিন্তু ও তৃষাকে মনে মনে তীব্র ঘৃণা করতে শুরু করল।
অন্যদিকে, সেই রাতে রেস্তোরাঁ থেকে বের হয়ে আরিমান সিকদার আর এক মুহূর্তও বাংলাদেশে থাকেনি। যে তীব্র আঘাত আর অপমান ও পেয়েছিল, তা ওর অহংকার এবং ভালোবাসাকে এক নিমেষে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল। ও নিজের জীবনের এই ভয়ংকর ঝড় সামলাতে দেশ ছেড়ে সোজা ইতালি পাড়ি জমাল। আরিমানরা বংশগতভাবেই অত্যন্ত ধনী আর প্রভাবশালী ছিল। ইতালিতে গিয়ে ও শিক্ষকতা পুরোপুরি ছেড়ে দিল। ওর ভেতরের সেই নরম মনের প্রফেসর আরিমান সিকদার সেই রাতেই মারা গিয়েছিল। ও এবার হাত দিল ওনাদের পারিবারিক বিজনেস সাম্রাজ্যে। মাত্র দুই বছরের মধ্যে আরিমান নিজের মেধা আর অমানুষিক পরিশ্রম দিয়ে বিজনেসকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেল। কিন্তু এই সফলতার পাশাপাশি ওর চরিত্রটা হয়ে গেল বরফশীতল আর নির্মম।
ইতালির আন্ডারওয়ার্ল্ড আর মাফিয়া চক্রের সাথে ওর বিজনেসের খাতিরে প্রায়ই মুখোমুখি হতে হতো। কিন্তু আরিমান এখন আর আগের সেই সাধারণ মানুষ নেই। ও এখন এক নিষ্ঠুর, কড়া লোক, যাকে তাকে খতম করতে ও দুবার ভাবে না। মাফিয়ারাও ওকে সমীহ করে চলে। ওর চোখের ইশারায় এখন কোটি কোটি টাকার খেলা হয়, আবার ওর এক ইশারায় মানুষের প্রাণ চলে যায়। ওর ভেতরের সব আবেগ, ভালোবাসা আর মায়া যেন ওই এক রাতে মিউজিকের সাথে মরে গিয়েছিল।
এই দুই বছরে আরিমান বাংলাদেশের পরিচিত প্রতিটি মানুষের সাথে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। এমনকি শাওন কিংবা ইরফানের ফোনও ও ধরত না। ও নিজেকে এমন এক দুর্ভেদ্য দুর্গে বন্দি করে নিয়েছে যেখানে ইমা নামের কোনো স্মৃতির প্রবেশাধিকার ছিল না।
আরিমানের এই চলে যাওয়ার পর তৃষার ভেতরের সেই 'তথাকথিত' ভালোবাসা আর আবেগও এক বছরের মাথায় কর্পূরের মতো শেষ হয়ে গেল। ও বুঝতে পারল আরিমান আর কোনোদিন ফিরবে না। তাই ও আর দেরি না করে নিজের পরিবারের পছন্দে এক ধনী ব্যবসায়ীকে বিয়ে করে সংসার সাজিয়ে নিল। যে তৃষা বিষ খাওয়ার নাটক করে ইমার জীবন ছারখার করেছিল, সে এক বছরের মাথায় দিব্যি হাসিমুখে অন্য একজনের ঘরণী হয়ে চলে গেল!
কিন্তু ইমা? ইমা এখনো পুড়ছিল সেই অপমানের আগুনে। এত এত মানুষের সামনে নিজের ভালোবাসাকে ওইভাবে অপমান করার গ্লানি ও কিছুতেই ভুলতে পারছিল না। ও রাতে ঘুমাতে পারত না, আরিমানের সেই রক্তাক্ত চোখের চাউনি ওকে তাড়া করে বেড়াত। ইমা বেশ কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। ফ্যানের সাথে ওড়না জড়াতে গিয়েও বারবার ভাইয়ের মুখটা মনে পড়ে ফিরে এসেছে, কখনো বা অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খেয়ে হসপিটালের আইসিইউতে ভর্তি হতে হয়েছে। বারবার ও মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে। হসপিটালে কতবার ও এডমিট হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই।
তৃষা অবশ্য এখনো মাঝেমধ্যে ইমাকে আড়ালে পেয়ে হুমকি দিত, "ইমা, তুই যেন কাউকে কিছু না বলিস। তুই যদি এখন সবাইকে সত্য বলিস, তবে আমার জামাইয়ের কাছে আমার মুখ পুড়বে, সবাই আমাকে ঘৃণা করবে। আমি কিন্তু বাঁচতে পারব না!"
দুই বছরের এই ভয়ংকর নরক গুলজার ও ঝড়ঝাপটার পর ইমা এখন এক শান্ত, নিথর জীবন কাটাচ্ছিল। ও পড়াশোনা শেষ করেছে ইরফানের জোরাজুরিতে। এই পুরো সময়ে হিয়ার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। হিয়া সবসময় ইমার পাশে ছায়ার মতো ছিল। শাওনও হিয়াকে ভালোবেসে দেশেই থেকে গেছে এবং ইমার এই করুণ অবস্থার জন্য ও মনে মনে তৃষাকে সন্দেহ করলেও ইরফানের নীরবতার কারণে কিছু বলতে পারত না।
দেখতে দেখতে কেটে গেল দীর্ঘ তিনটি বছর। তিন বছর পর ইমার পরিবার আবার সক্রিয় হলো। ইমার মা এবার কেঁদে-কেঁদে ইমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। ইমার বিয়ের জন্য এক পাত্র রেডি করা হয়েছে। পাত্র পেশায় একজন সাধারণ, ভালো মনের ডাক্তার।
ইমার মা ইমার হাত ধরে বললেন, "ইমা, অনেক তো হলো। তিনটে বছর তুই আমাদের জ্যান্ত মরা বানিয়ে রেখেছিস। এবার এই বিয়েটা তোকে করতেই হবে। এবার যদি তুই কোনো নাটক করিস বা বিয়ে ভাঙার চেষ্টা করিস, তবে তুই আমার মরা মুখ দেখবি!"
বেচারি ইমা! সব কুল থেকে এভাবে হুমকি পেতে পেতে নিজের জীবনের প্রতি ওর তীব্র বিতৃষ্ণা জন্মে গিয়েছিল। বোনের হুমকি, মায়ের মরা মুখ দেখার হুমকি সব মিলিয়ে ও নিজের ইচ্ছাশক্তি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছিল।
আজকাল প্রায়ই ইন্টারনেটে, গ্লোবাল বিজনেস নিউজগুলোতে আরিমানের ছবি দেখায়। ও এখন আন্তর্জাতিক মহলে বেশ পপুলার এক বিজনেস টাইকুন। ইমা মাঝরাতে লুকিয়ে লুকিয়ে ফোনের স্ক্রিনে ওনার সেই গম্ভীর, সুটেড-বুটেড ছবিগুলো দেখে। মানুষটার চোখে এখন এক আদিম হিংস্রতা আর তীব্র অহংকার। ইমা স্ক্রিনে হাত বুলিয়ে কাঁদে। ও তো জানে, এই মানুষটাকে ও এখনো বড্ড বেশি ভালোবাসে, নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।
ইরফান নিজের বোনের এই নীরব কষ্ট প্রতিদিন দেখে। ও জানে ইমার হাত-পা কীভাবে তৃষা বেঁধে রেখে গেছে। তবে ইরফান আর সহ্য করতে পারছিল না। ও ভালো করেই জানে, ইমা যেমন আরিমানকে ভুলতে পারেনি, আরিমানও ইমাকে ভোলেনি। ও শুধু অভিমানে আর অপমানে দূরে সরে আছে। কিন্তু নিজের প্রাণাধিক প্রিয় ‘হৃদয়হরণী’ অন্য কারো গলায় মালা দেবে, অন্য কারো বিছানা আলো করবে এটা সহ্য করার মতো ক্ষমতা আরিমান সিকদারের নেই। নিজের বন্ধুর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ইরফান খুব ভালো করেই জানে। তাই বিয়ের ঠিক তিন দিন আগে, ইরফান নিজের কসমের তোয়াক্কা না করে আরিমানের পার্সোনাল স্যাটেলাইট নাম্বারে একটা মাত্র মেসেজ পাঠিয়েছিল: "তোর হৃদয়হরণী চিরতরে অন্য কারো হতে চলেছে। আগামী পরশুপুত্র ওর বিয়ে।" তবে আরিমানের কোনো রেন্সপন্স না দেখে ইরফান থেমে যায়।
অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত বিয়ের দিনটি চলে এলো। ইমাদের বাড়ি সাজানো হয়েছে, তবে কোনো আড়ম্বর নেই। ইমাকে বিয়ের জন্য সাজানো হচ্ছে। ও নিজেই বলেছিল কোনো জমকালো সাজ ও সাজবে না। অত্যন্ত সিম্পল একটা হালকা গোলাপি রঙের কাতান শাড়ি পরানো হয়েছে ওকে। গলায় একটা ছোট চেইন আর কানে দুটো দুল। মেকআপের আড়ালে ওর ফ্যাকাশে মুখটা ঢাকা।
ইমা আয়নার সামনে বসে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল। ওর চোখের ভেতর কোনো স্পন্দন নেই, কোনো আলো নেই। ও যেন এক নিথর পুতুল। যে মেয়ের বিয়েতে পুরো বাড়ি আনন্দের জোয়ারে ভাসার কথা ছিল, আজ সেখানে এক অদ্ভুত নীরবতা।
কনে সেজে ইমা অত্যন্ত ধীর পায়ে, নিথরের মতো সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো। বসার ঘরে বরের বাড়ির লোকজন বসে আছে। বর সেজে সোফায় বসা। ইমাকে এনে বরের পাশে বসানো হলো। ইমার মনে হচ্ছিল ও যেন নিজের দেহের ভেতরেই নেই, শুধু একটা জড় বস্তু সোফায় বসে আছে। ওর মনটা তখন তিন বছর আগের সেই রুফটপ রেস্তোরাঁয় আটকে আছে।
কাজি সাহেব ওনার খাতা খুলে বসলেন। চারপাশটা একদম শান্ত। কাজি সাহেব চশমাটা নাকের ডগায় ঠিক করে গম্ভীর গলায় বললেন, "তাহলে বিয়ে শুরু করা যাক..."
তিনি ইমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আমাতুল ইমা চৌধুরী, আপনি কি দশ লক্ষ টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া..."
কাজি সাহেব ওনার বয়ান পড়ছেন, আর ইমা চোখ বন্ধ করে শেষবারের মতো আরিমানের মুখটা মনে করার চেষ্টা করছে। ওনার সেই খিটছিটে ধমক, "ইমু, পড়া পারোনি কেন?" ওনার সেই মিষ্টি চাউনি... ইমার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গাল বেয়ে শাড়ির আঁচলে গিয়ে পড়ল।
কাজি সাহেব বললেন, "বলুন মা, কবুল।"
আর ঠিক তখনই—