#তুমিই_আমার_হৃদয়হরণী পর্ব-২১
#লেখিকা_আশু
গাড়ির কাচের ওপর বিকেলের রোদের সাথে ট্রাফিকের লাল আলো এসে পড়ছিল। পেছনের সিটে বসা ইমার হাত দুটো কান্নায় আর দুশ্চিন্তায় কাঁপছিল। পাশে বসা ইরফান বারবার ব্যাকভিউ মিররে তাকিয়ে গাড়ি চালাচ্ছিল, মুখটা ওর ভীষণ থমথমে। ঢাকা শহরের যানজট যেন আজ ইমার অধৈর্য মনকে আরও বেশি পিষে মারছিল।
"ইরফান ভাইয়া, আর কতক্ষণ লাগবে? গাড়ি কি একটু দ্রুত চালানো যায় না?" ইমার কণ্ঠস্বরে কান্নার তোড়।
ইরফান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্টিয়ারিংয়ে চাপ বাড়াল, "ইমু, চেষ্টা করছি। কিন্তু তুই নিজেকে সামলা। আরিমান ভেঙে পড়ার ছেলে নয়। ও তিনদিন ধরে অফিসে নিজেকে বন্দি করে রাখলেও আমি নিশ্চিত ও কোনো না কোনো পথ বের করার চেষ্টাই করছে।"
"ও তো একা হয়ে গেছে ভাইয়া!" ইমা দুই হাতে মুখ ঢাকল। "আমি ইতালি থেকে ফেরার পর ওর দিকে একবারও সোজা হয়ে তাকাইনি। ওকে পশুর মতো কথা শুনিয়েছি, রাক্ষস বলেছি! যে মানুষটা নিজের জীবনের সব ঝুঁকি নিয়ে শুধু আমাকে আর আমার সন্তানকে রক্ষা করল, আমি তাকেই ঘেন্না দেখালাম! ও যদি ভেঙে না-ও পড়ে, ওর মনটা তো চুরমার হয়ে গেছে!"
ইরফান নীরব রইল। ও জানে আরিমানের ভালোবাসার ধরনটা সাধারণ আর দশটা মানুষের মতো নয়। আরিমান সিকদার যাকে ভালোবাসে, তাকে আগলে রাখতে পৃথিবীর সব সীমানা পার হতে পারে—এমনকি নিজের হাত রক্তে রাঙাতেও ওর হাত কাঁপেনি।
অবশেষে গাড়ি গিয়ে থামল ‘সিকদার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ’-এর সামনে। চৌষট্টি তলার সুউচ্চ কাচের টাওয়ারটি বিকেলের আলোয় চকচক করছে, কিন্তু তার ভেতরে আজ যেন এক থমথমে অমঙ্গলের ছায়া। সাধারণত যে ভবনের রিসেপশনে শত শত মানুষের ব্যস্ততা থাকে, আজ সেখানে এক অদ্ভুত নীরবতা। প্রধান ফটকে অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
ইমা দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে লিফটের দিকে দৌড়ে গেল। লিফট যখন চৌষট্টি তলার বোতাম স্পর্শ করে ওপরে উঠতে শুরু করল, তখন ইমার হৃদস্পন্দন শতগুণ বেড়ে গেল।
পরাবাস্তব এক অনুভূতি! কয়েক দিন আগেও যে মানুষকে ও ভয় পাচ্ছিল, আজ তাকে এক নজর দেখার জন্য, তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাওয়ার জন্য ওর ছাতিটা ফেটে যাচ্ছে।
লিফটের দরজা খুলতেই দেখা গেল লবিজুড়ে থমথমে পরিবেশ। কাচের বিশাল দরজার সামনে কালো স্যুটে দাঁড়িয়ে ছিল মার্কো। মার্কোর চোখেমুখে চরম দুশ্চিন্তা ও ক্লান্তির ছাপ। ইমাকে লিফট থেকে বের হতে দেখেই ও কিছুটা অবাক হলো, তারপর দ্রুত এগিয়ে এলো।
"ম্যাম! আপনি এখানে? আপনার শরীর তো ভালো ছিল না—"
"আরিমান ভেতরে আছে?" ইমা হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল।
মার্কো নিচু মাথা নিচু করে বলল, "হ্যাঁ ম্যাম। স্যার তিনদিন ধরে ভেতরেই আছেন। কাউকেই ঢোকার অনুমতি দেননি। ইতালি থেকে রেড নোটিশ জারির অফিশিয়াল ফাইল আসার প্রক্রিয়া শুরু হতেই স্যার সব মিটিং বাতিল করেছেন। ঢাকার সেরা সেরা ক্রিমিনাল ল-ইয়াররা এসেছিলেন, কিন্তু স্যার কাউকেই দেখা দেননি। ওনার হাতে সি*গারেট আর মদ ছাড়া আর কিছু নেই ম্যাম..."
