ফন্ট সাইজ:
থিম:
দাহরেখা

পর্ব 3

লেখক: পূর্ণতা আহমেদ

#দাহরেখা
#পর্ব_০৩
#পূর্ণতা_আহমেদ

বন্দি দশায় মাহিব প্রতিদিন ই মেহেরের সাথে নিয়ম করে দেখা করেছে,তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে কিন্তু সফল হয়েছিলো কিনা তা অজানা। এছাড়াও বাবার কাছে অনেকবার আবেদন করা হয়েছে যাতে মেহেরকে অন্তত তার ভাইয়ের সাথে বাইরে বের হতে দাওয়া হয়।
জামশাদ কোনোভাবেই রাজি নয়।জীবনে যেই ভুল একবার করে তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষকে হারিয়েছিলেন তা পুনরায় করতে সে নারাজ। মেয়েকে সেদিন ই ঘরমুক্ত করবেন যেদিন তার পাশে উপযুক্ত কাউকে খুঁজে পাবেন। তবে সে আশায় এখন বসে নেই। তিনি দূর দূরান্তে খোঁজ লাগিয়েছেন সুপাত্রের।মেহেরের প্রায় বাইশ বছর হতে চললো এসময়কার মেয়েদের বিয়ের জন্য এই সংখ্যা অনেক বেশি তাই পাত্র পাওয়াও মুশকিল। মেয়েকে চোখের বাইরে যেতে দিতে না চাওয়ার জেদে যে তার বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে সেই দিকে আজ এতোদিন পর জামশাদের গুরুতর খেয়াল হলো।

ওইদিকে দরজা খোলার শব্দে মেহের দরজা থেকে দূরে সরে এসে খাটের উপর বসলো।খাটে চোখ ধাধানো মখমলের গাড় বেগুনি চাদর,বাগদাদ থেকে আনা।পুরো ঘরটা লক্ষ্য করলে বোঝা যায় বেশ রাজকীয় ও সৌখিনতা দিয়ে সাজানো এ ঘর। প্রথম দেখায় মনে হবে এই বাড়ির বাকি ঘরগুলো থেকে এই ঘরকে অনেক বেশি প্রাধান্য দাওয়া হয়। যেন প্রতিটি কোণা জানান দিচ্ছে জামশাদ তার মেয়েকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন।

হুট করে দরজা খুলে প্রবেশ ঘটলো মাহিবের এবার সে একা নয়। অবশেষে সেই কন্ঠের মালিককে মেহের চিনতে পারলো।সে আর কেউ নয় তার বন্দিদশার সূচনা তৈরির কারিগর। যে তাকে একজন স্বদেশী হওয়া থেকে ধরে এনে কারাগারে পাঠিয়েছে। মূহুর্তেই লোকটিকে দেখে তার ভিতরের যত প্রশ্ন ছিল তা স্পষ্ট চেহারায় ফুটে উঠলো তবে কিছু বলতে যেয়েও বলতে পারলো না মেহের। সব মিলিয়ে তার মন বিষিয়ে আছে,এখন আর কোনো কিছুতেই সহজে আগ্রহ খুঁজে পায় না,হোক সেটা যতই আগ্রহের বিষয়।
তার আগে মাহিব বলে উঠলো, "চল ছাদে চল। অবশেষে তোর ছাদে যাওয়ায় অনুমতি পেয়েছি।"

"বেশ উপকার হলো।" তাচ্ছিল্যের স্বরে উত্তর দিল মেহের।

ছাদের এক কোণে মেহের নিরবতায় অভিমানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।পাশে তার ভাই মাহিব তাকে পরিচয় করিয়ে দিল শায়েরের সঙ্গে।

"আফতাব নগরের দশা করুন। সব স্বদেশিদের ধরে নাওয়া হয়েছে।সেখানে এখন থাকার মত পরিস্থিতি নেই। তাই এখন থেকে শায়ের এখানেই থাকবে তাছাড়া ও আমাদের কঠিন এই বিপদ থেকেও উদ্ধার করেছে। ব্রিটিশরা যদু কোনো ভাবে টের পেত , জামশাদ মজুমদারের মেয়ে সভায় গিয়েছিল আমাদের খবর হরে যেত।সে যাই হোক,এখন থেকে রোজ বিকেলে তিনজন এখানে এসে গল্প করবো। দেখবি তোর আর একা লাগবেনা।"

মেহের কোনো জবাব দিল না ভাইকে। তার মুখশ্রী বলে দিচ্ছে শায়ের সম্পর্কে জানতে সে মোটেও আগ্রহী নয়। সেই মুখের দিকে একবার দৃষ্টিপাত করে শায়ের বলল,
"কিছু দিনের মেহমান মাত্র।একটা ব্যবস্থা হয়ে গেলেই পালাবো। কাল রাত থেকে তোদের অতি ভোজনে অত্যাচারিত হয়ে যাচ্ছি।" বলেই উচ্চস্বরে হেসে দ্বিতীয়বার মেহেরের দিকে আড়চোখে তাকালো কিন্তু তার রসিকতা মেহেরের উপর কোনো প্রভাব ফেললো বলে মনে হলো না।

এরপর তিনজনের গল্পের আসরে শুধু দুজনের ই কথোপকথন শোনা গেল, তৃতীয় পক্ষ নিশ্চুপ। এই কথার ফাঁকে ,শুধু এক পর্যায়ে মেহেরের চোখের পাতা হালকা কেঁপেছিলো, শায়েরের দিকে একবার চোখ তুলে তাকিয়েছিলো যখন জানলো শায়ের ছদ্মনামে পত্রিকা সম্পাদনা করে এবং তার মতো ব্রিটিশ বিদ্বেষী মনোভাব তার মধ্যেও আছে যা মেহেরকে শায়ের সম্পর্কে জানতে মূহুর্তেই আগ্রহী করে তুলে। কিন্তু নিজের অভিমানের জাল ছিড়ে কোনো কথা সে বললো না।

রাতে নিজের ঘরে ফিরে শায়েরকে নিয়ে ভাবনার জাল বুনতে শুরু করলো। সেই জাল বুননে ক্লান্ত মেহের অজান্তে ঘুমিয়ে রাত পার করে দিলো। হঠাৎ সকালে দরজায় দাসীর কড়াঘাতে ঘুমের বিদায়ঘন্টা বেজে উঠলো। দাসী জানান দিল,
"হুজুর আপনাকে নিচে ভোজনের জন্য ডেকে পাঠিয়েছেন।"

—————
এখন মধ্যাহ্ন,আজ ভোজনে মেহেরের সব পছন্দের খাবার সাজিয়ে রাখা হয়েছে এর মাঝে বিশেষ মেহমানের যত্নেও কোনো কমতি নেই। অবশেষে বহুদিন পর সকলের সাথে বসে ভোজন করার সুযোগ পেল মেহের। এতেও তার নিরবতার ইতি ঘটল না। সে ইতি ঘটল বড় ভাইয়ের কঠিন কথায়, " ঘর থেকে বের হওয়ার সুযোগ পাওয়া মানে এই নয় যে তুই বাড়ির ত্রিসীমানায় পা দিতে পারবি।"

"হয়েছে থামো শাহরিয়ার। আমি কথা বলবো। খাওয়ার সময় কথা বলতে নেই।ভোজন শেষে সবাই বৈঠকখানায় আসবে সেখানে বলবো।" বলেই ভোজনে মন দিলেন জামশেদ কিন্তু তেমন কিছু খেতে পারলেন না।

নিজেও কথা বাড়ালেন না আর কাউকে বাড়াতেও দিলেন না।নিরব ভোজন শেষে বৈঠকখানায় জামশেদের প্রথম কথা ফুটলো মেহেরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

"আমরা তোমার বিয়ের জন্য আবারও উপযুক্ত পাত্র খুঁজছি। শীঘ্রই তোমাকে নতুন জীবন শুরু করতে হবে সে তুমি আমাকে বাবা হিসেবে যতই ঘৃণা করো আমার আদেশ মোতাবেক চলা ছাড়া তোমার গতি নেই।"

জামশাদের কথায় পুরো বৈঠকখানায় নিরবতার ছায়া নেমে এলো কেউ কোনো কথা বললো না শুধু মেহেরের চোখে কিছু একটা জ্বলে উঠলো।

সে কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে চেয়ে রইলো তারপর তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো,
"চার দেয়ালের বন্দিশালা ছোট মনে হচ্ছিলো বলেই কি এবার নতুন খাঁচার বন্দোবস্ত করেছো?"

"তোমার তা মনে হলে তাই। খাঁচায় উড়তে না পারলেও অন্তত জীবিত তো থাকবে।"

"বাহ! তোমার তারিফ না করে পারছি না বাবা। মাকেও তো সে খাঁচায় ই রেখেছিলে তবুও মাকে কেন বাঁচাতে পারলে না? যারা মাকে মেরে চলে গেল তাদের হয়েই গোলামি করছো? তা করো আমাকে করতে বাধ্য করো না।"

জামশাদ নির্বাক চেয়েই রইলেন কিন্তু শাহরিয়ার থাকতে মেহেরের এই বড় স্পর্ধা মেনে নাওয়ার মতো নয়। সে মেহেরকে হুংকার দিয়ে বলল,

"কোন সাহসে বাবার সাথে এভাবে কথা বলছিস! এখনই ক্ষমা চেয়ে নে নয়তো আমার হাত তোর গায়ে পড়বে মেহের! দেখেছো বাবা! ওর স্পর্ধা! "

এই তুমুল ঝড়ের একপাশে শায়ের মাহিবের সাথে বসে জাফরানি চা পান করছে। বাবা মেয়ের এই সংঘাতে নাক গলানোর চেয়ে চায়ের চুমুকে এই পরিবেশ উপভোগ করাই তার কাছে শ্রেয়। পাশে মাহিব মেহেরের কথার আঘাত বাবার ভিতরে কি প্রভাব ফেলছে তা নিয়ে ভাবছে সব মিলিয়ে সে যেন হতভাগ। পরবর্তীতে কি ঘটবে তার আশঙ্কা করে যাচ্ছে।

হঠাৎ জামশাদ সবাইকে বেরিয়ে যেতে আদেশ দিলেন মেহের ব্যাতিত। অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যখন সকলে বেরিয়ে গেল,বৈঠকখানায় আরও নিরবতা বিরাজ করলো। জামশাদ তার চেয়ারে বসলেন মেয়েকে হাতের ইশারায় ডান পাশে বসতে ইশারা করলেন। মেহের এতে কিছুটা নরম হলো বোধহয় তাই বাবার পাশে বসলো।
জামশাদ এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অতীতে ডুব দিল।

বিশাল জমিদার পরিবারে জন্ম জামশাদের।তরুণকালে ব্রিটিশ বিরোধী প্রচুর লেখালেখি করেছিলেন।সে জন্য এত বড় বাড়ি ছেড়ে দূরেও চলে গিয়েছিলেন। তার পূর্ব পুরুষদের ব্রিটিশদের সাথে সুসম্পর্ক ছিল।তাই এ বাড়িতে কখনো ফিরেননি। সেই একা জীবনের সঙ্গী হলেন মরিয়ম।সৃষ্টিকর্তা যেন তাকে সব সৌন্দর্য ও গুন ঢেলে দিয়েছিলেন।স্নিগ্ধ সেই মায়াবী মুখে যখন উজ্জ্বল চোখজোড়া জ্বলে উঠে তখন পৃথিবীর সকল সৌন্দর্যে যেন ফিকে হয়ে যায়।সেই একই রুপ,গুন ও তেজ নিয়ে সবশেষে তাদের কোলে এসেছিলো মেহের।

জামশাদের ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের একমাত্র সঙ্গী ছিল তার স্ত্রী আর কেউ তাকে এ পথে যেতে ভরসা দেয়নি। এমনকি তার লেখালেখিতে একক সঙ্গী ও মরিয়ম ছিলেন। কিন্তু সে পথে তাদের বেশিদিন চলা হলো না।

