#বৃষ্টি_ভেজা_এক_সন্ধ্যায়
#নাবিলা_সৈয়দ
পর্ব নং :- ০৩
বাসর রাতে কেউ বউকে থাপ্পড় মারে? আমার স্বামী মেরেছিল আমাকে। জোরালো একটা থাপ্পড় গালে পড়ার পর আমি দু-মিনিট, দু-মিনিট স্তব্ধ হয়ে ছিলাম। তারপর বলেছিলেন,’রুম থেকে বের হও, নাহলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করব।’
কথাটা শোনে কিছুক্ষণ সামনের দাঁড়ানো স্বামীর দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে ছিলাম আমি। এখনো আমার সেই থাপ্পড় আর কথাগুলোর কথা মনে হলে ভোঁতা অনুভূতি হয়। সামনে দাঁড়ানো লোকটা আমার স্বামী না হলে অইদিন আমি ওকে গেড়ে দিতাম। আমি গেড়ে দেইনি ওই লোককে, আমি তার থেকে শোধ নিয়েছিলাম খুব হালকা করে।
আমার দাদাজান বোকা লোক। তিনি তার ভদ্র নাতনী ইসাবেলা নামক মেয়েটাকে খুব বিশ্বাস করতেন। অন্ধের মতো। আমি যে লোককে পিঠে বারি মারতে গিয়ে মাথায় মেরেছি, ওই লোককে ইচ্ছে করেই মাথায় মেরেছি। কখনো শুনেছিলেন মানুষকে পিঠে মারতে গিয়ে মাথায় বারি মারতে, শুনেননি, তাই না? অইটা ছিল আমার রচিত একটা কাহিনি। যে কাহিনি আমি সবাইকে বলে বেরিয়েছি। আমার বাবা বিশ্বাস করেননি। তিনি খোঁজ নিয়েছিলেন ব্যাপারটা নিয়ে। আমি বাঁধাপ্রাপ্ত করিনি, উনাকে সুযোগ দিয়েছি জানার৷ উনিও জানুক, উনার মেয়ে কতটা ঘাতক। আমার বাবা জানার পর ব্যাপারটা মুর্মূষ রোগীর মতো হয়ে গিয়েছিলেন। সবাই যখন বিস্তারিত ঘটনা জানতে পারল তারাও আমাকে ভয় পেত, একমাত্র দাদাজান আমাকে বিশ্বাস করেছিলেন। তিনি জানতেন তার ইসাবেলা কাউকে মারার মতো মানুষ না। কিন্তু তিনি কখনোই জানতে পারবেন না,আমি ইসাবেলা সেদিন অই লোককে মারতেই গিয়েছিলাম আর আজ সামনে দাঁড়ানো লোকটাকে মারতে ইচ্ছে করছে আমার।
আমি ফ্যান্টাসিতে ভোগী। এই যে আমার বয়স এখন বিশ বছর, এই বয়সে আমি পরিণত হওয়ার কথা। তবুও আমার মনের কোণে ঘাপটি মেরে বসে ছিল এতদিন যাবত কিছু অবাস্তবিক ইচ্ছে। আমার বিয়েতে রাজী হওয়ার পেছনেই এই ফ্যান্টাসিই দায়ী। সব সময় চাইতাম আমার এমন একজনের সাথে বিয়ে হোক যে অন্য কাউকে ভালোবাসে। বিয়ের রাতে বলবে আমি তোমাকে মেনে নিব না। আমার জীবনে অন্য কেউ আছে। তারপর রেগে মেগে আমার গায়ে হাত তুলে বের করে দিবে আমাকে রুম থেকে৷ এখন যখন ঘটনাটা আমার সাথে ঘটছে তখন আমার রীতিমতো মাথা গরম হচ্ছে। এতদিন এসব অবাস্তবিক চিন্তা করে মন কীভাবে পুলকিত করতাম? থুহ..! ভাবতাম আমাকে ভালোবেসে লোকটা ভালো হয়ে যাবে। নিজেকে নিজের ধরে ইচ্ছে মতো তুলোধুনো করতে মন চাচ্ছে।
এসব কেন আমি ভাবছি সেই প্রশ্নই জাগতে পারে আপনাদের মনে? আসলে আড্রিয়ান চৌধুরীর প্রেমিকা আছে। অই মেয়েকে উনি ভীষণ ভালোবাসতেন। মেয়েটা উনাকে চিট করার পরও অই মেয়ের পেছনে ছ্যাবলার ন্যায় পড়েছিলেন৷ উনার মতো একটা লোক এমন করেছে লোকটাকে সামনে থেকে না দেখলে আমি বুঝতেই পারতাম না৷। লোকটা যে অন্য মেয়ের পেছনে পড়ে আছে সেটা জেনেও আমি তাকে বিয়ে করেছি বেহায়া, নির্লজ্জ, ইতর প্রাণির মেয়েদের মতো। কারোর জীবনের একপ্রকার তৃতীয় ব্যক্তি হয়েছি।