ইমার চোখ দিয়ে আবার জল গড়িয়ে পড়ল। ও আর এক মুহূর্তও না ভেবে আরিমানের চেম্বারের ভারী গ্লাস ডোরের দিকে এগিয়ে গেল।
ঘরের ভেতরটা আবছা অন্ধকারে ডুবে ছিল। জানালাগুলোর ভারী মখমলের পর্দা টানা, শুধু মাঝের একটু ফাঁক দিয়ে বিকেলের শেষ রাঙা আলো এসে পড়েছে মেহগনি কাঠের বিশাল এক্সিকিউটিভ টেবিলটার ওপর। বাতাস জুড়ে কড়া চুরুট আর হুইস্কির তিক্ত গন্ধ।
ঘরের এক কোণে থাকা বিশাল চামড়ার চেয়ারটিতে হেলান দিয়ে বসে ছিল আরিমান সিকদার। পরনের সাদা শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা, হাতা গুটানো। চুলগুলো চরম বিশৃঙ্খলভাবে কপালে ছড়িয়ে আছে। চোখে এক গভীর, নিভে যাওয়া ছাইয়ের মতো শূন্যতা। ওর এক হাতে তখনও একটা প্রায় শেষ হয়ে আসা সি*গারেট, আর অন্য হাতে ধরা ছিল ওদের চার বছর আগের বাঁধাই করা একটা ছবি।
কাচের দরজাটা হালকা শব্দে খুলতেই আরিমান না তাকিয়েই বরফশীতল গলায় বলল, "মার্কো, তোকে কতবার বলব আমাকে একা থাকতে দে? ইন্টারপোল আসুক, পুলিশ আসুক কিংবা ফাঁসির দড়ি—আরিমান সিকদার কারো তোয়াক্কা করে না। বের হ এখান থেকে।"
"আমি মার্কো নই আরিমান..."
ইমার কাঁপা কণ্ঠস্বর ঘরের থমথমে নীরবতা ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ল।
আরিমান নিমেষে চমকে উঠল! ওর হাতের সি*গারেটটা খসে পড়ল অ্যাশট্রেতে। হাতের ছবিটা টেবিলের ওপর রেখে ও দ্রুত মাথা তুলল।
ঘরের আবছা আলোয় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে ইমা। ওর পরনের সাধারণ শাড়িটা সামান্য এলোমেলো, চোখে জল, আর পুরো মুখে এক অসীম ব্যাকুলতা।
আরিমান চেয়ার ছেড়ে ঝটকা দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওনার চোখে বিস্ময় আর অবিশ্বাস।
"ই... ইমু? তুই এখানে? তোর শরীর ভালো নয়, তুই কেন এসেছিস?"
ইমা কোনো উত্তর দিল না। ও ধীর পায়ে আরিমানের দিকে এগোতে লাগল।
আরিমান দু-পা পিছিয়ে গেল। ও নিজের হাত দুটো পেছনের দিকে লুকিয়ে ফেলে নিচু গলায় বলল, "তুই কাছে আসিস না ইমু... আমার গায়ে এখনো সেই খুনের গন্ধ লেগে আছে। তুই তো আমাকে ঘৃণা করিস, আমাকে জল্লাদ ভাবিস... তুই কেন এলি আমার এই নরকে?"
ইমা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ও এক ঝটকায় এগিয়ে গিয়ে আরিমানের চওড়া, শক্ত বুকের ওপর আছড়ে পড়ল!
ওর দুটি নরম হাত আরিমানের পিঠ শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, আর মুখটা গুঁজে দিল আরিমানের শার্টের বোতাম খোলা বুকের মাঝখানে—যেখানে আরিমানের হৃদস্পন্দনটা ঝড়ের বেগে আছড়ে পড়ছিল।
আরিমান যেন এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মূর্তি হয়ে গেল! ওর হাত দুটো শূন্যে জমে রইল। বিশ্বাসই হতে চাইছিল না যে যে ইমা ওকে ছোঁয়া তো দূরের কথা, ওর দিকে তাকাতেও ঘৃণা করছিল, সেই ইমা আজ ওকে এভাবে আঁকড়ে ধরেছে!
"আমায় ক্ষমা করে দাও আরিমান... প্লিজ আমায় ক্ষমা করে দাও!" ইমা অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলল। "আমি ভুল করেছি! আমি তোমাকে বুঝতে পারিনি! তুমি যা করেছ, সব আমাকে আর আমাদের এই নিষ্পাপ সন্তানকে বাঁচানোর জন্য করেছ... আর আমি তোমাকে রাক্ষস বলে কষ্ট দিয়েছি!"
আরিমানের চোখের কোণ দিয়ে দুটো তপ্ত জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ল। ওর ভেতরে থাকা বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা কঠোর মাফিয়া হৃদয়টা এক মুহূর্তে গলে জল হয়ে গেল।
আরিমান আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। ও ওর দুই বিশাল ও শক্তিশালী বাহু দিয়ে ইমাকে নিজের বুকের সাথে চরম আকুলতায় পেঁচিয়ে ধরল। ওর মুখটা গুঁজে দিল ইমার ঘাড়ের নরম ভাঁজে।
"ইমু... আমার ইমু..." আরিমানের কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে এলো। "তুই সত্যি আমাকে ছেড়ে যাবি না তো? তুই আমাকে সত্যি ঘৃণা করিস না তো?"
"না! কখনো না!" ইমা মাথা তুলে আরিমানের বিষণ্ণ মুখের দিকে তাকাল। নিজের দুটি নরম হাত আরিমানের দুগালে রেখে বলল, "তুমি আলো হও কিংবা অন্ধকার—তুমি আমার আরিমান! আমার আর আমাদের সন্তানের আরিমান! তোমার এই বুকে ছাড়া আমার আর কোনো আশ্রয় নেই।"
আরিমান পরম আকুলতায় ইমার কপালে, গালে, বন্ধ চোখের পাতায় একের পর এক চুমুর বৃষ্টি ছড়িয়ে দিতে লাগল। চার দিনের সেই অভিশপ্ত বিচ্ছেদ আর নীরবতার পর দুটো তপ্ত হৃদয় আবার এক হয়ে গেল।
আরিমান ইমার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে দীর্ঘ এক গভীর স্পর্শ দিল। ইমিও আজ আর লজ্জা পেল না, ও আরিমানের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরে ওর সাথে মিশে গেল।
কয়েক মুহূর্ত পর আরিমান ইমার কপালে কপাল ঠেকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "কিন্তু ইমু... ইন্টারপোল আর ইতালিয়ান পুলিশ আমার পেছনে লেগেছে। ইতালির ওই ঘটনার পর হয়তো আমাকে যেকোনো মুহূর্তে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, কিংবা আমাকে দীর্ঘ এক আইনি লড়াই লড়তে হবে..."
ইমা আরিমানের ঠোঁটে নিজের আঙুল রেখে ওকে থামিয়ে দিল।
"আর কোনো রক্ত নয়, আর কোনো অন্যায় নয় আরিমান," ইমা একদম শান্ত ও দৃঢ় গলায় আরিমানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল। "আজ তোমাকে আমার কাছে একটা শেষ প্রতিজ্ঞা করতে হবে।"
আরিমান ইমার দিকে তাকাল, "কী প্রতিজ্ঞা?"
ইমা আরিমানের ডান হাতটা আলতো করে টেনে নিয়ে নিজের পেটের ওপর, অর্থাৎ ওদের দুই মাসের অনাগত সন্তানের ওপর রাখল।
"আমাদের এই সন্তানের দোহাই আরিমান," ইমা এক পরম আকুতি নিয়ে বলল, "তুমি আজ এই মুহূর্তে তোমার এই অন্ধকার মাফিয়া জীবনকে চিরতরে বিদায় জানাবে! আর কোনো যুদ্ধ নয়, আর কোনো আন্ডারওয়ার্ল্ড নয়, আর কোনো রক্তপাত নয়! তুমি শুধু একজন সাধারণ মানুষ হবে—আমার স্বামী আর আমাদের সন্তানের বাবা! তুমি কি পারবে আমাদের বাচ্চার জন্য তোমার এই সাম্রাজ্য ত্যাগ করতে?"
আরিমান থমকে গেল। ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল গত চার বছর ধরে গড়ে তোলা ওর বিশাল আন্ডারওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ক, মিলানের ক্ষমতা, অস্ত্রের ঝনঝনানি আর কোটি কোটি টাকার সাম্রাজ্য।
কিন্তু পরমুহূর্তেই ও তাকাল ইমার ভেজা, আকুল চোখের দিকে এবং নিজের হাতের নিচে অনুভব করল নিজের অনাগত সন্তানের ছোট্ট স্পন্দন।
আরিমান বুঝতে পারল—এই পৃথিবীর সমস্ত রাজত্ব, ক্ষমতা আর ধন-সম্পদ একদিকে, আর ওনার হৃদয়হরণী ইমা ও ওর সন্তানের একফোঁটা হাসি অন্যদিকে!
আরিমান ইমার হাত দুটো নিজের গালের সাথে চেপে ধরে হাঁটু গেড়ে নিচে বসে পড়ল। ও ইমার পেটের ওপর নিজের মাথাটা রাখল।
"আমি শপথ করছি ইমু..." আরিমানের চোখ দিয়ে খুশির জল গড়িয়ে পড়ল। "আমাদের সন্তানের কসম, তোর ভালোবাসার কসম! আজ এই মুহূর্ত থেকে আরিমান সিকদার তার মাফিয়া জীবন, তার অস্ত্র, তার অন্ধকার সাম্রাজ্য চিরতরে ত্যাগ করল! আজ থেকে আমি শুধুই তোর আরিমান... শুধুই আমাদের সন্তানের বাবা! এর জন্য যদি আমাকে আইনি লড়াই লড়তে হয়, আমি লড়ব, কিন্তু আর কখনো কোনো মানুষের রক্ত আমি ঝরাব না!"
