#কী_ভয়ংকর_মায়া_তোর
#পার্ট_৪৪
#লেখিতে_আরিফা_তাসনিম_তামু
____কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ ❌_____>
কিছু মানুষ জীবনে হঠাৎ করেই আসে।
কোনো পরিকল্পনা থাকে না, কোনো প্রস্তুতিও থাকে না তবুও অল্প অল্প করে সেই মানুষটাই জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে যায়।
রৌদ্র আর ইয়ানার গল্পটাও ঠিক তেমন।
রৌদ্র জানে, ইয়ানাকে তার ভালো লাগে। তাই অকারণে বিরক্ত করা, খোঁচা দেওয়া, নিজের ইচ্ছেমতো একটা নাম ধরে ডাকা এসবের আড়ালে লুকিয়ে থাকে তার অদ্ভুত এক যত্ন। কিন্তু সে কখনো সরাসরি নিজের অনুভূতিটা প্রকাশ করে না। বরং মজা আর দুষ্টুমির আড়ালে ইয়ানাকে নিজের কাছাকাছি রাখার চেষ্টা করে।
অন্যদিকে ইয়ানা বুঝতেই পারে না, রৌদ্রকে নিয়ে তার এত ভাবনা কেন।
রৌদ্র সামনে এলে কেন বুকের ভেতরটা অকারণে ধুকপুক করে?আর রৌদ্র হঠাৎ দূরে সরে গেলে কেন চারপাশটা এতটা ফাঁকা লাগে?
ইয়ানা শুধু জানে, মানুষটাকে সে যতই এড়িয়ে চলতে চায়, কোনো না কোনোভাবে রৌদ্র আবার তার সামনে এসে দাঁড়ায়।
রৌদ্র গাড়ি চালাচ্ছিল, আর ইয়ানা চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। কিছুক্ষণ পর রৌদ্র আড়চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
— এত চুপচাপ কেন?
— কথা বললে সমস্যা না বললেও সমস্যা ।
— সেটাই তো সমস্যা। তোমাকে এত চুপচাপ মানায় না।
ইয়ানা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
— আপনি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন সেটাই তো জানি না।
রৌদ্র মুচকি হেসে বলল,
— জানলে কি গাড়ি থেকে নেমে পালাবে?
— হ্যাঁ, দরকার হলে পালাবো।
— তাহলে না জানাই ভালো।
ইয়ানা বিরক্ত হয়ে বলল,
— আপনি সবসময় এমন রহস্য করে কথা বলেন কেন?
রৌদ্র কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— কারণ তোমাকে একটু অবাক দেখতে আমার ভালো লাগে।
ইয়ানা কিছু বলল না। শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর রৌদ্র আবার বলল,
— একটা কথা বলি?
— ও বাবা আপনি অনুমতিও নেন? যাই হোক বলেন।
— তুমি আমাকে যতই এড়িয়ে চলো না কেন, শেষ পর্যন্ত কিন্তু আমার সাথেই গাড়িতে উঠে বসলে।
ইয়ানা এবার ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
— আপনি জোর করে উঠিয়েছেন।
রৌদ্র হেসে বলল,
— জোর করে উঠিয়েছি ঠিকই… কিন্তু নামিয়ে দেওয়ার কথা তো বলোনি একবারও।
ইয়ানা চুপ করে গেল।
রৌদ্রও আর কিছু বলল না। শুধু ঠোঁটের কোণে সেই চেনা দুষ্টু হাসিটা রেখে গাড়ি চালিয়ে যেতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর রৌদ্র গাড়িটা একটা শপিং মলের সামনে থামাল। ইয়ানা অবাক হয়ে চারপাশে তাকিয়ে বলল,
— এখানে কেন থামলেন?
রৌদ্র গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে বলল,
— নামো।
— কিন্তু
— আবার কিন্তু? নামো তো।
ইয়ানা অনিচ্ছা সত্ত্বেও গাড়ি থেকে নামল। রৌদ্র সামনে হাঁটতে শুরু করতেই ইয়ানা পেছন থেকে বলল,
— আপনি কোথায় যাচ্ছেন?
রৌদ্র পেছনে না তাকিয়েই বলল,
— তোমার জন্য একটা জিনিস কিনতে।
ইয়ানা থেমে গেল।অবাক হয়ে বলে।
— আমার জন্য? কেন?
রৌদ্র এবার ফিরে তাকিয়ে বলল,
— কদিন পরে তোমার জন্মদিন তাই কিছু একটা কিনে দিবো। মেয়েদের জিনিস সম্পর্কে খুব একটা ধারণা নেই আমার, বনুর জন্য যখন কিছু কিনতাম বনু বা সাইফাকে নিয়ে আসতাম। কিন্তু তোমার পছন্দ ঠিক কেমন তা তো জানি না তাই তোমাকেই সাথে করে নিয়ে এসেছি। জন্মদিনের দিনও দিতে পারতাম কিনে কিন্তু এই কদিন আমি একটু ব্যস্ত থাকবো তাই আজ আসা।
ইয়ানা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো রৌদ্রের দিকে। শুধু বললো,
— আপনি আমার জন্মদিন মনে রেখেছেন?
রৌদ্র মুচকি হেসে বলল,
— তোমার ব্যাপারে সবকিছু মনে রাখি না, তবে কিছু কিছু জিনিস ভুলতে ইচ্ছে করে না।
ইয়ানা কিছুক্ষণ চুপ করে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে রৌদ্রের পাশে গিয়ে হাঁটতে শুরু করল।
ইয়ানা দোকানের দিকে তাকিয়ে আবার রৌদ্রের দিকে তাকাল।
— কী কিনবেন?
— তুমি পছন্দ করবে।
— আমি?
রৌদ্র হালকা বিরক্তির ভান করে বলল,
— এত প্রশ্ন করো কেন? একবার চুপ করে আমার সাথে চলতে পারো না?
ইয়ানা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— ঠিক আছে।
রৌদ্র হেসে ফেলল।
দুজনেই দোকানের ভেতরে ঢুকে গেল। রৌদ্র কয়েকটা সুন্দর জামা দেখছিল, আর ইয়ানা একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল।
হঠাৎ রৌদ্র একটা জামা হাতে নিয়ে ইয়ানার সামনে ধরল।
— এটা কেমন?
ইয়ানা তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
— সুন্দর।
— তোমার পছন্দ হয়েছে?
— হুম।
রৌদ্র জামাটা কিনে ফেলল।
ইয়ানা অবাক হয়ে বলল,
— এটা তো বেশ দামি!
রৌদ্র স্বাভাবিক গলায় বলল,
— দাম নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না।
— কিন্তু—
রৌদ্র এবার বললো,
— আবার কিন্তু বললে সত্যিই একটা থাপ্পড় দিবো।
ইয়ানা চুপ করে গেল। হাতে থাকা জামাটার দিকে তাকিয়ে অজান্তেই একটু হাসল।
তারপর রৌদ্র ইয়ানাকে বাড়িতে নিয়ে আসলো, গাড়ি থেকে নেমে একবার ইয়ানার হাতে থাকা ব্যাগের দিকে আর ইয়ানার দিকে তাকিয়ে বললো,
— ওটা যত্ন করে রাখবে উষ্ঠা খাওয়ালী।
— এতো সুন্দর একটা জামা তারপর আবার বেশ দামী যত্ন করে তো রাখতে হবেই।
— আমি জামাটার কথা বলছি না।
— তাহলে?
