“স্যার, এই শয়তানটাই কলেজে আপনার আর নৌশির নামে নোংরা কথা ছড়িয়েছে নৌশিকে কলঙ্কিত করতে। এ আসলে তিন মাস আগে নৌশিকে প্রপোজ করেছিলো। নৌশি রিজেক্ট করায় সেই ক্ষোভে আপনার আর নৌশির মিথ্যা অ্যাফেয়ারের কথা ছড়িয়েছে কলেজে। আবার একটু আগে নৌশিকে নোংরা কথা বলেছে। নোংরা প্রস্তাবও দিয়েছে।”
কথাগুলো বলেই থামে সাবা। কথাগুলো শুনতেই আলভীর মেজাজ মুহূর্তেই চটে যায় অজান্তেই। এতক্ষণ সে ফোনে জরুরি একটা কাজে কথা বলছিল, তাই এখানকার কিছুই শুনতে পায়নি। এখন এখানে আসার পর তানজিম আর আরেকটা ছেলের এমন অবস্থা দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো,
— ওদের এই অবস্থা কেন?
তখনি সাবা কথাগুলো বলে। সাবার কথা শুনে আলভীর রাগে মাথায় আগুন ধরে যায়। দাঁতে দাঁত পিষে তানজিমের মুখে লাথি মেরে বলে,
— নাজায়েজ বাপের নাজায়েজ সন্তান! নোংরা প্রস্তাব দিস কাকে? তোর বাপ বুঝি এভাবেই মেয়েদের এসব প্রস্তাব দিয়ে তোকে জন্ম দিয়েছে? রাস্তায় জন্ম নেওয়া বেজন্মার বাচ্চা, রাস্তার কীট! তোর সাহস কী করে হয় নৌশিকে নোংরা প্রস্তাব দেওয়ার?
কথাটা বলেই আলভী রাগে তানজিমকে লাথি মারতে শুরু অনবরত করে। প্রতিটা লাথির সাথে তার ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ আর ক্রোধ বেরিয়ে আসছে। তখনি একজন স্যার দ্রুত এগিয়ে এসে আলভীকে থামায়। বলে,
— স্যার, আর মারবেন না। এমনিতেই অনেক মার খেয়েছে। বাঁচবে কিনা সন্দেহ!
স্যারের কথায় আলভী থেমে গেল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজের রাগকে সংযত করে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। তারপর রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সাবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— একে এভাবে মেরেছে কে? নৌশিই?
সাবা মাথা নেড়ে বলে,
— না। রুদ্রিক চাচ্চু।
আলভী তানজিমের দিকে তাকিয়ে বলে,
— ভালো করেছে। একে তো পিস পিস করা উচিত।
বলেই আলভী আবার তানজিমকে লাথি মেরে বলে,
— টিসি দিয়ে বের করবো বেজন্মার বাচ্চাকে!