কাহিনি বিস্তারিত বলি আপনাদের। আমি রিহ্যাবে যাওয়ার মাস খানেক পর এক সকালে দড়ি দিয়ে বেঁধে গোরুর মতো টানতে টানতে আড্রিয়ানকে নিয়ে আসা হয়েছিল। সে পাগলের মতো গর্জাচ্ছিল এখান থেকে ছাড়া পেতে। কোনোরকমে মানুষ গুলো তাকে আটকে রেখেছিল। আড্রিয়ান তবুও যেন ছুটে যেতে চান। তার এই ঔদ্ধ্যতা দেখে তাকে টেনে হিঁচড়ে এনে ফেলা হলো রুম একটায়। চিৎকার চেচামেচি করে পুরো বিল্ডিং মাথায় তুলে ফেলেছিলেন তিনি। তার অই আচরণ দেখে দু-দিন অভুক্ত রাখা হলো তাকে। যখন খাবার আর পানি ছাড়া শরীর ভেঙে আসলো তখন সামান্য নত হলেন।
আড্রিয়ান যেদিন রিহ্যাবে এসেছিলেন সেদিন আমি তাকে দেখেছিলাম এরপর আর দেখিনি। এর মাস খানেক পর ওই ফুড কোর্টে দেখা হলো আর তখনই ফ্লাওয়ার ভাস দিয়ে মেরে অজ্ঞান করে দিয়েছিলাম। এরপর থেকে উনার জাত শত্রু হয়ে উঠেছিলাম আমি। আমার বন্ধুকে সেদিন অভাবে মারার কারণ ছিল সে ভুলবশত বলে ফেলেছিল,’তোমার প্রেমিকা অনুপমা আমার স্ত্রীর মতো দেখতে৷’ এই সামান্য কথায় লোকটা ক্ষেপে গিয়ে আমার বন্ধুকে আঘাতকরে বসে। এভাবে তো অনেকেই বলে, তাই বলে আঘাত করতে হবে? সামান্য মিল আছে বলায়, কেউ কাউকে মারতে পারে তা এই ব্যাটাকে না দেখলে আমি জানতে পারতাম না।
গালের থাপ্পড়টা খুব করে জ্বলছে। চোখ জ্বালা করছে। হয়তো পানি গড়িয়ে পড়বে, কিন্তু আমি পড়তে দিব না। সামান্য গা ঠেলে দূরে সরিয়ে দেওয়ায় একজন লোক আমার গায়ে হাত তুলবে তা আমি ইসাবেলা মেনে নিব না। আমি হলাম পৃথিবীর সবচেয়ে ত্যাড়া প্রজাতীর প্রাণি। আমাকে কেউ যদি একটা আঘাত করে আমি তাকে দশটা আঘাত করে ফিরিয়ে দেই। তাই আড্রিয়ানের এই আঘাত আমি তাকে দশগুণ করে ফিরিয়ে দেব।
আড্রিয়ান আমাকে থাপ্পড় মারার পর আর টু শব্দটি করেননি। বসে বসে সিগারেট ফুকছিলেন। তার ধোয়া পুরো রুমে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেটা রুমে ফেলে দিয়ে পায়ের জুতো দিয়ে পিষে ফেললেন। আবারো আমাকে শাসিয়ে নিলেন,”ফাস্ট অ্যান্ড লাস্টবারের মতো বলছি কখনো আমাকে স্পর্শ করবে না। তোমার ওই নোংরা হাতের স্পর্শ কখনো আমার গা যেন না ছোঁয়। তুমি একটা নোংরা মেয়ে মানুষ।
আমি শান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলাম,”একদম অনুপমার মতো, তাই না?
লোকটা হাত তুলে তেড়ে আসতে নিলেই সাবধান করলাম,”আমার হাত চালাতে বাধ্য করবেন না, আড্রিয়ান। আমি যদি নোংরা কীট হই আপনিও তাই। আপনিও আমার মতো পাগলা গারদে ছিলেন। আমার থেকে দু-মাস বেশি ওখানে ছিলেন। আমার থেকে নিচু প্রজাতির প্রাণি আপনি। আপনাকে কীট বললে কীটের অপমানে হবে… আপনি একজন আত্মসম্মানহীন। হীনের ন্যায় পড়ে আছেন একটা সামান্য মেয়ের পেছনে।
আরো কিছু বলতাম আমার গালে আরো একটা থাপ্পড় পড়ল। এক দিনে দু-দুটো থাপ্পড় খেয়ে যতটা রাগার কথা ছিল তা আমি রাগলাম না। অতিরিক্ত স্তব্ধতায় আমি হেসে ফেললাম। অই মুহুর্তে আমার হাসি ছাড়া কিছুই আসলো না। আমি হা হা করে হেসে ঢলে পড়লাম বিছানার উপর। আমার এই হাসির মানে আড্রিয়ান বুঝতে পারলেন না। যদি বুঝতে পারতেন, তাহলে অই রাতে বিছানায় আরামের ঘুম ঘুমাতে পারতেন না। সারারাত জেগে থেকেই নিজের আত্মরক্ষা করতেন।
চলবে…