ইমা হেসে ফেলল। ওর চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে আরিমানের এলোমেলো চুলে মিশে গেল। ও হাঁটু গেড়ে আরিমানের পাশে বসে ওর মাথাটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল।
পরদিন সকাল।
ঢাকার আকাশ ঘন মেঘে ঢেকে ছিল।
আরিমান সিকদার অফিসে ফিরে এসে প্রথম যে কাজটি করল, তা হলো ওর মাফিয়া সাম্রাজ্যের মূল সহযোগী মার্কো এবং ওর নিজস্ব আইনি দল ও আন্তর্জাতিক আইনজীবীদের সিকদার ভবনের কনফারেন্স রুমে তলব করল।
কনফারেন্স রুমের বিশাল টেবিলে ফাইল আর ল্যাপটপের স্তূপ। ঢাকার সেরা ক্রিমিনাল ল-ইয়ার ব্যারিস্টার রফিকের পাশাপাশি ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত ছিলেন রোম ও জেনেভার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞগণ।
আরিমান একদম শান্ত, কিন্তু কড়া ভঙ্গিতে টেবিলে বসল। ওর পাশে বসা মার্কোর মুখ ফ্যাকাশে।
"মার্কো," আরিমান শীতল গলায় বলল। "ইউরোপ আর এশিয়ার যত আন্ডারওয়ার্ল্ড অ্যাকাউন্ট, শেল কোম্পানি আর যেসব আর্মস ডিলিংয়ের ব্যবসা রয়েছে সবকিছুর লিকুইডেশন প্রসেস আজ থেকেই শুরু কর।"
মার্কো চমকে উঠে দাঁড়াল, "স্যার! আপনি কী বলছেন? 'ব্ল্যাক ভাইপার' ধ্বংস হওয়ার পর ইউরোপের পুরো মাফিয়া সাম্রাজ্য এখন আপনার হাতের মুঠোয়! কোটি কোটি ডলারের বিজনেস—"
"আই ডোন্ট কেয়ার, মার্কো!" আরিমান টেবিল চাপড়ে বলল। "আরিমান সিকদার আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথে কোনো সম্পর্ক রাখবে না। সব প্রপার্টি চ্যারিটি ফান্ডে ট্রান্সফার কর, আর বৈধ বিজনেসগুলো সিকদার গ্রুপের আন্ডারে নিয়ে আয়। আর যারা আমার সাথে কাজ করত, তাদের সবাইকে পর্যাপ্ত টাকা দিয়ে স্থায়ীভাবে অবসর নেওয়ার ব্যবস্থা কর।"
ব্যারিস্টার রফিক চশমাটা ঠিক করে বললেন, "আরিমান, বিজনেস ছাড়ার সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয়। কিন্তু ইতালিয়ান স্টেট পুলিশ আর ইন্টারপোল যে রেড নোটিশ জারি করতে যাচ্ছে, সেটা ঠেকানো তো এত সহজ নয়। লুসিয়ানোসহ পঁয়ত্রিশ জন মার্সেনারি নিহত হয়েছে আপনার লেক কোমোর ভিলায়। প্রমাণ সব আপনার বিরুদ্ধে।"
আরিমান একটা ফাইল ব্যারিস্টার রফিকের দিকে ঠেলে দিল।
"প্রমাণ শুধু একপক্ষের নয়, ব্যারিস্টার," আরিমান ঠাণ্ডা গলায় বলল। "লুসিয়ানো কোনো সাধারণ নাগরিক ছিল না। ও ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড টেররিস্ট ও ড্রাগ লর্ড ছিল। ইতালির লেক কোমোর ভিলায় ও অবৈধ অস্ত্র আর সাঁজোয়া বাহিনী নিয়ে হামলা চালিয়েছিল আমার স্ত্রীকে হত্যা ও কিডন্যাপ করার জন্য।"
ভিডিও কনফারেন্স থেকে ইতালিয়ান অ্যাটর্নি ডন সেবাস্টিয়ান বললেন, "আরিমান ঠিকই বলেছে। সেলফ-ডিফেন্স বা আত্মরক্ষার অধিকার আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত। আমরা যদি প্রমাণ করতে পারি যে লুসিয়ানো বেআইনিভাবে প্রাইভেট প্রপার্টিতে আক্রমণ করেছিল এবং আরিমান তার পরিবারকে বাঁচাতে আত্মরক্ষা করেছিল, তবে ইতালিয়ান কোর্টে কেস ভিন্ন দিকে মোড় নেবে।"