সাবা চুপ করে তাকিয়ে থাকে মাটিতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা তানজিমের দিকে। ঘৃণা আসছে তার। হঠাৎ সাবার মনে পড়ে, নৌশি আর রুদ্রিক বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। তাকে পাঠিয়েছে তার আর নৌশির ব্যাগ নিতে। এবার সাবা দ্রুত বলে,
— স্যার, আমি আসছি।
বলেই ছুট লাগায় সাবা। দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উঠে ক্লাসরুমে যায়। সেখান থেকে নিজের আর নৌশির ব্যাগ নিয়ে আবার দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে৷ তারপর দ্রুত পায়ে কলেজের বাইরে এসে দেখে, রুদ্রিক আর নৌশি দাঁড়িয়ে আছে। নৌশির হাতে একটা ঝালমুড়ি। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেটা খাচ্ছে। আরেকটা ঝালমুড়ির প্যাকেট রুদ্রিকের হাতে। সাবা কাছে গিয়ে নৌশির ব্যাগটা এগিয়ে দিতেই রুদ্রিক হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা নিয়ে নেয়। নৌশি রুদ্রিকের হাত থেকে অন্য ঝালমুড়ির প্যাকেটটা নিয়ে সাবার হাতে দিয়ে বলে,
— নে, তোর এটা।
রুদ্রিকের চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তি। এই রোদে রাস্তায় দাড়িয়ে থাকতে বিরক্ত লাগছে। রুদ্রিক নৌশির দিকে তাকিয়ে বলে,
— চল। গাড়িতে।
সাবা এবার হাসি দিয়ে নৌশিকে বলে,
— আচ্ছা, বাই।
নৌশি কপাল কুঁচকে বলে,
— বাই মানে? তুই আমাদের সঙ্গে চল। তোকে নামিয়ে দিয়ে যাবো বাসায়।
রুদ্রিক এবার বাঁকা চোখে তাকায় নৌশির দিকে। কিন্তু কিছু বলে না। মনে মনে অবশ্য তার বিরক্তির শেষ নেই।পার্সোনাল চাকর মনে করে নিয়েছে নাকি? ঝালমুড়ি হাতে দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখে, কলেজ ব্যাগটাও টানাচ্ছে তাকে দিয়ে! আবার এখন বান্ধবীকে নামিয়ে দিয়ে আসতে হবে বাড়িতে! সাবা রুদ্রিকের মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝে যায়, রুদ্রিক বিরক্ত হচ্ছে। সাবা ইশারায় নৌশিকে সেটা বোঝানোর চেষ্টা করে। নৌশিও সাবার ইশারা অনুসরণ করে রুদ্রিকের চেহারার বিরক্তি দেখে। তারপর আবার সাবার দিকে ফিরে ইশারায় বুঝায়,
— কিছু হবে না।
তারপর নৌশি সাবার হাত ধরে রুদ্রিককে পেছনে ফেলেই সামনে এগিয়ে যায়। দুজনকে এগিয়ে যেতে দেখে রুদ্রিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেও সামনে এগিয়ে যায়। নৌশি আর সাবা এসে গাড়ির সামনে দাঁড়ায়। রুদ্রিক পকেট থেকে গাড়ির চাবি বের করে গাড়ির পেছনের দরজা খুলে দেয়। প্রথমে সাবা গাড়িতে উঠে তারপর নৌশি পেছনে উঠতে নিলে রুদ্রিক পেছন থেকে নৌশির হাত ধরে তাকে থামায়। নৌশি ফিরে তাকাতেই রুদ্রিক গমগমে গলায় বলে,
— আমাকে কি তোমার ড্রাইভার মনে হয়? দুজন পেছনে বসবে আর আমি সামনে গাড়ি চালাবো!
নৌশি ফট করে উত্তর দেয়,
— হ্যাঁ, ড্রাইভারই তো আপনি। আমার পার্সোনাল ড্রাইভার।
রুদ্রিক এমন একটা লুক দেয়, যেন নৌশিকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— চুপচাপ সামনে গিয়ে বসো।
নৌশি মুখ বাঁকিয়ে সামনে এসে ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে গিয়ে বসে। রুদ্রিকও এবার ড্রাইভিং সিটে বসে। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ইঞ্জিন চালু করে। তারপর নৌশির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— লোকেশন?
নৌশি বলে,
— মোহাম্মদপুর!
গাড়ি চলতে শুরু করে। কিছুক্ষণ পর রুদ্রিক আয়নায় পেছনের সিটে বসে থাকা সাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
— ক্লাসে আসলে এদিক-সেদিক না গিয়ে ক্লাসে বসে থাকবে দুজনে। তোমরা ক্লাস করতে এসেছো, কলেজ ঘুরতে না। ক্লাস করবে ভদ্র মেয়ের মতো। এদিক সেদিক যাওয়ার কোনো দরকার নেই।
নৌশি আর সাবা দুজনেই একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করে। এবং বুঝে যায়, রুদ্রিক আসলে কালকে আলভী স্যার আর নৌশির বন্ধ ক্লাসরুমে আটকে পড়া নিয়ে বলছে। সাবা এবার দৃষ্টি সরিয়ে রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ে। একটু আগে রুদ্রিকের যে ভয়ংকর রূপ দেখেছে তাতেই বেচারির অবস্থা টাইট হয়ে গেছে। তাই অবাধ্যতা করে না। রুদ্রিক আর কোনো কথা বাড়ায় না। সে আবার গাড়ি চালানোর দিকে মনোযোগ দেয়। কিন্তু গাড়িটা নীরব রইল না। কারণ নৌশি যেখানে আছে, সেখানকার পরিবেশ নীরব থাকা অসম্ভব। আর সঙ্গে যদি সাবা থাকে, তাহলে তো কথার ননস্টপ বন্যা চলবেই!
দুজন ঝালমুড়ি খেতে খেতে একটার পর একটা কথা বলে যাচ্ছে। এক বিষয় থেকে আরেক বিষয়। আবার আরেক বিষয় থেকে সম্পূর্ণ অন্য কোনো বিষয়। রুদ্রিক কিছুতেই বুঝতে পারছে না, মানুষ কীভাবে এত ফালতু কথা বলতে পারে! নৌশি আর সাবার কথার কোনো আগামাথা নেই। এদের কথার ধরন এমন যেমন গরু আকাশে উড়ছে।এমনকি ওরা নিজেরাই বুঝতে পারছে না, ওরা কী নিয়ে কথা বলছে কিন্তু মুখ থামার কোনো নাম নেই। একটানা বকবক করতে করতে ওরা দুজন রুদ্রিকের কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে। রুদ্রিক মাঝে মাঝে বিরক্ত চোখে ওদের দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু কিছু বলছে না।
প্রায় এক ঘণ্টা পথ চলার পর অবশেষে ওরা সাবার বাড়ির সামনে পৌঁছায়। সাবাকে সেখানে নামিয়ে দিয়ে রুদ্রিক গাড়িটা ইউটার্ন নেয়। গাড়ি আবার চলতে শুরু করে। এবার গাড়িতে শুধু রুদ্রিক আর নৌশি। কিছুক্ষণ পর রুদ্রিক খেয়াল করে, নৌশি একটু পরপরই তার দিকে তাকাচ্ছে আর মুচকি হাসছে। আবার রুদ্রিক দেখে নিবে তাই দ্রুত অন্যদিকে লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। প্রথমে রুদ্রিক বিষয়টা এড়িয়ে যায়। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ এভাবে চলার পর রুদ্রিকের কৌতূহল হয়। রুদ্রিক আন্দাজ করে, নৌশি আসলে কোন কারণে খুশি আবার লজ্জাও পাচ্ছে।
রুদ্রিক গাড়ি চালাতে চালাতেই গম্ভীর গলায় বলে,
— আজ কলেজের বিষয়টা নিয়ে অন্য কিছু ভেবো না। তুমি আমার জন্য এতো ইম্পর্ট্যান্ট না যে আমি কাজ ফেলে কলেজে এসে কলেজে মারামারি করবো। তোমাদের প্রিন্সিপাল আমাকে এন্ড পাপাকে চিনে। ওই ছেলেগুলো আমার বউকে বাজে কথা বলে পার পেয়ে যাবে তাই নিজের সম্মান বাঁচাতে ওই ছেলে দুটোকে মেরেছি।
কথাটা বলেই রুদ্রিক এবার নৌশির দিকে তাকায়। নৌশির মুখ একদম স্বাভাবিক। রুদ্রিক কিছুক্ষণ নৌশির দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,
— বুঝতে পেরেছো?
নৌশি কয়েক মুহূর্ত রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দাঁত কেলিয়ে হেসে বলে,
— যেটা বুঝাতে চেয়েছেন সেটা বুঝিনি আর যেটা বুঝাতে চাননি সেটা বুঝে গেছি।
রুদ্রিক ভ্রু তুলে তাকায়।
— কী বুঝেছো? আর কী বুঝোনি?
নৌশি উত্তর দেয় না। সামনে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবে জিজ্ঞেস করে,
— কোথায় যাচ্ছেন?
রুদ্রিক নৌশির দিকে তাকিয়ে বলে,
— তোমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে হসপিটালে যাবো।
নৌশি সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠে বলে,
— এই, আমি বাসায় যাবো না। আমি হসপিটালে যাবো।
রুদ্রিক স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বলে,
— না। তুমি ডিস্টার্ব করো!
নৌশি রেগে বলে,
— আমাকে হসপিটালে না নিয়ে গেলে আরো বেশি ডিস্টার্ব করবো! আমি বাসা থেকে ঠিকই চলে যাবো হসপিটালে, বলে দিলাম।
রুদ্রিক এবার আর কোনো উত্তর দেয় না। নৌশি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর আবার জিজ্ঞেস করে,
— আপনি কি আমাকে বাসায় দিয়ে আসছেন?
— হুম।
নৌশি বিরক্তি নিয়ে বলে,
— শুনেননি আপনি? আমি বলেছি, আমি বাসায় যাবো না।
— হসপিটালে গিয়ে কী করবে?
— আমার ইচ্ছে, আমি যাবো। আর আপনার আমাকে নিয়ে যেতেই হবে। নাহলে আমি মুখের ভেতর হাত ঢুকিয়ে আপনার ওপর বমি করে দিবো!
রুদ্রিক এমন উদ্ভট কথা শুনে বাঁকা চোখে নৌশির দিকে তাকায়। এই মেয়েটা আসলে কী? বুদ্ধি বলে কি কিছু নেই?কী না কী বলে বসে! মুখের ভেতর হাত ঢুকিয়ে তার ওপর বমি করে দেবে! এটাও কি তাকে শুনতে হলো? রুদ্রিকের এমন অদ্ভুত দৃষ্টি দেখে নৌশি সত্যিই মুখের ভেতর হাত ঢোকানোর প্রস্তুতি নিয়ে বলে,
— আমি কিন্তু মুখের ভেতর হাত ঢুকিয়ে বমি করে দিচ্ছি আপনার ওপর?
রুদ্রিক আর তর্ক করে না। সামান্য বিরক্ত গলায় বলে,
— নিয়ে যাচ্ছি তো।
নৌশির মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠে।
— এই তো ঠিক আছে।
হাসিটা আড়ালে খেয়াল করে রুদ্রিক। হসপিটালে নিয়ে যাওয়ায় এত সুন্দর হাসি? কিছুক্ষণ পর রুদ্রিকের গাড়ি এসে থামে হসপিটালের সামনে। রুদ্রিক গাড়ি থেকে নেমে ভেতরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই পেছন থেকে নৌশি ডাক দেয়,
— ব্যাগ নিবে কে?
রুদ্রিক থেমে পেছনে তাকায়।
— কিসের ব্যাগ?
— আমার কলেজ ব্যাগ।
রুদ্রিক অবাক হয়ে বলে,
— ওটা তোমার। আর অফকোর্স তুমিই নিবে।
নৌশি গাল ফুলিয়ে বলে,
— সবসময় তো ওটা আমিই বহন করি। আজ আপনি নিন।
রুদ্রিক অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— আশ্চর্য! তোমার ব্যাগ অন্য কে বহন করবে!
— আপনি করবেন। আপনি আমার স্বামী। আমার ব্যাগ বহন করার দায়িত্ব আপনারই!
রুদ্রিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর বাধ্য মানুষের মতো ফিরে এসে গাড়ির দরজা খুলে নৌশির কলেজ ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিতে নিতে নিচু গলায় বিরবির করে বলে,
— স্বামী নাকি জোরোকা গোলাম, আল্লাহই জানেন।
তারপর হাঁটা ধরে রুদ্রিক। পেছন পেছন নৌশিও হাঁটতে শুরু করে। রুদ্রিক নৌশিকে নিয়ে নিজের কেবিনের ভেতরে ঢুকে। নৌশির ব্যাগটা চেয়ারের ওপর রেখে বলে,
— বসো। আমি চেঞ্জ করে আসছি।
বলেই রুদ্রিক ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। কিছুক্ষণ পর হসপিটালের ড্রেস পরে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে রুদ্রিক। রুদ্রিককে বের হতে দেখে নৌশি কিছুক্ষণ ভাবুক হয়ে রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর হঠাৎ প্রশ্ন করে,
— আপনার কনসালটেশন ফি এত কেন? ১৫,০০০ টাকা?!
রুদ্রিক স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
— আমার ডিগ্রির জন্য।
নৌশির ভ্রু কুঁচকে যায়।
— এত টাকা ফি হলে গরিব এবং মধ্যবিত্তরা চিকিৎসা করাবে কীভাবে? এত টাকা দেওয়া সম্ভব নাকি?!
রুদ্রিক নির্লিপ্ত গলায় বলে,
— আমি গরিবদের কনসালটেশন দেওয়ার জন্য না। আর না গরিবদের জন্য এই হসপিটাল। ওদের জন্য পাবলিক হসপিটাল আছে।
কথাটা নৌশির ভালো লাগে না। নৌশি গম্ভীর গলায় বলে,
— যাদের এত সামর্থ্য নেই কিংবা মধ্যবিত্তরা ভালো চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার নেই? যাদের টাকা আছে, কেবল তারাই ভালো চিকিৎসা এবং সব সুবিধা পেতে পারবে?
থেমে নৌশি মনমরা গলায় বলে,
— আপনি জানেন, আমার আব্বুর যখন হার্টে সমস্যা হয়? তখন সরকারি হসপিটালে নিয়ে গেছিলাম। মনে হচ্ছিলো ওরা চিকিৎসা দিচ্ছে না, বরং দানের কিছু দিচ্ছে।সঠিকভাবে চিকিৎসাও করেনি! তারপর আপনার কাছে ফ্রিতে......
কথাটা বলতে বলতেই হঠাৎ থেমে যায় নৌশি। বাকি কথাটা আর মুখে আনে না। রুদ্রিকও এড়িয়ে যায় না বিষয়টা। নৌশি কথা সম্পূর্ণ না করায় জিজ্ঞেস করে,
— কী?
নৌশি মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে বলে,
— কিছু না। আমি একটু আসছি।
রুদ্রিক থমথমে মুখে বলে,
— এসেছো আর টইটই করতে চলে যাচ্ছো?
— আমি কি আপনার মতো শামুক যে এক জায়গায় খাপ মেরে বসে থাকবো? যাচ্ছি টইটই করতে।
রুদ্রিক ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
— হ্যাঁ, তুমি তো ব্যাঙ! এক জায়গায় বসে থাকতে পারো না। সারাক্ষণ লাফানো লাগে!
নৌশি মাথা নেড়ে বলে,
— হ্যাঁ, ব্যাঙই। এখন যাচ্ছি আমি।
— না, পরে সবাই বলবে ডক্টর রুদ্রিকের বউটা কলেজ বাঙ্ক দিয়ে এসে পুরো হসপিটাল টইটই করে ঘুরে।
— তো আপনি তখন ওদের শুধরে দিবেন। বলবেন, আমার বউ টইটই হসপিটালে দৌড়েও বেড়ায়। ওরা কেন শুধু ঘুরে বেড়ানোর কথা বলে।
রুদ্রিক ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— তুমি মানুষ হওনি!
নৌশি ভীষণ সিরিয়াস ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে,
— তো এখন কি আমি ডাইনোসর?
রুদ্রিকের ইচ্ছে করে নিজের কপাল নিজে দেয়ালে বাড়ি মারতে। সে কেন যায় এই ফাজিল মেয়ের সাথে কথা বলতে? রুদ্রিক ধৈর্যহারা হয়ে হাত নেড়ে বলে,
— যাও, আমার চোখের সামনে থেকে যাও তুমি।
— ওটা তো আমি এমনিও চলে যাচ্ছি।
বলেই ভেংচি কেটে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায় নৌশি।রুদ্রিক কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের কাজে মন দেয়। এদিকে নৌশি কেবিন থেকে বেরিয়ে লিফটের কাছে এসে দাঁড়ায়।
গতকাল হসপিটালে এসে এক থেকে সাততলা পর্যন্ত প্রায় প্রতিটা কোনা-কানাচি ঘুরে দেখেছে। রুদ্রিকের কেবিন তৃতীয় তলায়। আর পুরো বিল্ডিং মোট বারো তলা।
নৌশি এবার ঠিক করে, আজ আটতলায় যাবে। নৌশি শুনেছে, আটতলায় কিডনির ডাক্তাররা এবং কিডনির রোগীরা থাকে। লিফটে উঠে নৌশি আটতলায় চলে আসে।
লিফট থেকে বেরিয়ে নৌশি এদিক সেদিক হাঁটতে থাকে। আর দেখতে থাকে চারপাশ। হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ নৌশির চোখে পড়ে, একটু দূরে একটা বেঞ্চে একটা ২৫-২৬ বছর বয়সী মেয়ে বসে কাঁদছে। নৌশির কৌতূহল হয়। কী কারণে মেয়েটা এভাবে কাঁদছে? নৌশি ধীরে ধীরে মেয়েটার দিকে এগিয়ে যায়।
নৌশি মেয়েটার কাছে গিয়ে নরম স্বরে জিজ্ঞেস করে,
— কাঁদছেন কেন আপনি?
মেয়েটা এতক্ষন মাথা নুইয়ে কাঁদছিলো। হঠাৎ কারো প্রশ্ন শুনে সে চোখ তুলে তাকায়। তারপর নৌশিকে দেখেই আবার কেঁদে উঠে। কাঁদতে কাঁদতে বলে,
— আমার হাসবেন্ডের দুটো কিডনি ড্যামেজ! কিডনি ডোনার পাচ্ছি না।
নৌশির মুখটা মলিন হয়ে আসে। মায়া হয় মেয়েটার জন্য। নৌশি মেয়েটাড পাশে বসে। মেয়েটা আবার কান্নাজড়িত গলায় বলে,
— একজনকে পেয়েছিলাম। প্রথমে রাজি হয়েছিল, কিন্তু পরে মানা করে দেয়। কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না ডোনার।
নৌশি কিছুক্ষণ চুপ করে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে কিছু একটা ভাবে। তারপর নরম স্বরে বলে,
— আচ্ছা, কাঁদবেন না। আমি দিবো কিডনি।
মেয়েটা যেন কথাটা বিশ্বাসই করতে পারে না। সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে নৌশির দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে,
— সত্যি বলছেন? আপনি সত্যিই আমার হাসবেন্ডকে কিডনি দিবেন? আপনি যত টাকা চাইবেন দিবো।
নৌশি একটু হকচকিয়ে গিয়ে বলে,
— আমি দিবো না। আমার হাসবেন্ড দিবে।
তারপর থেমে জিজ্ঞেস করে,
— আপনি কত টাকা দিবেন?
— আপনি যত চাইবেন।
নৌশি একটু ভেবে বলে,
— ৩০ লাখ?
মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যায়।
— কোনো সমস্যা নেই। আমি রাজি।
নৌশির মুখ হা হয়ে যায়। ত্রিশ লাখ টাকা! সত্যিই ত্রিশ লাখ টাকা দেবে? খুশিতে নৌশির মনটা লাফিয়ে উঠে।
নৌশির পা মাটিতে থাকছে না। নৌশি চটজলদি বলে উঠে,
— চলুন, আপনাকে আমার স্বামীর সাথে কথা বলাই।
মেয়েটা রাজি হয়। সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাড়ায়।
— জি, চলুন।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করে। হাঁটতে হাঁটতেই নৌশি মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করে,
— আপনার নাম?
মেয়েটা নম্র স্বরে বলে,
— মাহিমা।
কিছুক্ষণ পর নৌশি মাহিমাকে নিয়ে রুদ্রিকের কেবিনের কাছে এসে ভেতরে ঢুকতে নিলে আরাভ মাহিমাকে থামায়। নৌশি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠে,
— উনি আমার সাথে যাচ্ছে। আমার পরিচিত।
আরাভ মাথা নেড়ে বলে,
— ওকে, ম্যাম।
নৌশি এবার মাহিমাকে সাথে করে রুদ্রিকের কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে। রুদ্রিক তখন একজন পেশেন্টের সাথে কথা বলছিল। নৌশির এমন হুট করে ঢুকে পড়ায় পেশেন্টের সামনে রুদ্রিক কিছুটা বিব্রত হয়।
তার ওপর সঙ্গে একজন অপরিচিত মহিলাও এসেছে।
তবুও রুদ্রিক সেদিকে বেশি গুরুত্ব না দিয়ে আবার পেশেন্টের দিকে মনোযোগ দেয়। পেশেন্টের সমস্যার কথা জিজ্ঞেস করতে থাকে। নৌশি মাহিমাকে নিয়ে গিয়ে সাইডে রাখা সোফায় বসে। মাহিমা সামনে বসে থাকা পেশেন্টটার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে জিজ্ঞেস করে,
— ওটা আপনার স্বামী?
নৌশি মাহিমার ইশারা অনুসরণ করে পেশেন্টটার দিকে তাকায়। পোশাক আশাকে বেশ আভিজাত্যপূর্ণ। তবে বয়স আনুমানিক চল্লিশের কাছাকাছি হবে। নৌশি নাক কুঁচকে আস্তে করে বলে,
— আমার মতো যুয়ান সুন্দরীর অমন বুড়া হাসবেন্ড হবে?
তারপর আঙুল তুলে রুদ্রিককে দেখিয়ে বলে,
— ওই সুন্দরটা আমার।
মাহিমা এবার অবাক হয়ে নৌশির দিকে তাকায়।
— ডক্টর রুদ্রিক রওনক আপনার স্বামী?
নৌশি হাসি দিয়ে মাথা নেড়ে বলে,
— হ্যাঁ।
মাহিমা বিস্মিত কন্ঠে বলে
— উনি কেন কিডনি দিবেন? ওনার তো টাকা-পয়সার কমতি নেই।
নৌশি নির্বিকার ভাবে বলে,
— ওনার কমতি নেই আর আমার তো একেবারেই নেই টাকা-পয়সা। উনি দিবে। আপনি চিন্তা করবেন না। নিয়ে দিবো আমি।
মাহিমা পুরোপুরি বোকা বনে গেলো। কিছুই বুঝতে পারছে না। তবুও চুপচাপ বসে রইল। কিছুক্ষণ পর রুদ্রিকের পেশেন্ট চলে যায়। নৌশি তাড়াতাড়ি মাহিমাকে নিয়ে রুদ্রিকের সামনের চেয়ার দুটোতে গিয়ে বসে। রুদ্রিক ভাবে, হয়তো মেয়েটা কোনো পেশেন্ট। তাই যথেষ্ট ভদ্রভাবে বলে,
— জি, বলুন। আপনার সমস্যা?
মাহিমা কিছু বলার আগেই নৌশি বলে উঠে,
— ওনার আপনার একটা কিডনি লাগবে!
নৌশির কথা শুনে রুদ্রিক হতভম্ব হয়ে যায়। তারপর মাহিমার দিকে তাকিয়ে বলে,
— সরি?
মাহিমা এবার সামান্য অপ্রস্তুত হয়ে সবটা খুলে বলে,
— আসলে আমার হাসবেন্ডের দুটো কিডনি ড্যামেজ। আমি বসে কাঁদছিলাম। তখন আপনার স্ত্রী এসে আমাকে বললো, আপনি নাকি একটা কিডনি দিবেন আমার হাসবেন্ডকে! ৩০ লাখ টাকার কথা বলেছেন। আমি বলেছি, আমার কোনো আপত্তি নেই।
এমন কথা শুনে রুদ্রিক কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। দৃষ্টি ফেরায় নৌশির দিকে। নৌশি ঢোক গিলে মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নেয়। রুদ্রিক এবার নিজেকে সামলে মাহিমার দিকে তাকিয়ে বলে,
— এক্সকিউজ মি, মিস। আপনি একটু বাইরে যান। আমি আমার ওয়াইফের সঙ্গে কথা বলবো।
মাহিমা রুদ্রিকের কথামতো উঠে চলে যেতে নেয় তখনি নৌশি তাকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে আস্তে করে বলে,
— আপনি চিন্তা করবেন না। আমি ওনার থেকে আপনাকে কিডনি নিয়ে দিবো।
মাহিমা একবার রুদ্রিকের দিকে তাকায় তারপর আর কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়। দরজা বন্ধ হতেই রুদ্রিকের দৃষ্টি বদলে যায়। রুদ্রিক রাগী চোখে তাকিয়ে বলে,
— আমি তোমাকে বলেছি আমি আমার কিডনি দিবো?
নৌশি একটু নরম গলায় বলে,
— এমন করে না। মানুষকে সাহায্য করা উচিত।
— সাহায্য করার এত ইচ্ছে থাকলে নিজের কিডনি দাও।
নৌশি এবার চোখ পাকিয়ে বলে,
— আমি একটা বাচ্চা মেয়ে। ১৮ বছর হয়নি। আপনি আমাকে কিডনি দেওয়ার প্ররোচনা দিচ্ছেন। এর জন্য আপনার জেল হতে পারে। আমি মামলা দিতে পারি আপনার নামে।
রুদ্রিকও চোখ গরম করে তাকিয়ে বলে,
— কেস তো আমিও দিতে পারি তোমার নামে। তুমি আমাকে কিডনি দিতে জোর করছো!
নৌশি ঠোঁট বাকিয়ে বলে,
— আমি আপনার বউ। আপনার অর্ধাঙ্গিনী। মানে আপনার অর্ধেক অঙ্গ। আর আপনার দুইটা কিডনির অর্ধেক, অর্থাৎ একটা কিডনির ওপর আমার ফুল অধিকার আছে। তো একটা কিডনি দিয়ে দেওয়ার জন্য জোর করার অধিকার আমার আছে।
রুদ্রিক কিছুক্ষণ নৌশির দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— লজ্জা করে না? ৩০ লাখ টাকার জন্য নিজের হাসবেন্ডের কিডনি বিক্রি করে দেওয়ার ডিল করেছো?
নৌশি সামান্য গম্ভীর হয়ে বলে,
— আপনি বুঝার চেষ্টা করুন। যার যতদিন হায়াত আছে, ততদিনই বাঁচবে। একটা কিডনি, দুটো কিডনি কিছু আসে যায় না।
রুদ্রিক এবার এমন একটা লুক দেয় নৌশিকে, যেন আর একবার কথা বললেই সত্যিই তাকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। রুদ্রিকের সেই দৃষ্টি দেখে নৌশির মুখটা মলিন হয়ে যায়। নৌশি একটু মন খারাপ করে বলে,
— আপনি কাজটা ঠিক করছেন না। দিয়ে দিন না একটা কিডনি।
রুদ্রিক কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— তোমাকে যদি আর কখনো এখানে নিয়ে আসছি!
নৌশি সঙ্গে সঙ্গে ভেংচি কেটে বলে,
— নিয়ে আসবেন না। আমি একা এসে পড়বো।
চলবে?
#তবুও_তোমার_প্রেমে_আমি_পড়েছি
#লেখনীতেঃ_অধরা_মিনহা
#পর্ব_৯ [ শেষাংশ ]