ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমিই আমার হৃদয়হরণী

২০তম পর্ব

লেখক: আশু

#তুমিই_আমার_হৃদয়হরণী পর্ব-১৯

#লেখিকা_আশু

মিষ্টি রোদটা ব্যালকনির পাতলা পর্দা চিরে সোজা এসে পড়েছিল বিশাল কিং সাইজ বেডের ওপর। ভোরের সেই স্নিগ্ধ আলোর স্পর্শে ইমার চোখের পাতা দুটো ধীরে ধীরে কেঁপে উঠল।

ঘুম ভাঙতেই ও অনুভব করল এক অসম্ভব মিষ্টি ও ওম ভরা উষ্ণতা। ও আরিমানের বিশাল চওড়া বুকের ওপর মাথা রেখে সম্পূর্ণ লেপ্টে শুয়ে আছে। আরিমানের একটা শক্ত হাত ইমার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজেদের একদম কাছাকাছি ধরে রেখেছে, আর অন্য হাতটা ইমার মাথার নিচে বালিশের মতো পাতা।

ইমা একটু মাথা তুলে ওপরে তাকাল। সচরাচর যে আরিমানকে পুরো পৃথিবী এক কড়া, রাশভারী আর ভয়ংকর ব্যক্তিত্ব হিসেবে চেনে—ঘুমন্ত অবস্থায় সেই মানুষটার মুখটা কী ভীষণ নিষ্পাপ আর শান্ত দেখাচ্ছে! কপালে পড়ে থাকা দুটো এলোমেলো চুল, ঘন চোখের পাপড়ি আর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা এক হালকা তৃপ্তির হাসি।

গত রাতেই আরিমান ইমাকে নিয়ে নিজের বাড়ি ফিরে এসেছিল তারপর প্রতিটা রোমাঞ্চকর ও ব্যাকুল মুহূর্ত এক নিমেষে ইমার স্মৃতিতে ভেসে উঠল। চার বছরের বিরহ আর যন্ত্রণার পর কাল রাতে আরিমান যেভাবে ওকে নিজের ভালোবাসায় ভরিয়ে দিয়েছে, তাতে ইমার ভেতরের সমস্ত অনুশোচনা আর ভয় চিরতরে উধাও হয়ে গেছে।

ইমা আলতো করে নিজের হাতের আঙুলগুলো আরিমানের কপালে পড়ে থাকা চুলগুলোর মধ্যে চালিয়ে দিল। তারপর খুব সাবধানে, যাতে ওনার ঘুম না ভাঙে, আরিমানের গালে নিজের ঠোঁট দুটো ছুঁইয়ে দিল।

"আর চুরি করে চুমু খেতে হবে না, প্রকাশ্যে খেলেও আমি কিছু মনে করব না," হঠাৎই একটা গভীর, কণ্ঠ বেজে উঠল।

ইমা চমকে উঠে হাত সরাতে চাইল, কিন্তু ততক্ষণে আরিমান নিজের চোখ না খুলেই ইমার কোমর ধরে ওকে আরও শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরেছে! ইমা লজ্জায় লাল হয়ে আরিমানের বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল।

"আপ... আপনি জেগে ছিলেন?" ইমা তোতলাতে তোতলাতে বলল।

আরিমান এবার আস্তে আস্তে চোখ খুলল। ওর সেই গাঢ় কালো চোখে প্রগাঢ় ভালোবাসা আর দুষ্টুমির এক অদ্ভুত মিশ্রণ। ও ইমার কপালে নিজের ঠোঁট চেপে দীর্ঘ এক চুমু খেল।

"আমার বুকের ওপর আমার হৃদয়হরণী শুয়ে থাকবে, আর আমি ঘুমে ঢুলে পড়ব? অতটা কপাল খারাপ আমার নয় ইমু," আরিমান মৃদু হেসে বলল।

"ধুর! ছাড়ুন তো, সকাল হয়ে গেছে। নিচে সবাই কী ভাববে!" ইমা আরিমানের বুক থেকে ওঠার চেষ্টা করল।

আরিমান ইমার চিবুক ধরে নিজের দিকে মুখটা ফেরাল। ওর চোখ দুটো এবার একটু গম্ভীর হয়ে এলো। "নিচে কে কী ভাবল, তাতে আরিমান সিকদারের কিছু যায় আসে না। তবে হ্যাঁ, আজ থেকে তোর আর আমার জীবনে অন্য কোনো মানুষের হস্তক্ষেপ থাকবে না। কাল রাতে তোকে একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম..."

"কী কথা?" ইমা প্রশ্ন করল।

"আজ বিকেলে আমরা ইতালি যাচ্ছি," আরিমান শান্ত গলায় বলল।

ইমা চোখ দুটো বড় বড় করে ফেলল, "ইতালি? হঠাৎ?"

আরিমান ইমার গালটা আলতো করে চেপে ধরে বলল, "হ্যাঁ। গত চার বছর ধরে যে শহরটা আমাকে তোর স্মৃতির যন্ত্রণায় দগ্ধ করেছে, সেই মিলান শহরটাকে আজ আমি তোর পদস্পর্শে নতুন করে রাঙাতে চাই। তাছাড়া ঢাকা শহরের এই বিষাক্ত পরিবেশ আর তৃষার পাপের ছায়া থেকে তোকে কিছুদিন দূরে রাখা দরকার। ওখানে আমাদের নিজস্ব ভিলা আছে, পুরো সময়টা শুধুই তোর আর আমার।"

ইমা আরিমানের চোখের দিকে তাকাল। ও বুঝতে পারল আরিমান সত্যি সত্যিই চাইছিল না যে ঢাকার কোনো বিষাক্ত পরিবেশ ইমার মন খারাপের কারণ হোক। ইমা এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে আরিমানের বুকে মাথা রেখে বলল, "আপনি যেখানে নিয়ে যাবেন, আমি সেখানেই যাব।"

সকাল ১০:০০ টা, সিকদার ভিলার ডাইনিং টেবিল।

পরিবেশটা কালকের ঘটনার পর আজ অনেক বেশি শান্ত ও নির্মল। তবে ডাইনিং টেবিলে তৃষার খালি চেয়ারটা মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে একটা বিষাক্ত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে।

ইমা একটা হালকা বেগুনি রঙের সুতির শাড়ি পরে ডাইনিং টেবিলে নাস্তা সাজাচ্ছিল। শাড়িটি একদম সুন্দর করে পেঁচিয়ে পরা, পেট ও পিঠ সম্পূর্ণ ঢাকা। চুলে সাধারণ একটা ক্লিপ দেওয়া। ওকে দেখে মনেই হচ্ছিল না কাল রাতের সেই সব ঝড়-ঝাপটা ওর ওপর দিয়ে গেছে।

শাওন টেবিলে এসে বসতেই ইমার দিকে তাকিয়ে একটা দুষ্টু হাসি দিল। "আরে ভাবি! আজ তো তোমাকে একদম পরীর মতো লাগছে! তা আমাদের বর মশাই কোথায়? উনি কি এখনো রোমান্সের ঘোড়ায় চড়ে ইতালির স্বপ্নে বিভোর নাকি?"

ইমা লজ্জায় লাল হয়ে গরম কফির মগটা শাওনের সামনে রেখে বলল, "শাওন ভাইয়া, তুমি নাস্তা না করে আবার ফাজিলমি শুরু করেছ? কফিটা ঠাণ্ডা হওয়ার আগে খাও!"

এমন সময় ওপর থেকে নেমে এলো আরিমান। পরনে শার্ট আর ফরমাল ট্রাউজার। চুলগুলো নিখুঁতভাবে আঁচড়ানো। আরিমান এসে সোজা ইমার পাশে বসল।

ইরফানও পাশে এসে বসেছিল। ইরফান আরিমানের দিকে তাকিয়ে বলল, "ফ্লাইট কটায়?"

"বিকেল ৪টায়। প্রাইভেট জেট রেডি রাখতে বলেছি মার্কোকে," আরিমান কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল।

আরিমানের বাবা-মাও টেবিলে এসে বসলেন। মা ইমার মাথায় হাত রেখে বললেন, "মা ইমা, ইতালি যাচ্ছিস খুব ভালো কথা। চারটে বছর তোদের অনেক কষ্টে কেটেছে। এখন দুজনে মিলে একটু ঘুরে আয়, মনটা হালকা হবে। তবে বেশিদিন যেন আবার ওখানে থেকে যাস না!"

ইমা হেসে বলল, "না কাকিমা, আমরা দ্রুতই ফিরে আসব।"

আরিমান ইমার দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় শুধরে দিল, "কাকিমা নয় ইমু, মা বলো।"

ইমা একটু থতমত খেয়ে আরিমানের দিকে তাকাল, তারপর লজ্জা পেয়ে কাকিমার দিকে তাকিয়ে বলল, "মা..."

আরিমানের মা খুশিতে ইমার কপালে চুমু খেলেন। শাওন পাশে বসে নাটकीय ভঙ্গিতে হাততালি দিয়ে উঠল, "ওয়াও! আজ তো অফিশিয়ালি শাশুড়ি-বৌমার মিলন হয়ে গেল! ভাই, ইতালিতে গিয়ে অন্তত আমাকে দু-একটা দামি ব্র্যান্ডের ঘড়ি পাঠাতে ভুলো না কিন্তু!"

সবাই হেসে উঠল। ঘরের থমথমে ভাবটা নিমেষেই উধাও হয়ে গেল।

দুপুর ২:৩০ টা,

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।

সিকদার পরিবারের বিশেষ লাউঞ্জে বসে ছিল আরিমান ও ইমা। বাইরে ভিআইপি ট্যাক্সিগুলোর সারি। সিকিউরিটি গার্ডরা চারপাশ ঘিরে রেখেছিল।

ইমা হাত ব্যাগটা শক্ত করে ধরে বসে ছিল। ও মাঝে মাঝে ফোনের দিকে তাকাচ্ছিল। ইরফান ইমার পাশে এসে বসল।

"তৃষার কথা ভাবছিস ইমু?" ইরফান শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল।

ইমা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "ও আমার বোন ইরফান ভাইয়া। ও ভুল করেছে, কিন্তু ও যেভাবে সবার সামনে ছোট হয়ে গৃহহীন হলো... মনটা কেমন যেন করে।"

ইরফান ইমার কাঁধে হাত রেখে বোঝানোর সুরে বলল, "তোর ওই অতিরিক্ত দয়াটাই তোকে চার বছর ধরে কাঁদিয়েছে ইমু। তৃষা যেটা করেছে, সেটা শুধু ভুল ছিল না, ওটা ছিল অপরাধ আর হিংসার চরম সীমারেখা। কাল যদি সত্যি সত্যি ওই অডিওটা প্রকাশ না হতো, তবে আজকেও ও তোকে তিল তিল করে শেষ করত। ওর শাস্তি পাওয়াটা খুব দরকার ছিল যাতে ও মানুষ হতে শেখে। তুই এখন ওসব ভুলে যা। তোর সামনে এখন একটা সম্পূর্ণ নতুন জীবন।"

আরিমান দূর থেকে ওদের কথা শুনছিল। ও ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ইমার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। "ইরফান ঠিকই বলেছে ইমু। অতীতকে তুই যত আঁকড়ে ধরবি, বর্তমান তত তোর হাত থেকে পিছলে যাবে। চল, ফ্লাইটের সময় হয়ে গেছে।"

তারা পরিবারের সবাইকে বিদায় জানিয়ে প্রাইভেট জেটের দিকে এগিয়ে গেল।

বিমানের সুপরিসর কেবিনে ঢুকতেই ইমা মুগ্ধ হয়ে গেল। পুরো প্রাইভেট জেটটি যেন এক রাজকীয় হোটেল রুমের মতো সাজানো। লেদারের নরম সোফা, বিশাল টিভি স্ক্রিন আর পেছনে একটা ছোট মাস্টার বেডরুম।

বিমান যখন ঢাকার মাটি ছেড়ে নীল আকাশের বুকে ডানা মেলল, তখন ইমা জানালার কাচে মুখ রেখে নিচের চেনা শহরটাকে ছোট হতে দেখছিল।

আরিমান ইমার পাশে এসে বসল। ও ইমার কাঁধে নিজের হাত রেখে ওকে নিজের বুকের দিকে টেনে নিল। "ঢাকা ছেড়ে মন খারাপ লাগছে?"

ইমা আরিমানের বুকে মাথা রেখে আলতো করে চোখ বুজল। "না। আপনি সাথে থাকলে আমার পুরো পৃথিবীটাই সুন্দর।"

আরিমান ইমার চিবুক উঁচু করে ওর ঠোঁটে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল, "এই মিষ্টি মিষ্টি কথাগুলো কি শুধু বিমানেই বলবে, নাকি ইতালিতে গিয়েও বজায় থাকবে?"

ইমা আরিমানের পেটে মৃদু এক চিমটি কেটে বলল, "আপনি বড্ড দুষ্টু হয়ে গেছেন আরিমান!"

রাত ১২:৩০ টা (ইতালিয়ান সময়), মিলান, ইতালি।

মিলান মালপেনসা বিমানবন্দরে প্রাইভেট জেট ল্যান্ড করার পরপরই ইতালির কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস অভ্যর্থনা জানাল।

বিমানবন্দরের ভিআইপি এক্সিট গেটের বাইরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিল পাঁচটা চকচকে কালো মার্সিডিজ কার। আর সামনে দাঁড়িয়ে ছিল আরিমানের ইতালিয়ান ডানহাত—মার্কো, যার পরনে ছিল কুচকুচে কালো স্যুট আর চোখে গম্ভীর ভাব।

আরিমান ইমাকে একটা ভারী ও গরম কাশ্মিরী ওভারকোট পরিয়ে দিয়ে নিজে একটা লং কোট জড়িয়ে বাইরে বের হলো।

মার্কো আরিমানকে দেখেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাথা নোয়ালো, "ওয়েলকাম ব্যাক টু মিলান, স্যার!"

আরিমান ইমার হাত শক্ত করে ধরে ইতালিয়ান ভাষায় বলল, "গ্রাসিয়ে, মার্কো। ভিলা রেডি?"

"ইয়েস, স্যার। সব কিছু আপনার নির্দেশমতো ব্যবস্থা করা হয়েছে। লেক কোমোর ভিলা একদম প্রস্তুত। সিকিউরিটি টিম পুরো এলাকায় মোতায়েন আছে।"

ইমা আরিমানের পাশে হেঁটে যেতে যেতে খেয়াল করল, বিমানবন্দরের স্টাফ থেকে শুরু করে সিকিউরিটি গার্ড—সবাই আরিমানকে এক পরম শ্রদ্ধা আর ভয়ের চোখে দেখছে। আরিমান সিকদার ঢাকা শহরের সাধারণ একজন বিজনেসম্যান হতে পারে, কিন্তু এই ইতালির মাটিতে পা রাখতেই ওর চারপাশের পরিবেশ আর aura সম্পূর্ণ বদলে যায়। ও এখানে একচ্ছত্র অধিপতি—মাফিয়া !

ইমা আরিমানের হাতের বাঁধন আরও একটু শক্ত করল। আরিমান ইমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলল, "ভয় পাচ্ছিস?"

ইমা মাথা নেড়ে বলল, "না। আপনি তো আছেন।"

তারা গাড়িতে গিয়ে বসল। গাড়ি চলতে শুরু করল মিলানের রাজপথ চিরে লেক কোমোর প্রাইভেট ভিলায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে।

রাতের মিলান শহরটা আলোয় ঝলমল করছিল। কাচের জানালার বাইরে ঐতিহাসিক সব দালানকোঠা আর ইতালিয়ান স্থাপত্য শৈলী দেখে ইমা মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিল।

প্রায় এক ঘণ্টার ড্রাইভিংয়ের পর গাড়িগুলো লেক কোমোর এক নির্জন কিন্তু অসম্ভব সুন্দর পাহাড়ি এলাকায় এসে থামল। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে আর বিশাল লেকের পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিল আরিমানের নিজস্ব ইতালিয়ান স্টাইলের রাজকীয় ভিলা—'ভিলা ডি সিকদার'।

গাড়ি থেকে নামতেই লেকের ঠাণ্ডা হাওয়া আর পানির মৃদু ছপছপ শব্দ কানে এলো। ভিলার চারপাশটা বিশাল সব লাইট দিয়ে সাজানো, আর চারপাশে সশস্ত্র সিকিউরিটি প্রোটোকল।

আরিমান ইমার হাত ধরে ভিলার মূল ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। ভিলার ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই ইমা থমকে গেল! ড্রয়িংরুমের বিশাল দেয়ালজুড়ে টাঙানো রয়েছে একটি বিশাল ফ্রেমে বাঁধানো ছবি। ছবিটা চার বছর আগের! ইমা যখন জলপাই রঙা এক শাড়ী পড়ে হেসে দাঁড়িয়ে ছিল, আর আরিমান ওর দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে ছিল।

ইমা চোখ দুটো বড় বড় করে আরিমানের দিকে তাকাল। "এই ছবিটা...?"

আরিমান ধীর পায়ে ইমার পেছনে এসে দাঁড়াল। ও ইমার কোমর জড়িয়ে ধরে খুব নরম গলায় বলল, "গত চার বছর ধরে আমি যখনই মিলানের এই একা ভিলাটায় ফিরতাম, তখন এই ছবিটার দিকে তাকিয়ে তোকে ভালোবাসতাম, আবার তোকে না পাওয়ার যন্ত্রণায় দগ্ধ হতাম। এই পুরো ভিলাটা তোকে ছাড়া একটা কবরস্থানের মতো ছিল ইমু। আজ তুই এসেছিস, আজ এই ভিলা প্রাণ পেল।"

ইমার চোখে জল এসে গেল। ও বুঝতে পারল চার বছর ধরে এই ইতালির মাটিতে আরিমান কতটা একা আর নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়েছে। ও পেছনে ফিরে আরিমানের গলা জড়িয়ে ধরল।

"আমি এসে গেছি আরিমান... আমি আর কখনো আপনাকে একা রেখে কোথাও যাব না।"

আরিমান ইমাকে এক টানে শূন্যে কোলে তুলে নিল। "তাহলে চল, আজ রাতের জন্য এই ভিলার প্রধান রানীকে ওনার নিজস্ব ঘরে নিয়ে যাই।"

ভিলার দ্বিতীয় তলায় আরিমানের মাস্টার বেডরুম।

ঘরের ফ্রেঞ্চ উইন্ডো দিয়ে বাইরে বিশাল লেক কোমো আর চাঁদের রূপালী আলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। ঘরের ভেতরে একটা বিশাল ফায়ারপ্লেসে কাঠ জ্বলছিল, যা ঘরটাকে এক মায়াবী উষ্ণতায় ভরে রাখছিল।

আরিমান ইমাকে খুব সাবধানে কিং সাইজ বেডের ওপর নামিয়ে দিল। ইমার গায়ের ভারী ওভারকোটটা খুলে একপাশে রেখে দিল।

ইমা শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে লজ্জিত চোখে আরিমানের দিকে তাকাল। ফায়ারপ্লেসের লালচে আলো ইমার ফর্সা গালে প্রতিফলিত হয়ে এক স্বর্গীয় সৌন্দর্যের সৃষ্টি করছিল।

আরিমান নিজের কোট আর টাইটা খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিল। তারপর ও ধীর পায়ে বিছানার ওপর উঠে ইমার দিকে এগিয়ে এলো।

আরিমান ইমার থুতনি ধরে ওনার মুখটা ওপরের দিকে তুলল। ওর চোখে এখন সীমাহীন কামনা আর অগাধ ভালোবাসার প্রলয়ঙ্করী নেশা।

"আজকের রাতটা শুধুই আমাদের ইমু... মিলানের এই নির্জন রাতে তোর আর আমার ভালোবাসার কোনো বাধা নেই," আরিমানের কণ্ঠস্বর গভীর ও কম্পন সৃষ্টি করল।

পরদিন,

লেক কোমোর ভিলায় সকালটা এসেছিল এক স্বর্গীয় আনন্দ বার্তা নিয়ে। ইতালির কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস আর লেকের নীল পানির ওপর যখন ভোরের সোনালী রোদ এসে পড়েছিল, ঠিক তখনই সিকদার ভিলার তিনতলার মাস্টার বেডরুমে আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিল।

সকালে হুট করেই ইমার ভীষণ মাথা ঘোরা আর বমি ভাব শুরু হয়,কয়দিন ধরেই খারাপ লাগা ইমা পাত্তা দেয়নি । ইতালিয়ান ফ্যামিলি ডক্টর এসে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর যখন মিষ্টি হেসে নিশ্চিত করেছিলেন যে ইমা দুই মাসের গর্ভবতী, তখন আরিমান সিকদারের মতো কঠিন, শক্ত হৃদয়ের মানুষটার চোখেও খুশির জল চলে এসেছিল!

চার বছরের বিচ্ছেদ আর কষ্টের পর ইমা আজ তাকে বাবা বানাতে চলেছে! আরিমান আনন্দে ইমাকে জড়িয়ে ধরে ওনার কপালে, গালে চুমুর বৃষ্টি ছড়িয়ে দিয়েছিল। ইমাও আরিমানের বুকে মুখ লুকিয়ে নিজের পেটের ওপর হাত রেখে এক পরম তৃপ্তির হাসি হেসেছিল। পুরো ভিলায় তখন এক উৎসবের আমেজ।

কিন্তু সেই আনন্দের আয়ু ছিল বড্ড স্বল্প। নিয়তি যেন আড়ালে বসে অন্য এক বিষাক্ত চিত্রনাট্য লিখছিল।

ভিলা ডি সিকদারের প্রধান স্টাডি রুমে বসে ছিল আরিমান। ওর হাতে ছিল এক কাপ গাঢ় ব্ল্যাক কফি। কিন্তু ওর চোখের দৃষ্টি ছিল বরফশীতল ও হিংস্র।

সামনে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে ছিল মার্কো। মার্কোর কপালে উদ্বেগের বিন্দু বিন্দু ঘাম।

"স্যার, খবর শতভাগ নিশ্চিত," মার্কো নিচু কিন্তু কাঁপা গলায় বলল। "লুসিয়ানো ডি ক্যালোব্রিয়া মিলানে পা রেখেছে। ও শুধু একা আসেনি, দক্ষিণ ইতালির সবচেয়ে বিপজ্জনক 'ব্ল্যাক ভাইপার' মার্সেনারি গ্যাংকে সাথে নিয়ে এসেছে। ও খবর পেয়েছে আপনি ম্যামকে নিয়ে লেক কোমোর ভিলায় অবস্থান করছেন।"

আরিমানের ঠোঁটের কোণে এক রক্তপিপাসু পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল। ও কফির কাপটা ধীরে ধীরে কাঠের টেবিলে রাখল।

লুসিয়ানো ডি ক্যালোব্রিয়া! ইতালির আনন্ডারওয়ার্ল্ডের এক নির্মম ও ধূর্ত মাফিয়া। প্রায় দুই বছর আগে মিলানের ড্রাগ ও অস্ত্র চোরাচালানের একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে আরিমানের সাথে লুসিয়ানোর এক ভয়াবহ গ্যাংওয়ার হয়। সেই যুদ্ধে আরিমান নিজ হাতে লুসিয়ানোর একচ্ছত্র সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিয়েছিল এবং লুসিয়ানোর এক চোখে গুলি করে ওকে সারাজীবনের জন্য একচোখা সাথে পঙ্গু বানিয়ে দিয়ে ইতালি ছেড়ে পালাতে বাধ্য করেছিল।

গত দুই বছর ধরে ওই কাণাকাটা লুসিয়ানো সুযোগ খুঁজছিল আরিমান সিকদারকে শেষ করে নিজের প্রতিশোধ নেওয়ার। আর আজ, আরিমানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা—ইমা যখন ওর সাথে ইতালিতে উপস্থিত, ঠিক তখনই লুসিয়ানো সুযোগ বুঝে ঝাঁপিয়ে পড়তে চলেছে!

"লুসিয়ানো ভেবেছে আমি আমার বউকে নিয়ে রোমান্সে ব্যস্ত আর আমার গার্ড অফ করা," আরিমান পকেট থেকে বের করল একটা কাস্টমাইজড ব্ল্যাক মেটালিক গান। লোড করার পর পিস্তলের যান্ত্রিক শব্দ ড্রয়িংরুমে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করল। "ও ভুলে গেছে, আরিমান সিকদার শান্ত থাকলে সিংহ, আর ক্ষেপে গেলে সাক্ষাৎ কালান্তক যম!"

"স্যার! ওরা যেকোনো মুহূর্তে আক্রমণ করতে পারে। ম্যামকে কি এখনই কোনো সেইফ হাউসে নিয়ে যাব?" মার্কো উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল।

"না," আরিমান কড়া গলায় বলল। "ইমাকে এই ভিলাই আগলে রাখবে। ভিলাই এখন আমাদের ফোর্ট্রেস হবে। আজ রাতে মিলানের মাটিতে লুসিয়ানোর অধ্যায়ের চূড়ান্ত ইতি টানব আমি!"

বিকেল ৫:৩০ টা।

ইমা ওপরের রুম থেকে একটা হালকা ঘিয়ে রঙের নরম সুতির সালোয়ার স্যুট পরে নিচে নেমে এলো। পোশাকটি একদম শালীন, যার ওপরে ও ওড়নাটা বুকে সুন্দরভাবে ছড়িয়ে জড়িয়ে রেখেছিল।

ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই ইমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল!

পুরো ড্রয়িংরুমের রূপ এক মুহূর্তে বদলে গেছে। ভিলায় সাধারণত যে ১০-১২ জন গার্ড থাকত, আজ সেখানে প্রায় ৩০-৪০ জন ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সিকিউরিটি গার্ড থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে আছে। মার্কো সবাইকে একের পর এক পজিশন বোঝাচ্ছে।

ইমা ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই আরিমান এসে পেছন থেকে ওনার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।

"আ... আরিমান! এসব কী?" ইমা কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করল। "এরা সবাই এত বন্দুক নিয়ে এখানে কী করছে? কিছু হয়েছে কি?"

আরিমান ইমার হাত ধরে ওকে সোজা নিজের প্রাইভেট এলিভেটরে করে ওপরের তিনতলার সিক্রেট প্যানিক রুমে নিয়ে গেল। এই রুমটা বুলেটপ্রুফ গ্লাস, ছয় ইঞ্চি পুরু স্টিলের দরজা আর লেটেস্ট মনিটরিং সিস্টেমে তৈরি।

আরিমান ইমাকে রুমের ভেতর বসিয়ে দিয়ে ওর দুগালে নিজের শক্ত দুই হাত রাখল। ওর চোখের কড়াকড়ি ভাবটা এক মুহূর্তে গলে গিয়ে চরম ভালোবাসায় পরিণত হলো।

"ইমু, একদম মন দিয়ে শুনবি," আরিমান গম্ভীর কিন্তু নরম গলায় বলল। "আজ রাতে নিচে একটু লঙ্কা কাণ্ড হতে চলেছে। আমার কিছু পুরনো শত্রু আজ এই ভিলায় ছাই হতে আসছে।"

ইমার গায়ের রক্ত জল হয়ে গেল। ও আরিমানের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরে কেঁদে উঠল, "শত্রু? আরিমান প্লিজ! আমরা এখনই ঢাকায় ফিরে যাই! আমার খুব ভয় করছে আরিমান! আপনার কিছু হয়ে গেলে আমি বাঁচব না!"

আরিমান ইমার কপালে নিজের ঠোঁট চেপে দীর্ঘ এক চুমু দিল। "তোর আরিমানের কিছু করার ক্ষমতা এই পৃথিবীর কারো নেই, হৃদয়হরণী। দুই বছর আগে যে শয়তানটাকে আমি আধা-মৃত করে ছেড়ে দিয়েছিলাম, ও আজ আবার মাথা তোলার দুঃসাহস করেছে। তোকে আর আমাকে শান্তিতে বাঁচতে হলে আজ ওর মাথাটা ধড় থেকে আলাদা করতেই হবে।"

আরিমান ইমার হাতে একটা ছোট এমার্জেন্সি ট্র্যাকার ওয়াচ পরিয়ে দিল। "তুই এই রুমে একদম চুপচাপ থাকবি। দরজা ভেতর থেকে লক করা থাকবে। নিচে যা-ই আওয়াজ হোক না কেন, তুই বের হবি না। আমি ঠিক এক ঘণ্টার মধ্যে তোকে এসে এখান থেকে নিয়ে যাব। প্রমিস।"

ইমা অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে আরিমানের বুকে মুখ লুকালো। "আপনাকে আমার কসম আরিমান... আপনি নিজের খেয়াল রাখবেন!"

আরিমান ইমার ঠোঁটে আলতো একটা চুমু এঁকে দিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল এবং বাইরে থেকে বায়োমেট্রিক লকিং সিস্টেম অন করে দিল।

রাত ৮:০০ টা।

মিলানের আকাশ জুড়ে তখন ঘোর অমাবস্যার আঁধার আর মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বাজ পড়ার বিকট শব্দে পুরো পাহাড় কেঁপে উঠছিল।

হঠাৎ করেই ভিলা ডি সিকদারের প্রধান ফটকের লোহার বিশালাকার গেটটা একটা বিকট বিস্ফোরণে উড়ে গেল!

ডিটোনেটরের বিস্ফোরণের সাথে সাথে প্রায় দশটি কালো এসইউভি গাড়ি বিকট শব্দে ভিলার ভেতরে ঢুকল। গাড়ি থেকে নেমে এলো অন্তত ৫০-৬০ জন ভারী অস্ত্রধারী ইতালিয়ান মার্সেনারি। তাদের প্রত্যেকের হাতে একে-৪৭ আর সাব-মেশিনগান।

গাড়িগুলোর মাঝখান থেকে নেমে এলো লুসিয়ানো ডি ক্যালোব্রিয়া! ওর এক চোখে কালো প্যাচ বাঁধা, মুখে এক ভয়ংকর কাটা দাগ, আর অন্য চোখে জ্বলছে আগুনের মতো হিংসা।

"সিকদাআআআর!" লুসিয়ানো বিকট গলায় গর্জে উঠল। "আজ তোর শেষ দিন! তোর এই সুন্দর রাজপ্রাসাদ আজ আমি ছাই করে দেব!"

ঠিক তখনই ভিলার ওপরের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল আরিমান সিকদার!

বৃষ্টির জল ওর কুচকুচে কালো লেদার জ্যাকেটে আছড়ে পড়ছিল। কপালে পড়ে থাকা ভিজা চুল, চোখে সানগ্লাস ছাড়া এক ভয়ংকর রক্তচক্ষু। আরিমানের দুই হাতে দুটি রূপালী রঙের ডেজার্ট ইগল পিস্তল।

"লুসিয়ানো..." আরিমানের কণ্ঠস্বর মুষলধারার বৃষ্টির শব্দ ভেদ করে বরফশীতল হিমের মতো ছড়িয়ে পড়ল।

"দুই বছর আগে একটা চোখ হারিয়েও তোর শিক্ষা হয়নি? আজ তুই নিজের বাকি চোখটা আর প্রাণটাও হারাতে এসেছিস!"

"ফায়ার!" লুসিয়ানো আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে গর্জে উঠল।

মুহূর্তের মধ্যে শুরু হয়ে গেল এক নারকীয় কাণ্ড!

চারপাশ থেকে গুলিবর্ষণের বিকট শব্দে পুরো লেক কোমোর শান্ত এলাকা কেপে উঠল। গুলির সায়েন্সে চারপাশ যেন লাল হয়ে উঠল। লুসিয়ানোর মার্সেনারিরা মুড়ি-মুড়কির মতো ভিলার দিকে গুলি চালাতে লাগল।

কিন্তু আরিমান সিকদার কোনো সাধারণ মানুষ নয়। ও একাই যেন একটা পুরো সেনাবাহিনী!

ব্যালকনি থেকে লাফিয়ে নিচে এক স্লাইডিং পজিশনে নেমে এসে আরিমান দুই হাত উঁচিয়ে গুলি চালাতে শুরু করল। ওর প্রতিটি গুলি সরাসরি লুসিয়ানোর লোকজনের কপাল আর বুক চিরে বের হয়ে যাচ্ছিল! এক চুলও লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছিল না!

আরিমানের সাথে মার্কো আর ওর বিশ্বস্ত সিকিউরিটি টিম দুই পাশ থেকে কভার ফাইট দিতে শুরু করল। প্যানিক রুমের মনিটরে বসে ইমা বাইরে ফায়ারিং আর গর্জনের বিকট শব্দ শুনে কানে হাত দিয়ে হাউমাউ করে কাঁদছিল আর আল্লাহর কাছে আরিমানের জন্য দোয়া করছিল।

দশ মিনিটের মধ্যেই ভিলার সামনের আঙ্গিনা রক্তে ভেসে গেল। লুসিয়ানোর ৩০ জন লোক মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কিন্তু লুসিয়ানো ছিল ধূর্ত। ও গোলাগুলির আড়ালে নিজের বিশ্বস্ত চারজন লোককে নিয়ে ভিলার পেছনের সিঁড়ি দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছে!

লুসিয়ানো ভালো করেই জানত, আরিমানকে সামনাসামনি মার দেওয়া অসম্ভব। তাই ও ইমাকে জিম্মি করার উদ্দেশ্যে ওপরের দিকে ছুটছিল!

রাত ৮:২৫ টা।

লুসিয়ানো আর ওর চারজন লোক যখন তিনতলার সিক্রেট প্যানিক রুমের সামনে পৌঁছাল, তখন লুসিয়ানোর মুখে ফুটে উঠল এক পৈশাচিক হাসি।

"খুঁজে পেয়েছি! সিকদারের আসল কলিজা এখানে লুকিয়ে আছে!" লুসিয়ানো ওর লোককে বলল,

"সি-ফোর বোম্ব লাগা দরজা ওড়াতে!"

ওরা বোমা ফিট করতে যাবে, এমন সময় পেছন থেকে হঠাৎ এক রক্ত হিম করা কণ্ঠস্বর শোনা গেল—

"কিসের তাড়া, লুসিয়ানো?"

লুসিয়ানো চমকে পেছনে ফিরল।

সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে আছে আরিমান সিকদার! ওর পুরো পোশাক রক্তে ভেজা—নিজের নয়, শত্রুদের রক্তে। ওর হাতে আর কোনো গান নেই, কেবল একটা বিশাল ও ধারালো ইতালিয়ান স্মাগলিং ড্যাগার (ছুরি) জ্যান্ত আগুনের মতো জ্বলছে।

লুসিয়ানোর লোকগুলো আরিমানকে দেখে বন্দুক উঁচাতে গেল, কিন্তু আরিমান চিতার মতো বেগে ঝাঁপিয়ে পড়ল!

কয়েকটা নিখুঁত কোপ আর হাড় ভাঙ্গার শব্দ! মাত্র তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যে লুসিয়ানোর চারজন ভারী অস্ত্রধারী মার্সেনারি গলার নালী কাটা অবস্থায় মেঝেতে আছড়ে পড়ল! পুরো করিডোর লুসিয়ানোর লোকেদের তাজা রক্তে লাল হয়ে গেল।

লুসিয়ানো ভয়ে পিছিয়ে যেতে লাগল। ওর কপালে এবার মৃত্যুর শীতল ঘাম ফুটতে শুরু করেছে। ও নিজের রিভলভার তুলে আরিমানের দিকে গুলি করতে গেল—

আরিমান এক লাথি মেরে লুসিয়ানোর হাতের রিভলভারটা ছিটকে ফেলে দিল। তারপর লুসিয়ানোর গলা চেপে ধরে এক সজোর ধাক্কায় দেয়ালের সাথে সেঁটে ধরল!

আরিমান নিজের ধারালো ড্যাগারটা সোজা লুসিয়ানোর ডান উরুতে পুরোপুরি ঢুকিয়ে দিল!

"আআআআআআআআহ!" লুসিয়ানোর ভয়ংকর আর্নাদে পুরো ভিলা কেঁপে উঠল।

আরিমান চিবুক চেপে ধরে লুসিয়ানোর কানের কাছে মুখ আনল। ওর চোখে এখন শয়তানের চেয়েও ভয়ংকর রূপ।

"তুই ভেবেছিলি তুই আমার কলিজায় হাত দিবি?" আরিমান বরফশীতল গলায় বলল। "তোর মতো কীটকে ২ বছর আগে জীবিত ছেড়ে দেওয়াটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। আজ সেই ভুলের সংশোধন করব।"

আরিমান ড্যাগারটা এক টানে বের করে লুসিয়ানোর গলায় চেপে ধরল। লুসিয়ানো মাটিতে পড়ে কাঁপতে কাঁপতে হাত জোড় করল, "সিকদার... প্লিজ... ক্ষমা... স্পেয়ার মাই লাইফ..."

"আমার ডিকশনারিতে তোর জন্য কোনো ক্ষমা নেই, লুসিয়ানো," আরিমান শান্ত গলায় বলল।

তিনতলার সিক্রেট প্যানিক রুমের বাইরে তখন গোলাগুলির আওয়াজ কিছুটা থমে এসেছে। কিন্তু করিডোরজুড়ে ছড়িয়ে ছিল বারুদ আর তাজা রক্তের কটু গন্ধ।

ইমা আর সহ্য করতে পারছিল না। পেটের ভেতর নিজের ছোট্ট সন্তানটার নিরাপত্তার চিন্তা আর আরিমানের জন্য এক অজানা আতঙ্ক ওকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। ও কাঁপতে কাঁপতে প্যানিক রুমের ইমার্জেন্সি লকটা কোনোমতে আনলক করে বাইরে পা রাখল।

কিন্তু বাইরে পা রাখতেই ইমার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল!

করিডোরের মেঝেতে গড়াচ্ছে কয়েকটা তাজা লাশ, দেওয়ালজুড়ে রক্তের ছিটেফোঁটা। আর কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে আরিমান সিকদার!

আরিমানের পুরো পোশাক রক্তে ভেজা। ওর চোখে তখন এক পৈশাচিক, হিংসে ভরা রাক্ষসে রূপ! ওর এক হাতে ধরা একটা বিশাল ও ধাড়ালো ইতালিয়ান ড্যাগার, যা থেকে টপটপ করে তাজা রক্ত মেঝেতে ঝরে পড়ছে।

মেঝেতে যন্ত্রণায় ছটফট করছিল আধমরা লুসিয়ানো। ওর বুকের মাঝখানে আরিমানের ছোরার গভীর কোপ।

আরিমান যখন রক্তচক্ষু উঁচিয়ে লুসিয়ানোর চুলের মুঠি ধরে ড্যাগারটা শেষবারের মতো ওর গলায় চালাতে গেল, ঠিক তখনই মারাত্মক যন্ত্রণার মধ্যেও লুসিয়ানো এক পৈশাচিক অট্টহাসি হেসে উঠল।

লুসিয়ানো গলার ক্ষত চেপে ধরে কাঁপতে কাঁপতে বলল, "তোকে... তোকে আমি শেষ করতে পারলাম না সিকদার! তবে মনে রাখিস... তোর পতন হবেই! ... ইতালিয়ান পুলিশ আর ইন্টারপোল আসছে! কেউ আসবেই... তোকে ধ্বংস করবেই...!"

কথাটা বলতে বলতেই লুসিয়ানোর চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। ও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল।

পুরো দৃশ্যটা চোখের সামনে ঘটতে দেখে ইমা আতঙ্কে শিউরে উঠল! ও নিজের হাত দুটো দিয়ে মুখ চেপে ধরে পিছিয়ে গেল। ইমার মনে হলো ওর পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেছে। সকালে যে মানুষটা ওকে ভালোবেসে বুকে টেনে নিয়েছিল, তাকেই রাতে চোখের সামনে এত নির্মমভাবে একটা মানুষকে খুন করতে দেখে ইমার ভেতরের পুরো জগৎটা ওলটপালট হয়ে গেল!

ইমার পায়ের শব্দে আরিমান ঝটকা মেরে পেছনে ফিরল। ইমাকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরিমানের হাতের ড্যাগারটা নিমিষেই মেঝেতে খসে পড়ল! ওর চোখের সেই পৈশাচিক হিংস্রতা মুহূর্তে গায়েব হয়ে সেখানে এক অজানা ভয়ের ছায়া নেমে এলো।

"ই... ইমু?" আরিমান ধীর পায়ে ইমার দিকে এগোতে চাইল। "তুই এখানে কেন? আমি তোকে ভেতরে থাকতে বলেছিলাম না?"

ইমা দুপা পিছিয়ে গেল। ও নিজের কাঁপা হাত দুটো নিজের পেটের ওপর শক্ত করে চেপে ধরল। ওর চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরছিল।

"না! একদম আমার কাছে আসবেন না আপনি!" ইমার গলা ভয়ে আর চরম ঘেন্নায় কেঁপে উঠল।

আরিমান নিজের রক্তাক্ত হাত দুটোর দিকে তাকাল। ও দ্রুত শার্টের হাতা দিয়ে রক্ত মোছার চেষ্টা করতে করতে বলল, "ইমু, শোন! ও আমার শত্রু ছিল! ও তোকে মারতে এসেছিল! আমি শুধু তোকে আর আমাদের সন্তানকে বাঁচাতে—"

"থামুন আরিমান! দয়া করে আর একটা মিথ্যেও বলবেন না!" ইমা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। "আমি এমন সংসার চাই না আরিমান! যেখানে সকালবেলা ভালোবাসার কথা হয় আর রাতে চোখের সামনে মানুষ খুন হয়! এখানে থাকলে যেকোনো সুস্থ মানুষ অসুস্থ হয়ে যাবে! আপনার দুনিয়াটা বড্ড অন্ধকার... রক্তে ভেজা! এসব কি কোনোদিন শেষ হবে না আপনার?"

আরিমান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ও ধীর পায়ে মাথা নিচু করে ফেলল। ওর চওড়া বুকটা গভীর দীর্ঘশ্বাসে ওঠানামা করছিল। চার বছর ধরে আনন্ডারওয়ার্ল্ডের অপরাধ সাম্রাজ্য চালাতে চালাতে ও যতটা মাফিয়া হয়ে উঠেছিল, আজ ইমার এই নিষ্পাপ চোখ দুটোর সামনে নিজের সেই অন্ধকার রূপটাকে ঢেকে রাখার মতো কোনো অস্ত্র ওর কাছে ছিল না।

আরিমান অপরাধীর মতো নিচু গলায় বলল, "গত চারটে বছর তোকে ছাড়া থাকতে থাকতে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি ইমু... নিজের ভেতরের আলোটাকে আমি নিজ হাতে মেরে ফেলেছি। এখন এসব রক্ত, এসব অপরাধই আমার সাথে থাকবে মরার আগ পর্যন্ত... আমি চাইলেও এই অন্ধকার থেকে আর বের হতে পারব না।"

ইমা নিজের চোখের জল মুছে আরিমানের দিকে তাকাল। ওর দৃষ্টিতে আজ আর শুধু ভালোবাসা ছিল না, ছিল এক চরম কঠিন সিদ্ধান্ত।

"আপনি বের হতে না পারলে নেই আরিমান," ইমা একদম শক্ত গলায় বলল, "কিন্তু আমি থাকব না। আমি থাকতে পারব না আপনার সাথে আপনার এই রক্তভেজা অন্ধকার জীবনে! আমার সন্তানের গায়ে আমি কোনো খুনের দাগ লাগতে দেব না!"

কথাটা বলেই ইমা পেছন ফিরে দৌড়ে নিজের রুমে চলে যেতে চাইল।

আরিমানের ভেতরের ঘুমন্ত সিংহটা এক মুহূর্তে গর্জে উঠল! ইমার ওই "থাকব না" শব্দ দুটো আরিমানের মস্তিষ্কে চার বছর আগের সেই অভিশপ্ত বিচ্ছেদের যন্ত্রণা আবার জাগিয়ে তুলল!

"ইমুউউউ!" আরিমান সজোরে গর্জে উঠল।

ও চিতার মতো এক লাফে গিয়ে ইমার কবজি শক্ত করে চেপে ধরল। এক হেঁচকা টানে ইমাকে নিজের বুকের সাথে সেঁটে ধরল। আরিমানের চোখ দুটো রাগে আর হারানোর ভয়ে রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছিল।

"ভুলেও না ইমু!" আরিমান কড়া, বরফশীতল কিন্তু ভয়ংকর গলার আওয়াজে ইমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল। "দ্বিতীয়বার তুই আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভুলেও নিজের মুখে আনবি না! চার বছর আমি তোকে ছাড়া নরক যন্ত্রণা সহ্য করেছি, কিন্তু আজ আর নয়! তুই আমার আলো, তুই-ই আমার অন্ধকার! তুই চাস আর না চাস, এই আরিমান সিকদারের সাথেই তোকে বাঁচতে হবে আর এই বুকেই তোকে মরতে হবে!"

ইমা আরিমানের বুকের ওপর ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করে উঠল, "ছেড়ে দিন আমাকে! আপনি একটা রাক্ষস!"

"হ্যাঁ! আমি রাক্ষস! আর এই রাক্ষসটা তোকে কোনোদিন নিজের থেকে আলাদা হতে দেবে না!" আরিমান ইমাকে একপ্রকার জোর করেই কোলে তুলে নিয়ে মাস্টার বেডরুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা লক করে দিল।

ইমাকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে আরিমান দরজার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে হাঁপাতে লাগল। ওর চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোটা গরম জল। ইমা বিছানায় হাঁটুতে মুখ গুঁজে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগল।

বাইরে ইতালির মুষলধারে বৃষ্টি তখন আরও বাড়েছিল। লুসিয়ানোর শেষ শব্দগুলো—" ইন্টারপোল আসবে..."—তখনো যেন বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল।

আরিমান জানে, লুসিয়ানো ঠিকই বলে গেছে। আজকের এই কাণ্ডের পর ইতালিয়ান পুলিশ ভিলা ঘেরাও করতে বেশি সময় নেবে না। কিন্তু তার চেয়েও বড় ঝড় এখন আরিমানের মনের ভেতরে বইছে।

চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন