#তুমিই_আমার_হৃদয়হরণী পর্ব-২২
#লেখিকা_আশু
কোর্টের সেই যুগান্তকারী রায়ের পর দেখতে দেখতে পার হয়ে গেল আটটি দীর্ঘ মাস।
ঢাকার ওপর থেকে মেঘের ঘনঘটা কেটে গিয়ে আজ যেন এক নির্মল রোদ হাসছিল। লেক কোমোর সেই অন্ধকার, রক্তাক্ত স্মৃতিগুলো এখন সিকদার ভিলার কাছে শুধুই এক অতীতের দূরবর্তী স্বপ্ন।
আরিমান সিকদার ওর দেওয়া প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে রেখেছেন। ইউরোপ আর এশিয়ার সমস্ত আন্ডারওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ক চিরতরে গুটিয়ে ফেলা হয়েছে। কালো টাকার সাম্রাজ্য, অস্ত্রের চুক্তি কিংবা অবৈধ ট্রাস্ট—সবকিছুর লিকুইডেশন সম্পন্ন করে কোটি কোটি টাকা আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও এতিমখানায় দান করে দেওয়া হয়েছে। আজ ঢাকার মিডিয়া ও শিল্পজগতে আরিমান সিকদার শুধুই একজন সৎ, প্রখ্যাত ও সফল তরুণ শিল্পপতি।
বিকেলের সোনাঝরা আলো এসে পড়েছিল সিকদার ভিলার বিশাল পেছনের বাগানে। বাগানজুড়ে থরে থরে ফুটে থাকা রক্তকরবী, হাসনাহেনা আর ব্লিডিং হার্ট ফুলগুলোর মিষ্টি সুবাস বাতাসে ভাসছিল।
বাগানের সাদা দোলনায় অলস ভঙ্গিতে বসে ছিল ইমা। ওর গর্ভ এখন পূর্ণাঙ্গ—নয় মাস চলছে। হালকা গোলাপি রঙের একটা নরম ঢিলেঢালা সুতির শাড়িতে ইমাকে দেখতে কোনো স্বর্গের অপসরীর মতো লাগছিল। ফর্সা মুখটাতে গর্ভাবস্থার এক অপূর্ব মিষ্টি প্রভার ছোঁয়া, আর হাঁটাচলা করাও এখন ওর জন্য বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।
হঠাৎ পেছন থেকে দুটো চওড়া ও শক্তিশালী বাহু আলতো করে এসে ইমার গর্ভধারণ করা পেটটাকে আগলে ধরল। ঘাড়ের কাছে ঠান্ডা ঠোঁটের পরম চেনা এক উষ্ণ পরশ পেতেই ইমার মুখে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।
"তুমি এত তাড়াতাড়ি অফিস থেকে চলে এলে?" ইমা মাথাটা সামান্য পেছনে হেলিয়ে আরিমানের দিকে তাকাল।
আরিমান সিকদার এখন আগের সেই কঠোর, চোখ-মুখ থমথমে মাফিয়া লিডার নন। ওর চাহনিতে এখন কেবলই প্রশান্তি আর ভালোবাসা। ওর পরনে ধবধবে সাদা সুতির কার্তার শার্ট আর ক্যাজুয়াল ট্রাউজার, বিশৃঙ্খল চুলগুলো কপালে আলতো করে ছোঁয়াচ্ছে।
"তোর আর আমাদের এই খুদে অতিথিটার টানে চলে এলাম," আরিমান ইমার পাশে দোলনায় জায়গা করে নিয়ে বসে ইমার কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল।
"আজকাল অফিসে মনই বসে না রে ইমু। মনে হয় সব কাজ ফেলে সারাদিন তোর পাশে বসে তোকে আর এই পুচকেটাকে পাহারা দিই।"
ইমা খিলখিল করে হেসে উঠল, "হ্যাঁ! আর বাবা তো দুপুরবেলা ফোন করে তোমার ওপর রেগে অস্থির! বলছেন, ছেলে নাকি এখন বউ আর বাচ্চার চিন্তায় ব্যবসার দিকে নজরই দিচ্ছে না!"
আরিমান ইমার পেটে কান রেখে আলতো করে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, "বলুক! বাবা যা খুশি বলুক। চার বছর তোকে ছাড়া যে নরকে আমি বেঁচে ছিলাম, সেই নিঃসঙ্গতার ক্ষতিপূরণ কি এত সহজে আদায় হয়?"
কথাটা বলেই আরিমান ইমার পেটে ঠোঁট ছোঁয়াল। আর অমনি ভেতর থেকে ছোট প্রাণটা যেন বাবার স্পর্শ পেয়ে এক জোরালো কিপ দিল!
"আহ্! আরিমান, দেখো... দেখো ও আবার লাথি মারল!" ইমা মৃদু হেসে আরিমানের হাতটা সেখানে চেপে ধরল।
"বাপের মতোই জেদি হয়েছে দেখা যাচ্ছে," আরিমান এক পরম তৃপ্তির হাসিতে ঠোঁট বাঁকাল। "বাইরে আসার জন্য আর তর সইছে না ওনার।"
হঠাৎ করেই ইমার মুখের হাসির রেখাটা মিলিয়ে গেল! ওর মুখটা চরম ব্যথায় দুমড়ে-মুচড়ে গেল। ও এক হাতে আরিমানের শার্টের কলার শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
"আহ্... আরিমান!" ইমা কোঁকড়ে উঠে এক তীব্র চিৎকার দিল।
আরিমানের ভেতরের সেই আগের চিরচেনা উৎকণ্ঠা মুহূর্তে জেগে উঠল, ও আকুল হয়ে বলল, "কী হলো ইমু? ব্যথা করছে? খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে?"
"আরিমান... আমার... আমার পেটে খুব তীব্র ব্যথা হচ্ছে! মনে হয়... মনে হয় বাচ্চার সময় হয়ে এসেছে..." ইমার কপাল দিয়ে ঠান্ডা ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে পড়তে লাগল।
আরিমান আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। ও এক ঝটকায় ইমাকে নিজের কোলে তুলে নিল। ওনার বাঘের মতো গর্জন সদৃশ হাঁকে পুরো সিকদার ভিলায় শোরগোল পড়ে গেল!
"মা! বাবা! ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলো! ইমাকে হসপিটালে নিতে হবে।!"
আরিমানের আওয়াজে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল। মাহতাব সিকদার আর ওনার স্ত্রী দৌড়ে বাইরে এলেন। মুহূর্তের মধ্যে সিকদার ভিলার সবচেয়ে দ্রুতগামী গাড়িটি স্কয়ার হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
হাসপাতালের ভিআইপি ব্লকের লেবার রুমের বাইরে আরিমান সিকদার পাগলের মতো পায়চারি করছিলেন। ওনার কপাল ও গাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। যে মানুষটা জীবনের কঠিনতম মুহূর্তে শত শত শত্রুর বন্দুকের সামনে দাঁড়াতে গিয়ে এক চুলও কাঁপেনি, আজ লেবার রুমের ভেতর থেকে আসা স্ত্রীর সামান্য আর্তনাদে ওর হাত দুটো থরথর করে কাঁপছিল।
পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন মাহতাব সিকদার, ওনার স্ত্রী এবং হন্তদন্ত হয়ে আসা ইরফান।
"আরিমান, তুই শান্ত হ ভাই," ইরফান আরিমানের কাঁধে হাত রেখে বোঝানোর চেষ্টা করল। "ঢাকার সেরা ডাক্তাররা ভেতরে আছেন। ইনশাআল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে।"
"ও খুব কষ্ট পাচ্ছে ইরফান..." আরিমান করিডোরের দেয়ালে এক সজোর ঘুষি মেরে নিচু, ভাঙা গলায় বলল। "আমি ওর এই কষ্ট সহ্য করতে পারছি না! আমি ভেতরে যাব!"
"আহা আরিমান! থাম তুই!" মা এসে ছেলের হাত চেপে ধরলেন। "মেয়েদের সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় এই কষ্টটুকু সইতেই হয়। তুই একটু ধৈর্য ধর বাবা।"
ঠিক সেই মুহূর্তে লেবার রুমের ওপরের লাল বাতিটা নিভে গেল এবং ভারী দরজাটা খুলে গেল। বাইরে বেরিয়ে এলেন জ্যেষ্ঠ গাইনি বিশেষজ্ঞ ড. রেহানা। ওনার মুখে এক চিলতে পরম স্বস্তির ও মিষ্টি হাসি।
আরিমান এক লাফে ওনার সামনে গিয়ে দাঁড়াল,
"ডাক্তার! ইমা? ইমা কেমন আছে? ওর কিছু হয়নি তো?"
ডক্টর রেহানা হেসে বললেন, "শান্ত হন আরিমান সাহেব! আপনার স্ত্রী একদম সুস্থ আছেন। আর উনি অত্যন্ত নিরাপদে একটি অসম্ভব ফুটফুটে কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন!"
কন্যাসন্তান!
কথাটা আরিমানের কানে পৌঁছাতেই যেন মনে হলো পুরো পৃথিবী এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেছে। দীর্ঘ চার বছরের পাপ, রক্তপাত, বিরহ আর অশান্তির পর পরম করুণাময় ওনাকে এক খণ্ড স্বর্গ উপহার দিয়েছেন! আরিমানের চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল অনাবিল আনন্দের ধারা।
আরিমান ধীর, সতর্ক পায়ে লেবার রুমের ভেতরে ঢুকল। ঘরের হালকা মিষ্টি আলোয় বিছানায় শুয়ে ছিল ইমা। ওর মুখটা ক্লান্তিতে ফ্যাকাশে হলেও চোখেমুখে এক অপার্থিব তৃপ্তির ছোঁয়া। আর ওর ঠিক পাশে, একখানা নরম গোলাপি তোয়ালেতে পেঁচানো রয়েছে এক ছোট্ট রক্তমাংসের দলা—ওদের অগাধ ভালোবাসার জীবিত দলিল।
আরিমান হাঁটু গেড়ে ইমার বিছানার পাশে বসল। ও পরম ভালোবাসায় ইমার ঘামে ভেজা কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল, তারপর ওর হাতটা নিয়ে নিজের গালের সাথে চেপে ধরল।
"ধন্যবাদ ইমু... আমাকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য, আমার অন্ধকার জীবনে আলো আনার জন্য ধন্যবাদ," আরিমানের গলা কান্নায় বুজে এলো।
ইমা ক্লান্ত কিন্তু এক অপূর্ব সুন্দর হাসি উপহার দিল, "আপনার মেয়েকে কোলে নিন আরিমান..."
আরিমান অত্যন্ত সাবধানে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান কাচের পুতুলটা স্পর্শ করছেন, সেই ছোট্ট নিষ্পাপ কন্যাসন্তানকে নিজের চওড়া বুকের ওপর তুলে নিল। আর ঠিক তখনই, সেই পুচকে শিশুটি চোখ বন্ধ রেখেই ওর বড় শাহাদাত আঙুলটা নিজের ছোট্ট হাতের মুঠোয় শক্ত করে আঁকড়ে ধরল!
আরিমানের চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গিয়ে পড়ল বাচ্চার তুলতুলে গোলাপি গালে। ও পরম স্নেহে বাচ্চার কপালে চুমু খেল।
"ওর নাম কী রাখবেন আরিমান?" ইমা মিহি গলায় জিজ্ঞেস করল।
আরিমান ইমার দিকে তাকাল, ওর চোখে তখন শুধুই ভালোবাসার এক সমুদ্র।
"ওর নাম রাখব... 'আয়াত সিকদার'। আমাদের ভালোবাসার এক অলৌকিক চিহ্ন, যা আমাকে পাপ ও অন্ধকারের সীমানা থেকে আলোর জগতে ফিরিয়ে এনেছে।"
ইমা হেসে ফেলল।
হাসপাতালের জানালার কাচ ভেদ করে তখন ভোরের প্রথম সূর্যরশ্মি এসে পড়ছিল আরিমান, ইমা আর ওদের ছোট্ট আয়াতের ওপর।
সব অন্ধকার, সব রক্তক্ষরণ, আর অতীত অপরাধের সমস্ত সীমানা পেরিয়ে আজ ভালোবাসা পূর্ণতা পেল। আরিমান সিকদার প্রমান করে দিলেন—সত্যিকারের ভালোবাসা একটা মানুষকে অন্ধকার মাফিয়া থেকে এক পরম অনুরাগী স্বামী ও আদর্শ পিতায় রূপান্তরিত করতে পারে।
চলবে.....