“কলেজ বাঙ্ক দিয়ে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ডেটে যাচ্ছো? কয়টা বয়ফ্রেন্ড? দেখতে তো সুন্দরই! কমপক্ষে ছয়-সাতটা তো আছেই? নাকি তারও বেশি? আজকালকার কলেজপড়ুয়া মেয়েগুলো কলেজ বাঙ্ক দিয়ে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ডেটে যায়। এদিকে মা-বাবা ভাবে, মেয়ে বুঝি কলেজে বসে মন দিয়ে পড়াশোনা করছে!”
প্রতিটা শব্দের ইঙ্গিতই নৌশিকে লক্ষ্য করে ছুড়ে দিচ্ছে আলভী। একটু আগে কলেজের দেয়াল টপকে পালানোর চেষ্টা করে নৌশি আর সাবা। দুজনের উদ্দেশ্য ছিল কলেজ বাঙ্ক দেওয়া। কিন্তু দেয়াল টপকে নামার আগেই কোথা থেকে যেন আলভী এসে হাজির হয়ে দুজনকে ধরে ফেলে।তারপর দুজনকে সামনে দাঁড় করিয়ে এমন বিশ্রী কথাগুলোই বলে বসে আলভী। আলভীর কথাগুলো শুনতেই নৌশির গা জ্বলে উঠে। চোখেমুখে মুহূর্তেই ফুটে উঠে রাগের ছাপ।
নিজেকে সামলে নিয়ে নৌশি কড়া গলায় বলে উঠে,
— আপনি কি ভুলে যাচ্ছেন আপনি আমাদের শিক্ষক?
আলভী নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দেয়,
— না, একদমই না।
নৌশি তীক্ষ্ণ গলায় বলে,
— কিন্তু আপনার কথাবার্তায় তো একদমই শিক্ষক মনে হচ্ছে না।
আলভীর চোখে এবার কঠোরতা ফুটে উঠে। শক্ত গলায় বলে,
— শিক্ষক লাগছে না? এক্ষুনি শিক্ষক মনে করাচ্ছি। চল, দুজন প্রিন্সিপালের কাছে!
আলভীর এমন কথায় নৌশি একটুও ভয় পায় না। পিছিয়েও যায় না। সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা জবাব দেয়,
— হ্যাঁ, চলুন। সেখানে গিয়ে আমিও বলবো আপনি যে আমাদেকে এসব কুরুচিপূর্ণ কথাগুলো বলেছেন!
আলভী থমকে তাকায়।
— ব্ল্যাকমেইল করছো?
নৌশি এবার হেসে দুই হাত বুকে গুঁজে বলে,
— না। দেখুন, আপনি আমাদের প্রিন্সিপালের কাছে নিয়ে গেলে কী হবে? স্যার বকাঝকা করবেন? বড়জোর গার্ডিয়ান ডাকবেন? কিন্তু একবার যদি কলেজে ছড়িয়ে যায় যে আপনি আপনার স্টুডেন্টকে বলেছেন, বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ডেটে যাচ্ছে কিংবা বয়ফ্রেন্ড কয়টা সেটা জানতে চেয়েছেন, তখন পুরো কলেজে আপনার ইজ্জতটা কোথায় থাকবে?
নৌশি একটু থেমে বলে,
— হ্যাঁ, বড়জোর সামনাসামনি সবাই আপনাকে ভয় পাবে। কিন্তু পেছনে? পেছনে তো ঠিকই আপনার চরিত্র নিয়ে সন্দেহ করবে!
আলভী দাঁতে দাঁত পিষে রাগ সামলাতে সামলাতে বলে,
— নিজেকে খুব স্মার্ট ভাবো!
নৌশি সঙ্গে সঙ্গে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে,
— অবশ্যই। যেটা আমি, সেটা ভাবব না কেন?
আলভীর মুখ আরো শক্ত হয়ে যায়। বলে,
— তুমি জানো, তুমি কাজটা ভুল করেছো! এর জন্য পস্তাবে।
নৌশি হেসে বলে,
— ভুলটা আমার থেকে বেশি আপনিই করেছেন। এখন হয়তো আপনার পস্তানিও হচ্ছে আমাকে ওসব বলার জন্য, তাই না?
পাশে দাঁড়িয়ে সাবা এতক্ষণ নীরব দর্শক হয়ে দুজনের টেক্কাটেক্কি ঝগড়া দেখছে। কেউ কারোর থেকে কোনো অংশে কম না। একজনের কথা শেষ হওয়ার আগেই আরেকজন জবাব দিচ্ছে। এমন টেক্কা-টেক্কি লড়াইয়ে সাবার আসলে কিছুই বলার নেই। সে শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে দুজনের বাকযুদ্ধ দেখছে। আলভী শেষ পর্যন্ত নিজের অপমানটা গিলে ফেলে। রাগ নিয়ন্ত্রণে এনে ঠোঁটে জোর করে একটা হাসি ফুটিয়ে বলে,
— ভালো। এগুলো আমার মনে থাকবে। এন্ড এই কথাগুলোর জন্য তুমি রিগ্রেট করবে।
কথাটা বলেই আলভী চলে যেতে নেয় কিন্তু কয়েক পা এগোতেই পেছন থেকে নৌশির কণ্ঠ ভেসে আসে,
— স্যার!
আলভী থামে কিন্তু ঘুরে না। নৌশি এবার দৃঢ় কন্ঠে বলে,
— আরেকটা জিনিস মনে রাখবেন। আমি যেমনই হই না কেন, আমি চরিত্রহীন না। কখনো কোনো ছেলে বলতে পারবে না যে তাদেরকে আমি চান্স দিয়েছি। এই নৌশি অসভ্য, বেয়াদব, ফাজিল, গালিবাজ সব হতে পারে। কিন্তু চরিত্রে এক বিন্দু পরিমাণ গড়বড় নেই। তাই আপনি আমার চরিত্র নিয়ে বলে ভুল করেছেন। এটাতে কোনো ছাড় নেই।
কথাগুলো শুনে আলভী কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।কিন্তু প্রতিত্তোরে একটা শব্দও বলে না। অপমানটা গিলে নিয়ে চুপচাপ চলে যায়। আলভী চোখের আড়াল হতেই সাবা কপালে ভাঁজ ফেলে দুশ্চিন্তা ভরা কন্ঠে বলে,
— আমাদের কপালে এমন শনি লাগলো কেন দোস্ত? যেদিকে যাচ্ছি মারা খাচ্ছি। মারা খেতে খেতে এমন অবস্থা হয়েছে, ভাত খাওয়া লাগে না, মারা খেয়েই পেট ফুল!
নৌশি এবার সাবার পেটে আস্তে একটা ঘুষি মেরে বলে,
— তাহলে তোর টিফিনটা আজকে আমার। আমার পেটে অনেক জায়গা। মারাও খেয়ে আরো অনেক কিছু খাওয়ার জায়গা আছে।
সাবা বিরক্ত হয়ে বলে,
— দোস্ত, মজা নিচ্ছিস? তুই বুঝতে পারছিস আলভী স্যার আমাদের হুমকি দিয়ে গেছে!
নৌশি বিষয়টাকে পাত্তাই দেয় না। বলে,
— উড়িয়ে দে। যা হওয়ার হবে। চিল মুডে থাক।
কথাটা বলেই দুজন সামনে এগিয়ে যায়। উদ্দেশ্য ক্লাসরুম। কিছুক্ষণ পর দুজন ক্লাসে এসে পৌঁছায়। এখন ইংরেজি ক্লাস আর ক্লাসটা নেবে আলভী। একটু পরেই আলভী ক্লাসে ঢুকে। আলভী ক্লাসে ঢুকতেই নৌশি এবং সাবা অতি ভদ্রতার সঙ্গে দাঁড়িয়ে যায়। আলভীও কোনো কথা না বাড়িয়ে তাদের বসতে বলে। দুজনও চুপচাপ বসে পড়ে। আজ নৌশি আর সাবা আলভীকে তাদের দোষ ধরার কোনো সুযোগ দেয় না।
পুরো পঁয়তাল্লিশ মিনিটের ক্লাসে দুজন এমনভাবে ভদ্র হয়ে রইল, যেন তাদের চেয়ে শান্ত-শিষ্ট ছাত্রী এই কলেজে আর দ্বিতীয়টি নেই। ইচ্ছে করেই তারা এমন করেছে কারণ দুজনেই জানে, আলভী সুযোগ খুঁজবে। ক্লাসের মাঝখানে তাদের কোনো ভুল ধরতে পারলেই আগের অপমানের শোধ নেওয়ার চেষ্টা করবে আলভী। কিন্তু আজ নৌশি আর সাবা তাকে সেই সুযোগটুকুও দেয় না। শেষ পর্যন্ত পঁয়তাল্লিশ মিনিটের ক্লাস শেষ হয়। আলভী ক্লাস শেষ করে বেরিয়ে যায়। নৌশি আর সাবাও আলভীর পেছন পেছন ক্লাস থেকে বের হয়।
তারপর বারান্দার জানালা দিয়ে ক্যাম্পাসে দৃষ্টিপাত করে। একটুপর দেখে, আলভী ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে হেঁটে কলেজের বাইরে চলে যায়। নৌশি এবার সাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
— চল।
— কোথায়?
সাবার প্রশ্নের উত্তরে নৌশি একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
— দেওয়াল টপকে কলেজ পালাবো!
— না দোস্ত, আজ আর না। এমনিতেই আলভী স্যার একটু আগে আমাদের ধরেছে। আজ ফুল ক্লাস করেই যাবো!
নৌশি কথাটা শুনে বিরক্ত হয়। বলে,
— আলভী স্যার তোর চোখের সামনে দিয়ে গেছে বলদের বদল!
— থাকুক না! আজ ফুল ক্লাস করেই যাই।
নৌশি আর সাবার সাথে কথা বাড়ায় না।
— না। আমি ক্লাস করবো না। আমি গেলাম। তুই থাকলে থাক।
কথাটা বলেই নৌশি ক্লাসরুমে চলে যায়। নিজের ব্যাগটা তুলে নেয় কাঁধে। সাবা কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ক্লাসে এসে নিজের ব্যাগটাও তুলে নেয় সাবা। তারপর নৌশির পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে দুজন আবার কলেজের পেছনের দিকে চলে আসে। দেয়ালের কাছে পৌঁছাতেই নৌশি প্রথমে সাবাকে ঠেলে উপরে তুলে দেয়। সাবা লাফ মেরে দেওয়াল পার হয়। তারপর নৌশি দেওয়াল বেয়ে উঠে তারপর লাফ মেরে দেওয়াল টপকে দাড়ায়।
তারপর মাথা তুলতেই নৌশির হাওয়া ফুস! সামনেই আলভী দাঁড়িয়ে আছে।চোখেমুখে এমন শক্ত ভাব, যেন কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই দুজনকে কাঁচা খেয়ে ফেলবে।পাশেই সাবা ভয়ে কাঁপছে। নৌশি কয়েক সেকেন্ড আলভীর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য জোর করে মুখে একটা হাসি এনে বলে,
— আপনি এখানে?
আলভী ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলে,
— কুত্তার লেজ হাজার চেষ্টা করলেও সোজা হয় না। তেমনি তুমিও। আমি জানতাম তুমি আবারো পালাবে!
নৌশি সঙ্গে সঙ্গে একটা নিরীহ মুখ করে বলে,
— না স্যার, আমরা লাফিং লাফিং খেলছি।
আলভী কিছুক্ষণ নৌশির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটে অদ্ভুত হাসি ফুটিয়ে বলে,
— আচ্ছা। এখন লাফিং লাফিং করে চলো প্রিন্সিপাল অফিসে। বাকি কথা সেখানেই হবে।
নৌশি এক পা দুই পা করে আলভীর দিকে এগিয়ে আসে।আলভী কিছুই বুঝতে পারে না। হঠাৎ নৌশি সাবার হাত ধরে জোরে দৌড় দেয়। আলভী কিছু বুঝে ওঠার আগেই নৌশি সাবার হাত ধরে তার সামনে থেকে ছুটে পালায়।দৌড়াতে দৌড়াতেই নৌশি চিৎকার করে বলে,
— নো নো! এখন আমরা দৌড় দিয়িং! কালকে বাকি টক করিং!
এক মুহূর্তের মধ্যেই দুজন আলভীর ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। ওরা দুজন এমন দৌড় দিয়েছে যে এই দৌড় যদি অলিম্পিকে দিত, তাহলে সাবা আর নৌশি দুজনের ঘরেই দুটো করে অ্যাওয়ার্ড থাকত! আলভী কিছুক্ষণ হা করে সেদিকেই তাকিয়ে রইল। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে চিৎকার করে বলে,
— নৌশি! কালকে তোমার খবর আছে!
কিন্তু ততক্ষণে নৌশি আর সাবা অনেক দূরে। আলভীর ধরাছোঁয়ারও বাইরে চলে এসে এবার দুজন থামে। দুজনেরই অবস্থা একেবারে করুণ। হাঁপাতে হাঁপাতে বুক ওঠানামা করছে। ঠিকমতো শ্বাসই নিতে পারছে না। এত জোরে দৌড়েছে যে মনে হচ্ছে ফুসফুস দুটোও বুঝি এখন ধর্মঘটে যাবে। সাবা কোনো রকমে শ্বাস নিতে নিতে বলে,
— দোস্ত... এখন কি... হবে? কালকে... স্যার... আমাদের... খবর... করবেন!
নৌশিও হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
— কালকের...টা... কালকে... দেখা... যাবে!
কিছুক্ষণ হালকা জিরিয়ে নিয়ে দুজন একটা রিকশা ডাকে। রিকশায় উঠে নৌশি সাবাকে সঙ্গে নিয়ে মির্জা ম্যানশনের দিকে রওনা দেয়। প্রায় বিশ মিনিট পর ওরা মির্জা বাড়ির সামনে এসে নামে। রিকশার ভাড়া মিটিয়ে নৌশি সাবাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে। বাড়ির ভেতরে পা রাখতেই সাবার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। এত সুন্দর বাড়ি! সাবা চারপাশে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে যায়। নৌশি সাবাকে নিয়ে নিজের রুমে চলে আসে। তারপর দুজন হাত-মুখ ধুয়ে খাওয়া-দাওয়া করে শুয়ে শুয়ে ফোন টিপতে থাকে। এভাবেই সময় কেটে যায়।
কলেজের সময় শেষ হওয়ার পর সাবা বাড়ি থেকে চলে যায়। আর নৌশি সন্ধ্যার দিকে ঘুমিয়ে পড়ে। তবে সেই ঘুমটা শান্তির ছিল না। অনেকক্ষণ কাঁদার পর ঘুমিয়েছে।
দাঁতের ব্যথায় সন্ধ্যার দিকে কান্না করতে করতেই একসময় ঘুমিয়ে পড়ে নৌশি। আর সেই ঘুম ভাঙে রাত এগারোটার দিকে।
রুদ্রিক একটু আগেই বাড়িতে এসেছে। এসে চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে মাত্র বসেছে তখনি বিছানায় শুয়ে থাকা নৌশি পিটপিট করে চোখ খুলে। ঘুমজড়ানো চোখে হালকা করে রুদ্রিককে দেখে। তারপর চোখ-মুখ কুঁচকে ধীরে ধীরে উঠে বসে। রুদ্রিক আড়চোখে একবার নৌশির দিকে তাকায়। তারপর আবার চোখ বন্ধ করে হেলান দিয়ে বসে।
নৌশি চোখ কচলাতে কচলাতে বলে,
— আমার দাঁত ব্যথা করছে!
রুদ্রিক চোখ খুলে শান্ত গলায় বলে,
— ব্রাশ করো না ঠিকমতো তুমি!
এমনিতেই ঘুম থেকে উঠলে নৌশির মেজাজ খারাপ থাকে। তার ওপর ঘুম থেকে উঠেই রুদ্রিকের এমন অপমানজনক কথা শুনে নৌশি ফুঁসে উঠে,
— সাহস কত বড় আপনার! আমি প্রতিদিন সকালে ব্রাশ করি। আপনি কি তখন চোখগুলো খুলে রাখেন!
রুদ্রিক ভ্রু তুলে তাকায়।
— ওই দুই সেকেন্ডে ব্রাশ হয়ে যায়?!
নৌশি মুখ বাঁকিয়ে বলে,
— তো আমি কি আপনার মতো আধা ঘণ্টা লাগিয়ে কমোডের ব্রাশ দিয়ে ব্রাশ করবো?
রুদ্রিক কপাল কুঁচকে ফেলে।
— কমোডের ব্রাশ মানে?
নৌশির মুখে এবার দুষ্টু হাসি ফুটে উঠে। নিজের আটাশটা দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলে,
— আসলে আপনার দাঁত মাজার ব্রাশ দিয়ে আমি কমোড পরিষ্কার করেছি।
কথাটা শুনতেই রুদ্রিকের মনে হলো, তার গা গুলিয়ে সারাদুনিয়ার সমস্ত খাবার একসঙ্গে গলা পর্যন্ত উঠে এসেছে। রুদ্রিক মুখ বিকৃত করে চিৎকার করে উঠে,
— কিহ! ওয়াক ওয়াক! নৌশিইইইইইইই! আই উইল কিল ইউ ইফ দিজ ওয়াজ ট্রু!
কথাটা বলেই রুদ্রিক তাড়াতাড়ি উঠে ওয়াশরুমের দিকে চলে যায়। দরজা বন্ধ হওয়ার কয়েক মুহূর্ত পরই ভেতর থেকে বমি করার শব্দ ভেসে আসে। নৌশি বুঝতে পারেনি রুদ্রিক বমি করে দিবে। নৌশি তাড়াতাড়ি উঠে ওয়াশরুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর সামান্য ভয় নিয়ে বলে,
— আরে আরে, মজা করেছি। আপনি দেখছি সিরিয়াসলি নিয়ে নিয়েছেন!
ওয়াশরুমের ভেতর থেকে বমি করতে করতে রুদ্রিক বলে উঠে,
— তোমাকে আমি বিশ্বাস করি না, ফাজিল মেয়ে!
— সত্যি মজা করছি। আপনার কসম!
রুদ্রিক কথাটা শুনেই আরো ক্ষেপে যায়। ভেতর থেকে চিৎকার করে উঠে,
— এই খবরদার! আমার কসম করবে না। তোমার মতো ফাজিল মেয়ে আমি আমার জীবনে দেখিনি।
নৌশি এবার একটু নরম স্বরে বলে,
— আরে, আমি সত্যি বলছি। আমি খারাপ কিন্তু ওটাও খারাপ না। আপনি আমাকে অপমান করেছেন ব্রাশ করা নিয়ে, তাই আপনার আত্মাটা একটু লড়িয়ে দিতাম!
ওয়াশরুমের ভেতর থেকে আর কোনো উত্তর আসে না।নৌশি দরজার সামনে চুপ করে দাড়িয়ে থাকে। প্রায় মিনিট দুয়েক পর রুদ্রিক চোখে-মুখে পানি ছিটিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নৌশির সঙ্গে রুদ্রিকের চোখে চোখ পড়তেই রুদ্রিক নৌশিকে কাঁচা চিবিয়ে খাবে এমন লুক দেয়! সেই দৃষ্টি দেখে নৌশিও শান্ত ভদ্র হয়ে যায়। রুদ্রিক আর কিছু না বলে গিয়ে বেডে বসে পড়ে। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে নিজেকে সামলাতে লাগল। নৌশি এবার মানবদরদি হয়ে একটা টাওয়াল এগিয়ে দেয়।
রুদ্রিক একবার নৌশির দিকে তাকায়। তারপর টাওয়ালটা নিয়ে মুখ মুছে আবার নৌশির হাতে দিয়ে দেয়। নৌশি টাওয়ালটা রেখে এসে আবার রুদ্রিকের পাশে বসে পড়ে। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে আবার বলে,
— আমার দাঁতে ব্যথা করছে!
রুদ্রিক বিরক্ত মুখে তাকায়।
— তো আমাকে বলছো কেন? আমি কি ডাক্তার নাকি?
নৌশি বলদের মতো তাকিয়ে থেকে বলে,
— হ্যা আপনি তো ডাক্তারই।
রুদ্রিক কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে যায়। এটা কি বললো সে? সে তো আসলেই ডাক্তার! রুদ্রিক মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এই মেয়ে মাত্র দু-সপ্তাহে তার কী হাল করেছে! তার সাত বছরের ডাক্তারি পেশাটাই ভুলিয়ে দিয়েছে!
রুদ্রিক নিজেকে সামলে বলে,
— তো আমি কি দাঁতের ডাক্তার নাকি?
নৌশি বিরক্ত মুখে বলে,
— উফ! এত কিছু জানি না। কিন্তু আমার দাঁতে ব্যথা করছে অনেক! কিছু করেন!
রুদ্রিক নির্লিপ্ত গলায় বলে,
— আরও খাও চকলেট।
নৌশি সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকায়।
— চকলেটের খোঁটা দিবেন না। জীবনে তো একটা চকলেট খাওয়াননি আমাকে! কিপ্টা কোথাকার!
রুদ্রিক এবার উত্তর দেয়। নৌশি একটু পর রুদ্রিকের শরীরে হালকা ধাক্কা দিয়ে আবার বলে,
— আরে, বললাম না আমার দাঁতে অনেক ব্যথা করছে?
রুদ্রিক একটা শ্বাস ফেলে বলে,
— গরম পানি দিয়ে কুলি করো। সকালে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো নে।
নৌশি সঙ্গে সঙ্গে বায়না ধরে,
— গরম করে পানি করে দিন!
রুদ্রিক অবাক হয়ে তাকায়।
— আশ্চর্য ব্যাপার! আমি কি তোমাকে বিয়ে করেছি তোমাকে আদর-যত্ন করতে? নিজেরটা নিজে গিয়ে করো!
নৌশি এবার আদুরে গলায় বলে,
— দিন না। দাঁতে অনেক ব্যথা করছে। সেই সন্ধ্যা থেকে ব্যথা। ব্যথায় কান্না করতে করতে ঘুমিয়েছি!
রুদ্রিক এবার নৌশির দিকে তাকায়। নৌশি ব্যথায় কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়েছে, এই কথাটা শুনতেই রুদ্রিকের গলার স্বর অজান্তেই নরম হয়ে আসে। কিছুক্ষণ নৌশির দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত গলায় বলে,
— আচ্ছা, চল ডক্টরের কাছে।
নৌশি মাথা নেড়ে বলে,
— না না। এখন শরীরটা ভালো লাগছে না। গরম পানি দিয়েই কুলি করে নিবো।
রুদ্রিক বিরক্তি নিয়ে বলে,
— পাগল তুমি? তোমাকে কি বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছি? ডক্টরের কথা বলেছি।
নৌশি নিচু গলায় বলে,
— শুনেছি আমি। কিন্তু এখন যাবো না। ভালো লাগছে না।
রুদ্রিক এবার আর কিছু বলে না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায়। তারপর বলে,
— বসো। আমি গরম পানি করে নিয়ে আসছি।
নৌশি চুপচাপ মাথা নাড়ে। রুদ্রিক রুম থেকে বেরিয়ে যায়। আর নৌশি বেডে বসে বসে পা দুলাতে দুলাতে অপেক্ষা করতে থাকে। রুদ্রিক যাওয়ার প্রায় পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ফিরে আসে, হাতে একটা গ্লাস। এসেই গ্লাসটা নৌশির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
— নাও, কুলি করো।
নৌশি গ্লাসটা হাতে নিতে নিতে অবাক হয়ে বলে,
— এত তাড়াতাড়ি গরম করে এসেও পড়েছেন?
রুদ্রিক তীক্ষ্ণ গলায় বলে,
— হালকা গরম পানি দিয়ে কুলি করতে হবে, ফুটন্ত না।
নৌশি আর কথা বাড়ায় না। গ্লাসটা হাতে নিয়ে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। রুদ্রিক এসে বেডে বসে। কিছুক্ষণ পর নৌশি কুলি করে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসে।রুদ্রিক নৌশির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কমেছে ব্যথা?
নৌশি মাথা ঝাঁকিয়ে বলে,
— হুম।
বলেই নৌশি বেডের ওপর উঠে নিজের জায়গায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। তারপর গায়ে কম্বল টেনে নেয়। রুদ্রিক নৌশির দিকে তাকায়। নৌশি কম্বলের নিচে মুখ ঢুকিয়ে শুয়ে আছে। রুদ্রিক কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে,
— খেয়েছো কিছু?
নৌশি কম্বলের ভেতর থেকে মুখটা একটু বের করে বলে,
— দুপুরে ভাত খেয়েছিলাম।
রুদ্রিক এবার সরাসরি নৌশির দিকে তাকায়।
— আর কিছু খাওনি?
— না।
বলেই নৌশি আবার কম্বলের নিচে মুখ ঢুকিয়ে ফেলে। রুদ্রিক কিছুক্ষণ চুপ করে নৌশির দিকে তাকিয়ে বলে,
— নিচে চল, খেতে।
নৌশি কম্বলের ভেতর থেকেই উত্তর দেয়,
— না, দাঁতে ব্যথা করছে। খেতে পারবো না।
রুদ্রিক আর কিছু বলে না। কিছুক্ষণ কম্বলে মোড়ানো নৌশির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিঃশব্দে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতেই মেইন ডোরের কাছে রুদ্রিকের চোখ পড়ে রোহানের দিকে। রোহান ডেলিভারি ম্যানের বিল পে করে দরজা লাগাচ্ছে। তার হাতে একটা প্যাকেট। রুদ্রিক ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— কী এটা?
রোহান শান্ত গলায় বলে,
— পুডিং। অনলাইন থেকে আনিয়েছি।
কথাটা শুনতেই রুদ্রিকের মাথায় কিছু একটা এলো। শান্ত গলায় বলে,
— চারভাগ করে এক ভাগ নিয়ে যা আর তিন ভাগ রেখে যা।
রোহান সামান্য ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
— এতগুলো খাবে? তুমি তো এক পিসই খেতে চাও না। আনহেলদি বলে। আজ হঠাৎ কোন ভূতে ধরলো?
রুদ্রিক বিরক্ত গলায় বলে,
— এত কিছু জানা লাগবে না। চুপচাপ দিয়ে যা।
রোহান আর কোনো প্রশ্ন করে না। পুডিংয়ের প্যাকেটটা নিয়ে ডাইনিং রুমের দিকে এগিয়ে যায়। রুদ্রিকও সেখানে চলে যায়। রোহান টেবিলের ওপর পুডিংয়ের প্যাকেটটা রাখে। তারপর কিচেন থেকে একটা ছুরি, দুটো বাটি আর দুটো চামচ নিয়ে আসে। তারপর রুদ্রিকের কথামতো বিশাল পুডিংটাকে চার ভাগ করে এক ভাগ একটা বাটিতে তুলে নেয় রোহান। তারপর সেই বাটিটা নিয়ে চুপচাপ চলে যায়। রুদ্রিক বাকি তিন ভাগ পুডিং নিয়ে রুমের দিকে চলে আসে। রুমে ঢুকে দেখে নৌশি এখনো কম্বলের নিচে শুয়ে আছে।
রুদ্রিক পুডিংটা নৌশির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
— নাও।
কম্বলের ভেতর থেকে নৌশি মাথা বের করে। রুদ্রিকের হাতে প্লেটভর্তি পুডিং দেখেই তার চোখ চকচক করে উঠে।ফট করে উঠে বসে জিজ্ঞেস করে,
— পুডিং কোথায় পেলেন?
রুদ্রিক পুডিংয়ের প্লেটটা অটোমানের ওপর রাখতে রাখতে বলে,
— রাস্তার সামনে পড়ে ছিল। খাবারটা নষ্ট হবে ভেবে তোমার জন্য নিয়ে আসলাম।
নৌশি মুখ বাঁকিয়ে বলে,
— আপনি ওটাই পারবেন। কিনে এনে তো খাওয়াবেন না। কিপ্টা ব্যাটা!
রুদ্রিক ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলে,
— হাসব্যান্ডের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানো না, ফাজিল মেয়ে?
— বউয়ের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানেন না, রাক্ষস ডাক্তার?
রুদ্রিক তর্জনী তুলে বলে,
— আমি তোমার বয়সে বড়। আমাকে সম্মান দিয়ে কথা বলবে।
নৌশি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে স্যালুটের ভঙ্গি করে বলে,
— জি, চাচ্চু। আসসালামু আলাইকুম।
বলেই হেসে ফেলে। তারপর আবার বসে অটোমান থেকে পুডিংটা তুলে খাওয়া শুরু করে। রুদ্রিক দাঁত কিড়মিড় করে ফ্যানের দিকে তাকিয়ে বলে,
— আল্লাহ, আমাকে ধৈর্য দাও!
নৌশি পুডিং খেতে খেতেই জিজ্ঞেস করে,
— সবটা খেয়ে নিবো?
রুদ্রিক শান্ত গলায় বলে,
— হুম। সবটা তোমার জন্যই।
নৌশি চামচে করে পুডিং তুলে রুদ্রিকের দিকে বাড়িয়ে দেয়,
— নিন।
রুদ্রিক মাথা নাড়িয়ে বলে,
— উহু। আমি খাবো না।
নৌশি চামচটা আরো একটু সামনে বাড়িয়ে বলে,
— একটু নিন।
— আমি মিষ্টি এভয়েড করি।
— মি. স্বাস্থ্য সচেতন, একটু খান। দিচ্ছি আমি।
রুদ্রিক দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে নৌশির দিকে তাকিয়ে ছিলো। নৌশি এত করে সাধতে থাকায় শেষ পর্যন্ত রুদ্রিক সামান্য নৌশির দিকে ঝুঁকে চামচে থাকা পুডিংটা খেয়ে নেয়। নৌশি আবার নিজের খাওয়ায় মনোযোগ দেয়।রুদ্রিক কিছুক্ষণ নৌশির দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার পুডিং খাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ রুদ্রিকের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠে। কিছু না বলে রুদ্রিক রুম থেকে বেরিয়ে যায়। তার ডিনার করতে হবে।
নৌশি পুডিং খাওয়া শেষ করে পানি খেয়ে আবার কম্বলের নিচে ঢুকে ফোন হাতে নেয়। তারপর শুয়ে শুয়ে রিলস দেখতে থাকে। কিছুক্ষণ পর রুদ্রিক ডিনার করে রুমে ফিরে আসে। রুমে ঢুকেই দেখে, নৌশি কম্বলের নিচে।রুদ্রিক ভাবে, হয়তো ঘুমিয়ে গেছে। সেও আর কোনো কথা না বলে বেডের দিকে এগিয়ে আসে। বিছানায় উঠে কম্ফোর্টার টেনে গায়ে জড়িয়ে নেয়। তারপর উল্টো দিকে ঘুরে শুয়ে পড়ে। সারাদিন ডিউটি করে প্রচন্ড ক্লান্ত থাকায় বিছানায় মাথা রাখার কিছুক্ষণের মধ্যেই রুদ্রিকের চোখে ঘুম নেমে আসে। রুদ্রিকের চোখ লেগে যায়। কিন্তু সেই ঘুম বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ ঘরের নীরবতা ভেঙে প্রচণ্ড জোরে গান বেজে উঠে। ধপ করে উঠে বসে রুদ্রিক।
ঘুমের মধ্যে এমন বিকট শব্দ শুনে কয়েক সেকেন্ডের জন্য রুদ্রিক কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। এবার পাশে তাকায়।সন্দেহটা নৌশির দিকে যায়। রুদ্রিক হাত বাড়িয়ে কম্বল সরাতেই দেখে, কম্বলের নিচে নৌশি চোরের মতো মোবাইল টিপছে। ধরা পড়ে যেতেই নৌশির মুখ একেবারে চুপসে যায়। রুদ্রিক গরম চোখে তাকায়। তারপর এক ঝটকায় নৌশির হাত থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নেয়। ফোনটা হাতে নিয়ে রুদ্রিক বিরক্ত গলায় বলে,
— রাত বাজছে বারোটা, আর কম্বলের নিচে পেঁচার মতো ফোন টিপছে!
নৌশি সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসে হাত বাড়িয়ে বলে,
— দিন ফোন, দিন। সাউন্ড কমিয়ে দেখবো।
রুদ্রিক কিছু না বলে ফোনটা নিজের ট্রাউজারের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলে। তারপর আবার শুয়ে পড়তে পড়তে বলে,
— প্রয়োজন নেই। রাত হয়েছে, ঘুমাও!
নৌশি বিরক্ত মুখে বলে,
— আমার ঘুম ধরবে না। একটু আগে ঘুম থেকে উঠেছি।
রুদ্রিক চোখ বন্ধ রেখেই বলে,
— তাহলে পড়তে বসো। সময়টা কাজে দিবে।
নৌশি মুখ বাঁকিয়ে আবার শুয়ে পড়ে। এই রাতে সে পড়তে বসবে? তার চেয়ে চুপচাপ শুয়ে থাকাই অনেক ভালো।কিছুক্ষণ ঘরে নীরবতা বিরাজ করে। তারপর হঠাৎ নৌশি বলে উঠে,
— পুডিংটা মজা আছে! আমি কালকে আবার খাবো।
রুদ্রিক চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিলো। চোখ না খুলেই বলে,
— ঘুমাও।
নৌশি আবার জিজ্ঞেস করে,
— আগে বলুন, কালকে আবার খাওয়াবেন?
রুদ্রিক এবারো চোখ খুলে না।
— জানি না। ঘুমাও।
নৌশি এবার রেগে গিয়ে রুদ্রিকের গায়ে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলে,
— ফালতু একটা লোক! বললে কী হয়, যে হুম, খাওয়াবো!
রুদ্রিক তেমন রিয়েক্ট করে না। গম্ভীর গলায় বলে,
— খাওয়াবো বললে আবার দেখা যাবে ভোর সকাল থেকে তোমার ঘ্যানঘ্যানানি শুরু হবে খাওয়ানোর জন্য।
— তো খাওয়ালে কী হয়?
— আমি কিপ্টা। তোমার পেছনে অকারণে টাকা খরচ করার মানেই হয় না। বিনা লাভে ইনভেস্ট!
— এত কিছু জানি না। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠলে যেন আমি পুডিং পাই। আমি ঘুম থেকে উঠে খাবো।
কথাটা বলেই নৌশি চোখ বন্ধ করে পড়ে রইল। কিছুক্ষণ বিরক্তিকরভাবে চোখ বন্ধ করে থাকার পর কখন যে তার চোখে ঘুম নেমে এলো, নৌশি নিজেও বুঝতে পারে না।অজান্তেই ঘুমিয়ে যায় নৌশি। রুদ্রিক অনেকক্ষণ কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে পাশে ফিরে তাকায়। দেখে, নৌশি সত্যিই ঘুমিয়ে গেছে।
----
আজ রবিবার। রুদ্রিকের আজ কোনো ডিউটি নেই। বন্ধের দিন হওয়ায় বাসাতেই আছে সে। তবে ছুটির দিন হলেও রুদ্রিকের ঘুমের কোনো পরিবর্তন নেই। প্রতিদিনের মতো আজও সকাল আটটার দিকে ঘুম থেকে উঠে যায়।ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ এক্সারসাইজ করে তারপর গোসল সেরে নেয়। নৌশি তখনো গভীর ঘুমে। গোসল শেষ করে রুদ্রিক সকাল দশটার দিকে রুম থেকে বেরিয়ে নিচে নাস্তা করতে যায়। ডাইনিং রুমে এসে দেখে, সবাই তার অপেক্ষায় বসে আছে। রেজওয়ান মির্জা, ফাহমিদা আইরিন আর রোহান, তিনজনই সেখানে উপস্থিত। রুদ্রিক গিয়ে একটা চেয়ারে বসে। তারপর সামনে বসে থাকা রোহানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কালকে পুডিংটা কোথা থেকে এনেছিলি?
রোহান অবাক হয়ে বলে,
— কেন?
রুদ্রিক একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
— অর্ডার করবো।
রোহান মাথা নেড়ে বলে,
— আচ্ছা, পেজ শেয়ার করে দিচ্ছি।
বলেই টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা হাতে তুলে নেয় রোহান। তারপর পুডিংয়ের পেজটা রুদ্রিকের ফোনে শেয়ার করে দেয়। রুদ্রিক নিজের ফোনটা রুমেই রেখে এসেছে। খাবার টেবিলে আর তেমন কোনো কথা হয় না।রুদ্রিক নাস্তা শেষ করে আবার রুমে ফিরে আসে। রুমে ঢুকে ফোনটা হাতে নিয়ে রোহানের শেয়ার করা পেজে গিয়ে পুডিং অর্ডার করে। অর্ডার করা হয়ে গেলে ফোনটা আবার আগের জায়গায় রেখে বেডের ওপর এসে বসে।তারপর চোখ যায় নৌশির দিকে। এলোমেলো হয়ে ঘুমিয়ে আছে মেয়েটা। রুদ্রিক নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল।
শুধু তাকিয়েই রইল। সময় গড়ায়। এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। কিন্তু আশ্চর্য! রুদ্রিক চোখ সরাচ্ছে না। নৌশির দিকে তাকিয়েই আছে। তখনি রুদ্রিকের ফোনে কল আসে। ডেলিভারি ম্যান। পুডিং এসে গেছে। রুদ্রিক ওয়ালেট থেকে টাকা বের করে রুম থেকে বের হয়ে নিচে যায়। ডেলিভারি ম্যানকে বিল পে করে পার্সেলটা হাতে নিয়ে আবার রুমে ফিরে আসে। রুমে ফিরে দেখে, নৌশি এখনো আগের মতোই ঘুমিয়ে আছে। রুদ্রিক প্যাকেটটা টেবিলের ওপর রেখে দেয়। তারপর ল্যাপটপ বের করে।
ল্যাপটপে একটা রিসার্চ পেপার খুলে। এরপর পাশের ড্রয়ার থেকে দুটো মেডিকেল জার্নাল বের করে নিজের পাশে রাখে।
বেডের ওপর হেলান দিয়ে বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ বুলাতে থাকে। তারপর একে একে হাতে তুলে নেয় মেডিকেল জার্নাল দুটো। মনোযোগ
পড়তে শুরু করে। সময় গড়িয়ে দুপুর হয়ে এলো। বেলা সাড়ে বারোটার দিকে নৌশির ঘুম ভাঙে। ঘুম ভাঙতেই কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে মুচড়ে-মাচড়ে হাই তুলে নৌশি। তারপর উঠে বসে। চোখ খুলে পাশে তাকাতেই দেখে, রুদ্রিক মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপে কিছু একটা করছে। হাতে একটা ফাইলের মতো কিছু। নৌশির রাতের কথা একদম মনে আছে। ঘুমানোর আগে সে রুদ্রিককে পুডিংয়ের কথা বলে রেখেছিল। তাই প্রথম হাইটা শেষ করেই নৌশি জিজ্ঞেস করে,
— আমার পুডিং কই?
রুদ্রিক ল্যাপটপে মনোযোগ দিয়ে কিছু পড়ছিল। নৌশির কথা শুনে তার মনোযোগ কিছুটা সরে যায়। একবার চোখ তুলে নৌশির দিকে তাকায় তারপর আবার ল্যাপটপের দিকে চোখ রেখে বলে,
— ঘুম থেকে উঠে মানুষ আগে ফ্রেশ হয়, হাত-মুখ ধোয়। তারপর খাওয়ার কথা ভাবে।
রুদ্রিকের এমন বেখেয়ালি কথায় নৌশির ভাবে, রুদ্রিক বুঝি পুডিং আনেইনি। মুহূর্তেই নৌশির মুখটা মলিন হয়ে যায়। কণ্ঠে কান্নার সুর এনে বলে,
— আমি রাতে বলে ঘুমিয়েছি! তারপরও আনেননি? জানেন না আমার দাঁতে ব্যথা? আমি কিছু খেতে পারি না। তারপরও......
বাকি কথাটা শেষ করার আগেই রুদ্রিক ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই হাত বাড়িয়ে পুডিংয়ের প্যাকেটটা নৌশির দিকে এগিয়ে দেয়। নৌশি কয়েক সেকেন্ড অবাক হয়ে প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে থেকে ঝট কুঁচকে সেটা হাতে নেয়। তারপর খুলে দেখে ভেতরে পুডিং! মুহূর্তের মধ্যেই নৌশির মুখের সমস্ত মলিনতা উধাও। খুশিতে লাফিয়ে উঠে রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
— ইয়েএএএ! আপনি পুডিং এনেছেন! আমি রাতে স্বপ্নে দেখছিলাম আমি পুডিং খাচ্ছি!
রুদ্রিক গম্ভীর গলায় বলে,
— যাও, ফ্রেশ হয়ে এসো!
নৌশি আর এক মুহূর্তও দেরি করে না। লাফ মেরে বিছানা থেকে নেমে উরুক-ধুরুক করে ওয়াশরুমের দিকে ছুটে যায়। নৌশির এমন খুশি আর বাচ্চামি দেখে রুদ্রিক ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই মুচকি হাসে। মেয়েটা সত্যিই অদ্ভুত! একটা পুডিংয়ের জন্য এত খুশি?