"কিন্তু সমস্যা হলো," ব্যারিস্টার রফিক যোগ করলেন, "ইন্টারপোল আরিমানকে হেফাজতে নিতে চাইবে। আপনাকে হয়তো ইতালিতে গিয়ে সারেন্ডার করতে হতে পারে।"
কথাটা শেষ হতেই কনফারেন্স রুমের বাইরে কিছুটা হৈচৈ শোনা গেল।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন আরিমানের বাবা—মাহতাব সিকদার। ওনার পেছনে ইতস্তত করে ঢুকলো ইরফান।
মাহতাব সিকদারের মুখে চরম উদ্বেগ। ওনার হাতে একখানা খবরের কাগজ।
"আরিমান!" মাহতাব সিকদার কাঁপানো গলায় বললেন। "আজকের আন্তর্জাতিক পত্রিকাগুলোতে কীসব লেখা হচ্ছে? ইতালির ঘটনার সাথে তোর নাম কেন আসছে? তুই নাকি আন্ডারওয়ার্ল্ডের—"
আরিমান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ওর বাবার সামনে গিয়ে মাথা নিচু করল।
"বাবা..." আরিমান নিচু গলায় বলল। "আমি অতীতে অনেক ভুল করেছি। ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর শত্রুতার কারণে আমাকে একটা অন্ধকার জগতে ঢুকতে হয়েছিল। কিন্তু আমি আপনাকে আর মাকে কথা দিচ্ছি, আমি কোনো অপরাধমূলক কাজের সাথে নিজেকে জড়িয়ে রাখিনি। ইতালিতে যা ঘটেছে, তা শুধু ইমু আর আমার অনাগত সন্তানকে বাঁচাতে হয়েছিল।"
মাহতাব সিকদার চোখের জল মুছলেন। "তোর মা তো কেঁদে কেঁদে শেষ আরিমান! ইমা মেয়েটা তোকে কতটা ভালোবাসে যে সব জেনেও তোর পাশে দাঁড়িয়ে আছে! তোর যেন কিছু না হয় রে বাবা..."
আরিমান বাবাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে বলল, "কিছু হবে না বাবা। আরিমান সিকদার অন্যায় করতে পারে, কিন্তু হেরে যেতে শেখেনি। আমি আইনের মাধ্যমেই নিজেকে মুক্ত করব।
সপ্তাহখানেক পর।
বিষয়টি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। বাংলাদেশ সরকার ও ইতালিয়ান কনস্যুলেটের যৌথ সমঝোতায় সিদ্ধান্ত হলো—
আরিমান সিকদার ইতালিতে পালিয়ে যাবেন না, বরং ওর আন্তর্জাতিক আইনি টিম রোমের সুপ্রিম কোর্টে একটি প্রাক-গ্রেপ্তার জামিন এবং 'আত্মরক্ষা' পিটিশন দাখিল করবে।
আরিমান স্বেচ্ছায় ঢাকার ইতালিয়ান দূতাবাসে হাজির হয়ে ওর বয়ান রেকর্ড করাল।
এদিকে, ইমার শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে আরিমান ওকে বাসায় থাকার জন্য বলেছিল, কিন্তু ইমা এক চুলও নড়েনি। ও সব জায়গায় আরিমানের হাত ধরে পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছে।
রোমের আদালতের শুনানির দিন। ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে ঢাকার বিশেষ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল কোর্টরুম থেকে শুনানি অনুষ্ঠিত হচ্ছিল।
বিচারকের আসনে ইতালিয়ান সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জিওভান্নি। আর বিবাদী পক্ষে আন্তর্জাতিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ডন সেবাস্টিয়ান ও ব্যারিস্টার রফিক।
ইতালিয়ান প্রসিকিউটর তীব্র গলায় যুক্তি উপস্থাপন করছিলেন—"মাই লর্ড! আরিমান সিকদার একজন বিপজ্জনক ব্যক্তি। উনি লেক কোমোর ভিলায় লুসিয়ানো ও তার সহযোগীদের ওপর একতরফা গণহত্যা চালিয়েছেন! ওনার বিরুদ্ধে অবিলম্বে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হোক!"
ডন সেবাস্টিয়ান উঠে দাঁড়ালেন। ওনার হাতে ছিল একটি পেনড্রাইভ ও বিশাল নথিপত্র।
"মাই লর্ড," সেবাস্টিয়ান বললেন, "প্রসিকিউশন সত্য গোপন করছে। প্রথমত, লুসিয়ানো 'ব্ল্যাক ভাইপার' নামের একটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের প্রধান ছিল, যার নামে ইতালিতেই বিশটির বেশি খুন ও কিডন্যাপিংয়ের মামলা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, লেক কোমোর ভিলার ভেতরে সিকিউরিটি ক্যামেরার যেসব সিসিটিভি ফুটেজ ইতালিয়ান পুলিশ উদ্ধার করেছে, তা আমি আদালতে পেশ করছি।"
কোর্টের বিশাল পর্দায় সিকিউরিটি ফুটেজ ভেসে উঠল।
তাতে স্পষ্ট দেখা গেল—লুসিয়ানো তার পঁয়ত্রিশ জন সশস্ত্র মার্সেনারি নিয়ে আরিমানের ভিলার প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে ঢুকেছে। তারা সরাসরি গুলি চালিয়ে সিকিউরিটি গার্ডদের হত্যা করেছে। পুরো ট্রাইব্যুনালে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।
সেবাস্টিয়ান আরও যোগ করলেন, "ফুটেজে স্পষ্ট যে,
আরিমান সিকদার প্রথমে কোনো আক্রমণ করেননি। ওনার গর্ভবতী স্ত্রী ইমা সিকদারকে বাঁচাতে এবং নিজের বাড়িতে বেআইনি সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারীদের হাত থেকে পরিবারকে রক্ষা করতে উনি বাধ্য হয়ে আত্মরক্ষা করেছিলেন। ইতালিয়ান ফোর্সেস অ্যাক্ট অনুযায়ী, নিজ বাসভবনে গর্ভবতী স্ত্রীর জীবন রক্ষার্থে যেকোনো নাগরিকের চরম আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে।"
প্রসিকিউটর তাও দমার পাত্র ছিলেন না, "কিন্তু মাই লর্ড, আরিমান সিকদারের সাবেক আন্ডারওয়ার্ল্ড সংযোগের কী হবে?"
ব্যারিস্টার রফিক এবার উঠে দাঁড়িয়ে নথি জমা দিলেন, "মাই লর্ড! আরিমান সিকদার বিগত চার বছর ধরে কোনো বেআইনি কাজের সাথে জড়িত নন। উনি সিকদার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করছেন এবং ইতিমধ্যে ওনার সাবেক সমস্ত ট্রাস্ট ও সম্পত্তি চ্যারিটিতে দান করার আইনি নথি জমা দিয়েছেন। উনি একজন দায়িত্বশীল ব্যবসায়ী। "
কোর্টে চরম নীরবতা নেমে এলো।
বিচারক জিওভান্নি বেশ কিছুক্ষণ নথিপত্র পরীক্ষা করলেন এবং ওনার সহকারী বিচারকদের সাথে আলোচনা করলেন।
অবশেষে বিচারক ওনার চশমা খুলে রায় ঘোষণা করলেন—
"আদালত সব প্রমাণ ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, লেক কোমোর ঘটনাটি একটি চরম আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ ছিল। লুসিয়ানো এবং তার দলবল সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে প্রবেশ করে একজন নিরপরাধ গর্ভবতী নারী ও তার স্বামীর জীবন বিপন্ন করেছিল। অতএব, আরিমান সিকদারের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত প্রাথমিক খুনের অভিযোগ বাতিল করা হলো এবং ওনাকে নিঃশর্ত জামিন ও রেহাই দেওয়া হলো। তবে উনি আগামী এক বছর কোনো প্রকার অস্ত্র বহন করতে পারবেন না।"
রায়ের শব্দগুলো ভেসে আসতেই ট্রাইব্যুনাল রুমে যেন এক আনন্দের বন্যা বয়ে গেল!
ইমা পাশে বসে থাকা আরিমানের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে কেঁদে ফেলল। আরিমান ওকে এক টানে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে কপালে এক দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিল।
চলবে......