রৌদ্র এবার ওর চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললো,
— যে দিয়েছে তার কথাটা একটু মনে রাখিয়েন।
এই বলে গাড়িতে উঠে চলে গেলো। আর ইয়ানা হা করে তাকিয়ে আছে।
রৌদ্র চলে যেতেই ইয়ানার একটা কথা মাথায় এলো, আজকেও রৌদ্রকে বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে বলতে পারেনি। এসব ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেলো।
এসব এতক্ষণ একজন দেখছিলো সে হচ্ছে আমাদের শালু। শালু বিরবির করছে,
— এরা দুজন আবার একসাথে? দেখছি বেশ হাসিখুশিও? আর এতক্ষণ কি কইলো এরা দুইজনে? না মোর এগো বিষয়ডা ভালো মতো দেখতে হইবো তো।
______
বিকালের দিকে ওদের সবার ঘুরাঘুরি শেষে গাড়ি ধীরে ধীরে শ্রেয়াদের বাসার সামনে এসে থামলো। শ্রেয়া দরজা খুলে নামলো।
শ্রেয়া আহিকে বায় দিয়ে ফাইজের দিকে তাকতেই ওদের চোখাচোখি হয়ে গেলো। শ্রেয়া চোখ নামিয়ে তাড়াতাড়ি বাসার মধ্যে চলে গেলো। আর ফাইজের সে শ্রেয়ার যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকলো।
সব কিছুই আদ্র খেয়াল করছিলো, ওর কিছু একটা সন্দেহ হচ্ছে কিন্তু সেটা এখনই প্রকাশ করা যাবে না ওকে আরও কিছু জানতে হবে। তারপর আদ্র গাড়ি চালিয়ে বাড়ির দিকে গেলো।
____
রাতের দিকে,
আহি রুমে বসে চুল আঁচড়াচ্ছিলো। আদ্র রুমে ঢুকেই এই দৃশ্য দেখে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে গেলো। কিছুক্ষণ চুপচাপ বউয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে মুচকি হাসলো।
আহি আয়নায় আদ্রকে দেখতে পেয়ে বললো,
—এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
আদ্র ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বললো,
—আমার বউজানকে দেখছি।
—বউকে তো প্রতিদিনই দেখেন।
—প্রতিদিন দেখলেও তো মন ভরে না।
আহি মুচকি হেসে আবার চুল আঁচড়াতে লাগলো।
আদ্র ওর পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললো,
—দাও, আমি করে দিচ্ছি।
আহি অবাক হয়ে বললো,
—আপনি পারবেন?
—কেন পারবো না?
আহি চিরুনিটা আদ্রের হাতে দিয়ে বসে রইলো। আদ্র খুব সাবধানে চুল আঁচড়াতে শুরু করলো।
কিছুক্ষণ পর আহি বললো,
—আস্তে, টান লাগছে।
আদ্র সঙ্গে সঙ্গে হাত থামিয়ে বললো,
—লেগেছে?
—একটু।
—সরি বউ।
আহি আয়নায় ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।
আদ্র আবার আঁচড়াতে শুরু করলো। আদ্র সুন্দর করে একটা বেনী করে দিলো আহিকে।
আহি বেনী দেখে বললো,
— এত সুন্দর করে আপনি কিভাবে বেনী বাঁধলেন?
আদ্র চিরুনিটা পাশে রেখে একটু ভাব নিয়ে বললো,
—কেন? আমি কি শুধু অফিসের কাজই পারি? আমার বউয়ের চুলের বেনী করাও পারি।
আহি হেসে বললো,
—আপনি আগে কখনো কারও চুলের বেনী করেছেন নাকি?
আদ্র একটু থেমে বললো,
—না। তোরটাই প্রথম।
আহি এবার মুচকি হেসে বললো,
—তাহলে প্রথমবারেই এত সুন্দর করলেন কীভাবে?
আদ্র আয়নায় আহির চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
—যার চুল, সে যখন এত সুন্দর হয় তখন বেনী সুন্দর না হয়ে যায় কোথায়?
আহি লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেললো।
—আপনি না... সুযোগ পেলেই কথা দিয়ে লজ্জা দেন।
—লজ্জা দেই না, সত্যি কথা বলি।
আদ্র বেনীটা একবার দেখে নিয়ে বললো,
—তবে একটা কথা আছে।
—কী?
—কাল থেকে চুল বাঁধার দায়িত্ব আমার।
আহি হেসে বললো,
—কেন?
—কারণ তুই যখন আয়নার সামনে বসে চুল আঁচড়াস, তখন তোকে দেখতে আমার ভালো লাগে।
আহি আর কিছু বললো না। শুধু আয়নার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসতে লাগলো।
কিছুক্ষণ পর আহি হঠাৎ বললো,
—আচ্ছা, আমি না একটা জিনিস বুঝি না। আপনি একবার আমাকে ‘তুমি’ করে বলেন, আবার একবার ‘তুই’ করে। এমনভাবে কেন ডাকেন?
আদ্র কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। তারপর মুচকি হেসে বললো,
—এটা নিয়েও এত ভাবতে হয়?
—হ্যাঁ। আমার জানতে ইচ্ছে করে।
আদ্র আয়নার দিকে তাকিয়েই মুচকি হাসলো। তারপর আহির বেনীটা হাতে নিয়ে আলতো করে ঠিক করতে করতে বললো,
— জানিস, ‘তুমি’ আর ‘তুই’ এর মধ্যে আমার কাছে খুব বেশি পার্থক্য নেই। তুই যখন আমার সামনে থাকিস, তখন কখনো তোকে খুব আপন মনে হয়, তাই ‘তুই’ বলে ফেলি। আবার কখনো তোকে দেখলে মনে হয়, এই মেয়েটাকে যতটা ভালোবাসি, ততটাই সম্মানও করি তখন ‘তুমি’ বের হয়ে আসে।তুই,তুমি,আপনি সবই ভালোবাসার ডাক।
আহি চুপচাপ আয়নার দিকে তাকিয়ে রইলো।
আদ্র মৃদু হেসে বললো,
— তবে একটা কথা সত্যি, ‘তুই’ ডাকটার মধ্যে আমার একটু বেশি মায়া লুকিয়ে আছে। কারণ পৃথিবীর সবাইকে ‘তুমি’ বলা যায়, কিন্তু ‘তুই’ বলা যায় শুধু সেই মানুষটাকে, যাকে নিজের খুব কাছের মনে হয়।
আহির ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো।
— তাহলে আমি আপনার কাছে এতটাই কাছের?
আদ্র আয়নায় ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বললো,
— তুই কতটা কাছের, সেটা হয়তো কথায় বোঝানো সম্ভব না। শুধু এটুকু জানিস, তোকে ‘তুই’ বলার অধিকারটা আমি কাউকে দিতে পারবো না।
আহি তাকিয়ে আছে সামনে থাকা মানুষটার দিকে। সত্যিই আহি ভাগ্যবতী যে এমন একটা মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছে।
আহি মুচকি হেসে বললো,
—আপনি জানেন, আপনাকে আমার কেন এত ভালো লাগে?
আদ্র সঙ্গে সঙ্গে বললো,
—জানি। আমার চেহারার জন্য। আমি জানি, আমি দেখতে অনেক সুন্দর। এন্ড হ্যান্ডসাম।
আহি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বললো,
—আপনি নিজেকে নিয়ে এত প্রশংসা করেন কীভাবে?
আদ্র হেসে বললো,
—বউ যখন প্রশংসা করে না, তখন নিজেকেই করতে হয়।
আহি হেসে মাথা নাড়লো।
—আপনি আসলেই একটা বেহায়া।
—তোর জামাই বলে কথা। একটু বেহায়া না হলে কি চলে?
আহি আবার আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের বেনীটা দেখলো। তারপর হঠাৎ বললো,
—তবে বেনীটা সত্যিই সুন্দর হয়েছে।
আদ্র গর্বিত ভঙ্গিতে বললো,
—হওয়ারই কথা। জামাই নিজ হাতে করেছে।
—আপনি আবার শুরু করলেন!
—কী করবো? নিজের প্রতিভার প্রশংসা তো নিজেকেই করতে হবে।
আহি হেসে ফেললো। আদ্রও ওর হাসির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ ছিল। তারপর আদ্র হঠাৎ বিছানার পাশে বসে বললো,
—আচ্ছা বউ, একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?
আহি ওর দিকে তাকিয়ে বললো,
—হুম, করেন।
আদ্র একটু ইতস্তত করে বললো,
—ফাইজকে ইদানীং কেমন যেন মনে হচ্ছে না?
আহি ভ্রু কুঁচকে বললো,
—কেমন?
আদ্র কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুচকি হেসে বললো,
—সেটাই তো বুঝতে পারছি না। তবে আজকে শ্রেয়াকে বাসায় নামিয়ে দেওয়ার সময় ওর চোখের ভাষাটা আমার কাছে একটু অন্যরকম মনে হলো।
আহি একটু অবাক হয়ে বললো,
—শ্রেয়াকে নিয়ে?
—হুম।
—মানে?
আদ্র এবার আহির দিকে তাকিয়ে বললো,
—তুই খেয়াল করিস নি? শ্রেয়া গাড়ি থেকে নামার পর তোকে বায় দিয়ে যখন ফাইজের দিকে তাকালো, তখন দুজনের চোখাচোখি হলো। তারপর শ্রেয়া তাড়াতাড়ি ভেতরে চলে গেলো। আর তোর ভাই সাহেব?
আহি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—ভাইয়া কী করেছে?
আদ্র হেসে বললো,
—মেয়েটা চলে যাওয়ার পরও বেশ কিছুক্ষণ সেদিকেই তাকিয়ে ছিল।
আহি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে হঠাৎ চোখ বড় বড় করে বললো,
—আপনি কি বলতে চাচ্ছেন ভাইয়া শ্রেয়াকে পছন্দ করে?
আদ্র কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো,
—আমি এখনো নিশ্চিত না। তবে আমার সন্দেহ হচ্ছে।
আদ্র একটু থেমে আহির দিকে তাকিয়ে বললো,
—শ্রেয়াকে আইসক্রিম খাওয়ানো থেকে শুরু করে ওকে নিয়ে এত চিন্তা তারপর আরও কিছু কারণ সব মিলিয়ে আমার ভাইটাকে একটু বেশিই সন্দেহজনক লাগছে।
আহি হেসে ফেললো।
—তাহলে তো ভাইয়ার প্রেমে পড়ার সম্ভাবনা আছে!
আদ্রও হেসে বললো,
—সম্ভাবনা আছে কি না সেটা তোর ভাই জানে। তবে একটা কথা মনে রাখিস, আমি কিন্তু এসব ব্যাপারে ওকে সহজে ছাড়বো না।
আহি অবাক হয়ে বললো,
—কেন?
আদ্র ভীষণ গম্ভীর হওয়ার ভান করে বললো,
—কারণ আমার একমাত্র বউয়ের বান্ধবীকে যদি আমার ভাই পছন্দ করে, তাহলে হবু ভাবী হিসেবে তার ইন্টারভিউ নেওয়ার দায়িত্বও তো আমার!
আহি হেসে বললো,
—আপনি না সত্যিই একটা পাগল!
আদ্র মুচকি হেসে বললো,
—পাগল তো তোর জন্যই হয়েছি বউ।
আহি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ মুখে বিশাল একটা হাসি ফুটিয়ে বললো,
—সত্যি যদি ভাইয়া শ্রেয়াকে পছন্দ করে থাকে, তাহলে তো আমি ভীষণ খুশি হবো!
আদ্র বললো,
—এত খুশি হওয়ার কী আছে?
আহি উচ্ছ্বসিত হয়ে বললো,
—কী আছে মানে? শ্রেয়া যদি আমার ভাবি হয়, তাহলে তো আমি ওকে সারাদিন জ্বালাতে পারবো। এখন তো শুধু বান্ধবী, তখন তো একেবারে নিজের ভাবি সাথে দু জা হবো আমরা।
আদ্র হেসে বললো,
—তুই তো দেখি এখন থেকেই বিয়ের আয়োজন শুরু করে দিয়েছিস।
—হ্যাঁ করবোই তো! শ্রেয়া আমার খুব ভালো বন্ধু। আর ভাইয়ার সাথে ওকে বেশ মানাবে।
আদ্র মুচকি হেসে বললো,
—তা তুই কি নিশ্চিত, শ্রেয়া তোর ভাইকে পছন্দ করে?
আহি একটু ভেবে বললো,
—সেটা জানি না। তবে শ্রেয়া ভাইয়াকে দেখলে একটু ভয় পায়, আবার ভাইয়া সামনে থাকলে চুপচাপও হয়ে যায়। কিছু একটা তো আছেই।
আদ্র বললো,
—বাহ! আমার বউ তো দেখি ভালোই গোয়েন্দাগিরি করতে শিখেছে।
আহি হেসে বললো,
—আপনার কাছ থেকেই শিখছি।
তারপর হঠাৎ আদ্রের হাত ধরে আহি বললো,
—কিন্তু একটা কথা, আপনি ভাইয়াকে কিছু বলবেন না এখনই। আগে নিশ্চিত হই। তারপর আমি নিজেই শ্রেয়াকে ধরে জিজ্ঞেস করবো।
আদ্র মজা করে বললো,
—আর যদি দুজনের কেউ রাজি না হয়?
আহি সঙ্গে সঙ্গে বললো,
—তাহলে আমি দুজনকেই বুঝিয়ে রাজি করাবো। এত ভালো একটা ভাবি হাতছাড়া করতে আমি রাজি না!
আদ্র হেসে মাথা নাড়লো।
—ঠিক আছে, বুঝলাম। তুই ইতিমধ্যেই তোর ভাবি পছন্দ করে ফেলেছিস।
আহি মুচকি হেসে বললো,
—হুম। এতোদিন তো এই কথা আমার মাথাই আসে নি। এবার থেকে তাহলে আমার শ্রেয়াকে আর ভাইয়াকে নজরে নজরে রাখতে হবে।
আদ্র হেসে বললো,
—বউ, তুই কিন্তু দুষ্ট হয়ে যাচ্ছিস।
আহি দুষ্টু হেসে বললো,
—আপনার সাথে থাকতে থাকতে শিখে গেছি।
—তাই নাকি? তাহলে কাল থেকেই তদন্ত শুরু?
—অবশ্যই। আর যদি সত্যিই কিছু থেকে থাকে, তাহলে শ্রেয়াকে আমি কিছুতেই হাতছাড়া হতে দেবো না। আমার একটা সুন্দর ভাবি চাই!
আদ্র হেসে আহির গালে আলতো করে হাত রেখে বললো,
—আচ্ছা ম্যাডাম। এখন চলেন রাতের খাবার খেতে চলেন।
— আচ্ছা চলেন।
_____
খাবার টেবিলে সবাই আছে। সবাই বসে চুপচাপ খাবার খাচ্ছে। সবার খাওয়ার মাঝে আজিজ নেওয়াজ বলে উঠলেন,
—সবার কাছে আমার একটা কথা জানানো আছে।
সবাই খাওয়া থামিয়ে আজিজ নেওয়াজের দিকে তাকালো।ইয়ানা ভ্রু কুঁচকে বললো,
—কী কথা আব্বু?
আজিজ নেওয়াজ মুচকি হেসে বললেন,
—আহি আর আদ্রের বিয়েটা তো ছোটবেলায় হঠাৎ করেই হয়ে গিয়েছিল। ঠিকমতো কোনো আয়োজন করা হয়নি। তাই আমরা ঠিক করেছি, আগামী মাসে ওদের বিয়ের অনুষ্ঠানটা ধুমধাম করে করবো।
কথাটা শুনেই আহির মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো।
আদ্রহেসে আহির দিকে তাকালো।
আতিয়া খুশি হয়ে বললেন,
—হ্যাঁ, আমিও এটাই চাইছিলাম। মেয়েটার বিয়ের কোনো অনুষ্ঠানই হলো না, এতদিন পর সবাইকে নিয়ে একটু আনন্দ-উৎসব তো করাই যায়।
আহি লাজুক হয়ে মাথা নিচু করে ফেললো।
আদ্র মুচকি হেসে বললো,
—আমার কোনো আপত্তি নেই। তবে একটা কথা আছে।
আজিজ নেওয়াজ তাকিয়ে বললেন,
—কী?
আদ্র আহির দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হেসে বললো,
—আমার বউ যদি রাজি থাকে, তাহলে আমার আর কোনো সমস্যা নেই।
আহি সঙ্গে সঙ্গে লজ্জায় আদ্রের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিলো।
তাহমিদ নেওয়াজও বললো,
— আসলেই ভাইয়া খুব সুন্দর সিদ্ধান্ত নিয়েছো। ওদের বিয়ের অনুষ্ঠানটা এবার করা উচিত।
তরিকুল নেওয়াজও পাশে বসে সম্মতি দিলেন।
শালু পাশ থেকে মুচকি হেসে করে বললো,
—হায় আল্লাহ, এইবার বিয়া! তাইলে আমাগো বাড়িতেও হেব্বি খাওন-দাওন অইবো!
শালুর কথা শুনে সবাই হেসে উঠলো।
____
এদিকে ফাইজ নিজের রুমে বসে ছিল। কিন্তু আজ কোনো কাজেই তার মন বসছে না। বারবার শ্রেয়ার বলা কথাটাই মাথায় ঘুরছে—
“মানুষের নজরের কথা বুঝতে পারেন, কিন্তু মনের কথা পারেন না।”
কথাটার আসল মানে কী ছিল, সেটা নিয়েই ভাবছে ফাইজ।
ফাইজের ভ্রু কুঁচকে গেলো।
—মনের কথা...!
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর নিজের মনেই বললো,
—ও কী বলতে চেয়েছিল কথাটা?
ফাইজ বিরক্ত হয়ে নিজের চুলে হাত চালিয়ে বললো,
—ধুর! একটা মেয়েকে নিয়ে এত ভাবছি কেন?
নিজেকেই যেন বোঝানোর চেষ্টা করলো,
—ও তো শুধু আহির বান্ধবী। এর বেশি কিছু না।
কথাটা বলেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।
কিন্তু মনের ভেতর থেকে যেন অন্য একটা উত্তর এলো।
‘তাহলে সিফাতের কথা শুনে এত রাগ হয়েছিল কেন?’
ফাইজের মুখটা সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেলো।
সিফাত যখন শ্রেয়াকে বিরক্ত করতো, তখন কেন তার এত রাগ হতো? কেনই বা সিফাতকে দেখে মনে হতো ছেলেটাকে দূরে সরিয়ে দিতে হবে?
আর সেদিন...
সেদিন শ্রেয়াকে আইসক্রিম দেওয়ার সময় মেয়েটার অবাক চোখ দুটো কেন এত ভালো লেগেছিল?
ফাইজ চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
—না। এটা কিছু না। আমি অযথাই বেশি ভাবছি।
ঠিক তখনই দরজা খুলে আহি রুমে ঢুকলো।
—ভাইয়া?
ফাইজ চোখ খুলে তাকালো।
—হুম?
আহি কিছুক্ষণ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,
—তুমি কি মন খারাপ করে আছো?
—না তো।
—তাহলে এমন চুপচাপ বসে আছো কেন?
—এমনিই।
আহি এগিয়ে এসে ভাইয়ের পাশে বসলো। তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুচকি হেসে বললো,
—একটা কথা বলার ছিলো?
ফাইজ সন্দেহের চোখে তাকালো।
—কী?
আহি একটু মন খারাপ করে বলল
—জানো আমার মন টা ভীষণ খারাপ।
—কেন কি হয়েছে কেউ কিছু বলেছে নাকি?
—আরে না শ্রেয়া কল দিয়ে ছিলো ওকে নাকি ছেলে পক্ষ দেখতে আসবে।যদি পছন্দ হয় সেদিনই আংটি পরিয়ে দিবে।এটা নিয়ে মন খারাপ।
কথাটা বলেই আহি আড়চোখে ভাইয়ের দিকে তাকাল।ভাইয়ের মতিগতি বুঝার চেষ্টা চালাল।না কিছুই বুঝতে পারছে না ফাইজ কিছুক্ষণ চুপ থেকে গলা জেড়ে বলল
—এটা তো ভালো খবর বিয়ের বয়স হলে তো বিয়ে হবেই।এটা নিয়ে তুই মন খারাপ করে কী করবি বনু?
—তাও
—বাদ দে এসব শুনতে ইচ্ছে করছে না। এই টপিক বাদ অন্য কথা বল।
আহি ভালো করে ভাইকে দেখে নিল।বিড়বিড় করে বলে
—ভাঙবে তুমি মোছরাবে না।
(গল্প রেগুলার করছি কিন্তু তোমাদের রেসপন্স পাচ্ছি না এমন হলে গল্প বন্ধ করে দিব।বেশি বেশি রেসপন্স করো কমেন্টে নিজেদের মতামত শেয়ার করো আর বেশি বেশি শেয়ার করো। তাহলে তাড়াতাড়ি আসবে)
চলবে,,,,,