#কী_ভয়ংকর_মায়া_তোর
#পার্ট_৪৫
#লেখিতে_আরিফা_তাসনিম_তামু
_____কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ 🚫❌_____
সকাল বেলা,
নেওয়াজ বাড়ির সবাই টেবিলে বসে নাস্তা করছে। সবার নাস্তা খাওয়ার মাঝে আদ্র আজিজ নেওয়াজকে বললো,
— আব্বু আমার একটা কথা আছে।
আদ্রর কথা শুনে সবাই তার দিকে তাকালো। আজিজ নেওয়াজও ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— কী কথা বলো?
আদ্র একটু থেমে বললো,
— আব্বু তুমি কি আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠানের তারিখ ঠিক করেছো?
— না এখনও করি নি কিন্তু করবো। কিন্তু হঠাৎ এই প্রশ্ন?
— আমি চাই যেনো একটু তাড়াতাড়ি অনুষ্ঠানটা করা হয়।
আহি এতক্ষণ চুপচাপ নাস্তা করছিল। আদ্রর কথা শুনে এবার ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকালো। মনে মনে ভাবছে লোকটা হঠাৎ এ কথা বলছে কেন। আতিয়া ছেলেকে বললো,
— হঠাৎ এ কথা কেন বলছিস আদ্র?
আদ্র তার আম্মুর দিকে তাকিয়ে বললো,
— আম্মু কারণ আর ১ মাস পরেই আহির এইচএসসি পরীক্ষা,তাই আমি চাই বিয়ের অনুষ্ঠানটা তাড়াতাড়ি শেষ করতে যাতে আহির পড়াশোনার কোনো সমস্যা না হয়।
শালু সঙ্গে সঙ্গে বললো,
— আরে দুর এত তাড়াতাড়ি কি করে হইবো ভাইজান??
আজিজ নেওয়াজ শালুকে চুপ করতে বলে সম্মতি জানিয়ে বললেন,
— বেশ তাহলে আমি আজই তারিখ ঠিক করে ফেলবো।
আদ্র স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললো,
— আচ্ছা আব্বু।
আজিজ নেওয়াজ আহির দিকে চেয়ে বললো,
— আম্মু তোমার কি কোনো আপত্তি আছে এতে?
আহি মুচকি হেসে বললো,
— না বড় আব্বু আমার কোনো সমস্যা নেই তোমরা যেটা ভালো মনে করো সেটাই করো।
আজিজ নেওয়াজ মুচকি হেসে বললেন,
— তাহলে তো ঠিকই আছে। আজকে অফিস থেকে এসেই আমরা সবাই মিলে তারিখ ঠিক করে ফেলবো।
আহি মাথা নাড়িয়ে আবার নাস্তা করতে লাগলো।
আদ্র সবার দিকে চেয়ে ফাইজের দিকে তাকালো। দেখলো সে চুপচাপ খাচ্ছে। আদ্র একটা শয়তানি হাসি দিয়ে তরিকুল নেওয়াজের দিকে তাকিয়ে বললো,
— বুঝলে মেজো আব্বু এবার ফাইজকেও একটা বিয়ে দিতে হবে। কতদিন আর একা একা থাকবে বলো।
এই কথা শোনা মাত্র ফাইজ বিষম খেলো শালু তাড়াতাড়ি তাকে পানি দিয়ে বললো,
— আমি বুঝলাম না, আপনাগো বিয়ার কথা কইলেই খালি আপনারা বিষম খান কির জন্য ওইদিন ইয়ানা আপাও বিয়ার কথা শুইনা বিষম খাইলো আজ আপনে। আপনাগো কি এইডা জন্মগত অভ্যাস নাকি?
আতিয়া নেওয়াজ শালুকে বলে।
— এই চুপ কর। ছেলেটা এমনিতেই ভিষম খেয়েছে তার উপর তোর আছে যতসব উটকো কথাবার্তা।
শালু মুখ ফুলিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো।আজকাল উচিত কথার ভাত নেই সে জানে।
আদ্র সব দেখে আবার বললো,
— যাইহোক তোমরা মেয়ে দেখা শুরু করো ফাইজের জন্য।
ফাইজ এবার বলে উঠলো,
— আরে ভাইয়া তুমি আমার বিয়ে নিয়ে পড়েছো কেন তুমি করো বিয়ে।
— তুই আমার ছোট ভাই আমি তোর বিয়ে নিয়ে পড়বো নাতো কে পড়বে বল।
— না ভাইয়া আমি...
ফাইজের কথার মাঝে তরিকুল নেওয়াজ বললো,
— আহা ফাইজ এটা কেমন কথা বিয়ে করবে না আমি তো ভেবেই রেখেছি আদ্রর বিয়ের শেষেই তোমার বিয়ে নিয়ে বসবো।
ফাইজ বাবার দিকে চেয়ে শান্ত ভাবে বললো,
— আব্বু আমি এখন বিয়ে করতে চাই না।
আতিয়া নেওয়াজ বললেন,
— এখন বিয়ে করবি নাতো কবে করবি বুড়ো হলে?
ফাইজ কিছু না বলে চুপ করে রইলো। সবাই চুপ দেখে শালু বলে উঠলো,
— দেহেন খালাম্মা যার বিয়াই হোউক আমার একখান সুন্দর ঝাকানাকা শাড়ি লাগবো।সুন্দরী সাজতে হইবো না।
শালুর কথা শুনে সবাই হেসে দিলো। ইয়ানা হাসতে হাসতে বললো,
— শালু আপু তোকে একটা না দুটো শাড়ি কিনে দিবো।যত ইচ্ছে সাজিস
একথা শুনে শালু ভিষণ খুশি হলো।মন চাচ্ছে এখানেই লুঙ্গি ডান্স দিতে।অবশ্য পুরুষেরা না থাকলে দিয়ে দিতো আজ সে।
________
আহি কলেজে এসে দেখলো শ্রেয়া,সাইফা,তিহা,তিহান সবাই গল্প করছে। আহি সবার কাছে এসে ওর বিয়ের কথা বললো। সবাই তো খুব খুশি হয়েছে, খুশি হবে নাই বা কেন তাদের বান্ধবীর বিয়ে বলে কথা। কিন্তু শ্রেয়া এত পরিমানে খুশি হয়েছে সে চিল্লিয়ে গান গাইতে লাগলো,
~ ভাবি আমার পরিয়াছে লাল রঙের শাড়ি~
~ দুই হাতেতে পরিয়াছে রেশমি কাচের চুড়ি ~
~ খোঁপাতে বাবলা গাছের ফুল ~
~ কানে ঝুলিতেছে ঝুমকা নামের দুল ~
শ্রেয়ার গান শেষ হলে সাইফা শ্রেয়াকে বললো,
— বইন আহির বিয়ে এখনি হয়ে যাচ্ছে না তুই এখনি গান গাচ্ছিস কেন?
শ্রেয়া একটু ভাব নিয়ে বললো,
— আমি গানের প্রাকটিস করছি। তোদের মতো বেসুরারা এসব বুঝবি না।
তিহা বললো,
— হ্যাঁ ম্যাডাম আপনি অনেক সুরেলা গান,গান বুঝি।
— অবভিয়াসলি তোদের থেকে হাজার না সরি কোটি কোটি গুনে ভালো গাই আমি।
শ্রেয়ার কথা শুনে সবাই হাসতে লাগলো। আহি বললো,
— হ্যাঁ ম্যাম আপনি অনেক ভালো গান।
শ্রেয়া একটু লজ্জার ঢং করে বললো,
— ইস এভাবে বলো না আমার লজ্জা লাগে।
তিহানের ওদের কথা ভালো লাগছিলো না তাই সে উঠে অন্যদিকে গেছো তা দেখে সাইফা বললো,
— দেখেছিস তোরা, ও নিজেকে কি মনে করে আমরা এতজন এখানে বসে আছি আর ও সবার মাঝ থেকে উঠে চলে গেলো?
তিহা বললো,
— আরে বাদ দে তো জানিস তো ও একটু এমনই।
— এই তিহা তোর ভাইকে বলে দিবি আমাদের সাথে ফ্রেন্ডশিপ রাখতে হলে আমাদের সাথেই থাকতে হবে সবসময়।
আহি সাইফাকে বুঝাতে বললো,
— আরে এত রেগে যাচ্ছিস কেন? বাদ দে ও একটু পরেই চলে আসবে। আর তিহান গেছে তাতে তুই এত রেগে যাচ্ছিস কেন? এমনি তো দুটোতে মিলে সারাদিন ঝগড়া করতে থাকিস।
সাইফা আর কিছু বললো না। ভুম দিয়ে বসে রইলো। তা দেখে শ্রেয়া বললো,
— এখন আবার পেঁচার মতো ভুম দিয়ে বসে আছিস কেন?
আহি আর তিহা ইশারায় শ্রেয়াকে চুপ করতে বললো।
পরিস্থিতি ঠিক করতে আহি বললো,
— আচ্ছা বান্ধবীগণ এবার বলেন তো আপনারা কবে বিয়ে করছেন তিহার তো বয়ফ্রেন্ড আছে। শ্রেয়া আর সাইফা আপনাদের কি অবস্থা শুনি??
সাইফা বললো,
— আরে এখনও বিয়ে নিয়ে ওতো ভাবিনি আর আমার বয়ফ্রেন্ড নেই রে থাকলে তো জানতিই।
এবার সবাই শ্রেয়ার দিকে তাকালো। শ্রেয়া ওদের কথা শুনছিলো বসে বসে হঠাৎ তার দিকে সবার এমন তাকানো দেখে বললো,
— কিরে ভাই এমনে তাকাছ কেন তোরা?
আহি বললো,
— হুম তুই যা ভাবছিস তাই বল।
— আমি কিছু ভাবছি না।
তিহা বললো,
— দেখ শ্রেয়া ত্যাড়ামি করবি না, সত্যি করে বল তোর কোনো বয়ফ্রেন্ড আছে কিনা?
শ্রেয়া বললো,
— আরে দূর এসব বয়ফ্রেন্ড টয়ফ্রেন্ড আমার নেই।
আহি বললো,
— আচ্ছা যা বিশ্বাস করলাম তোর বয়ফ্রেন্ড নেই কিন্তু কোনো পছন্দ তো আছে।
শ্রেয়া সঙ্গে সঙ্গে বললো,
— পছন্দ তো অনেক কিছুই আছে।
আহি ভ্রু কুঁচকে বললো,
— কী?
শ্রেয়া গুনতে গুনতে বললো,
— ফুচকা, বিরিয়ানি, শপিং, ঘুরতে যাওয়া...
সাইফা রেগে বললো,
— আরে ধুর! আমরা মানুষ বুঝাচ্ছি।
শ্রেয়া হেসে বললো,
— ওহ্! মানুষও পছন্দ করি। তোরা তো আছিসই তারপর আমার মা,বাবা,ভাই তো আছেই।
তিহা বললো,
— উফফ শ্রেয়া! তুই কথাটা ঘুরাচ্ছিস কেন?
— কারণ তোরা এমনভাবে জিজ্ঞেস করছিস যেনো আজকেই আমার বিয়ের পাকা কথা হয়ে যাবে।
আহি মুচকি হেসে বললো,
— তার মানে সত্যিই কেউ আছে?
শ্রেয়া কিছুক্ষণ আহির দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,
— থাকলেও তোদের বলে কী লাভ?
আহি সঙ্গে সঙ্গে বললো,
— মানে আছে!
শ্রেয়া বললো,
— আমি কিন্তু সেটা বলিনি।
সাইফা বললো,
— তাহলে কী বললি?
শ্রেয়া কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো,
— যা বুঝার বুঝে নে।
আহি শ্রেয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।
— ঠিক আছে, এখন আর কিছু জিজ্ঞেস করবো না।
শ্রেয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললো,
— এই তো ভালো মেয়ে।
তারপর হঠাৎ শ্রেয়া উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
— চল, ক্যান্টিনে যাই। আমার ক্ষুধা লাগছে।
সাইফা বললো,
— হুম চল।
_____
এদিকে রৌদ্র কিছু কাজে আদ্রর সাথে ওদের বাসায় এসেছে। আদ্র ওয়াশরুমে গিয়েছে ফ্রেশ হতে তাই রৌদ্র একটু হাঁটতে হাঁটতে ওদের বড় বারান্দার দিকে গেলো। গিয়ে দেখতে পেলো ইয়ানা দোলনায় বসে বই পড়ছে। রৌদ্র ভাবলো একটু জ্বালানো যাক তাঁর উষ্ঠা খাওয়ালীকে। সেই ভেবে সে গিয়ে ইয়ানার পাশে বসে পড়লো দোলনায়।
কারও উপস্থিতি পেয়ে ইয়ানা পাশে তাকালো, দেখতে পেলো রৌদ্র। ইয়ানা কিছুটা অবাক হলো এসময় রৌদ্রকে এখানে দেখে। তাই বললো,
— আপনি এখানে?
— কেন অন্য কাউকে আশা করছিলে নাকি?
ইয়ানা ভাবে এ সবসময় ত্যাড়া উত্তর দেয় কেনো। তাই আবার বইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
— না কাউকেই আশা করি নি আপনাকে তো একবারেই না-ই
রৌদ্র দোলনায় হেলান দিয়ে বললো,
— বাহ্ উষ্ঠা খাওয়ালী তুমি দেখি বইও পড়ো। তা দেখি কি বই পড়ছো?
এই বলে রৌদ্র ইয়ানার হাত থেকে বই আনতে যাবে ইয়ানা বইটা দূরে সরিয়ে নিলো।
— আপনাকে দেখাবো কেনো?
— না দেখালেও হবে। আমি নিজেই দেখে নিচ্ছি।
রৌদ্র বইটা দেখার জন্য একটু এগিয়ে আসতেই ইয়ানা সঙ্গে সঙ্গে বইটা বন্ধ করে ফেললো।
— এই! কী করছেন?
— বইয়ের নাম দেখছিলাম।
— দেখার দরকার নেই।
— এত লুকানোর কী আছে? রোমান্টিক বই নাকি?
ইয়ানা চোখ বড় বড় করে বললো,
— আপনার মাথায় সবসময় এসব ছাড়া আর কিছু থাকে না?
— না কি করবো বলো বয়সটাই তো এখন বিয়ে করে বউকে আদর করার রোমান্টিক প্রেমালাপ করার। বুঝলে সবই কপাল এই কপালে দুঃখ ছাড়া সুখ নেই।
ইয়ানার রাগ উঠে যায় এমন কথায়।বিরক্ত কন্ঠে বলে
— উফ কথা বলাই ভুল হয়েছে আমার। যান আপনি অন্যকারো কাছে গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করুন।
— বর্তমানে তোমাকে ছাড়া আর কাউকে চোখে পড়ছে না। তাই তোমাকেই আমার দুঃখের কথা বললাম।
ইয়ানা কিছু না বলে আবার বইটা পড়া শুরু করলো।
এই লোকের সাথে কথা বলাই অযথা। রৌদ্র এবার ডাকলো,
— এই মেয়ে.?
— কি?
— কিছু না।
ইয়ানা একটু বিরক্ত ভাবে চেয়ে আবার বই পড়া শুরু করলো।
রৌদ্র আবার ডাকলো,
— এই মেয়ে শুনছো.?
— কি বলেন।
রৌদ্র মুচকি হেসে বললো,
— কিছু না।
ইয়ানা রেগে বললো
— উফ আপনি এমন কেন? দুর আমি বসবোই না এখানে।
ইয়ানা যেতে নিবে রৌদ্র হাত টান মেরে ইয়ানাকে নিজের কাছে এনে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
— আমি এমনই মাই মিসেস। আর এভাবেই আপনাকে আমায় মেনে নিতে হবে সারাজীবন।
এই বলে রৌদ্র সেখান থেকে চলে গেলো আর ইয়ানা হা করে তার যাওয়ার প্রানে চেয়ে আছে।
চলবে,,,,,