ফন্ট সাইজ:
থিম:
বৃষ্টি ভেজা এক সন্ধ্যায়

পর্ব 5

লেখক: নাবিলা সৈয়দ

#বৃষ্টি_ভেজা_এক_সন্ধ্যায়
#নাবিলা_সৈয়দ
পর্ব নং:-০৫

আমার আর আড্রিয়ানের দাম্পত্য জীবনের শুরু হয় বিয়ের প্রায় পাঁচ বছর পর। এর মধ্যে আমরা একে অন্যকে দেখতে পারতাম না। দেখলেই সাপ নেউলের মতো লড়ে পড়তাম। এমন পর্যায়ে আমাদের ঝগড়া ছিল যে, আমার শ্বশুর আমাদের থামানোর জন্য দুটো রুমে লক করে রাখতেন। সামনে পেলে একজন আরেকজনে মাথা ফাটিয়ে ফেলতে আমরা দ্বিধাবোধ করতাম না।

ধীরে ধীরে সব কাহিনি বলি, আবারো ফিরি আমাদের বিবাহের পরের ঘটনা।

আড্রিয়ানের ঠ্যাং ভেঙে দেওয়ার পর আমার সামনে বসে ওকে নিয়ে লুলু শুরু করলেন চৌধুরী বাড়ির বুড়ি দুটো। এসব দেখে ব্যথায় মাথা চিল্লান শুরু করেছিল প্রায়। রগটা দপদপ করছিল। হাতের কাছে কাউকে পেলে ঠাস ঠাস করে দুটো থাপ্পড় মারতাম। মারতে পারলে ভালো লাগতো। এদের নাটক চলল ঘন্টাখানেক। আমার জীবনের সেরা নাটক দেখেছিলাম আমি ওই বাড়িতে। এসব নাটকীয়তা কখনো আমার বোধগম্যের ভেতরে ছিল না, আজ ও তা নেই৷ এখন বসে ভাবলে মনে হয় ওগুলা দেখা উচিত ছিল। আমার এন্টারটেইনিং এর অভাব হতো না।

আড্রিয়ানকে যখন মেরে আধমরা করে দিই তখন আমার শ্বাশুড়ি খালেদা আর দাদি শ্বাশুড়ি শান্তি চৌধুরী আমার উপর আক্রমন করে বসেছিলেন প্রায়। আমি চেহারার প্রতি অনেকটাই সেনসেটিভ৷ কেউ আমার মুখে আঘাত করতে গেলেই আমার মেজাজটা কঠিনভাবে বিগড়ে যায়। সেদিন ওরা আক্রমনাত্মক হয়ে আক্রমণ করার আগেই আমি সরে পড়েছিলাম। ঠেলে শ্বশুরকে মা, বৌয়ের সামনে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেকে পরোক্ষভাবে বাঁচিয়েছি । শাশুড়ির মুঠো পাকানো খামচিটা আমার মুখে না পড়লেও শ্বশুরের মুখে পড়েছিল। এরপর উনার ফরসা চেহারায় যে দাগ পড়েছিল তা মিটতে মাসখানেক লেগে গেছে। আমি যখনি তাকাতাম আমার মুখটা ব্যঙের মতো হয়ে যেত। অই দাগটা আমার মুখে পড়ত, আমি যদি সেদিন ঠিক সময় না সরতাম৷

স্বামীর ঠ্যাং ভেঙে দেওয়ার পর থেকে স্বামী কেমন যেন ঠান্ডা হয়ে গেছিলেন। আমাকে দেখে ছ্যাত ছ্যাত করে ওঠার ভাবটা বদলে গেছিল। কেমন করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। প্রেমময় দৃষ্টি ভাববেন ওটা ছিল। আমাকে কীভাবে শায়েস্তা করা যায় তার ভাবনা ভাবতেন এভাবে তাকিয়ে।

আমরা এক রুমে থাকতাম, কিন্তু কথা বলতাম না। যেদিন আমার স্বামীর ঠ্যাং ভেঙে দিলাম সেদিন দুপুরে আমার শ্বশুর আমাকে ডেকে পাঠালেন উনার লাইব্রেরি রুমে। আমি ভাবলাম আমার ক্লাস নিবেন আচ্চা মতো। কিন্তু হলো তার উলটো।

দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই শ্বশুর মশাই গম্ভীর স্বরে আদেশ দিলেন,”বেলা, দরজা লাগিয়ে এসে বসুন।

আমার শ্বশুর এই পর্যন্ত আমাদের যতবার কথা হয়েছিল নাম ধরে ডাকেননি। কিন্তু এভাবে ডাকায় আমি নিজেও একটু ভরকে গিয়েছিলাম। আমি আমার জীবনে উনার মতো ভদ্রলোক দুটো দেখিনি আবার উনার মতো রাগী লোক ও আর দেখিনি। উনার সেই রাগ একবার আমি দেখেছি। আমার শ্বশুর সবার সামনে থাকতেন ভীষণ গম্ভীরতা ধরে রাখা এক লোক, আর চার দেয়ালের ভেতর হয়ে যেতেন পাগলা মেয়েটার পাগলা শ্বশুর। ইসাবেলা নামক মেয়েটার শ্বশুর ছিলেন তার জীবনে দেখা সবচেয়ে ভদ্রলোকের একজন।

আমার শাশুড়ির সাথে আমার শ্বশুরের সম্পর্ক ভালো ছিল না। বাহির থেকেই তাদের সম্পর্ক ছাড়া ছাড়া ছিল৷ এজন্য শ্বশুর মশাই সবসময় হোপ করে বসে থাকতেন।

দরজা লাগিয়ে শ্বশুরের সামনে বসতেই, তিনি বললেন,”ওর ঠ্যাং ভেঙেছেন কেন আপনি?

আমি একটু ভয় পেলাম। ভ্রু উচিয়ে শুধালাম,”কেন আপনি খুশি হোননি, ঠ্যাং ভাঙায়?

আমার শ্বশুর আমাকে অবাকের চূড়ায় পৌঁছে দিয়ে বললেন,”আমি খুশি হতাম যদি হতচ্ছাড়া, খবিসটার দুটো ঠ্যাং আপনি ভেঙে দিতেন। একটা ভাঙার প্রয়োজন ছিল না, ওর দুটো ঠ্যাং ভেঙে দিলেই আমি বেশি খুশি হতাম। মাথা ও ফাটিয়ে দিলেন না কেন?

আমি শ্বশুরের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে টেবিলে থাপ্পড় মেরে হেসে উঠলাম৷ তখন তিনি আবার বললেন,”পরেরবার যখন ওর মাথা ফাটাবেন বা ঠ্যাং ভাঙবেন তখন আমাকে জানাবেন, হু? আমি এসে আপনাকে সাহায্য করে যাব।

আমি মাথা দোলালাম৷ আমার শ্বশুর মশাই ছেলের পা ভেঙে যাওয়া নিয়ে ব্যথিত মোটেও হলেন না, উনি বোঝা গেল এতে যেন আরো বেশি উৎফুল্ল হয়ে পড়েছেন। মুখটা সূর্যমূখী ফুলের ন্যায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। আমাকে আরো টিপস দিলেন কীভাবে আমার স্বামীকে আঘাত করলে তিনি দমে যাবেন। উনার নিজের চেহারা নিয়ে খুব ভাব ছিল। নিজেকে নিয়ে খুবই সেনসেটিভ ছিলেন তিনি। সেই চেহারায় একসময় আমার জন্য বড়সড় দাগ পড়ে গেছিল। ওই দাগের দিকে তাকালে আজ ও আমার বুক ভারী হয়ে ওঠে। আহ.. কেন জেন করতে গেলাম কাজটা?

যাই হোক,আমার আব্বুর বন্ধু ছিলেন আমার শ্বশুর। বাবা যখন আমার ব্যাপারে খোঁজ খবর নেন তিনি সাথে ছিলেন৷ অই মুহুর্তে তিনি জানতে পারেন আমার ব্যাপারে। জানার পরও আমাকে ছেলের বউ বানিয়ে নিয়েছেন এটা উনার বড় হৃদয়ের উদরতা ভাববেন আপনারা! আসলে তেমন কিছু না। আমার শ্বশুর আর আমার ডিল হয়েছিল বিয়ের পূর্বে উনি আমাকে টাকা দিবেন, এর বদলে আমি উনার ছেলেকে হতচ্ছাড়া মেয়েটার কাছ থেকে ছাড়িয়ে আনব। হতচ্ছাড়া মেয়েটা আমার স্বামীর প্রেমিকা ছিল একসময়। প্রথমদিকে আমি রাজী হচ্ছিলাম না। উনি বারবার আমাকে প্রস্তাব দিচ্ছিলেন বাবার অলক্ষ্যে। আকস্মিক আমার মাথায় ভাবনা এলো কাজটা করলে সমস্যা কোথায়! বিনিময়ে তো আমি টাকা পাব।

ভদ্রলোক আমি রাজী হতে না দেখে শেষ পর্যন্ত বাবার কাছে প্রস্তাব রাখলেন, তখন আমি বিনা বাক্যে রাজী হয়েছি টাকার জন্য। শ্বশুর আমার স্বামীকে শায়েস্তা করার ফন্দি শিখিয়ে দিলেন। আমি ও আমার মতামত রাখলাম। উনি শুনলেন। শোনার পর খুশিতে হাসলেন। এবার উনার ছেলে ওই হতচ্ছাড়া মেয়ের কাছ থেকে ছাড়া পাবে ভেবে উনি হেসেছিলেন আমি ভাবলাম, কিন্তু শেষের দিকে গিয়ে জানতে পারলাম এটা ভিন্ন কারণে। আমার শ্বশুর পুরো দাবা খেলেছেন, আমি আর আড্রিয়ান ছিলাম সেই দাবার সামান্য গুটি।

স্বামীর ঠ্যাং ভেঙে দেওয়ার পর থেকে তিনি নির্লিপ্ত থাকলেও, ঠ্যাং ভাঙার দশ দিনের দিন উনি উনার মুখ থেকে জিপার খুললেন। আমি তখন আমার ফাটা গলা দিয়ে গান গাচ্ছিলাম৷ সোয়ামিকে বিরক্ত করছিলাম। আমার গান শুনলেই উনি মুখ কুঁচকান। এগারোদিনের দিন এমন হলো না। গান গাওয়ার মধ্যে আমার স্বামী হুইলচেয়ার ঠেলে এসে আমার সামনে দাঁড়ালেন। একপ্রকার বসাই বলা চলে। আমি ভ্রু কুঁচকালাম৷ উনাকে সামনে দেখেও বিশেষ পাত্তা দিলাম না। একটা মাছির মতো অবেহেলা করে নিজের কার্যে ব্যস্ত হলাম। আমার রসে রঙে, হাজারটা প্রজাপতি উড়া পৃথিবীতে নিউক্লিয়ার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তিনি বললেন,”আমার বাবা তোমাকে কতটাকা দিয়ে বুকড করেছে?

আমার ভ্রু, কপাল, চোখ, নাক সব কুঁচকে গেল এক লহমায়। স্বামীর দিকে এমনভাবে তাকালাম যেন জীবনের জঘন্য, আমার শোনা বিশ্রী শব্দের একটা শুনেছি। মনে তখন ধাম ধাম করছিল। ব্যাটা জানল কীভাবে এটা? আজ ও তা রহস্য হয়ে পড়ে আছে। আমার স্বামী আমার নাটকীয়তা চুপচাপ হজম করে নিয়ে, ঠান্ডা গলায় বললেন,”এত নাটক করতে হবে না, সত্যি করো বলো কত টাকা দিয়েছে!

আমাকে না বোঝার ভান ধরে বসে থাকতে দেখে উনি তপ্ত শ্বাস ফেললেন৷ বললেন,”বাবার টাকার দ্বিগুণ টাকা আমি তোমাকে দিব, তুমি আমার সাথে ডিল সাইন করো।

আমার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। টাকার ব্যাপারে ইসাবেলা কখনো আপোস করে না। করে ফেললে ওইদিন ভালো হতো। ঠোঁটে মিচকে হাসি ঝুলিয়ে, লোভীদের মতো শুধালাম,”কেন? আপনার সাথে কেন ডিল সাইন করব?

উনার মতো খবিস, ত্যাড়া, বাঁদর তখন নত হয়েছিলেন অই মেয়ের জন্য। বললেন,”আমার আর তোমার তো কোনো শত্রুতার সম্পর্ক নেই। আমরা না হয় বন্ধু হই। তুমি আমার কথামতো কাজ করবে আমি তোমাকে পেমেন্ট করব। এতে খারাপ কী?

আসলেই খারাপ কী? দু-দিক থেকেই আমার লাভ। আমি বিনা বাক্য ব্যয়ে রাজী হলাম প্রস্তাবে। সেদিন থেকে আমার ব্যবসা ফুলে ফেপে উঠল। একদিক থেকে শ্বশুর টাকা দিলেন ছেলেকে হতচ্ছাড়িটার থেকে ছাড়ানোর জন্য, অন্যদিকে আমার স্বামী আমাকে টাকা দিলেন তার বাবার সব কথা আমি যেন তাকে জানাই। আমি দু-দিক থেকে দু-ঠ্যাং হাত পা দিয়ে টাকা আয় করলাম৷ আমি ভেবেছিলাম ওটা আমার এই শান্তির জীবনের শুরু, আসলে ভুল ছিলাম। অইটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। শান্তির জীবন অশান্তীতে চলে যাওয়ার একটা ফাঁদ। আর ওই ফাঁদে আমি লাফিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছিলাম। যা আমার শ্বশুর আমাদের জন্য এঁটে রেখেছিলেন।

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 5 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন