#তুমিই_আমার_হৃদয়হরণী পর্ব-১০
#লেখিকা_আশু
আরিমানের এই অচেনা রূপ দেখে ইমার ভেতরের ভয়টা এবার তীব্র আতঙ্কে রূপ নিল। ও বুঝতে পারল, ওর ভেতরের এই হিংস্রতা কোনো সাময়িক রাগ নয় তিন বছরের জমে থাকা এক ভয়ংকর প্রতিশোধের আগুন।
আরিমান যখন ওর গলার নিচে নিজের ঠোঁটের রুক্ষ চাপ বাড়িয়ে দিল, ইমা নিজের পুরো শক্তি দিয়ে ওনাকে পেছনের দিকে ঠেলার চেষ্টা করল। ও দুই হাত দিয়ে আরিমানের চওড়া কাঁধটা খামচে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, "ছাড়ুন... প্লিজ, ছাড়ুন আমাকে! আপনি এমন করতে পারেন না..."
কিন্তু আরিমান তখন মদের নেশা আর আক্রোশে এক অন্ধ মূর্তিতে পরিণত হয়েছে। ইমার এই বাধা দেওয়াটা ওর ভেতরের জেদকে যেন আরও হাজার গুণ বাড়িয়ে দিল। ওর কাছে ইমার এই ‘না’ বলাটা তিন বছর আগের সেই প্রত্যাখ্যানের যন্ত্রণাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল।
আরিমান এক ঝটকায় ইমার দুটো ছটফট করতে থাকা হাতকে নিজের এক হাতের মুঠোয় পুরে মাথার ওপর শক্ত করে চেপে ধরল। ইমা নিজের হাত দুটো এতটুকু নড়ানোর সুযোগও পেল না। ও বিছানায় একদম অসহায়ভাবে আটকে গেল। আরিমান ওর অন্য হাত দিয়ে ইমার মুখটা শক্ত করে চেপে ধরে ওর কান্নার আওয়াজটা ঘরের দেওয়ালে বন্দি করে দিল। ওর বরফশীতল, কড়া কণ্ঠস্বর ইমার কানের কাছে প্রতিধ্বনিত হলো, "বাধা দিচ্ছিস? তিন বছর আগে যখন সবার সামনে আমার ভালোবাসাটাকে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলেছিলি, তখন তো তোর হাত কাঁপেনি ইমা! আজ তুই আমার বিবাহিত স্ত্রী। তোর এই শরীরের ওপর, তোর এই নিশ্বাসের ওপর এখন শুধু আমার অধিকার। তুই চাইলেও আজ আমার থেকে নিজেকে লুকাতে পারবি না।"
ইমা মাথা নেড়ে অনবরত বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছিল, ওর চোখ দিয়ে জলের ধারা গাল বেয়ে ওর হাতের ওপর পড়ছিল। ও বুক ফুলিয়ে নিশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু আরিমানের ভারী শরীরের অবাধ্য চাপ ওর সব প্রতিরোধকে এক নিমেষে গুঁড়িয়ে দিচ্ছিল। আরিমান জোর করে ওনার ঠোঁট দুটো ইমার কান্নারত ঠোঁটের ওপর চেপে বসাল—সেটা কোনো ভালোবাসার চুম্বন ছিল না, ওটা ছিল একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করার এক তীব্র, কড়া শাসন।
ইমা প্রথমে তীব্র ছটফটানি আর বাধা দিলেও, আরিমানের সেই জোরপূর্বক, নেশালো স্পর্শের তীব্রতায় ওর শরীরের সমস্ত শক্তি ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে লাগল। ওর এই বন্য, অবাধ্য আকর্ষণের এক মোহে ইমা কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে পড়তে লাগল। ও বুঝতে পারল, এই পুরুষটার হাত থেকে আজ আর ওর মুক্তি নেই সেটা হোক ভালোবাসায়, কিংবা তীব্র ঘৃণায়।
ইতালির মিলান শহরের সেই অন্ধকার, গুমোট ঘরে তখন কেবল কড়া তামাক আর অ্যালকোহলের তীব্র গন্ধ মিশে এক দমবন্ধ করা পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। বিছানার চাদরটা দুমড়ে-মুচকে গেছে। ইমা বিছানার এক কোণে নিজের ছেঁড়া শাড়ির আঁচলটা বুকে জড়িয়ে ধরে গুটিসুটি মেরে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। ইমার সারা শরীরে তখন আরিমানের দেওয়া সেই জোরপূর্বক, বন্য স্পর্শের দাগগুলো দগদগে লাল হয়ে জ্বলছিল। ঠোঁটের কোণ থেকে রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে। আরিমান শার্টটা মাটিতে ফেলে দিয়ে, কেবল ট্রাউজার পরা অবস্থায় খাটের পাশে এসে দাঁড়াল। আরিমানের ফর্সা, চওড়া বুকে তখনো ইমার নখের আঁচড়ের দাগ স্পষ্ট।
আরিমান টেবিলে রাখা মদের বোতলটা তুলে নিয়ে সরাসরি গলাধকরণ করল। তারপর খালি বোতলটা এক ঝটকায় দেওয়ালে ছুঁড়ে মারল। কাচের বোতলটা ঝনঝন শব্দে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ল। সেই আওয়াজে ইমা ভয়ে আরও বেশি কুঁকড়ে গেল।
আরিমান ইমার দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো তৃপ্তি ছিল না, কোনো শান্তি ছিল না; বরং এক অদ্ভুত হাহাকার আর তীব্র আক্রোশ জ্বলজ্বল করছিল। আরিমান ধীর পায়ে ইমার দিকে এগিয়ে এলো। ইমা ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল, ভাবল আরিমান বুঝি আবার ওকে আঘাত করবে। কিন্তু আরিমান এবার ইমাকে স্পর্শ করল না। আরিমান ইমার থুতনি ধরে মুখটা ওপরে তুলতে বাধ্য করল।
"কী রে? কেঁদে কেঁদে তো গাল ভাসিয়ে দিলি? তিন বছর আগে যখন আমার বুকটা এভাবে ভেঙে চুরমার করে ইতালি পাঠিয়েছিলি, তখন কি একবারও ভেবেছিলি এই আরিমান সিকদার কতটা কেঁদেছিল?" আরিমান দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ওর গলার স্বর কাঁপছিল।
ইমা চোখ খুলে আরিমানের চোখের দিকে তাকাল। আর বলল,"আপনি আমাকে মারুন, কাটুন, যা ইচ্ছা করুন... কিন্তু প্লিজ ওভাবে বলবেন না। আমি আপনাকে কোনোদিন ঘেন্না করিনি। আমি আপনাকে আমার নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি," ইমা ভাঙা গলায়, অনবরত কেঁদে কেঁদে বলল।
আরিমান একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। ইমার হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে আরিমান বলল, "তোর ওই মুখের ভালোবাসার কথা এখন আমার কানে বিষের মতো লাগে। তুই আমার লিগ্যাল ওয়াইফ, তোকে আমি এই খাঁচায় বন্দি করে রাখব। প্রতিদিন তোকে মনে করিয়ে দেব, তুই কী অপরাধ করেছিস। এখন চুপচাপ ঘুমা!" এই কথা বলেই আরিমান আর এক মুহূর্তও ওই রুমে দাঁড়াল না। দরজাটা বাইরে থেকে লক করে দিয়ে গটগট করে বেরিয়ে গেল।
পরদিন সকাল।
ইতালির মিলান শহরের আকাশে তখন উজ্জ্বল রোদ, কিন্তু আরিমানের এই বিশাল ভিলার ভেতরে যেন সারাক্ষণ এক অন্ধকার মেঘ জমে থাকত। ইমা সকালে ঘুম থেকে উঠে ওয়াশরুমে গিয়ে নিজেকে আয়নায় দেখল। ওর গালটা ফুলে নীলচে হয়ে গেছে, সারা শরীরে ব্যথার তীব্র অনুভূতি। কিন্তু ইমার মনে এখন ভয়ের চেয়ে বেশি কাজ করছিল এক ধরনের জেদ। ও নিজের মনে প্রতিজ্ঞা করল, আরিমান যত বড় মাফিয়াই হোক না কেন, যত নিষ্ঠুরই হোক না কেন—ও নিজের ভালোবাসা দিয়ে আরিমানের ভেতরের সেই পুরনো প্রফেসরকে ফিরিয়ে আনবেই।
ইমা আলমারি খুলে একটা সাধারণ সুতি শাড়ি বের করে পরল। তারপর রুম থেকে বের হতে গিয়ে দেখল দরজাটা বাইরে থেকে আনলক করা। ও ধীর পায়ে নিচে নেমে এলো। পুরো বাড়িটা এক শ্মশানের মতো শান্ত। চার-পাঁচজন কড়া বডিগার্ড ওদিক-সেদিক অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। ইমাকে দেখে তারা কোনো বাধা দিল না, কারণ আরিমানের কড়া নির্দেশ ছিল—ইমা বাড়ির বাইরে যেতে পারবে না, কিন্তু বাড়ির ভেতরে ও স্বাধীন।
ইমা রান্নাঘরে গিয়ে দেখল একজন ইতালিয়ান শেফ সকালের নাস্তা তৈরি করছে। ইমা ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে ওকে বুঝিয়ে নিজে আরিমানের জন্য কফি বানাতে বসল। ও খুব ভালো করেই জানে, আরিমান কফিতে চিনি একদম পছন্দ করে না, কিন্তু কফিটা হতে হবে একদম কড়া ব্ল্যাক কফি। ইমা নিজের হাতে কফিটা বানিয়ে একটা ট্রের ওপর রাখল।
ঠিক তখনই লিভিং রুমে বুটের আওয়াজ শোনা গেল। আরিমান নিচে নেমে এসেছে। ওর পরনে এখন এক নিখুঁত আর্মানি স্যুট, চুলগুলো ব্যাক-কম্ব করা, চোখে সেই চশমা। ওকে দেখে মনেই হবে না যে গত রাতে উনি একটা মেয়ের ওপর এতটা বন্য আচরণ করেছিলেন। ওর পুরো অবয়বে এখন এক আন্তর্জাতিক বিজনেস টাইকুনের প্রফেশনাল ভাব।
ইমা কফির কাপটা নিয়ে আরিমানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আরিমান সোফায় বসে ল্যাপটপে কী যেন দেখছিল। ইমাকে সামনে দেখে ও এক পলক তাকাল। ইমার হাতের কফির কাপ আর ওর ফোলা গালটার দিকে তাকিয়ে আরিমানের চোখের এক কোণায় মুহূর্তের জন্য একটা অপরাধবোধ খেলে গেল, কিন্তু ও সেটাকে নিমেষেই চেপে ধরল।
"কফিটা নিন। চিনি ছাড়া, আপনার ঠিক যেমন পছন্দ," ইমা মৃদু স্বরে বলল।
আরিমান ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই ঠান্ডা গলায় বলল, "কে বলেছে তোকে আমার জন্য কফি বানাতে? এই বাড়িতে স্টাফ আছে। তোর কাজ শুধু ঘরে বসে নিজের পাপের শাস্তি ভোগ করা।"
"স্টাফরা তো আর আপনার মনের মতো করে বানাতে পারবে না। নিন না প্লিজ," ইমা একটু জেদ ধরে কাপটা ওর সামনে বাড়িয়ে দিল।
আরিমান এবার ল্যাপটপটা দড়াম করে বন্ধ করল। ও সোজা উঠে দাঁড়িয়ে ইমার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। আরিমানের লম্বা শরীরের সামনে ইমা এক্কেবারে ছোট দেখাচ্ছিল। আরিমান কফির কাপটা ইমার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে সোজা পাশের বেসিনে ঢেলে দিল। তারপর শূন্য কাপটা ডাইনিং টেবিলে আছাড় দিয়ে ভেঙে বলল, "তোর হাতের কোনো কিছু আমি ছোঁব না ইমা। তুই আমার সামনে আসবি না। তোকে দেখলে আমার শুধু তোর সেই বিষাক্ত কথাগুলো মনে পড়ে।"
ইমা ভাঙা কাচের টুকরোগুলোর দিকে তাকাল, তারপর আবার আরিমানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "আপনি যতবার ফেলে দেবেন, আমি ততবার বানাব। আপনি আমাকে তাড়িয়ে দিতে পারবেন না, কারণ আমি এখন আপনার বউ।"
ইমার এই চটপটে আর সাহসী জবাব শুনে আরিমান এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তিন বছর আগে ইমা ঠিক এভাবেই ওর কথার পিঠে কথা বলত। আরিমান নিজের রাগ সামলাতে ওখান থেকে হনহন করে বেরিয়ে মেইন গেটের দিকে চলে গেল। বডিগার্ডরা ওর পেছনে দৌড়াল। ইমা দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ওনার চলে যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল। ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মলিন হাসি ফুটে উঠল। ও বুঝল, আরিমান এখনো ওকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে পারেনি।
দেখতে দেখতে ইতালিতে ইমার জীবনের একটা মাস কেটে গেল। এই একটা মাসে আরিমান ইমার ওপর আর কোনো শারীরিক জোর জবরদস্তি করেনি, কিন্তু ওর মানসিক অবহেলা আর নীরবতা ইমাকে প্রতিদিন একটু একটু করে মারছিল। আরিমান গভীর রাতে বাড়ি ফিরত, কখনো কখনো ড্রাঙ্ক হয়ে আসত, আবার কখনো অন্য রুমে গিয়ে ঘুমাত। ইমার সাথে ওর কথা হতো শুধু তীব্র কটূক্তি আর অপমানের মাধ্যমে। কিন্তু ইমা হাল ছাড়েনি। ও প্রতিদিন আরিমানের কাপড় গুছিয়ে রাখত, ওর জন্য খাবার তৈরি করে টেবিলে সাজিয়ে রাখত, যদিও আরিমান সেগুলোর দিকে ফিরেও তাকাত না।
এরই মাঝে একদিন বিকেলে ভিলার মেইন গেট দিয়ে একটা বিলাসবহুল গাড়ি এসে ঢুকল। গাড়ি থেকে নামল এক চেনা অবয়ব—শাওন!
শাওন ইতালি এসেছে আরিমানের বিজনেসের একটা জরুরি কাজে। ও ভিলার ভেতরে ঢুকতেই ইমাকে দেখে থমকে গেল। ইমা তখন বাগানের গোলাপ গাছগুলোর পরিচর্যা করছিল। শাড়ি পরা এক বাঙালি মেয়েকে এই ইতালির রাজকীয় ভিলায় এভাবে দেখে শাওনের চোখ দুটো আনন্দে চকচক করে উঠল।
"ভাবি! আই মিন ইমা!" শাওন একছুটে ইমার সামনে এসে দাঁড়াল।
ইমা শাওনকে দেখে নিজের চোখের জল লুকিয়ে হাসিমুখে বলল, "শাওন ভাইয়া! আপনি? কবে এলেন?"
"এই তো জাস্ট ল্যান্ড করলাম। দোস্ত আমাকে এয়ারপোর্টে গাড়ি পাঠিয়েছিল। কিন্তু তুমি.. তুমি এখানে কেমন আছো ইমা? আরিমান তোমার সাথে কোনো খারাপ ব্যবহার করছে না তো? ও তো এখন এক্কেবারে কসাই হয়ে গেছে, ওর সামনে যেতে আমার নিজেরই ভয় লাগে!" শাওন এদিক-সেদিক তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল।
ইমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "ও বাইরে থেকে যতই কড়া হোক না কেন ভাইয়া, ভেতরে ও এখনো আমার সেই আগের স্যারই আছে। শুধু ওর ওপর এক বিশাল অভিমানের পাহাড় জমেছে।"
ঠিক তখনই আরিমান অফিস থেকে ফিরে এলো। শাওন আর ইমাকে একসাথে কথা বলতে দেখে আরিমানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। ও ওনার গম্ভীর গলায় বলল, "শাওন, তুই এখানে বিজনেসের কাজে এসেছিস, নাকি ফালতু আড্ডা দিতে? রুমে চল।"
শাওন আরিমানের ওমন রুক্ষ মেজাজ দেখে জিভ কেটে বলল, "আসছি দোস্ত, আসছি।" ও ইমার দিকে একটা সান্ত্বনার চাউনি দিয়ে আরিমানের পেছনে পেছনে ওনার স্টাডি রুমে চলে গেল।
স্টাডি রুমে ঢুকে আরিমান কোটটা খুলে চেয়ারে বসল। শাওন সোফায় বসে সিরিয়াস মুখে বলল, "আরিমান, তুই ইমার সাথে এটা কী করছিস? ও তোকে কতটা ভালোবাসে তুই দেখিস না? তিন বছর আগের একটা ভুলের জন্য তুই একটা মেয়েকে এভাবে বন্দি করে রাখবি?"
আরিমান ওর চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে লাল চোখ দুটো নিয়ে শাওনের দিকে তাকাল, "ভুল? ওটা ভুল ছিল না শাওন, ওটা ছিল এক পরিকল্পিত অপমান। ও আমার ভালোবাসাকে সবার সামনে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিল।"
"তোর কি একবারও মনে হয় না যে এর পেছনে অন্য কোনো কাহিনী থাকতে পারে?" শাওন জের করল, "ইরফান কিন্তু বাংলাদেশে এই তিন বছর এক নরক যন্ত্রণার মধ্যে কাটিয়েছে। ওই তোকে মেসেজটা পাঠিয়েছিল। তুই কি জানিস, ইমা এই তিন বছরে কতবার সুইসাইড করার চেষ্টা করেছে? ও কতবার হসপিটালে ভর্তি হয়েছে?"
শাওনের এই কথাটা শুনে আরিমান যেন আকাশ থেকে পড়ল। ওর হাতের কলমটা হাত থেকে ফসকে টেবিলের ওপর পড়ে গেল। ওর চওড়া বুকটা তীব্র এক আশঙ্কায় কাঁপতে লাগল। ওর খিটখিটে গলাটা আরও ভারী হয়ে গেল, "কী বললি? সুইসাইড? ইমা?"
"হ্যাঁ!" শাওন সোজা হয়ে বসল, "আমি আর হিয়া ইমাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। ও তোকে ছাড়া আর কাউকেই ভাবেনি। তুই চলে যাওয়ার পর তৃষা এক বছরের মধ্যে অন্য একজনকে বিয়ে করে সুখে সংসার করছে, অথচ ইমা আজ জ্যান্ত লাশ হয়ে আছে। আমার কেন যেন মনে হয়, তৃষাই....
আরিমান এক ঝটকায় হাত তুলে শাওনকে থামিয়ে দিয়ে অত্যন্ত কড়া গলায় বলল, "থাম শাওন! অনেক হয়েছে। এমন কী বড় ব্যাপার ঘটে যাবে যার জন্য ও আমাকে ওভাবে রিজেক্ট করবে? এটা নিতান্তই ওর একটা নোংরা প্ল্যান ছিল। তিন বছর আগে যখন আমার হৃদয়টা ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছিল, তখন ও কোথায় ছিল? এখন আমার ক্ষমতা আর এই সাম্রাজ্য দেখে ও বুঝছে ভালোবাসা কী জিনিস! তাই এখন ওইসব মায়াকান্নার নাটক করছে।"
বলেই আরিমান পকেট থেকে লাইটার বের করে একটা কড়া তামাকের সিগারেট ধরাল। ওনার চশমার আড়ালে চোখ দুটো তখনো অপমানে আর অভিমানে ধকধক করে জ্বলছিল। ধোঁয়ার কুণ্ডলী বাতাসে উড়িয়ে উনি জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন, যেন নিজের ভেতরের ছটফটানিটা শাওনের সামনে আড়াল করতে চাইছেন।
পরদিন দুপুর থেকেই মিলানের আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। ইতালির এই কড়া ঠাণ্ডা বৃষ্টিতে পুরো ভিলার পরিবেশ আরও থমথমে হয়ে উঠল।
বিকেলের দিকে ইমা বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করতেই
মাথাটা ঘুরে উঠল। ওর সারা শরীর তখন আগুনে পুড়ছে। গত এক মাসের মানসিক অত্যাচার, অবহেলা আর কাল রাতের ওই বৃষ্টির ছাঁট লেগে ওর শরীরে ১০৪ ডিগ্রি জ্বর চলে এসেছে। ও কাঁপতে কাঁপতে কোনোমতে কম্বলটা গায়ে জড়িয়ে শুয়ে রইল। মুখটা জ্বরে এক্কেবারে লাল হয়ে গেছে, ঠোঁট দুটো শুকিয়ে কাঠ।
রাত ১০টায় আরিমান যখন বাড়ি ফিরল, তখন পুরো বাড়ি অন্ধকার। প্রতিদিন ইমা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকত বা টেবিলে খাবার সাজিয়ে রাখত, কিন্তু আজ নিচে কেউ নেই। আরিমানের খিটখিটে মেজাজটা আরও চড়ে গেল। ও গটগট করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে ইমার রুমের দরজাটা এক ধাক্কায় খুলল।