— এটা প্রতিশোধের বিয়ে? আমার তো মনে হচ্ছে, তুমি ওই মেয়ের ওপর আগে থেকেই দুর্বল ছিলে। তাই প্রতিশোধের নাম করে বিয়ে করে নিয়েছো। নইলে এখন পর্যন্ত ওই মেয়েটাকে কষ্ট দিতে দেখলাম না। কোনো খারাপ ব্যবহারও করতে দেখলাম না! উল্টো এখানে এসে রানীর মতো থাকছে! বাবার বাড়িতে জীবনে যা দেখেনি, এখন সেসবও দেখছে। খাচ্ছে, দাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে!
লিভিং রুমে দাঁড়িয়ে প্রচন্ড ক্ষোভ নিয়ে কথাগুলো বলন রেজওয়ান মির্জা। ওনার সমস্ত রাগ এসে পড়েছে রুদ্রিকের ওপর। রুদ্রিক এখন হসপিটালে যাবে তবে হসপিটালে যাওয়ার আগে তাকে নৌশির কলেজে যেতে হবে। নৌশি বাইরে গাড়ির কাছে অপেক্ষা করছে। রুদ্রিক বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে রেজওয়ান মির্জা তার সঙ্গে হসপিটালের ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে জানতে পারে, রুদ্রিক নৌশির কলেজে যাবে। আর সেই মুহূর্তেই কথাগুলো ছুড়ে দেন রেজওয়ান মির্জা।
রেজওয়ান মির্জার কথা শুনে রুদ্রিক থমকে যায়। মুহূর্তেই তার মুখটা ভার হয়ে আসে। দৃষ্টি নেমে যায় ফ্লোরের দিকে। হঠাৎ করেই এমন কঠিন প্রশ্নের সামনে পড়ে গেছে। রুদ্রিকের এমন নীরবতা রেজওয়ান মির্জার সন্দেহ আরো বাড়িয়ে দেয়। তিনি কিছুক্ষণ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে আবার প্রশ্ন করেন,
— তুমি কি সত্যিই এই মেয়ের প্রতি দুর্বল ছিলে? এই মেয়েকে চিনতে?
রুদ্রিক এবার সরাসরি পাপার দিকের চোখ তুলে তাকায়। কিন্তু বেশিক্ষণ রেজওয়ান মির্জার চোখে চোখ রাখতে পারে না। কারণ রেজওয়ান মির্জা রুদ্রিকের চোখের দিকে তাকিয়ে রুদ্রিকের গভীরে লুকিয়ে থাকা সত্যিটা খুঁজে বের করতে চাইছেন। রুদ্রিকের মনের কথাটা তার চোখ থেকেই পড়ে নিতে চাইছেন। অস্বস্তিতে রুদ্রিক চোখ সরিয়ে অন্যদিকে তাকায়। তারপর গম্ভীর গলায় বলে,
— স্টুপিটের মতো কথা বলবে না। আমি কেন নৌশির প্রতি দুর্বল হবো? এমন কিছুই না। ওর কলেজে গার্ডিয়ান ডেকেছে। যেহেতু ওর পরিবারের কারোর সাথে যোগাযোগ রাখতে দেইনি, সো গার্ডিয়ান হিসেবে আমারই যেতে হবে!
রেজওয়ান মির্জা সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন,
— প্রয়োজন কী ওর কলেজ যাওয়ার? পড়ালেখা বন্ধ করে বাড়িতে বসাও!
রুদ্রিক অবাক হয়ে তাকায়।
— পড়ালেখা বন্ধ করবো মানে? এটা কেমন কথা? পড়ালেখা করবে না কেন? প্রতিশোধ নিতে ওর পড়ালেখা বন্ধ করতে হবে কেন?
রেজওয়ান মির্জার কঠিন গলায় বলেন,
— ওকে নিশ্চয়ই বিয়ে করে আনোনি পড়ালেখা করে শিক্ষিত বানাতে? ওকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে কষ্ট দিতে, শোধ তুলতে। তাই ও বাড়ির সব কাজ করবে। বাড়ির কাজের মানুষদের মতো খাটবে, তবেই তো প্রতিশোধ নেওয়া হবে!
কথাটা শুনেই রুদ্রিকের মুখের ভাব বদলে যায়। এবার চেহারায় কঠোরতা আর কন্ঠে তীক্ষ্ণতা নিয়ে বলে,
— পাপা, লিমিটে থেকে কথা বলো। নৌশি কাজের মেয়ে না। বউ হয় আমার। তুমি ওকে কাজের মানুষের সাথে মিলাও কিভাবে?
রেজওয়ান মির্জা এতক্ষণ এই কথাটারই অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি ফুঁসে উঠেন,
— তাহলে প্রতিশোধের বিয়ে যে করেছো, প্রতিশোধটা নিচ্ছো কোথায়? তোমার বউয়ের পড়ালেখা বন্ধ করতে পারবে না। বাড়ির কাজ বউকে করতে দেবে না। শুধু বিয়েটাই প্রতিশোধ?
রুদ্রিক বিরক্ত গলায় বলে,
— এখন প্রতিশোধের জন্য ওকে দিয়ে বাড়ির কাজ করাবো? এটা চিপ! তাছাড়া নৌশি এসব পারবে না। পাপা, নৌশি বাচ্চা মেয়ে!
রেজওয়ান মির্জা ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলেন,
— তাহলে বাচ্চা মেয়েটাকে তুলে এনে বিয়ে করেছো কেন? যদি বাচ্চা মেয়েকে কষ্ট দিতে মায়াই লাগে?
রুদ্রিক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
— মায়া লাগছে না। নৌশির জন্য আমার মায়া লাগে না। নৌশিকে প্রতিশোধের জন্য বিয়ে করেছি এবং ওর থেকে প্রতিশোধ নেবো ওর পুরো পরিবারের কৃতকর্মের। কিন্তু তাই বলে বাড়ির কাজ কেন করবে? আমাদের বাড়িতে কাজের লোক আছে।
রেজওয়ান মির্জা ক্ষোভ নিয়ে বলেন,
— তোমার বোন যে ওদের বাড়িতে গিয়ে কাজ করছে? ওদের যে অবস্থা, কাজের মানুষ রাখতে পারার মতো না। দেখো গিয়ে, আমার মেয়েটাকে দিনরাত খাটাচ্ছে। এটাতে তোমার রাগ লাগছে না? যে বোনকে আদর করে লোকমা তুলে খাইয়েছো, সেই মেয়ে ওদের বাড়িতে গিয়ে খাটছে?
কথাটা এবার রুদ্রিককে থামিয়ে দেয়। সে আর কোনো উত্তর দেয় না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। রেজওয়ান মির্জার কথাগুলো তার ভেতরে আঘাত করে।বোনের কথা মনে পড়তেই রুদ্রিকের মুখের সমস্ত কঠোরতা স্তিমিত হয়ে আসে। বুকটায় শূন্যতা অনুভব করে রুদ্রিক। কিছু সময় নীরব থাকার পর হঠাৎ রুদ্রিক বলে ওঠে,
— দেরী হচ্ছে আমার।
বলেই আর রেজওয়ান মির্জাকে কথা বলার সুযোগ দেয় না। চুপচাপ লিভিং রুম থেকে বেরিয়ে আসে। পেছনে দাঁড়িয়ে রেজওয়ান মির্জা ছেলের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকেন। এখন ওনার চোখে রাগের চেয়ে সন্দেহটাই বেশি। রুদ্রিক কি সত্যিই নৌশির প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে? রুদ্রিক বাইরে এসে দেখে, নৌশি গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছে। এতক্ষণ অপেক্ষা করতে করতে নৌশিও বিরক্ত।
রুদ্রিককে দেখামাত্রই নৌশি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— এতক্ষণ লাগে আসতে আপনার?
রুদ্রিক পকেট থেকে গাড়ির চাবিটা বের করে দরজা খুলে দিতে দিতে নৌশিকে বলে,
— পাপার সাথে কথা বলছিলাম।
নৌশি আর কিছু বলে না। চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসে।রুদ্রিকও গাড়িতে উঠে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়। গাড়ি চলতে শুরু করার কিছুক্ষণ পরই রুদ্রিক একবার নৌশির দিকে তাকিয়ে তারপর সামনে তাকিয়ে বলে,
— তোমার লজ্জা লাগে না? মেয়ে মানুষ হয়ে কলেজ পালাও! ছেলে হলে একটা কথা ছিল।
নৌশি সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলে,
— কেন? কলেজে কি নিয়ম আছে শুধু ছেলেরাই পালাতে পারবে?
রুদ্রিক বিরক্তির হয়ে বলে,
— ফাজিল মেয়ে! নিলজ্জের মতো তর্ক করো না।
নৌশি মুখ বাঁকিয়ে কোনো উত্তর দেয় না। রুদ্রিকও গাড়ি চালাতে চালাতে আবার বলে,
— কতটা এমবেরাসিং জানো? ডক্টর রুদ্রিক, যাকে এক নামে সবাই চেনে, সে যাচ্ছে কলেজে। আর কেন যাচ্ছে? তার বউ কলেজ পালিয়েছে, সেটার সমাধান করতে!
নৌশি কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে বলে,
— সবাই চিনে?
রুদ্রিক সামান্য বিরক্তিতে তাকিয়ে বলে,
— তা নয়তো কি?
নৌশি মিটমিট করে হেসে বলে,
— কই, আমি তো চিনতাম না।
বলেই মুখ চেপে হাসতে থাকে। রুদ্রিক নৌশিকে এখনিই কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে, এমন লুক দেয়। সেই লুক দেখে নৌশি সঙ্গে সঙ্গে হাসি বন্ধ করে দেয়। তারপর কিছুটা নিরীহ গলায় বলে,
— জীবনে প্রথম বার যাচ্ছেন, এর মধ্যেই এত খোটা?
রুদ্রিক চোখ সরিয়ে সামনে তাকিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে বলে,
— দিজ ইজ দা ফাস্ট টাইম আমি যাচ্ছি তোমার অভিযোগ সমাধান করতে। এর পরে আমি আর যাবো না। সো, শুধরে যাও।
নৌশি আর কোনো কথা বলে না। চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর গাড়িটা এসে থামে নৌশির কলেজের সামনে। রুদ্রিক গাড়ি থেকে নেমে নৌশিকেও নামতে ইশারা করে। তারপর দুজন একসঙ্গে কলেজের ভেতরে ঢুকে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যায় প্রিন্সিপালের রুমের দিকে। প্রিন্সিপালের রুমের কাছে এসে রুদ্রিক দরজায় নক করার আগে নৌশির দিকে তাকায়। তারপর নিচু গলায় সর্তক করে বলে,
— ভেতরে মানুষের মতো থাকবে। অমানুষের মতো আচরণ করবে, তোমাকে আমার কাছ থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।
নৌশি রুদ্রিকের হুমকি বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে মেনে নেয়। তারপর চোখেমুখে ভান করে বুঝায়, সে সব বুঝেছে। ভেতরে গিয়ে কোনো ঝামেলা করবে না। রুদ্রিক এবার দরজায় নক করে। সঙ্গে সঙ্গেই ভেতর থেকে আওয়াজ এলো,
— কে?
রুদ্রিক ভদ্রভাবে উত্তর দেয়,
— আমি ডক্টর রুদ্রিক রওনক মির্জা।
ভেতর থেকে সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর আসে,
— ভেতরে আসুন।
রুদ্রিক দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখে, প্রিন্সিপাল দাঁড়িয়ে আছেন। রুদ্রিককে দেখেই তিনি হাসিমুখে বলেন,
— আসুন। আসুন।
রুদ্রিক নৌশিকে সঙ্গে নিয়ে ভেতরে ঢুকে। প্রিন্সিপাল রুদ্রিকের দিকে চেয়ার দেখিয়ে বলেন,
— বসুন, বসুন।
রুদ্রিক গিয়ে চেয়ারে বসে। কিন্তু নৌশি বসে না। সে রুদ্রিকের পেছনে দাঁড়িয়ে রইল। রুদ্রিক বসেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে নৌশিকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে, নৌশির হাতটা ধরে নৌশিকে নিজের পাশে এনে বসাতে বসাতে কোমল স্বরে বলে,
— বসো।
প্রিন্সিপালের সামনে নৌশিকে হাত ধরে এনে রুদ্রিকের বসানোটা নৌশির মনে আলাদা ভাবে জায়গা করে নেয়। এমন সম্মান পেয়ে সপ্তাদশির বুকের ভেতরটা হঠাৎ তীব্র আবেগ আর অদ্ভুত ভালোলাগায় ছেয়ে যায়। মুগ্ধ চোখে নৌশি তাকিয়ে রইল রুদ্রিকের দিকে। চোখ সরানোর ইচ্ছে করলো না তার। হঠাৎ নৌশির মনে পড়ে সে প্রিন্সিপাল রুমে। তাই দ্রুত চোখ সরিয়ে মাথা নুইয়ে হালকা হাসে নৌশি। তারপর আড়চোখে আরেকবার রুদ্রিকের দিকে তাকায়।
প্রিন্সিপাল রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে হেসে বলেন,
— হঠাৎ কী কারণে আসা? বলেননি তো আসবেন?
রুদ্রিক নৌশির দিকে ইশারা করে বলে,
— একচুয়ালি, আমার ওয়াইফ আপনাদের কলেজেরই স্টুডেন্ট। কালকে.....
রুদ্রিক কথা শেষ করার আগেই নৌশি বলে উঠে,
— স্যার, কালকে আমার শরীর খারাপ লাগছিলো, তাই হাফ টাইমে চলে গেছিলাম। এখন আলভী স্যার বলছেন আপনার কাছে বিচার দিবেন....
নৌশির কথা শুনে প্রিন্সিপাল হেসে ফেলেন। তারপর স্বাভাবিক গলায় বলেন,
— সমস্যা নেই। আমি আলভীকে বলে দিবো। এটা নিয়ে ভাবার কিছু নেই।
কথাটা শুনে নৌশির চোখ খুশিতে বড় বড় হয়ে যায়। সে ভাবতেই পারেনি, প্রিন্সিপাল এত সুন্দরভাবে বিষয়টা মেনে নেবেন। কারণ প্রিন্সিপাল বেশ রাগী হিসেবে পরিচিত। তাই নৌশি মনে মনে ভেবেছিল, অন্তত সামান্য হলেও বকা তাকে খেতেই হবে। কিন্তু এখানে এসে তো উল্টো কোনো ঝামেলাই হলো না!
রুদ্রিক হালকা হেসে বলে,
— তাহলে আসি আমি।
প্রিন্সিপাল সঙ্গে সঙ্গে বলেন,
— না, না। এসেছেন অনেকদিন পর। কফি খেয়ে যেতে হবে।
রুদ্রিক সৌজন্য হেসে বলে,
— না। আজ না। আজ দেরী হয়ে যাবে।
প্রিন্সিপাল বলে,
— এই সামান্য কারণে কষ্ট আসলেন? আপনি কল করে দিলেই হতো।
রুদ্রিক হালকা হেসে বলে,
— ইটস ওকে।
তারপর রুদ্রিক নৌশির হাত ধরে উঠে দাঁড়ায়। নৌশিও উঠে দাঁড়ায়। রুদ্রিক প্রিন্সিপালের দিকে তাকিয়ে বলে,
— আসছি।
প্রিন্সিপাল উঠে দাড়িয়ে মাথা নেড়ে বলেন,
— জি। আসবেন আবার।
রুদ্রিক নৌশিকে সঙ্গে নিয়ে প্রিন্সিপালের রুম থেকে বেরিয়ে আসে। বাইরে আসতেই দেখে, সাবা দাঁড়িয়ে আছে। নৌশি সাবাকে দেখামাত্রই মুখে বিজয়ের হাসি দিয়ে বলে,
— এখন নো টেনশন। আলভী স্যার বিচার দিলেও কিছু হবে না।
সাবা অবাক হয়ে নৌশির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— সত্যি দোস্ত?
নৌশি হেসে মাথা নেড়ে বলে,
— হ্যাঁ।
রুদ্রিক নৌশির দিকে তাকিয়ে বলে,
— যাও, ক্লাসে যাও। আর অবশ্যই ফুল ক্লাস করে যাবে।
নৌশি মুখটা মায়াবী করে বলে,
— কিছু কিনে দিয়ে যান?
রুদ্রিক নৌশির এমন মায়াবী মুখ দেখে থেমে যায়। তারপর নরম স্বরে বলে,
— কী কিনে দিবো?
নৌশি ফট করে রুদ্রিকের হাতটা ধরে সুন্দর একটা হাসি দিয়ে বলো,
— চলুন বাইরে। ঝালমুড়ি খাবো।
রুদ্রিক একবার নিচে তাকিয়ে নিজের হাতের দিকে তাকায়, যে হাতটা নৌশি ধরে রেখেছে। তারপর চোখ উঠিয়ে তাকায় নৌশির হাসি মাখা মুখের দিকে। কয়েক সেকেন্ড সেভাবেই তাকিয়ে থেকে শেষ পর্যন্ত নিজেও নৌশির হাতটা ধরে মাথা নেড়ে শান্ত গলায় বলে,
— চল।
বলেই নৌশিকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে শুরু করে রুদ্রিক।হাঁটতে হাঁটতে ওরা কলেজের গেটের সামনে এসে পৌঁছায়। গেটের কাছে যেতেই দারোয়ান তাদের থামিয়ে দেয়। তারপর রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কী লাগে?
রুদ্রিক গম্ভীর মুখে বলে,
— বউ হয় আমার!
দারোয়ান কথাটা শুনে কিছুটা অবাক হয়ে রুদ্রিকের দিকে তাকায়। বলে,
— দুইটাই বউ?
রুদ্রিক ভ্রু কুঁচকে বলে,
— হ্যাঁ?
কথাটা বলেই রুদ্রিক পেছনে ফিরে তাকায়। আর তখনি দেখে নৌশির পাশেই সাবা দাঁড়িয়ে আছে। নৌশি সাবার হাত ধরে রেখেছে। আসলে রুদ্রিক যখন নৌশিকে নিয়ে কলেজের গেটের দিকে আসছিল, তখনি নৌশি পেছনে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে ইশারা করে সাবাকে তাড়াতাড়ি তার হাত ধরতে বলে। সাবাও দেরি না করে ছুটে এসে নৌশির হাত ধরে। আর এখন নৌশি সাবাকেও সঙ্গে নিয়ে বাইরে যাবে। নৌশি দারোয়ানের দিকে তাকিয়ে হাসি দিয়ে সাবাকে দেখিয়ে বলে,
— ও হচ্ছে ওনার ভাতিজি।
রুদ্রিক সঙ্গে সঙ্গে চোখ গরম করে নৌশির দিকে তাকায়।কিন্তু নৌশি ভয় পায় না। সে একদম নির্বিকার। দারোয়ান রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
— বউ এবং ভাতিজি দুজনকেই নিয়ে যাবেন?
রুদ্রিক এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এই মেয়েটার সঙ্গে তর্ক করে কোনো লাভ নেই। তাই শেষ পর্যন্ত বলে,
— হ্যাঁ। বাইরে থেকে কিছু কিনে দিবো। তারপর আবার এসে পড়বে।
দারোয়ান মাথা নেড়ে বলে,
— আচ্ছা, যান।
বলেই দারোয়ান গেট ছেড়ে এক পাশে সরে দাঁড়ায়।রুদ্রিক, নৌশি আর সাবা তিনজনই কলেজের গেট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। বাইরে এসেই নৌশি আর সাবা ঝালমুড়িওয়ালা মামার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। দুটো ঝালমুড়ির অর্ডার দেওয়া হয়। ঝালমুড়ি তৈরি করে তাদের হাতে দেওয়ার পর রুদ্রিক ঝালমুড়িওয়ালাকে টাকা দিয়ে নৌশির দিকে তাকায়। তারপর বলে,
— এখন যাও।
নৌশি মুখটা ভার করে বলে,
— শুধু ঝালমুড়ি বলেছি তাই শুধু ঝালমুড়িই দিবেন? আর কিছু দিবেন না?
রুদ্রিক শান্ত ভাবেই জিজ্ঞেস করে,
— আর কী?
নৌশি সঙ্গে সঙ্গে আঙুল তুলে কলেজের পাশের বড় গ্রোসারি শপটা দেখিয়ে বলে,
— ওটা থেকে চিপস, চকলেট কিনে দিন।
রুদ্রিক একবার দোকানের দিকে তাকায়। তারপর নৌশি আর সাবার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে,
— চল।
রুদ্রিক নৌশি আর সাবাকে নিয়ে দোকানটার দিকে এগিয়ে যায়। দোকানে ঢুকতেই নৌশি আর সাবা সুযোগের সৎ ব্যবহার করে। দুজন মিলে একনাগাড়ে চিপস আর চকলেটের নাম বলতে শুরু করে। একটার পর একটা!এতগুলো জিনিসের নাম বলতে লাগল যে, দোকানদারও ওদের জিনিস বের করতে করতে হাপিয়ে উঠে। অবশেষে নৌশি আর সাবার বলা শেষ হলো। দোকানদার সব জিনিস দুইটা বড় প্যাকেটে ভরে নৌশির হাতে তুলে দেয়।
নৌশি একটা প্যাকেট নিজে নেয়, আরেকটা সাবার হাতে দিয়ে দেয়। রুদ্রিক এবার দোকানদারের দিকে তাকিয়ে বিল জানতে চায়,
— বিল কত?
দোকানদার হিসাব করে বলে,
— দুই হাজার টাকা।
দুই হাজার টাকা শুনে নৌশি একটুও অবাক হয় না। কিন্তু সাবার চোখ কপালে উঠে যায়। সাবা নৌশির কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে,
— কিছু কমিয়ে নিবো?
নৌশি সঙ্গে সঙ্গে সাবাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,
— চুপ কর। বল, আর কিছু নেওয়া বাকি আছে কিনা। সেগুলোও নিবো।
সাবা সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে যায়। রুদ্রিক কোনো কথা না বলে দোকানের বিল পে করে দেয়। তারপর নৌশি আর সাবাকে সঙ্গে নিয়ে আবার কলেজের গেটের সামনে এসে দাঁড়ায়।।রুদ্রিক পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে দুই হাজার টাকা বের করে নৌশির হাতে দিয়ে বলে,
— রাখো তুমি। কিছু কিনে খাবে।
নৌশির মুখটা সঙ্গে সঙ্গেই খুশিতে জ্বলজ্বল করে উঠে।
নৌশি খুশি মনে টাকাটা নিজের পকেটে রেখে দেয়। রুদ্রিক নৌশির দিকে তাকিয়ে বলে,
— যাও, ভেতরে যাও। ফুল ক্লাস করে যাবে। আর হ্যাঁ, বাসার গাড়ি আসবে নিতে। একা একা যাবে না।
নৌশি বলে,
— আপনি যান। আমরা যাচ্ছি।
রুদ্রিক এবার সামান্য কঠিন গলায় বলে,
— চুপচাপ ভেতরে যাও।
নৌশি সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকিয়ে ফেলে। তারপর সাবাকে নিয়ে কলেজের ভেতরে ঢুকে যায়। রুদ্রিক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নৌশিকে কলেজের ভেতরে ঢুকে যেতে দেখে। নৌশি আর সাবা যখন কলেজের ভেতরে চলে যায় তখন রুদ্রিক নিজেও গাড়িতে উঠে বসে। ইঞ্জিন স্টার্ট করে এক ঝটকায় গাড়ি টেনে সেখান থেকে চলে যায় রুদ্রিক।
চলবে?
#তবুও_তোমার_প্রেমে_আমি_পড়েছি
#লেখনীতেঃ_অধরা_মিনহা
#পর্ব_১১ [ ২য় অংশ ]