বাবার মৃত্যুর পর বাড়ি ফিরে এসেছিলেন পরিবার নিয়ে।জমিদারি তখন নিঃশেষ হওয়ার পথে। তারপর বড় ভাইয়ের সাথে শুরু করলেন পাট,চা ও মশলার ব্যবসা।একদিন হঠাৎ বড় ভাই ও চলে গেলেন।তারপর থেকে দুঃখ যেন তার চিরসঙ্গী।
মেহেরের যখন বয়স দুই বছর হলো একদিন আচমকা তার স্ত্রী নিরুদ্দেশ হলেন।চারিদিকে খোঁজ পড়লো কিন্তু তার হদিস মিলল না।ছোট মেহের ও দুই ছেলেকে কাধে করে দিনরাত শান্ত করার চেষ্টা ও স্ত্রীর চিন্তায় অস্থির জামশাদ আশার আলো খুঁজছিল এমন অবস্থায় খবর এলো বারদোলি ঘাটে মরিয়মের ছিন্নভিন্ন লাশ পাওয়া গেছে। দেখে মনে হয় কোনো হিংস্র হায়না দল শিকারকে ছিড়েছুড়ে ফেলে গেছে।

সে হায়না দল যে ব্রিটিশ বাহিনী ছাড়া আর কেউ নয় তা বুঝতে আর বাকি রইলো না।এ যেন ছিল জামশাদকে দাওয়া সব চাইতে নিষ্ঠুরতম হুমকি। সেই প্রথম ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জামশাদের প্রতিবাদী চোখ দুটি আর জ্বলে উঠেনি।সেই চোখ আর কখনোই জ্বলে উঠেনি। সে চোখ যখনই মেহেরের উপর পড়েছে তা শীতল হয়ে গেছে। মেহেরের রুপ যেন প্রতি মূহুর্তেই মরিয়মের প্রতিবিম্ব ফেলে জামশেদের আয়নায়। মেয়েকে তাই সর্বোচ্চ ভালোবাসা ও নিরপত্তার দেয়ালে বন্দি করে রেখেছেন এতগুলো বছর। তারা ছেলেরা বয়সের সাথে বাবার পরিস্থিতি বুঝে উঠলেও মেহেরের কাছে এটা যেন শুধুই কাপুরষতা। তার মাকে তার থেকে যারা কেড়ে নিয়েছে তাদের সামনে সে মাথা নত করতে পারবেনা।যদি মেহেরকে জিজ্ঞেস করা হয় সে সবচেয়ে বেশি কি ঘৃণা করে? নির্দিধায় উত্তর আসবে....ব্রিটিশদের।

মায়ের মর্মান্তিক বিদায়,বাবার চাপা কষ্ট, বাস্তবতা ও কল্পনার জগতের সুতো ছিঁড়ে যাওয়া সব মিলিয়ে যে অদ্ভুত যন্ত্রণা মেহেরকে ঘিরে ধরলো তা সে আর বেশিক্ষণ সইতে পারলো না।নিরবে বৈঠকখানা ছেড়ে বেরিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলো। অবশেষে রাতের আধারে যখন সকল অনূভুতিরা তাকে জেঁকে বসলো,নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হলো তখন স্বস্তি পেতে দোতলার ছাদে গেল।ছাদে যেতেই শীতল বাতাস ও গোলাপের সুঘ্রাণে তার স্বস্তি কিছুটা ফিরলো বোধহয়।পছন্দের একটা কোণা আছে যেখান থেকে দূরের নদী,বারদোলী ঘাট দেখা যায়।মন খারাপ হলেই দক্ষিণের সেই কোণে যেয়ে নিরালায় সময় কাটায় মেহের। কিন্তু আজ সে একান্ত জায়গাটুকু কেউ দখল করেছে বলে মনে হচ্ছে। দূর থেকে দেশলাই দিয়ে কেউ চুরুট ধরিয়ে তাতে একের পর এক টান দিয়ে যাচ্ছে নিঃশব্দে।
মেহেরের উপস্থিতি বুঝতে পেরে লোকটি দ্রুত চুরুট ফেলে দিলো এবং সেখান থেকে চলে যেতে নিলে মেহের পিছন থেকে বলে উঠল,

"ছদ্মবেশে কোন পত্রিকার সম্পাদনা করছেন ?"

শায়েরের ঠোঁটের কোণে কিছুটা হাসি ফুটিয়ে বলল,
"নাম বলে দিলে আর ছদ্মবেশী থাকলাম কই?"

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 3 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন